তহা আবদুর রহমান : মুজাদ্দিদ ও দার্শনিক (শেষ পর্ব)

মূল : মোহাম্মদ আতেশ

মুহাম্মদ শরিফ

তহা আবদুর রহমান : মুজাদ্দিদ ও দার্শনিক (প্রথম পর্ব)

আধুনিকতার রুহ/আত্মা 

তহা আবদুর রহমানের মৌলিক দার্শনিক প্রকল্পসমূহের অন্যতম হলো আধুনিকতার সংকট বা ‘মডার্নিটি’র স্বরূপ বিশ্লেষণ। আধুনিকতা প্রসঙ্গে বিভিন্ন চিন্তাবিদ যেসব সংজ্ঞা প্রদান করেছেন—যেমন : “এটি একটি অবিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক কালখণ্ড যা পাশ্চাত্যে শুরু হয়ে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছে”, অথবা “যুক্তি, প্রগতি ও স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত উন্নয়ন”, কিংবা “ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ” অথবা “আধুনিকতা মানেই যুক্তিবাদ”—এইসব ব্যাখ্যাকে তিনি অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন। তাঁর মতে, আধুনিকতার মতো ধারণাগুলো অত্যন্ত ফ্লেক্সিবল, তাই এদের কোনো একটি অনড় বা চূড়ান্ত সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা দুঃসাধ্য, ফলত এই ধরনের প্রত্যয়সমূহ অনুধাবন করতে হলে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফিরে যাওয়া অপরিহার্য। আমাদের মতে, আধুনিকতা মূলত একটি ‘সভ্যতার ধরন’ (civilizational style), যার উদ্ভব ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে রেনেসাঁ ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য সমাজে সূচিত হয়েছে। এই সভ্যতার মডেলটি আলোকায়ন (Enlightenment) এবং ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে শিকড় গেড়ে বসার প্রক্রিয়া শুরু করে; পরবর্তীকালে শিল্প ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের হাত ধরে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান যুগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লব একে প্রায় সমগ্র বিশ্বের ওপর আধিপত্য বিস্তারের সক্ষমতা দান করেছে। সুতরাং সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে পাশ্চাত্য সমাজে যে গভীর ও আমূল রূপান্তরসমূহ ঘটেছে, আধুনিকতা হলো মূলত সেই পরিবর্তনগুলোরই এক সামগ্রিক নির্যাস। তবে এই রূপান্তরগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো নিছক পরিবর্তন নয়, বরং এক ধরনের উন্নয়নমূলক ও ক্রমসঞ্চয়ী (cumulative) বিবর্তন, যা পাশ্চাত্য সমাজকে এক সভ্য যুগ থেকে আরো উন্নত ও অগ্রসর সভ্যতার স্তরে উন্নীত করেছে।

আধুনিকতার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো—এই রূপান্তরসমূহ একান্তই ‘অভ্যন্তরীণ’ বা স্বজাত। পাশ্চাত্য তার আপন সত্তা এবং নিজস্ব সমাজের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এই পরিবর্তনগুলো সাধন করেছে। এগুলো তাদের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, কিংবা অন্য কোথাও থেকে ধার করে আনা কোনো ‘আমদানীকৃত’ বিষয়ও নয়। এর অর্থ হলো, আমরা এখানে একটি অভ্যন্তরীণ ও ক্রমসঞ্চয়ী প্রপঞ্চের সম্মুখীন। আর আমরা এই অবস্থাকেই ‘ইবদা’ (ibda’) বা ‘মৌলিক সৃজনশীলতা’ হিসেবে অভিহিত করি। মূলত আধুনিকতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো—এটি পাশ্চাত্য মানুষের উপস্থাপিত মৌলিক ও স্বকীয় সৃষ্টিসমূহের এক সামগ্রিক রূপ। আমাদের অভিমত হলো, আমাদের এই বৈশিষ্ট্যটিকে সর্বজনীন রূপ দান করা প্রয়োজন। আধুনিকতার পরিচয়কে কেবল একটি বিশেষ কালখণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে একে ‘মৌলিক উৎপাদন’ বা সৃজনশীলতার মানদণ্ডে সংজ্ঞায়িত করা উচিত। যদি আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি, তবে সিদ্ধান্ত দাঁড়াবে এই যে—যেখানেই কোনো মৌলিক ও স্বকীয় সৃজনের অস্তিত্ব আছে, সেখানেই আধুনিকতা বিদ্যমান। [1]আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৯৬

বস্তুত তহা আবদুর রহমান মনে করেন যে, বিভিন্ন চিন্তাবিদ আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পদ্ধতিগত (methodological) ভ্রান্তি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। একটি পদ্ধতিগত নীতি হিসেবে কোনো বিষয়ের ‘প্রয়োগ’ (practice) এবং তার ‘রুহ’ বা প্রাণসত্তার (spirit) মধ্যে পার্থক্য করা অপরিহার্য। কোনো বিষয়ের রুহ বা প্রাণসত্তা হলো—সেই বিশেষ মূল্যবোধ ও মূলনীতিসমূহের সমষ্টি, যার বাস্তব রূপায়ণ ও প্রয়োগই হলো ওই বিষয়ের ‘আমল’ বা প্র্যাকটিস। কিন্তু আধুনিকতার সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে এই চিন্তাবিদগণ মূলনীতি এবং সেই নীতির প্রয়োগগত রূপের মধ্যকার সূক্ষ্ম ব্যবধানটি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা আধুনিকতার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য মূলনীতিসমূহকে সেই নীতিগুলোর প্রায়োগিক কাঠামোর সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন।

উদাহরণস্বরূপ, যখন তাঁরা বলেন— “আধুনিকতা হলো আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট”, তখন তাঁরা একটি ‘মূলনীতি’ হিসেবে আধুনিকতাকে আলোকায়নের একটি বিশেষ ও মূর্ত প্রয়োগের সাথে একীভূত করে ফেলেন। অথচ একটি সংজ্ঞায়ন প্রক্রিয়ার নির্ভুলতার জন্য আধুনিকতাকে একটি ‘ঐতিহাসিক আমল’ বা প্র্যাকটিস হিসেবে দেখা এবং একে একটি ‘রুহ’ বা মূল্যবোধ হিসেবে দেখা—এই দুয়ের মাঝে বিভাজন টানা অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ, আধুনিকতার প্রাণসত্তা যে মূলনীতিগুলোর উপর দাঁড়িয়ে, তার প্রয়োগ কেবল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক রূপেই (যেমন পাশ্চাত্য মডার্নিটি) সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

তহা আবদুর রহমান ‘আধুনিকতার রুহ’ প্রত্যয়টিতে ‘রুহ’ শব্দটিকে এমন এক শক্তিসত্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা কোনো বিষয়কে প্রয়োগের দিকে ধাবিত করে এবং আধুনিকতার অবয়বে তাকে বাস্তবতার আঙিনায় মূর্ত করে তোলে।[2]আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফকান লিল-ফিকর, পৃ. ১৪৩ এই বিচারে, ‘আধুনিকতার রুহ’ বলতে সেই সকল মূলনীতি ও মূল্যবোধকে বোঝায়, যা আধুনিকতাকে মানুষের ‘মুদ্রিকা’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের বিমূর্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করে একটি প্রত্যক্ষ ও দৃশ্যমান রূপ দান করে। অর্থাৎ, আধুনিকতার ‘আমল’ বা প্রয়োগ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিতে বিদ্যমান সুশৃঙ্খল তাত্ত্বিক অবধারণা ও সত্যায়নসমূহের (tasdiq) বহির্জাগতিক বাস্তবায়ন মাত্র।

এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এটি স্পষ্ট হয় যে, আধুনিকতার যে ‘পাশ্চাত্য রূপ’ আমরা দেখি, তা মূলত এই ‘রুহ’ বা প্রাণসত্তার অসংখ্য সম্ভাব্য প্রয়োগের মধ্যে একটি বিশেষ প্রয়োগ বা রূপ মাত্র। পাশ্চাত্যের এই নির্দিষ্ট প্রয়োগটির সাথে এমন কিছু স্বতঃসিদ্ধ ধারণা মিশে ছিল, যা মূলত পাশ্চাত্য সমাজের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির দ্বারা নির্ধারিত। উদাহরণস্বরূপ, ‘ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছেদ’ বা সেকুলারিজমকে আধুনিকতার কোনো অপরিহার্য মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা যায় না। কারণ, এই বিচ্ছেদ ছিল তৎকালীন পরিস্থিতির এক অনিবার্য দাবি; গির্জা যখন শাসনব্যবস্থা ও সমাজকে কুক্ষিগত করে জুলুম ও নিপীড়ন শুরু করেছিল, তখন সেই বাস্তব সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতেই রাজনীতিকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা পাশ্চাত্যের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। এমনকি তহা আবদুর রহমান ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে আমরা ধর্ম ও রাজনীতির পুনর্মিলন প্রত্যক্ষ করব। কারণ, এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি আধুনিকতার রুহজাত কোনো মৌলিক নীতি ছিল না, বরং এটি ছিল প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতির দ্বারা আরোপিত একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত।

উপর্যুক্ত সকল পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে তহা আবদুর রহমান এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, আধুনিকতাকে আমাদের কোনো ‘আমল’ বা প্র্যাকটিস হিসেবে নয়, বরং একটি ‘মূল্যবোধ’ (value) হিসেবে গ্রহণ করা আবশ্যক। নিঃসন্দেহে আধুনিকতার পাশ্চাত্য প্রয়োগটি বর্তমানে কার্যকর এবং একে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মুসলিম সমাজও এই পাশ্চাত্য প্রয়োগের সাথে মিথস্ক্রিয়া করছে, তাকে অনুকরণ করছে এবং সেখান থেকে নানা কিছু গ্রহণ করছে। কিন্তু আবদুর রহমান সতর্ক করে বলেন যে, আধুনিকতার এই পাশ্চাত্য প্রয়োগের নিছক অনুকরণ মুসলিমদের সেই কাঙ্ক্ষিত আধুনিকতার মঞ্জিলে পৌঁছাতে সাহায্য করবে না। বরং তাদের উচিত হবে সেই সকল মূলনীতি ও মূল্যবোধের সন্ধান করা, যা আধুনিকতার প্রকৃত ‘রুহ’ বা প্রাণসত্তা গঠন করে—বর্তমান পাশ্চাত্য প্রয়োগ যার একটি খণ্ডচিত্র বা প্রতিফলন মাত্র। আর এই উদ্ভাবনী দৃষ্টির মাধ্যমে ‘আধুনিকতা’ ধারণাটি নানামুখী টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পেয়ে একটি সৃজনশীল ও ফলপ্রসূ রূপ ধারণ করতে পারে।

এই কারণেই তিনি আধুনিকতার সংজ্ঞায়নে সমকালীন চিন্তাবিদদের প্রস্তাবিত ‘র‌্যাশনালিটির নীতি’, ‘সেক্যুলারিজমের নীতি’, ‘ব্যক্তিবাদ’ কিংবা ‘অস্তিত্ববাদী (subjectivity) নীতি’গুলোকে গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন। এর পরিবর্তে তিনি একটি মৌলিক ও স্বকীয় পাঠের (original reading) মাধ্যমে আধুনিকতার রুহের জন্য তিনটি বুনিয়াদি বা গঠনমূলক মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন—যেগুলো তাঁর দাবি অনুযায়ী আধুনিকতার চিন্তাবিদগণও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। এই তিনটি মূলনীতি হলো—রুশদ (পরিপক্বতা/Maturity), নাকদ (সমালোচনা/Critique) ও শুমুল (সর্বব্যাপ্ততা/Comprehensiveness)। 

১. রুশদ বা পরিপক্বতার নীতি : এই নীতির সারকথা হলো—“আধুনিকতার গূঢ় রহস্য নিহিত রয়েছে সাবলকত্ব বা পরনির্ভরশীলতার অবস্থা থেকে ‘রুশদ’ বা পরিপক্কতার স্তরে উত্তরণের মধ্যে।” এই মূলনীতির নির্যাস আমরা কান্টের সেই বিখ্যাত উক্তির মধ্যেও খুঁজে পাই : “নিজেই চিন্তা করো এবং তোমার চিন্তার উপর অন্য কারো অভিভাবকত্ব (guardianship) স্বীকার করো না।”[3]আবদুর রহমান, রুহুল হাদাসা, পৃ. ২৫

এই বুনিয়াদি নীতিটি শর্ত আরোপ করে যে, মানুষকে তার চিন্তা ও আচরণে সকল প্রকার বাহ্যিক অভিভাবকত্ব থেকে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। এই স্বাধীনতা কেবল স্বনির্ভরতাই নয়, বরং এটি ‘ইবদা’ বা মৌলিক সৃজনশীলতারও দাবি রাখে। ‘ইবদা’ হলো এমন এক সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, যা যা আগে ছিল না তা সৃষ্টি করে অথবা যা বিদ্যমান ছিল তাকে এক নতুন মাত্রা দান করে।

তহা আবদুর রহমানের মতে, এই ‘রুশদ’ নীতিটি আধুনিকতার দর্শনের পাশাপাশি ইসলামি প্রায়োগিকতার (Islamic pragmatics) সাথেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। রুশদ বা সাবলকত্ব হলো এক ধরনের মৌলিক ভিত্তি, যা মানুষকে খামতি বা নোকসান থেকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। আর এই নোকসান বা অপূর্ণতা মানেই হলো অন্যের অন্ধ অনুসারী হওয়া। একজন আধুনিক মানুষের কাছে প্রত্যাশা এই যে—তার চিন্তা হবে তার একান্তই নিজস্ব, অন্য কারো কাছ থেকে ধার করা কোনো বিষয় নয়। উম্মাহর যেসব সন্তান আধুনিকতার ‘রুহ’ গ্রহণ না করে কেবল তার ‘আমল’ বা প্র্যাকটিসটুকু গ্রহণ করেছেন, তারা কোনোভাবেই এই রুশদ নীতিটি অর্জন করতে পারেননি। যেহেতু তারা অন্যদের অনুকরণেই তৃপ্ত ছিলেন, তাই তারা এক চিরস্থায়ী পরনির্ভরশীলতা বা অপূর্ণতার ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। রুশদের এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মুসলিমবিশ্বের তথাকথিত আধুনিকতাবাদীদের মাঝে প্রকৃত আধুনিকতার স্ফুরণ ঘটেনি। কারণ তাদের আধুনিকতা হলো ‘মুকাল্লিদ’ বা অনুকরণসর্বস্ব; আর যেখানে অনুকরণ বা ‘তাকলিদ’ বিদ্যমান, সেখানে রুশদ বা পরিপক্বতার কোনো স্থান নেই।

২. নকদ বা সমালোচনা-নীতি : এই নীতির সারমর্ম হলো— ‘এতেকাদ’ বা অন্ধ বিশ্বাসের অবস্থা (প্রমাণহীন বশ্যতা) থেকে ‘ইনতিকাদ’ বা সমালোচনামূলক অবস্থায় উত্তরণ, যেখানে যেকোনো বিষয়কে গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে অকাট্য দলিল বা প্রমাণ দাবি করা হয়। একজন আধুনিক মানুষ প্রমাণ ব্যতিরেকে কোনো কিছুই গ্রহণ করেন না; তাঁর সামনে উপস্থাপিত প্রতিটি বিষয় অবশ্যই যৌক্তিক দলিল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। যদি তিনি দেখেন যে উপস্থাপিত দলিলটি যুক্তির মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে, তবে তিনি তাতে আপত্তি উত্থাপন করেন। তহা আবদুর রহমান এখানে বহুল প্রচলিত ‘আকল’ বা ‘যুক্তি-নীতি’র পরিবর্তে ‘নকদ’ বা ‘সমালোচনা-নীতি’ পরিভাষাটি ব্যবহার করতে পছন্দ করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, ‘সমালোচনা’র ধারণাটি অনেক বেশি ব্যাপক। তাঁর দৃষ্টিতে সমালোচনা কেবল আকল বা যুক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি যুক্তির বাইরের ক্ষেত্রগুলোকেও স্পর্শ করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘নাকলি খবর’ বা পরম্পরাগত তথ্যের মাধ্যমেও সমালোচনা করা সম্ভব।

স্মর্তব্য যে, কান্ট সমালোচনাকে কেবল যৌক্তিক দলিলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলেও একে দর্শনের ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। অন্যদিকে, ইসলামি পণ্ডিতগণ তাঁদের ধ্রুপদী উৎসসমূহে একে ‘এতেরায’ বা ‘আপত্তির নীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে এই নীতির প্রয়োগ অত্যন্ত সুপ্রচলিত ছিল। ইসলামি প্রায়োগিকতায় (pragmatics) কোনো আলোচনার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো—যুক্তি বা আপত্তি উত্থাপন করা। সত্যতা প্রমাণের অকাট্য দলিল পেশ না করা পর্যন্ত একজন ব্যক্তি যেকোনো মতের বিরোধিতা করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। এই সমালোচনামূলক চিন্তার দাবি হলো—মানুষের মধ্যে এমন এক বৌদ্ধিক শক্তি থাকতে হবে, যার মাধ্যমে সে তার নিজের সত্তা, অপর ব্যক্তি এবং তার চারপাশের জাগতিক ব্যবস্থার উপর প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ, এই নীতিতে ‘এতেরায’ বা আপত্তি কোনো সংকীর্ণ সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং তা এক সর্বব্যাপ্ত ও বিস্তৃত পরিসরকে ধারণ করে।[4]আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৩

৩. শুমুল বা সর্বব্যাপ্ততার নীতি : আধুনিকতার বুনিয়াদি মূলনীতিসমূহের অন্যতম হলো ‘শুমুল’ বা সর্বব্যাপ্ততা, যা মূলত সকল জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্রকে ধারণ করা এবং সকল সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক হওয়ার সক্ষমতাকে নির্দেশ করে। আধুনিকতার কর্মপরিধি কেবল একটি বিশেষ ক্ষেত্র বা নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এমনকি এটি যে সমাজে জন্ম নিয়েছে, কেবল সেই সমাজের প্রাচীরের মধ্যেও একে বন্দি করে রাখা অসম্ভব। আধুনিকতার স্বকীয় ‘অভ্যন্তরীণ যুক্তি’ বা ইনার লজিকের দাবিই হলো—এর দিগন্ত ক্রমাগত প্রসারিত হবে এবং তা প্রতিটি সমাজ ও প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিজের অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। বস্তুত বর্তমান বিশ্বের ‘বিশ্বায়ন’ বা গ্লোবালাইজেশনের প্রপঞ্চটির দিকে তাকালে আমরা আধুনিকতার এই সর্বব্যাপ্ত প্রসারের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।

তহা আবদুর রহমানের মতে, পূর্বোক্ত এই তিনটি শিক্ষা বা মূলনীতিই হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর আধুনিকতার সুউচ্চ প্রাসাদ দণ্ডায়মান। এই ভিত্তিকে কেন্দ্র করে এটি দাবি করা সম্ভব যে—আধুনিকতা মূলত মানবেতিহাসের প্রতিটি সমাজেই কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান ছিল। কারণ, এই মূলনীতিসমূহের আলোকে বিনির্মিত অবধারণা অনুযায়ী আধুনিকতা হলো— “মানুষের নিজ সময়ের সাথে এক সচেতন যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়া।” যে জাতিই তার চিন্তা ও কর্মে নিজ সময়ের দাবিগুলোকে নিজস্ব প্রায়োগিকতা বা ‘প্র্যাগমেটিকস’ অনুযায়ী পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে, তারাই প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতাকে করায়ত্ত করেছে।

অতএব, “আধুনিকতা মানেই অতীতের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা”—এই প্রচলিত সিদ্ধান্তটি একটি অসার বা ‘বাতিল’ দাবি বৈ কিছু নয়। এই অর্থে বিচার করলে দেখা যায়, আধুনিকতার যে ‘রুহ’ বা প্রাণসত্তা, তা মানবেতিহাসের পরতে পরতে সর্বদা বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, আধুনিকতা কোনো নির্দিষ্ট যুগের একক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা স্বকীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে ধারণ করে নিজ সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার এক চিরন্তন সৃজনশীল প্রক্রিয়া।

বর্তমানে পাশ্চাত্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার মূল কারণ আধুনিকতার মূলনীতিসমূহ নয়, বরং সেই নীতিগুলোর বিশেষ ‘পাশ্চাত্য ঘরানার প্রয়োগ’। এই কারণে তহা আবদুর রহমান মনে করেন—মুসলিমদের উচিত হবে তাদের নিজস্ব ‘ইসলামি আধুনিকতা’কে পাশ্চাত্য আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণে নয়, বরং আধুনিকতার সেই চিরায়ত রুহ বা মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে বিনির্মাণ করা। অধিকন্তু, এই মূলনীতিসমূহের প্রতি অনুগত থাকলে ইসলামি আধুনিকতার প্রায়োগিক রূপটি পাশ্চাত্য প্রয়োগের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিকও হতে পারে।

ধরা যাক, ইসলামি প্রায়োগিকতা ‘সামষ্টিকতা’ (communalism), ‘আকল ও দ্বীনের অবিচ্ছেদ্যতা’ কিংবা ‘ধর্ম ও রাজনীতির মিলন’ দাবি করছে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য প্রেক্ষাপট দাবি করছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত—অর্থাৎ ‘ব্যক্তিবাদ’, ‘আকল ও দ্বীনের বিচ্ছেদ’ কিংবা ‘ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ’। এমতাবস্থায়, আমরা যদি আধুনিকতার সেই বুনিয়াদি তিনটি নীতির (রুশদ, নাকদ ও শুমুল) উপর অটল থাকি, তবে আমাদের আধুনিকতা কোনো অংশেই পাশ্চাত্যের চেয়ে কম বলে গণ্য হবে না। কারণ, আধুনিকতার প্রকৃত দাবি হলো—নিজস্ব প্রায়োগিক প্রেক্ষাপট থেকে ‘মৌলিক সৃজনশীলতা’ (ibda’) প্রদর্শন করা, অন্য কারো আধুনিকতাকে তার বিশেষ প্রেক্ষাপটসহ হুবহু ধার করে আনা নয়।

আবদুর রহমান অত্যন্ত জোরালোভাবে এই বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন যে—আমাদের দায়বদ্ধতা আধুনিকতার ‘রুহ’ বা প্রাণসত্তার প্রতি, তার কোনো বিশেষ ‘আমল’ বা ঐতিহাসিক রূপের প্রতি নয়। এই রুহ বা প্রাণসত্তাই আমাদের সেই ‘অনুকরণসর্বস্ব আধুনিকতা’ (imitative modernity) থেকে মুক্তি দেবে, যা প্রেক্ষাপটের ভিন্নতাকে তোয়াক্কা না করে স্রেফ পাশ্চাত্য মডেলকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। কোনো একটি রুহ বা প্রাণসত্তার প্রয়োগগত রূপ বিচিত্র ও বহুমুখী হতে পারে; আর প্রয়োগের এই ‘বহুত্ব’ (multiplicity) একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। এমনকি খোদ পাশ্চাত্য আধুনিকতাও কোনো একক বস্তু নয়, বরং তা অনেকগুলো আধুনিকতার সমষ্টি। জার্মান আধুনিকতা তার চিন্তাগত বৈশিষ্ট্যে ব্রিটিশ আধুনিকতা থেকে ভিন্ন; ফরাসি দার্শনিক আধুনিকতা অ্যাংলো-স্যাক্সন আধুনিকতা থেকে স্বতন্ত্র। তেমনি জাপানি শিল্প-আধুনিকতা কিংবা ভারতীয় আধুনিকতার স্বকীয়তাও সুস্পষ্ট। আর রাজনৈতিক আধুনিকতাবাদের মধ্যকার প্রকট ভিন্নতা তো বলাই বাহুল্য।[5]আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৪

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আধুনিকতা মূলত ‘আসর’ বা যুগের রুহ বৈ কিছু নয়। এর অর্থ হলো—মানুষের মধ্যে তার নিজ যুগের দাবি ও প্রয়োজনসমূহের সাথে তাল মিলিয়ে চলার এক সক্রিয় সদিচ্ছা বিদ্যমান থাকা। অর্থাৎ, মানুষকে তার নিজের সময়ের সাথে একীভূত হতে হবে, অন্যের সময়ের সাথে নয়। কেননা আধুনিকতার যে ‘আমল’ বা প্র্যাকটিস, তা কোনো একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালখণ্ডের প্রাচীরে বন্দি থাকতে নারাজ; বরং অতীতের গভীরে যেমন এর শিকড় প্রোথিত, তেমনি ভবিষ্যতের দিগন্তেও এর বিস্তৃতি বিদ্যমান। তহা আবদুর রহমান ‘ফিকহ শাস্ত্রের’ (usul al-fiqh) পরিভাষা ব্যবহার করে এই মথিত বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন : “আধুনিকতার রুহ নিহিত রয়েছে নিজ সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের আত্মপ্রকাশ এবং তার ‘মুবদি’ (সৃজনকারী) হওয়ার সামর্থ্যের মধ্যে। এই সৃজনশীলতা হতে হবে মৌলিক ও নান্দনিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ। আমি যদি বলি যে—আধুনিকতা, যা আমাদের সংজ্ঞায়িত এই নির্মাণশৈলী ও নান্দনিকতার সমার্থক, তা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ‘ফরজে আইন’ বা ব্যক্তিগত আবশ্যিক কর্তব্য—তবে আমি সত্য থেকে বিচ্যুত হব না। কেউ কেউ হয়তো আপত্তি তুলে বলতে পারেন যে, আধুনিকতা কোনো নান্দনিক বিষয় নয়। তাদের প্রতি আমার উত্তর হলো : আধুনিকতা হলো আপনার আপন মৌলিক চিন্তা ও দর্শনের মাধ্যমে নতুন কিছুর ‘ইনশা’ বা বিনির্মাণ। এটি এমন কিছু উপস্থাপনের নাম যা অন্যের মনে বিস্ময় ও শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে এবং যা তারা কেবল আকল বা বুদ্ধি দিয়ে নয়, বরং তাদের ‘রসবোধ’ (aesthetic taste) দিয়েও অনুভব করতে পারে। এই মৌলিক ও নান্দনিক সৃষ্টিকে অবশ্যই কোনো না কোনো উচ্চতর মূল্যবোধ বহন করতে হবে। আর এটিই হলো আধুনিকতার সেই নিগূঢ় রহস্য—যাকে আমরা ‘ইবদা’ বা সৃজনশীলতা বলে অভিহিত করি।”[6]আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৬

তহা আবদুর রহমানের মতে, পাশ্চাত্য আধুনিকতার যেমন একটি সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও প্রায়োগিক রূপ রয়েছে, তেমনি এর একটি নিজস্ব ‘আকিদা’ বা বিশ্বাসতাত্ত্বিক ভিত্তিও বিদ্যমান। তাঁর বিশ্লেষণে আধুনিকতার এই আকিদা কয়েকটি বুনিয়াদি স্তম্ভের ওপর দণ্ডায়মান। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘র‍্যাশনালিটি’ বা যুক্তিবাদের নীতি। এই নীতির মূল প্রতিপাদ্য হলো—আকল বা যুক্তিকে এমন এক অনন্য অভ্যন্তরীণ ‘কর্তৃত্ব’ (authority) হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া, যা প্রতিটি বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা দেবে এবং মানুষ সেই ফয়সালা অনুযায়ীই জীবন অতিবাহিত করবে। এই বিশেষ যুক্তিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো—এটি ওহি বা প্রত্যাদেশকে অপসারিত করে মানুষকে কেবল তার নিজের নফস বা প্রবৃত্তিগত আধিপত্যের অধীনে নিয়ে আসে। এই কারণেই তা অনিবার্যভাবে ধর্মীয় শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

তহা আবদুর রহমান এই যুক্তিবাদকে ‘মুজাররাদ র‍্যাশনালিটি’ (Abstract Rationality) বা ‘বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলা হয় এই কারণে যে, এটি ঐশী ওহী থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিযুক্ত বা বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। এই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি কেবল মানবিক আকল নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকে এবং ঐশী প্রত্যাদেশের সাথে কোনো প্রকার সংলাপে লিপ্ত হতে অস্বীকার করে। এদিকে আধুনিকতার অন্য একটি বুনিয়াদি নীতি হলো সেক্যুলারিজম। এই নীতিটি মানুষের মধ্যে জাগতিক বিষয়ের প্রতি এক তীব্র আসক্তি ও গুরুত্ব সৃষ্টি করে এবং ‘আখেরাত’ বা পরকালকে তার চিন্তা ও মনোযোগের পরিসর থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাসিত করে।

 

ঐতিহ্য পাঠের পদ্ধতি ও মৌলিক দার্শনিক সৃজন

“মুসলিম হিসেবে কীভাবে আমরা বুদ্ধিবৃত্তি ও দার্শনিকতায় মৌলিক সৃষ্টিশীলতা উৎপাদন করতে পারি?”—এই প্রশ্ন  ও সংকটকে কেন্দ্র করে তহা আবদুর রহমান দুই খণ্ডে সমাপ্ত ‘ফিকহুল ফালসাফা’ (দর্শনের প্র্যাক্সিওলজি) নামক একটি আকরগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘মৌলিকতা’ বা ‘অরিজিনালিটি’র পথটি নিঃসন্দেহে একটি সুদৃঢ় পদ্ধতিগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে, তিনি মৌলিক ইলমি ও ফিকরি সৃষ্টিশীলতার জন্য তিন ধরনের পদ্ধতিতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায় প্রতিটি সুযোগেই গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। এই তিনটি পদ্ধতি হলো, ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে স্বাতন্ত্র্য দানকারী সমন্বয়মূলক পদ্ধতি (Integrative/Takamul Methodology), বিশেষত ভাষাদর্শনে বহুল ব্যবহৃত প্রায়োগিক পদ্ধতি (Pragmatic/Tadavul Methodology) এবং যুক্তিবিদ্যায় থাকা তর্কমূলক বা হিজাজি পদ্ধতি (Argumentative Methodology)।[7]আবদুর রহমান, সুয়ালুল মানহাজ, পৃ. ১৬

তিনি এই পদ্ধতিগুলোর সমন্বয়ে এমন একটি ‘তাফাক্কুর প্যারাডাইম’ বা চিন্তাকাঠামো নির্মাণ করেছেন, যা মুসলিমদের উচ্চাভিলাষী বুদ্ধিবৃত্তিক ও এপিস্টেমিক উল্লম্ফন এবং সভ্যতা পুনর্নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। দার্শনিক তহা আবদুর রহমান কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই তিনটি পদ্ধতিকে এতখানি গুরুত্ব দিয়েছেন—সে বিষয়ে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান সমীচীন হবে।

১. সমন্বয়মূলক পদ্ধতি : এই পদ্ধতির মূল প্রতিপাদ্য হলো—ইসলামি চিন্তা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে সমালোচনা, সংশোধন কিংবা সমকালীন করার যেকোনো প্রচেষ্টার সার্থকতা কেবল ঐতিহ্যের নিজস্ব ‘সামগ্রিক পদ্ধতি’র মাধ্যমেই সম্ভব। তহা আবদুর রহমান মনে করেন, মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে ‘মৌলিক সৃজনশীলতা’ প্রয়োজন, তার জন্য সেই সকল মুসলিম মনীষী ও দার্শনিকদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলো পুনরাবিষ্কার করা অপরিহার্য—যারা ইসলামি ‘প্রায়োগিকতা’কে (pragmatics) জ্ঞান ও চিন্তা উৎপাদনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন।

ঐতিহ্যকে সেই নিজস্ব পদ্ধতিগত কাঠামোতে পাঠ করাই হলো মৌলিক সৃজনের পূর্বশর্ত। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঐতিহ্য পর্যালোচনার সময় তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কিংবা মতাদর্শিক প্ররোচনা থেকে মুক্ত থাকা। কারণ, ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত চিন্তা ও উৎপাদনের উপকরণসমূহ এবং এর ‘ইস্তিদলাল’ বা যুক্তিপ্রয়োগের কৌশলগুলো আবিষ্কার ও অনুধাবন করা—উক্ত ঐতিহ্যে বিদ্যমান ইলমি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলোর নিছক তথ্যের চেয়েও অগ্রগণ্য। অর্থাৎ, জ্ঞান কী বলছে তার চেয়ে জ্ঞানটি কোন পদ্ধতিতে উৎপাদিত হচ্ছে, তা জানাই হলো প্রকৃত গবেষণা।[8]আল-হাররি, ২০১৪, পৃ. ১১৬

প্রায়োগিক পদ্ধতি : এই পদ্ধতির মূল দর্শন হলো—কোনো দার্শনিক চিন্তার সমালোচনা, সংশোধন কিংবা তাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সেই দার্শনিকের নিজস্ব ‘প্রায়োগিক উপকরণ’ (pragmatic tools) সম্পর্কে একটি গভীর ও আত্মস্থ বোধ গড়ে ওঠে। ইসলামি ঐতিহ্যের যেমন নিজস্ব ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সৃজনশীলতা রয়েছে, পাশ্চাত্য ঐতিহ্যেরও তেমনি নিজস্ব ও পৃথক সৃজন-কাঠামো বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে তহা আবদুর রহমান জাতিসমূহের মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্মুক্ততা ও ভাব-বিনিময়ের জন্য যে ‘তাআরুফ’ (পারস্পরিক পরিচয়) নীতির প্রস্তাব করেছেন, তা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে—পাশ্চাত্য সংস্কৃতি তার দার্শনিক বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, প্রথমে সেটা আবিষ্কার করা মুসলিমদের জন্য অনিবার্য শর্ত। এটিই তাদের দর্শনের ময়দানে নতুন ও মৌলিক যাত্রার পথ প্রশস্ত করবে।

এই কারণেই আবদুর রহমান মনে করেন, মুসলিমদের উচিত পাশ্চাত্য দর্শনকে নিছক ‘দার্শনিক’ চশমায় না দেখে প্রথমে একটি ‘বৈজ্ঞানিক’ বা গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। তাঁর রূপক ভাষায়—এই বিশেষ দৃষ্টিই একজন গবেষককে ‘দার্শনিকের কারখানায়’ প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। এর ফলে একজন দার্শনিক অন্য চিন্তাবিদদের বয়ান অনুবাদের সময় কোন পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন, কীভাবে স্বকীয় পরিভাষাসমূহ ‘ইবদা’ বা সৃজন করছেন, সংজ্ঞাসমূহ কীভাবে নির্ধারণ করছেন কিংবা তাঁর প্রমাণের বুনন কীভাবে তৈরি করছেন—তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে। বস্তুত, তহা আবদুর রহমানের ‘ফিকহুল ফালসাফা’র ধারণাটি এই লক্ষ্যপূরণেরই এক সুসংগঠিত প্রয়াস। এটি পাশ্চাত্য দর্শনকে তার নিজস্ব প্রায়োগিক প্রেক্ষাপটে অনুধাবন করা এবং পাশ্চাত্য দার্শনিকদের তাদের নির্মাণ-প্রক্রিয়াসহ চিনে নেওয়ার একটি দিকনির্দেশনামূলক প্রকল্প।

তর্কমূলক বা হিজাজি পদ্ধতি : এই পদ্ধতির সারকথা হলো—ইসলামি ঐতিহ্য এবং দার্শনিক বয়ানসমূহকে যুক্তিনির্ভর ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সেই বিশ্লেষণকে অবশ্যই ‘হিজাজি’ বা তর্কমূলক যুক্তিবিদ্যার সূত্র মেনে সম্পন্ন করতে হবে। কারণ ভাষাদর্শন, যুক্তিবিদ্যা এবং প্রাগমেটিক্সের আধুনিক গবেষণাসমূহ প্রমাণ করেছে যে, মানুষের স্বাভাবিক সংলাপ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে যে ‘ইস্তিদলাল’ বা যুক্তিপ্রক্রিয়া কাজ করে, তা কোনো যান্ত্রিক বা ‘বুরহানি’ (demonstrative) পদ্ধতিতে চলে না; বরং তা চলে একটি ‘তর্কমূলক’ বা আর্গুমেন্টেটিভ ঢঙে।[9]মাশরুহ, পৃ. ১১৪

খেয়াল করবার বিষয় হলো, এটিই ছিল চিরায়ত ইসলামি জ্ঞানকাণ্ডের প্রধানতম যুক্তিপ্রয়োগ-পদ্ধতি। ইসলামি চিন্তাধারার ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগ দেখা যায়। এমনকি সমকালীন আধুনিক গবেষণাসমূহ আজ যে পদ্ধতির সপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, মুসলিম মনীষীগণ সেই যুগেই তার পদ্ধতিগত উৎকর্ষ বিবেচনা করে ‘ইলমুল মুনাযারা’ (বিতর্কবিদ্যা) নামক এক স্বতন্ত্র শাস্ত্র গড়ে তুলেছিলেন। ইসলামি প্রায়োগিকতায় (pragmatics) বিদ্যমান এই ‘জাদালি’ বা দ্বান্দ্বিক যুক্তিপদ্ধতি কোনো ফর্মাল যুক্তিবিদ্যা নয়, বরং এটি একটি অপারেশনাল বা সক্রিয় ও প্রায়োগিক যুক্তিবিদ্যা। কারণ, এই পদ্ধতিতে শব্দের বিন্যাসকে তার অর্থ থেকে এবং অর্থকে তার প্র্যাগমেটিক (ভাষাগত, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বিশ্বাসগত) ভিত্তি থেকে আলাদা করা হয় না।[10]আতেশ, আধুনিকতার দার্শনিক ভিত্তিসমূহ ও ইসলাম, ২০১৯

 

তহা আবদুর রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থাবলি 

১. ভাষা ও দর্শন : অন্টোলজির ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামো; (মূল : Langage et philosophie : Essai sur les structures linguistiques de l’ontologie); ১৯৭২।

২. ডিডাক্টিভ ও ন্যাচারাল আর্গুমেন্টেশন প্রসঙ্গ এবং এর মডেলসমূহ; (মূল : Essai sur les logiques des raisonnements argumentatifs et naturels); ১৯৮৫।

৩. ফর্মাল লজিক ও গ্ৰামার; (মূল : المنطق والنحو الصوري); ১৯৮৫।

৪. সংলাপের মূলনীতি প্রসঙ্গ এবং ইলমে কালামের তাজদিদ; (মূল : في أصول الحوار وتجديد علم الكلام); ১৯৮৭।

৫. দ্বীনি প্রাকটিস এবং আকলের তাজদিদ; (মূল : العمل الديني وتجديد العقل); ১৯৮৯।

৬. ঐতিহ্য মূল্যায়নে পদ্ধতির তাজদিদ; (মূল : تجديد المنهج في تقويم التراث); ১৯৯৪।

৭. দর্শনের প্র্যাক্সিওলজি-১ : দর্শন ও তর্জমা; (মূল : فقه الفلسفة. 1-الفلسفة والترجمة); ১৯৯৬।

৮. ভাষা ও ব্যালেন্স অথবা আকলি বহুত্ববাদ; (মূল : اللسان والميزان أو التكوثر العقلي); ১৯৯৮।

৯. দর্শনের প্র্যাক্সিওলজি-২ : দার্শনিক কথা, ধারণা ও এটিমোলজির কিতাব; (মূল : فقه الفلسفة. 2- القول الفلسفي، كتاب المفهوم والتأثيل); ১৯৯৯।

১০. আখলাক প্রশ্ন : পশ্চিমা আধুনিকতার আখলাকি সমালোচনায় একটি অংশগ্রহণ; (মূল : سؤال الأخلاق. مساهمة في النقد الأخلاقي للحداثة الغربية); ২০০০‌।

১১. ডায়ালগ ফর দি ফিউচার; (মূল : حوارات من أجل المستقبل); ২০০০।

১২. দার্শনিক এখতেলাফে আরবীয় অধিকার; (মূল : الحق العربي في الاختلاف الفلسفي); ২০০২।

১৩. বুদ্ধিবৃত্তিক এখতেলাফে ইসলামী অধিকার; (মূল : الحق الإسلامي في الاختلاف الفكري); ২০০৫।

১৪. আধুনিকতার রুহ : ইসলামী আধুনিকতা নির্মাণের প্রারম্ভিকা; (মূল : روح الحداثة. المدخل إلى تأسيس الحداثة الإسلامية); ২০০৬।

১৫. আধুনিকতা ও প্রতিরোধ; (মূল : الحداثة والمقاومة); ২০০৭।

১৬. প্রাকটিস প্রশ্ন : চিন্তা ও জ্ঞানের প্রাকটিক্যাল অরিজিন প্রসঙ্গ; (মূল : سؤال العمل. بحث عن الأصول العملية في الفكر والعلم); ২০১২।

১৭. দ্বীনের রুহ : সেক্যুলারিজমের সংকীর্ণতা থেকে ইতিমানিয়ার প্রশস্ততায়…; (মূল : رُوح الدين. من ضيق العَلمانية إلى سعة الائتمانية); ২০১২‌।

১৮. চিন্তার দিগন্ত হিসেবে সংলাপ; (মূল : الحوار أُفُقًا للفكر); ২০১৩‌। [বইটি ‘ফালসাফা, আধুনিকতা ও ট্রাডিশন’ নামে বাংলায় তর্জমা হয়েছে।]

১৯. সেক্যুলারিজমের মুসিবত : দ্বীন থেকে আখলাককে সেপারেশনের ইতিমানি সমালোচনা; (মূল : بُؤس الدَّهْرانية. في النقد الائتماني لفصل الأخلاق عن الدين); ২০১৪।

২০. পদ্ধতি প্রশ্ন : নয়া বুদ্ধিবৃত্তিক প্যারাডাইম নির্মাণের দিগন্তে…; (মূল : سؤال المنهج. في أفق التأسيس لأُنموذج فكري جديد); ২০১৫।

২১. পোস্ট-সেক্যুলারিজমের গোমরাহি : আখলাক পরিত্যাগের ইতিমানি সমালোচনা; (মূল : شرود ما بعد الدهرانية. النقد الائتماني للخروج من الأخلاق); ২০১৬।

২২. আবতার ইনসান থেকে কাউসার ইনসানে; (মূল : من الإنسان الأبتر إلى الإنسان الكوثر); ২০১৬।

২৩. লজ্জার দ্বীন : ইতিমারি ফিকহ থেকে ইতিমানি ফিকহে-১, ইতিমানি দৃষ্টিভঙ্গির উসুলসমূহ; (মূল : دين الحياء. من الفقه الائتماري إلى الفقه الائتماني. 1- أصول النظر الائتماني); ২০১৭।

২৪. লজ্জার দ্বীন : ইতিমারি ফিকহ থেকে ইতিমানি ফিকহে-২, স্যোশাল মিডিয়া বিপ্লবের আখলাকি সংকটসমূহ; (মূল : دين  الحياء. من الفقه الائتماري إلى الفقه الائتماني. 2- التحديات الأخلاقية لثورة الإعلام والاتصال) ২০১৭।

২৫. লজ্জার দ্বীন : ইতিমারি ফিকহ থেকে ইতিমানি ফিকহে-৩, হিজাবের রুহ; (মূল : دين الحياء. من الفقه الائتماري إلى الفقه الائتماني. 3- روح الحجاب); ২০১৭।

২৬. রিবাতের অতন্দ্র পাহারা : হালের জাতিগত সংঘাতের ইতিমানি পর্যালোচনা; (মূল : ثُـغور المُرابَطة: مقاربة ائتمانية لصراعات الأمة الحالية); ২০১৮।

২৭. সেক্যুলার ও ইতিমানি দর্শনে আখলাকি ধারণাসমূহ-১, ইতিমানি ধারণাবলি; (মূল : المفاهيم الأخلاقية بين الائتمانية والعَـلْمانية: 1-المفاهيم الائتمانية); ২০২০।

২৮. সেক্যুলার ও ইতিমানি দর্শনে আখলাকি ধারণাসমূহ-১, সেক্যুলার ধারণাবলি; (মূল : المفاهيم الأخلاقية بين الائتمانية والعَـلْمانية: 2-المفاهيم العلمانية); ২০২০।

২৯. ইলমুল মাকাসিদের ইতিমানি নির্মাণ; (মূল : التأسيس الائتماني لعلم المقاصد); ২০২২।

৩০. দার্শনিক চরিত প্রশ্ন : ইতিমানি দার্শনিকতার হাকিকত অনুসন্ধান; (মূল : سؤال السيرة الفلسفية: بحث في حقيقة التفلسف الائتمانية); ২০২৩। 

 ৩১. সীরাতে নববী ও আখলাকি নির্মাণ; (মূল : السيرة النبوية والتأسيس الأخلاقي); ২০২৪।

৩২. দার্শনিক তার সময়ের সন্তান; (মূল : الفيلسوف ابن ساعته); ২০২৫। 

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৯৬
2 আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফকান লিল-ফিকর, পৃ. ১৪৩
3 আবদুর রহমান, রুহুল হাদাসা, পৃ. ২৫
4 আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৩
5 আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৪
6 আবদুর রহমান, আল-হিওয়ারু উফুকান লিল-ফিকর, পৃ. ৮৬
7 আবদুর রহমান, সুয়ালুল মানহাজ, পৃ. ১৬
8 আল-হাররি, ২০১৪, পৃ. ১১৬
9 মাশরুহ, পৃ. ১১৪
10 আতেশ, আধুনিকতার দার্শনিক ভিত্তিসমূহ ও ইসলাম, ২০১৯

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments