মিনা বাজার (সপ্তম পর্ব)

মূল : আব্দুল হালিম শরর লখনভি

এক সুন্দরী দোকানি

বাদশাহ মহলে প্রবেশ করলে মমতাজ বেগম তার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সিংহাসন ও মুকুটধারী স্বামীকে দেখে তিনি এসে তার পাশে বসলেন, তারপর বললেন, ‘জাহাঁপনার বাজার ঘুরতে বেশ সময় লেগেছে।’

‘তা সত্ত্বেও তো কেবল অর্ধেক বাজার ঘুরে দেখতে পেয়েছি। এটা সাধারণ কোনো দর্শনীয় স্থান নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এমন মুগ্ধতা, যেন হৃদয় টেনে ধরে বলছে, এখানেই থেকে যাও। প্রতিটি দোকান আর বিক্রেতার মধ্যে ছিল এত আকর্ষণ, খুব অনিচ্ছায় পা বাড়াতে হচ্ছিল। এটা এমন এক স্থান, একবার কোনো দোকানে ঢুকলে সেখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করে।’

‘তাই বলে কি নিজের পরিবার-পরিজনকেও ভুলে যাবেন?’

বাদশাহ হেসে বলেন, ‘আমার এটা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং বলা উদ্দেশ্য, যে দোকানে যাবে সেখানেই দিনভর সৌন্দর্য দেখতে পাবে। অন্য দোকানে যাওয়ার নামই নেবে না। অর্থাৎ মানুষ সারা দিনে এক দোকান ছেড়ে অন্য দোকানে যেতে পারবে না।’

‘তাহলে কী হবে? বারোশ দোকান। বছরে তিনশ ষাট দিন। আড়াই বছর ধরে এসব দোকানে পরিদর্শন করতে থাকলে রাজ্য, ঘরবাড়ি ও পরিবার সব ভুলে যাবেন!’

‘কেন, রাতে কি ঘরে ফিরব না?’

‘এটা আমার প্রতি মহামান্যের অনুগ্রহ হবে, কিন্তু রাজ্য চলবে কী করে?’

‘এ কাজ মন্ত্রীরা দেখবে। সকল বিষয়েই কি তোমার সন্দেহ? আমি বলেছিলাম, তোমার প্রচেষ্টায় এই বাজার এত সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক হয়েছে, যেখানেই যাই সেখান থেকে ফিরতে ইচ্ছে করে না।’

‘হুজুর বলেছেন, বাজার খুব সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক হয়েছে। সুন্দর হওয়াতে কোনো সমস্যা নেই, মহামান্যের জন্য সবকিছুই সুন্দর হওয়া চাই। কিন্তু চিত্তাকর্ষক বলবেন না। এটা খুবই বিপজ্জনক শব্দ।’

‘শব্দটিকে আমি ওই অর্থে বলিনি, যে অর্থে তুমি নিয়েছ। আমার মনে হয় সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক একই অর্থ বহন করে। তবে শব্দটি তোমার কাছে অপছন্দনীয় হলে আমি তা ব্যবহার করা ছেড়ে দেব।’

‘আমাকে আশ্বস্ত করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এবার বলুন, আজ সেখানে আপনার কাছে উপস্থিত নারীদের মধ্যে কাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে?’

‘এটা বড়ই জটিল প্রশ্ন। কেবল এটুকু বলতে পারি, সবাইকে খুব পছন্দ হয়েছে। এমন কেউ নেই যাকে পছন্দ হয়নি।

‘এটা বড়ই স্বস্তির খবর।’

‘কেন?’

‘বিপদ তখনই হয় যখন সবার মধ্যে কাউকে বেশি মনে ধরে। কিন্তু যখন হাজারো সুন্দরীদের একরকম লাগে, তখন চিন্তার কোনো কারণ নেই।’

‘খুবই যুক্তিসংগত কথা বলেছ। এখন আমি আসলেই তোমার কথা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখছি, যদিও সেখানে একের পর এক চাঁদের মতো মুখ ও পরির মতো সুন্দরী নারীরা জমায়েত হয়েছিল, তবুও কারও মুখচ্ছবি আমার হৃদয়ে আঁকিনি।’

‘এর কারণ এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, সকল নারী এতই সুন্দরী যে, হৃদয়ে একজনের ছাপ পড়তেই অন্য পরিসুন্দরী এসে তা মুছে দিয়েছে। কারও ভাবনাই আমার হৃদয়ে স্থায়ী হয়নি। তবে আমি মনে করি, এর প্রকৃত কারণ তোমার ভালবাসা ও গুণাবলি আমার হৃদয়ে এত গভীর প্রভাব ফেলেছে, অতিসুন্দর কোনো রূপও তার স্থান নিতে পারেনি।’

এ কথা শুনে রানির চেহারায় লজ্জামিশ্রিত গর্ব ও আনন্দের বলিরেখা ফুটে ওঠে। তিনি সেই আবেগ দমন করে বলেন,

‘জাহাঁপনার এই ভালোবাসা ও অনুগ্রহের জন্য আমি গর্বিত ও আনন্দিত। এটা আমার জন্য প্রশান্তিদায়ক, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, বাজারকে সৌন্দর্য ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে।

প্রথম দিন বাজার সাজানো দেখে কিছু আমিরের স্ত্রী পরামর্শ দিয়েছিল, যেসব নারী রূপে-গুণে অনন্য, তাদেরকে বাজারে ঢুকতে দেওয়া না দেওয়া। তাদের ধারণা, হযরত জিল্লে সুবহানি তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখে পাগল হয়ে যাবেন। আমি বলেছি, মহামান্যের পবিত্রতা ও মহৎ চরিত্রের প্রতি আমার এতটাই ভরসা, এমন সতর্কতার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আমি তাদের পরামর্শের বিপরীতে গিয়ে চেষ্টা করেছি, যেসব নারীর সৌন্দর্যের খ্যাতি রয়েছে, তাদেরকে প্রথমে ডাকতে, যেন সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বলে পরিচিত কোনো নারী দোকান লাভ করা থেকে বঞ্চিত না হয়।’

‘তোমার এই আত্মত্যাগের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি জানি, আমার জন্য তুমি নিজেকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করো না।’

‘দোকানিদের পাশাপাশি নিশ্চয়ই দর্শনার্থী নারীদেরও ব্যাপক সমাগম ছিল। তাদের অবস্থা কেমন দেখলেন?’

‘তারাও এমন সৌন্দর্য ও মনোহর ভঙ্গিতে সেজেগুজে এসেছিল, সবাইকে কনের মতো দেখাচ্ছিল। কিন্তু আমি শুধু এক ঝলক দেখা ছাড়া তাদেরকে ভালোমতো লক্ষ করতে পারিনি। কেউ কেউ তো ছিল এমনই রূপসী ও চঞ্চল ভঙ্গিমার, মনে হচ্ছিল তাদের সঙ্গেও কিছুক্ষণ কথা বলি। কিন্তু তা উচিত বলে মনে হয়নি।’

‘আফসোস! দরবারি আমির-উমরা সঙ্গে থাকার কারণে আমি আপনার সাথে যেতে পারিনি। নইলে জাহাঁপনার এই শখটিও পূরণ করতাম। তাকে ডেকে এনে কাছে দাঁড় করিয়ে দিতাম, হুজুর যতক্ষণ ইচ্ছা তার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।’

‘কিন্তু তোমার উপস্থিতিতে তো আমার তাকে স্বচ্ছন্দে দেখাও সম্ভব নয়।’

‘তাহলে আমি না থেকে এক প্রকার ভালোই হয়েছে। যাকে ইচ্ছা মনভরে দেখে খুশি হতে পেরেছেন।’

‘তোমার কথায় বিদ্রূপের আভাস পাচ্ছি, বেগম!’

‘আমি উপহাস বা তিরস্কারের ছলে কথাটি বলিনি, বরং মন থেকেই চাই, হজরত যেন মিনা বাজারে মন ভরে, স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ান। যাহোক, এবার বলুন, বাজারের যে অংশ দেখা বাকি, তা কি দেখা হবে?’

‘ফেরার সময় ঘোষণা করে দিয়েছি এবং আগামীকাল যাওয়ার কথা বলে এসেছি। এটা কীভাবে সম্ভব, এমন আগ্রহ ও উদ্দীপনাময় বস্তুকে বেশিদিন ধরে রাখব?’

‘আমি তো আরও ভেবেছিলাম, দু-তিন দিনের বিরতি দিয়ে যাবেন।’

‘বাজার ঘুরে এত আনন্দ পেয়েছি, অদেখা অংশটুকু দেখার ইচ্ছা একদিনের বেশি দমন করা সম্ভব নয়। যদিও আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তবু আগ্রহ এত বেপরোয়া ছিল, বাজারের সুন্দরীদের কষ্টের কথা বিবেচনা না করলে রাতভর ঘুরে বেড়াতাম।’

‘এত আগ্রহ দেখে আমি প্রার্থনা করছি, আল্লাহ যেন এই বাজার পরিদর্শন সুন্দরভাবে সমাপ্ত করেন!’

রাত গভীর হয়ে পড়েছিল। বাদশাহ খুবই ক্লান্ত ছিলেন। তাই তিনি খাটে শুয়ে বিশ্রাম নেন। সকালে উঠে নামাজ শেষ করেই নাস্তার সময় আবার রানির সাথে মিনা বাজারের আলাপ তোলেন, আর বলেন, ‘কাল রাতভর শুধু বাজারের স্বপ্নই দেখেছি। বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল, আর আমি প্রতিবার বাজারে পৌঁছে যাচ্ছিলাম।’

‘তাহলে তো রাতভর সেখানেই ছিলেন!’

‘হ্যাঁ, ছিলাম, আর প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি।’

‘তাহলে রাতের সফরের চিত্তাকর্ষক বর্ণনাগুলোও শোনান। দিনের সফরে তো কোনো উদ্বেগের ঘটনা ঘটেনি। যদিও কিছুটা উদ্বেগ ছিল, তবে হযরতের বর্ণনায় তা দূর হয়ে গেছে। কারণ এত রূপবতী নারীদের ভিড়ে কারও প্রতি কোনো ভাবনা হৃদয়ে স্থির হয়নি। হয়তো রাতের সফরে এমন কোনো হুরের মতো রূপবতী নারী চোখে পড়েছে, যাকে ভুলতে পারেননি।’

‘তোমার কি স্বপ্নের বিষয় নিয়েও সন্দেহ? ধরো, স্বপ্নে এমন কোনো সুন্দরীকে দেখেছি, যার কথা হৃদয়েও গেঁথে গেছে, এতে ভয়ের কী আছে? তাকে তো জীবনে কোথাও দেখতে পাব না। আর সে তোমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করবে না।

‘কখনো এমনও হয়, স্বপ্নে কোনো সুন্দরী নারী দেখা দেয়, আর সকালে সেই মুখ কোথাও চোখে পড়ে, তখন ব্যাপারটা খুবই ভয়ংকর হয়ে ওঠে। হতে পারে, গতরাতে জাহাঁপনা স্বপ্নে কোনো সুন্দরী প্রিয়ার প্রেমে মজেছেন, আজ মিনা বাজার পরিদর্শনে গিয়ে তার ওপর দৃষ্টি পড়ল। এমন হলে তো কিয়ামত হয়ে যাবে! তাই আমাকে কেবল এটুকু বলুন, দিনের ঘোরাঘুরিতে যেমন কারও মুখ মনে গেঁথে যায়নি, রাতেও কি তাই হয়েছে? না কি স্বপ্নে এমন কোনো পরিসুন্দরী দেখেছেন, যার মিষ্টি মুখ এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন?’

‘যা কিছু দেখেছি সবই চোখের সামনে ভাসছে। এমন কিছু দেখেছি যে, চোখের তৃষ্ণা এখনো রয়ে গেছে।’

‘তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমিও এটাই চাই, হুজুর যা কিছু দেখেন স্বপ্নে কিংবা জাগ্রত অবস্থায়—সবই তার চোখের সামনে থাকুক। এমনটা যেন না হয়, কোনো একটি মুখ কল্পনায় গেঁথে গেল আর বাকি সবকিছু ভুলে গেলেন। এটা কত স্বস্তির কথা, রাতে দেখা এমন কোনো মুখ নেই, যাকে দিনের বেলায় জাহাঁপনার চোখ খুঁজে বেড়াবে।’

‘কিন্তু বেগম, আমার চোখ কোনো মুখ খুঁজুক বা না খুঁজুক, তোমার তো সবসময় এর জন্য বুক কেঁপে ওঠা উচিত। বিশেষ করে যখন আমি এ অঙ্গীকার করেছি, কাউকে কুনজরে দেখব না।’

‘মহামান্য যা খুশি বলুন, যতক্ষণ এই বাজার টিকে আছে, ততক্ষণ আমার হৃদয় থেকে এই ধড়ফড়ানি যাবে না। যাক, এটা ছাড়ুন। বলুন, বাজারে সওয়ারি কখন যাবে? দেরি হচ্ছে, আর আমি চাই না আপনার শখ পূরণে কোনো বাধা আসুক!’

‘তৃতীয় প্রহরে যাব, গতকাল ফেরার সময় এ কথা বলে এসেছি।’

‘তাহলে তো হুজুর বড় কষ্ট করে নিজেকে দমন করছেন। শখের দাবি তো এটাই, ভোর হতেই রওনা হয়ে যাবেন!’

‘শখের পেছনে পড়ে নিজের কর্তব্য ভুলি কী করে? আমাকে এখন দরবারে যেতে হবে। সেখান থেকে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেব, তারপর আরামসে বাজারে যাব।

‘খুব ভালো, ঠিক আছে; তবে আমি হুজুরের যাওয়ার আগে গিয়ে দেখে আসি, সবকিছু ঠিক আছে কি না, এমন কেনো বিষয় তো নেই যা মহামান্যের অপছন্দ।’

‘অবশ্যই যাও, আর এটাও জেনে এসো, গতকাল আমার যাওয়ার পর বাজারের লোকদের মাঝে কী প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যাদের দোকানে গিয়েছি, তাদের কোনো অভিযোগ আছে কি না?’

‘মূলত আমি এ উদ্দেশ্যেই যেতে চাচ্ছি। আমি এ ব্যাপারে ভালো করে জেনে আপনাকে জানাব।’

এরপর বাদশাহ দরবারে যান। আর রানি শাহজাদি ও সঙ্গী নারীদের নিয়ে বাহনে করে মিনা বাজারে পৌঁছান। আজ সেখানে প্রথম প্রহরেই ভিড় জমে গেছে। কারণ সবাই নিশ্চিত ছিল, বাদশাহ আজও আসবেন। তাই সকল দরবারি আমির ও শহুরে অভিজাতদের স্ত্রীরা উপস্থিত হয়েছে। রাস্তার ওপর যে গালিচা বিছানো ছিল, তা বদলানো হচ্ছিল। চেষ্টা করা হচ্ছিল, বাজারের জাঁকজমক যেন গতকালকের চেয়েও ভালো হয়।’

মমতাজ বেগম সেই রাস্তাগুলোতে যান, যেগুলো গতকাল বাদশাহ পরিদর্শন করেছেন। প্রতিটি দোকানে গিয়ে দোকানিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, গতকাল বাদশাহর সঙ্গে তাদের কী কী কথা হয়েছে, তাদের পণ্য কতটা বিক্রি হয়েছে এবং তারা নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসায় লাভবান হচ্ছে কি না?

সবাই খুশি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাদশাহর সাথে যেসব কথোপকথন হয়েছে সেগুলোর বর্ণনা দেয়। মোটকথা, সবাইকে সুখী ও সমৃদ্ধ দেখা যায়। জানা যায়, বাদশাহর অনুগ্রহ সবাইকে পরিতৃপ্ত করেছে, সকলেই দরবারি সুদৃষ্টি ও অনুগ্রহের প্রশংসা করছিল।

এরপর মমতাজ বেগম সেই দুটি রাস্তায় যান, যেখানে আজ হযরত জিল্লে সুবহানি পরিদর্শনে যাবেন। তিনি গভীরভাবে লক্ষ করেন, দোকানি নারীরা দেখতে কেমন, তাদের পোশাক ও আচরণ কেমন, তাদের কাছে কত ও কী ধরনের পণ্য আছে। তিনি দোকানিদের বুঝিয়ে বলেন—

‘আজ জাহাঁপনা তোমাদের দোকানে আসবেন। কেউ যেন কোনো অযাচিত কথা না বলে। সুন্দর ভঙ্গিমা, রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শনে ত্রুটি না করে। সেইসাথে শালীনতা-গাম্ভির্যতাও যেন বজায় থাকে। হয়তো তিনি কারও সাথে রঙ্গ-রসিকতা করবেন, তখন তার যথোচিত জবাব দেবে। তবে রসিকতার ছলে যেন বেপরোয়া ও নির্লজ্জ হয়ে না পড়ে।’

সকলকে যথাযথ উপদেশ দিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামগৃহে অবস্থান নেন, তারপর বারোটা বাজার আগেই মহলে প্রবেশ করেন। ভেতরে পা রাখতেই জানা যায়, জাহাঁপনা দরবার থেকে ফিরেছেন। তিনি চটজলদি তার পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হযরত কি আহার সেরে ফেলেছেন?’

‘না। তোমার আসার অপেক্ষায় ছিলাম। দস্তরখান বিছানোর আদেশ দাও আর বলো, মিনা বাজার কি দেখে এসেছ?’

‘দেখে এসেছি। সবাই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য আপনার অপেক্ষা করছে।’

‘গতকালের আচরণে কেউ কি অসন্তুষ্ট?’

‘কেউ না; বরং সকল দোকানি ও দর্শনার্থী নারী কৃতজ্ঞ, হুজুর তাদেরকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়েছেন। সকল নারীর মুখেই শোনা যাচ্ছিল, প্রজাদের সম্মান-মর্যাদা রক্ষাকারী বাদশাহর এমনই হওয়া উচিত, যেমন আমাদের হযরত জিল্লে সুবহানি।’

‘সত্যি করে বলো তো, সেখানে এমন কোনো কথা শুনোনি, যে কারণে তোমার মনে আমার প্রতি অভিযোগ জন্মেছে?’

‘এমন কোনো কথা শুনিনি। আর শুনলেও আমার কোনো অভিযোগ থাকত না।’

‘তোমার এই ভালোবাসার জন্য আমি কৃতজ্ঞ এবং তোমার মতো একজন রানি পাওয়ার জন্য প্রায়ই খোদার কাছে শুকরিয়া জানাই। তবে এটা বলো, আমার সঙ্গে যেসব সম্মানিত দরবারি সদস্যবৃন্দ ভেতরে গিয়েছিল, নারীদের কি তাদের নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে? কিংবা তাদের মধ্যে কেউ কি এমন কিছু করেছে, যা কোনো নারীর জন্য অপ্রীতিকর? যদিও আমি তাদের আচরণ ও অবস্থা গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ করেছি। কিন্তু প্রায়ই এমন হয়েছে, আমি দোকানের ভেতরে গিয়ে দোকানি নারীর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, আর তারা সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল বা অন্য কোনো দোকানে চলে গিয়েছিল। আমার দৃষ্টির আড়ালে থাকার কারণে হয়তো কেউ কোনো অশোভন আচরণ করে থাকতে পারে।’

এ ব্যাপারেও কোনো অভিযোগ শুনিনি। আমি সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছি, কাউকেই অসন্তুষ্ট পাইনি। যখন আপনি সব সঙ্গীদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, কেউ কোনো নারীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকাবে না, তখন কার সাহস আছে কারও দিকে চোখ তুলে তাকানোর? কিছু নারীর বক্তব্য, তারা এমনভাবে দৃষ্টি অবনত রেখেছিল, কোনো নারীকে গভীর দৃষ্টিতে দেখেছিল কি না সন্দেহ!’

‘তুমি আমাকে খুবই খুশি করতে পেরেছ। আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি এই প্রচেষ্টায় সফল হয়েছি।’

দস্তরখান বিছানো হয়। বাদশাহ ও রানি খাবার গ্রহণ করেন। খাওয়া শেষ হলে হাত ধুয়ে বাদশাহ তার সিংহাসনে বসে বের হন। আমির-উমরা ও সম্মানিত লোকেরা দরবারে উপস্থিত হয়। বাদশাহ রাজকীয় হাওদায় চড়ে গতকালের মতোই জাঁকজমকের সাথে মিনা বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। সেই মহিমা ও প্রতাপ নিয়ে বাজারে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণের জন্য শাহি তাঁবুতে অবস্থান করে পায়ে হেঁটে বাজার পরিদর্শনে বের হন।

বিকেলের শুরুতে পরিদর্শনে বের হন। আর যখন দিনের দুই প্রহরের মতো বাকি, তখন তৃতীয় রাস্তা পেরিয়ে চতুর্থ রাস্তায় পা রাখেন। সেখানে ঢুকতেই এক দোকান চোখে পড়ে, সকল দোকানের মধ্যে যা অধিক সজ্জিত। বাদশাহ সেখানেই প্রবেশ করেন। দোকানটিতে প্রবেশ করতেই এক ভীষণ রূপবতী ফুলের মতো কোমল সুন্দরী নারী এমন ভালোবাসা মাখা ভঙ্গিমায় মাথা নত করে সম্ভাষণ জানায়, বাদশাহ রীতিমতো হতবাক হয়ে যান।

তার বেশভূষা দেখে মনে হয়, এমন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের এমন সজ্জা আগে কখনো দেখেননি। তার মুখশ্রী দেখে মনে হয়, এমন চাঁদের মতো রূপ ও ফুলের মতো কোমল দেহ আগে কখনো দেখা হয়নি। তারপর তার টেবিলের ওপর দৃষ্টি পড়লে দেখা যায়, কোনো অলঙ্কার ছাড়াই সেটা এমন পরিচ্ছন্ন ও অপূর্ব সাধারণ, হাজারো সৌন্দর্য যার সামনে তুচ্ছ। এই চাঁদমুখী রূপসী কেবল কানে দুটো ঝুমকা আর গলায় সূক্ষ্ম গয়নাগাঁথা চাপা ফুলের মালা পরেছে। মনে হয়, সে তার সমস্ত গয়না খুলে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। 

বাদশাহ যখন তার পোশাক, রূপ-লাবণ্য আর মার্জিত আচরণকে অতুলনীয় মনে করেন, তখন তার ইচ্ছে জাগে কথাবার্তার ধরনটিও দেখার। তিনি টেবিলের ওপর রাখা গয়নার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এই গয়নাটি টেবিলের পরিবর্তে তোমার শরীরে থাকলে আরও বেশি সুন্দর দেখাত।’

‘আমার সৌন্দর্যের জন্য এই গয়নার কী প্রয়োজন?’

‘প্রয়োজন তো নেই, তবে গয়নার সৌন্দর্য শতগুণ বেড়ে যেত।’

‘আমাকে তো বলা হয়েছিল, মুখের উজ্জ্বলতার সামনে এটা ম্লান হয়ে যাবে, আর জাহাঁপনা এটা পছন্দ করবেন না।’

‘এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমি তখনই এর মূল্য অনুধাবন করতে পারব, যখন এটা তোমার গলে পরবে।’

‘আমার পরে দেখাতে আপত্তি নেই, কিন্তু এই গয়নার সঙ্গে যদি দাসীকেও পছন্দ হয়ে যায়, তাহলে কিয়ামত হয়ে যাবে!’

বাদশাহ একটু ভেবে বলেন, ‘নিশ্চয়ই কিয়ামত আসবে, তবে শুধু তার জন্য যে তোমাকে এই গয়নায় দেখবে। তোমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই!’

‘মহামান্য যদি এটাই চান, তখন আর কী আপত্তি থাকতে পারে? তবে এটুকু অনুমতি দেবেন, আমি অলঙ্কারটি ওদিকে পর্দার আড়ালে গিয়ে পরে আসব?’

বাদশাহ অনুমতি দিলে সে গয়নাটি নিয়ে পর্দার আড়ালে গিয়ে পরতে থাকে। যতক্ষণ সে অদৃশ্য থাকে, তার নিকটাত্মীয় আরেকজন নারী বাদশাহর সামনে বিনম্রভাবে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তিনি তার সঙ্গে কোনো কথাই বলেন না।

বাদশাহ মাত্র কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেন, যখন সেই রূপসী বধূ ১৪ বছরের কিশোরীর মতো এমন ঝলমলে ভঙ্গিতে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন মনে হয় যেন হঠাৎ পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উদ্ভাসিত হয়েছে। সুন্দর মুখশ্রীর সাথে রত্নখচিত গয়নাটি এমন ঝকঝকে আলো ছড়ায় যে, বাদশার চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে। তিনি আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই গয়নাটি ভারী মূল্যবান, আর এর উপযুক্ত স্থান জগতের আর কোথাও হতে পারে না।’

‘এই গয়না তো দাসীকে দান করে দেওয়া হলো। এখন আমার কাছে মহামান্যকে নজরানা দেওয়ার মতো কী বাকি থাকল?’

‘তোমার গায়ে এই গয়না দেখার মূল্য এর চেয়েও অনেক বেশি। এছাড়া কি তোমার কাছে বিক্রয়ের জন্য আর কিছু আছে?’

‘এই হীরার অতি দুর্লভ রত্নটি আছে, যদি মহামান্যের তা পছন্দ হয়।’

‘নিয়ে এসো দেখি! তোমার চোখে যা মূল্যবান, নিশ্চয়ই তা অমূল্যই হবে।’

একথা শুনে সে বিদ্যুতবেগে পর্দার পেছন থেকে একটি সোনার বাক্স বের করে আনে। সেটি খুলে খুবই সাবধানে একটি হীরার পদ্ম বের করে হাতের তালুতে রেখে নজরানার ভঙ্গিতে বাদশাহর সামনে পেশ করে। সেটি তুলে নিয়ে বাদশাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর দোকানের বাইরে আলোতে গিয়ে ভালো করে পরখ করে হাসিমুখে ভেতরে এসে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি অতুলনীয়। এমন হীরা হয়তো কেউ কখনো দেখেনি। তোমার মিষ্টি ঠোঁট ও মধুর ভঙ্গির সমস্ত গুণ যেন এতে মিশ্রিত হয়েছে। এর মূল্য কত?’

সুন্দরী হেসে বলে, ‘এক লাখ রুপি।’

‘খুবই সস্তা, আমি খুশি মনেই নিয়েছি।’ এ কথা বলে তিনি কোষাধ্যক্ষকে ডেকে তাকে দেখিয়ে পকেটে রেখে দেন। আর আদেশ করেন, ‘এখনই এই নারীকে দুই লাখ রুপি দাও। তারপর ওই রূপসীর প্রতি মনোযোগী হয়ে বলেন, ‘এক লাখ রুপি তোমার গয়নাটি পরার জন্য আর বাকি এক লাখ রুপি এই রত্নটির জন্য।’

রূপসী মাথা নুয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। বাদশাহ তার সাথে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কোষাধ্যক্ষ এগিয়ে এসে কানে কানে বলে, ‘হুজুর, এটা তো একটি মিশরি কাঁচা পাথর, যাতে এক চতুর রত্নকার হীরার পদ্মফুলে পরিণত করেছে।’ এ কথা শুনে বাদশাহ অট্টহাসি দিয়ে বলেন, ‘তুমি এত বড় রত্নব্যবসায়ী, অথচ আজ পর্যন্ত রত্ন চিনতে শিখলে না! এটা অতি মূল্যবান হীরা, যা তোমার চোখ কখনো দেখেনি। যাও, এখনই মূল্য পরিশোধ করো, রত্ন চেনা শেখো এবং এমন ভুল যেন আর কখনো না হয়।’

সে চলে যাওয়ার পর বাদশাহ ওই রূপসীর প্রতি মনোযোগী হয়ে তার মুখ ও পোশাক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি তার হাত ধরে বলেন, ‘তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ, আশা করি তুমি রাখবে!’

‘দাসীর কি কোনো নির্দেশ পালনে আপত্তি থাকতে পারে?’

‘তোমার কথা শুনে আমার মন ভরেনি। একান্তে বসে আরও কিছু কথা বলতে চাই। আজ রাতে আমার সাথে আহার করো। আমার এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করো।’

‘দাসীর জন্য এটা মহা সম্মানের। আমি খুশিমনেই হাজির হব।’

‘আমি সওয়ারির নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছি, আমার চলে যাওয়ার দুঘণ্টা পরেই রওনা হয়ে রাজদরবারে পৌঁছে যাবে।’

‘দাসী অবশ্যই উপস্থিত হবে।’

এরপর বাদশাহ অন্য দোকান পরিদর্শনে চলে যান। কিন্তু হৃদয়ে এমন তোলপাড় তোলে, কোনো দোকানেই মন বসে না। রূপসীর মুখ গেঁথে গেছে হৃদয়ে। যে দোকানেই যায়, চোখের সামনে এসে তার প্রতি ধাবিত করে। যথাসম্ভব দোকানগুলো পরিদর্শন ও কেনাকাটা সেরে মাগরিবের পূর্বেই তিনি প্রাসাদের উদ্দেশে রওনা হন।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments