দর্শন ও বিশ্বাসের সন্ধিক্ষণে : ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্বের একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা

ইবনে খালদুন (১৩৩২–১৪০৬ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামী বৌদ্ধিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী মনীষী ও অগ্রসর চিন্তাবিদ হিসেবে সমাধিক পরিচিত। তাঁকে প্রায়শই সমাজবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, কারণ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা-তে সামাজিক সংগঠন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চার পদ্ধতিগত ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ইবনে খালদুন তাঁর যুগের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে মানব সভ্যতার উত্থান-পতন, রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর অন্তঃস্থ জটিল প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক শক্তির বিন্যাস এবং মনস্তত্ত্বের অন্তর্নিহিত প্রভাবসমূহকে ব্যাখ্যা করেছেন, যা আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক গৌরবময় পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

তাঁর চিন্তাভাবনার বিস্তৃত পরিসরের এক বিশেষ দিক হলো সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক তাঁর দার্শনিক মতবাদ। ইবনে খালদুন তাঁর আল-মুকাদ্দিমা-তে বিশ্বজগতের বিকাশপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের উপাদানগুলোকে একসূত্রে গেঁথে একটি ক্রমবিকাশমূলক ধারা উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুসারে, সৃষ্টিজগতের বিকাশধারা খনিজ পদার্থ থেকে শুরু হয়ে উদ্ভিদ জগতে অগ্রসর হয়; সেখান থেকে প্রাণীজগৎ ও অবশেষে মানুষের দিকে ক্রমান্বয়ে উন্নীত হয়। এই গ্রেডেড ক্রিয়েশন থিওরি বা ধাপে ধাপে সৃষ্টির ধারণায় গ্রিক দার্শনিকদের মতবাদ বিশেষত অ্যারিস্টটল ও নব্য-প্লেটোনীয় চিন্তাধারার  প্রভাব  সুস্পষ্টত লক্ষ  করা যায় ।

যদিও ইবনে খালদুনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর যুগের তুলনায় অত্যন্ত আধুনিক, বিশ্লেষণাত্মক ও বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে স্বীকৃত, তথাপি ইসলামী আকীদার আলোকে এর কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির বর্ণনা সরাসরি আল্লাহর আদেশে সংঘটিত—যেখানে কোনো মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক বিকাশ বা বিবর্তন প্রক্রিয়ার স্থান নেই।

উল্লেখ্য যে, এ প্রবন্ধে আমরা ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্বকে একটি সমালোচনামূলক ও তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করব যে, কীভাবে এই তত্ত্ব ইসলামী আকীদার মূলনীতি, বিশেষত হযরত আদম (আ.)-এর সরাসরি সৃষ্টির বিশ্বাসের সাথে বিরোধ  তৈরি করে এবং একইসঙ্গে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক চিন্তাধারার সুস্পষ্ট প্রভাব বহন করে।

 

ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্ব

এই উদ্ধৃতিগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইবনে খালদুনের দৃষ্টিতে সৃষ্টিজগৎ একটি ঊর্ধ্বমুখী অস্তিত্বের শৃঙ্খল (Great Chain of Being) হিসেবে বিন্যস্ত, যেখানে প্রতিটি স্তর জটিলতা, গঠন ও ক্ষমতার দিক থেকে পূর্ববর্তী স্তরের চেয়ে উন্নততর। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রাণীজগৎ ও মানবজাতির মধ্যে ‘বানর সদৃশ’ জীব একটি সংযোগসূত্র হিসেবে বিবেচিত, যা মানবজাতির প্রাকৃতিক পর্যায়ক্রমিক উত্থানের ধারণাকে প্রতিফলিত করে।

তবে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, ইবনে খালদুন এই তত্ত্বকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক বিবর্তনততত্ত্বের মতো রূপে উপস্থাপন করেননি। বরং এটি ছিল তাঁর দার্শনিক পর্যবেক্ষণ ও প্রাকৃতিক জগতের স্তরবিন্যাসকে ব্যাখ্যা করার বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ছিল ‘তাকউইন’ বা সৃষ্টিজগতের অন্তর্গত নিয়মতান্ত্রিক ক্রমোন্নতির একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা, যা প্রাচীন গ্রিক দর্শন, বিশেষত নব্য-প্লেটোনীয় Scala Naturae বা Great Chain of Being-এর চিন্তাধারার প্রভাবকে স্পষ্ট করে।

ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্ব একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে প্রাকৃতিক দর্শনচর্চার এক অনবদ্য নিদর্শন, অন্যদিকে ইসলামী আকীদার মৌলিক বিশ্বাস—বিশেষত হযরত আদম (আ.)-এর সরাসরি সৃষ্টির প্রামাণ্য বর্ণনার সাথে কিছুটা মতবিরোধও সৃষ্টি করে। এজন্য বহু ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসবিজ্ঞান সংক্রান্ত তত্ত্বসমূহকে বিপুলভাবে সমাদৃত করলেও, তাঁর সৃষ্টিতত্ত্বকে সাধারণত সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে থাকেন।

 

ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্বে  গ্রিক দর্শনের প্রভাব 

ইবনে খালদুন সৃষ্টিজগতকে এক অবিচ্ছিন্ন, আন্তঃসংলগ্ন ও স্তরবিন্যস্ত সত্তারূপে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুসারে জড়পদার্থ, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণীজগৎ এবং মানবজাতি—এই চারটি স্তর পরস্পরসম্পর্কিত এবং স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের ধারায় যুক্ত।

এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন :

نرى هذا العالم متّصلاً بعضه ببعضه، متدرّجاً في التكوين من المعدن إلى النبات إلى الحيوان إلى الإنسان 

“আমরা দেখি এই জগৎ একে অপরের সাথে সংযুক্ত, ক্রমান্বয়ে গঠিত—ধাতু থেকে উদ্ভিদ, উদ্ভিদ থেকে প্রাণী, প্রাণী থেকে মানুষ পর্যন্ত।”[1]ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، بيروت، 2005، ص. 85 تقريباً

এরপর তিনি পুরো সৃষ্টিজগতকে এক ধাপে ধাপে সংযুক্ত কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেন :

نرى عالم التكوين كله مؤلفاً من مراحل متصلة يشدّ بعضها بعضاً

“আমরা সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে এক পরস্পরসংলগ্ন ধাপসমূহের ধারাবাহিক গঠন হিসেবে বিবেচনা করি, যেখানে প্রতিটি ধাপ অপরটিকে শক্তভাবে সংযুক্ত ও সহায়তা করে।”[2]ابن خلدون، المقدمة، نفس الصفحة

এরপর প্রাণীজগত ও মানবজাতির সংযোগের কথায় তিনি বলেন :

 يتصل عالم الحيوان بعالم الإنسان من جهة ما هو منحط من الإنسان مثل القردة

“প্রাণীজগৎ মানবজগতের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত, যেখানে মানবসত্তার নিম্নস্তরসমূহে যে সাদৃশ্য বিদ্যমান, তা বিশেষভাবে বানর প্রজাতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।”[3]ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، ص. 85

পরিশেষে তিনি বলেন :

ثم يرتقي عالم الحيوان إلى الإنسان لما فيه من الحس والإدراك 

“তারপর প্রাণীজগৎ উন্নীত হয় মানুষের দিকে, কারণ এতে অনুভূতি ও উপলব্ধিজ্ঞান রয়েছে।”[4]ابن خلدون، نفس المصدر

ইবনে খালদুন এমন এক বৌদ্ধিক পরিসরে জীবনযাপন করেছেন, যা প্রাচীন গ্রিক দর্শনের গভীর ছায়ায় বিকশিত হয়েছিল। প্লেটো, এরিস্টটল এবং নিউ-প্লাটোনিস্ট চিন্তাবিদগণ (যেমন প্লটিনাস) গ্রিক মহাবিশ্বতত্ত্বের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তারই অনুরণন আমরা মধ্যযুগের ইসলামীক দার্শনিক ঐতিহ্যে দেখতে পাই।

“গ্রেট চেইন অব বিইং” (Great Chain of Being) বা scala naturae ধারণাটি প্রাচীন গ্রিক বিশ্ববীক্ষার অন্যতম ভিত্তি। এরিস্টটল তাঁর Historia Animalium এবং Metaphysics-এ জীবজগৎ ও বস্তুজগতকে এক ক্রমধারারূপে বর্ণনা করেন, যেখানে পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ ও দেবতা একটি ঊর্ধ্বমুখী শৃঙ্খলে বিন্যস্ত থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ, আরিস্টটল বলেছেন :

Nature proceeds little by little from things lifeless to animal life in such a way that it is impossible to determine the exact line of demarcation.[5]Aristotle, Historia Animalium, Book VIII, 1, 588b4–5

প্রকৃতি ধাপে ধাপে নির্জীব বস্তুর স্তর অতিক্রম করে প্রাণীর জগতে প্রবেশ করে—এমন প্রক্রিয়ায়, যেখানে জীবিত ও নির্জীবের মধ্যে সুনির্দিষ্ট বিভাজনরেখা নির্ধারণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই ধারণাটিই মধ্যযুগীয় মুসলিম দার্শনিকদের কাছে অনুরূপভাবে আত্মীকৃত হয়। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা (আভিসেনা) এবং ইবনে রুশদ (আভারোয়েস) তাঁদের রচনায় গ্রিক দর্শনের যৌক্তিক কাঠামো ও ইসলামি তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করেন।

ইবনে সিনা তাঁর الشفاء (Kitab al-Shifa’)-তে জগতের ধাপে ধাপে বিকাশের কথা বলেছেন :

إن الوجود كله مرتب من الأدنى إلى الأعلى، متصل لا انفصال فيه

“সমস্ত অস্তিত্ব সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত, সংযুক্ত এবং এতে কোনো  বিচ্ছিন্নতা নেই ।”[6]ইবনে সিনা, আল-শিফা, আল-আমিরিয়া প্রেস, কায়রো, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪২

পাশাপাশি, আধুনিক পশ্চিমা গবেষকরাও ইবনে খালদুনের এই দার্শনিক সমন্বয়কে গ্রিক দর্শনের উত্তরাধিকাররূপে ব্যাখ্যা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, রোজলিন রেগি লিখেছেন :

“Ibn Khaldun’s concept of the chain of beings clearly echoes the Aristotelian and Neoplatonic hierarchy, yet reshapes it in line with Islamic cosmology and divine agency.”[7]Rosalind Regh, Islamic Philosophy and the Classical Heritage, Cambridge University Press, 2002, p. 97

ইবনে খালদুনের সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খল ধারণা স্পষ্টতই এরিস্টটলীয় ও নিউ-প্লাটোনিক স্তরবিন্যাসের প্রতিধ্বনি বহন করে, তবে তিনি এটিকে ইসলামী মহাবিশ্বতত্ত্ব ও ঐশী ইচ্ছাশক্তির (Divine Agency) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নতুনভাবে রূপায়িত করেছেন।

তবে, এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—গ্রিক দর্শনজগৎকে চিরন্তন ও স্বাভাবিক ক্রমধারার অংশ হিসেবে দেখে। এরিস্টটল Metaphysics-এ বলেছেন:

“The world has always existed and will always exist.”[8]Aristotle, Metaphysics, Book XII, 1072b

বিশ্বজগত চিরকাল বিদ্যমান ছিল এবং চিরকাল বিদ্যমান থাকবে।

অন্যদিকে, ইসলামী আকিদাহ মতে সৃষ্টিজগতের প্রতিটি স্তরই নির্দিষ্ট এবং মহা উদ্দেশ্য নিয়ে  আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন।  পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা  ইরশাদ করেন :

 الله خالق كل شيء وهو على كل شيء وكيل

“আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।”[9]القرآن الكريم، سورة الزمر، الآية ٦٢

পাশাপাশি  ইবনে খালদুন স্পষ্টভাবেই এই পার্থক্যটিকে গুরুত্ব দেন। আল-মুকদ্দামা-তে তিনি বারবার আল্লাহর সৃষ্টি ও ইচ্ছার কেন্দ্রীয়তা স্মরণ করিয়ে দেন :

[10]ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، بيروت، 2005، ص. ١١٢ فالله يخلق ما يشاء ويختار

সব মিলিয়ে দেখা যায় ইবনে খালদুনের সৃষ্টিতত্ত্ব একদিকে গ্রিক দর্শনের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার বহন করছে, অপরদিকে ইসলামি তাওহিদি দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ থেকে এক  দার্শনিক ভিত্তি গড়ে  তোলার চেষ্টা করছে। তবে একথা সত্য যে, ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে যেভাবে তিনি  যৌক্তিক বিশ্লেষণাধর্মী আলোচনার নব দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন, তার সৃষ্টি তত্ত্বে এটা অনেকটাই গরহাজির। তিনি গ্রিক দর্শনকে সেই মানদণ্ডে খতিয়ে দেখেননি যেমনটা তিনি ইতিহাস পাঠে প্রয়োগ করেছেন। গ্রিকদের সৃষ্টিতত্ত্বকে  যাচাই-বাছাইয়ের পরিবর্তে তিনি অনুকরণনীতি অবলম্বন করেছেন। তাই আমারা ইবনে খালদুনকে ইসলামি সৃষ্টি তত্ত্ব ও গ্রিক সৃষ্টি তত্ত্ব সমন্বয় সাধনে দোদুল্যমান দেখতে পাই । আর এটাই তাকে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। 

 

আদম (আ.)-এর সৃষ্টির বিষয়ে ইসলামী আকীদা

ইসলামী আকীদা অনুযায়ী মানবজাতির সূচনা কোনো জৈবিক ক্রমবিকাশ বা প্রাকৃতিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফসল নয়; বরং এটি সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সৃষ্টিশক্তির এক অনন্য নিদর্শন। পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় বহু স্থানে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الإِنسَانَ مِن سُلاَلَةٍ مِّن طِينٍ

“অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি।”[11]আল-কুরআন, সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:১২

অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে—

إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসা (আ.)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আ.)-এর দৃষ্টান্তেরই সমতুল্য। তিনি তাঁকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাঁকে বললেন, ‘হও’, ফলে তিনি হয়ে গেলেন।”[12]আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান, ৩:৫৯

এছাড়াও আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট ভাষায় মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টিকে স্বতন্ত্র এবং বিশেষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—

إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن طِينٍ

“যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি মাটি থেকে একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’”[13]সূরা সোয়াদ, ৩৮:৭১

বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে এই বিশ্বাস আরও সুস্পষ্টভাবে রূপায়িত হয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত—

“আল্লাহ সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির মিশ্রণ সংগ্রহ করে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন।”[14]সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, হাদীস : ৬৪৩৩

অন্য এক হাদীসে বর্ণিত—

خَلَقَ اللهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا

“আল্লাহ আদম (আ.)-কে তাঁর (নির্ধারিত) আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত।[15]সহীহ বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস : ৩২২৬

এছাড়া সহীহ হাদীসে স্পষ্ট বর্ণনা আছে যে আল্লাহ সমগ্র পৃথিবীর মাটি থেকে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন :

 إنَّ اللهَ قبضَ قَبضةً من جميعِ الأرضِ فجاء بنو آدمَ على قدرِ الأرضِ…

“আল্লাহ সমস্ত পৃথিবী থেকে মাটির এক মুষ্টি অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং আদম সন্তানের বৈচিত্র্য সেই অনুযায়ী।”[16]সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৬৪৩৩

স্মর্তব্য যে এই দার্শনিক কাঠামো ইবনে সিনা (আভিসেনা), আল-ফারাবি, ইবনে রুশদ (আভারোয়েস)-এর লেখাতেও দৃশ্যমান। তবে ইসলামী আকীদা সরাসরি আল্লাহর ওহীভিত্তিক ব্যাখ্যাকেই সর্বোচ্চ স্থান দেয়:

 أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ

“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি অতিশয় সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ।”[17]আল-কুরআন, সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৪

ইবনে খালদুনের “বানর সদৃশ” স্তরবিন্যাসের ধারণা যদি কোনো প্রেক্ষাপটে ভুলভাবে উপস্থাপিত বা ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা সহজেই আধুনিক জৈবিক বিবর্তনবাদের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। অথচ ইসলামী তাফসীর ও আকীদা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে মানবজাতি কোনো প্রাকৃতিক ক্রমবিকাশের ফল নয়; বরং এটি পরম স্রষ্টা আল্লাহর সরাসরি ইচ্ছা ও আদেশের মাধ্যমে বিশেষভাবে সৃষ্ট। ইমাম আন নববী (রহ.) বলেন:

 يجب الإيمان بأن آدم خلقه الله بيده من تراب ولم يتطور من مخلوق آخر

“একথার উপর ইমান আনা জরুরি যে  আদম (আ.)-এর সৃষ্টি আল্লাহ নিজ হাতে করেছেন এবং তিনি অন্য কোনো সৃষ্টিরূপ থেকে বিকশিত হননি।”[18]শরহ সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী, دار الفكر، بيروت، ج ১৮، ص. ৮৫

 

বিশ্বাসগত তাৎপর্য

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আদম (আ.)-এর এ সৃষ্টিই মানবজাতিকে অন্য সৃষ্টিরূপের তুলনায় এক অনন্য মর্যাদা প্রদান করে। পবিত্র কুরআনে মানবজাতিকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

“আমি আদম সন্তানের প্রতি মর্যাদা দান করেছি।”[19]সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০

ইসলামী আকীদা অনুযায়ী মানবজাতি কোনো বিবর্তনের ফল নয়; বরং সরাসরি মহান স্রষ্টার স্বতন্ত্র ও উদ্দেশ্যপূর্ণ সৃষ্টির ফলাফল। এ কারণেই মানবজীবনের লক্ষ্য, অর্থ ও দায়িত্ব অন্য সব সৃষ্টিরূপ থেকে ভিন্ন। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে মুসলিম সভ্যতা জৈবিক বা বস্তুবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে মানুষের আত্মিক মর্যাদা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়।

ইসলামী বিশ্বদৃষ্টিতে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ঘটনা মানবজাতির পরিচয় ও স্বকীয়তা নির্মাণের মূল ভিত্তি। এই বিশ্বাসকে অস্বীকার করে কোনো বিবর্তনমূলক তত্ত্ব গ্রহণ ইসলামী আকীদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ আদম (আ.)-এর সরাসরি সৃষ্টি মানবজাতির অনন্য মর্যাদা ও খিলাফত দায়িত্বশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

 

ইবনে খালদুনের দার্শনিক বিভ্রান্তি

ইবনে খালদুনের ধাপে ধাপে সৃষ্টির ধারণা, যা তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মুকাদ্দিমায় উল্লেখ করেছেন, তা মধ্যযুগীয় ইসলামী দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। এই ধারণাটি মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে একটি ক্রমিক ও ধাপে ধাপে বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে, যা তৎকালীন গ্রিক দর্শন এবং প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণের প্রভাব বহন করে। তবে, ইসলামী আকীদা বা বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করলে এই ধারণাটি কিছু দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিভ্রান্তি বা সমস্যার জন্ম দেয়। নিচে এই বিষয়গুলো পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা  হলো:

১. আদম (আ.)-এর সরাসরি সৃষ্টির অবহেলা

ইসলামী আকীদার মৌলিক বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রথম পিতা আদম (আ.)-কে সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, যেমনটি কুরআনে বর্ণিত আছে : “নিশ্চয়ই তোমাদের রব তিনি, যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন” [20]সূরা হুদ : ৬১। এছাড়াও, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে [21]যেমন, সূরা সাজদা : ৭-৯ আদম (আ.)-এর সৃষ্টির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আল্লাহর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও আদেশের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টি সম্পন্ন হয়েছে। ইবনে খালদুনের তত্ত্বে, তিনি মানুষের সৃষ্টিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রকৃতির বিভিন্ন স্তর (যেমন খনিজ, উদ্ভিদ, প্রাণী) থেকে ক্রমান্বয়ে মানুষের উদ্ভব ঘটেছে বলে মনে করা যায়। কিন্তু ‍মুকাদ্দিমার এই বর্ণনায় আদম (আ.)-এর সরাসরি সৃষ্টির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, যা ইসলামী বিশ্বাসের মৌলিক দিকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই অস্পষ্টতা ইসলামী আকীদার দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কারণ এটি কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনার পরিবর্তে দার্শনিক কল্পনাকে প্রাধান্য দেয়।

২. দার্শনিক চিন্তার প্রতি অগ্রাধিকার

ইবনে খালদুনের ধারণাটি গ্রিক দর্শন, বিশেষ করে অ্যারিস্টটলীয় এবং নিওপ্ল্যাটোনিক চিন্তাধারার প্রভাব বহন করে। তিনি সৃষ্টির ধারণায় প্রকৃতির ক্রমবিকাশ এবং স্তরবিন্যাসের ধারণা ব্যবহার করেছেন, যা গ্রিক দার্শনিকদের ‘গ্রেট চেইন অফ বিয়িং’ (Great Chain of Being)-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন হিসেবে দেখা হয়, যেখানে নিম্নতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে উত্তরণ ঘটে। ইসলামী আকীদায়, কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনা দার্শনিক কল্পনা-জল্পনার পরিবর্তে সরাসরি ঐশী আদেশ ও সৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনি যখন কোনো কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি কেবল বলেন, ‘হও!’ ফলে তা হয়ে যায়”[22]সূরা ইয়াসিন: ৮২। ইবনে খালদুনের তত্ত্বে এই ঐশী সরলতার পরিবর্তে দার্শনিক জটিলতা ও প্রকৃতিগত ক্রমবিকাশের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। 

৩. সম্ভাব্য ভুল ব্যাখ্যা ও জৈবিক বিবর্তনের সঙ্গে সাদৃশ্য

ইবনে খালদুনের বর্ণনায় মানুষের সৃষ্টির পূর্বে একটি “বানর সদৃশ” প্রাণীর অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে, যা তিনি প্রকৃতির ক্রমবিকাশের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ধারণাটি আধুনিক জৈবিক বিবর্তনবাদের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, ইবনে খালদুনের সময়ে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের ধারণা প্রচলিত ছিল না। তবুও, তাঁর এই বর্ণনা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হলে, এটি ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে গণ্য হতে পারে। ইসলামী আকীদায়, মানুষের সৃষ্টি একটি স্বতন্ত্র ও আল্লাহপ্রদত্ত  কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে আদম (আ.)-কে আল্লাহ সরাসরি সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর মধ্যে তাঁর রূহ সঞ্চার করেছেন [23]সূরা সাজদা : ৯। ইবনে খালদুনের “বানর সদৃশ” ধারণাটি যদি বিবর্তনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে এটি ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, কারণ বিবর্তনবাদ ইসলামী পণ্ডিতদের মতে কুরআনের  সৃষ্টির ধারণার সাথে  সরাসরি  সাংঘর্ষিক। 

৪. বর্ণনামূলক প্রমাণের সাথে সংঘাত

কুরআন ও সুন্নাহ মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির বিষয়ে বলা হয়েছে : “যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি মাটি থেকে একটি মানুষ সৃষ্টি করব’[24]সূরা সাদ : ৭১। এছাড়াও, হাদীসে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, যেমন সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহ আদম (আ.)-কে তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। ইবনে খালদুনের ধাপে ধাপে সৃষ্টির ধারণা এই সরাসরি সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ তিনি মানুষের উদ্ভবকে প্রকৃতির একটি ক্রমিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখেছেন। এই ধারণাটি কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে, কিছু ইসলামী পণ্ডিত এই তত্ত্বকে কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করেন।

 

ইসলামী পণ্ডিতদের দৃষ্টিভঙ্গি

অনেক মুসলিম বিদ্বান ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক অবদানের যথাযথ প্রশংসা করেন, তবে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়গুলোতে তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্ধভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ (১৯০৮–২০০২) ইবনে খালদুনের ইতিহাসচর্চার পদ্ধতিগত বৈপ্লবিকতা ও সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি তাঁর দার্শনিক ব্যাখ্যার সীমারেখা স্পষ্ট করেছেন :

 “Ibn Khaldun’s historiographical and sociological method was pioneering for his time, yet his metaphysical views often contain philosophical speculation that may at times conflict with core Islamic teachings.”[25]Muhammad Hamidullah, The Muslim Conduct of State, Lahore: Sh. Muhammad Ashraf, 1974, p. 75

ইবনে খালদুনের ইতিহাস-গবেষণা ও সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি তাঁর সময়ের জন্য অগ্রগামী ছিল, তবে তাঁর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায়ই এমন দার্শনিক অনুমান বিদ্যমান, যা কখনো কখনো ইসলামী মৌলিক শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

হামিদুল্লাহর বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের ধাপে ধাপে বিকাশের ধারণা সরাসরি ওহীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী ড. ফজলুর রহমান (১৯১৯–১৯৮৮) ইবনে খালদুনের দর্শনচর্চাকে ইসলামী বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু তিনি গ্রিক দর্শনের প্রভাবের জটিলতাও নির্দেশ করেছেন :

“Ibn Khaldun’s philosophical synthesis is unique in the Islamic tradition. However, in absorbing Greek metaphysics, he illustrates the tension between revealed truths and rational inquiry.”[26]Fazlur Rahman, Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition, University of Chicago Press, 1982, p. 42

ইবনে খালদুনের দার্শনিক সমন্বয় ইসলামী বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে অনন্য; তবে গ্রিক মেটাফিজিক্স বা বিশ্বতত্ত্ব ধারণাকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তিনি ওহীর সত্যের সঙ্গে যুক্তিগত অনুসন্ধানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

তিনি মনে করেন, ইবনে খালদুন প্রাকৃতিক ক্রমবিকাশের ধারণা ব্যবহার করে ওহীর স্পষ্ট সৃষ্টিতত্ত্বকে যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বরং আরো জটিলতা তৈরি করেছেন।

আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবী সৈয়দ হোসেন নাসর  Islamic Cosmological Doctrines গ্রন্থে লিখেছেন—

“While Ibn Khaldun’s Muqaddimah remains a classic, his occasional allusions to a chain of beings bordering on evolution must be read cautiously within the larger Islamic cosmological context.”[27]Seyyed Hossein Nasr, Islamic Cosmological Doctrines, London: Thames & Hudson, 1978, p. 184

যদিও ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমা এক অমর ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত, তবুও তাঁর সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খল সংক্রান্ত প্রসঙ্গসমূহ—যা আংশিকভাবে বিবর্তন-সাদৃশ্য ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ—তা বৃহত্তর ইসলামী বিশ্বতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের আলোকে সতর্কতার সঙ্গে পাঠ করা আবশ্যক।

একইভাবে, আরব পণ্ডিত الدكتور فتحي الدريني তাঁর أصول الفقه الإسلامي গ্রন্থে বলেন—

إن ابن خلدون رغم عبقريته في الاجتماع، قد يتجاوز أحياناً حدود الاعتقاد الأصيل عندما يفسر الكون تفسيراً فلسفياً متصلاً بسلسلة الوجود

ইবনে খালদুন, যদিও সমাজতত্ত্বে একজন অসাধারণ প্রতিভা, তবুও কখনো কখনো তিনি সৃষ্টিজগতকে একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সৃষ্টির শৃঙ্খল’ ধারণার সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মৌলিক ইসলামী বিশ্বাসের সীমারেখাকে কখনো কখনো অতিক্রম করে ফেলেন।[28]الدريني، أصول الفقه الإسلامي، دار القلم، دمشق، 1996، ص. ٣٢١

স্কলারদের এই মূল্যায়নগুলো একথা  নির্দেশ করে যে ইবনে খালদুনের দার্শনিক যুক্তি ও গ্রিক দর্শনের প্রভাব ছিল তাঁর সময়ের বৌদ্ধিক পরিবেশেরই অংশ। তিনি মুসলিম দার্শনিক আল-ফারাবি, ইবনে সিনা (আভিসেনা), ইবনে রুশদ (আভারোয়েস)-এর ধারা থেকে বহু বিষয় উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করেছিলেন। তবে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই দর্শন ও ওহীর মধ্যে ফারাক বজায় রাখা অত্যাবশ্যক। কারণ, কুরআন বারবার মানবজাতির বিশেষ মর্যাদা ও সরাসরি সৃষ্টিকে গুরুত্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছে :

 وَلَقَدْ خَلَقْنَا الإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

“আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।”[29]আল-কুরআন, সূরা আত-তীন, ৯৫:৪

সুতরাং, ইবনে খালদুনের বুদ্ধিবৃত্তিক কীর্তি, বিশেষত তাঁর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও ইতিহাসবোধ, মুসলিম জগতে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে। তাঁর আল-মুকাদ্দিমা কেবল ইতিহাসচর্চার জন্যই নয়, মানুষের সামাজিক গঠন, অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণার জটিলতা বোঝার ক্ষেত্রে অমূল্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিতত্ত্ব, যা ধাপে ধাপে সৃষ্টির ধারণার ওপর নির্ভর করে এবং প্রাচীন গ্রিক দর্শনের প্রভাব বহন করে, ইসলামী আকীদার আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদ্রেক করে।

যেমন দেখা গেছে, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মানবজাতির সৃষ্টিকে সরাসরি আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার ফলাফল হিসেবে ঘোষণা করে, যেখানে কোনো মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক বিবর্তন বা ক্রমিক বিকাশের স্থান নেই। ইবনে খালদুনের পর্যবেক্ষণমূলক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা যদিও তাঁর সময়ের জন্য প্রগতিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ, তবুও তা সরাসরি ওহীভিত্তিক সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে সর্বাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম পণ্ডিতদের পরামর্শ হলো—ইবনে খালদুনের সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দিকগুলোকে যথাযথ মর্যাদা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টি দিয়ে অধ্যয়ন করতে হবে, তবে তাঁর দার্শনিক সৃষ্টিতত্ত্বকে অবশ্যই ইসলামী বিশ্বাসের মূলনীতির আলোকে যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, ইবনে খালদুন ছিলেন ইসলামী জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি দর্শন ও বিশ্বাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন। তাঁর দার্শনিক বিভ্রান্তিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ওহীর আলো ছাড়া মানববুদ্ধি সর্বদা সীমিত, আর ঈমানই মানুষের চিন্তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। সুতরাং, মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজের কর্তব্য হলো—ইবনে খালদুনের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামী আকীদার মূল ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে তাঁর তত্ত্বগুলোর প্রাসঙ্গিক সমালোচনা করা এবং প্রয়োজনে সংশোধিত দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করা।

 

রেফারেন্স :

  1. Ibn Khaldun. Al-Muqaddimah. Beirut: Dar al-Fikr, 2005.
  1. Aristotle. Historia Animalium. Book VIII, 1, 588b4–5.
  1. Aristotle. Metaphysics. Book XII, 1072b.
  1. Ibn Sina (Avicenna). Kitab al-Shifa’. Cairo: Al-Amiriya Press, vol. 1, p. 342.
  1. Qur’an al-Kareem: Surah Az-Zumar (39:62), Surah Al-Mu’minun (23:12), Surah Al-Imran (3:59), Surah Sad (38:71), Surah Al-Isra (17:70), Surah At-Tin (95:4), Surah Al-Mulk (67:14), Surah Hud (11:61), Surah As-Sajdah (32:7-9), Surah Yasin (36:82).
  1. Sahih Muslim. Kitab al-Jannah, Hadith: 6433.
  1. Sahih Bukhari. Kitab al-Anbiya, Hadith: 3226.
  1. Imam An-Nawawi. Sharh Sahih Muslim. Beirut: Dar al-Fikr, vol. 18, p. 85.
  1. Rosalind Regh. Islamic Philosophy and the Classical Heritage. Cambridge: Cambridge University Press, 2002, p. 97.
  1. Muhammad Hamidullah. The Muslim Conduct of State. Lahore: Sh. Muhammad Ashraf, 1974, p. 75.
  1. Fazlur Rahman. Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. Chicago: University of Chicago Press, 1982, p. 42.
  1. Seyyed Hossein Nasr. Islamic Cosmological Doctrines. London: Thames & Hudson, 1978, p. 184.
  1. الدكتور فتحي الدريني. أصول الفقه الإسلامي. دمشق: دار القلم، 1996، ص. 321.

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، بيروت، 2005، ص. 85 تقريباً
2 ابن خلدون، المقدمة، نفس الصفحة
3 ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، ص. 85
4 ابن خلدون، نفس المصدر
5 Aristotle, Historia Animalium, Book VIII, 1, 588b4–5
6 ইবনে সিনা, আল-শিফা, আল-আমিরিয়া প্রেস, কায়রো, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪২
7 Rosalind Regh, Islamic Philosophy and the Classical Heritage, Cambridge University Press, 2002, p. 97
8 Aristotle, Metaphysics, Book XII, 1072b
9 القرآن الكريم، سورة الزمر، الآية ٦٢
10 ابن خلدون، المقدمة، دار الفكر، بيروت، 2005، ص. ١١٢
11 আল-কুরআন, সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:১২
12 আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান, ৩:৫৯
13 সূরা সোয়াদ, ৩৮:৭১
14 সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, হাদীস : ৬৪৩৩
15 সহীহ বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস : ৩২২৬
16 সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৬৪৩৩
17 আল-কুরআন, সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৪
18 শরহ সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী, دار الفكر، بيروت، ج ১৮، ص. ৮৫
19 সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০
20 সূরা হুদ : ৬১
21 যেমন, সূরা সাজদা : ৭-৯
22 সূরা ইয়াসিন: ৮২
23 সূরা সাজদা : ৯
24 সূরা সাদ : ৭১
25 Muhammad Hamidullah, The Muslim Conduct of State, Lahore: Sh. Muhammad Ashraf, 1974, p. 75
26 Fazlur Rahman, Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition, University of Chicago Press, 1982, p. 42
27 Seyyed Hossein Nasr, Islamic Cosmological Doctrines, London: Thames & Hudson, 1978, p. 184
28 الدريني، أصول الفقه الإسلامي، دار القلم، دمشق، 1996، ص. ٣٢١
29 আল-কুরআন, সূরা আত-তীন, ৯৫:৪

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments