উন্মেষকাল

সাব্বির জাদিদ

মোড় ঘুরতেই মসজিদের মিনার ভেসে ওঠে। কপাল থেকে সানগ্লাস নামাতে নামাতে ড্রাইভারকে দ্রুত গলায় থামতে বলেন বাবা। মসজিদে জুমার খুতবা চলছিল তখন। নামাজের জন্য বাবার হাত ধরে গাড়ি থেকে নেমে আসে মুগ্ধ। মা আর মালপত্তর নিয়ে গাড়িটি এগিয়ে যায় দাদু বাড়ির দিকে। রমজানের শেষ জুমা বলেই মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ। মুসল্লিদের ভেতর বিরাজ করছে সংযমের পবিত্র আভা। ওজু করে পেছনের কাতারে এক টুকরো জায়গায় বসতে বসতে শেষ হয়ে যায় দাদুর খুতবা। শেষ মুহূর্তে মিম্বরের ওপর দাদুর পাগড়ি পরা সুশ্রী মুখটা দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে মুগ্ধ—বাবা, দ্যাখো দাদু! একমাত্র সন্তানের দিকে তাকিয়ে বাবা প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন।

করোনার কারণে দু বছর পর গ্রামে ঈদ করতে এলো মুগ্ধ। দু বছরের বিরতির পর ছুটিপুর গ্রামখানি সম্পূর্ণ নতুনরূপে ধরা দিতে লাগল মুগ্ধর চোখে। পাখির ডাক আর সবুজ ঘাসের স্পর্শের ভেতর যে এমন মায়াবী সৌরভ লুকিয়ে থাকে, আগে বোঝেনি ও।

বৃক্ষছাওয়া সবুজ পাতার ভেতর সাদা রঙের ছিমছাম একতলা দাদু-বাড়ি মুগ্ধদের। এত বড় বাড়িতে মানুষ মাত্র তিনজন। দাদু, দিদা আর কাজের মেয়ে রোজিনা। আতিথ্যের শূন্যতায় ধুকতে থাকা বাড়িটা আজ নতুন অতিথি পেয়ে সরগরম হয়ে ওঠে। দাদু তার মনোযোগের সবটুকু নিংড়ে দেন উত্তর-প্রজন্মের জন্য। গ্রামের সবুজ পথের মতো দাদুর সান্নিধ্যও ভিন্ন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয় মুগ্ধর কাছে। তখন ও বুঝতে পারে, দু বছরে ওর দেখার চোখ বদলে গেছে। বদলে গেছে অনুভবের পেলবতা। আসলে মানবজীবনে শৈশব এমন এক অলৌকিক কাল, যেখানে মুহূর্তে মুহূর্তে অনুভূতির রূপান্তর ঘটে যায়। সেই অলৌকিক রূপান্তর মুগ্ধ টের পায় দাদুর সাথে গ্রাম দেখতে বেরিয়ে, আসরের পর।

মা নিষেধ করেছিল। রোজা রেখে আড়াই শ কিলোমিটার জার্নি করে এসে রোদে রোদে ছুটে বেড়ালে মুগ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়বে—এই ছিল মায়ের আপত্তির জায়গা। দাদু বললেন, হৃদয় যেখানে সরব, শরীরের নীরবতায় কিছু এসে যায় না, বউমা। তাছাড়া রোদ ধরে এসেছে। এই সময়টাতে বরং ঘরে বসে থাকলে ইফতারের প্রতীক্ষা ফুরাবে না।

ঈদগাহ মাঠের কোলঘেঁষে চুলের ফিতার মতো ক্ষীণকায় বৈশাখী নদী। নদী দেখে মন খারাপ হয়ে যায় মুগ্ধর। নালার মতো ক্ষীণ স্রোতধারা নিয়ে যেনবা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে নদীটা। এক সময় যেখানে থইথই করত পানি, সেখানে এখন ধানক্ষেতের আইল। দাদুর হাত ধরে পানির একেবারে কাছে চলে এলো মুগ্ধ। কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ টলটলে পানির ভেতর কয়েকটি ছোট মাছ পুচ্ছ দোলাচ্ছে। মাছ দেখে, হোক তার আকার সাংঘাতিক রকমের ক্ষুদ্র, উত্তেজিত হয়ে উঠল মুগ্ধ—দাদু, মাছ!

কিন্তু দাদুর সাড়া নেই। দাদু তখন বিষণ্ন চেহারায় ডাঙায় পোটলা করে রাখা ছোট ছোট শামুক পানিতে ফেলতে ব্যস্ত। পায়ে পায়ে দাদুর কাছে এগিয়ে যায় মুগ্ধ। বলে, কী করছ তুমি?

চেহারার মতো কণ্ঠেও বিষণ্নতা দাদুর—ওদের আর কতভাবে বোঝাব, এই শামুকগুলোরও প্রাণ আছে। ওরা আমাদের প্রকৃতির সম্পদ, আমাদের জীববৈচিত্র্য।

বৈশাখীর পানি কমে গেলে ছুটিপুরের লোকেরা ঠেলাজাল দিয়ে মাছ ধরে। একেক ঠেলায় ওঠা মাছগুলো তারা খুঁটে খুঁটে খালই ভর্তি করে আর জালে লেপ্টে থাকা শামুক, পোকামাকড়, কাঁকড়া, শ্যাওলা তারা জাল উপুড় করে ফেলে দেয় ডাঙায়, জালের আবর্জনা সাফ করে। কাঁকড়া আর বড় শামুকগুলো হয়তো জলে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু ওই জলজ উদ্ভিত, শ্যাওলা, ঝাঁকবদ্ধ ছোট্ট ছোট্ট শামুক, ওরা ফিরতে পারে না ঘরে। ডাঙায়, রোদের উত্তাপে ওরা কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়। যে নদী ছুটিপুরবাসীকে মাছ খাওয়ায়, সেই ছুটিপুরবাসী নদীর সন্তানগুলোকে সজ্ঞানে হত্যা করে। মানুষ এতটা অকৃতজ্ঞ!

দাদুর কথায় হতভম্ব হয়ে যায় মুগ্ধ। সৃষ্টির প্রতি দাদুর মনে এত মায়া! দাদুর সাথে ও নিজেও হাত লাগায় অসহায় শামুকগুলোকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়ার ব্রতে।

দাদু বলেন, জুমার খুতবায় আমি মুসল্লিদেরকে এই নিষ্ঠুর কাজটি থেকে বিরত থাকতে বলি। কেন, জালের আবর্জনা সাফ করার জন্য জালটা পানির ভেতর উপুড় করে ঝাড়া দিলেই তো হয়। এতে বেঁচে যায় অজস্র প্রাণ। রক্ষা পায় আমাদের প্রকৃতি। অথচ খুব কম মানুষই আছে যারা আমার অনুরোধ মনে রাখে। মানুষ বড় উদাসীন। স্বার্থপর। নিজেরটুকু হয়ে গেলে এরা আর কিছু ভাবে না।

ফেরার পথে দেখা হয় মোমিনুলের সাথে। মোমিনুল মুগ্ধর বাবার বয়সি। গালের কাছে কাটা দাগ। দারিদ্র্যের ঝাপটায় বিধ্বস্ত শরীর। দাদু বলেন, মোমিনুল, চলো যাই, আজ আমাদের সঙ্গে ইফতার করবে। শহিদুল এসেছে ঢাকা থেকে। দেখা হয়ে যাবে।

বাবার কথা শুনে লোকটা ভেতরে ভেতরে আঁকুপাঁকু করে ওঠে। দাদুর পাশ ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে বলে, চাচা, শহিদুল আর আমি এক সাথে পড়তাম। আপনের ছাওয়াল কত বড় অফিসার হলো আর আমি হলাম কামলা। আমার বাপটা যদি…

এসব বলতে নেই মোমিনুল। এই পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। পৃথিবীতে সব ধরনের মানুষেরই দরকার আছে।

ভাতিজা, তুমি তো মেলা বড় হয়ে গেছ। দুই বৎসর পর গিরামে আসলে। মুগ্ধর দিকে চেয়ে হাসতে থাকে মোমিনুল। উত্তরে মুগ্ধও মুচকি হাসি উপহার দেয় বাবার বালকবেলার বন্ধুকে। এরপর চোখের সামনে দাদু বাড়ির পাঁচিল ভেসে উঠলে মুগ্ধ ফিসফিস করে দাদুকে বলে, লোকটার পোশাক এবং চেহারার যে অবস্থা, আমাদের সাথে কীভাবে ইফতার করবে! তাকে দাওয়াত না দিলেই কি হত না!

দাদুও মুগ্ধর মতো ফিসফিস করে বলে, মোমিনুল গরিব, কিন্তু রোজাদার। সর্বোপরি সেও আমাদের মতোই মানুষ। দাদু ভাই, এই বিষয়ে তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব।

ইফতার এবং মাগরিবের নামাজ শেষে চায়ের কাপ হাতে দাদুর কোলের কাছে সরে আসে মুগ্ধ। বলে, এইবার বলো।

দাদু বলেন, আমরা রোজার মাসটাকে খাওয়ার মাস বানিয়ে ফেলেছি। এর পক্ষে একটা ভুল হাদিসও তৈরি করে নিয়েছি। অনেকে বলে, রোজার মাসে খাওয়ার কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। যত খুশি খাও। অথচ রোজার মাস খাওয়ার মাস নয়, খাওয়ানোর মাস। আমাদের নবি বলেছেন, কেউ যদি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তবে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব সে পাবে, কিন্তু রোজাদারের সওয়াব একটুও কমবে না। 

তাহলে কি সওয়াবের লোভেই এই কাজটা করা হয় না? এক্ষেত্রে সহমর্মিতা কোথায় থাকল? দাদুর উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন বাবা।

দাদু বলেন, পৃথিবীতে তুমি সব ধরনের মানুষই পাবে, শহিদুল। কেউ সওয়াব প্রত্যাশী, কেউবা মানবিক এবং সহমর্মী। যে উদ্দেশেই ইফতার করানো হোক, দিনশেষে কল্যাণ তো মানুষেরই। আমার মনে হয় সবার দিকে খেয়াল করেই নবিজি ব্যাপারগুলোর প্রবর্তন ঘটিয়েছিলেন।

দাদু, বিকেলে তুমি যে শামুকের জীবন বাঁচালে, এই ব্যাপারেও কি আমাদের নবির নির্দেশনা আছে?

অবশ্যই আছে। নবিজি বলেছেন, কেউ যদি অকারণে একটি চড়ুই, এমনকি এরচেয়ে ক্ষুদ্র কোনো প্রাণীকেও হত্যা করে, আল্লাহর কাছে এর জন্য তাকে হিসাব দিতে হবে।

আমাদের নবি এত কথা বলেছেন? মুগ্ধতায় মুগ্ধর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে।

জবাবে হাসি ছাড়া ভাষায় কিছু বলেন না দাদু। ভাবখানা এমন, আমার সংস্পর্শে থাকো কিছুদিন, ধীরে ধীরে সব জানতে পারবে। পরদিন দাদুর সাথে গ্রাম দেখতে বেরিয়ে সত্যি সত্যি নতুন আরেক আলোর দেখা পায় মুগ্ধ। দাদু ওকে গ্রাম দেখাবার কথা বললেও আদতে ওকে দেখাতে থাকেন গ্রামের মানুষ এবং তাদের ঘরবাড়ি। বেছে বেছে এমন সব বাড়িতে তিনি নিয়ে যান নাতিকে, যাকে বাড়ি না বলে কুঁড়েঘর বললেই মানানসই হয়। এবং দাদু এইসব কুঁড়েঘরের বাসিন্দাদের হাতে তুলে দেন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির আনন্দে লোকগুলোর চেহারা প্রদীপ শিখার মতো কাঁপতে থাকে, ওই আনন্দোজ্জ্বল মুখগুলোর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকা যায়। লোকগুলো টাকায় চুমু খায় আর মুগ্ধর জন্য রুদ্ধ কণ্ঠে দোয়া করতে থাকে। মুগ্ধ এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করে, দাদু, এ কীসের টাকা?

সদকাতুল ফিতরার টাকা, দাদু ভাই।

সদকাতুল ফিতরা শব্দযুগল নতুন এবং দুর্বোধ্য লাগে মুগ্ধর কাছে। বলে, এটা আবার কী, দাদু ভাই?

আরবি পরিভাষা তুমি বুঝবে কীভাবে! তুমি তো আর আমার মতো মাদরাসায় পড়োনি। এর মানে হলো রোজা সমাপ্তির দান। আজ আটাশ রোজা। দুদিন পরেই রমজান মাস শেষ হয়ে যাবে। তারপর আসবে আমাদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ। রোজা সমাপ্তির আনন্দে এবং ঈদের খুশি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। এটা ইসলামের বিধান।

কেউ যদি ফিতরা না দেয়?

না দিলে তার গোনাহ হবে।

পথের ওপর ছাতিম গাছের ছায়া চৈত্রের বাতাসে মৃদু মৃদু কাঁপছিল। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন জীবন্ত আল্পনা। দাদু সেই আল্পনার ভেতর পা গলিয়ে বলতে থাকেন—ফিতরা ঈদের আগেই দিতে হয়। যেন টাকাটা নিয়ে গরিব মানুষগুলো ফিরনি-পায়েসের ব্যবস্থা করতে পারে। আমাদের নবিজি ঈদের আগেই ফিতরা আদায় করে দিতে বলেছেন। বলেছেন, কেউ যদি ঈদের আগে ফিতরা দেয়, জাকাতের সওয়াব পাবে। আর ঈদের পরে দিলে সেটা হবে সাদামাটা এক দান।

দারুণ তো!

আমরা দুইভাবে আনন্দ উপভোগ করি, দাদু ভাই। ভোগ আর ত্যাগের মাধ্যমে। দুটোর মধ্যে উত্তম আনন্দ হচ্ছে ত্যাগের আনন্দ। ইসলাম আমাদের যতগুলো আনন্দের উপলক্ষ্য দিয়েছে, সবগুলোর ভেতর আগে আছে ত্যাগ, তারপর ভোগ।

যেমন?

আমি এখনো ঈদের বাজার করিনি। তার আগেই গরিবের জন্য ফিতরা দিচ্ছি। ভোগের আগেই ত্যাগ করছি।

দাদু, ত্যাগের আরেকটা এক্সাম্পল দাও তো।

মুসলমানদের আরেকটা ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ। এই ঈদে ধনীদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। আমাদের নবিজি বলেছেন, কেউ যদি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি না দেয়, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে। কত বড় কথা! এবং কোরবানির ঈদে আমরা কী করি? আগে গরিবের হাতে তার ভাগটুকু দিয়ে তবেই নিজের ভাগ ঘরে তুলি। এখানেও সেই ত্যাগের নিদর্শন। আগে ত্যাগ তারপর ভোগ।

দাদু, সবাই কি তোমার মতো ভাবে? আমি এগুলো আগে জানতাম না।

মানুষ তো মাতৃগর্ভ থেকে সবকিছু জেনে আসে না। তুমি এখনো ছোট। ধীরে ধীরে সব জানতে পারবে। তবে জানার জন্য লাগবে একটি তৃষ্ণার্ত হৃদয়।

রমজানের ঊনত্রিশ তারিখ সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়ে দাদুর সঙ্গে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো মুগ্ধ। আজ চাঁদ উঠলেই কাল ঈদ। মসজিদ চত্বরে শিশুদের হল্লা চলছে। কেউ একজন দরাজ গলায় গান গাচ্ছে: ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…। চারদিক আনন্দের সৌরভ অথচ দাদুর মন খারাপ। ইবাদতের বসন্তকালটা চলে যাচ্ছে যে!

দাদু মুগ্ধর হাত ধরে নিয়ে গেলেন বৈশাখী নদীর তীরে। জায়গাটা ফাঁকা। ঘরবাড়ি নেই। বড় গাছপালা নেই। চাঁদ উঠলে সহজেই দেখা যাবে। দাদু বারবার বলছিলেন, চাঁদ যেন আজ না ওঠে। প্রিয় মাসটার ভাণ্ডারে আরও একটা দিন যুক্ত হোক। কিন্তু দাদুর কামনাকে অগ্রাহ্য করে বাঁশবনের মাথার ওপর মায়ের ভ্রুর মতো চিকন চাঁদের দেখা মিলল। চাঁদের ওপর চোখ পড়তেই চিৎকার করে উঠল মুগ্ধ—দাদু, ওই তো চাঁদ! মুহূর্তে ছুটিপুরের বিভিন্ন মোড় থেকে চাঁদ দেখা বিষয়ক চিৎকার ভেসে আসতে লাগল। চারিদিকের ওই চিৎকার রক্তে নাচন তুলল মুগ্ধর। ও নাচতে নাচতে বলল, কাল ঈদ। কী মজা!

চাঁদের দিকে তাকিয়ে দাদু বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। তারপর নদীর তীরের ঠান্ডা ঘাসের ওপর বসতে বসতে মন খারাপ করা গলায় বললেন, আজ তারাবি নেই। কিছুক্ষণ বসে যাই।

গল্পের বইয়ের মতো নদীকে সামনে নিয়ে বসতেই সেদিনের সেই শামুকের কথা মনে পড়ল মুগ্ধর। বলল, দাদু, সেই শামুকগুলো কি পানিতে যাওয়ার পর বেঁচে উঠেছে?

জানি না, দাদু ভাই।

তুমি অন্য রকম। সামান্য শামুকের জন্যও তোমার মায়া।

অন্য রকম মানুষদের ঝামেলাও আছে, দাদু ভাই। সব সময় এদের মন খারাপ থাকে। খুব তুচ্ছ কারণে এদের মন খারাপ হয়। ভূমিকম্পের কবলে পড়া এক গ্লাস পানির মতো এদের মন সর্বদা টলমল করে বেদনায়।

কেন এমন হয়?

কারণ, মানুষ এবং প্রকৃতিপ্রেম এদেরকে সর্বদা আচ্ছন্ন করে রাখে। আর প্রকৃতিতে সব সময় কোনো না কোনো বিপর্যয় ঘটেই চলে। সেই বিপর্যয়ের ভারে এদের মন খারাপ হয়। লাউয়ের মাচায় এক জোড়া ঘুঘুর বাচ্চা তুলে উড়ের যাওয়ার ঘটনাতেও এদের চোখ সজল হয়। তুমি কখনো প্রকৃতির স্বভাব খেয়াল করেছো? এরা সর্বদা সৃষ্টির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। কবে কোথায় মাটিতে একটি বীজ পড়ল, সেই বীজ থেকে চারা গজাতে প্রকৃতি তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বীজের ওপর যদি তুমি পাথর চাপা দাও, কদিন পর দেখবে পাথরের কোণা দিয়ে সবুজ উঁকি মারছে। আমাদের উঠোনেও গজায় এমন অসংখ্য অপরিকল্পিত গাছের চারা। আর সামাজিক দায় থেকে সেই আগাছা আমাকে পরিষ্কার করতে হয়। তখনো, একটি সবুজ আগাছার শেকড় কাটতে গিয়েও, আমার মন খারাপ হয়। প্রকৃতি সৃষ্টির জন্য উন্মুখ আর আমরা ধ্বংসের জন্য ব্যাকুল। দাদুর কণ্ঠ ধরে এসেছিল। হঠাৎ জরুরি কিছু মনে পড়ে যাওয়া ভঙ্গিতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন আর বললেন, দাদু ভাই, চলো চলো। কাল না ঈদ! এতক্ষণে নিশ্চয় রাফিদদের বাড়িতে ছেলেরা এসে গেছে। ঈদগাহ সাজাতে কাগজের ফুল কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

রাফিদ ও তার বন্ধুরা কলেজে পড়ে। প্রতি বছর ঈদগাহ সাজানোর দায়িত্বটা ওদের কাঁধেই ন্যস্ত থাকে। ওদের হাতের কাজ চমৎকার। মুগ্ধকে রাফিদদের বাড়িতে রেখে এলেন দাদু। একটি ঈদ কীভাবে পল্লবিত হয়ে ওঠে, একটু একটু করে দেখুক ছেলেটা।

ঈদগাহ সাজানোর কাজের যে আনন্দ, তা ঈদের আনন্দের চেয়ে কম নয় কোনো অংশে—রাফিদদের বাড়িতে গিয়ে একটুক্ষণ থাকার পরই উপলব্ধি করতে শুরু করল মুগ্ধ। দাদুর এই সিদ্ধান্তে মনে মনে অসন্তুষ্টই হয়েছিল ও। কিন্তু রাফিদদের বাড়িতে গিয়ে, কাগুজে ফুলের নানা রকম কারুকাজ দেখে ওর মন ভালো হয়ে ওঠে। অল্পতেই ভাব হয়ে যায় রাফিদ ভাইয়াদের সঙ্গে। মোবাইলে নজরুলের গজল বাজে। গজলের তন্ময়তার ভেতর কখন যে একটি শুষ্ক কাগজ জীবন্ত সূর্যমুখী ফুল হয়ে যায়, তা বিস্ময়কর। একটু দেখে নিয়ে মুগ্ধ নিজেও হাত লাগায় ফুল বানানোর কাজে। আনন্দের ঝরনাধারায় চাঁদরাতটা একটু একটু করে গাঢ় হতে থাকে, তবু ঘুম পায় না মুগ্ধর। শেষে, রাত বারোটার পর দাদু এসে ওকে ঘুমুতে নিয়ে যান।

মুগ্ধর খুব ইচ্ছে ছিল, ঈদগাহ সাজানো দেখবে। কিন্তু ঘুমের প্রবল চাপে ওর আর ওঠা হয় না ভোরে। একবারে গোসল করে দাদুর হাত ধরে নামাজ পড়তে গিয়ে ও অবাক হয়ে যায়। ফাঁকা ঈদগাহটা একরাত্রির ব্যবধানে নববধূর মতো সেজে উঠেছে। দাদু খুতবা দেন। কিন্তু খুতবার কঠিন কঠিন উচ্চারণ কানে পশে না মুগ্ধর। ও বরং চারপাশে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেখতে থাকে ঈদের মাঠ ও মানুষের সৌন্দর্য। ছুটিপুরে ওর বয়সি ছেলেদের সংখ্যা কম নয়। সাধ্যের ভেতর সকলে নতুন পোশাক পরেছে। আতরের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। ও একবার দাদুর পাশে দাঁড়িয়ে চোখ রাখে পুরো ঈদগাহ মাঠের ওপর। টুপির অজস্রতাকে মনে হয় ছোপ ছোপ সাদা রঙের আল্পনা।

নামাজ শেষে কোলাকুলি করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে হোঁচট খায় মুগ্ধ। চেনা এবং সহজ পথ পরিহার করে দাদু বেছে নিয়েছেন তুলনামূলক দূরের অচেনা পথ। মুগ্ধ থমকে দাঁড়ায়—এই পথে কেন, দাদু?

দাদু তার এই শহুরে নাতির কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম কণ্ঠে বলেন, আমাদের নবিজি একপথে ঈদগাহে যেতেন আর ফিরতেন অন্যপথে।

কেন এমন করতেন? মুগ্ধর কণ্ঠে সেই চিরচেনা কৌতূহল।

যেন পথের ভিন্নতায় নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। ঈদের এই খুশির দিনে অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হবার এবং কুশল বিনিময়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি এমনটা করতেন।

মুহূর্তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে মুগ্ধর। এক ঝটকায় ও চলে যায় পনেরো শ বছর পেছনের মদিনায়। কল্পনার চোখে দেখে, সুঠামদেহী এক জুব্বওয়ালা প্রৌঢ় ঈদের খুতবা দিয়ে শিশুদের মাথায় আতরওয়ালা হাত বোলাতে বোলাতে ঘরে ফিরছেন। দাদুর হাত আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে মুগ্ধ। দাদু, মানুষকে ভালোবেসে তিনি এতকিছু করতেন!

ফেরার পথটা সেই পাড়ার ভেতর দিয়ে গেছে, দুদিন আগে যে পাড়ায় দাদু ফিতরা দিতে এসেছিলেন। দাদুর অনুমতি সাপেক্ষে এ পাড়ার সকল দরিদ্র শিশুর সঙ্গে কথা বলে মুগ্ধ। এরপর সবাইকে নিয়ে আনন্দ মিছিল করতে করতে বাড়ি ফেরে ও। ঈদের এই দিনটাতে মুগ্ধর দাদু বাড়িটা মুখর হয়ে ওঠে দরিদ্র বাচ্চাদের কলহাস্যে। শুরুতে অনভ্যস্ত জড়তায় দূরত্ব এবং গাম্ভীর্য বজায় রেখে চললেও একটু পরেই খুলে যায় ওদের সকল আড়ষ্টতার পালক। ওরা মুগ্ধর ঘরে লাফায়, চিৎকার করে আর হঠাৎ থমকে গিয়ে কোনো একটা খেলনা দেখে। দেয়ালের পেইন্টিং দেখে সবচেয়ে চালাক ছেলেটা ফিসফিস করে—আমাগের গাঙ। চামচে সেমাই খাওয়ার অদক্ষতার দরুণ ওরা পিরিচে আঙুল ডোবায় আর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসে। এই বাড়ি, এই বাড়ির ছেলেটাকে ওদের এত ভালো লেগে যায়, ওদের আর মায়ের কাছে ফিরতে ইচ্ছে করে না। ঘর ভুলে আমের পাতায় ছাওয়া বাগানে ওরা মুগ্ধর সাথে খেলে। খেলার ফাঁকে ওরা যখন জানতে পারে, দুদিন পরেই তাদের ‘বড়নোক’ বন্ধু ঢাকায় চলে যাবে, ওদের মন খারাপ হয়। পেইন্টিং দেখে ‘আমাগের গাঙ’ বলা ছেলেটা বলে, তুমি আর ঢাকায় যায়ো না। আমাগের সাতে গিরামের স্কুলে ভর্তি হও।

ছেলেটির ওই প্রস্তাব সেই রাতে ঘুমাতে দেয় না মুগ্ধকে। সারারাত ছেলেটির কণ্ঠস্বর ওকে ফুসলায়, প্রলুব্ধ করে—তুমি আর ঢাকায় যায়ো না। কী এমন ক্ষতি হবে, মুগ্ধ যদি গ্রামের স্কুলে ভর্তি হয়। ক্ষতি তো হবেই না, বরং লাভ হবে। দাদু তো প্রায়ই বলেন, প্রকৃতির পাঠশালা থেকে অর্জিত জ্ঞানই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। তাহলে?

ঘুম ভেঙে বাবা-মার কাছে তো নয়-ই, বন্ধুর মতো দাদুর কাছেও প্রস্তাবটি পাড়ার সাহস হয় না মুগ্ধর। ছুটির বাকি দিনগুলো ও গম্ভীর হয়ে থাকে। দাদুর সঙ্গে গ্রামদর্শনে বেরোয়, বন্ধুদের সাথে খেলে; কিন্তু সর্বক্ষণ কানে বাজে সেই প্রস্তাবখানি: তুমি আর ঢাকায় যায়ো না। হায়! মুগ্ধ যদি চিরকালের জন্য রয়ে যেতে পারত প্রকৃতির কাছে!

অবশেষে ঢাকা ফেরার নিষ্ঠুর দিনটি এসেই যায়। মুগ্ধ থমথমে মুখে চোখ মুছে গাড়িতে উঠে বসে। ভেতরে ভেতরে ও এতটাই অভিমানকাতর—দাদু-দিদার কাছ থেকে হাসি মুখের বিদায় পর্যন্ত নেয় না। যেন ওর এই চলে যাওয়ার দায় সবটুকুই দাদু-দিদার। কেন তারা ওকে আটকাচ্ছে না!

ওদের গাড়িটি যখন সেই দরিদ্রপাড়া অতিক্রম করে, মুগ্ধ অবাক হয়ে দেখে, ওর বন্ধুরা রাস্তার দুপাশ থেকে খেজুর শাখা উঁচু করে ধরে ‘বড়নোক’ বন্ধুকে বিদায় সংবর্ধনা জানাচ্ছে। খেজুর শাখার সেই তোরণের ভেতর দিয়ে গাড়িটি যখন বেরিয়ে যায়, মুগ্ধ ফিসফিস করে: আমি আবার আসব। ততদিন তোমরা ভালো থেকো।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments