জুয়াড়ি টমাস। দিলটা তার আস্ত পাথর। নিশুতি রাতে জুয়ার আড্ডায় যাওয়ার জন্য বেশ তড়িঘড়ি করছে। কম্পাসের কাঁটা যেমন কেবল উত্তরের দিকে নিবেদিতভাবে নিবদ্ধ থাকে, তেমনি জুয়াড়ির মনও নিবদ্ধ থাকে জুয়াখানায়। ঠিক ওই সময়ে ঘরে আরেকটি হৃদয়ের কাঁটা সচল ছিল। এই ভালোবাসার কাঁটাটি দিকভুল করে কেবল ওই টমাসের পাষাণ-হৃদয়ের দিকেই অমোঘ টানে আটকে আছে।
টমাসের স্ত্রী একবার তাকালেন তাঁর কোলে থাকা দুধের শিশুটির দিকে। সকাল থেকে বাচ্চাটির নসিবে এক ফোঁটা দুধ জোটেনি। জুটবে কোত্থেকে? খোদ মায়ের পেটেই তো গত দু-দুটি রাত ধরে হাড়জ্বালানি ক্ষুধা। ক্ষুধার তাড়নায় শিশুটি গোঙাতে লাগল। মা আর সইতে পারলেন না। ঝট করে নজর সরিয়ে তিনি তাকালেন স্বামী টমাসের দিকে। দুটি চোখ ছলছলে, তাতে ঠিকরে বেরোচ্ছে বুকফাটা হাহাকার আর একরাশ হতাশা।
নারীর চোখে সর্বনাশা হতাশা ও হাহাকার! প্রকৃতির কী নির্মম পরিহাস—যার ওই চাউনিতেই পৃথিবীর সমস্ত আশা আর ভরসার চাবিকাঠি লুকানো, আজ সেই চোখই কি না সামান্য করুণার কাঙাল? অন্য আরেকটি চোখের দিকে দয়ার আশায় চেয়ে আছে।
কিন্তু টমাসের ওসব দেখার ফুরসত কোথায়? স্ত্রীর আশাতুর সেই দৃষ্টি আর ইনসাফ-প্রার্থী চোখের পানি বিন্দুমাত্র রেখাপাত করল না তার মনে; বরং নিতান্ত অবজ্ঞা ও উপেক্ষাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল। স্ত্রীর মনে তখন তোলপাড়—এই কি সেই বে-রহম নিষ্ঠুর চোখ? অথচ বছর পাঁচেক আগে ঠিক এমনই এক রাতে এই চোখ দুটোই তো ভালোবাসার কাঙাল হয়ে অশ্রুসজল হয়েছিল—সেদিন তো সে ভিক্ষা চেয়েছিল ভালোবাসা, আর আজ আমি ভিখারি হয়ে হাত পেতেছি একটু রহম ও করুণার আশায়।
টমাস বেরিয়ে পড়ল। জুয়াখানার নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আহা! সে যদি একবার ফিরে দেখত—নিরাশা আর হাহাকারভরা দুটি চোখ কীভাবে তার পিছু নিয়েছে! জুয়ার মোহে সে আজ এতটাই মত্ত যে তার মনেই পড়ল না সেই অভাগা হৃদয়টির কথা; যে কি না তারই মতো এক জুয়ায় হেরে বসে আছে। মোহব্বতের এই জুয়ায় পরাজিত হয়ে বিজয়ী শত্রুর পাষাণ মুষ্টিতে বন্দি জীবনপাত করছে।
ফজর হলো। কোলের শিশুকে নিয়ে জুয়াখানায় এসে জুয়ার নেশায় বুঁদ জুয়াড়ি স্বামীকে খুঁজতে লাগল। দুশ্চিন্তায় তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। তবুও সেখানে গিয়ে তাকে শুনতে হলো যে, গত রাতে পুলিশের একটি দল তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। এই চরম দুঃসংবাদেও তার মরুর মতো শুষ্ক চোখে এক ফোঁটা জলও দেখা দিল না। কারণ জীবনের দীর্ঘ সফরে অশ্রুরও একটা মনজিল ও সীমা আছে । যে মনজিল ও সীমা বহু আগেই সে পার করে এসেছে।
টমাসের স্ত্রী পথ জিজ্ঞেস করতে করতে জেলখানার গেটে এসে হাজির হলো। কোলে তার দুধের শিশু। দরজার ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি মেরে সে খুঁজতে লাগল—বেড়ি-শিকলের এই শ্বাসরোধকারী পরিবেশে তার মানুষটা ঠিক কোথায়?
কার সাধ্য আছে এই মুহূর্তে এই নারীর মনোগতি পাঠ করার? যে পাষণ্ড স্বামী তাকে কেবল লাঞ্ছনাই দিয়েছে তার জন্য কেন এই ব্যাকুলতা? নারীর হৃদয় যেন অনন্ত অরণ্য, মোহন মায়াজাল এবং এক অমীমাংসিত রহস্য। এই হৃদয়কে পৃথিবীতে কে-ই বা বুঝতে পারে!
উফ্, মাওলানার অনুভূতি এত তীক্ষ্ণ!