তহা আবদুর রহমানের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার পুনর্পাঠ

ত্বহা তরীক

তহা আবদুর রহমানের কাছে রাজনীতি (سياسة) এর মানে কী—এ প্রশ্নের সমাধান করতে গেলে দুটো প্রধান জটিলতার সামনে এসে আমাদের দাঁড়াতে হয়। প্রথমটি হলো : তহা আবদুর রহমান রাজনীতিকে যে অর্থে ব্যবহার করেন তা দৈনন্দিন অর্থে আমরা রাজনীতিকে যে অর্থে ব্যবহার করি তার থেকে আলাদা। আমি আমার এই প্রবন্ধের পরিক্রমায়, পশ্চিমা ঐতিহ্যে—ম্যাকিয়াভ্যালি থেকে হাবেরমাসের কাছে—রাজনৈতিকতা যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা মুসলিম রাজনৈতিক ঐতিহ্যে রাজনীতির যে ধারণা আছে—তার থেকে তহা আবদুর রহমানের কাছে “রাজনীতি” শব্দবর্গের অর্থের ফারাকের বিষয়টি নিয়ে আলাপ করব। এই ফারাক শুধুমাত্র অর্থগত নয়, বরং অধিবিদ্যা (metaphysics), জ্ঞানতত্ত্ব থেকে শুরু করে নানা দিকে এই পার্থক্যের জাল বিস্তৃত। পশ্চিমা আধুনিক ঐতিহ্যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখে কীভাবে এই সংঘাতপূর্ণ ক্ষেত্রকে সুচারুরূপে বাগে আনা যায় তার পাঠ দেওয়া হয়েছে। এই দুই ঐতিহ্যেই রাজনীতি প্রয়োজনীয়। মজ্জাগতভাবে ইতিবাচক না হলেও রাজনীতির ক্ষেত্র হিসেবে ইতিবাচক হয়ে ওঠার সুযোগ আছে। প্রাক-আধুনিক ইসলামি তুরাছে মোটা দাগে রাজনীতি একটি নীতি শাস্ত্র, যার মূল গরজ হলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু তহা আবদুর রহমানের কাছে রাজনীতি সত্তাগতভাবে নেতিবাচক; ক্ষমতার দ্বৈতরথের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে আধ্যাত্মিক এলাজের মাধ্যমে সারিয়ে তোলাই তার প্রধান অভিপ্রায়। সুতরাং “রাজনীতি” এর প্রচলিত যে অর্থে পাঠক অভ্যস্ত তা থেকে চ্যুত না করতে পারলে, “রাজনীতিকে” তহা আবদুর রহমান কোন অর্থে ব্যবহার করছেন, সেই সূত্র পাঠককে ধরিয়ে দেওয়া মুশকিল।

 

এই তক এসে একটি দ্বিধার খোলাসা করা প্রয়োজন। আধুনিক যুগে এসে রাজনীতি যখন আমাদের হায়াতের উদ্দেশ্য ও মওতের সিদ্ধান্ত নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সেখানে রাজনীতিকে আধ্যাত্মিকতা দ্বারা সমাধান করা তহা আবদুর রহমানের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্পকে পাঠের গুরুত্ব আসলে কতটুকু? এই দ্বিধার জওয়াবে বলা দরকার, তহা আবদুর রহমানের মজবুতির জায়গা হলো, সমকালীন পাশ্চত্যের রাজনৈতিক চিন্তাকে টীকা-টিপ্পনীর সাথে হাজির করা। তহা আবদুর রহমানের বিকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে আপনাদের দ্বিধা থাকলেও, এই ক্ষেত্রে তিনি আপনাদের অন্তত হতাশ করবেন না বলে একিন রাখতে পারেন।

 

দ্বিতীয় জটিলতা হলো তর্জমার মজ্জাগত অস্পষ্টতা ও সীমাবদ্ধতা। তহা আবদুর রহমান নিজে পশ্চিমা ঐতিহ্যের সাথে, বিশেষ করে ফরাসি ভাষার পণ্ডিতদের সাথে হর-হামেশাই চিন্তার কারবার করে থাকেন। সাথে সাথে আরবি ভাষায়ও তিনি নতুন নতুন শব্দ-বন্ধনী তৈরির কাজেও পারঙ্গম। এ প্রবন্ধের ভাষা যেহেতু বাংলা, সে ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনটি, বা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি ভাষার শব্দ, এবং তার সাথে সাথে সেই শব্দের নির্দিষ্ট ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের সিলসিলার সুলুক-সন্ধান না করা সম্ভব হলে অস্পষ্টতা তৈরি হয়। কাজেই আলোচনা ব্যাহত হয়। যেমন ধরা যাক সহিংসতা শব্দের কথাই। সহিংসতার ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ হলো violence। যদিও এই শব্দের ল্যাটিন রুট এর অর্থ প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করা, যার সাথে আধুনিক আরবি عنف এর মিল আছে, কিন্তু বর্তমানে english/french শব্দ violence তাত্ত্বিক ভাবে জর্মন gewalt শব্দের অনুগামী।

 

এর কারণ হলো, পশ্চিমা ঐতিহ্যে violence এর তত্ত্বায়নের পিছনে জর্মন পন্ডিতেরা—বিশেষ করে, হেগেল, মার্ক্স, ওয়েবার এবং সবশেষে ওয়াল্টার বেনজামিন— বড় ভূমিকা পালন করেছেন। এরা সকলেই কোন না কোন ভাবে violence কে সামাজিক, ঐতিহাসিক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখেছেন। আইনী ভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়াও এখানে violence বলেই স্বীকৃত হয়। তারা violence বোঝাতে gewalt শব্দ ব্যবহার করেছেন। এই gewalt শব্দের রিশতা হলো আধুনিক জর্মন ক্রিয়াপদ walten তথা শাসন করা বা চালনা করা- এর সাথে। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো, ক্ষমতা, সামর্থ্য, কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ। এজন্য তাদের চিন্তা অনুসারে শাসন প্রক্রিয়া বা ক্ষমতার যে কোন বহিঃপ্রকাশ স্বাভাবিকভাবেই violent। এ ক্ষেত্রে তাত্ত্বিকভাবে জর্মন gewalt এবং ইংরেজী violence এর ভিতরে কোন নেতিবাচক কিছু নেই; যদিও জনপরিসরে এসে রাজনৈতিক স্বার্থে ইংরেজী violence নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়।

 

এর সাথে আমরা যদি বাংলা সহিংস শব্দের অর্থগত সিলসিলা চিন্তা করি, এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা অহিংসা (अ-हिंसा) এর সাথে। হিংসা শব্দের ক্রিয়াপদের অর্থ হলো আঘাত করা, জখম করা। অহিংসা এর ধারণা ভারতীয় সভ্যতায় অপরকে ক্ষতি না করার দর্শন হিসেবে মশহুর ছিল। এই ঐতিহ্যের ফলে সহিংস শব্দের অর্থ বাংলাতে স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক ভাবে দেখা হয়। এজন্য যখন কোন শব্দের সিলসিলা না জেনে, সেই শব্দ যখন অন্য কোন ভাষার সমার্থবোধক শব্দ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় সেই শব্দ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে। যাই হোক, এই দুই প্রধান জটিলতার কথা মাথায় রেখেই আমাদের এই তত্ত্ব-তল্লাশীতে নামতে হবে।

 

তহা আবদুর রহমানের চিন্তাগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট :

তহা আবদুর রহমান “রাজনীতি” বর্গকে কীভাবে বুঝেছেন, তা বুঝতে গেলে আমাদের তহা আবদুর রহমানের চিন্তাকে তার নির্দিষ্ট স্থানিক-কালিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই আগাতে হবে। অন্য কথায় তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিকতা, চিন্তার সফর ও মরক্কোর সমকালীন বাস্তবতাকে সামনে না নিয়ে এসে তার “রাজনীতি” তত্ত্বের ঠাহর করা মুশকিল। যদিও তহা আবদুর রহমানকে নিয়ে লিখিত অধিকাংশ গবেষণাতে তাকে এভাবে বোঝার চেষ্টা করতে দেখা যায় না; বরং তার চিন্তাকে বিমূর্ত তত্ত্ব হিসেবেই আলোচনা করা হয়েছে। যে লেখাগুলো আমার চোখে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা পড়েছে সেগুলো হলো: ফরিদ সুলাইমান, মুহাম্মদ হাসহাস এবং ইব্রাহীম মাশরুহের। ইব্রাহীম মাশরুহ ও মুহাম্মদ হাসহাস তার চিন্তার সফরের বর্ণনা করলেও রাজনীতির প্রসঙ্গে তার অবস্থানের সাথে তার সুফী চিন্তার সম্পর্ক পরিষ্কার ভাবে দেখাননি। যদিও তারা দুইজনই মরক্কোর কাদেরী সুফী তরীক্বা বুদশিশিয়্যা এবং এর পীর সিদি হামজার তহা আবদুর রহমানের উপর তাছির নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

ওয়ায়েল হাল্লাক এদিক থেকে তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি তত্ত্বকে বাস্তব প্রেক্ষাপটে পরিপূর্ণ স্থাপন না করলেও, হাল্লাক তহা আবদুর রহমানের চিন্তার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সচেতন। কারণ হাল্লাক মনে করেন, মরক্কোর সমসাময়িক নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তহা আবদুর রহমান তার চিন্তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেননি। এজন্য তিনি নিজে থেকে সচেতনভাবে তহা আবদুর রহমানের চিন্তার অধিকতর রাজনৈতিক পাঠের পথ তৈরি করেছেন। তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি-তত্ত্বের সাথে বাস্তব প্রেক্ষাপটের সম্পর্ক ধরা পড়েছে ফিলোসফিক্যাল ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রির প্রফেসর ফরিদ সুলাইমানের কাছে। ফরিদ সুলাইমান দেখিয়েছেন যে, বুদশিশিয়্যাহ সুফীদের সাথে তহা আবদুর রহমানের সম্পর্ক এবং এই সুফী গোষ্ঠীর সাথে মরক্কোর বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর সম্পর্কের আলোকেই তার চিন্তাকে পাঠ করা প্রয়োজন।

 

বুদশিশীদের চিন্তার অভিমুখ নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। অনেক গবেষকগণ, বর্তমানে তাদেরকে non-legalistic সুফীদের মধ্যেও গণ্য করেছেন। এর কারণ এই নয় যে, তারা শরীয়ত মানেন না, বরং তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরণের লোকায়ত কৃষ্টি-কালচারের প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা পক্ষান্তরে শরীয়তের গুরুত্ব দেওয়া আলেমগণ পছন্দ করেন না। মোট কথা, বুদশিশীরা বর্তমানে শরীয়াহকে আইনী কাঠামো মনে করার চেয়ে, তারা এটিকে একটি নৈতিক আবহ বলে মনে করে। উদাহরণস্বরুপ: বুদশিশিয়্যার নারী সদস্যদের নেকাব/হিজাব পরবার বিষয়ে কোন বাধ্যবাধ্যকতা নেই। এমনকি বুদশিশী শায়খের (পীর) পরিবারের সদস্যরাও হিজাব পরেন না বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা হতে দেখা যায়। আধুনিক সময়ে এসে বুদশিশীরা অন্যান্য সুফী তরীক্বার মতো কবর/মিলাদ নিয়ে রীতি-নীতি পালন করার বিষয়ে জোর দেয় না, বরং বর্তমানে তারা নানা সামাজিক সংস্কার মূলক কাজে বেশি আগ্রহী। পাশাপাশি তারা আধুনিক পরিভাষা যেমন tolerance, universalism, dialogue ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক এবং সেক্যুলার জনগণের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন।

 

তবে বুদশিশীরা আগে এরকম ছিল না। ইতিহাস গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, সত্তরের দশকের প্রথম দিকে সিদি আব্বাস মৃত্যুবরণ করলে, বুদশিশিয়্যাদের প্রধান হন সিদি হামজা। তিনি সমাজের নানাস্তরের মানুষের লোকদের, চাই তারা ধর্মীয় বিধি বিধান মানুক বা না মানুক, বুদশিশিয়্যা তরীক্বায় অন্তর্ভূক্ত করেন। তার এই নীতি তরীক্বা পূর্ববর্তী শায়খ সিদি বুমেদিনের (মৃ. ১৯৫৫) নীতি- যেমন চল্লিশ বছরের নিচে কাউকে তরীকায় অন্তর্ভূক্ত না করা এবং শরঈ জ্ঞানের উপর জোর দেওয়া ইত্যাদি- থেকে পুরোপুরি আলাদা ছিল। একে কেন্দ্র করে বুদশিশীদের মাঝে বিভাজনও দেখা যায় এবং সিদি আব্বাসের প্রধান শিষ্য আব্দুস সালাম ইয়াসিন বুদশিশী তরীক্বা ছেড়ে যান।

 

আব্দুস সালাম ইয়াসিন পরবর্তীতে সুফী তাযকিয়া অব্যহত রাখার পাশাপাশি আদল ওয়াল ইহসান নামে একটি দল গঠন করেন। সাইয়্যিদ কুতুবসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হলেও, তিনি নিজেকে সচেতনভাবে সরাসরি রাজনীতি থেকে দূরে রাখেন। কিন্তু নানাভাবে মরক্কোর রাজনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা চালিয়ে যান এবং জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৪ সালে আব্দুস সালাম ইয়াসিন রাজা হাসান দ্বিতীয়র প্রতি একটি খোলা চিঠি লেখেন। আব্দুস সালাম ইয়াসিনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে থাকার পাশাপাশি অব্যাহতভাবে গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং তাকে নানা ধরণের নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। তার অনুসরণকারীরা সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও সুফিবাদ চর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এদের শক্তিশালী মতামত আছে।

 

ফরিদ সুলাইমান দেখান, ধর্মীয় বিধি বিধানে সহজতা দেখিয়ে বুদশিশী তরীক্বা যখন মরক্কোর সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে, এ সময়  তহা আবদুর রহমান ১৯৮০ সালের দিকে বুদশিশিয়্যা তরীক্বার সদস্য হন। তিনি তার العمل الديني وتجديد العقل  বইয়ের প্রথম সংস্করণের  ভূমিকায় সিদি হামজাকে আধ্যত্নিক গুরু এবং নিজের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। সিদি হামজার উপস্থিতিতে বিভিন্ন আলোচনা মাহফিলে তহা আবদুর রহমান বক্তব্যও রাখতেন। তার জীবনী নিয়ে বানানো আল জাযিরার এক ডকুমেন্টারিতে তিনি যুক্তিবিদ্যার সীমাবদ্ধতা বোঝার পর আক্বলের সীমানা অতিক্রম করার জন্য সিদি হামজার শরণাপন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৯২ সালের এক ভিডিওতে বুদশিশিয়্যাহদের দরবারে সিদি হামজার উপস্থিতিতে তহা আবদুর রহমানকে জিকিরের তালে তালে সুফীদের নৃত্যে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

 

স্বাভাবিকভাবে একজন দার্শনিক সুফী তরীক্বার সাথে যুক্ত থাকবেন তাতে কোন সমস্যা নেই, বরং রুহানি জ্ঞানের জন্য তা করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু বুদশিশীদের রাজনৈতিক অবস্থান পাঠ করলে এই সম্পর্ককে গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন মনে হয়। এ দিক থেকে ফরিদ সুলাইমানের মূল্যায়ন এবং দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাস্তবে দেখতে পাই, বুদশিশীরা নিজেদের অরাজনৈতিক থাকার দাবি করে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান মরক্কোর রাজপরিবারের স্বার্থের সমানুপাতে চলে। বিশেষ করে, নিকট অতীতে এসে মরক্কোর রাজপরিবার বুদশিশীদেরকে শান্তিপূর্ণ উদারনৈতিক “মরক্কোর ইসলাম” এর মডেল হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই চিত্রায়নে বুদশিশীরা হলো Good Muslim, অপরদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতির সমর্থকরা, সালাফিরা এবং আব্দুস সালাম ইয়াসিনের সুফী আদল ওয়া ইহসান গোষ্ঠীরা হলো Bad Muslim। Bad Muslim-রা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করেন, রাজার ক্ষমতার সাথে সংসদের ক্ষমতার সমান বিভাজন দাবি করেন এবং রাজপরিবারের সমালোচনা করেন। এই চিত্রায়নে বুদশিশীরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাদের এই রাজনৈতিক প্রকল্প ভালোভাবে বোঝার জন্য আরেকবার ইতিহাসে কিছুটা নজর দেওয়া জরুরী। অন্যান্য সুফী গোষ্ঠীগুলোর উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও, বুদশিশীদের নির্লিপ্ততা এবং শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে উপনিবেশ শক্তির পক্ষ থেকে তাদেরকে অরাজনৈতিক ও নমনীয় মনে করা হত। এ পরিস্থিতিতে সত্তরের দশকে সিদি হামজা ইসলামের উদারনৈতিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে বুদশিশীরা হুকুমতের নিকটবর্তী মিত্র হয়ে ওঠে। এ সময় অনেক প্রভাবশালী লোকজন বুদশিশী তরীক্বায় যোগ দেন। মরক্কোর বাদশা হাসান দ্বিতীয় নব্বই দশক থেকে সুফিদের প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ তে ষষ্ঠ মুহাম্মদ ক্ষমতায় আসার পর বুদশিশীরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে আঠারো বছর দায়িত্ব পালন করা ইসলামপন্থীদের দিকে ঘেষা হাদিছ বিশেষজ্ঞ আব্দুল কাবির আলাওয়ীকে সরিয়ে, সরকার বুদশিশীদের থেকে আহমদ তাওফিককে ধর্মীয় এবং ওয়াক্বফ মন্ত্রী নিয়োগ করে। যিনি আজ অবধি সেই পদে আছেন।

 

বিশেষ করে ২০০৩ সালে ক্যাসাব্লাংকাতে উগ্রবাদীদের বোমা হামলার পর, হুকুমত জোরে শোরে “মরক্কান উদারনৈতিক” ইসলাম তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। মরক্কোতে সরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন সুফী ভাবধারার গান, কবিতাসহ বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মদদে প্রচার-প্রসার করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মসহ অন্যান্য আধ্যত্নিক ধারার সাথে সংলাপের আয়োজন করা হয়। আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর এমনকি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় সংস্কৃতির আড়ালে সরকারের একান্ত অনুগত, আপোষকামী, good muslim তৈরির রাজনৈতিক প্রকল্প থেকে এই উদ্যোগ আসলে ভিন্ন কিছু ছিল না। মূলত ৯/১১ এর পরে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে সুফিবাদকে অরাজনৈতিক-অনুগত বিকল্প ইসলাম হিসেবে সামনে নিয়ে আসা শুরু হয়।

 

এইখানে দুটো বিষয় বলে রাখা ভালো :

 

প্রথমত : সুফিবাদ মজ্জাগতভাবে কখনোই অরাজনৈতিক নয়, বরং তাদের এই অ-রাজনীকিকরণ এবং বিকল্প ইসলাম তৈরিকরণ একটি পশ্চিমা-ঔপনিবেশিক প্রকল্প। রাশিয়ার বিরুদ্ধে শামিল দাগেস্তানির যুদ্ধের সময় অথবা ইতালী এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সুফীদের যুদ্ধের সময়, পশ্চিমা প্রাচ্যবিদরা সুফিবাদের মুরিদের পীরের হাতে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পন করাকে টোটালিটারিয়ান হিসেবে চিহ্নিত করতো। এ ছাড়াও সুফিবাদকে নানাভাবে খারাপ এবং সহিংসতার উপাদানে পরিপূর্ণ হিসেবে তারা উপস্থাপন করতো। কালের পরিক্রমায়, পশ্চিমের সুফিবাদকে বিকৃতভাবে পাঠের সিলসিলা বন্ধ হয়নি। তবে তখন সুফিবাদকে শত্রু হিসেবে হাজির করা হলেও, এখন liberalism এর সাথে মিলিয়ে একে হাজির করা হয়েছে বন্ধু হিসেবে। এজন্য, এই বিষয়টি ধর্মীয় নজরে না দেখে রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে শত্রু-মিত্র তৈরি করে নেয়ার পদ্ধতি হিসেবে ও সুফিবাদকে ক্ষমতার আয়ত্তাধীন করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

 

দ্বিতীয়ত : স্থানীয় ইসলাম তৈরির প্রকল্প পৃথিবীর নানা স্থানেই দেখা যায়। এই প্রকল্পে ইসলামের যে সংস্করণ ক্ষমতাসীনের জন্য হুমকিস্বরুপ তাকে বৈদেশিক ইসলাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং যেই ইসলাম ক্ষমতার অনুগত তাকে স্থানীয় ইসলাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উদাহরণস্বরুপ: ভারতে বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে তাদের আদর্শের প্রতি হুমকিস্বরুপ ইসলামের যে কোন চিহ্নকেই বহিঃস্থ হিসেবে দাবি করা হয়। এ ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য হলো, রাজনৈতিকভাবে অক্রিয়, নমনীয় “স্থানিক” ইসলাম নামের বর্গের উৎপাদন করা। এই প্রকল্পের প্রধান আদর্শ হলো, তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করা এবং উৎখাত করা। অর্থাৎ, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা যে কোন ভিন্নমত পোষণকারীকে এই প্রকল্প জমিনের সাথে সম্পর্ক থাকা অথবা না থাকার প্রশ্নে পরিণত করতে সিদ্ধহস্ত।

 

আরব বসন্ত আরব দেশগুলোর মধ্যে মরক্কোর ওপর তেমন কোন প্রভাবই ফেলতে পারেনি; এর বড় একটি কারন হলো বুদশিশীরা তাদের শায়খের নির্দেশে রাজা এবং তৎকালীন নতুন সংবিধানের পক্ষে রাস্তায় নেমে সমর্থন জানায়। এর ফলে অন্যান্য প্রতিবাদকারীরা সুবিধা করতে পারেনি। মজার ব্যাপার হলো, নিজেরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করলেও এসব মিছিলে তাদেরকে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করতে দেখা যায়। মোদ্দাকথা হলো, রাজার কর্মকান্ডের বৈধতা প্রদান করতে বুদশিশী এবং রাজার মধ্যে শক্তিশালী ঐক্য গড়ে উঠেছে। তহা আবদুর রহমান এসব প্রকল্পকে সমর্থন করেছেন নাকি বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তা জানা যায় না। ফরিদ সুলাইমান দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের নানা ক্ষমতাসীন সরকারের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলেও মরক্কোর সরকারের বিষয়ে তিনি সবসময় চুপ থেকেছেন। সুফিবাদের এই বিকৃতির বিষয়েও তাকে জনপরিসরে কিছু বলতেও শোনা যায় না।

 

ফরিদ সুলাইমানের সামগ্রিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আমাদের মনে রাখতে হবে তহা আবদুর রহমান এবং বুদশিশীদের সম্পর্ককে সরলরৈখিকভাবে পাঠ করা উচিত নয়। বরং আমাদের এই কথা স্মরণ রাখতে হবে বুদশিশীদের নিয়ে জনপরিসরে নেতিবাচক কিছু না বললেও আভ্যন্তরীণভাবে বুদশিশীদের সাথে তার সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করেছে। এর প্রমাণ হলো: বুদশিশীদের অনেকে তার লেখা “রাজনৈতিক” হয়ে যাওয়ার সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে, আধুনিক ইসলামী দল-উপদলগুলোর বিশেষজ্ঞ মুন্তাসির হামাদার মতে, ২০১৭ সালে সিদি হামজার মৃত্যুর পরে তার চিন্তার রাজনৈতিক রঙ জাহের হতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পূর্বে তার চিন্তাকে নিয়ে বুদশিশিয়্যাহ এবং সরকারী কতৃপক্ষ যতটা স্বস্তিতে ছিল, পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে তার মন্তব্যে বুদশিশীরা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে। বুদশিশী বুদ্ধিজীবীদের সাথে রাজনৈতিক-আদর্শিক বিষয় নিয়ে তহা আবদুর রহমানের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেও জানা যায়। বিশেষ করে ২০১৮ সালে তার ثغور المرابطة বই প্রকাশের পর এই সমালোচনা তীব্র হয়।

 

মরক্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইদ্রিস জান্দারী তহা আবদুর রহমানের এই বইকে কেন্দ্র করে বলেন যে, তহা আবদুর রহমান এই বইতে দার্শনিকতার আড়ালে নিজস্ব আদর্শিক অবস্থানকে ঢেকে রাখতে চাওয়া সত্ত্বেও ব্যর্থ হয়েছেন। তার মতে, এই বইতে তহা আবদুর রহমানের চিন্তা ইখওয়ানুল মুসলিমিন এবং খোমেনীপন্থিদের মতো পুনর্জাগরণবাদী ইসলামের পক্ষে চলে গিয়েছে। সাথে সাথে তহা আবদুর রহমান স্থিতিশীল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলেও তার অভিযোগ। বিশেষ করে, জান্দারী এই বইতে তহা আবদুর রহমানের চিন্তাতে ইরানের প্রতি পক্ষপাত, আরব আমিরাতের বিপক্ষে অবস্থান, কারবালার ঘটনাকে ইতিহাস হিসেবে না দেখে ontologically দেখা, আল-আক্বসার গুরুত্ব দিতে গিয়ে কাবা ঘরের গুরুত্ব খর্ব করা ইত্যাদি নিয়ে তহা আবদুর রহমানের সমালোচনা করেন।

 

এই সব প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বুদশিশীদের সাথে তহা আবদুর রহমানের সম্পর্ককে পুরোপুরি এক করে দেখাটা ঠিক নয় বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, আধুনিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী সুফী-সালাফী, ইখওয়ানী সকলের অবস্থান তিনি যেভাবে সমালোচনা করেছেন, সুফিবাদের এই আমেরিকা-ফ্রেঞ্চ এবং আধুনিকতা দ্বারা প্রভাবিত ইহজাগতায়িত রূপ মোটাদাগে দেখলে তার সমালোচনার বাইরে রয়ে গেছে। আপত্তি সত্ত্বেও, আমরা যদি মুন্তাসির হামাদার কথাকেই সত্য বলে ধরে নেই যে, তার লেখা আগের চেয়ে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে, তাহলেও আমাদের কাছে প্রশ্ন থেকে যায় যে— তার চিন্তার এই বাঁক-বদলের আগের ও পরের তহা আবদুর রহমানকে আমরা কীভাবে পাঠ করবো। তহা আবদুর রহমান নিজেই এ সমাধান দিতে পারেন, কিন্তু তার সাথে বুদশিশীদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং সেই সমস্যার তার নিজের চিন্তার উপর প্রভাব সম্পর্কে তাকে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলতে দেখা যায় না।

 

যেসব পাঠক তহা আবদুর রহমানের তাত্ত্বিক পাঠ করার উমিদ নিয়ে আমার এই লেখা পড়তে বসেছিলেন, তারা নিশ্চিতভাবে আমার এই লম্বা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এতক্ষণে আশাহত হয়েছেন। কিন্তু আপনাদের এই কথা মনে করিয়ে দেওয়া জরুরী যে, উপরের এই আলোচনা থেকে তহা আবদুর রহমানের তত্ত্বকে বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে পড়ার জরুরত আমি শনাক্ত করেছি। এই প্রকল্পটি হলো, উপনিবেশিক প্রতিরোধের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সুফী ত্বরীক্বাগুলোকে পশ্চিমায়িত লিবারেল ধারার দন্ত-নখরহীন পোষমানা সুফিবাদে পরিণত করার প্রবণতা। এই প্রস্তাবনা অনুসারে, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, ক্ষমতাসীনের জন্য হুমকি স্বরূপ (বিদ্যমান কাঠামোর ভিতরে হোক বা বাইরে হোক) যে কোন ধরণের ইসলামী প্রস্তাবনা আসলে বহিরাগত এবং বিদেশী প্রস্তাবনা। বাস্তবে কোন ধরণের ইসলাম লোকায়ত হয়ে উঠবে এবং কোনটাকে বিদেশী মনে করা হবে, যদিও উভয়টাই স্থানীয় অধিবাসীদের বিভিন্ন মানুষজন গ্রহণ করেছে— সে প্রশ্নটা রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে সমাধানের রাস্তা থাকা উচিত। কিন্তু তা না করে বিরোধীদের জমিনের সাথে সম্পর্ক নেই বলে দাবি জানানো, আধুনিক দুনিয়ার তাদের সর্বশেষ তল্পিতল্পা তথা জাতি রাষ্ট্রের পরিচয় কেড়ে নেয়ার শামিল। যা আসলে তাদের জীবনকে খরচযোগ্য (homo sacer) করে তোলারই নামান্তর।

 

এই বাস্তবতা মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশতেই আছে। এই অবস্থায়, তহা আবদুর রহমানের রাজনীতির পরিসরকে গায়েব করে দেওয়ার চিন্তাকল্পকে পশ্চিমা তত্ত্বের সমালোচনা, ঔপনিবেশকিতার বিরোধিতা ইত্যাদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পাশাপাশি মরক্কো এবং মুসলিম বিশ্বের এই বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে মূল্যায়ন না করে উপায় নেই। এখানে এই বিকল্প প্রেক্ষাপট প্রস্তাবের পেছনে আমার উদ্দেশ্য হলো, মরক্কোর সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তহা আবদুর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তা কোন ধরণের রাজনীতিকে চিন্তার রসদ জোগাচ্ছে এবং কোন ধরণের রাজনৈতিক চিন্তাকে দমনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে— সেই বিষয়ে তহা আবদুর রহমানের পাঠককে সচেতন করে নেওয়া।

 

তহা আবদুর রহমানের কাছে “রাজনীতি” কী :

এ কথা বলা বাহুল্য যে, তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি এর তত্ত্বায়ন এই সীমিত পরিসরে পুরোপুরি উপস্থাপন সম্ভব নয়। তহা আবদুর রহমানের নিজস্ব পদ্ধতির কারণে তার পাঠও একটি সময়সাধ্য প্রক্রিয়া। তবুও নিচে সংক্ষিপ্ত পরিসরে, তিনি রাজনীতি বা سياسة বর্গকে কীভাবে তত্ত্বায়ন করেছেন তা আলোচনা করা হলো। এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, অন্য কোন লেখকের এই কেন্দ্রিক পাঠ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে আমি তাকে স্বতন্ত্রভাবে পাঠ করার চেষ্টা করেছি।

 

“রাজনীতি” এর তত্ত্বায়ন করতে গিয়ে তহা মূলত নিজেকে দুইটি ধারার বিপরীতে স্থাপন করেছেন। প্রথমটি হলো: ধর্মনিরপেক্ষদের (العلمانيون) ধর্ম ও রাজনীতির বিভাজনের ধারা এবং ইসলামপন্থীদের (মোটাদাগে, তহা আবদুর রহমানের ভাষায় الديانيون ) ধর্ম ও রাজনীতির মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের ধারা। তহা আবদুর রহমানের কাছে দুইটি ধারাই ত্রুটিপূর্ণ।

 

তহা আবদুর রহমানের মতে, মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তার অস্তিত্ব দ্বৈত (مزدوج)। এজন্য যারা মানুষকে রাজনৈতিক প্রাণী অথবা ধর্মীয় প্রাণী অথবা আক্বলবান প্রাণী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে, তাদের প্রত্যেককেই তিনি ত্রুটিপূর্ণ মনে করেছেন। কারণ হলো তারা সবাই মানুষকে একক অস্তিত্বের অধিকারে অধিকারী মনে করেছে এবং তার অস্তিত্বকে আনুভূমিক (أفقي) মনে করেছে। অর্থাৎ তাদের মতে মানুষ অস্তিত্বের দিক থেকে শুধুমাত্র দৃশ্যমান জগতেই (العالم المرئي) বিচরণ করে। অস্তিত্বের এই পদ্ধতির নাম তহা দিয়েছেন انوجاد। এ পদ্ধতিতে রুহ ও দেহ একসাথে থাকে (৪০ পৃ.)।

 

বিপরীত পক্ষে, তহা আবদুর রহমানের কাছে মানুষের অস্তিত্ব হলো অনুলম্বিক (عمودي)। (২৮-৩১) অর্থাৎ, মানুষ তার রুহের মাধ্যমে দৃশ্যমান জগতে থাকার পাশাপাশি অদৃশ্য জগতেও (العالم غير المرئي) যেতে পারে এবং এর মাধ্যমেই সে পূর্ণ হয়ে ওঠে (৩৫-৬, ৩৮)। এ পদ্ধতির নাম হলো تواجد। এই জীবনাচরণে মানুষের শুধু মাত্র রুহই ব্যবহার করতে হয়। বস্তুত দৃশ্যমান জগতের সবকিছুতেই যেহেতু অদৃশ্য জগতের ছোঁয়া থাকে, তাই রুহের মাধ্যমে মানুষ দুই জগতকেই বুঝতে পারে। (৪০-১)

 

এই পর্যায়ে এসে তিনি দ্বীন এবং রাজনীতির সাথে তার এই অধিবিদ্যার সম্পর্ক স্থাপন করেন। এ জন্য তিনি দুই ধরণের মানুষের কল্পনা করেন। রাজনৈতিক কর্তা (الفاعل السياسي) , তার মতে, দৃশ্যমান জগতকে পবিত্রায়ন করতে গিয়ে, একে অদৃশ্য জগতের পর্যায়ে নিয়ে যায় (والفاعل السياسي، بإنتهائه إلى تقديس مرئياته، يرتقي بها حتما إلى رتبة المغيبات)। এর ফলে সে দৃশ্যমান জগতের সাথেই انوجاد  এর পাশাপাশি تواجد করতে শুরু করে। (৪৪) অর্থাৎ, দৃশমান জগতে তার রুহ এবং দেহ উভয়েই যখন রাজনীতিতে ব্যপ্ত হয়, তখন অদৃশ্য জগতে তার রুহও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এর মধ্য দিয়ে তার কাছে রাজনৈতিক লক্ষ্য, আদর্শ, পরিচয় হয়ে ওঠে গায়েবী জগতের মতো পবিত্র।

 

অপরদিকে, দ্বীনী কর্তা (الفاعل الديني) যদিও অদৃশ্য জগতকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে তার যাত্রা শুরু করে, তার কাছে দৃশ্যমান জগত অদৃশ্য জগতের আলোতে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, দৃশ্যমান জগত আসলে অদৃশ্য জগতেরই তাজাল্লী, অন্য একটি রূপ (فيشهد المرئيات نازلة منزلة تجليات لهذه المغيبات)। এর ফলে তার গায়েবী জগতের বিষয়াবলীর সাথে তার রুহের تواجد বা সহাবস্থানের সম্পর্কের ভিত্তিতেই, দৃশ্যমান জগতে তার দেহ এবং রুহের অস্তিত্বের انوجاد নির্ধারিত হয়। (৪৪)

 

এই জটিল দার্শনিক ভাষায় তহা আবদুর রহমান যা বলতে চাইছেন, তার সহজ ব্যাখ্যা হলো রাজনীতি মজ্জাগতভাবে এমন একটি তাত্ত্বিক জায়গা যা মানুষকে, তার রুহকে, দৃশ্যমান দুনিয়াতে আটকে ফেলে। দ্বীন হলো জীবন যাপনের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি, রাজনীতির বিপরীতে, মানুষের রুহকে গায়েবী দুনিয়ার ভিতর দিয়ে দৃশ্যমান দুনিয়াকে দেখার ব্যবস্থা করে। তার এই তত্ত্ব আরো পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য তার কথার দিকেই তাকানো যাক। তিনি বলেন :

أن الفاعل السياسي، ما أن يستقيم له تدبير عالمه المرئي والتحكم بشؤونه ، حتى تغريه شهوة السلطة بمزيد العلو، فينساق إلى إضفاء الهيبة والجلالة على شخصه وإضفاء التنزه والقداسة على عمله، رافعا الواقع المرئي إلى رتبة المثال الغيبي.

“রাজনৈতিক কর্তা যখন দৃশ্যমান জগতকে পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হয়, তখন ক্ষমতার লালসা তাকে আরও উচ্চাভিলাষী হতে প্রলুব্ধ করে। ফলে সে নিজের ব্যক্তিত্বে ও কাজে মহিমা, প্রতাপ, পবিত্রতা এবং পরিশেষে অলঙ্ঘনীয়তার আবরণ আরোপ করার দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলশ্রুতিতে সে এখানে দৃশ্যমান বাস্তবতাকেই অদৃশ্য আদর্শের পর্যায়ে উন্নীত করে।” (৪৪)

 

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, তিনি এখানে রাজনৈতিক কর্তা বলতে রাজা/শাসককে শুধু বোঝাচ্ছেন না, বরং বলতে চাইছেন রাজনীতিতে যুক্ত যে কোন মানুষেরই এই ঈশ্বর হয়ে ওঠার তাড়না বিদ্যমান। (৪২) এবং এই তাড়না শুধু মাত্র নৈতিক স্খলন নয়, বরং নিজেকে রবের স্থানে কল্পনা করার নামান্তর। তার মতে, রাজনীতি মজ্জাগতভাবে দৃশ্যমান জগতকে অদৃশ্য জগতের পর্যায়ে উন্নীত করার প্রকটি প্রকল্প, যা নাম হলো تغييب। (৪৫)

 

অপর পক্ষে দ্বীন জড়িত হলো تشهيد এর সাথে। এই প্রক্রিয়ায় দ্বীনী কর্তা, অদৃশ্য জগত থেকে সফর শুরু করে। সে অদৃশ্য জগতের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ (شهادة) করে এবং দৃশ্যমান দুনিয়ার উপর গায়েবের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে সে রুহানীভাবে পরিপূর্ণ হয় (مرتقيا بفضلها في مدارج الكمال الروحي والخلقي)। তার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার মাঝে সে আল্লাহ প্রদত্ত একটি দায়িত্ব দেখতে পায়। তখন এই দায়িত্বের আমানত রক্ষার জন্য সে নানা ধরণের কাজ সম্পাদন করে; যেগুলো করার ফলে সে অদৃশ্য জগতকে দৃশ্যমান জগতে নামিয়ে আনে—এই পদ্ধতির নাম তহা আবদুর রহমান দিয়েছেন تشهيد। (৪৬)

 

এজন্য তিনি মনে করেন যে, ধর্ম ও রাজনীতিকে জীবনের দুইটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র মনে করা সমীচীন নয়। বরং মানব জীবন পরিচালনা করার দিক থেকে এদের সম্পর্ক ব্যতিহারিক (منهجان متقابلان)। এদের মধ্যে দ্বীন হলো ইবাদতমূলক পথ (تعبد), রাজনীতি হলো আধিপত্যমূলক (تسيد)। (৪৭) পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখান যে, রাজনীতির মৌলিক ক্ষেত্রগুলো হলো: ইলাহী বৈশিষ্ট্যগুলো নফসের নিজের দিকে যুক্ত করা (النسبة), মানুষকে দাস বানানো (السلطان) এবং দ্বন্দ্ব-কলহ (التنازع)। মোট কথা, তহা আবদুর রহমানের সামগ্রিক মূল্যায়নে রাজনীতি হলো একটি নেতিবাচক ক্ষেত্র।

 

কিন্তু, তহা আবদুর রহমান তার আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেননি। রাজনীতির সাথে প্রাক-আধুনিক যুগে নৈতিকতার গভীর সংযোগ ছিল। প্রাচীন সংস্কৃত ঐতিহ্য রাজনীতি শব্দের সাথে নীতির ব্যবহার বা মধ্যযুগে পারস্য দুনিয়ার জনপ্রিয় রাজনীতি তত্ত্বের বই أخلاق ناصري বইয়ের দিকে তাকালেই এই কথা বোঝা যায়। পরবর্তীতে ১৬শ এবং ১৭শ শতাব্দীতে পশ্চিমা দুনিয়াতে রাজনীতির মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে raison d’état বা রাষ্ট্রের স্বার্থভিত্তিক নীতি। এই যুক্তি অনুসারে, রাষ্ট্রের টিকে থাকার স্বার্থে যে কোন কাজ, হোক তা নৈতিক বা অনৈতিক, করার নামই রাজনীতি। অর্থাৎ, রাজনীতির সাথে মানুষের সুন্দর জীবন যাপনের সংযোগ থেকে এ সময় রাজনীতি হয়ে ওঠে মানুষের উপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র। এর মানে এই নয় যে, আগে আধিপত্য ছিল না, বরং আগেকার আধিপত্যকে বিচ্যুতি মনে করা হতো। বর্তমানে দাপট দেখানোকেই রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকে অন্তর্নিহিতভাবে আধিপত্য বিস্তারের সাথে সংযুক্ত করে তহা আবদুর রহমান কেন আধুনিক রাজনীতির ধারণার মৌলিক একটি অনুসিদ্ধান্তকে গ্রহণ করে নিলেন তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। অন্যান্য বর্গের ক্ষেত্রে— যেমন অর্থনীতি, যুক্তি (reason), ইত্যাদি— তিনি যেভাবে পশ্চিমা অর্থের সমালোচনা করে পশ্চিমাদের বিপরীতে ঐ বিষয়ক নৈতিক বদলী কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি তেমনটি করেননি। অন্য কথায়, পশ্চিমাদের হাত থেকে “যুক্তিকে” তিনি যেমন পুনরুদ্ধার করে عقل مسدد ধারণার প্রবর্তন করেন, এখানে রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি সেরকম কোন বিকল্প হাজির করেন না। কাজেই তার প্রস্তাবনায় রাজনীতি পশ্চিমা প্রভাবে নেতিবাচক হয়ে উঠেছে এমন নয়, বরং এটি অন্তর্নিহিতভাবেই নেতিবাচক ক্ষেত্র।

 

পশ্চিমা রাজনীতি-তত্ত্বের সাথে তহা আবদুর রহমানের মোকাবেলা :

এবার দেখা যাক, সমকালীন পশ্চিমা চিন্তকদের রাজনীতির ধারণাতে তহা আবদুর রহমান কোন জায়গায় দ্বিমত করেছেন এবং তাদের কীভাবে সমালোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে কার্ল শ্মিট, শানতাল মোফ এবং জুর্গেন হাবেরমাসকে তিনি প্রধানত মোকাবেলা করেছেন।

 

কার্ল শ্মিট রাজনৈতিক (political) কে শত্রু-বন্ধুর পার্থক্য করার ক্ষেত্র হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এর অর্থ হলো, রাজনীতি এমন বিষয়ে লড়াইয়ের ময়দান যে সমস্যা সমাধান করতে প্রতিদ্বন্দীরা পরস্পরকে হত্যার সম্ভাবনা পর্যন্ত রাখে। তহা আবদুর রহমান একে التعادى হিসেবে নামকরণ করেছেন। এই political ধারণার দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল তহা আবদুর রহমান চিহ্নিত করেছেন।

 

প্রথমত : রাজনীতি কোন স্বতন্ত্র ক্ষেত্র নয়; বরং জীবনের যে কোন পরিসরই, অর্থনীতি বা সংস্কৃতি, রাজনীতিতে পর্যবসিত হতে পারে, যখন তা পারস্পারিক শত্রুতা-প্রতিযোগিতা (تعادى) এর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। তিনি এটুকুতে কার্ল শ্মিটের সাথে সহমত পোষণ করেছেন। কারণ শ্মিট এ দিক থেকে তহার জন্য সহায়ক। দ্বীনের বিপরীতে রাজনীতিকে যে নেতিবাচক metaphysical কাঠামোতে তহা স্থাপন করেছেন, তা শ্মিটের ধারণার সাথে মিলে যায়। (وتتفق مع النتيجة التي تستخلص من تصورنا)। সে দিক থেকে তহা আবদুর রহমানের রাজনীতির ধারণাও কার্ল শ্মিটের রাজনীতির ধারণার মতই সর্বব্যাপী। উল্লেখ্য যে এখানে তহা আবদুর রহমান স্বীকার করেছেন, سياسة এর গ্রিক ট্রাডিশনে (পরবর্তী কিছু মুসলিমদের কাছেও) গ্রহণযোগ্য অর্থ: রাজনীতি হলো জনপরিসরের ব্যবস্থাপনা (تـدبير الشأن العام سياسة هي) কে নাকচ করেই তিনি এই নতুন আধুনিক শ্মিটিয়ান ধারণাকে কবুল করে নিয়েছেন।

 

দ্বিতীয় বিষয়টি তার শ্মিটের সাথে দ্বিমতের জায়গাকে স্পষ্ট করে। তিনি দাবি করেন যে, শ্মিট যেভাবে রাজনীতিকে বন্ধু-শত্রু বিভাজনের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তাতে তিনি হামেশা এই সম্পর্ককে গোষ্ঠীর (collective) মাঝে সম্পর্ক হিসেবে কল্পনা করেছেন। তহা আবদুর রহমানের আপত্তি হলো বস্তুত এই শত্রুতা-বন্ধুতা ব্যক্তি পর্যায়েই নেমে আসে, কারণ এই শত্রুতা বা বন্ধুত্বের প্রধান মাধ্যম হলো ব্যক্তি। ব্যক্তিই তার অন্তরে শত্রুতা পোষণ করে। ব্যক্তিই ব্যক্তিকে খুন করে। এর ফলে ব্যক্তি ব্যক্তির শত্রুতাই রাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র এবং প্রধান উৎস হয়ে দাড়ায়। (أن التعادي الذي يقوم بالنفس هو الأصل في التعادي الذي يقوم في السياسة)। এ কারণে তহা আবদুর রহমান মনে করেন, ব্যক্তিগত পরিসর রাজনৈতিক পরিসরের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে (أكثر تسيسا من التعادي السياسي)। এর ফলে শ্মিটের সাথে তহা আবদুর রহমানের দ্বন্দ্বের যে জায়গা দাঁড়ায় তা হলো, তহা আবদুর রহমান রাজনীতির বন্ধু-শত্রু পার্থক্যকে শুধু রাজনৈতিক পার্থক্য নয়, বরং ব্যক্তিগত আদর্শিক, জ্ঞানকান্ডের পার্থক্য হিসেবে হাজির করেন। (১৪০-৩)

 

তহা আবদুর রহমান এরপর শানতাল মোফের politics এবং political এর পার্থক্য আলোচনা করেছেন। শানতাল মোফের কাছে, politics হলো মানুষের মাঝে থাকা দ্বন্দ্ব-বিবাদ নিরসনের জন্য শাসনতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কসরত। আর political হলো সমাজে থাকা নানা ধরণের দ্বন্দ, সংঘাতপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক— যার উপর ভিত্তি করেই সমাজ গড়ে ওঠে। মোফের রাজনৈতিক এর ধারণা সেদিক থেকে antagonism এর উপর নির্ভরশীল, যাকে তহা অনুবাদ করেছেন التخاصم। এই রাজনৈতিক ধারণায়, ব্যক্তিরা তাদের পরস্পরের কিছু অধিকারের বিষয়ে একমত হয়, যাতে করে রাজনৈতিক সমাজ ভেঙ্গে না পড়ে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী তার আইনসিদ্ধ শত্রুর অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়। আর এই আইনসিদ্ধতা নিরুপণ হয়, আধুনিক নৈতিকতার মূলনীতি (যেমন: স্বাধীনতা, সমতা) দ্বারা।

 

তহা আবদুর রহমান মোফের গভীর দৃষ্টিভঙ্গির (رؤية عميقة) প্রশংসা করেছেন। এই প্রশংসার কারণ মূলত দুইটি।

 

প্রথমত, যারা মনে করেন কমিউনিজমের পতনের পর নতুন যুগের সূচনা হয়েছে এবং এই দুনিয়াতে মানুষ গণতন্ত্র, উদারনৈতিকবাদের বদৌলতে শান্তিতে বসবাস করবে— তাদের এই অলীক স্বপ্নকে ভাঙতে মোফের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত কার্যকর। মোফের চিন্তা এটি প্রমাণ করে যে, মানব সভ্যতা যতই অগ্রসর হোক না, দ্বন্দ্ব-দ্বিমত সঙ্গে নিয়েই তাকে চলতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত, তহা আবদুর রহমানের মতে মোফের শক্তিশালী দিক হলো, মোফ রাজনীতিতে মানুষের আবেগ-অনূভূতি (العامل الوجداني) এর ভূমিকার দিকে নজর দিয়েছেন। (১৪৩-১৪৮)

 

তবে শ্মিটের মতোই ব্যক্তি-ব্যক্তির দ্বন্দ্বের বদলে শুধু মাত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বকে রাজনীতি-তত্ত্ব প্রয়োগের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করায় তহা আবদুর রহমান মোফকে সমালোচনা করেছেন। তবে মোফের প্রতি তার প্রধান সমালোচনা হলো, মোফের রাজনীতি-তত্ত্বে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জায়গা থাকলেও, এই সংঘাতেরও একটি সীমানা আছে (فإنها تضع له حدودا معلومة)। অর্থাৎ, স্বাধীনতা, সমতা, ইত্যাদি নীতির— যার উপর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে— সাথে দ্বিমত করলে, সেই দ্বিমতকারীকে এখানে বেআইনী মনে করা হয় এবং খারিজ করা হয়। (أما النزاعات التي ترفض هذه القيم المجمع عليها، فتعد خصومات غير مشروعة)

 

সুতরাং এই তত্ত্বের স্ববিরোধিতা দেখিয়ে তহা বলেন: এই রাজনৈতিক কাঠামোর সমস্যা হলো, এই রাজনীতি সংঘাতকে স্বীকৃতি দিলেও, স্বীয় কাঠামোর মৌলিকতা নিয়ে প্রশ্ন করার অথবা দ্বিমত করার সুযোগ দেয় না। শুধুমাত্র দ্বিমতের পরিমাণ ও ধরণ নিয়েই এখানে বিতর্ক করার সুযোগ আছে। এজন্য তহা আবদুর রহমান দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন: ১. মোফের এই সংঘাতের সীমানার যৌক্তিকতা কী? এবং ২. কে বা কারা এই সংঘাতের সীমানা নির্ধারণ করেছেন? (১৪৯)

 

তহা দেখান যে, এই সীমানাগুলো কেন যুক্তিযুক্ত, কোন ঐতিহ্য থেকে, কীভাবে এই সীমানাগুলো নির্ধারিত হলো এবং কীভাবেই বা এই সীমানাগুলো নিয়ে “ঐক্যমত” প্রতিষ্ঠিত হলো— এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তরও মোফের থেকে পাওয়া যায় না। তহা এখানে যুক্তি দেন যে, যেহেতু মোফের কথা মতে, এই সীমানাগুলো মূল্যবোধ (value) থেকে উৎসরিত এবং মূল্যবোধ (=ought) কখনো fact(=is) দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে না, সুতরাং এই মূল্যবোধগুলো হয় অবশ্যই কোন না কোন ঐতিহ্য/ধর্ম থেকে উৎসরিত। নতুবা এই মূল্যবোধগুলো নিজে নিজেই ধর্মের মতো অতিন্দ্রিক হয়ে ওঠার দাবি করছে। অর্থাৎ, এগুলোকে ঈশ্বরের মতো বিতর্কের উর্ধে মনে করতে হবে অথবা এরা নিজেই নিজের প্রমাণ (self-referential) হিসেবে ধরে নিতে হবে। (১৫০-২) মূলত তহা আবদুর রহমান এই সমালোচনার মাধ্যমে মানুষের দ্বৈত অস্তিত্ব বিষয়ক তার অনুসিদ্ধান্তে ফিরে যান। তিনি প্রমাণ করেন, অদৃশ্য জগত থেকে রাজনীতিকে দূরে মনে করা হলেও, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মূলে লুকিয়ে আছে metaphysical বিবাদ-বিসংবাদ, যেগুলো আধুনিক পশ্চিমা গবেষকরা সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

 

শ্মিট এবং মোফ যেখানে التعادى এবং التنازع এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, হাবেরমাস সেখানে সংলাপমূলক রাজনৈতিকতার (التناقش) প্রস্তাব করেছেন।  তহা আবদুর রহমানের হাবেরমাসের প্রতি সমালোচনা আরো বিস্তৃত, কিন্তু সেই ধারণা রাজনীতি থেকে শুরু হয়ে ভাষাদর্শন এবং জ্ঞানতত্ত্বের দিকে মোড় নিয়েছে। নিবন্ধের পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে, এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র political কে তত্ত্বায়নের ক্ষেত্রেই তহা আবদুর রহমান এবং হাবেরমাসের মতবিনিময় আমি এখানে উল্লেখ করছি।

 

এই মতামত অনুসারে, রাজনীতি (political) হলো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে নাগরিকরা যুক্তি-তর্ক (deliberation) ও সংলাপের (dialogue) এর মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানোর চেষ্টা করে। তহা এই তত্ত্বের উপর বেশ কিছু আপত্তি উত্থাপন করেছেন।  তহা দেখান যে, হাবেরমাস তার রাজনীতি তত্ত্ব পারস্পারিকতার (تعالق) মূলনীতির উপরে গোড়াপত্তন করেছেন। অর্থাৎ, একে অপরের সাথে নানা ধরণের বিনিময়ই হাবেরমাসের কাছে রাজনীতির মূল অধিক্ষেত্র। তহার এতেরাজ হলো, এই বিনিময় শুধু মতামত-বিনিময় বা রাজনৈতিকতার ক্ষেত্রে বোঝাই যথেষ্ট নয়, বরং এই বিনিময়কে মানুষের সত্ত্বাগত নির্মাণের (تكوين الذات) মূল সূত্র হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরী। এর অর্থ হলো, তহা ব্যক্তিসত্ত্বা এবং তার সামাজিক সত্ত্বার মাঝে ফারাক করবার পক্ষপাতি নন। তার মতে, ব্যক্তি মূলত অন্য কারো সাথে যোগাযোগের মাধ্যমেই তার ব্যক্তিক পরিচয় গড়ে তোলে। (ولا يحدد الفرد هويته إلا من خلال التواصل مع غيره)। এজন্য, সামাজিক সম্পর্ক তহার কাছে শুধুমাত্র একে অপরের যোগাযোগ বা সম্পর্কের জায়গা নয়, বরং এটি ব্যক্তির আত্নপরিচয় বিনির্মাণেরই আসল শর্ত। (১৫৭-৮)

 

তহা আবদুর রহমানের এই সমালোচনাটি মূলত আধুনিক ব্যক্তি-স্বতন্ত্রতা মতবাদের গভীর সমালোচনা। তহার মতে, যেহেতু এই সামাজিক বিনিময় শুধু মাত্রই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতার উপর ক্বায়েম করা হয়েছে, সেহেতু এই রাজনৈতিক তত্ত্ব পারস্পারিক বোঝাপড়া তৈরি করতে সক্ষম নয়। বরং এটি গড়ে ওঠে ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা (تقاسم) করার নীতির উপর। এর ফলে এটি কোন পরামর্শমূলক গণতন্ত্র্রের জন্ম দেয় না, বরং পয়দা করে aggregative democracy (الديمقراطية التجميعية)।

 

তহার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হলো, হাবেরমাস শুধুমাত্র রাজনীতির প্রক্রিয়াগত (طرائق) বিষয় আলোচনাতেই নিজেকেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। হাবেরমাস এখানে সিদ্ধান্তের কোন নৈতিক লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়ার পক্ষপাতি নন। বরং তার মতে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসারে যদি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, তাহলেই সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে। এখানে সিদ্ধান্তটি মৌলিকভাবে (حقائق) ভালো/খারাপ কি না সেই প্রশ্ন হাবেরমাসের কাছে ধর্তব্য নয়। তহা যুক্তি দেখান যে, লিবারেল আইনতাত্ত্বিকরাও ন্যায়বিচারের আইনী প্রক্রিয়াকে নৈতিক মূল্যবোধের সাথে যুক্ত করেছেন। সেদিক থেকে হাবেরমাস এই বিষয়গুলো শুধুমাত্র মানুষে মানুষে যোগাযোগের ভাষিক মূলনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করেছেন। পক্ষান্তরে, তহা আবদুর রহমানের কাছে এই حقائق এবং طرائق এর দ্বিমিক দৃষ্টিভঙ্গিই কোনমতে গ্রহণযোগ্য নয়।  (ان هذه التفرقة بين الحقائق والطرائق إلى حق التضاد يمكن الإعتراض عليها،) বরং তিনি মনে করেন যে, যে কোন আচরিত পদ্ধতিই (طرائق) মানুষের জীবনের জীবন, নৈতিকতা, মূল্যবোধ (حقائق) ইত্যাদির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। (১৭৩) এ দিক থেকে হাবেরমাসের طرائق শুধু ভাষিক মূলনীতি নয়, বরং অনুক্ত নৈতিক মূল্যবোধের সাথে যুক্ত বলেও তহা আবদুর রহমান মনে করেন।

 

তহা আবদুর রহমানের আরো কিছু আপত্তির কথা আলোচনা করেই আমরা পশ্চিমা চিন্তাবিদদের সাথে তার বাতচিতের ইতি টানব। তহা বলেন, উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকদের মতে ভাষাই (দেরিদিয়ান text অর্থে) মানুষের জীবনের সমস্ত অর্থের আধার। এর অর্থ হলো, মানুষের অস্তিত্ব এবং অর্থবহ সকল কিছুই ভাষিক নীতি (الخطاب اللغوي) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হাবেরমাস যোগাযোগমূলক যুক্তির (communicative reason) মাধ্যমে মানুষের বিসংবাদের মীমাংসা এবং ঐক্যমতে পৌঁছবার যে রাজনীতি-তত্ত্ব দিয়েছেন তাও এই ভাষিক মূলনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই নীতি অনুসারে হাবেরমাস মনে করেন যে, যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো পরস্পরের বোঝাপড়া তৈরি করা। কিন্তু তহা এখানে দেখান যে, হাবেরমাসীয় “যুক্তি” শুধুমাত্র অপরকে বোঝানোর ক্ষেত্র হিসেবে রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করলেও, রাজনীতি ক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি ক্ষমতা দাবি করবার বিষয়টি (তহার তত্ত্বে এর নাম تناسب) এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না।

 

তহার আরেকটি আপত্তি হলো, মানুষ শুধুমাত্র যুক্তির উপর ভিত্তি করেই সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈয়ার করে না। মানুষ দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে যতটা না রাজনৈতিক/সামাজিক সহমর্মিতা গড়ে তোলে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে আবেগগত বন্ধনের উপরে। তহার মতে, হাবেরমাসের তত্ত্ব অনুযায়ী এই আবেগগত বন্ধনকে যুক্তির মাধ্যমে বিমূর্ত (تجرد) করে তোলা সম্ভব হওয়ার কথা। না হলে যুক্তির মধ্য দিয়ে এই আবেগগত সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়ে উঠবে না। কিন্তু এই পর্যায়ের বিমূর্তকরণ করা হলে, তহার যুক্তিতে, সেই যোগাযোগ আর কোন ভাষিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে না, বরং তা গণিতের মতো অকাট্য যুক্তিতে পরিণত হবে। সেই পর্যায়ে কেউ আর তা নিয়ে বিতর্কেরও প্রয়োজনও বোধ করবে না। (إن الإجماع المجرد ينشده هذا الفيلسوف، لو أمكن تحقيقه، لاشبه البرهان القطعي. وإذ ذاك يصبح لنا الحساب غنية عن الخطاب) (১৫৯-১৬১)

 

উপরের পশ্চিমা তিনজন রাজনীতি তত্ত্বের সাথে তহা আবদুর রহমানের মোকাবেলা থেকে কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরী। রাজনীতিকে তত্ত্বায়ন করতে গিয়ে তহা আবদুর রহমান, রাজনীতি কী— এই প্রশ্নে পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের মধ্যে শ্মিট এবং মোফের সাথে মোটাদাগে একমত। তার মতে রাজনীতি হলো সংঘাত এবং আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র। আমরা আগেও আলোচনা করেছি, রাজনীতির এই ধারণা প্রাক-আধুনিক নীতি-নির্ভর রাজনীতি-তত্ত্ব থেকে আলাদা। অন্যদিকে হাবেরমাসের পারস্পারিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রকে তিনি ত্রুটিপূর্ণ মনে করার বড় একটি কারণ হলো, এটি ক্ষমতার ভাষাকে এবং যুক্তির ভাষাকে একই মনে করেছে, যদিও তা প্রায়শই এক না হতে পারে। সে ক্ষেত্রেও, রাজনীতি তহার আবদুর রহমানের কাছে নৈতিকতা বিযুক্ত ক্ষমতার ভাষা হিসেবেই পরিগণিত হয়েছে। এজন্য তার এই তাত্ত্বিকদের সাথে মোকাবেলাতে এই প্রমাণ হয় যে, তহা আবদুর রহমান অন্য ক্ষেত্রে পশ্চিমা কাঠামোতে নৈতিকতা যুক্ত করার আহ্বান জানালেও, রাজনীতিকে তিনি পশ্চিমা রাজনীতির ধারণা (মোটাদাগে ম্যাকিয়াভ্যালিয়ান) অনুসরণ করে সত্ত্বাগতভাবে নৈতিকতা বিযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবেই দেখেছেন।

 

ইসলামী ঐতিহ্যে রাজনীতির ধারণার সাথে তহা আবদুর রহমানের ফারাক্ব :

এদিক থেকে তহা আবদুর রহমান তার রাজনীতি-তত্ত্বে প্রাক-আধুনিক গ্রিক, সংস্কৃত, পারস্য ঐতিহ্যে রাজনীতিকে যে নীতিশাস্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, তার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বরং তার তত্ত্ব ইসলামী রাজনৈতিক তুরাছেরও বিপরীত। প্রথমত, মনে হতে পারে ধর্মের সাথে রাজনীতির প্রশ্নে তার দ্বিমত শুধুমাত্র হালের ইসলামপন্থীদের সাথেই। কিন্তু দেখা যায় তিনি ইসলামী রাজনৈতিক তুরাছের দুই অন্যতম পুরোধা মাওয়ারদী এবং ইবনে খালদুনের রাজনীতির সংজ্ঞারও বিরোধিতা করেছেন।

 

মাওয়ারদী খিলাফতের সংজ্ঞা দিয়ে গিয়ে বলেছেন: খিলাফত হলো দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং দুনিয়াকে পরিচালনা নীতি। (الخلافة هي حراسة الدين وسياسة الدنيا)। মাওয়ারদীর এই সংজ্ঞার প্রতি তহা আবদুর রহমান আপত্তি জানিয়েছেন। মূলত ইসলামপন্থীদের ইসলামকে দ্বীন ও দুনিয়ার মেলবন্ধন হিসেবে দেখবার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমালোচনা করতে গিয়েই তিনি মাওয়ারদীর রাজনীতির ধারণার প্রতি সমালোচনা করেছেন। ইবনে খালদুনের রাজনীতি-তত্ত্বের উপরেও তিনি একই ধরণের আপত্তি জানিয়েছেন। এদের সবার প্রতি তার সমালোচনার মূলবিন্দু একই। তা হলো, রাজনীতি যদি সঠিকভাবে করা হয়, তাহলে তা আর রাজনীতি থাকে না; বরং তা ইবাদতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাহলে, এখানে খলীফার ক্ষেত্রে আলাদা করে রাজনীতি ও দ্বীনের কথা বলবার দরকার নাই। বরং দ্বীনের কথা বললেই তার ভিতরে রাজনীতির কথা চলে আসবে। অর্থাৎ, কোন কাজ ইবাদত হলে তা দ্বীনী হবে বলে তিনি মনে করেছেন। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে গিয়ে, তহা আবদুর রহমান রাসূল সা. এর কর্মের ক্ষেত্রে উসূলে ফিক্বহে তাঁর ইবাদত (দ্বীনী) এবং স্বাভাবিক দুনিয়াবী কাজের (عادات) যে বিভাজন আছে— সেই বিভাজন তহা আবদুর রহমান মানেননি। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, প্রচলিত ফিক্বহকে তিনি সাধারণভাবে إئتماري বা বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্র মনে করেন, এর বদলে তিনি নৈতিকতাযুক্ত الفقه الإئماني এর ধারণার প্রস্তাব করেন। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সাধারণভাবে ফিক্বহকে ائتماري বলবার পিছনে একটি পূর্ব অনুমান আছে। তা হলো الفقه এর সাথে সত্ত্বাগতভাবে নৈতিকতা যুক্ত নয়; বরং আলাদাভাবে নৈতিকতা এর সাথে যুক্ত করা দরকার। আইন ও নৈতিকতাকে এই আলাদা করবার প্রবণতা অবশ্যই আধুনিক। মুসলিম ফিক্বহবিদরা স্বাভাবিকভাবে, আইন ও নৈতিকতাকে আলাদা ক্ষেত্র হিসেবে মনে করেননি।

 

শুধু তাই নয়, মাঝে মধ্যে তিনি বিভিন্ন আধুনিক মুসলিম ধারার সমালোচনা করতে গিয়ে উত্তরাধুনিকদের তত্ত্বের সাহায্য নিতে গিয়ে ইসলামী ঐতিহ্যের মৌলিক কিছু বিষয়ের সাথে দ্বিমত করেছেন। এমন একটি হলো, মরক্কোর সালাফীদের প্রতি তার করা একটি সমালোচনা। সালাফদের থেকে পাওয়া মতামত, আরবী ভাষা ইত্যাদির মাধ্যমে সরাসরি কুরআন-হাদীছের নস বোঝার যে দাবি সালাফীরা করে সেটিই এখানে তার সমালোচনার মূল বিন্দু। কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এখানে উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকদের তত্ত্বের অনুগামী হয়ে কুরআন-হাদীছের অন্তর্নিহিত অর্থ থাকা না থাকা নিয়ে সন্দেহের স্বীকার হয়েছেন। এসব তাত্ত্বিকরা মনে করেন: একজন লেখকের কোন লেখার উৎপাদন করার পর সেটির অর্থের উপর সেই লেখকের আর কোন কর্তৃত্ব থাকে না। এটিকে dead of author হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। La mort de l’auteur নামে লেখা একটি বিখ্যাত প্রবন্ধে Roland Barthes দাবি করেন যে, একটি লেখার অর্থ লেখকের উদ্দেশ্য দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং পরবর্তীতে পাঠকের ব্যাখ্যার উপর সেই লেখার নতুন নতুন অর্থ নির্মাণ হয়। সে ক্ষেত্রে লেখক সত্ত্বা ও তার নিজস্ব অর্থ মূলত: লেখা জন্ম দেয়ার সাথে সাথে মওত লাভ করেছে।

 

এই নীতিকে সামনে রেখে তহা মতামত দেন, কুরআন-হাদীছের মূল নসের দিকে ফিরে যাওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হলো: কেউ যখন কোন একটি রচনা (النص) কে পাঠ করতে শুরু করে, তখন সেই এই রচনার অর্থে পৌঁছার পথে তার নিজের ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি হস্তক্ষেপ তৈরি করে। এ ছাড়াও ঐ রচনার অর্থের উপর নির্মিত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূঞ্জিভূত অভিজ্ঞতার সামনে দাড়িয়ে তার সামনে এই রচনার মূল অর্থে পৌঁছা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ভিত্তিতে তিনি দাবি করেন: কুরআন-হাদীছের মৌলিক অর্থ অথবা সালাফদের বুঝে আমাদের পক্ষে পরবর্তী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ছাড়া পৌঁছা অসম্ভব।

 

উত্তর আধুনিক তত্ত্বের অনুসারে তিনি এখানে বোঝাতে চাইছেন যে, কুরআন ও হাদীছের অন্তনির্হিত কোন অর্থ নেই, পরবর্তীদের হাতে যে অর্থের তৈরি হয়েছে তার মধ্য দিয়েই আমাদের কুরআন ও হাদীছকে বুঝতে হবে। কুরআন-হাদীছ বুঝতে পরবর্তীদের ব্যাখ্যার ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, এ কথা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু সেই ভূমিকাকে সহায়ক নয়, বরং মৌলিক— এই দাবি করাটা মূলত: মুসলিম ঐতিহ্যবাদী ধারায় নসের অর্থ বের করার জন্য যে শাস্ত্রগুলো গড়ে উঠেছে নাকচ করার শামিল। মূলত: তার এই চিন্তা উত্তরাধুনিকতা দ্বারা সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত।

 

রাজনৈতিক বাস্তবতায় করণীয় :

বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিমদের তাহলে কী করা উচিত?—  এ প্রশ্নের উত্তরে তহা আবদুর রহমানের মতামত আলোচনা করে আমরা আমাদের প্রবন্ধের সমাপনীর দিকে যাব। যদিও এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তার রাজনীতিক তত্ত্বকে তিনি বাস্তবে কীভাবে রুপান্তরিত হতে দেখতে চান, তা বোঝার জন্য সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিমদের করণীয় নিয়ে তার আলাপ এখানে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। তহা আবদুর রহমান মনে করেন রাজনীতি অন্তর্নিহিতভাবে تسيد বা আধিপত্যের সাথে জড়িত। যেহেতু, এই আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য تعبد বা ইবাদতের বিপরীত, সেহেতু, এই ক্ষেত্রে যে কোন ধরণের অংশগ্রহণ তহার কাছে নৈতিক স্খলনের শামিল। এই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদদের নিজেদের সত্ত্বার ইবাদত (التعبد للذات) এবং স্রষ্টার গুণাবলী নিজেদের প্রতি আরোপ করে নিজেরা মানুষের “রব” সেজে বসার (تربب) দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে কেউ যদি মুসলিমদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে বসে, তাহলে তাকে প্রতিরোধের তিনটি উপায় ব্যবহার সাধারণত করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে শুধু শেষেরটির সাথে তহা আবদুর রহমান একমত।

 

প্রথমটি হলো : শক্তি (سلطان) প্রয়োগের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী (متسيد) কে পদচ্যুত করা। বিপ্লব, সশস্ত্র এগুলো সবই এই পন্থার অন্তর্ভূক্ত। এই পদ্ধতিকে তিনি سلطان হিসেবে নামকরণ করেছেন। তহা আবদুর রহমানের মতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত নয়, কারণ এর ফলে রুহের পরিবর্তন ঘটানোর বিপরীতে, শক্তিপ্রয়োগকারী নিজেই একজন স্বেচ্ছাচারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

 

দ্বিতীয়টি হলো : দলীল-যুক্তি প্রমাণ (برهان) পেশ করার মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই তৈরি করা। তহা আবদুর রহমান মনে করেন, এই পন্থাও আসলে সহিংসতা থেকে মুক্ত নয়। ব্যক্তি এখানে সহিংসতা এড়াতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা বললেও বাস্তবে সে অস্ত্রের সহিংসতা ছেড়ে, কথার সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। বস্তুত এই কথা দিয়ে আরেকজনকে আহত করা, কাজ দিয়ে আহত করার চেয়েও অনেক সময় ক্ষতিকর হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু এই পন্থায় বস্তুগত সহিংসতা করা না হলেও, আদর্শিক সহিংসতা হয়, এবং এর মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করা, তহা আবদুর একেও ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন (أن البرهان لا يقل طلبا للتسيد من السلطان)। (২৯২)

 

তৃতীয়টি হলো : মানুষের আবেগ-অনুভূতি এবং চেতনাকে (الوجدان) প্রতিরোধের কেন্দ্র বানানো। তহা আবদুর রহমানের মতে এই পদ্ধতিকে সামনে রেখেই আগানো প্রয়োজন। কেননা এই পদ্ধতি تسيد বা আধিপত্যের বদলে تعبد বা ইবাদতের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আগায়। যেহেতু এই পদ্ধতিটি স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি/পদ্ধতির আভ্যন্তরীণ জগতকেই বদলানোর জন্য কাজ করে, এজন্য তিনি মনে করেন, অপর দুইটি পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতিটি মৌলিক একটি পদ্ধতি। (২৯৩-৬) তহা আবদুর রহমানের কাছে এই চেতনাগত প্রতিরোধের মূল মাধ্যম হলো زعج (সড়িয়ে দেয়া বের করা/বের করা অর্থে)। মূলত: জালিমকে জুলুম থেকে বের করে ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে আসা, বা নৈতিকহীন অবস্থান থেকে নৈতিক দিক থেকে প্রশংসনীয় অবস্থানে নিয়ে আসাই এই পদ্ধতির মূল কথা। (عبارة عن نقل من حال أدنى إلى حال أعلى)।

 

এই পদ্ধতি হুকুমতকে বদলানোর চেয়ে মানুষের ভিতর থেকে পরিবর্তনের দিকে জোর দেয়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে গেলে যে إزعاج করতে চাইছে, তার নিজেকেই প্রথমে انعزاج বা আধ্যত্নিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই পদ্ধতিতে অন্যায় আচরণকারীর সামনে নৈতিক আচরণের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠতে পারলে, স্বেচ্ছাচারীর মধ্যে একধরণের অস্বস্তির উদ্রেক করা সম্ভব, যাতে সে তার ভুলে যাওয়া ফিতরাতের দিকে যেতে পারে। তহা আবদুর রহমানের মতে, দ্রুত না হলেও এই পদ্ধতি অনেক কার্যকরী এবং স্বতন্ত্র একটি পদ্ধতি। (২৯৬ff.) আদিল তাহেরী এই إزعاج এর পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তুলেছেন। তা হলো, স্বেচ্ছাচারী যদি মানুষের এই আত্নিক আলোড়নের পথে বাধা দেয় অথবা এর দ্বারা কোন প্রভাবিতই না হয় তাহলে কী করা হবে?— এই প্রশ্নের কোন জবাব তহা হাজির করেননি।

 

মূল্যায়ন ও সমাপনী :

রাজনীতি কী— এই প্রশ্নের প্রতি তহা আবদুর রহমানের জওয়াব বিভিন্ন দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেভাবে সমকালীন চিন্তাবিদদের মোকাবেলায় নিজের নিজস্ব একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রের ধারণা গড়ে তুলেছেন, তা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে, ব্যক্তিকে রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করা, তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ। তহা আবদুর রহমানের تسيد বা আধিপত্যের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, পশ্চিমা চিন্তা, প্রথমত, আধিপত্যকে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণের বস্তু হিসেবে কল্পনা করে, সেই বিন্দু থেকে আধিপত্য কীভাবে ব্যক্তিত্বকে (subjectivity) নির্দিষ্ট গড়নে তৈয়ার করে থাকে সেই আলোচনায় মোড় নেয়। তহা আবদুর রহমান এখানে স্বতন্ত্র, কারণ তিনি ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে আলোচনা শুরু করেন এবং তাকে বিশ্লেষণ করে ব্যক্তি কীভাবে আধিপত্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে, সেই আলোচনা করেন। (ما يميز مقاربة طه عن المقاربة الغربية عموماً أنه انطلق من الذات الإنسانية نفسها وليس القمع)।

 

যদিও ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে শুরু করার কারণে তহা আবদুর রহমানের তত্ত্বের অভিনবত্ব ধরা পড়ে, কিন্তু সমস্যা হলো তহা আবদুর রহমান সমষ্টিকে কেন্দ্র করে কোন আলাদা তত্ত্ব দেন না। তার কাছে, ব্যক্তিই যেহেতু সমষ্টি তৈরির ইট, তাহলে ব্যক্তিক সমস্যা সমাধান করলেই, সমষ্টির মুশকিল আসান হয়ে যাবে। এর পিছনে তার ধারণা হলো, সমষ্টি, প্রতিষ্ঠান অথবা সামগ্রিক নিযামের আলাদা কোন সত্ত্বাগত মেজাজ নেই; এর কোন আচরণের প্যাটার্ন বা কাঠামোগত যুক্তি নেই। এর ফলে এদেরকে আলাদা ভাবে স্বতন্ত্র বিশ্লেষণের বস্তু বানানোর জরুরতও নেই। অনেকটা বলা যায়, তহা আবদুর রহমান ইটের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু বাড়ি নিয়ে কোন আলোচনা করেননি। এবং মনে হয়, তিনি তা আলোচনা করতে আগ্রহীও নন। তিনি বরং সেই সমস্যাকে ব্যক্তিগত পরিসরের সমস্যা বলেই চিহ্নিত করেন। এ ক্ষেত্রে সমাজ পরিবর্তনের সেকেলে বিতর্ক: সমাজের উঁচুতলার পরিবর্তন থেকে নিচু তলার পরিবর্তন নাকি নিচু তলার পরিবর্তন থেকে উঁচুতলার পরিবর্তন— এর বাইরে যেতে তিনি সক্ষম হননি। (التغيير من أسفل، لا من أعلى)। ইসাম আইদো এজন্য এই পদ্ধতিকে তহা আবদুর রহমানের নিজস্ব স্বীকৃতি অনুসারেই সমাজ পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ এবং ধীর (محدودة وبطيئة) পদ্ধতি বলে শনাক্ত করেছেন।

 

পাশাপাশি, আমরা তহা আবদুর রহমানের শ্মিট, মোফ এবং হাবেরমাসের সাথে মোকাবেলা থেকে আমরা দেখিয়েছি, পশ্চিমা রাজনীতি তত্ত্বের সাথে তার মৌলিক পার্থক্য থাকলেও, তাকে পশ্চিমের তত্ত্বের ঢালাও সমালোচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং, রাজনীতি কী?— এই প্রশ্নে তার অবস্থান পশ্চিমা রাজনীতির (political) ধারণা থেকে উৎসরিত— যে ধারণা অনুসারে রাজনীতি জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার শাস্ত্র নয়, বরং দ্বন্দ্ব-বিভেদের ক্ষেত্র, অন্তর্নিহিতভাবে কলুষিত ময়দান। এ ক্ষেত্রে তার রাজনীতির ধারণা ইবনে আরাবী তথা সুফিদের থেকেও ভিন্ন, কারণ ইবনে আরাবী রাজনীতির ক্ষেত্রে প্লেটোর নৈতিকতার নমুনা অনুসরণ করেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব নীতি, সরকারী দায়িত্ব ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

তহা আবদুর রহমান পশ্চিমা আধুনিকতার তত্ত্বকে যেমন নৈতিকতাসহ কবুল করার পক্ষপাতি, তেমনই তিনি রাজনীতি প্রশ্নেও পশ্চিমা আধুনিক ঐতিহ্যেই নিজেকে স্থাপন করেছেন। তাদের নানা গুরুত্বপূর্ণ পূর্বানুমান অ/সচেতনভাবে গ্রহণ করেই তিনি অগ্রসর হয়েছেন। এই পূর্বানুমান গ্রহণ করবার ফলে, তিনি রাজনীতি নামক ক্ষেত্রকে দ্বীনের বিপরীতে জীবন যাপনের আলাদা একটি পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, এই পদ্ধতি অনুসারে জীবন-যাপন করলে ব্যক্তির মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেকে ঈশ্বরের স্থানে কল্পনা করা। এজন্য এই সমস্যা সমাধানের জন্য, তিনি দিন শেষে রাজনীতিকে ব্যক্তিক পরিসরে পুনর্বাসিত করেছেন। আমরা এও দেখিয়েছি যে, এই কারণে ইসলামী রাজনৈতিক তুরাছে রাজনীতিকে যে নীতিশাস্ত্র হিসেবে তত্ত্বায়ন করা হয়েছে তার সাথে তার একটি বিরোধের জায়গাও তৈরি হয়েছে।

 

আমার এই আলাপ তার চিন্তাকে নাকচ করার জন্য নয়, বরং, দুইটি বিপরীতধর্মী সম্ভাবনাকে একই সাথে মাথায় রাখবার জন্য। সে দুটি হলো :

১) মুসলিম ঐতিহ্য-আইন প্রধান অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র না হওয়া সত্ত্বেও, প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যায়ন করা একজন পন্ডিত ইসলামকে আধুনিক সময়ে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারেন এবং নতুনভাবে বোঝার জন্য জানালা খুলে দিতে পারেন- এই সম্ভাবনাকে মাথায় রাখা। সাথে সাথে পাশ্চত্যের চিন্তা-ঐতিহ্যের সিলসিলার সাথে কারবার না করে মুসলিম আধুনিক কোন চিন্তা দাঁড়াতে পারে কি না অথবা আমাদের প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী পাঠ্যক্রম কেন তহা আবদুর রহমানের মতো চিন্তক তৈরি করতে পারছে— সেই আত্নজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নকে হাজির করা।

 

২) এই মুদ্রার অপরপিঠ হচ্ছে, আধুনিক ঐতিহ্যের সাথে বিনিময়কারী কোন পন্ডিতকে, একইভাবে তহা আবদুর রহমানকেও, পাঠ করার ক্ষেত্রে তাদের স্তুতিসূচক পাঠ নয়, বরং তাদের পশ্চিমা-তত্ত্ব গ্রহণ-বর্জনের নীতিকে খতিয়ে দেখে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাঠ করা।

 

এই দুইটি সম্ভাবনা একসাথে মাথায় রাখলে একদিকে পশ্চিমা চিন্তার সাথে নেতিবাচক বোঝাপড়া নয়, বরং ক্রিটিক্যাল বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। অপরদিকে পশ্চিমা আদর্শ, বিশ্বাস এবং আধুনিক সমাজ-দর্শনের ছোঁয়া, আমাদের চিন্তার পথকে কতটুকু বদলে দিতে পারছে— সে বিষয়টি ক্রমাগত আত্ননিরীক্ষণ করা সম্ভব। এ জায়গা থেকে, তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি নামক বর্গের ইতিবাচক দিক ইনকার করা, এতে অংশগ্রহণকারীকে ঐশী ক্ষমতার দাবিদার সাব্যস্ত করা এবং সাথে সাথে সংলাপ নামক উদারনৈতিক লিবারেল বর্গের তেমন কোন নেতিবাচক দিক আলোচনা ছাড়াই কবুল করার নীতি কোন নির্দিষ্ট রাজনীতি, রাষ্ট্র, অথবা আদর্শকে রসদ জোগায়— তা দেখার জরুরত আছে। পাশাপাশি কোন ধরণের রাজনীতিকে এবং রাষ্ট্রকল্পকে এই ধরণের তত্ত্ব খতম করতে চায়, জাতি এবং ধর্মচ্যুত করতে চায় আমাদের পূর্বে উল্লেখিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে তাও বিবেচনায় আনা জরুরী।

 

তহা আবদুর রহমানের নৈতিকতা ও প্রাতিজনিক পরিশুদ্ধির তরীকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা অস্বীকারের মওকা নেই। কিন্তু, আদিল তাহেরীর দাবি মতে, পৃথক কোন সামাজিক দর্শনের পাশাপাশি একে পাঠ না করলে এই প্রকল্প তার গুরুত্ব হারায়। এজন্য, তহা আবদুর রহমানের “রাজনীতি” শব্দবন্ধনীর তত্ত্বায়নের গুরুত্ব হলো তার পাশ্চত্য দর্শনের সাথে বোঝাপড়ায়, তার নিজস্ব “রাজনীতি” এর ধারণায় নয়। বরং পাশ্চত্য দর্শনকে পাশ কাটিয়ে তহা আবদুর রহমানকে বুঝতে হলে তাকে বিমূর্ত এবং অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয়ও মনে হতে পারে। কেউ যদি মিশেল ফুকো, কার্ল শ্মিট, জুর্গেন হাবেরমাস শ্যান্তাল মোফকে পড়ে না বুঝে থাকেন, কারো কাছে যদি domination (আধিপত্য) কেন পশ্চিমা চিন্তায় গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দেখা দিলো এই ঐতিহাসিক কারণ স্পষ্ট না থাকে, তার কাছে তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি-তত্ত্বের জরুরত ধরা নাও পড়তে পারে। কারণ মুসলিম চিন্তায় শাসকের একনায়কতন্ত্র বা জনগণের উপর আধিপত্য কখনোই অব্যহতভাবে সমস্যা তৈরি করেনি, বরং শাসকেরা আইনী কাঠামো দ্বারা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত ছিলো। বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শাসকই অনেক সময় দ্রুত অপসারিত হতো দেখে, স্থিতিশীলতার সমস্যাই ছিল মুসলিম তুরাছি রাজনৈতিক চিন্তকদের ফিকিরের প্রধান বিষয়।

 

অন্য কথায়, আমার কাছে পশ্চিমা ব্যবস্থার সমালোচনার ক্ষেত্রে এবং মুসলিম নৈতিক মনন তৈরিতে তহা আবদুর রহমানের রাজনীতি-চিন্তার প্রধান গুরুত্ব ধরা পড়েছে, কিন্তু মুসলিমদের বদলী ব্যবস্থা গড়ে তোলাতে তহা আবদুর রহমানের প্রকল্প বাস্তব এবং তাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই সীমাবদ্ধ এবং অনেকাংশে প্রতিবন্ধক। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, এ কারণেই ফার্সি ভাষায় বলা হয়: با یک دست دو هندوانه نمی توان گرفت (এক হাত দিয়ে দুই খরবুজ তুলে নেয়া সম্ভব নয়)।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments