মিনা বাজারে বাদশাহ
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই মমতাজ বেগম সাজসজ্জা করে মিনা বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছেই তিনি শাহজাদিদের ডাকেন। শাহি পরিবার ও অন্যান্য নারীদের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু তাদের আগমনের পূর্বেই শহরের হাজার হাজার নারী বাজারে এসে পৌঁছায়।
দুপুরের আগেই নারীদের সমাগমে বাজার ভরে ওঠে। অভিজাত নারীদের পাশাপাশি দোকানদার নারীদের বাবুর্চিখানা থেকে আহার করানো হয়। অনেক দর্শনার্থীকেও—যারা মহলে প্রবেশের অধিকারী—দস্তরখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
রানি হিসাব করেন, আজ কী পরিমাণ দর্শনার্থী এসেছে। ফটকে তিনি কয়েকজন নারীকে নিযুক্ত করেন, যারা আগত সকল নারীর নাম লিখে রাখে। কিছুক্ষণ পরপর তাকে খবর দিতে থাকে, কতজন নারী এসেছে। তৃতীয় প্রহরে জানা যায়, দর্শনার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। তিনি খুবই বিস্মিত বোধ করেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, বাদশাহ ও অন্যান্য পর পুরুষের উপস্থিতির কারণে নারীদের সংখ্যা কম হবে।
তিনি বিশ্রামগৃহ ছেড়ে বাজারের দিকে আগান। যদিও দাসীরা পথ করে দেয়, তবুও নারীদের এত ভিড়, পার হওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে। চলার সময় তিনি প্রতিটা দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেন, দোকানিরা ক্রেতাদের সাথে কীরূপ আচরণ করছে। কেউ কারো সাথে অসদাচরণ করছে না তো! বাজার ঘুরে উদ্যানে একপ্রকার উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ঘোষণা করা হয়, বাজারে উপস্থিত নারী, দোকানদার নারী ও দর্শনার্থী নারীরা যেন উদ্যানে চলে আসে। মহারানি তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান।
অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরো উদ্যান নারীদের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে। চত্তরে পর্যাপ্ত বসার জায়গা না থাকায় মাটিতে চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়। সকলেই সমবেত হলে রানি তাদের প্রতি আন্তরিক সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন—
‘কাল বাজার উদ্বোধনের দিন যেসব নারী এসেছিল, ভেবেছিলাম পরবর্তী দিনগুলোতে তাদের সংখ্যা কম হবে। কিন্তু আজ আপনাদের ভিড় দেখে খুবই খুশি হয়েছি। নিশ্চিত হয়েছি, নারীদের কল্যাণ ও নৈতিক উন্নতির জন্যই যে এই বাজার খোলা হয়েছে, আপনারাও তা পছন্দ করেছেন এবং এর উন্নতিতে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করছেন। বাদশাহ জাহাঁপনা আপনাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। তিনি প্রতিদিন এর খবরাখবর জানতে চান এবং বাজার ঘুরে আপনাদের খুশি হওয়ার কথা শুনে আনন্দিত হন।
গতকাল আমি আশ্বাস দিয়েছিলাম, জাহাঁপনা হয়তো আজ বা আগামীকাল বাজার পরিদর্শনে আসবেন। কিন্তু কিছু আলেমের আপত্তির কারণে তিনি মনে করেন, সম্মানিত ও অভিজাত মুসলিম নারীরা পর্দার ভয়ে এখানে আসতে দ্বিধা করবেন। যদিও ধর্মীয় পণ্ডিতদের ইচ্ছানুযায়ী সব ধরনের নেকাবে মুখ ঢাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবুও তিনি চান না, আপনাদের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করা হোক। আর এমন কোনো কাজ না করা হোক, যা নারীদের স্বভাবপরিপন্থি।
আমিও ভেবেছিলাম, জাহাঁপনার আগমনের কারণে হয়তো আজ কম সংখ্যক নারী আসবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে অসংখ্য নারী দর্শনার্থী এসেছে। আমি খুব খুশি, নারীরা তাঁর প্রতি ভরসা রাখেন। যখন আমি জাহাঁপনাকে এই সংবাদটি দেব, তখন তিনি খুবই খুশি হবেন। এবার আমি সবার সামনে ঘোষণা করছি—
‘আগামী পরশু বিকেলে হযরত জিল্লে সুবহানি এই বাজারে তার পবিত্র পদধূলি দিয়ে সবাইকে সম্মানিত করবেন। প্রতিটি দোকানে গিয়ে ব্যক্তিগত কেনাকাটা করবেন। আপনাদের এই উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে আমি আশাবাদী, সেদিন সব বোনেরা অবশ্যই আসবেন। যাতে হুজুর আমাদের এই বাজারের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।’
রানির বক্তব্য শেষ হলে এক সম্মানিত মন্ত্রীর ফারসি শিক্ষিত স্ত্রী দাঁড়িয়ে সকলের পক্ষ থেকে রানির দয়া ও করুণা স্বীকার করে বলে—
‘আমরা সকলেই শরিয়তের অনুসরণ এবং নিজেদের ইজ্জত রক্ষার প্রতি সচেতন। কিন্তু আমাদের সত্যিকার সুরক্ষাদাত স্বয়ং জাহাঁপনা। এমন দয়ালু, ফেরেশতাসদৃশ রক্ষাকর্তার প্রতি আমরা কীভাবে সন্দেহ পোষণ করতে পারি? আমরা সকলেই তাঁর দাসী। একজন দাসীর জন্য তার মনিবের সাথে পর্দার প্রয়োজন নেই। তিনি তার দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা নিজেকে আমাদের স্নেহশীল পিতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। এই অবস্থায় আমরা লাভ করেছি তার কন্যার গৌরব। তাই পিতা ও কন্যার মধ্যে পর্দার কী প্রয়োজন?
যাই হোক, জাহাঁপনাহ আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিভাবক। আমরা কখনো চাই না তার প্রতি কেউ খারাপ ধারণা করুক। তাছাড়া যখন আমাদের মুখ নেকাবে ঢাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তখন আর চিন্তার কী কারণ? রানির অনুগ্রহে উপকৃত হওয়ার জন্য আমরা সকলেই প্রতিদিন বাজার দর্শনে আসব। আগামীকাল রানির সাথে জাহাঁপনার আগমনের সংবাদ শুনে আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা আরও আগ্রহ- উদ্দীপনার সাথে আসব। সমগ্র মিনা বাজার নারীদের সমাগমে ভরে ওঠবে। আমরা চেষ্টা করব তিনি যেন আমাদের দ্বারা খুশি হন।’
তারপর এক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত হিন্দু রানি উঠে দাঁড়িয়ে রানিকে তার সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ বলে আশ্বস্ত করে—‘আমরা জাহাঁপনার আত্মীয়স্বরূপ। তিনি আমাদের মাহরাম। এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মাহরাম, যার প্রতি নিষ্ঠা রেখে জীবন দান করা আমাদের প্রাচীন রীতি। আমাদের মধ্যে মুসলমানদের মতো কঠোর পর্দার বিধান নেই, কিন্তু নিজ আত্মীয়ের প্রতি বিশ্বস্ততায় আমরা তাদের চেয়ে এগিয়ে। তিনি যেমন আমাদের জন্য একজন স্নেহশীল পিতা, তেমনই প্রিয় ভ্রাতা ও সৌভাগ্যবান পুত্রও। এই তিনজন প্রিয়জন, যাদের প্রতি বিস্বস্ততায় আমরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত।’
এমন স্বস্তিদায়ক কথাবার্তা শুনে রানি খুবই খুশি হয়ে বলেন, ‘মহলে গিয়ে আমি সর্বপ্রথম আপনাদের সকলের আন্তরিকতা, ভক্তি ও আনুগত্যের কথা হুজুর শাহেনশাহকে শোনাব।’
এরপর যত নারী জড়ো হয়েছিল, দোকানদার বা দর্শনার্থী—সকলের জন্য জেয়াফতের ব্যবস্থা করা হয়। এই পর্ব শেষ হলে বাজারে আলো জ্বলে ওঠে। রানি মাগরিবের নামাজ পড়ে সওয়ারিতে চড়েন। সঙ্গে আসা শাহজাদিরাও। তারা তাদের নিজ নিজ প্রাসাদে ফিরে যায়।
বাজারে অনেক ভিড়। সন্ধ্যায় সেই ভিড় আরও বেড়ে যায় যখন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, আগামীকাল বাদশাহ বাজারে আসবেন। দোকানিরা খুশি হয়, কারণ তাদের পণ্যগুলো বিক্রি হয়ে যাবে। এই খুশিতে তারা নিজেদের দোকান সাজাতে থাকে। আর নিজেরাও সাজে। দর্শনার্থীরাও খুশি হয়। কাল বাজার দর্শনের সুবাদে বাদশাহর দর্শন লাভ হবে। সেসব নারী নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করে, যাদের পরিবার মিনা বাজারে আসার জন্য অনুমতি দিয়েছে।
এই সমাবেশে এমন কিছু নারীও অপস্থিত ছিল, যাদের পর পুরুষদের সামনে আসাটা খুবই অস্বস্তির। তারা মনে মনে ভাবছিল, কীভাবে তাদের সামনে যাওয়া-আসা করব? কিন্তু তাদের পক্ষে এ অজুহাতটিই যথেষ্ট ছিল, মুখে নেকাব পরতে পারবে। যেহেতু তাদের অভিভাবকরা তাদের আসার অনুমতি দিয়েছে, তাই কেউ নেই তাদের দোষারোপ করার।
সকাল থেকেই দোকান, রাস্তাঘাট ও উদ্যান পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয় যত্নের সাথে। লণ্ঠন পরিষ্কার করা হয়, রাস্তাঘাটে বিছানো হয় মখমল ও আতলুসের কার্পেট। দুপুরের আগেই মমতাজ বেগম বাজার পরিদর্শনে আসেন। বাজারের অবস্থাই তখন অন্যরকম। পাশাপাশি দোকানদার নারীদের সৌন্দর্য ও আভরণও ছিল অসাধারণ। সকল নারী আপাদমস্তক গয়না ও ভারী পোশাক পরে কনের সাজে সজ্জিত।
পুরো বাজার পরিদর্শনের পর রানি ফিরে যান। কারণ বাদশাহর আগমনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার সাথে যেহেতু দরবারের আমিররাও আসবে, তাই তার পক্ষে বাজারে থাকা সম্ভব নয়। তিনি শাহজাদি ও রাজপরিবারের অন্য নারীদের নিয়ে বাজার ছেড়ে চলে যান। মহলে প্রবেশ করেই তিনি স্বামীর কাছে গিয়ে বলেন, ‘এবার আপনি যেতে পারেন, আমি বাজার পরিদর্শন করে এসেছি। সকল নারী এত সুন্দর সাজে সজ্জিত, সবাইকে পরীর মতো লাগছে। আজ বাজারে যে ভিড় ও জৌলুস দেখেছি, তা আগে কখনো দেখিনি। আমি তো বলেছিলাম, গত দুই দিনের তুলনায় আজ অনেক বেশি নারী আসবে। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের এই শঙ্কা সম্পূর্ণ ভুল যে, পর্দার কারণে নারীদের সংখ্যা কম হবে।’
এ কথা শুনে বাদশাহ খুবই খুশি হয়ে আওয়াজ দেন, সব আমির কি এসেছে? উর্দা বেগনি তৎক্ষণাৎ জানান, সবাই উপস্থিত হয়েছেন, শুধু জাহাঁপনার বের হওয়ার অপেক্ষা। এ সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাদশাহ হাওদার ওপর সওয়ার হয়ে মহল থেকে বের হন। দরবারি আমিরগণ এগিয়ে এসে তাকে অভিবাদন জানায়।
মিনা বাজার উদ্বোধনের দিন যেভাবে রানির জন্য বিশেষ আয়োজন করা হয়, বাদশাহর জন্য তার চেয়েও বড় আয়োজন করা হয়। রাজকীয় বাহিনী থাকে সবার আগে। এরপর অসংখ্য পদাতিক সৈন্য। আকাশে শত শত পতাকা ওড়ে। বীরচিহ্নগুলো ঝলমল করে ওঠে। সূর্য ও চাঁদের প্রতীকগুলো দেখায় এতিহ্যবাহী জৌলুস। হাতি ও উটের পিঠে রাখা নাকারায় আঘাত পড়ে। সিঙ্গা বাজে, নকীবরা পদে পদে জয়ধ্বনি করে।
শত শত সম্ভ্রান্ত আমির নিজেদের পদবী অনুযায়ী বাহনে আরোহণ করে। এই জমকালো শোভাযাত্রার মাঝে বাদশাহ একটি উঁচু ও সুসজ্জিত হাতির পিঠে গঙ্গা-যমুনা শৈলীতে বসা। তার সাথে অনেক সফরসঙ্গী ও আমির। মিনা বাজারে দূত ও অশ্বারোহীরা সংবাদ ছড়ায় বাদশাহর সওয়ারী এখন অমুক স্থানে ও অমুক বাজারে আছে। এভাবে যখন শাহি নাকারার শব্দ শোনা যায়, তখন সকল নারী দেহে একধরনের শিহরণ জাগে। অনেকে ভয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করে। কিন্তু যারা সাহসী, তারা ভক্তিভরে একটি স্থানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এমন সময় মহলের নারী ঘোষক উচ্চস্বরে ঘোষণা দেয়, ‘জাহাঁপনা সালামত’! বাদশাহ পালকি থেকে নেমে হাওদায় চড়েন। চার-পাঁচশো আমির হাওয়াদাটি ঘিরে ধরে। এই মর্যাদাপূর্ণ জৌলুশের সাথে বাদশাহ মিনা বাজারে প্রবেশ করেন। সর্বত্রই সুন্দর, মনোহর পরীদের ঝাঁক, তারা মধুর সুরে ‘জাহানপানাহ সালামত!’ বলে ধ্বনি দেয়। এই জাঁকজমক নিয়ে রাজকীয় সওয়ারি দালানের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছায়। সঙ্গী আমির ও মন্ত্রিগণ বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে। বাদশাহ সিঁড়িতে পদার্পণ করেন। তিনি দালানে প্রবেশ করবেন—এমন সময় এক সম্মানিত মন্ত্রীর স্ত্রী উচ্চস্বরে বলে ওঠে, ‘আপনার আগমন হোক আমাদের সৌভাগ্যের সোপান!’
বাদশাহ সিংহাসনে উঠলে এক ইরানি আমিরের শিক্ষিত স্ত্রী শ্রদ্ধাভরে সামনে দাঁড়িয়ে ইরানি সুরে ও তালে একটি প্রশংসামূলক কাসিদা গেয়ে শোনায়, যা বিশেষভাবে সেই মুহূর্তের জন্য রচিত। কাসিদা শেষ হতেই কয়েকজন চঞ্চল মনোহর নারী—যাদেরকে ডোমনি সম্প্রদায় থেকে বাছাই করা হয়েছিল—নিজেদের সুন্দর মোহনীয় সুরে শুভেচ্ছার গান গাইতে শুরু করে।
বাদশাহ এই পরীদের উদ্যানের প্রত্যেক সুন্দরী নারীর প্রতি নজর বুলিয়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তারপর নারীদের মধ্যে সবার সামনে অবস্থানকারী সাদুল্লাহ খানের স্ত্রীর দিকে ফিরে বলেন—রানির ইচ্ছা, তোমাদের এই বাজারটি যেন সর্বদা বাজারই থাকে। যেখানে বড়-ছোট, উচ্চ-নীচের মধ্যে ভেদাভেদ থাকবে না। কিন্তু তোমরা তো এটাকে দরবারে পরিণত করেছ।
সাদুল্লাহ খানের স্ত্রী বলে, ‘আমরা সবাই জাহাঁপনার—আমাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকর্তার দাসী। এই শুভ মহূর্তে আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মহামান্য রানি তা মঞ্জুর করেননি। অন্যথায় আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, নজরানা পেশ করে কর্তব্য পালন করার।’
আমি তোমাদের নজরানার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছি, তোমরা রানির খুশির জন্য এত আগ্রহ- উদ্দীপনার নিয়প এখানে জড়ো হয়েছ এবং আমাকে ও আমার শাহজাদাদের আসার অনুমতি দিয়েছ। আমি অবাক হচ্ছি, যদিও সবার জন্য নেকাবের অনুমতি আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কারও মুখেই নেকাব দেখছি না।
জবাবে আরেকজন আমিরজাদি মাথা নত করে বলে, ‘আমরা সকলেই মহামান্যের দাসী। দাসীদের আবার মনিবের সাথে পর্দা কিসের। আর মহামান্য রানি তো অত্যন্ত দয়া করে, প্রাচীন এই প্রথা সংরক্ষণের জন্য নেকাবের অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু আমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যদি আমাদের মুখ ঢাকতেই হয়, তাহলে আমরা এখানে আসব না। আর যদি আসি, তবে নেকাব ছাড়াই আসব।’
‘তোমার এই সৌভাগ্য ও আনুগত্যের প্রকাশ দেখে আমি মুগ্ধ। তবে এখানে কি এমন কোনো নারী আছে, যে আমার সামনে আসতে অশ্বস্তি বোধ করছে এবং এদিকে-সেদিকে লুকিয়ে আছে?’
‘এখানে এমন কোনো নারী নেই। সম্ভবত পুরো শহরেই নেই। আমরা নারীদের মধ্যে এই অলিখিত চুক্তি করেছি, যা আগত সকল দর্শনার্থীর কাছে প্রকাশ করেছি। কিন্তু আমরা এমন কোন নারীকে পাইনি, যে গতকাল বা পরশু মিনা বাজারে এসেছিল কিন্তু আজ আসেনি।’
‘তোমাদের সবার বাজারটি পছন্দ হয়েছে?’
কয়েকজন নারী বলে, ‘আমরা খুবই পছন্দ করেছি এবং মহামান্য রানির এ দান আমরা সারাজীবন মনে রাখব।’
‘তিনি বাজারটি নিছক শখের বশে নয়, বিশেষভাবে তোমাদের উপকারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর দৃশ্যমান উপকার হলো, নারীদের তৈরি জিনিসপত্র ভালো দামে বিক্রি হবে। তবে আসল উপকার হলো, গৃহে বন্দি থাকা নারীরা বহির্জগত দেখতে পাবে। পরস্পরের মধ্যে মেলামেশা বাড়াবে, ভালোবাসা ও নৈতিকতার সঙ্গে মিশতে শিখবে, জানবে সভ্যতার রীতিনীতি। তারপর একসাথে মিলে নিজেদের উদ্দেশ্য ও সুবিধাগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে।’
এক নারী বলে ওঠে, ‘নিশ্চয়ই আমাদের উন্নতি এবং সভ্য ও মার্জিত করে গড়ে তোলার জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষালয়, যাকে আমরা মনে করি মহামান্যের একটি স্থায়ী আশীর্বাদ।’
‘এ চিন্তা করেই রানির ইচ্ছা, প্রতি বছর বসন্তকালে এক মাসের জন্য এই বাজার চালু থাকবে। এটা ভেবেই তিনি বাজারের জন্য এই স্থায়ী দালানটি নির্মাণ করেন, যা দিনে দিনে আরো বড় হবে। এই সুযোগে প্রতি বছর একদিন তোমাদের সাথে দেখা করে আনন্দ পাব।’
কয়েকজন নারী বলে, ‘এতে আমরা গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করব।’
‘কিছু আলেম এবং সম্ভবত আরও কিছু লোকের আমার এখানে আসা-যাওয়া নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। যদিও আমি ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী এই বিষয়ে ভালোভাবে বিবেচনা করে নিশ্চিত হয়েছি, এতে ধর্মীয় কোনো বাধা নেই। তা সত্ত্বেও আমি প্রজাদের প্রাচীন রীতিনীতির প্রতি সম্মান করি এবং চাই না কারো মনে কোনো সন্দেহ তৈরি হোক। কিন্তু আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হলো, নারীদের উন্নতি ও কল্যাণের পাশাপাশি তাদের সংস্কার ও অগ্রগতি।’
অতঃপর বাদশাহ উঠে বিশ্রামগৃহ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বাজারের উদ্দেশে বের হন। বেহারারা হাওদা এগিয়ে নিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হেঁটে যাব।’ এরপর মুচকি হেসে বলেন, ‘বেগম পুরো রাস্তায় সুন্দর জমকালো কার্পেট বিছিয়েছে। পায়ে না হাঁটলে অকৃতজ্ঞতা হবে। আর আমি প্রতিটি দোকান দেখতে চাই, তাই পায়ে হাঁটব।’
তৎক্ষণাৎ নকীব নারী ও পরিচারিকাগণ সামনে এগিয়ে আসে এবং নারীদের ভিড়কে এদিক-সেদিক ঠেলে দিয়ে বাদশাহর সামনে অবস্থান নেয়। শাহজাদা, আমির ও অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ পেছনে থাকে। এত বড় মহিলা সমাবেশ, তাদের অপরূপ সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে স্বয়ং বাদশাহ জিল্লুল্লাহ ও তার দরবারি সফরসঙ্গীরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
যেহেতু সবার কাছ থেকেই শপথ নেওয়া হয়, কেউ কারও দিকে কুদৃষ্টিতে তাকাবে না। তাই কারও জন্য সুযোগ ছিল না কোনো সুন্দরী নারীকে মনভরে দেখবে। সকলেই নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখে। সম্ভবত হিন্দুস্তানে কুরআনের বিধান—‘মুমিন পুরুষরা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং মুমিন নারীরাও যেন রাখে তাদের দৃষ্টি অবনত’—এর ওপর এত আমল করা হয়নি, আজ যতটা আমল হচ্ছে।
বাদশাহ এক প্রান্ত থেকে দোকানগুলো দেখতে শুরু করেন। প্রত্যেক দোকানে তাশরিফ নিয়ে যান। প্রতিটি বস্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
বিক্রেতা নারীদের সাথে কথা বলেন, কেনাকাটার প্রতি উৎসাহ দিতে মূল্য পরিশোধ করেন এবং দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। যে পণ্যই সামনে পেশ করা হয়, তার মূল্যবান অংশ ক্রয় করে নেন।
এতে কোনো সন্দেহ নেই, প্রত্যেক নারীর আচরণ ও কথা বলার ধরন ছিল ভিন্ন। কেউ বেশ সুন্দর চটপটে। তার অবস্থা ছিল এমন, বাদশাহ যেমন তার কথায় আনন্দ পান, তেমনি সে-ও আনন্দ পায় বাদশাহর কথায়। কেউ আবার এতই বেপরোয়া, ঠাট্টা করতেও দ্বিধা করে না। বাদশাহ মনে মনে তার এমন বেপরোয়া স্বভাব দেখে মজা পান, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না।
কেউ কেউ এতটাই লাজুক, তার দিকে তাকানোই যায় না। মুখ থেকে একটি কথাও বেরোয় না। কিন্তু তার এই লজ্জা ও সংকোচের ভঙ্গিমা হৃদয়ের ভাষায় যেন সবাইকে ছাপিয়ে যায়।
কেউ আবার এতই স্থির প্রকৃতির গম্ভীর সংযত, যার মধ্যে লজ্জা বা ছলচাতুরি নেই। সে প্রতিটি কথার উত্তর দেয় অত্যন্ত সংযত ও সুস্থিরভাবে। বাদশাহ তাকে নিয়ে ঠাট্টা করলেও তার গাম্ভীর্যে বিন্দুমাত্র চিড় ধরাতে পারেন না।
তাদের মধ্যেও ছিল আবার নানা বৈচিত্র্য—
কারো একধরনের মহিমা, তো কারো স্বতন্ত্র কথা বলার ধরন। কারো সাহসিকতা একরকম, আবার কারও চপলতা অন্যরকম। কারো লজ্জায় একরকম শৈলী, তো কারও অন্যরকম।
মোটকথা, বাদশাহ প্রতিটি দোকান থেকে উৎসুক মনে এক নতুন ছাপ নিয়ে এই ‘সৌন্দর্যের বাজারে’ ঘুরতে থাকেন। এই পরিদর্শন ও কেনাকাটায় এতটাই সময় লাগে, বাজারের চারটি রাস্তার মধ্যে মাত্র একটি পরিদর্শনেই সন্ধ্যা নেমে যায় এবং সবখানে আলো জ্বলতে শুরু করে।
সন্ধ্যা হয়ে আসায় বাদশাহ বিনোদনকেন্দ্রের চত্তরে গিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে দ্বিতীয় রাস্তার ধারে যান এবং পুনরায় পরিদর্শন ও কেনাকানায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
বাজার এখন সম্পূর্ণ আলোকিত হয়ে ওঠে, যা আনন্দ বাড়িয়ে দেয়। যেভাবে রাতের আলোতে রাস্তা, দোকানপাট ও সেগুলোর সাজসজ্জার শোভা বেড়ে যায়, তেমনই দোকাদার নারী ও তাদের পণ্যের জৌলুসও বেড়ে যায়।
পরীসদৃশ নারীদের ঝাড়বাতি, ফানুস ও মশালের আলোয় দেখায় জান্নাতি হুরদের মতো। আর তাদের বিক্রিত মনিমুক্তোগুলো ছড়ায় দিনের আলোর চেয়েও বেশি দ্যুতি।
বাদশাহর পরিদর্শনের অবস্থা কি আর আগের মতো থাকে? প্রতিটি দোকানের সামনে থমকে যায় সময়, চাঁদমুখী সুন্দর দোকানিদের নয়নাভিরাম রূপ দেখেন। তাদের দোকানের সজ্জা ও সুন্দরভাবে সাজানো পণ্যগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকান। কথা বলেন তাদের সঙ্গে। কথা বলার ভঙ্গি ও আচরণে মুগ্ধ হন। তাদের মনভরে দেখে সামনে এগিয়ে যান।
এই পরিদর্শনেই কেটে রায় রাতের একপ্রহর, অথচ এখনো অর্ধেক বাজারই দেখা বাকি। আজ যেহেতু তিনি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি হেঁটেছেন, তাই খুব ক্লান্ত হয়ে বলেন, ‘মন তো চায় সারারাত এই পরিদর্শনেই কাটিয়ে দিই, আজই পুরো বাজার ঘুরে দেখি। কিন্তু আমি এখন ক্লান্ত। বাজারের লোকেরাও। তাই বাকি দুটি রাস্তা কাল ঘুরে দেখব। আজ যে সময়ে এসেছি কাল ঠিক একই সময়ে আসব। এ কথা বলে তিনি রাজকীয় বিশ্রামগৃহে ফিরে যান। কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম করেন। তারপর এশার নামাজ আদায় করে জাঁকজমকের সাথে মহলের দিকে রওনা হন।