আগুনকলের বতর

সুবন্ত যায়েদ

রাত গাঢ় হইতেই স্বপ্নের উপাদানে ডর মিশে যাইতেছে। ঘুমকাতুরে সোনালীর না ঘুমানো চোখ তবু সকালটা দেখে মনোরম। সূর্য ফাটা আলোয় চোখ মেলিয়া দেখে সর্পউদ্ভিদ পরথমবারের মতো ফুল দিছে। মরণের ইশারা দিয়ে স্বপন আসার পর এমন ফুলের ইংগিত ঘোরতর প্যাচানো বিষয় মনে হয়। হয়তো মরণের শিয়রে সবসময় এই রকম আচানক এক ফুল ফোটে। এসব ঝোড়োচিন্তাময় সময়ে সোনালীর ঘরপড়শি লাগাতার কোনো টিউটোরিয়াল দেখতে থাকে। এরই মাঝে সে ঘরপড়শিরে ডাইকা কয়, তুই যখন কারো মরণের কথা শুনিস, অথবা দেখিস, অথবা কোনো সমাধি পার হয়া যাস, তখন সর্বপরথম তোর কী মনে আসে?

সোনালীর ঘরপড়শি থমকায়া থাকে। আরো থমকায়া থাকে তার ফোনের টিউটোরিয়াল। সে কয়, কী আর মনে হয়, কিছুই মনে হয় না। অত মনে হওনের টাইম কই? থাকি সারাদিন দৌড়ের উপ্রে। যার মরার সে মরবই। আমিও তো একদিন যামুগা। কিন্তুক এসব মরামরি বিষয় নিয়া ভাবার মতো অবসর জীবন তো পাই নাই।

এই কইয়া সে আবার টিউটোরিয়ালে মুখ ডোবায়। আর সোনালী গরম একটা শ্বাস ফেলে হাসে। অথচ দ্যাখ, আমি যখন কাউরে মরতে দেখি বা শুনি, অথবা কোনো গোরস্থান পার হয়া যাই, তখন পরথম আমার নিজের কথাই মনে আসে।

এভাবে সোনালীর বিহান লম্বা হইতে থাকলে চারদিক থেকে ধাওয়া আসে। টাইমটা ফট করেই অপিসের দিকে যাইতে ধরে। তারপর যখন সে বাইর হয়, দেখে যথাসময়েই হরেক গাড়ি নিয়া জ্যাম আইসা হাজির হইছে।

কিন্তু সোনালীর পা দুখানা রাস্তায় নামতেই তব্দা খায় আরো কারণে। এপ্রিল মাসের আগমন হইলে, অথবা মে আর জুন মাসেও আগুনগোলার নাম পরানো হয় তপ্ত রোইদ। সেই রোইদে বাইর হইলে ঝাঝরা হয়া তাপ আসে। বাতাস নিয়া অনেক কামনা থাকে মাইনষের। কিন্তু রোইদ বাতাসরেও আলগোছে পটায়া ফেলে। আর মাইনষেরা বুক থাবড়ানো বেদনা পায়। সোনালীর মনে হয়, লু মেশানো হাওয়া অ্যাসিডের পাওয়ার নিয়া গালে আছড়াইয়া পড়তেছে। সবুজের হাহাকার নিয়া টিকে থাকা ঢাকা শহরের বুকে সবুজ রঙা ছাতা লোকপ্রিয় হইতেছে এমন সময়ে। আর সোনালীর হলুদ ছাতা অজস্র সবুজের ভিতরে ভ্রুকুটি মারে। তখন তার মুখে হলদে রঙ দখল নিয়া ফেলে। তাতে মুখটা তার কামারের তাপ আগুনের আখড়া হয়। গোটা দ্যাশটাই যেন তাই, কামারের আগুনকলের বতর শুরু হইছে। যে শহরে ও গঞ্জে লালা ছিটানো লালসার কাছে বিরিক্ষ পরাজিত হয়, সে শহরে চিরজনম আগুনকলের বতরই মানানসই।

এইসব বহুল বিলাস দর্শনের ভিতরে সোনালীর চোক্ষু টাটায়। সে পুনরায় দশাদৈন্যময় জ্যামের কাণ্ড দেখে। সেই পুরানা রঙে ঢঙে। কতক রঙচটা বেসারি হয়া দাঁড়ানো গাড়ি। জ্যামের তাইলে এই ছিরি! আজকে যেন একদম কোনো সৌন্দর্য দেখা যায় না। জ্যামের বিবেক ও সৌন্দর্যবোধ নিয়া এখন হরহামেশা আঙুল তোলা যায়। বুড়া জ্যাম তার মগজের ক্ষেম্তা হারাইতেছে।

ভাবনারা এভাবে কইলজার সীমানা চক্কর দিতে থাকলে সোনালী নিজেরে সেই কারেকটারের মতো দেখে, যে এক্সএক্স ক্রোমোজোমের কারেকটার নেংটু হয়া সিগনাল দিয়া ট্র্যাফিক সামলায়। কেন এমন ফালপাড়ানি কথা আসে? আরো মনে আসে, পোশাক এক আদুরে জঞ্জাল। দেহকে তাহা হইতে ছাড়াইয়া পাবলিক হইতে দম লাগে। যাহাদের দম আছে তাহারা জানে দেহ দেখানো কসরৎ তাহার ভেতর মজা আছে। এমন এক মজার ভিতরে ঘরে ঘরে কচি বুড়োদের লিঙ্ক পাবলিশ হইতেছে। জগতে রক্তের কেউ নাই বলে সোনালীর এসব লিঙ্ক নিয়া কোনো গাব্যথা নাই। কিন্তু মনের ভিতরে  ঠিকই স্বজন না থাকার বেদনা আসে।

কড়া উগরানো রইদের ভেতর বেদনার মতো কিছু ভাববে না বলে সে এসব থেকে বাইর হয়। তারপর সময় মাপে। তখন ১৫ মিনিট কম ৯টা বেজে ওঠে। সূর্যখানা রোজ অপিসের সময়ের সাথে তাল মেলায় কিন্তু শালার রাস্তার সাথে লক্কর বাসগুলা তাল মেলায় না। যেভাবে তাল মেলায় না বয়সের সাথে জীবনটাও। তবে তাল মেলায় সোনালীর দুখানা পা। পিপিলিকার মতো পিলপিল করে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তারে আগায়া দেয়। সে হাঁটতে হাঁটতে জ্যাম প্রকল্পের অনেক অ্যারিয়া পার করে আসে। মন চাইলো বলে সোনালী একবার তাকায় গাড়ির জানালাদের দিকে। অনেক নির্বিষ চোক্ষুর ভিতরে সে দেখে, প্রেম আছড়াইয়া পড়া কাপলেরা রসালো বদন লইয়া বসে আছে। এই জ্যাম তাইলে উহাদের কাছেই শুধু স্বস্তির বারতা দেয়। বসে থাকতে থাকতে দুয়েকঘেয়ামি আসলে কিছুটা জার্নিও হয়। ইহা এক প্রদচমক জেনারেশন, যে জেনারেশনের উপর দিয়া অতি সফলতার সহিত টিকটক পার হইতেছে।

 

সোনালী উপস্থিত হয়া দেখে অপিস জোড়তোড় শুরু করছে। কাজ আইসা বসে আছে ডেস্কে। সোনালী চেয়ার টাইনা বসে। অপিস কী এক চেয়ার আমদানি করছে, কিছুক্ষণ বসলেই পাছা ঘেমে সপসপা হয়। সোনালী ভাবে, ইহা কি তবে পাছারই কোনো কীর্তি হবে! খরার দ্যাশে এমন জল কামানো পাছা মন্দ কী। পড়শি দ্যাশ নদীগুলাতে পানি আসবার দেয় না। এপ্রিল আইলেই পানি নাইমা যাইতেছে সারা দ্যাশেই। বৃষ্টির দেব্তার ছুটি আর ফুরায় না। আর মানুষজন বিজি আছে নানা মাত্রার নুনুভূতি ও তাহার প্রাপ্ত আঘাত লইয়া। মানুষ বাঁচলে তবেই না নুনুভূতি!

এসব ভাবনা-ফিকিরের ভিতর সে সোস্যাল মিডিয়ায় ভিজিট করে। আর কাংগালাদেশ নামে ট্রোল দুনিয়ায় নয়া একখান দ্যাশ আবিষ্কার করে। সোনালী দুঃখটুক্ষ পায় অথবা সে ফিক করে হাসি মারে। আর বসের কামরা থেকে ডাক আসে বরাবর সোনালীর টেবিলে। তখন সোনালী পাছা পরখ করতে করতে বসের একান্ত কামরায় যায়।

বস জিগায়? কী নাম?

সোনালী কয়, বস কোথাও আপনার ভুল হইতেছে।

বস আগুনমুখে কয়, আমি ভুল? ভারি তো আশপদ্দা?

সোনালী চ্যাকাভ্যাবা খায়, স্যার আমি সোনালী, আমার তো রুপালী হবার কোনো সম্ভাবনা নাই। আমি এই অপিসে তিন মাস আছি।

বস ধমক লাগায়, সত্যিই তো ভারি আশপদ্দা! কর্পোরেট কোনো ডিসিপিলিন নাই। এই অপিসে আমি কাউরেই চিনি না। আমি চিনি কাজ। যাহাকে যা জিগাবো, তাহাকে তাই কওয়া লাগবে জিগানো মাফিক। এই সীমানা ছাড়া অপরাধে আমি কি পানিশমেন্ট দিতাম মিস সোনালী?

অন্যত্র ভিজে গেলেও গলাটা এবার ঠিকই শুকায়া ওঠে। শুকনা গলায় কোনো মতে ঢোকটা গেলে। তারপর মিনতি করে কয় যে, আমার বিরাট ভুল হয়া গেছে স্যার, ক্ষমা শো করা আপনার একটা গুন বলেই জানি। 

বস শান্ত হয়া আসে রইদে নেতানোর মতন। বুকে খানিক আশা বান্ধে সোনালী। সেই বুকেই আশা-ভরসার কাছাকাছি কোথাও ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমা পড়ে। সামনে আয়না নাই তবু চুপসে যাওয়া বেলুনমুখ সে দেখতে থাকে। ইহার ভিতরেই ভাবতে ভাবতে সে কথাটা কইয়া ফেলে।

স্যার, আপনি কি আমার কাছে একান্ত কিছু চান? আমি তো এসবে কোনো সমস্যাই দেখি না।

তখন বসের মাথার উপর যেন দুপুরের তাতানো রইদ ঢাইলা পড়ে তরলের মতন। সে আরো নেতায়া পড়ে, ঘাম মোছে টিস্যু কাগজ দিয়া। তারপর কহে, ঠিক আছে তুমি রাইতে বাসায় আইসো। 

অপিসের সকলে তাজ্জব বনতে গিয়া পাগলা হয়। তারা ইথারে ওথারে শোর তোলে। তারা জানে বসভাণ্ডারে ক্ষমা নামক কোনো শব্দ নাই। সামান্য হেরফেরেই সে অপিস থেকে উস্টা মারে কর্মীদের। সোনালীরে তবে ক্ষমা দিলো দেহদানের প্রস্তাবেই! অথচ কতো সুন্দ্রি উজাড় করে দিতে চাইলে বস কটাক্ষ মারা হাসি দিছিলো। তবে কি তাহার কিছু নাই! এমন এক রসালো অতৃপ্ত কামনা-বাসনার গপ্প ছড়ায়া পড়ে টেবিলে টেবিলে। এদিকে সোনালী তো তত সুন্দ্রিও নহে। তাইলে বস যে কোন মোহে গ্রস্ত হইলো তাহা রহস্য।

কিন্তু এক দিনেই সোনালী অপিসে স্টার হয়া ওঠে। সকলেই তাহার দিকে তাকায় আর ইনায়াবিনায়া গল্প ছাড়ে। অথবা তার  ফিগারে স্পেশাল কিছু ধরা পড়ে কিনা এমন উৎসুক চোখ চোরাগোপ্তা হামলা করে। এসব উপভোগ করলেও বসের খাস বান্দী হইতে বুকটা কোথাও থরথর করে সোনালীর। কারণ সে ভেবেই পায় না বস তারে কোন ক্যাটাগরিতে বিশেষ করে তুলছে। এভাবে সে ‘কত সুন্দ্রি গেল তল, সোনালী কয় কত জল’ টাইপের পুরনো ছড়া রিক্রিয়েট করে। এমন তাজ্জব সমূহ ঘটনাপ্রবাহে থরথরানো বুক লইয়া বসের বাংলো বাড়িতে হাজিরা দেয় সোনালী, তখন রাইত সন্ধ্যা হয়। সোনালী দেখে, এমন গরমের রাইতে আকাশে তারা ফোটার মতন শিউলি ফুটে আছে। বাংলোটাও কেমন আকাশের লাহান রহস্যময় লাগে। আন্ধার আর শলোকের তিরতিরানো কাপঝাপ হয়। বস এমনই আলো আঁধারের পেট থেকে নাজেল হন। এমন আচানকভাবে যে, সোনালীর হার্টবিটে দরপতন ঘটে। বিষয়টা সামলে নিতে পারতো তবু সোনালী চমকায়া ঢঙমারানির মতো বুকে হাত রাখে। বস যেন বুঝতে পারে এবং হাসি মারে অথবা হাসি মারে না। বাংলোজুড়ে আজিবমার্কা আন্ধারে শুধু তাজ্জব রহস্য ফুটে থাকে।

একটু কি আলো জোগাড় করা যায় বস?

সোনালী যেন ভাবরহস্যে ডর খায়। তখন বসও কইয়া ওঠে, তুমি তো বস কইয়া কখনো ডাক পাড়ো নাই? তুমি কি ডরের ফাঁদে পড়তেছো?

স্যার ডর কি তাইলে কোনো ফাঁদ?

হুমম ডরের ফাঁদে পড়লে তুমি ওখানেই শ্যাষ।

স্যার তাইলে আমিও সাহসী হই। আপনি আমারে যেমনে পারেন গ্রহণ কইরা নেন। শুধু একটু আর্লি। রাইতেই আমার আরো একটা জব আছে।

এতো কেমনে পারো সোনালী? শরীরে কুলায়?

পারতে হয় স্যার। নয়তো মরতে হয়। এমন এক বাজার সয়লাব হইছে যে, প্রতিটি মুহূর্ত পয়সা কামানোর ধান্ধায় ঘুরতে হয়। নয়তো বাসাভাড়া হয় তো খাওনে টানাটানি পড়ে। খাওন হয় তো বাসাভাড়া বাকি পড়ে।

এমন একটা সময় মহান মানুষদেরই উদ্ভব সোনালী। আফসোস। কিন্তু আজকে আমি তোমারে গোটা রাতের জন্যই চাই। সূর্যের কুঁড়ি ফাইটা যখন রোইদ বাইর হইবো, তখন আমরা অব্সরে যাবো। ভাবতেছি আইজগা খইফোঁটার মতো তারাফোঁটা রাইতটা দেখবো। মজার কিস্সা হইলো, আমি কখনো খই ফোঁটাই দেখি নাইকা। কিন্তু পত্রিকা ফিচার বানাইছে দেখলাম যে, আকাশ আইজকা ঝকঝকা থাকবো আর খই ফোঁটার মতো তারা ফুটবো। কী গল্পটা মজার মনে হইতেছে?

গোটারাতের কথা শুনে সোনালী তব্দা খায় তবু মাথায় দোল দেয়। তখন বস সোনালীর শরীর ঘেষে আসতে থাকে। সোনালী পরথম দফায় দুপা পিছায়া আবার দাঁড়ায়া পড়ে। বস আরো সামনে চলে আসে। কামনার তুফান ওঠা আকাশের মতো থমথমে লাগে তার মুখ। এইরকম করে বস একদম কাছে চলে আসে, এতোটাই যে, বসের নিঃশ্বাসের গন্ধ মুখে আইসা ঝাপটা মারে। সোনালী থতোমতো খায়া কয়, স্যার আমরা ঘরের ভেতর যাইতে পারি।

ইহা শুনেই বস ছিটকে গিয়ে ঠাস্ ঠাস্ করে অট্ট হাসি মারে। হাসি মারতে মারতে একটা চক্কর দিয়ে আবার সোনালীর সামনে আইসা দাড়ায়া পড়ে।

তা মিস সোনালী, আমরা ঘরে গিয়ে কী করবো?

সোনালী কট খাওয়ার মতো খাড়ায়া থাকে। বস আবারো প্রশ্নের মতো বাণ ছোঁড়ে।

ঘরে গিয়ে কী করবো সোনালী?

সোনালী বলে, আপনি যা চান, স্যার।

চাইলেই কি পাওয়া যায়?

সেটা জানি না স্যার, কিন্তু আমাকে পাইবেন।

তোমারে পেয়ে কী লাভ সোনালী?

এসব হেঁয়ালী সোনালীর মাথার উপ্রে দিয়া যায়। সোনালী খাড়ায়া থাকে।

বস কয়, এই যে আমি সবসময় অপিসের মেয়েদের সামান্য ভুল ও অপরাধে পাছাধাক্কা দিয়ে বাইর কইরা দিই, তাহারা ইনায়াবিনায়া দেহ সাধে। আমি নাকচ কইরা দিই, কেন দিই সোনালী, তাহা কি জানো?

সোনালী মাথা নাড়ায় ও কয়, জানার কথা না স্যার।

কারেক্ট, জানার তো কথা না। সোনালী চলো, আমরা দোস্তি পাতি।

ইহার পর, বসের ঠোঁটের ফাঁকফোকরে চুরুট ঢুকে পড়ে। আর সোনালী খইফোঁটা তারাদের কারখানাজাত বাষ্পমেঘে ঢেকে যেতে দেখে। কিন্তু দোস্তির কোনো মানে খুঁজে পায় না। অথবা সে বুঝতেই পারে না বসের মগজে কী মতলব প্যাচায়া আছে। তখন চুরুটের ধোয়াময় ক্যারেক্টারের ভেতর বস ত্রাতা হয়া সামনে আসে। বস কয়, এতো পাল্টাপাল্টি ভাবনা ভাবার কিছু নাই। আসলে এসব গল্প দোস্তি ছাড়া কানপাচার করা সম্ভব না। তাই আমরা সই ও দোস্ত হয়া উঠবার পারি বৈকি। এমন একটা রাইতের পর আমরা আরো অনেক প্যাচাল পাড়ার সুযোগও পাইতে পারি।

এসব কথার পর, সোনালী ইমোশনাক্রান্ত হয় ও আলগোছে হাতটা বাড়ায়া দেয়। বস তখন ঠোঁটচুরুটে ভেট্কি মেরে ধোঁয়া উড়ায়া কয়, সোনালী, আমি জীবনে তিনটা সংকল্প নিছিলাম।

সোনালী মাথা নাড়ে। আর দোস্ত হওয়া বস কয়, তারমধ্যে একটা হলো আমি কখনো পিতা হবো না। আরেকটা হলো, আমি কখনো বিয়েও বসবো না।

সোনালী কয়, তাইলে তো আপনি সাকসেস। আপনি ওসব ক্ষুদ্রতার পথে আগান নাই। অন্তত, আমরা যে অসভ্যতায় বাস করি, এখানে নতুন কোনো প্রাণ গজানো ঠিক না। কিন্তু আরেকটা সংকল্প?

বস তখন ধোয়ার শরীরে রিং পরায়া বাতাসে ভাসায়। এক দুই করে অজস্র। সোনালী গুনতে গুনতে তড়িঘড়ি তন্দ্রাকে আসতে দেখে। তন্দ্রা আইসা সরাসরি চোখের কোটরেই আঘাত করে। সেই নরম মৃদু আঘাতের পরেও ড্যাবড্যাবে চোখে তাকায়া ওঠে। সোনালীর মনে হয় বস কাইন্দা দিছে। আসলেই কাইন্দা দিছে কিনা জিগাইতে পারে না। ঠিক তখনি বস কয়, যৌন ক্ষমতাহীন একজন ব্যাটা মাইনষের জীবনটা কেমন হয়? যার প্রচুর প্রতিপত্তিও আছে। তুমি চোখ মেলিয়া দেখতে পারো, একজন পুরুষের জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় যৌবনকেন্দ্রিক, অথবা যৌনতাকেন্দ্রিকই। উদযাপনের অধিকাংশ দিকও যৌনতাকেন্দ্রিক। জীবনের সকলই তাই, সরাসরি নয়তো কিঞ্চিৎ অসরাসরি। তাইলে, যৌন ক্ষমতাহীন একজন ব্যাটা মাইনষের জীবনটা কেমন হয়? যার প্রচুর প্রতিপত্তি আছে, মিস সোনালী? আর হ্যাঁ, আমার জীবনের আরেকটা সংকল্প ছিলো, আমি প্রচুর নারীদেহের স্বাদটাদ নেবো। আর সে জন্য আমি একখান অপিস খুইলা বসলাম। যে অপিসে নারী কর্মীদের বাড়াবাড়ি সংখ্যা থাকবে। আবার এমন সব নারী কর্মীদের নিয়াাগ দেবো যাদের প্রকৃত অভাব আছে। মানে আমার একটা প্রসেসের ভেতর দিয়ে যাইতে ইচ্ছে করলো। ধরো চাইলাম আর পায়া গেলাম এমন সস্তার ভিতরে মজা নাই। একটু জোক ভাইবা দেখো, যাবতীয় স্বর্গের ধারণায় এমন সস্তা উপাদানে ভরা।

সোনালী কয়, আপনি কি তাইলে স্বর্গ চান না?

এক ঢোক ধোয়া গিলিয়া বস কয়, নরক আর কে চায়।

সোনালী কয়, কিন্তু আপনার জীবনের শেষ সংকল্প নিয়া আমার ধোঁয়াশা কাটতেছে না।

বস কয়, সত্য কইতেছো না। নয়তো তুমি বোকার হদ্দ। গল্পের এদ্দুরে আইসাও কিছু বোঝো না?

সোনালী লজ্জামার্কা হাসি মেরে কয়, আসলে বিপুল রহস্য লাগতেছে। আপনার পরথম দুইটা সফল সংকল্পের পর তৃতীয় সংকল্প নিয়া কোনো সমাধানে যাওয়া যাইতেছে না। আপনি কেন নারী কর্মীদের ভাগায়া দিতেছেন অথচ তারা শরীর দিতে এক খাড়াপায়ে। আপনার যৌন ক্ষমতা রহিত হওনের কোনো সূত্রও বুঝতেছি না। হাছাই কি এমন কিছু ঘটেটটে গেছে?

বস চুরুটের প্যাকেট হাতড়ায়, চুরুট হাতে ওঠে না ক্যান এমন এক পেরেশানি লইয়া কয়, ইয়েস সোনালী, আমার সেই ক্ষমতা রহিত হয়া গেছে। হঠাৎ করেই একদিন, নিজেকে ক্ষমা দিতে না পারার মতো এক পাপ করার পর। সে এমনই এক পাপ যে, সেটা যেন স্বপ্নে ঘটে গেছে আমার।

সোনালী শুকনা ঢোক গেলে। আপনার তাইলে তীব্র পাপবোধ আছে! কিন্তু সেই পাপটা কী?

বস চুরুটে অগ্নিসংযোগ করে। কয়, সেটা আমি কখনো কাউরে বলি না। কাউরেই বলবো না, ওসব বলা যায় না।

ইহা শোনার পর, সোনালী বসের চুরুটের দিকে তাকায়া সেই পাপ নিয়া ভাবতে ভাবতে ধোয়া গেলার খায়েশ হয়। তারপর কয়, আমিও একটা চুরুট গিলতে চাই।

বস কয়, তোমার ভিতরেও কি বেদনা চেগায়া উঠতেছে সোনালী? আমরা তো দোস্তি পাতছি তাইলে তুমিও কও তোমার কিছু বেদনা।

সোনালী মৃদু হাসতে হাসতে দেখে কারখানার বাষ্পমেঘ তখনো চারপাশ দখল নিয়া রাখছে। তখন কয়, আজ কাগজে কইছে যে খইফোঁটার মতো তারা ফুটে থাকবো কিন্তু কারখানার বাষ্পমেঘের কথা তো কয় নাই। অথচ বাষ্পমেঘে আর তারাই দেখা যাইতেছে না। এমন বড় সইত্য লুকায়া খইফোঁটা তারাদের আকাশ দেখায়া লাভ কী? এভাবে প্রকৃত সইত্য সবখানে আড়াল করা হইতেছে।

বস কয়, এসব ভেবেটেবে লাভ কী? তোমার দুঃখের কথা কও শুনি।

সোনালী কয়, ইহা আমার বড়ো দুঃখ। যদিও আপনার দুঃখের কেচ্ছা আমারে কাঁপায়া দিতেছে। আমি বুঝতেছি কেন মেয়েকর্মীদের আপনি ভাগায়া দিতেছেন। যদিও আপনার দুইটা সংকল্প পুরা হইছে কিন্তু সেই পুরা হওনের ভেতর বেজ্জতি আছে। কারণ আপনার তো সেই ক্ষমতাই নাই। কিন্তু আমার এইরকম ব্যক্তিগত বৃহৎ কোনো দুঃখ নাই। আমার কাছের কোনো স্বজন নাই সেইটা নিয়া দুঃখ হয় একটু। আমার বৃহৎ দুঃখ হয় এই ঢাকা শহরে বাস করতেছি জীবনের জন্য, অথচ এখানে কোনো জীবনই নাই। এসব দুঃখের ভিতরে আরো দুঃখ দিতেছে স্বপ্ন। প্রায় রাতে স্বপন আসতেছে সইত্যের মতো দম নিয়া। আজ স্বপন দেখছি যে, এই শহরের গোরস্থানের জমি বাইড়া যাইতেছে। শনশন কইরা শব্দ করতে করতে বাড়তেছে। গোরস্থানের জমি যেন ধাওয়া করা কোনো বাঘ যার ক্ষুধা লেগে আছে। মজার কথা হইলো গিয়া এই ক্ষুধা তৈয়ারের জন্য তো মানুষই প্রকল্প খুইলা থুইছে। এই ক্ষুধা থেকে কি মানুষের বাঁচন আছে? মানুষরে গিইল্যা খাইবে।

এইসব প্যাচালের ভীড়ে বসের উসখুসানি বোঝা যায়। বস কয়, তুমি কী সব প্রলাপ কইতেছো যে, আবোল তাবোল স্বপ্নরে টাইনা নিতেছো। এই সকল মোমেন্টাম নষ্ট না কইরা আমরা ঘরে গিয়া দুয়ারে খিল দিবার পারি। আর খিল না দিলেই বা কী, বাড়িতে আছে মাত্র এক প্রহরী যে হয় আমার গোলাম। কোনো মানুষ তো নাই।

সোনালী ঘরে গিয়া খিল লাগানোর কথা শুইনা তাজ্জব হয়। খিল কেন?

সোনালীর প্রশ্নে বস চোরামার্কা হাসি দেয়। কেন সে হবে সে হবে, আগে ঘরেই চলো।

এই বইলা বস সোনালীর হাত টানতে টানতে ঘরে ঢোকে। তারপর অপেক্ষা না কইরা সোনালীর পোশাক খুলতে শুরু করে। সোনালী স্তরে স্তরে তাজ্জব হয়া কয়, এসব কী করতেছেন বস। আপনার তো এসবের কোনো ক্ষেমতাই নাই।

তখন বস নিজের পোশাক খুইলা ছুঁড়ে মারতে থাকে দেয়ালে। এতো স্পিডে যে, যেন দেয়ালও চমকিত হয়। প্রথমে শার্ট খুলে ফেলার পর নিচের পোশাক খোলে। আর সোনালী হা বিস্ময়ে তাকায়া থাকে। অথবা, বসের খাড়ায়া থাকা লিঙ্গদণ্ড সোনালীর দিকে হা বিস্ময়ে চাইয়া থাকে। তারপর বস সোনালীর উপর দানবের মতো ঝাপায়া পড়ে। বিস্ময়ের চোদনে অবশ দেহজমি ফেলায়া রাখে সোনালী। বাঁধা সে কখনোই দিতো না কেবল এসব মুহূর্তরে কোনো তর্জমা করতে পারে না। তখন বসের শেষ কথাটা শোনা যায় যে, আমি মেয়েদের এমন চোদনা বানায়া চু*তে ভালোবাসি সোনালী, কেমন দিলাম বলো তো…

 

কারখানার বাষ্পমেঘের ঘনত্ব বাড়লে খইফোঁটা তারারা আর ফিরা আসে না। রাইতের বয়স বাড়ে অথবা রাইতের গলায় ফাঁস দিলে অন্ধকারের মরণ হয়। সোনালী বোঝে না ইহা কি দিন না দিনের মতো কোনো রাইত। যেভাবে সে বোঝে না ঢাকার মতো শহর অথবা শহরের মতো ঢাকা। কেবল বোঝে অপিসের অভাবী মেয়েরা বসের গোপন প্রকল্পে কীভাবে হান্দায়া যায়।  যেভাবে হারায়া যায় শহরের বিরিক্ষরা। সে আরও বোঝে না এসব বোঝাবুঝি স্বপনে চলতেছে না জাইগা। মন কয় স্বপনেই নইলে সেই গোরস্থানের স্বপন ক্যান ফিরা আসতেছে!

 

সোনালী দেখে গোরস্থানের জমি আরো দ্বিগুন গতিতে বাইড়া যাইতেছে। সব গিলে খাইতেছে। মানুষের বসতবাড়ি, জমিজমা, আবাসন প্রকল্প সব শনশন কইরা গিলে খাইতেছে। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার যে সোনালীর ডর করে না। সে নির্বিকার বইসা গোরস্থানের জমিরে শনশন কইরা বাড়তে দেখে। তারপর সোনালীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেলে সে আলগোছে গোরস্থানের জমির উপ্রে শুয়ে পড়ে। আর শেষবারের মতো দেখে খইফোঁটা তারারা আবার ফুটতে শুরু করছে। তখন ঢাকা নামক পুরানা গোরস্থানে বিরিক্ষরা সাম্রাজ্য গইড়া তুলছে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments