বিকল্প

হাসান ইনাম

শহরের শেষ প্রান্ত। শুটিং ইউনিটের লোকজন ছাড়া খুব একটা মানুষজন এদিকে আসে না, আসা সম্ভবও না। কিছু সাংবাদিক হয়তো আসেন, তবে একদম রুটিন মাফিক। ধরা যাক ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের বুধবার বা জানুয়ারির প্রথম রোববার। এরকম ক্যালেন্ডারে মার্ক করা দিনে সাংবাদিকরা আসেন লাইন ধরে। ওই দিনগুলো হয় সাংবাদিকদের কাছে পিকনিকের মতো। শহরের গলি-ঘুপচি বা গ্রামের বর্ষাকাদা মাড়িয়ে বছরের ওই একটা বা দুটো সময় একটু তাদের ফুরসত মিলে। মিলে খানিকটা অবকাশ। পুরনো কলিগদের সাথে দেখা-সাক্ষাত হয়। বেশ আমোদেই কাটে সময়। তবে কোনো সাংবাদিক চাইলেই এই এসাইনমেন্টে আসতে পারে না। সুতরাং ভালো রিপোর্টিং, ভালো প্যাকেজ বা ভালো নিউজ করে এখানে আসা সম্ভব না। প্রিন্ট হোক আর ইলেক্ট্রিক মিডিয়া হোক সম্পাদকের সাথে খাতির লাগিয়েও তেমন কোনো কাজ হয় না। এই এসাইনমেন্টে কারা আসবে সেটা ঠিক করে খোদ মালিক পক্ষ।

শুটিং ইউনিটের লোকজনের ব্যস্ততা অবশ্য লেগেই থাকে এখানে। তবে  প্রোডাকশন হাউজগুলোর ভেতর একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা লেগে থাকে সাংবাদিক আসার মৌসুমে শুটিং করা নিয়ে। রুটিন মাফিক অতিথি পাখিদের মতো সাংবাদিকরা আসলেও বছরের ঠিক কোন সময়টাতে তারা আসবে সেটা নির্ধারণ হয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। যাইহোক এসব কথা পরে। আমরা বরং সরাসরি সেটে চলে যাই। নদীর পাশে চলছে শুটিং। আজকের গল্পে ক্যারেক্টার একজন। সম্ভবত এখন সে মেকাপ ‍রুমে আছে। গোটা শুটিং সেটে মরা মরা ভাব। একমাত্র স্ক্রিপ্ট রাইটার ছাড়া বাকি সবাই ঝিমুচ্ছে কেমন যেন। স্ক্রিপ্ট রাইটার ছেলেটা তরুণ। সম্ভবত এই ইউনিটের সাথে আজকেই তার প্রথম কাজ। কাল সারারাত জেগে সে স্ক্রিপ্ট লিখেছে। আমরা একটু তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করব। যেহেতু ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমের মতো সাংবাদিক প্রবেশের নিষিদ্ধ সময় চলছে এখন তাই আমাদের একটু সতর্ক থাকতে হবে। ও আচ্ছা, আপনাদের বলা হয়নি। বছরের ওই নির্দিষ্ট সময় ছাড়া বাকি সময়গুলোতে এখানে সাংবাদিক প্রবেশ একদমই নিষিদ্ধ।

স্ক্রিপ্ট রাইটার ছেলেটা হুট করেই হৈ-হুল্লোড় শুরু করল। হাই তুলতে তুলতে সেটের অন্যান্য ক্রুরা সামনে এগিয়ে এলো। ডিরেক্টরকে দেখা গেল গোল একটা ক্যাপ পরে মহা বিরক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। তার হাতে লাল কালিতে দাগানো একটা এক পাতার কাগজ। আমরা অনুমান করে নিলাম এটাই আজকের স্ক্রিপ্ট। যেহেতু কলেবর মাত্র এক পাতা তাহলে বেশিক্ষণ আমাদের এখানে অবস্থান করতে হবে না। যতই আমরা অপেক্ষা করব, ততই ঝুঁকি বাড়বে। কোনরকমে ফার্স্ট হ্যান্ড ফুটেজ নিয়ে এখান থেকে বের হতে পারলেই বাঁচি আমরা। শুটিং শেষে লাইন প্রডিউসার সব মিডিয়া হাউজে মেইল করে দেয়। একই মেইল সব হাউজে যাওয়ার কারণে কেউ একটু কম বা বেশি ছাপতে বা দেখাতে পারে না। গড়পাড়তা সব মিডিয়া একই খবর দেখায়। এতে করে কারো  টিআরপি বা সার্কুলেশন কোনটাই বাড়ে না আলাদা করে। তাই মিডিয়া হাউজগুলো থেকে আমার মতো সাহসী সাংবাদিকদের মাঝেমধ্যে এইরকম এসাইনমেন্টে পাঠানো হয়। এই ধরণের এসাইনমেন্টে আসতে পারলে বেতনের পাশে বেশ ভালো অংকের বোনাস পাওয়া যায়। হাউজে যশ বাড়ে, মালিক পক্ষের সুনজরে থাকা যায়। তবে এখানে একটা কিন্তু আছে। ধরা খেলে জামিন নাই। অর্থাৎ পরিচয় লুকিয়ে এখানে এসে কোনো সাংবাদিক যদি নিউজ নিয়ে বের হতে পারে তাহলে হাউজ তাকে মাথায় তুলে নাচবে আর যদি কোনো সাংবাদিক ধরা পড়ে যায় তাহলে তার কোনো দায় দায়িত্ব নিবে না। এইতো গত মাসে চ্যানেল ফাইভের এক রিপোর্টার বডিক্যাম নিয়ে ধরা পড়ল শুটিং সেট থেকে। ধরা পড়তে দেরি কিন্তু চ্যানেল ফাইভ থেকে বিবৃতি আসতে দেরি হলো না। আমরা যারা ক্রাইম বিট করি তারা কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম আর নিজেদের এমন পরিণতি যেন না হয় এজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করলাম।

যাইহোক, আমার চাহিদা খুব একটা বেশি কিছু না। আজকের যে গল্প দেখতে পাচ্ছি, খুব রগরগে বা রোমহর্ষক গল্প যে পাব সেটাও মনে হচ্ছে না। আমার মনোযোগ বরং তরুণ স্ক্রিপ্ট রাইটারের দিকে। কোনো না কোনোভাবে তার একটা ইন্টারভিউ নিয়ে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে! একদম এক্সক্লুসিভ। আগামী তিন দিন টক অফ দ্যা কান্ট্রি থাকবে এই রিপোর্ট। আরো বেশি থাকতে পারে, আমি একটু কমিয়ে তিন দিন বললাম কারণ এত ইস্যুর ফাঁকে এখন টিকে থাকা খানিকটা মুশকিল। এইতো সেদিনের কথা, দৈনিক আজাদির রাসেল ভাই, ‘সরকার পতনের পদধ্বনি’ শিরোনামের মতো নিউজ করেও তিন দিনের বেশি আলাপে থাকতে পারেন নাই। আমি আলাপে থাকতে চাই না। আমি কেবল চাকরিটা বাঁচাতে চাই। ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টিলিজেন্স আমার নামে আপত্তিপত্র ইস্যু করে পাঠিয়েছে সম্পাদকের কাছে। আমার মতো কলুর বলদের মতো কামলা দেওয়া সাংবাদিককে সম্পাদক মহোদয় হারাতে চান না বলেই আজকে এখানে আসার বুদ্ধিটা তিনি নিজেই আমাকে দিয়েছেন। এখানকার ছোট একটা এক্সক্লুসিভ নিউজের সাথে নিজের নাম যুক্ত করতে পারলে কিছুটা রিস্ক ফ্রি থাকা যাবে। অবশ্য ওখানে যেহেতু একবার নাম উঠে গেছে, তেমন কিছু আর করার নেই আপাতদৃষ্টিতে। সম্পাদক মহোদয় এবং আমার এটা শেষ চেষ্টা বলতে পারেন। ইন্টিলিজেন্সকে আমরা ছোট করে যে বার্তাটা দিতে চাচ্ছি, সেটা হলো… আমরা তো আপনাদেরই লোক।

হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এখানে জীবন বাজি ধরে ছদ্মবেশে অফ সিজনে যেসব সাংবাদিক পৌঁছায় তারাও ‘আপনাদেরই লোক’ হয়ে থাকে। বৃত্তের বাইরের কেউ এখানে পৌঁছাতেও পারে না। আমার নামে যে আপত্তিপত্র ইস্যু হয়েছে সেখানে মোটাদাগে এটাই লেখা– ‘ধারণা করা হচ্ছে উনি আমাদের লোক না’। যেদিন সরকারি দস্তখত মারা চিঠিটি সদ্যই পড়ে আমাকে রুমে ডেকেছিলেন সম্পাদক মহোদয় সেদিন ছিল জুলাই মাসের আঠারো তারিখ। ষোলো তারিখে পুলিশের গুলিতে ছয়জন মারা গেছে এমন একটা নিউজ করেছিলাম আমি। একদিন সময় নিয়ে ঠিক আঠারো তারিখেই চলে এসেছিল চিঠি। চিঠিটি এসেছিল সবুজ রংয়ের খামে। খামের উপরে লেখা, ‘মুক্ত গণমাধ্যম, ভয়হীন সাংবাদিকতা’ আর পেছনে লেখা ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার, তথ্য হবে সবার’। এই দুটো স্লোগান সম্ভবত এই বছরের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে প্রণয়ন করা হয়েছে। সম্পাদক মহোদয়ের কাঁপা কাঁপা হাতে ধরে থাকা খামের উপরের ও নিচের লেখাগুলো ছাড়া আর কিছুই আমি পড়তে পারি নাই। আমরা দুজনই কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সম্পাদক মহোদয় নিচু স্বরে বলেছিলেন, ‘উনারা মনে করতেছেন তুমি উনাদের লোক না। আর এই চিঠি যেহেতু চলে আসছে এটা এখন আর তোমার ব্যাপার নাই। আমরা সবাই পস্তাব।’

এই দেশে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে নিতে দুটো কাজ করতে হয়। এক. মেরুদণ্ডকে খুলে সরকারি কোষাগারে জমা রেখে আসতে হয়। দুই. হলুদ রঙের চশমা পরতে হয়। নিয়ম মেনে দুটো নিয়মই আমি পালন করেছিলাম এই পেশায় ঢুকবার সময়। এই মাসের শুরু থেকেই কেমন করে যেন মেরুদন্ডহীন পিঠে সুড়সুড়ি অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল নতুন করে হাড় গজাচ্ছে নিতম্বের উপরে। আর হলুদ রঙের চশমাটার লেন্স একটু ঘোলা হওয়া শুরু করেছে বছরের শুরুতে যে নির্বাচন হলো তখন থেকেই। কেবল সাংবাদিক নয়, দেশের সকল পেশাজীবীদের জন্য এরকম ভিন্ন ভিন্ন কানুন আছে। আর এগুলো দেখভাল করা হয় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। আমি আমাদের পত্রিকার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানকে জানিয়েছিলাম আমার চশমার লেন্স ঘোলা হয়ে যাওয়ার কথা। মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান তেমন একটা পাত্তা দেননি আমার কথার। প্রতি নির্বাচনের পরেই নাকি এরকম অভিযোগ দুই চারটা তার কাছে আসে, কিছুদিন যাওয়ার পর আবার আপনাআপনিই লেন্স ঠিক হয়ে যায়। একবার তিনি নতুন লেন্স অর্ডার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। সেই লেন্স পত্রিকা অফিসে পৌঁছানোর আগেই আবার ঠিক হয়ে গিয়েছিল অভিযোগকারীদের লেন্স। এরপর থেকে তিনি আর এ বিষয়ে বাড়তি চাপ নেন না।

ডিরেক্টরকে দেখে স্ক্রিপ্ট রাইটারের গলার আওয়াজ কিছুটা কমল। আমি কিছুটা দূরে বসে আছি সহকারী মেকাপ আর্টিস্ট ছদ্মবেশে। ঠিকঠাক শুনতে পাচ্ছি না কী কথা হচ্ছে ওখানে। এখানে অফ সিজনে যেসব সাংবাদিক আসে তাদেরকে নানা ধরণের লিংক-লবিং মেইনটেন করতে হয়। কিছু এজেন্সি আছে যারা এখানে আসার ব্যবস্থা করে দেয় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। এই দফায় টাকাগুলো আমার পকেট থেকেই গেছে। কারণ কালো তালিকা থেকে সাদা তালিকায় যাওয়ার জরুরতটা আমার। অন্য সময় মালিক পক্ষই ইনভেস্ট করে থাকে। তবে পুরো টাকা আমি দিয়েছি সেটা বললে ভুল হবে। সম্পাদক মহোদয় কিছু টাকা দিয়েছেন, যদিও সেটা কম।

একটা শুটিং সেটে নানা ধরণের মানুষ থাকে। এই যেমন ধরেন, ডিরেক্টর, সহকারী ডিরেক্টর মানে এডি, প্রোডাকশন ম্যানেজার, প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট, ডিওপি (সিনেমাটোগ্রাফার), ক্যামেরা অপারেটর, অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান, গ্যাফার, লাইটম্যান, গ্রিপ, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট, বুম অপারেটর, রিসার্চার, স্ক্রিপ্ট সুপারভাইজার, আর্ট ডিরেক্টর, প্রপস অ্যাসিস্ট্যান্ট, কস্টিউম ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, ট্রান্সপোর্ট ড্রাইভার, ক্যাটারিং কর্মী, সিকিউরিটি বা লোকাল গাইডসহ আরো নানা ধরণের মানুষ। কেউ না কেউ তো অনুপস্থিত থাকে। সবাই একইসাথে উপস্থিত থাকতে পারে না। কারো মা মারা যায়, কারো নতুন বাচ্চা হয়, কারো ডিভোর্স আর কেউবা বৃষ্টির দিনে আড়মোড়া ভেঙে কাজে আসতে চায় না। বাসায় বসে আরাম করতে চায়। তাদের জন্য এবং আমার মতো সুযোগসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য এজেন্সিগুলো দারুণ একটা প্যাকেজ বানিয়েছে। হিসাব খুব সহজ। জাস্ট, এধারকা মাল উধার। এইযে আজকে আমি এসিস্ট্যান্ট মেকাপ আর্টিস্ট হিসাবে আসছি, বুকের উপর অদ্ভুত একটা জিনিস পরেছি যেটা না এ্যাপ্রোন, না ভেস্ট। যার ভেতরে অসংখ্য পকেট। আর প্রতি পকেটে মেকাপের সরঞ্জাম। আমাকে এক বছর সময় দিলেও আমি এগুলোর নাম মনে রাখতে পারব না। আমার জায়গায় যার থাকার কথা সেই বেচারার ভাই গত পরশু মারা গেছে। রাস্তায় হেঁটে বাসায় যাচ্ছিল, পুলিশ আর ছাত্রদের মাঝখানে পড়েছে। পুলিশ বলছে ছাত্রদের গুলিতে মারা গেছে আর ছাত্ররা বলছে আমরা তো নিরস্ত্র, কেবল কিছু ইট পাথর মেরে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি মাত্র। আমরা গুলি পাব কোথায়। ছাত্রদের এসব ননসেন্স কথা রাষ্ট্র, পুলিশ বা সুশীল সমাজ কেউ বিশ্বাস করেনি। জনা দশেককে জেলে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের আত্মবিশ্বাস, ঠিকমতো ডিম থেরাপি দিলে ঠিক ঠিক সব কথা স্বীকার করে নিবে ওরা। সহকারী মেকাপ আর্টিস্টের এসবে কিছু আসে যায় না। কারণ এতদিন এখানে কাজ করার সুবাদে সে বেশ ভালো করেই জানে জাস্টিস কারে বলে। এজেন্সিতে আমি যখন আবেদন করেছিলাম গোপন ফর্মের মাধ্যমে, তখন ফিরতি মেইলে আমাকে জানানো হয়েছিল সহকারী মেকাপ আর্টিস্ট পদটা হয়তো পুরোপুরি খালি হয়ে যাচ্ছে। আমি চাইলে লং টাইমের জন্য শুটিং সেটে ঢুকে যেতে পারি। টাকাও কম ধরবে ওরা। আমি না করে দিয়েছিলাম ওই প্রস্তাব। এজেন্সিওয়ালারা পড়েছে বিপদে, কারণ ভাই হারানোর পর বেচারা মেকাপ আর্টিস্ট চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন এই পদে নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়া লাগবে এজেন্সির। আমার মতো খুচরো কাস্টমার দিয়ে তাদের পোষাবে না।

হুট করেই আমার দিকে নজর দিলেন ডিরেক্টর। স্ক্রিপ্ট রাইটার গজগজ করেই যাচ্ছে।

“এইযে, তুমি কি নতুন?” জোরে হাঁক দিয়ে বলল ডিরেক্টর।

কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ডিরেক্টরের সাথে আমার কথা বলা লাগতে পারে সেটা তো এজেন্সি বলে নাই। কিছু শিখিয়েও দেয় নাই।

“হ্যাঁ, স্যার।”

“গুড, আমি চাই নতুন নতুন ছেলেপেলে আমাদের এখানে আসুক। তারা শিখুক, জানুক।  এগুলো না জানলে, না দেখলে দেশকে ভালোবাসবে কী করে।”

আমি মাথা নাড়িয়ে গালভরা হাসি দিয়ে ডিরেক্টরের কথায় সম্মতি দিলাম।

“আচ্ছা, কস্টিউমে কে আছে এখানে? দ্রুত এদিকে আসো। দুটো জিহাদি বই নিয়ে আসো।”

আমাকে বাদ দিয়ে কস্টিউম ডিজাইনারবকে খোঁজা শুরু করল ডিরেক্টর। ডিরেক্টরের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রতিবাদ করে উঠল তরুণ স্ক্রিপ্ট রাইটার।

“আপনি যদি আমার স্ক্রিপ্ট না মানেন তাহলে আমাকে দিয়ে লেখালেন কেন? আপনারা নতুনদের চিন্তাকে শ্রদ্ধা করতে পারেন না এখনও। আপনারা ভাবেন কেবল আপনারাই ঠিক।”

কিছুটা এগিয়ে গেলাম আমি। এখন স্ক্রিপ্ট রাইটার আর ডিরেক্টরের কথা খুব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই কথোপকথন থেকেই একটা রিপোর্ট করে ফেলতে পারব।

“নতুনদের শ্রদ্ধা করব কেন? নতুনদের করব স্নেহ।” হাসতে হাসতে বলল ডিরেক্টর। যেনবা তরুণ স্ক্রিপ্ট রাইটারের রাগকে তিনি আমলেই নিলেন না।

“এইযে আপনি আবারো কৌশলে আমাকে হেয় করলেন। আমি কি বলেছি আমাকে শ্রদ্ধা করতে? আমার চিন্তার কথা বলেছি, আমার লেখার কথা বলেছি। আমার সৃজনশীল সৃষ্টিকে তো আপনি আমর বয়স দিয়ে মাপতে পারেন না।” গলার স্বর কিছুটা নিচু হয়ে এসেছে তার। রাগের স্থান দখল করেছে অভিমান।

“নারে বাবা, তোমার সৃজনশীল সৃষ্টিকে আমি তোমার বয়স দিয়ে মাপি নাই। তাহলে তো তোমাকে এখানে আনতাম না। দেশের জন্য তোমাদের মতো ছেলেরা যখন কাজ করতে আগ্রহী হয় তখন দেশ আরো সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তোমাকে তো ঐহিত্য বুঝতে হবে। জিহাদি বই সামনে রেখে ফটোশ্যুট করা আমাদের ঐতিহ্য। সেখানে তুমি মোবাইল রেখে, বেটিং সাইটের কথা বললে তো হবে না। ঐহিত্যকে সম্মান করতে হবে।” ঠান্ডা মাথায় বলল ডিরেক্টর।

“বস্তাপচা ঐতিহ্য। সেই আদিকাল থেকে দেখে আসছি এই পদ্ধতি। দুটো জিহাদি বই, কিছু প্রচারপত্র আর কয়েকটা সিডি সামনে রেখে ফটোশ্যুট। এসব দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছে দেশের মানুষের। আমাদের তো নতুন কিছু ট্রাই করা উচিত। মানুষকে নতুন কিছু দেখানো উচিত। সামথিং নিউ, সামথিং বিগ।”

“ভেরি পোর লজিক ইয়্যাংমান। মানুষ যেটা বারবার দেখে সেটা তার মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। এসব জিনিস বারবার দেখানো হয় সোসাইটিতে স্টাবলিশ করার জন্য। আর একবার যেটা স্টাবলিশ হয় সেটা ভাঙা মুশকিল।”

“এজন্য আমরা বছরের পর ভুল জিনিস স্টাবলিশ করে যাব? নতুন কিছু ট্রাই করব না? বিকল্প কিছু ভাবব না?”

‘বিকল্প’ শব্দটা শোনার পর পুরো শুটিং সেট জুড়ে নীরবতা নেমে এলো। একদম কারফিউয়ের মতো নীরবতা। গত বছর শেষ দিকে কিছু শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এর ভেতর ‘বিকল্প’ শব্দটা অন্যতম। তিনি এ শব্দটা একদমই পছন্দ করেন না। কেউ যদি শব্দটা ব্যবহার করে তবে সাত বছর কারাদণ্ড ও দশ লাখ টাকা জরিমানা। কোনরকম যদি কিন্তু ছাড়া এই শাস্তি প্রয়োগ হবে, আইন বলবৎ হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নেই। এই মাসের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই আইনকে কালা কানুন আখ্যা দিয়ে আইন বাতিলের দাবিতে রাজপথে নেমেছে। আর এরপর থেকেই চলছে দফায় দফায় সংঘর্ষ আর প্রাণহানি।

এরপরের ঘটনাগুলো দ্রুতই ঘটল। ডিরেক্টর পকেট থেকে রিভালবার বের করে স্ক্রিপ্ট রাইটারের কপালে ধরলেন। তরুণ মেধাবী ছেলেটা বুঝে গেল তার অপরাধ ও কেউ নতুন করে বর্ণনা না করলেও সে জেনে গেল তার পরবর্তী পরিণতি সম্পর্কে। এডি আর ডিওপি দুপাশে এসে দাঁড়াল স্ক্রিপ্ট রাইটারের। দুজনে দুদিক থেকে চ্যাং দলা করে উঠিয়ে নিয়ে গেল ছেলেটাকে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আমি ঝটপট সবকিছু টুকে রাখছিলাম মস্তিষ্কে। অন্যান্য সাংবাদিকদের মতো গোপন কোনো ডিভাইস আমি সাথে নিয়ে আসি নাই। আমার স্মৃতিশক্তিই আমার ভরসা। এসেছিলাম ছোট একটা নিউজের খোঁজে কিন্তু এভাবে যে লিড নিউজ পেয়ে যাব সেটা কখনও ভাবি নাই। তবে মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম এজন্য যে, আমার সাবজেক্ট চুজিং ভুল ছিল না। আমি সকালে এসে স্ক্রিপ্ট রাইটারকে টার্গেট করেছিলাম, আর এই ছেলেটাই আমার লিড এনে দিল। সম্পাদক মহোদয় তো বটেই, মালিক পক্ষও অনেক পছন্দ করবে এই নিউজ। কারণ প্রোডাকশন হাউজ থেকে পাঠানো মেইলে এই খবর থাকবে না। 

ডিরেক্টর খেই হারিয়েছেন। সেটে থাকা অন্যান্য ক্রুদের মেজাজও মোটামুটি খারাপ। সবাই কোনোরকম আজকের কাজটা শেষ করতে পারলে বাঁচে। সেট সাজানো প্রায় শেষ। তবে ক্যারেক্টারের মেকাপ নেওয়া এখনো শেষ হয়নি। ডিরেক্টর আমাকে এক ধমক দিয়ে মেকাপ রুমে পাঠালেন আর অনর্গল গালাগাল করতে থাকলেন। আমি পড়িমরি করে দৌড়ে মেকাপ রুমে গিয়ে ঢুকলাম।

হাইস্কুল পড়ুয়া এক কিশোর বসে আছে। ডান চোখের পাশে অবিশ্বাস্য রকমভাবে ফুলে আছে। প্রধান মেকাপ আর্টিস্ট সব ধরনের স্নো-পাউডার মাখিয়েও দাগটা আড়াল করতে পারছেন না। আমি একটা ক্যাপ পরাতে বললাম। এতে করে দাগ কিছুটা হলেও আড়ালে চলে যাবে। আমার মতামত বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করল প্রধান মেকাপ আর্টিস্ট। মনে হলো নিয়মিত এখানে কাজ করলে আমার পদন্নোতি কেউ ঠেকাতে পারত না। 

বাইরে লাইট-ক্যামেরা সব রেডি। টেবিলের উপর জিহাদি বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, একপাশে কিছু প্রচারপত্র আর সিডি। ছেলেটাকে কোনরকমে ধরে টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলাম। ব্যথার কারণে ঠিকঠাক তাকাতে পারছে না সে। সম্ভবত গতকাল রাতে মিছিল থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে আজকে অভিনয় করানোর জন্য। 

ডিরেক্টর ছেলেটার মাথা বরাবর একটা মনিটর বসালেন। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে কিছু কথা লেখা। সেগুলোই জাস্ট পড়ে যেতে হবে। দামি দামি ক্যামেরায় কথাগুলো ধারণ করা হবে। তারপর ছড়িয়ে দেওয়া হবে দেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়।

অল গুড, কিপ সাইলেন্ট। রোলিং… থ্রি টু জিরো। একশন। ডিরেক্টর ইশারায় ছেলেটাকে মনিটরের লেখাগুলো পড়তে বললেন। ছেলেটা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শুরু করল বলা। কিন্তু এসব কী বলছে সে? এগুলোই কি লেখা আছে স্ক্রিপ্টে?

“আমি বিকল্প, আমরা সবাই বিকল্প। আমাদের দমন করা এত সহজ না।”

ডিরেক্টর রাগে কাঁপতে কাঁপতে হাতে রিভালবার তুলে নেন। ঠিক তখনি কীভাবে যেন আমার চোখের হলুদ লেন্স ঝাপসা হতে থাকে। সেটা কি সামনে থেকে চশমায় ফিনকি দিয়ে আসা রক্তের কারণে কি না সেটা বুঝে উঠতে পারি না। দূর থেকে কারা যেন এগিয়ে আসছে মিছিল নিয়ে। আর গমগম স্বরে বলছে, “আমি বিকল্প, আমরা বিকল্প…”

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments