বাংলাভাষায় দার্শনিক পদ্ধতি রচনার প্রশ্ন : তহা আবদুর রহমানের ফী উসুলিল হিওয়ার ও আধুনিক ভাষাদর্শনের আলোকে ভাষা, দর্শন ও পদ্ধতি

আরিফ বিল্লাহ

১. ভূমিকা

দর্শনে পদ্ধতির প্রশ্নটি সর্বদাই বিষয়বস্তুর অন্বেষণের আগে হাজির থাকে। আমরা কোন পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসা করি বা সত্যের অনুসন্ধান করি, তা-ই মূলত নির্ধারণ করে দেয় আমরা আদতে কোন ধরনের জবাব লাভের যোগ্য। ইসলামি ঐতিহ্য‌ও এর ব্যতিক্রম নয়। এই পরিসরে পদ্ধতিগত প্রশ্নগুলোকে যে শব্দগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘বোরহান’ (البرهان)—যা এরিস্টটলীয় ‘প্রদর্শনমূলক যুক্তি’ (Demonstrative Syllogism)-এর অনুবাদ। এখানে সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হিসাবে নিরেট ও অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণকে বিবেচনা করা হয়। মুসলিম দার্শনিকরা গ্রিক দর্শন থেকে এই কাঠামো গ্রহণ করে বিপুলভাবে বিকশিত করেছিলেন, যা আধুনিক যুগে ‘বিশ্লেষণী দর্শন’ (Analytic Philosophy) ও গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে। বিজ্ঞান, গণিত ও বিশুদ্ধ আইনশাস্ত্রে এই বোরহানি কাঠামোর অপরিহার্যতা ও শক্তি নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

কিন্তু এই প্রবন্ধে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে এটা দেখাব যে, পদ্ধতিগতভাবে তিনটি জ্ঞানগত পরিসরে, তথা ১. ভাষার অর্থনির্মাণ-পরিসর, ২. নৈতিক যুক্তি এবং ৩. বিতর্ক পদ্ধতিতে বোরহান বা প্রদর্শনমূলক যুক্তিবিদ্যা কাঠামোগতভাবে অপ্রতুল। কারণ এই ক্ষেত্রগুলোতে সত্য কোনো একক মন বা বৌদ্ধিক কর্তা থেকে উদ্গত হতে পারে না কিংবা বিশুদ্ধ ও পরম সত্য উৎপাদন করতে পারে না। বরং পারস্পরিক সংলাপ, কথোপকথন ও সামাজিক অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই কেবল ‘দেশকালপাত্রাধীন সত্য’ উৎপাদন সম্ভব। এই পদ্ধতিগত অপ্রতুলতা দূর করতে আমরা প্রস্তাব করি ‘মুনাজারা’ (المناظرة) বা সংলাপভিত্তিক পদ্ধতি, যা মরক্কোর দার্শনিক তহা আবদুর রহমান তাঁর ‘ফী উসুলিল হিওয়ার’ গ্রন্থে বিশদভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বর্তমান প্রবন্ধে এই তিনটি পরিসরকে ‘মুনাজারা’-র একটি সমন্বিত পদ্ধতিগত কাঠামোর অধীনে পুনর্বিবেচনা করা হবে। ফলে এটা জেনে রাখা ভালো, এই তিনটি পরিসর আদতে মানুষের স্বাভাবিক ও জীবন্ত ভাষারই ক্রিয়ারত শক্তি। এইক্ষেত্রে ভাষার অর্থনির্মাণ পরিসর হলো, যা আধুনিক ভাষাতত্ত্বের বিপ্লবে ‘সেমান্টিক্স’ (Semantics) আকারে একটি শক্তিশালী জ্ঞানক্ষেত্র হিসাবে হাজির হয়েছে। অন্যদিকে বাকি দুটো পদ্ধতি সরাসরি ও খুবই ওতোপ্রোতভাবে উইটগানস্টাইনীয় ভাষা-দার্শনিক বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত। যা আধুনিক ভাষাতত্ত্বে ‘প্রাগম্যাটিক্স’-র প্যারাডাইম (Paradigm of Pragmatics) হিসাবে পরিচিত। তহার ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, তিনি আধুনিক ভাষাতত্ত্বের এসকল বৈপ্লবিক উল্লম্ফনগুলোকে তাঁর বৃহত্তর দার্শনিক প্রকল্পে সৃজনশীলভাবে পুনর্গঠন করেছেন।

বিমূর্ত যৌক্তিক প্রমাণের অকাট্য সত্যের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে ভাষিক ব্যবহারের জীবন্ত ও নৈতিক পরিসরে দর্শনের নতুন জমিন অনুসন্ধান বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক দাবি। প্রথাগত দর্শনের ইতিহাসে সত্য উদ্ঘাটনের প্রধান মাধ্যম হিসাবে যেভাবে ‘বোরহান’ বা অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণকে (Demonstrative Logic) শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আদতে জীবন ও ব্যবহারের জটিলতাকে প্রকাশ করতে ব্যর্থ। এরিস্টটলীয় অর্গানন থেকে শুরু করে আধুনিক যুক্তিবিদ্যার গাণিতিক কাঠামো পর্যন্ত দর্শনের যে যাত্রা, সেখানে জগৎকে একটি স্থবির গাণিতিক ছক হিসাবে দেখার প্রবণতা প্রবল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দর্শন ও ভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে যে বিরাট বিপ্লব ঘটে গেছে, তার মাধ্যমে এখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, বিমূর্ত যুক্তি বা ‘বোরহান’-এর একমুখী কাঠামো জীবনের সামগ্রিক সত্য এবং মানুষের সামষ্টিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে ধারণ করতে অক্ষম। এই সংকট উত্তরণে ‘মুনাজারা’ বা জীবন্ত সংলাপভিত্তিক পদ্ধতি (Dialogic Method) একটি অধিক কার্যকর ও গতিশীল বিকল্প হিসাবে আবির্ভূত হয়। তবে এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের পরিসরে বিকশিত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ইসলামের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে গড়ে ওঠা সামাজিক ভাষা ও কথোপকথনমূলক চর্চার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে তহা আবদুর রহমানের ‘হিওয়ার’ বা সংলাপতত্ত্ব এবং বিংশ শতকের ষাট-সত্তরের দশকের ভাষাবৈজ্ঞানিক বিপ্লব থেকে আমরা কী কী শিক্ষা নিতে পারি, তা-ই এই প্রবন্ধের মূল অন্বেষা।

এই প্রবন্ধটি মূলত তিনটি তাত্ত্বিক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমত, তহা আবদুর রহমানের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আলোকে দেখানো হবে যে, বোরহানি পদ্ধতি প্রাকৃত ভাষার সামাজিক ও অভিজ্ঞতামূলক বিধানগুলো ধারণ করতে কেন ব্যর্থ হয়। আর এই ক্ষেত্রে আমরা এককভাবে তাঁর ‘ফী উসুলিল হিওয়ার’ কিতাবখানা ব্যবহার করব। কেননা কেউ যখন একই সময়ে একাধিক এলেম হাসিল করার জন্য নিজের ওপর জোর দেয়, তাঁর সমস্ত কাজই পণ্ডশ্রমে পরিণত হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, ইমাম তাশকুবরাযাদাহপ্রদত্ত ‘মুনাজারা’-র সংজ্ঞা ও ফান এমেরেনের ‘প্রাগমা-ডায়ালেক্টিক’ পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুনাজারার পদ্ধতি নির্মাণ করা হবে। এবং তৃতীয়ত, বাংলার ইসলামি ঐতিহ্যের ‘মোশাহাদা’ ধারণাকে মুনাজারার সাথে বিশ্লেষণাত্মকভাবে যুক্ত করে একটি রূপরেখা প্রদান করা হবে।

 

২. বোরহানি পদ্ধতি : সংজ্ঞা, শক্তি ও সীমাবদ্ধতার নকশা

২.১ বোরহানের সংজ্ঞা ও শক্তি

বোরহান হলো এমন একটি যুক্তিকাঠামো যেখানে সুনির্দিষ্ট ভিত্তিবাক্য (Premises) থেকে অপরিহার্যভাবে একটি সিদ্ধান্ত (Conclusion) নিঃসৃত হয়। তহা আবদুর রহমান (২০০০: ৬২-৬৩) নিজেও এর কাঠামোগত বর্ণনা দিয়েছেন : ‘এটি একটি গাণিতিক আন্তর্সম্পর্কমূলক বিশ্লেষণ পদ্ধতি। অর্থাৎ গাণিতিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের মধ্য দিয়ে বোরহানের প্রক্রিয়ায় কোনো একটা আলাপ বোরহান হিসাবে গঠন লাভ করে।’ এই পদ্ধতির তিনটি বিশিষ্ট শক্তি রয়েছে—

প্রথমত, স্বচ্ছতা ও সুসংগতি : বোরহানি কাঠামোর মূল শক্তি হলো এর স্পষ্টতা। এটি প্রধানত দুটি ধ্রুপদি যৌক্তিক সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—একটি হলো ‘বৈপরীত্যহীনতার সূত্র’ (যা বলে একই জিনিস একই সাথে সত্য ও মিথ্যা হতে পারে না) এবং অন্যটি হলো ‘মধ্যমাবর্জিত সূত্র’ (যা বলে একটি বিষয় হয় সত্য হবে, নয়তো মিথ্যা—এর বাইরে কোনো অবস্থান নাই)। এরিস্টটল এই সূত্রগুলোর মাধ্যমেই প্রথম ভাষার ভেতরে যৌক্তিক চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এরপর তা আধুনিক গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্রে পর্যন্ত সত্যের নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসাবে বিস্তৃত হয়।

দ্বিতীয়ত, যাচাইযোগ্যতা : বোরহানি যুক্তির প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত স্বচ্ছ। এখানে কোনো অস্পষ্ট দাবি করার সুযোগ নাই। প্রতিটি যুক্তি পদ্ধতিগতভাবে এমনভাবে সাজানো থাকে যে, কেউ চাইলে খুব সহজেই এর সত্যতা বা ভুলগুলো যৌক্তিকভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

তৃতীয়ত, সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা : বোরহানি সিদ্ধান্তের একটি সার্বজনীন চরিত্র রয়েছে। এর মাধ্যমে যে নতিজা বের হয়, তা কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সমাজের জন্য নয়। বরং দেশকালপাত্র নির্বিশেষে সকল বুদ্ধিমান মানুষের কাছেই এই সিদ্ধান্ত একইভাবে গ্রহণযোগ্য এবং অকাট্য বলে বিবেচিত হয়।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্যযুগীয় ইসলামি দর্শনে ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ এরিস্টটলীয় বোরহানি পদ্ধতিকে পরাবিদ্যা (ইলাহিয়াত) থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। আধুনিক যুগে গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার যে অতি-সূক্ষ্ম কাঠামো নির্মিত হয়েছে, তাকে বোরহানি পদ্ধতিরই সমকালীন ও চূড়ান্ত বিকাশ বলা যেতে পারে। সুতরাং, এই বিশাল ও শক্তিশালী তাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে স্রেফ ‘শুষ্ক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়; বরং এর সীমাবদ্ধতা বুঝতে হলে এর শক্তির উৎসগুলোকেও যথাযথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

আধুনিককালে যুক্তিবিদ্যায় প্রতীকী ফরমালিজমের (Symbolic Formalism) সূচনা হয় গটলব ফ্রেজে (Gottlob Frege), জিউসেপ পিয়ানো (Giuseppe Peano) এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের (Bertrand Russell) হাত ধরে। বিশেষ করে রাসেল এবং আলফ্রেড হোয়াইটহেড ১৯১০-১৩ সালের মধ্যে তিন খণ্ডে প্রকাশিত তাদের বিশাল গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ (Principia Mathematica)-তে সমকালীন যুক্তিবিদ্যার গাণিতিক ভিত্তি প্রদান করেন। এই গ্রন্থটিই ছিল উইটগেনস্টাইনের ‘ট্র্যাক্টেটাস লজিকো-ফিলোসফিকাস’ (Tractatus Logico-Philosophicus)-এর প্রারম্ভবিন্দু। ১৯২৫ সাল নাগাদ ভিয়েনার দার্শনিক ও গণিতবিদদের মধ্যে এই নতুন যুক্তিবিদ্যা নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন মরিটজ শ্লিক (Moritz Schlick), হ্যান্স হ্যান (Hans Hahn) এবং পরবর্তীকালে রুডলফ কারনাপ (Rudolf Carnap)।

ভিয়েনা সার্কেলের এই জ্ঞানগত তৎপরতার মধ্যেই কুর্ট গোডেলের (Kurt Gödel) আবির্ভাব ঘটে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে গোডেল তাঁর বিখ্যাত ‘পূর্ণতা’ (Completeness) এবং ‘অপূর্ণতা’ (Incompleteness) উপপাদ্য পেশ করে আধুনিক যুক্তিবিদ্যার ইতিহাসে এক নাটকীয় পরিবর্তন আনেন। ১৯২৯ সালের জানুয়ারির মধ্যেই গোডেল ‘ফার্স্ট-অর্ডার লজিক’-এর পূর্ণতা প্রমাণ করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের মে মাস থেকে তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ— ‘অপূর্ণতা উপপাদ্য’ (Incompleteness Theorem) নিয়ে কাজ শুরু করেন, যার ভিত্তি ছিল গাণিতিক ব্যবস্থার ভেতরেই এমন কিছু সত্যের অস্তিত্ব থাকা যা ওই ব্যবস্থার ভেতরে প্রমাণ করা অসম্ভব। এই যে গাণিতিক ও যৌক্তিক কাঠামোর ভেতরে নিখুঁতভাবে সত্যকে বন্দি করার চেষ্টা, একে আমরা বোরহানি ঐতিহ্যেরই আধুনিক কারিগরি রূপ হিসাবে গণ্য করতে পারি (গ্যোডেল ও হান ২০২৪ : ৭-৮)।

তবে গোডেলের কাজের শক্তির দিক হলো এটা আধুনিক ফরমালিজম বা বোরহানি যুক্তিপদ্ধতির অভ্যন্তরীণ সীমা উদাম করে দেয়। ফলে ফ্রেজে থেকে গোডেল পর্যন্ত এই পরম্পরা প্রমাণ করে যে, বোরহান জগৎকে গাণিতিক শৃঙ্খলার ভেতরে পাঠ করার ক্ষেত্রে এক বিশাল উল্লম্ফন ঘটালেও, তার নিজস্ব গাণিতিক অকাট্যতার ভেতরেই এমন এক ‘অসম্পূর্ণতা’ রয়ে গেছে যা তাকে বিশুদ্ধ গাণিতিক কাঠামোর বাইরেও অন্যান্য পদ্ধতির দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

২.২ ত্রিমাত্রিক পরিসরে বোরহানের কাঠামোগত অপ্রতুলতা

তহা আবদুর রহমান বোরহানি পদ্ধতির শক্তিমত্তাকে স্বীকার করলেও এর সীমাবদ্ধতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিশদভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাঁর মতে, বোরহানি পদ্ধতির প্রধান সংকট হলো এটি প্রাকৃত ভাষার (Natural Language) সেই সকল জীবন্ত বিধানকে অস্বীকার করে, যার ওপর ভিত্তি করে স্বয়ং বোরহান দাঁড়িয়ে আছে। বোরহানের সঙ্গে দার্শনিকের কারবার প্রাকৃত ভাষার বাইরে গিয়ে করা অসম্ভব; কারণ দর্শনের সাধ্যে প্রাকৃত ভাষা হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তহা আবদুর রহমান এই অপ্রতুলতার মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন বোরহানি পদ্ধতির ‘সামাজিক’ ও ‘অভিজ্ঞতামূলক’ ভিত্তির অস্বীকৃতিতে। তহার মতে, বোরহান শাস্ত্রের কারিগররা মনে করেন এটি একটি বিমূর্ত ও অভিজ্ঞতার অতীত শাস্ত্র, কিন্তু বাস্তবে বোরহানি ব্যক্তিকেও পর্যবেক্ষণ, অনুমান ও অভিজ্ঞতামূলক যাচাই-বাছাইয়ের পথ ধরেই কাজ করতে হয়। তহার ভাষায় (আবদুর রহমান ২০০০ : ৬৩)—“বোরহানের সঙ্গে দার্শনিকের কারবার প্রাকৃত ভাষা থেকে বাইরে বেরিয়ে করা অসম্ভব। কেননা দর্শনের সাধ্যে প্রাকৃত ভাষার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নাই।” এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার ফলেই তিনটি প্রধান জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে বোরহানি অপ্রতুলতা প্রকট হয়ে ওঠে—

২.২.১ ভাষার অর্থনির্মাণ পরিসর

বোরহানি পদ্ধতি ভাষার অর্থকে একটি স্থির, গাণিতিক ও অপরিবর্তনীয় যৌক্তিক কাঠামো হিসাবে কল্পনা করে—যেখানে শব্দের অর্থ প্রসঙ্গের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু তহা আবদুর রহমান দেখান যে, দার্শনিক আলাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভাষার মধ্যেই গড়ে ওঠে। “প্রাকৃত ভাষায় যা চলে, দর্শনের আলাপেও তাই চলে।” কারণ তহা বলেন (প্রাগুক্ত) :

“সুতরাং ভাষার মধ্যে যেসব জিনিস প্রভাব ফেলতে পারে সেটা দর্শনের মধ্যেও একইভাবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রাকৃত ভাষার ভিতর বিবিধ রকমের বিষয় ও আলোচনা একটা জীবন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভিতরে ভিতরে ক্রিয়া করতে থাকে এবং নতুন নতুন রূপ তৈরি করতে থাকে।…একসময় শুরুতে যা বলা হয় শেষে তার পরিবর্তন হয় এবং শেষে যা বলা হয় শুরুতে তা অন্যরকম হয়।‌”

প্রাকৃত ভাষা একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া, যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। বোরহানি কাঠামোর একমুখী ও স্থবির ভঙ্গি ভাষার এই ‘জীবন্ত’ এবং ‘পরিবর্তনশীল’ চরিত্রকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। কাজেই যা জ্যামিতিক ছকের মতো নিখুঁত হতে চায়, তা কোনোভাবেই মানুষের ভাষা ব্যবহার ও অনুশীলনের জটিলতাকে স্পর্শ করতে পারে না।

২.২.২ নৈতিক যুক্তি ও সামাজিক বিধান

নৈতিক সিদ্ধান্ত কোনো গাণিতিক উপপাদ্য নয় যে তা বোরহানির মাধ্যমে একমাত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তহা আবদুর রহমান পশ্চিমা দর্শনের দেকার্তীয় ‘বিমূর্ত ও স্বতন্ত্র চিন্তাশীল আমি’র তৈরি যুক্তি প্রকরণকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, বোরহানি শুদ্ধতার জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুক্তি যথেষ্ট নয়, বরং “অনেকগুলো ব্যক্তির সমাজবদ্ধ চুক্তি বা সম্মতি জরুরি।” কারণ নৈতিক দাবিসমূহ কেবল যৌক্তিক সংগতির বিষয় নয়, বরং আন্তঃব্যক্তিক স্বীকৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।  কেননা বিতর্কের লক্ষ্য কেবল সমস্যার সমাধান নয়, বরং “সঠিক-বেঠিক নির্ণয়ের সামনে যে তাত্ত্বিক রহস্য বা সমস্যা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তার সমাধান করা,” যা কোনো একক ব্যক্তির যুক্তিতে সম্ভব নয়। বোরহানি যুক্তি এককভাবে অপরকে ‘তুষ্ট’ করতে পারে না, কারণ এটি সামাজিক ও নৈতিক সম্মতির বিধানকে অগ্রাহ্য করে (২০০০ : ৬৪)। উদাহরণস্বরূপ যখন দুটি পক্ষ বিতর্কে অবতীর্ণ হয়, তখন তারা কেবল দুটি গাণিতিক বা লজিক্যাল সিস্টেমের মুখোমুখি হয় না; বরং তারা দুটি জীবন-পদ্ধতি, দুটি অঙ্গীকার-কাঠামো ও দুটি আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হয়। বোরহানি পদ্ধতি বিতর্কের এই বৈচিত্র্য ও জীবন্ত চরিত্রকে অগ্রাহ্য করে একে একটি ‘কারিগরি’ সমস্যার সমাধানে নামিয়ে আনে। কিন্তু তহার মতে, এখানে প্রয়োজন এমন এক পদ্ধতি যা প্রতিপক্ষের বিশ্বাস ও মতাদর্শের ভেতরেও নতুন আলাপের সূত্রপাত ঘটাবে। আর এখানেই বোরহানি পদ্ধতি আর কাজে লাগে না। বরং দরকার ‘মুনাজারা’, পারস্পরিক দেখাদেখি ও কথোপকথনমূলক চর্চার।

২.২.৩ অভিজ্ঞতামূলক বিধান ও পারস্পরিক সম্বোধন-এর প্রক্রিয়া

বোরহানি পদ্ধতির প্রচলিত সিদ্ধান্ত হলো, এটি একটি বিমূর্ত (Abstract) শাস্ত্র, যা অভিজ্ঞতামূলক জগৎকেও অতিক্রম করতে পারে। এই ধারণা আমাদের মনে বদ্ধমূল হবার কারণ হলো এই বিশ্বাস যে, বোরহানি যুক্তির সত্যতা একটি সার্বজনীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গাণিতিক ছকের মতো সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু তহা আবদুর রহমান দেখান যে, একজন বোরহানশাস্ত্রীয় ব্যক্তিও মূলত অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতির পথ ধরেই কাজ করেন। তিনি কেবল বিমূর্ত সূত্রের মধ্যে থাকতে পারেন না। বরং তিনি নিজেও পর্যবেক্ষণ করেন, অনুমান করেন এবং তথ্যের যাচাই-বাছাই করেন। এক্ষেত্রে তাঁর কাজ একজন ভাষাবিশারদের কাজের মতোই—যিনি কোনো কিছু নির্মাণ করতে নিজের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞান, উপলব্ধি কিংবা অনুভূতির কাছে ফিরে যান এবং তাতে পরিস্থিতির প্রয়োজনে যোগ-বিয়োগ বা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটান। তহার মতে, প্রাকৃত ভাষার মধ্যে দলিল প্রদানের এই প্রক্রিয়াটি কোনো বিশুদ্ধ যুক্তিবাদী কারিগরির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না, বরং তা ঘটে ‘পারস্পরিক সম্বোধন’-র জীবন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

তহা এই প্রক্রিয়ার সংজ্ঞা দেন এভাবে (২০০০ : ৬৫) :

“‘পারস্পরিক সম্বোধন’-এর সংজ্ঞা হলো এটা এক ধরনের বিতর্কমূলক সজীব সক্রিয় এবং জীবন্ত ক্রিয়াশীলতা। সজীব সক্রিয় জীবন্ত কথাটার মানে হল তার চিন্তার মুদ্রণ বা ছাপ সামাজিক ও বৈষয়িক অবস্থানমূলক।”

এখানে ‘সজীব ও সক্রিয়’ কথাটির তাৎপর্য হলো, যুক্তি যখন ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, তখন তার ওপর সমাজ ও বাস্তবতার গভীর ছাপ থাকে। এটি কোনো বায়বীয় বিমূর্তায়ন নয়, বরং নানা রকম স্থানগত অভিমুখ, তথ্যমূলক সংবাদ ও সাধারণ জ্ঞানকে আত্তীকরণ করেই এই প্রক্রিয়াটি দানা বাঁধে। একে ‘বিতর্কমূলক’ বলা হয় কারণ এর লক্ষ্য নিছক সংকীর্ণ গাণিতিক নির্ভুলতা নয়, বরং নিজেকে একটি বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ দালিলিক প্রক্রিয়ায় উন্নীত করা।

 

৩. তহা আবদুর রহমানের ফী উসুলিল হিওয়ার : ভাষার ত্রিমাত্রিক সত্তা ও বিতর্কের স্তরভেদ

৩.১ ভাষার তিনটি অপরিহার্য মাত্রা : তাবলিগ, তাদলিল ও তাওজিহ

এই আলাপে প্রথমে আমরা শুরু করব, তহার মোকাদ্দিমার মৌলিক একটা বর্গ আবিষ্কার করা থেকে। আমাদের মনে রাখা দরকার ‘ভাষা’ সম্পর্কে তহার প্রস্তাবনা দাঁড়িয়ে আছে ‘ভাষাপরিমণ্ডল’ সম্পর্কে তাঁর মৌলিক একটা ধারণার ওপর। কথোপকথন বা পারস্পরিক সম্বোধন যেভাবে দুই বা ততোধিক মানুষের ভাষাকে রূপ দান করে, কথবার্তায় বা বাতচিৎ। তহা একে ‘তাখাতুব’ আকারে অভিহিত করেন। তাখাতুবের সবথেকে কাছাকাছি ইংরেজি সম্ভবত ‘কনভার্সেশন’, বাংলায় আমরা বলতে পারি ‘কথোপকথন’। কিন্তু আমরা ভাষাব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে চাই, তাহলে এর গাঠনিক উপাদানসমূহ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তাই আমাদের প্রথম কাজ হলো কীভাবে ভাষা শুরু হয় তাঁর স্থানটি চিহ্নিত করা।

এটা বুঝতে আমরা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের সাহায্য নিতে পারি। ভাষাবিজ্ঞানে এর শুরুটা হয় ব্যক্তিক পরিসর (الفعل الفردي) থেকে—অর্থাৎ একজন মানুষ যেভাবে কথা বলে। তারপর এর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির কথোপকথনের পরিসরে বা স্পিকিং সার্কিটে (الدائرة الكلامية)। যার মধ্য দিয়ে একটি পরিপূর্ণ ‘কথোপকথন পরিসর’ গঠিত হয়।

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ‘জনক’ হিসাবে খ্যাত ফের্দিনঁ দ্য সোঁসিওর এই কথোপকথনের প্রক্রিয়া বোঝাতে ‘ক’ এবং ‘খ’ নামক দুজন ব্যক্তির কল্পনা করেন। সোঁসিওর মডেলে, ‘ক’-এর মস্তিষ্কে একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তা বা কনসেপ্ট (Concept) যখন একটি শব্দরূপ বা ধ্বনিজনিত ছবি বা সাউন্ড-ইমেজের (Sound Image) সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা ধ্বনির মাধ্যমে মূর্ত রূপ পায়। মস্তিষ্ক থেকে নির্গত এই সংকেত যখন ‘ক’-এর মুখ দিয়ে শব্দতরঙ্গ হিসাবে ‘খ’-এর কানে পৌঁছায়, তখন তা একটি ভৌত (Physical) প্রক্রিয়া। আবার ‘খ’-এর কানে পৌঁছানোর পর কান থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছানোর মাধ্যমে পুনরায় মনস্তাত্ত্বিক (Psychological) সংযোগ তৈরি হয়  (সোঁসিওর ১৯৫৯ : ১১-১২)।

সোঁসিওর এই মডেলে ফিজিক্যাল (ধ্বনি তরঙ্গ), ফিজিওলজিক্যাল (ধ্বনি ও শ্রবণ কার্যক্রম) এবং সাইকোলজিক্যাল (চিন্তা ও ছবির ছবি) উপাদানগুলোকে আলাদা করে দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, বক্তার মুখ থেকে বের হওয়া ধ্বনি একটি ইতিবাচক বা সক্রিয় অংশ, আর শ্রোতার কানে পৌঁছানো সেই সংকেত একটি নেতিবাচক বা নিষ্ক্রিয় অংশ। এই কথোপকথনের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন ও বিন্যস্তকরণের ক্ষমতাই ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হিসাবে রূপ দেয়।

তহা এই প্রক্রিয়াকে স্বীকার করেন আলবৎ। তবে এই যে মানবিক ভাষা, জীবন্ত কথোপকথন পরিসরে তিনি এমন তিনটি মাত্রার কথা বলেছেন, যা কেবল এই ভৌত বা মনস্তাত্ত্বিক আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ভাষায় : “ভাষা সর্বদাই তাবলিগি, তাদলিলি এবং তাওজিহি হওয়া অনিবার্য।”

এই তিনটি মাত্রা মানবিক ভাষার স্বরূপকে সংজ্ঞায়িত করে (২০০০ : ২৭):

৩.১.১ তাবলিগ (التبليغ):

এটি ভাষার ব্যঞ্জনামাত্রা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সত্তার মধ্যে সাধারণ কতিপয় অর্থ সৃষ্টি হয়। মানুষের ভাষা এই ব্যঞ্জনা উৎপাদন পদ্ধতির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন এককের ভেতর বিবিধ অর্থ সাধারণ ও সামাজিক রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

৩.১.২ তাদলিল (التدليل):

এটি ভাষার দলিল-মাত্রা বা নির্দেশক রূপ। এখানে বাক্য স্বয়ং নিজের অর্থের ওপর দলিল বা প্রমাণ হিসাবে কাজ করে। এই অর্থ ব্যক্তি নিজের চিন্তার অভ্যন্তরে অথবা বাইরের জগতে অনুসন্ধান করে থাকে।

৩.১.৩ তাওজিহ (التوجيه):

এটি ভাষার উদ্দেশ্য-মাত্রা বা অভিমুখ। এই মাত্রার মাধ্যমেই কথার মধ্যে বিভিন্ন নৈতিক মূল্যবোধ ও তাৎপর্য বিস্তৃত হয়, যা একইসঙ্গে শ্রোতার মধ্যে নির্দিষ্ট কাজের উদ্দীপনা বা সক্রিয়তা তৈরি করে।

এই ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বোরহানি পদ্ধতির মৌলিক ত্রুটিও উন্মোচন করে। বোরহানি যুক্তি মূলত কেবল ‘তাদলিল’ বা দলিল-মাত্রায় কাজ করে; যেখানে সত্য কেবল তথ্যের শুদ্ধতা বা গাণিতিক সংগতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এইখানে ভাষার ‘তাবলিগ’ (সাধারণ অর্থস্থল নির্মাণ) এবং ‘তাওজিহ’ (উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধের সঞ্চার)-কে পদ্ধতিগতভাবে বাদ দিয়ে দেয়। তহার মতে, বোরহানি যুক্তি এই দুই মাত্রাকে অস্বীকার করার ফলে একটা মৃত ভাষায় পরিণত হয়। ফলে তা জীবন্ত মানবিক আলাপের বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে না। কেননা মানুষ তাঁর এই কথোপকথনমূলক চর্চার মধ্য দিয়েই সামাজিক অঙ্গীকার ও নৈতিক জগতকে সক্রিয় করে তোলে।

৩.২ জীবন্ত ভাষা (اللغة الحيّة) : বোরহানের বিকল্প ভিত্তি

তহার মতে যুক্তিবিদ্যা ও ভাষার সম্পর্ক নিয়ে একটি মৌলিক বিভ্রান্তি প্রচলিত, যা বোরহানি পদ্ধতির অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রধান কারণ। তিনি মনে করেন, সমকালীন দার্শনিকরা কারিগরি যুক্তিবিদ্যার কৃত্রিম কাঠামোকে মানুষের স্বাভাবিক ভাষার ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। অথচ ভাষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও যুক্তিবিদ্যার কারিগরি প্রণালি সম্পূর্ণ আলাদা। তহার ভাষায় :

“বহুদিন যাবত সমকালীন দার্শনিকরা কারিগরি যুক্তিবিদ্যার কাঠামো স্বভাবজাত চিন্তা ও তার ক্রিয়াকলাপের উপর খাটাত। কিন্তু চিন্তার স্বভাবজাত প্রক্রিয়ার ধরন ও প্রণালি সম্পূর্ণ আলাদা এ বিষয়টি তারা বিলকুল উপেক্ষা করেছেন। …কেননা যুক্তিবিদ্যা বানানো শিল্প বা কারিগরি কিন্তু ভাষা মানুষের স্বভাবজাত অবস্থা।” (২০০০ : ২৯-৩০)

তহা এই স্বাভাবিক অবস্থাকেই ‘জীবন্ত ভাষা’ (اللغة الحيّة) হিসাবে অভিহিত করেছেন। একটি সত্যিকারের জীবন্ত বাক্যে শব্দের চিত্ররূপ বা ‘আঁকিবুঁকি’ বিষয়বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না; বরং তা ব্যক্তির বিশ্বাস, আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে।

এখানে তহা পদ্ধতিগতভাবে ‘ভাষাদর্শন’ (Philosophy of Language)-এর পদ্ধতিগত সীমারেখা অনুসরণ করেছেন। কারণ এই পরিসরেই আমরা প্রশ্ন করি—মানুষ যখন কোনো ধ্বনি উচ্চারণ করে (Acoustic blast), তখন কীভাবে তার একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ তৈরি হয়? উদাহরণস্বরূপ ‘জায়েদ বাড়ি গিয়েছে’—এই বাক্যটি যখন একজন বলেন এবং অন্যজন বোঝেন, তখন কেন শ্রোতা কেবল এই কথাটিই বোঝে? এই বাক্যের এমন কি কাজ করে, সক্রিয় হয় বা প্রেরণা হাজির হয়, যা বক্তার সুনির্দিষ্ট ‘অভিপ্রায়’ (Meaning) ব্যক্ত করে এবং ওপরের মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়? এই কারণে ‘ভাষাদর্শন’ সরাসরি মানুষের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক ভাষার আদান-প্রদানের সক্রিয় তৎপরতাগুলো নিয়েই বাহাস করে (সার্ল ১৯৬৯ : ৩-৪)।

ভাষাদর্শনের ইতিহাসে সত্তরের দশকে এক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে, যা কথোপকথন বা আলাপের (Conversation) সঙ্গে যুক্তিবিদ্যার সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এর আগে দার্শনিক ঐতিহ্যে যুক্তিবিদ্যাকে মূলত দুটি সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হতো :

১. বর্ণনার হাতিয়ার হিসাবে (كأداة للوصف): যেখানে যুক্তিবিদ্যাকে ব্যবহার করা হতো কোনো তত্ত্ব বা প্রস্তাবনাকে বিশ্লেষণ ও বিন্যস্ত করার একটি যান্ত্রিক হাতিয়ার বা পদ্ধতি হিসাবে। ২. বর্ণিত বিষয় হিসাবে (كموصوف لهذه الأداة): যেখানে যুক্তিবিদ্যা নিজেই আলোচনার মূল প্রক্রিয়া হয়ে উঠত, অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যার অভ্যন্তরীণ গাণিতিক ও টেকনিক্যাল নিয়মগুলো নিয়েই কেবল বাহাস চলত (তহা ২০০০: ৩০)।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় অনেক দার্শনিকের নিকট এই দুই ব্যবহারের মধ্যকার পার্থক্য ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট ছিল না। ফলে তারা ভাষাকে কেবল একটি মৃত যুক্তি-কাঠামোর ছাঁচে ফেলে বিচার করতেন। কিন্তু সত্তরের দশক থেকে ভাষাদর্শনের যে নতুন পাটাতন তৈরি হয় (বিশেষ করে জন সার্ল বা এইচ. পি. গ্রাইস-এর হাত ধরে), তা যুক্তিবিদ্যাকে কেবল বর্ণনা বা বর্ণনার বিষয় হিসাবে না দেখে বরং মানুষের ‘কথোপকথনমূলক চর্চার’ (Communicative Action) অংশ হিসাবে পাঠ করতে শেখায়।

বোরহানি পদ্ধতির মূল সংকট এখানেই যে, এটি ভাষার এই ‘অভিপ্রায়’ (Meaning) এবং ‘উপলব্ধি’র (Understanding) জীবন্ত ও নৈতিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে। বোরহানি কাঠামো ভাষাকে বিচার করে কেবল বিমূর্ত সত্য বা মিথ্যার (Truth or False) ছকবাঁধা গাণিতিক মানদণ্ড দিয়ে। কিন্তু জীবন্ত ভাষায় কোনো কথা কেবল সত্য বা মিথ্যা হয় না; বরং তা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গুরুত্বপূর্ণ, অর্থবহ, উদ্দীপক কিংবা অর্থহীন হতে পারে।

বোরহানি পদ্ধতি ভাষাকে একটি ‘নির্মল ক্যালকুলাস’ বানাতে গিয়ে তার প্রাণশক্তি কেড়ে নেয়। অন্যদিকে, তহা প্রস্তাবিত জীবন্ত ভাষা বা ‘তাখাতুব’-এর জমিনে যুক্তিবিদ্যা কেবল বিমূর্ত সত্যের মাপকাঠি নয়, বরং তা মানুষের সামাজিক অঙ্গীকার ও নৈতিক জগতকে সক্রিয় করারও একটি মাধ্যম। ফলে বোরহানি পদ্ধতির একমাত্রিক চরিত্রকে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের ভাষার এই ত্রিমাত্রিক সত্তা এবং তার ‘অভিপ্রায়-নির্ভর’ জীবন্ত রূপকেই বিকল্প ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।

ভাষাদর্শনের এই নতুন পাটাতন থেকেই তহা আবদুর রহমান তাঁর বিতর্কবাদ বা ‘মুনাজারা’র আলোচনাকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেন। তহার মতে, সংলাপ বা বিতর্ক কেবল দুটি ভিন্ন মতের সংঘাত নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘চুক্তি’ বা নৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সংলাপে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো কেবল বিমূর্ত যুক্তির আদান-প্রদান করে না, বরং তারা নির্দিষ্ট কিছু ‘শর্তের’ অধীনে পরস্পর যুক্ত হয়। তহা এই আলাপ শুরু করেন ‘সংলাপের সাধারণ শর্তাবলি’ (الشروط العامة للحوارية) দিয়ে। এই শর্তাবলি প্রধানত দুটি স্তরে বিভক্ত (২০০০ : ৩৫-৩৮):

১. ইস্তিদলালি বা দলিল সংক্রান্ত শর্ত (شروط النص الاستدلالي)

এই স্তরে একটি আর্গুমেন্ট বা টেক্সটের ‘গাঠনিক’ শুদ্ধতা বিচার করা হয়। তহা এখানে তিনটি উপ-শর্তের কথা বলেন:

১. নাস্সিয়্যাহ (Textuality/Texthood): প্রতিটি টেক্সট বা বক্তব্যকে কতগুলো সুসংগত বাক্যের সমষ্টি হতে হবে, যেখানে বাক্যগুলো একে অপরের সঙ্গে যৌক্তিক সম্পর্কের সুতায় গাঁথা থাকবে।

২. ইকতিরানিয়্যাহ (Connectivity): এর মানে হলো এই টেক্সট একইসঙ্গে আবার বাক্যের মধ্যকার আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করবে। একটি সজীব আলাপ মানে প্রতিটি উপাদান এমনভাবে যুক্ত থাকা যে একটিকে বাদ দিলে অন্যটির অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

৩. ইস্তিদলালিয়্যাহ (Demonstrativeness): এটি যে কোনো আলাপেরই প্রাণস্বরূপ। এখানে االمقدمات (Premises) বা কোনো একটি সিদ্ধসূত্র থেকে ধাপে ধাপে النتائج (Conclusion) বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যৌক্তিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়। তহার মতে, বোরহানি পদ্ধতিতে এই ইস্তিদলাল হয় যান্ত্রিক, কিন্তু বিতর্কমূলক (Argumentative) পদ্ধতিতে তা হয় ‘সজীব’ এবং ‘উদ্দেশ্যমুখী’।

২. তাদাউলি বা ‘ব্যবহারিক’ শর্ত (شروط التداول اللغوي)

তহার এই কিতাবের এটিই তাঁর প্রধান পদ্ধতিগত ভিত্তি। এর ওপরেই তাঁর আলাপের কাঠামো গঠিত হয়েছে। এই শর্ত অনুসারে তিনি আমাদের বলবেন, কেবল যৌক্তিক বিশুদ্ধতা একটি বিতর্ককে সার্থক করতে পারে না যদি না তার সামাজিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকে। এই স্তরেও তিনি কিছু উপশর্ত যোগ করেছেন:

১. নুতকিয়্যাহ বা বক্তব্য-ক্রিয়া (Nutqiyya/Speech Act): একজন বক্তা কেবল তখনই প্রকৃত ‘বক্তা’ হতে পারেন যখন তিনি একটি জীবন্ত ভাষায় কথা বলেন এবং সেই ভাষার ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় দক্ষতা আয়ত্ত করেন।

২. সামাজিক বা ইজতিমায়ি সত্তা: সংলাপ বা মুনাজারা সবসময়ই ‘অপর’ বা অন্যের উপস্থিতিকে দাবি করে। তহার মতে, সংলাপের লক্ষ্য কেবল নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং অন্যের বিশ্বাস ও জ্ঞানের শরিক হওয়া। এটি এমন এক সামাজিক বাধ্যবাধকতা যেখানে বিবাদীরা কেবল যুক্তি দিয়ে নয়, বরং ‘সম্মতি’র (Consent) মাধ্যমে সত্যে পৌঁছাতে চায়।

৩. ইকনায়ি বা পরিতুষ্টিগত (Satisfactory) ও ইতিকাদি বা বিশ্বাসগত (Attitudinal) দিক: বিতর্ক কেবল তখনই সফল হয় যখন তা প্রতিপক্ষকে কেবল পরাস্ত করে না, বরং তাকে ‘তুষ্ট’ (Satisfaction) করে। বোরহানি পদ্ধতি কেবল সঠিক-বেঠিক নির্ণয় করে, কিন্তু ‘তাদাউলি’ বা ব্যবহারিক পদ্ধতি প্রতিপক্ষের মনের মধ্যেও রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়।

এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে এটা পরিষ্কার, একটি সার্থক বিতর্ক কেবল কোনো ‘কারিগরি’ (Technical) বা লজিক্যাল সমস্যার যান্ত্রিক সমাধান নয়। যখন আমরা বোরহানি অপ্রতুলতা কাটিয়ে ভাষার এই জীবন্ত ও নৈতিক শর্তাবলি মেনে বিতর্কে অবতীর্ণ হই, তখন তা মানুষের ‘আমল’ (Action) ও ‘আদর্শিক অঙ্গীকারের’ (Moral Commitment) একটি সজীব পরিসরে পরিণত হয়। তহা এবার তাঁর মূল আলোচনায় আমাদের নিয়ে যান।

৩.৩ বিতর্কবাদের তিনটি স্তর: হিওয়ার, মুহাওয়ারা ও তাহাউর

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা দেখেছি যে, বোরহানি পদ্ধতি কেন একটি ‘মৃত’ ও একমাত্রিক যুক্তি-কাঠামোয় পরিণত হয় এবং তহা আবদুর রহমান কীভাবে ‘জীবন্ত ভাষা’র (اللغة الحيّة) মধ্য দিয়ে তার বিকল্প সন্ধান করেন। এখন পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে তারই একটি প্রায়োগিক ও পদ্ধতিগত বিস্তার আমরা দেখতে পাব। এখানে তহা দেখান যে, বোরহানি যুক্তি কেবল ‘তাদলিল’ বা দলিলের ওপর নির্ভর করে একমুখী হিওয়ার (الحوار) তৈরি করে, কিন্তু ‘জীবন্ত ভাষাব্যবস্থা’ সর্বদা সক্রিয় সংলাপ বা ‘তাহাউর’ (التحاور)-এর ওপর দাঁড়ায়।

তহা আবদুর রহমান বিতর্কবাদকে তিনটি ক্রমবর্ধমান স্তরে বিভক্ত করেছেন। তবে কেবল এই স্তরগুলো চিহ্নিত করলেই তাঁর তত্ত্বের গভীরতা ধরা পড়ে না। এই তিনটি স্তরের ভেতরের কারিগরি বুঝতে হলে আমাদের তাঁর ‘আরজিয়্যাত’ বা পারিপার্শ্বিকতা তত্ত্বকে (نظرية العرضية) আগে বুঝতে হবে। কারণ এটিই এই গোটা বর্গায়নের ভিত্তিপ্রস্তর।

এখানে পারিপার্শ্বিকতা কথাটি মানুষের সজীব ও সক্রিয় কথাবার্তার মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন কারিগরি বা হাতিয়ার (الآلية الخطابية) বোঝাতে ব্যবহার হয়েছে (২০০০ : ৩৮)। আরবি ‘আরজ’ (عرض) শব্দটির অভিধানিক অর্থ পরিপার্শ্ব, দুর্ঘটনা বা আকস্মিকতা। কিন্তু যুক্তিশাস্ত্রের বিশেষ পরিভাষায় এটি ‘দাবি’ অর্থে ব্যবহৃত, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Episodical’। কারণ যে ‘আরজ’ করে, অর্থাৎ যে দাবি পেশ করে, সে তার দাবিকৃত বিষয়ে বিশ্বাস করে; সে উপস্থিত ব্যক্তিকে তার বক্তব্য স্বীকার করার দায় আরোপ করে; সে তার কথার বিষয়ের প্রেক্ষিতে দলিল কায়েম করে; এবং সে তার যুক্তি ও যুক্তি-প্রক্রিয়া উভয়ের ওপর আস্থা রাখে।

তহা বিতর্কবাদের প্রথম স্তর الحوار বা সংলাপ পদ্ধতিকে তিনি তাত্ত্বিকভাবে ‘পারিপার্শ্বিকতা’-এর সঙ্গে যুক্ত করেন  এবং তার তিনটি আলাদা পদ্ধতি উল্লেখ করেন। তহা সুনির্দিষ্টভাবে দেখান যে তিনটিই নানা দিক থেকে অসম্পূর্ণ (২০০০: ৩৯-৪০):

ক. শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর বাসনা: এটি একটি অভিমুখ ধরে লক্ষ্যে উপনীত হয়, যেখানে শুরুর বিন্দু উপস্থাপক ও শেষ বিন্দু শ্রোতা।

খ. বাক্য শর্তসমেত প্রয়োগ হওয়ার পদ্ধতি: এটি বাক্যটিকে নিজে শর্তের দিক থেকে সত্য আকারে নিরূপণ করে, কিন্তু কীভাবে এই বাক্যটি কথোপকথনের পরিসরে ব্যবহার হয় এবং এর জীবন্ত প্রক্রিয়া কী, সে সম্পর্কে কথা বলে না।

গ. বোরহানি পদ্ধতি: এটিও অসম্পূর্ণ, কারণ কথোপকথন সৃষ্টির জীবন্ত প্রক্রিয়া ও সেটা হৃদয়ঙ্গম করার সঙ্গে এর ছেদ থাকে। একজন উপস্থাপকের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো তার উপস্থাপিত জিনিসটি একান্তই তার ব্যক্তিগত হওয়া—ফলে পণ্ডিত যখন কথা বলেন, তখন নিজের কথাকে প্রতিপক্ষের সব রকমের অনুপ্রবেশ থেকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ম যুক্ত করেন।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনটি স্তরের বিভাজন আসলে এই তিন ধরনের অসম্পূর্ণ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার প্রচেষ্টা।

৩.৩.১ হিওয়ার: বিতর্কের প্রথম ও নিম্নতম স্তর

হিওয়ার (الحوار) হলো বিতর্কবাদের সবচেয়ে মৌলিক ও নিম্নতম স্তর। তহার ভাষায় (২০০০: ৪২): “মোটকথা বিতর্ক একটি যুক্তিপ্রমাণ শুদ্ধ বাক্য যার ভিত্তি পরস্পরের মধ্যে পৌঁছানোর বাসনা থেকে গড়ে উঠেছে। আবার সে এমন বাক্য যেখানে বক্তা নিজের প্রতিপক্ষের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার প্রয়াস পায়।”

এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যটি গুরুত্বপূর্ণ— একদিকে পৌঁছানোর বাসনা, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের চিহ্ন মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই কারণেই আরবিতে হিওয়ারকে বিতর্কবাদের সবচেয়ে নিচু স্তর গণ্য করা হয়। এই স্তরে যোগাযোগ মূলত একমুখী— বক্তা তার বার্তা শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে চান, কিন্তু শ্রোতার প্রতিক্রিয়া বক্তার অবস্থানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে না। এখানে হিওয়ার আসলে বোরহানি পদ্ধতির কথোপকথনমূলক রূপ মাত্র। কারণ বক্তার একমাত্র লক্ষ্য তার নিজস্ব দলিল প্রতিষ্ঠা করা, প্রতিপক্ষের সাথে সত্যিকার মোকাবিলা নয়।

৩.৩.২ মুহাওয়ারা: আপত্তি উত্থাপন ও প্রকৃত সংলাপের সূচনা

মুহাওয়ারা (المحاورة) হলো দ্বিতীয় ও গভীরতর স্তর, যেখানে ‘ইতেরাজ’ (الإعتراض) বা ‘আপত্তি উত্থাপন’-এর মাধ্যমে প্রকৃত আলাপ শুরু হয়। তহা এর সংজ্ঞা দিয়েছেন (২০০০: ৪৩-৪৪):

“আপত্তি তোলা মানে হলো প্রতিপক্ষ স্বেচ্ছায় অপর পক্ষের ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি সাধারণ তত্ত্বের জ্ঞান তৈরি করতে নিজস্ব ব্যাকরণশৈলী ও বিধি-বিধান ব্যবহারে বাধ্য হবে।” এই আপত্তি উত্থাপন প্রক্রিয়ার পাঁচটি বিশেষ দিক রয়েছে:

  • প্রথমত, এটি একটি জবাব প্রদানমূলক কাজ— সূচনামূলক কর্ম নয়।
  • দ্বিতীয়ত, এটি ‘পশ্চাতে বলার’ কর্ম— সে তার প্রভাব বা চিহ্ন তার আগেকার কথার অভিমুখে প্রকাশ করে।
  • তৃতীয়ত, এটি পরামর্শমূলক— স্বেচ্ছাচারিতা নয়; কথোপকথনের মধ্যে থাকাবস্থায় আপত্তিকারীর কোনো একতরফা ক্ষমতা খাটানোর সুযোগ নাই।
  • চতুর্থত, এটি মূল্যায়নধর্মী— আপত্তিকারী প্রতিপক্ষের বক্তব্যের ভেতর নিজের অবস্থান নির্ণয় করে নেয়।
  • পঞ্চমত, এটি সংশয়মূলক— আপত্তিকারী হয় প্রতিপক্ষের দলিলের খণ্ডন করে অথবা তার কাছে বাড়তি যুক্তির দাবি জানায়।

তবে মুহাওয়ারায় আপত্তি জানানোর কিছু শর্তও রয়েছে। আপত্তিকারীর কথার মূল ও প্রতিপক্ষের কথার মূল একই হতে হবে— ‘মূল’ মানে এখানে কথার বিষয়। আপত্তিকারীর বক্তব্যের ভঙ্গি বা শৈলী কোনো না কোনো দিক থেকে প্রতিপক্ষের কথার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এবং আপত্তিকারীর অভিমুখ হবে প্রতিপক্ষের কথার ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সমকালীন ভাষাবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘কথোপকথন পদ বা ক্রিয়া’ বলেন। আর পুরানা শাস্ত্রীয় ব্যক্তিবর্গ এর নাম দিয়েছেন ‘মুনাজারা’ (২০০০: ৪৬)। আমরা পরের অধ্যায়গুলোতে এ নিয়ে আরো বিস্তারিত আলাপে যাব।

তহা দেখান যে (২০০০: ৪৮), এর দুটো দিক রয়েছে; প্রথম দিক হলো ভাষার স্বেচ্ছাচারিতা এবং দ্বিতীয় দিক হলো ভাষার রূপক-সম্ভাবনা। ভাষার স্বেচ্ছাচারিতা মানে হলো আমরা কথা বলতে গিয়ে নানান অবস্থায় একটি বিষয়কে উল্টেপাল্টে পরিবর্তন করতে পারি। ফলে কথার শুরু ও শেষ ভিন্ন হয়ে যায়। ভাষার রূপক-সম্ভাবনা মানে হলো বিভিন্ন অর্থ একে অপরকে হয় অবধারিত করে অথবা একে অপরকে নাকচ করে। যখন দুটো অর্থ পরস্পরকে অবধারিত করে, তখন তার্কিকের সত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে; আর যেখানে তারা একে অপরকে নাকচ করে, সেখানে একে অপরকে পরিচ্ছন্ন করে একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কেবল তখনই তর্কাতর্কির রূপ ও অর্থ এবং তার্কিকের সত্তা পূর্ণতা লাভ করে।

৩.৩.৩ তাহাউর: পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক রূপান্তর

তাহাউর (التحاور) হলো সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে পরিপক্ব স্তর, যেখানে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান পারস্পরিক আলোচনার আলোকে পুনর্বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তাহাউরও আবার ‘তাআরুজ’ (التعارض) বা ‘একে অপরের ওপর আরজ করা’-র প্রক্রিয়ার প্রতিষ্ঠিত। তহা দেখান যে এই কথা তোলাতুলিতে তার্কিকের সত্তা নিজেই দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। এর সংজ্ঞা হলো: “পারস্পরিক আপত্তি বা সংলাপ আদান-প্রদানের সংজ্ঞা হলো একজন তার্কিকের নিজের বক্তব্য বা আপত্তিকে পারস্পরিক আলোচনা-পর্যালোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে পাল্টাতে পারা এবং তার এই বিশ্বাস থাকা যে এই প্রক্রিয়ায় যে সকল পাল্টাপাল্টির লক্ষণ তৈরি হলো তা আমলের উৎসাহ যোগায়।” (২০০০ : ৪৮-৪৯)

তাহাউরের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে:

  1. তুমি যে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করতে চাও না সেই বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য পেশ করবে না।
  2. কথার নানান টুকরাকে পরস্পরের মুখোমুখি করার নীতি অনুসরণ করতে হবে।
  3. তোমার কথায় আপত্তির সুযোগ থাকতে হবে।

এই নিয়মের অধীনে তার্কিক অনিবার্যভাবে নিজেকে পেশকারী সত্তায় নিষ্ক্রান্ত করে অথবা আপত্তিকারী সত্তায় নিষ্ক্রান্ত করে। তহার পরিভাষায় প্রথমটির ফলাফল হলো ‘মানতুক’— যার শব্দের অর্থ নিজের দিক থেকেই স্পষ্ট ও পরিষ্কার। দ্বিতীয়টি হলো ‘মাফহুমুল মুখালিফ’— যেখানে সরাসরি শব্দ থেকে সমগ্র অর্থ তুলে আনা যায় না, বরং অন্যান্য দলিল বা আলামত অনুসরণ করে বুঝতে হয়। এ দুটি প্রত্যয়ই উসুলুল ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। এই সংযোগ তহার বৃহত্তর প্রকল্পে ইসলামি জ্ঞানঐতিহ্যের সাথে আধুনিক ভাষাদর্শনের সংলগ্নতার একটি নজির।

 

দুটি প্রামাণ্য বর্ণনা পদ্ধতি

তাহাউরের ভেতরে তহা দুটি প্রামাণ্য বর্ণনা পদ্ধতি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো ‘শীর্ষস্থ বা মৌলিক দেখাদেখি’—এখানে তার্কিক প্রায়শই একই জায়গা ও একই সময়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। এর পেছনে কারণ হলো আলাপ কখনোই শূন্য থেকে শুরু হয় না— কেননা শ্রোতার মনে সর্বদা স্তূপিকৃত আগাম তথ্য-উপাত্ত হাজির থাকে। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ‘সমান্তরাল দেখাদেখি’— এখানে একটি বক্তব্যের মধ্যে কথাবার্তার নানারকম অভিব্যক্তি ও তার ভিন্নতার দরুন শ্রোতা ও বক্তার সত্তায় পরিবর্তন ঘটে। বক্তাকে তখন বিভিন্ন সত্তায় বিশেষায়িত করা যায়: সরাসরি কথক সত্তা, কথাবার্তার অভিব্যক্তি সম্পর্কে দায়ীসত্তা এবং সকল উহ্য অভিব্যক্তি সম্পর্কে দায়ীসত্তা (২০০০: ৫৩-৫৫)।

এই দুই বর্ণনা পদ্ধতি মিলিয়ে তহা দেখান যে তাহাউরে তার্কিকের সত্তা নিজেই রূপান্তরিত হয়—সে আলাপ করার মধ্যে আলাপকারী হয় এবং আলাপের বিষয়ের দিক থেকে শ্রোতা হিসাবেও পরিগণিত হয়।

৩.৪ মুনাজারা: তাদাউলি দর্শনের কেন্দ্রীয় পদ্ধতি

তহার ফী উসুলিল হিওয়ার-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, দার্শনিক আলাপকে বোরহানি হতেই হবে— এই দাবিটি আসলে কতটা বৈধ? কেননা যদি দার্শনিক অর্থ বৌদ্ধিক অর্থ হয়, এবং বুদ্ধির প্রক্রিয়া বোরহানের হয়, তাহলে দার্শনিক অর্থ বোরহানি অর্থ হওয়া অপরিহার্য।

তহা উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম দার্শনিকরা গ্রিক থেকে গণিতশাস্ত্র ও প্রকৃতিবিদ্যার বইপত্র অনুবাদ করার পরে এই জ্ঞানকাণ্ডগুলোর জ্ঞানতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পরাবিদ্যার শাখায়ও সম্পৃক্ত করেছিলেন। এরিস্টটলের শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত পরাবিদ্যা ও মুসলিমদের তওহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত এলাহিয়াতের মধ্যে যে সংঘাত অনিবার্য ছিল, তার ফলে একদল দার্শনিক ‘বোরহানের প্রতিরক্ষা’ গ্রহণ করে এটিকেই চিন্তার একমাত্র পদ্ধতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় তারা তর্কে জয়ী হবার জন্য বোরহানের নামে এমন সব আলোচনার জন্ম দিলেন যা যুক্তিবিদ্যা থেকে একেবারেই আলাদা। যেমন খোদার অস্তিত্ব ও জগতের অবিনশ্বরতা সম্পর্কে ওঠা তর্ক (২০০০: ৬১-৬২)।

৩.৫ ‘পারস্পরিক সম্বোধন’ ও মুনাজারার সংজ্ঞা

তহা বোরহানকে রদ করে ‘হিজাজ’-এর আলাপে প্রবেশ করেন। আমরা একে বলব ‘পারস্পরিক সম্বোধন’। তিনি বলেন (২০০০: ৬৫), প্রাকৃত ভাষার মধ্যে দলিল প্রদানের প্রক্রিয়া আসলে ‘পারস্পরিক সম্বোধনর’-এর মধ্য দিয়ে হয়, কোনো বিশুদ্ধ যুক্তিবাদী কারিগরির মাধ্যমে নয়। একে অপরকে ‘সম্বোধন’ করা হলো এক ধরনের বিতর্কমূলক সজীব ও জীবন্ত ক্রিয়াশীলতা। এটিকে ‘বিতর্কমূলক’ বলা হয় কারণ তার লক্ষ্য বিশুদ্ধ যুক্তিবাদী সংকীর্ণ কাঠামো থেকে তুলনামূলক বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ দালিলিক ও যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে উন্নীত করা।

এই ‘পারস্পরিক সম্বোধন’-এর সামাজিক-অভিজ্ঞতামূলক পরিসরে গড়ে ওঠার দরুন সর্বোচ্চ শক্তিশালী বিতর্কমূলক আর্গুমেন্ট, যা গাঠনিকভাবে বিভিন্ন দিক থেকে ত্রুটিযুক্ত হলেও সেটা বিশুদ্ধ বোরহান থেকে উত্তম। যদি বোরহানটি অন্যকে তুষ্ট করতে না পারে। কারণ কেউ একটা প্রমাণ উল্লেখ করলেই সেটা বোরহান হবে না; বোরহান হতে হলে সেই দলিল দিয়ে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, কোনো ফলাফল তৈরি করতে হবে এবং শ্রোতাকে বাধ্য করতে হবে।

এইজন্য তহা দেখান ‘মুনাজারা’ (المناظرة) বিতর্কের এমনি একটি রূপ, যা মুহাওয়ারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত কিন্তু একটি বিশেষ দ্বিমুখী চরিত্রের কারণে স্বতন্ত্র। তহার সংজ্ঞা (২০০০ : ৪৬):

“এখানে কোনো বিষয়ে সঠিক বেঠিক নির্ণয় করার জন্য দুই দিক থেকে চোখে চোখে রাখা হয়। এখানে যিনি মুনাজারা করেন তিনি নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের লোক হতে পারেন অথবা আপত্তিও জানাতে পারেন। কিন্তু তার কথা যেমনই হোক সেটা প্রতিপক্ষের বিশ্বাস ও মতাদর্শের মধ্যে নতুন আলাপের সূত্রপাত ঘটায়।”

‘‘পারস্পরিক সম্বোধন’-এর’র এই ধারণাটি কীভাবে এই বিশেষ পদ্ধতিতে পরিণত হয়, তা বোঝার জন্য মুনাজারার শাস্ত্রীয় সংজ্ঞাকে সামনে আনা প্রয়োজন। ইমাম তাশকুবরাযাদাহ (১৫৬১ খ্রি.) মুনাজারার সংজ্ঞা দিয়েছেন এইভাবে (২০১২: ৪৫): দুই অভিমুখ থেকে দুটি বস্তুর সম্বন্ধ সম্পর্কে সত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে ‘বছিরত’ বা অন্তর্দৃষ্টির ভিত্তিতে ‘নজর’ করা বা দৃষ্টিপাত করাই হলো মুনাজারা। মুনাজারার আক্ষরিক অর্থও এই সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ— এটি ‘নজর’ বা দর্শন-ক্রিয়া থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ ‘দেখাদেখি’ বা ‘দুই চোখের মুখোমুখি হওয়া’। বাংলায় এর অর্থ করা যায়, সংলাপ, কথোপকথন, বাতচিৎ, তর্কাতর্কি ইত্যাদি। এই শব্দগুলো আরবিতে গড়ে ওঠা ‘মুনাজারা’ শব্দটির ধারনাগত পরিসর বুঝাতে পারে না। তাই আমরা স্রেফ ‘মুনাজারা’ শব্দটিই ব্যবহার করব। এই সংজ্ঞার গভীরতা বুঝলে শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। তহার আলাপের প্রেক্ষিতে বলা যায় এর তিনটি মাত্রা রয়েছে :

প্রথমত, দুই দিক বা কথোপকথন পরিসর (المحاورة من الجانبين): এর মধ্য দিয়ে আমরা ‘নজর’ প্রধান হয়ে উঠতে দেখি। ‘নজর’ (النظر) এখানে এই পরিসরের বিষয় ও বিধেয়ের কর্তব্য পালন করছে। ‘বিষয়’ ও ‘বিধেয়’ নিজ অর্থে স্বাধীন কোনো দায়িত্ব পালন করছে না। বরং জীবন্ত মানুষ ও দুই পক্ষের কথোপকথনের ভিত্তিতে তার সম্পৃক্ততা ও কর্তব্য নির্ধারিত হয়। এই সম্পৃক্ততা সংজ্ঞার অপর শব্দ ‘বছিরত’ কথাটির মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করছে। এখানে ‘নজর’ বা বুদ্ধির অভিমুখ নির্ধারিত হবে উভয় পক্ষের সক্রিয় কথোপকথনের পরিণতিতে জীবন্ত মানুষের ‘অন্তর্দৃষ্টি’র ভিত্তিতে। ফলে এখানে দর্শন ও কথা একেঅপরের মধ্যে যেন অনুপ্রবেশ করছে বলে মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, সত্য, কাজ ও কর্তব্য (إظهار الحق من جهة العمل): আমরা হয়তো বুঝতে পারছি মানুষের বুদ্ধি কখনো নিজের ইচ্ছায় স্বাধীন নয়। কেবল জীবন্ত মানুষের মধ্য দিয়ে তার উদ্দেশ্য ও অভিমুখ নির্ধারিত। কেননা বুদ্ধি যদি নিজের সম্পর্কে ‘সত্য দাবি’ নিয়ে আসে, তখন তার দাবি এই পরিসরেই মীমাংসা হবার উপযুক্ত হতে হবে। কোনো পক্ষ যদি নিজের যুক্তির শক্তি সম্পর্কে নিশ্চয়তার দাবি করে তাকে ‘দাবি’ ও ‘আপত্তি’ উত্থাপনের কায়দার অধীন হতে হয়। এই পরিসর থেকে কোনো পক্ষ যদি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, দলিল হাজির করতে অপারগ ও দুর্বল হয়, তাকে অন্যের কথার অধিকার স্বীকার করতে হবে। নতুবা তার বক্তব্য পুরাপুরি অগ্রাহ্য হবে (غير المسموعة والموجهة)।

তৃতীয়ত, আখলাকি ও নৈতিক সম্বন্ধ (شهادة الأخلاق): এই কথোপকথন পরিসর গড়ে ওঠায় ‘নৈতিক সম্বন্ধ’ বুদ্ধির অধীন হয়ে উঠতে পারে না। ফলে নৈতিকতা ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে মাত্র। এই পরিসরের মধ্যে মানুষ আদাব ও আখলাকের সীমা ও সম্মতি প্রদান করে। ‘বুদ্ধি’ এর দ্বারা আখলাকি ও নৈতিকতার অর্থ পরিগ্রহ করছে। মানুষ এর ফলে সত্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করতে পারছে না। ফলে এখানে চিন্তা ও জগত‌ও আলাদা হয়ে উঠতে পারছে না।

মুনাজারার শাস্ত্রীয় সংজ্ঞার ভেতরে যে পদ্ধতিগত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তার সঙ্গে সমকালীন পাশ্চাত্য যুক্তিতত্ত্বের, বিশেষত ফান এমেরেন (Van Eemeren) ও গ্রোটেনডার্স্ট (Grootendorst)-এর ‘প্রাগমা-ডায়ালেক্টিক’ (Pragma-dialectics) মডেল নিয়ে আমরা আলাপ করতে পারি। ফান এমেরেন তাঁর ‘Speech Acts In Argumentative Discussions গ্রন্থে যুক্তিকে কেবল গাণিতিক চিহ্নের বিমূর্ত বিন্যাস হিসাবে না দেখে একে প্রাত্যহিক ভাষার (Colloquial speech) একটি সক্রিয় সামাজিক প্রক্রিয়া হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, যুক্তি হলো ‘প্রকাশিত মতামতের বিবাদ নিষ্পত্তি’র (Resolution of disputes) একটি পথ, যা মানুষের বৌদ্ধিক জড়তা কাটিয়ে বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও সংলাপ জারি রাখে। আমরা চাইলে তাঁদের এই বৃহৎ প্রকল্পের চারটি মূল স্তম্ভ—বহিষ্করণ, কার্যায়ন, সামাজিকীকরণ ও দ্বান্দ্বিকীকরণ— ইমাম তাশকুবরাযাদাহ বর্ণিত মুনাজারার সংজ্ঞার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি।

প্রথমত, বহিষ্করণ (Externalization)-এর মাধ্যমে ফান এমেরেন পপারের (Popper) সূত্র (কেবল একটি বিধিবদ্ধ বা ভাষিক কাঠামোয় রূপদান করা তত্ত্বই গঠনমূলক সমালোচনার বিষয় হতে পারে; যে তত্ত্ব কেবল বিশ্বাস হিসাবে লালিত হয়, তা আলোচনা যোগ্য নয়।) ধরে দাবি করেন যে, যুক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত কেবল মনের ভেতরের বিশ্বাস (Belief) হিসাবে থাকে, ততক্ষণ তা সমালোচনার যোগ্য হয় না। বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির অবস্থানকে ভাষিক ও সামাজিকভাবে প্রকাশ করা। এটিকেই আমরা বলতে পারি, ‘ইজহার করা’ (إظهار) বা ‘দুই চোখের মুখোমুখি হওয়া’ বা প্রত্যক্ষ নজরদারির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির অপরের কাছে আপন সত্যকে প্রকাশ করা (ইমেরেন ও গ্রুটেনডর্স্ট ১৯৮৩: ৪)।

দ্বিতীয়ত, ‘কার্যাভিমুখিকরণ’ (Functionalization)-এর মধ্য দিয়ে যুক্তিকে একইসঙ্গে একং ‘বক্তব্য-ক্রিয়া’ বা স্পিচ অ্যাক্ট (Speech act) হিসাবে গণ্য করা। এটাকে আমরা ‘আমলের অভিমুখ’ (جهة العمل) হিসাবে অভিহিত করেছি। কেননা ‘কথা’ যখন কাজের দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তখন তা কোনো একক কর্তার ইচ্ছায় নয়, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয় (প্রাগুক্ত : ৭)।

তৃতীয়ত, সামাজিকীকরণ (Socialization)-এর মূলকথা হলো যুক্তি একটি দ্বিপাক্ষিক (Bilateral) প্রক্রিয়া। বক্তা এখানে কেবল নিজের কথা বলেন না, বরং একজন ‘যুক্তিসম্পন্ন বিচারককে’ (Rational Judge) সম্বোধন করেন। এই বিচারক কেবল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নন, বরং তাঁর অধিকার আছে বক্তার দাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার। ‘মুনাজারা’ ধরনের দিক থেকে ‘মুহাওয়ারা’ বা দ্বিমুখী সংলাপের শর্তটিকে অনুমান করে। সে সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে আপন রূপ প্রকাশ করে, যেখানে ‘নজর’ বা বুদ্ধি উভয় পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে জীবন্ত হয়ে ওঠে (প্রাগুক্ত : ৯)।

চতুর্থত, দ্বান্দ্বিকীকরণ (Dialectification)-এর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে, যুক্তিকে কেবল পক্ষসমর্থনের হাতিয়ার নয়, বরং বিপক্ষ-যুক্তির (Contra-argumentation) মোকাবিলা করার পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ফান এমেরেন মনে করেন, কোনো দাবির যথার্থ পরীক্ষা কেবল সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হলেই সম্ভব। ‘মুহাওয়ারা’ ধারনাগত দিক থেকে তাই স্রেফ বিতর্ক বা তর্ক কিংবা কূটতর্ক না। মুনাজারার মধ্যে দুই বা ততোধিক ব্যক্তিরা আপত্তি উত্থাপন ও তার নিরসনের মধ্য দিয়ে তাই সত্যের সন্ধান করেন (প্রাগুক্ত : ১৫)।

তবে মুনাজারা এই চারটি বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেও একটি মৌলিক দিক থেকে এই ধরনের ‘কথোপকথন’ পদ্ধতিকে ছাড়িয়ে যায়। ফান এমেরেনের কাঠামো একধরনের নিয়মতান্ত্রিক যুক্তিপদ্ধতি অনুমান করে— এটি ‘কোড অব কনডাক্ট’ (Code of conduct) বা যৌক্তিক আচরণবিধি প্রতিষ্ঠার একটি প্রকল্প। যেখানে যুক্তিসম্পন্ন বিচারক বাইরের কিছু নিয়মের নিরিখে বিবাদ নিষ্পত্তি করেন। মুনাজারার মধ্যে এই চার বৈশিষ্ট্য হাজির থাকলেও ইমাম তাশকুবরাযাদাহ যে তৃতীয় মাত্রার কথা বলেছেন, আমরা যাকে বলেছি, ‘শাহাদাতুল আখলাক’ (شهادة الأخلاق) বা দু’জন ব্যক্তির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পরস্পরের প্রতি নৈতিক সাক্ষ্য প্রদান— এই দিক থেকে স্বতন্ত্র। মুনাজারায় নৈতিকতা কেবল বাইরের কোনো আরোপিত নিয়ম বা আচরণবিধি নয়, বরং এটি মানুষের পারস্পরিক কথোপকথনের‌ই একটি অন্তর্নিহিত শর্ত। যা আদব ও আখলাকের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। এখানে ‘বুদ্ধি’ কেবল নিয়ম মানে না, বরং আখলাকি সংবেদনার মধ্য দিয়ে সত্যের অধিকারকে স্বীকার করে নেয়। তহা আবদুর রহমানের প্রস্তাবনায় ‘মুনাজারা’-এর শক্তি হচ্ছে এটা বৈশিষ্ট্যগতভাবে ‘পরামর্শতান্ত্রিক’ (Consultative) ও নৈতিক সমাজ গঠনের দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করতে পারে। ফলে যৌক্তিক বিতর্কবাদ আগাম অনুমানকৃত নিয়মের ওপর দাঁড়ায়, কিন্তু মুনাজারার পরিমণ্ডল মানুষের সামষ্টিক অন্তর্দৃষ্টি বা ‘বছিরত’-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত।

৩.৬ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কালামশাস্ত্রের ভূমিকা

আধুনিক ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসের দিক থেকে পাশ্চাত্যে গড়ে ওঠা যে পদ্ধতির সঙ্গে তহা ‘মুনাজারাকে’ তুলনা করেন, সেটা হলো ‘তাদাউলি দর্শন’ (دور التداولي) বা ভাষাতত্ত্বের বিকাশে যা ‘প্রাগম্যাটিকস’ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তহা আমাদের দেখান প্রাগম্যাটিকসের কানভারি করা স্লোগানে আমাদের এটা বললেই যথেষ্ঠ না যে ‘ভাষার অর্থ তার ব্যবহারের মধ্যে নিহিত’। বরং আমাদের ভাষার অর্থ ও স্বরূপ খুঁজতে হবে ওই ভাষাচর্চাকারী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাদের বাচনিক বিন্যাসের (constellations of statements) ভেতরে। তহা সংক্ষেপে এই মিলের সূত্রটি ধরিয়ে দিয়ে বলেন (২০০০: ৬৬):

“মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গড়ে ওঠা দর্শনের হুজ্জাত তৈরি হয় ভাষার সজীব ও সক্রিয় বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে; তার ভিত্তি হল কোন মত পেশ করা কিংবা কোন মতের ওপর আপত্তি তোলা। এর লক্ষ্য হলো উত্থাপিত কিংবা আপত্তিকৃত মতের সঠিকতা কিংবা ভ্রান্তি তুলে ধরে অপরকে সন্তুষ্ট করা। সর্বক্ষেত্রে যার শর্ত হলো দার্শনিক সত্যের অনুসন্ধান।”

দৈনন্দিন জীবনে গড়ে ওঠা দর্শনের হুজ্জাত বা প্রস্তাব একই সঙ্গে দুই তলা বিশিষ্ট সত্তার পরস্পর মোকাবিলা—যেখানে উত্থাপনকারী বা আপত্তিকারী পরস্পরের দিকে অভিমুখ করে থাকে। এই মোকাবিলার মধ্য দিয়ে দুই প্রতিযোগীর বিশ্বাস ও অনুমানসমূহ পরিবর্তন হতে থাকে। পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রিয়া’। আর এই পারস্পরিক ‘করাকরি প্রক্রিয়া’র ওপরেই মুনাজারা প্রতিষ্ঠিত।

ঐতিহাসিকভাবে চিন্তার ইতিহাসে একমাত্র ইসলামি জ্ঞানগত পরিমণ্ডলে দুটি বৈশিষ্ট্য একইসাথে লক্ষ্যণীয়: একদিক থেকে সকল জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে দার্শনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ এবং অন্যদিক থেকে বিপুলভাবে দর্শনের আলোচনায় মুনাজারার পদ্ধতি অনুসরণ। এইখানে ‘দর্শন’ যে দিক থেকে মানুষের অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ড থেকে নিজেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে রাখে, সেটাই হলো ‘মুনাজারা’। এই ক্ষেত্রে তহার একটা গুরুতর অন্তর্দৃষ্টি হলো তিনি দেখান দর্শন কেবল মেটাফিজিক্স বা পরাবিদ্যার বিষয়বস্তু দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না, বরং তা সংজ্ঞায়িত হয় ‘ডিসকার্সিভ এনগেজমেন্ট’ বা আলোচনার পদ্ধতি দিয়ে। অর্থাৎ যেখানেই আপত্তি-সক্ষম আলোচনা (Objection-capable discourse) এবং জবাবদিহিমূলক দাবি (Accountable claim-making) বিদ্যমান, সেখানেই দর্শনের উদয় ঘটে। এই অর্থে কালামশাস্ত্র বা ফিকহশাস্ত্রও দার্শনিক হয়ে উঠতে পারে যদি তা মুনাজারার কাঠামো দ্বারা সুসংগঠিত হয়। সুতরাং সকল জ্ঞানকাণ্ডে মুনাজারার পদ্ধতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই দার্শনিক অভিব্যক্তি উপস্থিত হয়। এই দাবিটি বাংলায় দার্শনিক ভাষার নিজস্ব ভিত্তিরচনার‌ জন্য‌ও পূর্বশর্ত।

ইসলামের ইতিহাসের শক্তিশালী জ্ঞানতত্ত্বীয় ক্ষেত্রগুলোর দিকে ফিরে গেলে আমাদের কথার সত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে খারিজি, মুরজিয়া, মুতাজিলা, আশারিয়া, মাতুরিদিয়া ও শিয়াদের বিতর্ক, এবং পরবর্তীতে দার্শনিক, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও দ্বৈতবাদীদের সাথে মোকাবিলা কালামশাস্ত্রকে একটি স্থায়ী ‘এতেরাজ ও রদ’ (Objection-response) কাঠামো দান করে। ঈমানের সংজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি, স্বাধীন ইচ্ছা, কোরআনের সৃষ্টিতত্ত্ব কিংবা স্রষ্টার গুণাবলি নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে বিভাজন তৈরি হয়, তা কেবল বিমূর্ত অবরোহী (Pure deduction) পদ্ধতিতে মীমাংসাযোগ্য ছিল না। এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তাত্ত্বিক মোকাবিলা ও সামষ্টিক আলাপ-আলোচনার পদ্ধতি আকারে মুনাজারা গড়ে ওঠে। কালাম, মানতেক ও উসুলের অভ্যন্তরে ‘ইতিরাজ’ (اعتراض/Objection), ‘জাওয়াব’ (جواب/Response), ‘নাকদ’ (نقض/Refutation) এবং ‘ইলযাম’ (إلزام/Internal consequence)-এর মতো পদ্ধতিগত সরঞ্জামগুলো বিকশিত হয়। পরবর্তীকালে এই পদ্ধতিগুলোই মুনাজারার কাঠামোগত ব্যাকরণ হিসাবে পরিগণিত হয়।

১৩শ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত মুসলমানদের জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলে ‘আদব আল-বাহস ওয়াল-মুনাজারা’ (বাহাস ও মুনাজারার আদব) বিপুলভাবে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের আওতায় আসে। ফখরুদ্দিন রাজি, আদুদি-দ্দিন আল-ইজি এবং শামসুদ্দিন সামরকান্দির মতো মনীষীরা বিতর্কের কায়দা-কানুনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এখানে দাবি (دعوى), দলিল (دليل) এবং আপত্তির (منع/نقض/معارضة) ধরণগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল, যা পদ্ধতিগতভাবে ‘কথোপকথন’কে প্রথম সুবিন্যস্ত যৌক্তিক রূপ প্রদান করে (সামারকান্দি ২০২০: ৬০১)। ফলে ইসলামের দীর্ঘ ঐতিহ্যে গ্রিক যুক্তিবিদ্যার ‘বোরহানি’ বা প্রদর্শনমূলক পদ্ধতি (Demonstrative) এখানে এসে কালাম, ফিকহ ও মুনাজারার মাধ্যমে সামাজিকভাবে প্রোথিত (Socially embedded) হয়ে পড়ে। এখানে যুক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তি বিচ্ছিন্ন বা বিমূর্ত কর্তার মধ্য দিয়ে বিকশিত হতে পারেনি। বরং তা আলাপ ও তর্কের মজলিস, মাদ্রাসা, ফতোয়া ও বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পরিসরের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসাগুলোতেও (যেমন: ফিরিঙ্গি মহল ও দেওবন্দ) ‘আদবুল বাহস’ এবং ‘কালাম’ চর্চার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল। এটা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস বোঝার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এ নিয়ে কোনো তুলনামূলক পর্যালোচনার ধারা এখনও গড়ে ওঠেনি।

 

৪. মুনাজারা ও মোশাহাদা: বঙ্গীয় দার্শনিক পদ্ধতির প্রস্তাবনা

৪.১ মুনাজারা থেকে মোশাহাদা

এই প্রবন্ধের আলাপ এতদূর আসার পরে এবার আমরা আমাদের চিন্তার জমিনে দাঁড়িয়ে কিছু প্রশ্ন তুলব। আমরা প্রশ্ন করতে পারি : মুনাজারার মধ্য দিয়ে যে সত্য উৎপাদিত হয়, তার ভিত্তি কোথায়? অর্থাৎ দুই পক্ষের ‘দেখাদেখি’ বা ‘নজর’ করার মধ্য দিয়ে যখন সত্য নিজেই নিজের দর্শন প্রদান করে, সেই ‘দেখা’ বা দর্শনের স্বরূপ কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা ‘মোশাহাদা’ (المشاهدة)-এর ধারণায় উপনীত হই। মুনাজারা ও মোশাহাদার সম্পর্কটি বোঝার জন্য প্রথমে তাদের ভাষায় তাত্ত্বিক উৎস লক্ষ্য করা দরকার।

আরবি ভাষায় মুনাজারা (المناظرة) এবং মোশাহাদা (المشاهدة)— উভয়ের মধ্যেই  ‘হাকিকত’ বা সমস্ত বস্তুজগতের প্রত্যক্ষ সত্যকে দর্শনের অনুমান থেকে উদ্গত। মুনাজারা ক্রিয়াপদটি ‘নজর’ (النظر) ধাতু থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছে। যার অর্থ দৃষ্টিপাত করা, দেখা বা বুদ্ধির ‘অভিমুখ’ নির্ধারণ করা। অন্যদিকে মোশাহাদা কথাটি ‘শ-হ-দ’ (شهد) ধাতু থেকে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ সাক্ষ্যদান, সরাসরি প্রত্যক্ষ করা বা অনুপস্থিতির উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সত্যের উপলব্ধি ঘটা। যার মধ্য দিয়ে আমরা দেখি, উপস্থিতির নিশ্চয়তা প্রদান করি, কিন্তু একইসঙ্গে যা অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে সর্বদা অনিশ্চয়তা বা সীমা প্রদর্শন করে। ফলে তা অন্তর্দৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের মনের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। উভয়ের মধ্যে ব্যুৎপত্তিগত এই ফারাক থাকা সত্তেও উভয়ই আদতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও একইসঙ্গে সত্যের ‘দর্শন’-র সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আবার শক্তি ও সম্ভাবনার দিক থেকে উভয়ের মধ্যে সত্যের রূপ ও আস্বাদনের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। এই হিসাবে ‘নজর’ যেখানে বৌদ্ধিক অভিমুখ ও দিকনির্ধারণ, ‘শাহাদা’ হলো সরাসরি উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া। আমরা এই ব্যুৎপত্তিগত দিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে তিনটি বিষয় নজরে আনতে চাই:

এক : ‘নজর’ মূলত একটি বৌদ্ধিক অনুসন্ধান ও অভিমুখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এখানে সত্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে বুদ্ধিবৃত্তিক তুষ্টি ও যৌক্তিক সংগতির ওপর। ফলে নজরের ক্ষেত্রে ‘ফলাফল’ বা বুদ্ধির সঠিক সিদ্ধান্তই প্রক্রিয়ার বৈধতা দান করে।

দুই : ‘শাহাদা’ হলো সরাসরি উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া। ‘নজর’ আদতে এই দিক থেকে শাহাদারই একটি প্রাথমিক স্তর। যা অনুমান করে সত্য মাত্রই অনুপস্থিত, যা কেবল তার মহিমার প্রকাশ বা নামচিহ্ন ধরেই হাজির হয়। ফলে অনুপস্থিতি আপন প্রকাশের জন্য সবথেকে মহিমান্বিত রূপের আশ্রয় নেয়। আর এটাই বনি আদমের শ্রেষ্ঠত্ব। এই দিক থেকে শাহাদা নজরকেও ছাড়িয়ে যায়, কারণ শাহাদা মানে একইসঙ্গে অনুপস্থিতি। সে ভাষা, দর্শন ও জগতের এমন চিহ্ন, এমন শব্দ, যা সবথেকে ‘আদি’ এবং সকল কিছুর ‘ধ্বনি’ নির্দেশ করে। ফলে এটা কোনো দেশ-কাল-পাত্রের অধীন হতে পারে না, বরং মানুষের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নানা রূপে নানা তাৎপর্য নিয়ে সে হাজির হয়।  সুতরাং আমরা বলতে পারি :

তিন: নজর বুদ্ধিবৃত্তিক অভিমুখ এবং শাহাদা সত্যের আস্বাদন ও অনুপস্থিতির সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজে কাজেই মুনাজারা যেহেতু ‘নজর’ বা ‘দেখাদেখি’র ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই এর সার্থকতা কেবল যুক্তির কারিগরিতে নয়, বরং মোশাহাদার সেই স্তরে পৌঁছানো যেখানে সত্য নিজেই নিজের সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত হয়।

অর্থাৎ, মুনাজারার পদ্ধতিগত ‘নজর’ যখন গভীরতর হয়, তখন তা আর কেবল তর্কালাপে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মোশাহাদা বা সত্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের স্তরে উন্নীত হয়। এই পর্যায়ে ‘দেখা’ আর কেবল বাহ্যিক জগতের প্রতি দৃষ্টিপাত নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টির (বছিরত) মাধ্যমে সত্যকে তার সমগ্রতায় আস্বাদন করা।

এই পার্থক্য থেকেই বোরহান, মুনাজারা ও মোশাহাদার তিনটি জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তর স্পষ্ট হয়:

১. বোরহান: কতিপয় সুনিশ্চিত মোকাদ্দিমার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত জ্ঞান; এইখানে একক কর্তা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধসূত্র থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

২. মুনাজারা: এমন এক পদ্ধতি যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়ে ‘নজর’ করে— কিন্তু এই ‘নজর’ শুধু তখনই সত্যে পৌঁছায় যখন তার পেছনে ‘বছিরত’ বা অন্তর্দৃষ্টি থাকে।

৩. মোশাহাদা: এটি হলো সেই বছিরত তৈরির পরিসর, যেখানের সত্যের সাক্ষী ও সাক্ষ্য পরস্পরের মধ্য দিয়ে সত্যকে আস্বাদন করে।

এই সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট হয় যদি আমরা ইমাম তাশকুবরাযাদাহর আলাপে যে তৃতীয় মাত্রাটি যোগ করা হয়েছে, সেই দিকে আমরা লক্ষ্য করি: ‘শাহাদাতুল আখলাক’ (شهادة الأخلاق) বা নৈতিক সাক্ষ্যদান। এই মাত্রায় ‘শাহাদা’র ধাতুটি স্বয়ং উপস্থিত— যা নির্দেশ করে মুনাজারার নৈতিক পরিসর আদতে একটি ‘মোশাহাদা’-র পরিসর। কারণ দুই পক্ষ যখন পারস্পরিক আপত্তি ও জবাবের মধ্য দিয়ে কথোপকথন পরিচালিত করে, তখন তারা কেবল যুক্তি বিনিময় করে না— তারা একইসঙ্গে জগতের মধ্যে একে অপরের মোকাম ‘প্রত্যক্ষ করে’, একে অপরকে নৈতিক সাক্ষী হিসাবে গণ্য করে এবং সাক্ষী ও সাক্ষ্য হিসাবে উভয়ই আপন সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে পরস্পর পরস্পরকে রূপান্তর করতে থাকে।

সুতরাং বলা যায়, মুনাজারা হলো এমন সামাজিক-ভাষিক পদ্ধতি যার মধ্য দিয়েই মোশাহাদা ঘটতে পারে। অতএব যেমন মুনাজারাবিহীন কোনো মোশাহাদা নাই, তেমনই মোশাদাবিহীন কোনো মোনাজারাও নাই।

আমরা এবার উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বাংলা ভাষায় আমাদের কথোপকথনের ভাষিক-দার্শনিক শর্তগুলোও প্রস্তাব করতে পারি। তবে মনে রাখা ভালো, এই রূপরেখা বোরহানি পদ্ধতিকে আগাগোড়া বাতিল করে না। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলো তাকে তার সঠিক পরিসরে স্থাপন করা কিংবা বলতে পারি তাকে তার মোকাম দেখিয়ে দেওয়া। একইসঙ্গে যেসব জায়গায় মুনাজারা অপরিহার্য, সেখানে একটি আলাপের পদ্ধতিশাস্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এইক্ষেত্রে আমরা প্রধানত তিনটি শর্ত আমাদের সমস্ত অনুসন্ধানের কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারি :

১. ভাষার ত্রিমাত্রিকতার স্বীকৃতি : তহার তাবলিগ-তাদলিল-তাওজিহ কাঠামোকে বাংলা ভাষায় সকল প্রকার দার্শনিক তথ্য ও বক্তব্য বিশ্লেষণের প্রাথমিক হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করা দরকার। যেকোনো দার্শনিক বাক্য বিশ্লেষণে তিনটি সমান্তরাল প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি:

  • তাদলিলি দিক: এই বাক্য যৌক্তিকভাবে কোন অর্থ বহন করে?
  • তাবলিগি দিক: এই বাক্য কি শ্রোতার সাথে কোনো ধরনের ‘সাধারণ শর্ত’ (Common ground) নির্মাণ করতে পারে?
  • তাওজিহি দিক: এই বাক্য শ্রোতাকে কোনো ধরনের নৈতিক বা ব্যবহারিক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করে? বোরহানি পদ্ধতি যেখানে কেবল তাদলিলি মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে, বঙ্গীয় দর্শনের পরিকাঠামো এই তিনটি মাত্রাকেই একইসঙ্গে ধারণ করবে।

২. মুনাজারা ও পারস্পরিক জবাবদিহিতা: নৈতিক, সামাজিক ও ভাষতাত্ত্বিক প্রশ্নে মুনাজারাকে বোরহানের উপরে স্থাপন করা। তবে মুনাজারার মধ্যে একটি স্বাভাবিক জবাবদিহির কাঠামো বিদ্যমান, যা তহার আরজিয়্যাত তত্ত্ব থেকে নিষ্ক্রান্ত। এখানে যে ‘আরজ’ (নিবেদন) করে, সে তার দাবিকৃত বিষয়ে বিশ্বাসের পাশাপাশি উপস্থিত ব্যক্তির ওপর তা স্বীকার করার দায় আরোপ করে। অন্যদিকে, ‘ইতেরাজ’ (আপত্তি) করার অধিকারটিও এখানে শর্তসাপেক্ষ। কেননা প্রতিপক্ষের আন্তরিকতা ও স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই কথা বলার অধিকার অর্জন করতে হয়। এই আরজ-ইতেরাজ কাঠামো একটি স্বাভাবিক নৈতিক জবাবদিহির ব্যবস্থার ওপর ভাষাকে দাঁড় করাতে পারে। ফলে আমাদের প্রতিটি দাবিই গভীর সামাজিক ও নৈতিক অঙ্গীকার বহন করবে।

৩. মোশাহাদার মধ্য দিয়ে দর্শন ও চিন্তার পুনর্গঠন : স্রেফ যুক্তি-বুদ্ধি দিয়েই সত্যের রূপ দর্শন সম্ভব নয়। কিন্তু মোশাহাদা হচ্ছে এমন এক চিহ্ন, যা সত্যকে নিজের দিক থেকেই আমাদের উপলব্ধি করতে শিখায়। মোশাহাদায় আমাদের প্রস্তাব হলো, নৈতিকতা, সৌন্দর্য বা ‘সত্য’ পারস্পরিক সাক্ষ্যদানের মধ্য দিয়েই কেবল দর্শন করা সম্ভব। এই মূলনীতি অনুযায়ী, দার্শনিক কেবল ‘কী আছে’ তা বলবে না, বরং তাঁর কাজ হলো একইসঙ্গে ‘কীভাবে উপস্থিত থাকতে হয়’ ও ‘কীভাবে সাক্ষী হতে হয়’ তাও বলা।

 

৫. উইটগেনস্টাইনের দার্শনিক রূপান্তর: প্রত্যাখ্যান নয়, রূপান্তর

৫.১ ট্র্যাক্টেটাসের সীমা ও অভিপ্রায়

লুডভিগ উইটগেনস্টাইনের প্রথম পর্যায়ের দর্শন—ট্র্যাক্টেটাস লজিকো-ফিলোসফিকাস (১৯২১)—সরলভাবে ‘বোরহানি পদ্ধতির চূড়ান্ত রূপ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক ভুল হবে। ট্র্যাক্টেটাসে উইটগেনস্টাইন ভাষাকে জগতের একটি ‘ছবি’ হিসাবে কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এই চিত্রতত্ত্বের (Picture Theory) গভীরে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ভাষা ও জগতের সম্পর্ক কোথায়? ট্র্যাক্টেটাসের শেষ বাক্য—‘যার বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়, তার বিষয়ে নীরব থাকতে হবে’—এই নীরবতাকে স্বীকৃতি দেয়, যা বোরহানি পদ্ধতির আত্মবিশ্বাসী একমাত্রিকতার ঠিক বিপরীত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো উইটগেনস্টাইন স্বীকার করেছিলেন যে ট্র্যাক্টেটাসে যা ‘দেখানো যায়’ কিন্তু ‘বলা যায় না’ তার একটি বিশাল পরিসর রয়েছে। এটি ভাষার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি, এবং এই স্বীকৃতিই তাঁর পরবর্তী পর্যায়ের প্রশ্নের বীজ।

৫.২ রূপান্তরের মূল বিষয়বস্তু: ব্যবহার, ভাষা-খেলা ও জীবনের ধরন

ফিলোসফিক্যাল ইনভেস্টিগেশনসে (১৯৫৩) উইটগেনস্টাইনের পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান নয়, রূপান্তর। তাঁর প্রশ্ন একই ছিল—ভাষার অর্থ কীভাবে নির্মিত হয়?—কিন্তু উত্তর মৌলিকভাবে বদলেছে। ট্র্যাক্টেটাসে উত্তর ছিল: লজিক্যাল ফর্মের মাধ্যমে। পরবর্তীতে উত্তর হলো: ব্যবহারের মাধ্যমে।

এই ব্যবহার (Gebrauch/Use) ধারণাটি তহার তাওজিহ বা উদ্দেশ্যমাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ভাষার অর্থ তার প্রয়োগের সামাজিক-ব্যবহারিক প্রসঙ্গ থেকে আলাদা করা যায় না। উইটগেনস্টাইনের ‘ভাষা-খেলা’ (Sprachspiel) ধারণাটি এই সত্যকে তুলে ধরে: শব্দ ও বাক্য শুধু তখনই অর্থ বহন করে যখন তারা কোনো সামাজিক কার্যক্রম বা ‘জীবনের ধরন’ (Lebensform)-এর অংশ।

এটি তহার সেই সিদ্ধান্তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে দার্শনিক আলোচনার বোরহানি হবার দাবি আসলে প্রাকৃত ভাষার যে সামাজিক ও অভিজ্ঞতামূলক বিধান থেকে এটি উঠে আসে, তার অস্বীকৃতি। উইটগেনস্টাইন প্রস্তাব করেছেন ‘রুক্ষ জমিন’ (rough ground)-এ ফিরে যেতে—দৈনন্দিন ভাষার বৈচিত্র্য ও ঘর্ষণে, যেখানে বোরহানের নির্মল কিন্তু পিচ্ছিল মেঝে আর নেই।

৫.৩ উইটগেনস্টাইন ও তহার মিলন বিন্দু

উইটগেনস্টাইনের ‘পরিবার-সাদৃশ্য’ (Family Resemblance) ধারণাটি তহার বিতর্কবাদের সেই দিকটির সাথে মিলে যায় যেখানে তহা বলছেন ভাষার অর্থ তার ‘সামাজিক বিধান’ থেকে আসে। উইটগেনস্টাইনের মতে ধারণাসমূহ কোনো একক সংজ্ঞা দ্বারা নয়, বরং কতগুলো পারস্পরিক অতিক্রমণকারী বৈশিষ্ট্যের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ। এটি সেই আলোচনারই ভাষায়তাত্ত্বিক প্রকাশ যা তহা ‘মুনাজারার বহুতান্ত্রিক চরিত্র’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

 

৬. ব্রান্ডমের আদর্শিক যুক্তিবাদ: মুনাজারার জ্ঞানতাত্ত্বিক ন্যায্যতা

৬.১ কেন সংলাপ সত্য উৎপন্ন করে: একটি মৌলিক প্রশ্ন

মুনাজারা পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন হলো: কেন সংলাপ সত্য উৎপন্ন করে? কেউ যদি বলেন, ‘দুটি মানুষের মধ্যে নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সৌহার্দ্য থাকলেই সত্যে পৌঁছানো যায়’—এটি যথেষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক ন্যায্যতা নয়। রবার্ট ব্রান্ডমের আদর্শিক যুক্তিবাদ (Inferentialism) এই প্রশ্নের একটি কঠোর উত্তর প্রদান করে।

ব্রান্ডমের মূল দাবি: একটি বক্তব্য বা দাবি (Claim) তখনই অর্থবহ যখন তা একটি আদর্শিক কাঠামোর (Normative Structure) ভেতরে অবস্থান করে—যেখানে ওই দাবি কতটুকু অন্য দাবিকে সমর্থন করে এবং কতটুকু অন্য দাবির সাথে সংঘর্ষ করে, তা স্পষ্ট। এই কাঠামোটি কোনো একক মনের ভেতরে নেই—এটি সামাজিক।

৬.২ ডিয়ন্টিক স্কোরকিপিং ও মুনাজারার মিলন

ব্রান্ডমের ‘ডিয়ন্টিক স্কোরকিপিং’ (Deontic Scorekeeping) ধারণাটি তহার মুনাজারার কাঠামোর সাথে অভূতপূর্বভাবে মিলে যায়। ব্রান্ডমের মতে, আমরা যখন একটি সংলাপে অংশ নিই, তখন আমরা পরস্পরের ‘স্কোর’ রাখি—কে কোন দাবি করেছে, কোন দাবির জন্য কোন প্রমাণ দিয়েছে, কোন দাবি কোন অঙ্গীকারকে বহন করে।

এই স্কোরকিপিং প্রক্রিয়া তহার সেই বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে তিনি বলেছেন: “যে পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে যুক্তি প্রদানের বিশুদ্ধতা নিরূপণ হয়—কিন্তু যা একইসঙ্গে দাবিকারী ব্যক্তির অর্জন করার সম্ভাবনা দ্বারা ঠিক হয়। যখন দুইটি পক্ষ বিতর্কের মাধ্যমে অপরকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সক্ষম হয়।” এটি হুবহু ব্রান্ডমের সেই ‘গেম অব গিভিং অ্যান্ড আস্কিং ফর রিজনস’ (Game of Giving and Asking for Reasons)।

ব্রান্ডমের কাছে সত্য কোনো একক চিন্তাশীল সত্তার ভেতরে পূর্বে-প্রস্তুত নয়; এটি সামাজিক আদর্শিক প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত। এই কারণেই সংলাপ কেবল একটি যোগাযোগ-মাধ্যম নয়, এটি নিজেই একটি জ্ঞান-উৎপাদনী প্রক্রিয়া।

৬.৩ বাংলা অনুমান-ভিত্তিক যুক্তিবাদের সম্ভাবনা

ব্রান্ডম ও তহার এই সংযোগ থেকে বাংলা দার্শনিক ঐতিহ্যে একটি ‘অনুমান-ভিত্তিক যুক্তিবাদ’ (Bangla Inferentialism) গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ইসলামি কালামশাস্ত্রে ‘বাহাস’ বা তর্কশাস্ত্রের যে ঐতিহ্য রয়েছে—বিশেষ করে মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর মতো পণ্ডিতদের সামাজিক বাহাস পদ্ধতিতে—সেখানে এই ধরনের আদর্শিক স্কোরকিপিং প্রক্রিয়া অন্তর্নিহিতভাবে বিদ্যমান ছিল। সমস্যা হলো এই ঐতিহ্য কখনো দার্শনিকভাবে তাত্ত্বিকীকৃত হয়নি।

 

৭. মোশাহাদা: সাক্ষ্য-ভিত্তিক জ্ঞানতত্ত্বের একটি প্রস্তাবনা

বোরহানি জ্ঞানতত্ত্বে জ্ঞান হলো একটি যুক্তিশৃঙ্খলের শেষ বিন্দু। এর বিপরীতে আমরা প্রস্তাব করি ‘মোশাহাদা’ (المشاهدة)-ভিত্তিক জ্ঞানতত্ত্ব, যা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ও পারস্পরিক সাক্ষ্যদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কেবল রহস্যবাদী অভিজ্ঞতার কথা নয়—এটি একটি দার্শনিক দাবি।

‘মোশাহাদা’ শব্দটি আরবি ‘শ-হ-দ’ ধাতু থেকে উদ্গত, যা ‘শাহাদাহ’ বা একমুখী সাক্ষ্যদান থেকে আলাদা। মোশাহাদায় পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষিত উভয়ই সক্রিয়—এটি একটি দ্বিমুখী বা পারস্পরিক প্রক্রিয়া। এটি তহার সেই আলোচনার সাথে সংগতিপূর্ণ যেখানে তিনি বলেছেন সংলাপে তার্কিক ব্যক্তিকে ‘নিজের মধ্যে অপরকে উপলব্ধি করতে সক্ষম’ হতে হবে।

জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে মোশাহাদার দাবি হলো: কিছু ধরনের সত্য কেবল প্রত্যক্ষ মুখোমুখি সম্পর্কের মাধ্যমে জানা যায়—শুধু যুক্তিশৃঙ্খলের মাধ্যমে নয়। নৈতিক সত্য, সৌন্দর্য, কষ্ট—এগুলো বোরহানি প্রমাণের মাধ্যমে জানা যায় না; এগুলো সাক্ষ্যদানের সম্পর্কে জানা যায়। এই দার্শনিক অবস্থান পাশ্চাত্য ঐতিহ্যে ‘সেকেন্ড-পার্সন পার্সপেক্টিভ’ নামে আলোচিত—স্টিফেন দারওয়াল যা ‘Second-Person Standpoint’ বলেছেন তার সাথে মোশাহাদার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলা ইসলামি সুফী সাহিত্যে মোশাহাদার ধারণা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আলাওলের কাব্যে পার্থিব প্রেম ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সংযোগে এই দ্বিমুখী দৃষ্টিবিনিময়ের চিত্র রয়েছে; সৈয়দ সুলতানের নবী বংশে ঐতিহাসিক মুনাজারার মাধ্যমে সত্য অন্বেষণের প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু এই ঐতিহ্যকে কেবল ‘সুন্দর কাব্য’ বলে গ্রহণ করা দার্শনিক দায়িত্বহীনতা হবে—এটিকে তাত্ত্বিকীকরণ প্রয়োজন।

 

৮. বাংলা ইসলামি ঐতিহ্য: একটি সমালোচনামূলক পুনরাবিষ্কার

৮.১ সংলাপমূলক ঐতিহ্যের বাস্তব শক্তি

বাংলার ইসলামি সাহিত্যিক ঐতিহ্যে সংলাপ পদ্ধতির একটি সমৃদ্ধ উপস্থিতি আছে বটে। মধ্যযুগীয় বাংলা সুফী সাহিত্যে বিভিন্ন ধর্মীয় পরিভাষাসমূহের আন্তঃসাংস্কৃতিক নেগোশিয়েশন—নাথ সাহিত্যের কায়া-সাধনের পরিভাষা ইসলামি রূহানি ব্যাখ্যার সাথে যুক্ত হওয়া—এটি কোনো নির্দোষ সমন্বয় নয়, বরং একটি সক্রিয় জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা প্রক্রিয়া যা ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞান-ঐতিহ্যকে মুখোমুখি বসিয়েছে।

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর ‘বাহাস’ ঐতিহ্য এই দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঊনিশ ও বিশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের সাথে তাঁর বিতর্কসমূহ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না—এগুলো ঔপনিবেশিক আধুনিকতার জ্ঞান-কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি যুক্তিবাদী প্রতিরোধ, যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক মর্যাদা রক্ষা করা হয়েছিল।

৮.২ ঐতিহ্যের ভেতরকার উত্তেজনা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

কিন্তু এই ঐতিহ্যকে অতিরোমান্টিক দৃষ্টিতে দেখা বৌদ্ধিক সততার বিরুদ্ধে যায়। বাংলার সুফী ও ইসলামি ঐতিহ্যে সংলাপ সর্বদা সমতাভিত্তিক ছিল না। ‘আদব’ বা শিষ্টাচারের যে কাঠামো গুরু-শিষ্য সম্পর্কে বিদ্যমান ছিল, তা অনেক সময় অধিক ক্ষমতাশালী পক্ষের বয়ানকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এবং আনুগত্যের সংস্কৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব ইসলামি মাদ্রাসা শিক্ষায় ঐতিহাসিকভাবে অমীমাংসিত।

এছাড়াও অর্থোডক্সি ও হেটেরোডক্সির মধ্যকার উত্তেজনা—যেমন বাউল-সুফী ‘মারেফতি’ ঐতিহ্য যখন ফিকহপন্থীদের দ্বারা বিদাহ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে—এটি বলে দেয় যে বাংলার সংলাপী ঐতিহ্য কোনো নির্বিরোধ আদর্শলোক ছিল না। একটি সৎ দার্শনিক প্রকল্পকে এই উত্তেজনাগুলো স্বীকার করতে হবে।

৮.৩ ঐতিহ্য থেকে যা গ্রহণযোগ্য: সংলাপের ব্যাকরণ

এই সমালোচনার পরেও বলা যায়, বাংলার ইসলামি ঐতিহ্যে কিছু দার্শনিক রত্ন আছে যা আধুনিক সংলাপ-তত্ত্বের সাথে সংলগ্ন করা সম্ভব। ‘নিয়াত’ বা সংকল্পের ধারণাটি—যা কেবল ধর্মীয় আচারের নয়, বরং প্রতিটি ভাষিক কার্যক্রমের পূর্বশর্ত—এটি এইচ.পি. গ্রাইসের ‘কোঅপারেটিভ প্রিন্সিপল’-এর সাথে যুক্ত করে বাংলা ভাষাদর্শনের একটি মৌলিক নীতিমালা তৈরি করা যায়। ‘সোহবত’ বা নৈকট্যের ধারণাটি উইটগেনস্টাইনের ‘জীবনের ধরন’ (Form of Life)-এর সাথে সংলগ্ন—কারণ কোনো ভাষা-খেলা একটি নির্দিষ্ট সোহবত বা সামাজিক সহাবস্থান ছাড়া গড়ে ওঠে না।

 

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

আবদুর রহমান ২০০০ || তহা আবদুর রহমান। ফী উসুলিল হিওয়ার ওয়া তাজদিদি ইলম আল-কালাম। বৈরুত: আল-মারকায আস-সাকাফি আল-আরাবি, ১৯৮৭।

ইমেরেন ও গ্রুটেনডর্স্ট ১৯৮৩ || Frans H. van Eemeren and Rob Grootendorst, Speech Acts in Argumentative Discussions: A Theoretical Model for the Analysis of Discussions Directed Towards Solving Conflicts of Opinion, Dordrecht: Foris Publications।

গ্যোডেল ও হান ২০২৪ || Kurt Gödel and Hans Hahn, Mathematical Logic in Vienna, Vienna Circle Institute Library 13, Cham: Springer Nature Switzerland AG, 2024।

তাশকুবরা যাদাহ ২০১২ || এসামুদ্দীন আবুল খয়ের তাশকুবরা যাদাহ, রিসালাতুল আদাব ফী ইলমি আদাবিল বাহসি ওয়াল মুনাজারাহ, দারুজ জাহেরিইয়াহ, কুয়েত।

সামারকান্দী ২০২০ || শামসুদ্দীন সামারকান্দী, কিস্তাস আল-আফকার ফি আল-মানতিক, তাহকিক ও তাসহিহ: ইস্তিদলালি ফালাহি, তেহরান: মুআস্সাসা-ই পাঝুহিশি-ই হিকমত ওয়া ফালসাফা-ই ইরান, ১ম সংস্করণ, ১৩৯৯ শ./২০২০ খ্রি.

সার্ল ১৯৬৯ || John R. Searle, Speech Acts: An Essay in the Philosophy of Language, Cambridge: Cambridge University Press, 1969.

সোঁস্যুর ১৯৫৯ || Ferdinand de Saussure, Course in General Linguistics, trans. Wade Baskin, New York: Philosophical Library।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments