ইকবালের চিন্তা ও শিল্পের সাথে আবুল হাসান আলি নদভির সম্বন্ধসূত্র সুনিবিড়, এতটাই যে, তাঁকে এভাবে ব্যক্ত করা যেতে পারে যে, ইকবাল তাঁর কাব্যযোগে মিল্লাতে ইসলামিয়াকে যে ব্রত প্রদান করেছেন, আলি নদভি গদ্যের মারফত সেই কাজটি সম্প্রসারিত অবয়বে সম্পাদন করেছেন, কিংবা এভাবেও ব্যক্ত করতে পারি, আলি নদভির ব্যক্তিত্ব হলো আল্লামা ইকবালের চিন্তার যথার্থ তর্জুমান।
যারা আলি নদভিকে জেনেছেন, পাঠ করেছেন, তাঁরা উপলব্ধি করবেন, নদভির শব্দে, বাক্যে, ভাবে, ব্যাখ্যায় এবং শৈলীতে আল্লামা ইকবালের ইসলামি পুনর্জাগরণের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মবিস্মৃত অধঃপতিত মুসলিম জাতির পুনরুত্থানে নিবেদিত একটি তপ্ত হৃদয়ের দরদই প্রতিফলিত, অনুরণিত। নদভির অসংখ্য রচনা, বক্তৃতা ও খুতবা ইকবালের আত্মিক আশীষে প্রাণিত, ঋদ্ধ।
বোধ হওয়ার পর থেকেই ইকবাল ছিলেন আলি নদভির পাঠ ও প্রেরণার বিষয়। এই বিষয়ে নদভি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই আল্লামা ইকবালকে পছন্দ করি এবং বোধের বয়সে পৌঁছে তাঁকে আমার চর্চার বিষয় করে নিই। ইকবাল যখন তাঁর খ্যাতির শীর্ষে, তখন আমার উন্মেষের কাল। কবি হিসেবে ইকবালের যে প্রভাব তাঁর সময়ের ওপর ছিল, তাঁর উদাহরণ কোনো কালের কবির ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তাই আমি যদি তাঁকে আমার শৈশবে পছন্দ করি এবং বুঝের বয়সে এসে তাঁকে নিজের বিষয়বস্তু করে নিই, তবে তা মোটেই আশ্চর্যের নয়।’
অন্যত্র বলেন, ‘আমি ছাত্রাবস্থাতেই ইকবালের ‘চাঁদ’ কবিতাটিসহ কিছু কিছু পদ্যকে আরবি বসন পরিধান করাবার চেষ্টাও করি। আমি তখন কেবল তাঁর ‘বাঙ্গে দরা’ পড়েছিলাম। তাঁর কাব্যের ফারসি সংকলন প্রকাশিত হলেও আমি তখনও তাঁর যওক-শেনাস তথা তাঁর শিল্প-রুচিকে আত্মস্থ করতে পারিনি।’[1]নুকূশে ইকবাল, আবুল হাসান আলি নদভি, ১৯৮৫, পৃ. ৩৩।
১৯২৯ সালের জুন মাসে লাহোরে, পনেরো কি ষোলো বছর বয়সে আল্লামা ইকবালের সাথে প্রথমবারের মতো আলি নদভির সাক্ষাৎ ঘটে। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ইসলামি ক্যারিকেচার অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল্লাহ চাগতাই তাঁকে ইকবালের নিকট নিয়ে যান এবং ইকবালের কাছে আলি নদভিকে ‘গুলে রানা’র রচয়িতা তাঁর পিতা এবং ‘তাঁর কাব্যের অনুরাগী’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। নদভি সেদিনের সান্নিধ্যে ইকবালের ‘চাঁদ’ কবিতার আরবি তর্জমাটি পেশ করেন। ইকবাল তখন আলি নদভিকে কতিপয় আরব কবি সম্পর্কে এমন কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, যা থেকে নদভির জানা-শোনার পরিসর আন্দাজ করা যায়! এই প্রথম সাক্ষাতের অনুভূতি ব্যক্ত করে আলি নদভি লিখেন, মজলিস শেষ হয় আর আমি এই মহান কবির বিনয়-নম্রতা, সরলতা, স্পষ্টবাদিতা ও আন্তরিকতার প্রতি দারুণ মুগ্ধতা নিয়ে প্রত্যাবর্তন করি।[2]প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩।
১৯৩৫ সালের পর থেকে, যখন তিনি ইকবালের কাব্যগ্রন্থ ‘জারব-এ-কলিম’, ‘বাল-এ-জিবরিল’, ‘আসরার-ই-খুদি’, ‘রুমুয-এ-বেখুদি’, ‘মসনবি’, ‘পাস চে বায়াদ কার্দ, আয় আক্বওয়াম-এ-শারক’, ‘পয়গাম-এ-মাশরিক’, ‘জাভেদ-নামা’ এবং ‘জাবুর-এ-আজম’ অধ্যয়ন করতে থাকেন, আলি নদভির সামনে ইকবালের কবিতার উচ্চতা এবং প্রভাবের প্রকৃত তাৎপর্য হাজির হতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে আলি নদভির মনমস্তিষ্ক সাহিত্য, কবিতা এবং চিন্তার ক্ষেত্রে আল্লামা ইকবালের এমন প্রভাব গ্রহণ করে নেয়, যা অন্য কারো ক্ষেত্রে ছিল না।
আলি নদভি সবিশেষ ইকবালের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অন্যতম কারণ এই বলেছেন যে, ‘সমসাময়িক লেখক ও পণ্ডিতদের জ্ঞানগত গবেষণা, কৃতিত্ব এবং তথ্যের উৎসগুলি সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত ছিলেন, এবং তাঁর ধারণা ছিল যে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যয়ন এবং অবিরাম অনুশীলনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব; কিন্তু ইকবালের চিন্তা ও ধারণা এবং তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস ছিল তাঁর নাগালের বাইরে।’
আলি নদভি আরও লিখেন: ‘সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি আমাকে তাঁর চিন্তা-শিল্পের দিকে ধাবিত এবং তাঁকে আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে, তা হলো—তিনি উন্নত দৃষ্টি, ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের কবি, যার সুষম সংমিশ্রণ তাঁর কাব্য-কালামের মধ্যে পাওয়া যায় এবং যা তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে দেখা যায় না। অর্থাৎ, ইকবাল একটি বিশ্বাস, একটি দাওয়াহ এবং একটি পয়গাম বহন করেন। আমিও আমার স্বভাব ও চরিত্রের মধ্যে এই তিনটি উপাদান খুঁজে পাই। আমি সে-ধরনের সাহিত্য এবং পয়গামের দিকে স্বতঃস্ফূর্তই প্রবৃত্ত হই, যা উচ্চ দৃষ্টি, উন্নত মনোবল ও ইসলামের পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানায় এবং মহাবিশ্ব জয়ে ও নিজের আত্মনির্মাণে অনুপ্রাণিত করে, যা ভালোবাসা ও হৃদ্যতার মতো সুকুমার বৃত্তিকে পুষ্ট করে এবং ঈমানী শুউর ও বিশ্বাসী চেতনাকে জাগ্রত করে, সর্বোপরি যা মুহাম্মদ (সা.)-এর মহত্ত্ব এবং তাঁর পয়গামের সর্বজনীনতা ও চিরন্তনতায় বিশ্বাস করে।’
‘.. আমি আল্লামা ইকবালকে দেখি, তিনি ইসলামের মহত্ত্ব এবং মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যধিক চিন্তাশীল, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও গোঁড়া দেশাত্মবোধের ঘোর বিরোধী এবং পশ্চিমের বস্তুবাদী সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সমালোচক ও বিদ্রোহী। সর্বোপরি ইনসান ও ইসলামের এক মহান প্রবক্তা। এইভাবে, ‘কালাম-এ-ইকবাল’ আমার পছন্দের নিক্তিতে উত্তীর্ণ হয়ে ধরা দেয় এবং তা কেবল আমার বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই নয়, বরং তা এমনকি আমার উপলব্ধি ও অনুভূতিরই প্রতিস্বর হয়ে হাজির হয়।’[3]প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪।
১৯৩৭ সালে ইকবালের মৃত্যুর মাসকয়েক আগে ইকবালের সাথে আলি নদভির দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়। এটি ছিল দীর্ঘ এবং শেষ সাক্ষাৎ। এই সাক্ষাৎ-আলাপে আল্লামা ইকবাল নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। জাহিলি যুগের কবিতা, গ্রিক দর্শন, খোদাতত্ত্ব, ইউরোপের বিকাশ থেকে শুরু করে হিন্দুস্তানে ইসলামের পুনরুজ্জীবন এবং মুসলমানদের একটি স্বাধীন স্বদেশের প্রয়োজনীয়তাসহ অনেক বিষয়ে মত প্রকাশ করেন তিনি। এই বিষয়ে আলি নদভি ‘নুকুশ-এ-ইকবাল’-এর ভূমিকায় বিস্তারিত বিবরণ দাখিল করেছেন।
নদভি আমাদের জানান, ‘ইসলামের এই মহান কবির মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে তাঁর সাথে এক দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক সাক্ষাতের সুযোগ হয় আমার। তারিখটা ছিল ১৬ রমজান, ১৩৫৬ হিজরি মোতাবেক ২২ নভেম্বর ১৯৩৭ সাল। যখন আমি আমার ফুফা মাওলানা সাইয়্যেদ তলহা হাসানীর (লাহোরের অরিয়েন্টালিজম কলেজের সাবেক অধ্যাপক)-এর সঙ্গে ইকবালের বাসগৃহে পৌঁছাই, আল্লামা ইকবাল তখন দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় শয্যাশায়ী, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সাথে বেশ প্রফুল্লতার সাথে সাক্ষাৎ করেন! সম্ভবত, আমাদের আগমনে তাঁর মনে এই সাময়িক পুলক অনুভূত হয়েছে। মোটকথা, সেদিন তাঁর মেজাজের বাঁধন যেন খুলে যায়। আমাদের বৈঠক জারি ছিল খুবই মনোরম এক আবহে। তাঁর খাদেম আলি বখশ মাঝে-মধ্যে এসে ইকবালকে অতিরিক্ত উপবেশন ও আলাপন থেকে নিবৃত্ত হতে বললেও তিনি বরাবরই এড়িয়ে যান। এই সাক্ষাৎ-আলাপে বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে থাকে। জাহেলি কবিতার আলোচনা এলে, ইকবাল এর শুদ্ধতা ও নৈপুণ্য, এর চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং ‘হামাসা’ থেকে কিছু কবিতা আবৃত্তি করেন।’
ইকবাল এরপর বলতে লাগলেন, ‘ইসলাম তার অনুসারীদের মধ্যে ব্যাবহারিকতা ও বাস্তববাদিতা সৃষ্টি করে। এদিকে আজকের বিজ্ঞানও বাস্তববাদ এবং কল্পনা-অনুমান থেকে দূরত্বে অবস্থানের ক্ষেত্রে ইসলামের নিকটবর্তী বলে লক্ষ করা যায়। ইসলামের দুই শতাব্দীকাল মুসলমানদের ভেতর এই চেতনারশ্মি জীবন্ত ছিল, যার ফলশ্রুতিতে তারা বিশ্বাস, কর্ম, আদর্শ ও চরিত্রের সুদৃঢ় রাজপথে ছিল সতত অবিচল। কিন্তু, গ্রিক খোদাতত্ত্বের ফালসাফা প্রাচ্যকে রুগ্ন এবং নিষ্কর্ম মানুষে পরিণত করেছে! … ইউরোপের পুনর্জাগরণও তখন হয়েছিল, যখন সে তার স্কন্ধ থেকে অধিবিদ্যক দর্শনের জোয়াল ছুড়ে ফেলেছিল এবং উপকারী, ব্যবহারিক বিজ্ঞানের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিল। তবে বর্তমানে সে-সমস্ত সংকট সৃষ্টি হতে শুরু করেছে, ইউরোপকে যা রিগ্রেশনের পথে নিক্ষেপ করে। ইকবাল বলেন, আরবীয় মেজাজ ইসলামের পক্ষে খুবই যুৎসই প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু, অনারবী চিন্তাকল্প ইসলামের উপর তেমনই অবিচার করেছে, যেমনটা ইউরোপের উপর করেছিল গির্জা। মোটকথা, অনারবী চিন্তা-চেতনা উভয় ধর্মকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে।’
এর পর ইকবাল তাসাউফের আলোচনায় কতিপয় সুফির চিন্তাগত প্রান্তিকতার সমালোচনা করেন এবং ওয়াজদ ও সামা’ (আত্মবিলোপের এক বিশেষ অবস্থা) সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামের এ ধরনের খেয়ালিপনা ছাড়াই ঘোড়সওয়ারি এবং জান-কোরবানিতে পুলক অনুভূত হতো। হিন্দুস্তানে ইসলামের সংস্কার ও পুনর্জাগরণের প্রসঙ্গ আসলে, শায়খ আহমদ সারহিন্দি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, সুলতান মহিউদ্দিন আলমগীর (রহ.)-এর বেশ প্রশংসা করেন তিনি। বলেন, ‘আমি সর্বদাই বলে থাকি, যদি এই মনীষীদের অস্তিত্ব এবং তাঁদের সংগ্রাম-সাধনা নিয়োজিত না হতো, তবে ভারতীয় সংস্কৃতি এবং দর্শন ইসলামের প্রাণসত্তাকে গিলে খেত!’
পাকিস্তান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে জাতি নিজস্ব দেশ রাখে না, তারা তাদের ধর্ম এবং সভ্যতাকেও ধরে রাখতে পারে না। ধর্ম ও সভ্যতা রাষ্ট্র ও প্রতিপত্তি দ্বারাই বেঁচে থাকে। সুতরাং, পাকিস্তানই মুসলিম সংকটের একক উদ্ধার এবং এটি অর্থনৈতিক জটিলতার সমাধানও বটে।’ প্রসঙ্গত তিনি ইসলামের যাকাতব্যবস্থা এবং বায়তুল মাল-এর বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি কতিপয় রাষ্ট্রীয় ও সরকারি মুসলিম কর্তাব্যক্তিদের অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং মুসলমানদের মধ্যেও দাওয়াতি তৎপরতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছি। আরবি ভাষার অগ্রগতি এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কথা বলেছি, এবং আমার মতে, মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের জন্য একটি উচ্চস্তরের ইংরেজি পত্রিকারও প্রয়োজন আছে; যার মারফৎ মুসলিম জাতির কণ্ঠস্বরে শক্তি এবং প্রভাব সৃষ্টি হবে। কিন্তু আফসোস, মুসলিম নেতা ও হর্তাকর্তারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি আর না তাঁরা আসন্ন বিপদ সম্পর্কে টের পেয়েছিলেন।’ তাঁদের অদূরদর্শিতা, নিচু মানসিকতা এবং আত্মস্বার্থপরায়ণতার নেহাত নিন্দাকারী ছিলেন ইকবাল।[4]প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪-৩৬।
আলি নদভি তাঁর এই বৈঠকে ইকবালের কাছে তাঁর কাব্যের আরবি তর্জমা করার অনুমতি প্রার্থনা করলে, ইকবাল অত্যন্ত খুশি হন এবং অনুমতি প্রদান করেন, এবং ড. আব্দুল ওয়াহহাব আযযাম সাহেবের আরবি অনুবাদের আগ্রহের বিষয়টিও ইকবাল আলি নদভিকে জানান। বস্তুত, আলি নদভি সবসময় এটা ভেবে মনঃক্ষুণ্ন হতেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইকবালের তুলনায় আরব দেশে অধিক পরিচিত। নদভি যখনই আরবি পত্রিকার পাতায় ঠাকুরের প্রশংসামূলক লেখা দেখতেন, নিজের ভেতর আরব দেশে ইকবালকে পরিচিত করানোর একটা তাগিদ বোধ করতেন।
আলি নদভি নিজেই লেখেন, ‘আমাকে এ বিষয়টি উদ্বিগ্ন করত যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইকবালের তুলনায় আরবজগতে অত্যধিক পরিচিত এবং মিশর, শাম ইত্যাদি দেশের আরবি সাহিত্যিকরা তাঁর ভক্ত। এই অবস্থাকে আমি আমাদের আত্ম-ঔদাসীন্যের পরিণাম হিসেবে বিবেচনা করি। কারণ, আমরা ইকবালকে সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি, যেভাবে দরকার ছিল। আরবি ম্যাগাজিনগুলোতে ঠাকুর প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের ওপর যখনই প্রশংসামূলক প্রবন্ধ চোখে পড়ত, তখন আমার মনে ইকবালের আরবি রূপান্তরের ইচ্ছে সতেজ হয়ে উঠত এবং সে কাজকে নিজের যিম্মায় আমানত মনে হতে থাকে।’[5]প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪।
২১ এপ্রিল ১৯৩৮ সালে, ইকবালের প্রয়াণ-সংবাদ পেলে তাঁর সৃষ্টি-শিল্প ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কাজ করার সংকল্প আলি নদভির ভেতর পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে আলি নদভি মিশর ও শাম সফর করেন এবং সেখানে প্রায় এক বছরের অধিককাল অবস্থান করেন। সেসময়ে ইকবাল এবং তাঁর চিন্তা-শিল্প সম্পর্কিত কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করে দারুল উলুম এবং কায়রো ইউনিভার্সিটিতে সেগুলি পাঠ করেন। ১৯৫৬-এ দ্বিতীয়বার শাম সফরকালে রচনা করেন আরও একটি আর্টিকেল, যা “মুহাম্মদ ইকবাল ফী মাদীনাতীর রাসুল” শিরোনামে দামেস্ক রেডিও থেকে প্রচারিত হয়।
কিন্তু, নদভি জানান, ইকবালের কবিতার তর্জমার জন্য মন তখনও যেন পুরোপুরি সায় দিচ্ছিল না। এর একটি কারণ ছিল, ড. আব্দুল ওয়াহহাব আযযাম কাজটি শুরু করেছিলেন। তাঁর আরবি, ফারসি ভাষাদক্ষতা এবং ইকবালের সঙ্গে তাঁর চিন্তাগত ঘনিষ্ঠতার কারণে এ কাজ তাঁর পক্ষে বেশ উপযুক্তও ছিল বটে। পরবর্তীতে যখন তাঁর তর্জমার একাধিক সংকলন সামনে আসে, নদভির কাছের কিছু বন্ধু তাঁকে বলেন, ‘এই তর্জমার মধ্যে মূলের সেই জোর এবং ভাব-বৈশিষ্ট্য বজায় নেই। এ কারণে ইকবালের চিন্তা স্পষ্টভাবে এতে উপলব্ধ হয় না এবং ইকবালের সুখ্যাতির পক্ষেও তা মানানসই নয়!’
আলি নদভি নিজেও তর্জমাগুলি দেখে বুঝতে পারেন যে, তর্জমার জ্ঞান এবং তাঁর পদ্যের মধ্যে কোনো শাস্ত্রীয় ত্রুটি নেই, বরং মূল সমস্যা হলো, তিনি ছন্দ-গ্রথিত অনুবাদের দায়িত্ব নিয়ে নিজের সাথে সুবিচার করেননি। এর ফলে আসল এবং নকল—উভয়ের বৈশিষ্ট্য যথারূপে উদ্ভাসিত হতে পারেনি। কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ততা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা পাঠক এবং কাব্য-স্বাদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাঁর মতো আরবি সাহিত্যিক, ফারসি ভাষাবিজ্ঞ ব্যক্তির জন্য বরং সমীচীন ছিল, তিনি ইকবালের চিন্তাকে আত্মস্থ করে অতঃপর তাঁকে আরবি পদ্যের পোশাক পরাতেন, যেভাবে বিখ্যাত মিশরীয় ম্যাগাজিন ‘আর-রিসালাহ আস-সাকাফাহ’-এর কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী আর্টিকেলের মধ্যে তিনি তা করতে সফল হয়েছেন।[6]প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭-৩৮।
এ প্রসঙ্গে নদভি আরও বলেন, ‘স্পষ্টতই, প্রতিটি ভাষার নিজস্ব স্থানিকতা, মনস্তত্ত্ব এবং পরিভাষা রয়েছে, যার উৎপত্তি সেই ভাষার সমাজ-সংস্কৃতি ও ইতিহাসে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। শব্দগত রূপান্তর যদি এই ব্যাপারগুলিকে ধারণ করতে না পারে, তবে সেই ভাষান্তর আপন সৌন্দর্য ও তাৎপর্য হারাবে। তা সত্ত্বেও ড. আযযামের কাজ ইসলাম ও সাহিত্যের এক অসামান্য খেদমত; যা সর্বরকম মূল্যায়ন, কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতির দাবিদার। উপরন্তু তাঁর আরবি ভাষাজ্ঞান, তাঁর সুন্দর কর্মনিষ্ঠতা এবং ইসলামী চিন্তার সাথে তাঁর আন্তরিক সংযোগেরই দলিল। এটা ইকবালের সৌভাগ্য যে, তিনি আযযামের ন্যায় একজন তর্জুমান পেয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই, ইকবালের আত্মা আযযামের এই প্রচেষ্টা ও ভালোবাসার দ্বারা প্রফুল্ল ও প্রসন্নবোধ করছে। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।’[7]প্রাগুক্ত।
তো আলি নদভি এই বাস্তবতা ও বিচিত্র ব্যস্ততার ভারে ইকবালের কবিতার তর্জমার কাজে লিপ্ততার প্রতি সেভাবে উৎসাহ পাচ্ছিলেন না, কিন্তু একটি ঘটনা জিয়নকাঠির স্পর্শের মতো তাঁর ঝিমিয়ে থাকা সংকল্পকে জিইয়ে তোলে। দামেস্কের একটি মর্যাদাপূর্ণ ম্যাগাজিন ‘আল-মুসলিমুন’-এ আরবি ভাষার খ্যাতিমান সাহিত্যিক আলি তানতাভির একটি পত্র তিনি পান, যেখানে তিনি আলি নদভিকে ইকবালের কবিতার তর্জমা করার আমন্ত্রণ জানান, যেন আরবভূমিতে ইকবালের পরিচয় ঘটে এবং তাঁর কবিতার পয়গাম সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায়।
আলি তানতাভি সে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনি কি ইকবালের কবিতার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ করে আমাদেরকে তাঁর চিন্তা ও বিশ্বাসের মাহাত্ম্যকে বোঝার এবং এর রহস্যকে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দিয়ে উপকৃত করবেন? আযযামের আরবি অনুবাদ আমাদের মধ্যে অপরিচিততার প্রাচীরকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। আপনি কি এই মহান কাজকে আপনার খেদমতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং আমাদেরকে দৃষ্টির অন্তরালে থাকা সেই রহস্যোদ্যানে বিহার করার মওকা করে দেবেন?’[8]আল মুসলিমুন, সংখ্যা, ৩, খণ্ড ৬, উদ্ধৃত : নুকূশে ইকবাল, প্রাগুক্ত, ৩৮-৩৯।
তানতাভির এরূপ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আলি নদভি এই পর্যায়ে প্রস্তুত হয়ে যান। তিনি নিজেই বলেন, ‘আলি তানতাভির এই প্রস্তাব আমার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে। এরই ফলশ্রুতিতে, ‘মসজিদ-এ-কুরতুবা’ শীর্ষক কবিতাটি এক বৈঠকে তর্জমা তৈরি হয়ে গেল এবং নিজের ভেতর তর্জমার এমন এক অন্তর্গত প্রেষণা ও উচ্ছ্বাস অনুভব করলাম যে, পরপর ধারাবাহিক কয়েকটি প্রবন্ধ লেখা হয়ে যায়।’[9]প্রাগুক্ত, ৩৯। ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’ সে-সব রচনারই গ্রন্থবদ্ধ সংকলন। যেহেতু এই প্রবন্ধগুলির প্রাথমিক শ্রোতা ছিলেন আরব, এবং ইকবাল ও ইকবাল-চিন্তার সাথে তাঁরা ছিলেন অপরিচিত, তাই নদভি ইকবালের কালামের সেই অংশকে বিশেষভাবে ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’-এ অন্তর্ভুক্ত করেন যেগুলি আরবদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
বলা বাহুল্য, আলি নদভির ‘রাওয়াই’ ইকবাল-এর পরেই আরব ও ইসলামি দুনিয়া ইকবাল প্রতিভার সন্ধান লাভ করে এবং ইকবাল হয়ে উঠেন আরবদের অধ্যয়নের অংশ। এই প্রসঙ্গে, ‘ইকবাল, ইকবালিয়্যাত এবং উর্দু ভাষার দু’জন ইকবাল বিশেষজ্ঞ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে নায়াব হোসাইন লিখেছেন, ‘ইকবালিয়্যাত’কে উপলব্ধি এবং প্রসারণের ক্ষেত্রে আলি নদভির ভূমিকা লক্ষণীয়রূপে হাজির হয়। আলি নদভি ইকবালের মৃত্যুর প্রায় ত্রিশ বছর পর একটি নতুন জগতের সাথে আল্লামা ইকবালকে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হন। ইকবালকে তিনি তাঁর বিচক্ষণ মেধা এবং সাবলীল ও সুস্পষ্ট লেখনীর মাধ্যমে সেইসব মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন; যারা ছিল ইকবালের অধিকাংশ বক্তব্যের সত্যিকার শ্রোতা।
নায়াব হোসাইন তাঁর লেখায় একটি স্মৃতিকথার উল্লেখ করেন। যেখানে তিনি বলেন, ২০১০ সালে আমি দারুল উলূম দেওবন্দে তখন অধ্যয়নরত, সুপরিচিত আরবি ইসলামি চিন্তাবিদ, সুলেখক এবং বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘লা তাহযান’-এর রচয়িতা ড. আয়াজ আল ক্বরনী দেওবন্দ আগমন করেছিলেন। তিনি জামে রশিদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইকবালের বিখ্যাত এই কবিতা :
رہ گئی رسمِ اذاں روحِ بلالی نہ رہی
فلسفہ رہ گیا تلقینِ غزالی نہ رہی
এর আরবি অনুবাদটি আবৃত্তি করেন আলি নদভির বরাতে এবং তিনি এরপর এর হৃদয়হারী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এমনভাবে যে, আমার অনুভব হয়েছে, ইকবালকে এর চেয়ে উত্তমরূপে না বোঝা সম্ভব, না বোঝানো সম্ভব! আর নিশ্চয়ই এর কৃতিত্ব আলি নদভিরই। যিনি তাঁর ভাষিক ও সাহিত্যিক দক্ষতা, বৌদ্ধিক ও মননশীল প্রতিভা এবং গভীর ইসলামিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনার অধীনে ইকবালকে অত্যন্ত বিশ্বস্তরূপে আরববিশ্বে উপস্থাপন ও পরিবেশন করতে সক্ষম ও সফল হয়েছিলেন।
‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’ কোনো পদ্য অনুবাদ নয়; কিন্তু এর বাগ্মিতাপূর্ণ সাহিত্যিক প্রকাশ এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, একে গদ্য কবিতা বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে লেখকের তত্ত্বাবধানে ‘নুকুশ-এ-ইকবাল’ নামে বইটির উর্দু রূপান্তর হয় মওলভী শামস তাবরিজ খানের তুরীয় হাতে। অনুবাদকের সাহিত্যিক প্রতিভা এবং দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ আপন অনুবাদেই স্পষ্ট। আরবির সমস্ত গুণাবলী অনুবাদে উপস্থিত এবং এর সাবলীল ও মসৃণতার কারণে অনুবাদটি অনুবাদের মতো মনে হয় না।
আব্দুল মজিদ দরিয়াবাদী যেমনটা বলেন, ‘মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভি ইকবালের ওপর ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’ নামে আরবিতে রচিত বইটি সম্পাদনা ও সংযোজনের পর উর্দু বিন্যাসে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের সামনে এসেছে, যা প্রতিটি ইকবাল-ভক্তের দেখার উপযুক্ত। বইটি থেকে আমরা জানতে পারি, আলি নদভি ইকবালকে কোন কোন দিক থেকে আরবি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন।’[10]সিদকে জাদীদ, ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭০।
বইটিতে তিনি ইকবালের গুরুত্বপূর্ণ নজম ও বিভিন্ন কবিতা থেকে ইসলামের শিক্ষা, তাঁর চেতনা ও ইসলামি জাতির তাজদিদ ও সংস্কার, পশ্চিমা সভ্যতা এবং এর জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কিত ইকবালের চিন্তা ও ধারণাগুলির সারনির্যাস উপস্থাপন করে দিয়েছেন, যা থেকে এর প্রধান দিকগুলো সামনে এসে যায়। বইটি সংক্ষিপ্ত হলেও ইকবালের উদ্দেশ্য, বার্তা ও ধারণা বোঝার জন্য যথেষ্ট।[11]মাহনামা মাআরিফ, মার্চ, ১৯৭১।
বস্তুত, ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’-এর উর্দু অনুবাদের প্রয়োজন ছিল নানা বিচারে। উর্দু জগতে, ইকবাল এবং মাওলানা নদভির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা ক্রমাগতভাবেই চাচ্ছিলেন যে ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’-এর একটি উর্দু অনুবাদ হওয়া উচিত, কারণ ইকবাল এবং মাওলানা নদভির চিন্তাগত সামঞ্জস্যের এ এক স্বাভাবিক তাগাদা ছিল যে, একটি চিরজীবন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর উপস্থাপিত ধারণাগুলি থেকে উপকৃত হওয়া উচিত.. এভাবে মাওলানা নদভির কলম থেকে বেরিয়ে আসা কিছুর গুরুত্ব একাডেমিক ও সাহিত্যিক মূল্যের সাথে সাথে এর ইসলামবান্ধবতা ও এর দাওয়াতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
যেমনটি বইটির অনুবাদকের অভিমত, ‘ইকবালকে বিশেষভাবে তাঁর দ্বীনি রুজহান ও দাওয়াতি প্রবণতার আলোকে দেখার চেষ্টা এখন পর্যন্ত খুব কমই হয়েছে। ‘রাওয়াইয়ু’-এর মধ্যে মনে হয় ইকবালের হৃদয় ও আত্মা পর্যন্ত পৌঁছার এবং এর কিছু দিক উদ্ভাসিত করার সফল প্রয়াস হয়েছে।’[12]নুকূশে ইকবাল পৃ. পৃ. ২৫-২৬।
প্রখ্যাত উর্দু সমালোচক শামসুর রেহমান ফারুকী ধ্রুপদী উর্দু গজলে কাব্যিকতার দুটি মৌলিক দিক চিহ্নিত করেছেন: Epistemological এবং Ontological। প্রথম দিকটি কবিতার রচনা, কল্পনা এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ দিকগুলিতে আলোকপাত করে। দ্বিতীয় দিকটি কবিতার বাহ্যিক ও আনুষ্ঠানিক গুণাবলী বিবেচনা করে। তিনি বলেন, ‘ধ্রুপদী যুগের পর, আমরা কবিতার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক মানদণ্ডে একটি নতুন মাত্রা (Dimension)-এর সংযোজন দেখতে পাই, যাকে ‘পয়গাম’ অভিধায় ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। উর্দু সমালোচনার তিন ভিত্তিপুরুষ—আজাদ, হালী এবং শিবলির হাত ধরে যার শুরুয়াত এবং যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো আল্লামা ইকবালের কবিতা।’[13]শেরে ইকবাল কী হাকীকী কদর ও কীমত পর আলী নদভী কা নুকতায়ে নজর, দলিল ডট পি কে, ৯ … Continue reading
এই প্রসঙ্গে সাইয়্যেদ মাতিন আহমেদের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেন, ‘ইকবালকে সাধারণত একজন দার্শনিক, কবি, চিন্তাবিদ এবং নতুন চিন্তার একজন রাজনৈতিক চিন্তক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইকবালের এই সকল মাত্রা অপেক্ষা বিশিষ্ট মাত্রা হলো তাঁর ঈমানের দাঈসুলভ মাত্রা। ইকবালের এ মাত্রাটিকে সর্বোচ্চ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন সম্ভবত মাওলানা আলি নদভি। ইকবালের কবিতার ঈমানি ও দাওয়াতি দিক নিয়ে লেখার জন্য যেহেতু নিছক শব্দের জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, যদি না লেখক ইকবালের হৃদয়ের উত্তাপ এবং খোদার সামনে ব্যাকুল আকুলতার কিছু অংশ লাভ করেন। ফলে স্বভাবতই এ দিকটিকে আলি নদভির উপযুক্ত ব্যক্তিত্বই তুলে ধরতে পেরেছে উত্তমরূপে। .. বস্তুত, ইকবালের কবিতার এই দিকটিই ইকবালকে প্রথাগত কবি বা সাহিত্যিকের পরিচয় থেকে সরিয়ে ‘আসহাবে-দাওয়া’র কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। .. এ বইটি অধ্যয়ন করার মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র ইকবাল চিন্তার অবগতিই মেলে না, বরং পাঠককে সেই অন্তর্দহনের অভিজ্ঞতায়ও ঋদ্ধ করে, যা এমনই এক অমূল্য রত্ন, আজকের বস্তুবাদ এবং মেকি দুনিয়ায় সর্বস্ব দিয়েও যদি তা হাসিল করা যায়, তবুও তা হবে এক সস্তা সওদা!’[14]প্রাগুক্ত।
বলাই বাহুল্য, আলি নদভিই হলেন প্রথম আলেমে দ্বীন যিনি আল্লামা ইকবালের ব্যক্তিত্ব এবং কবিতাকে অসাধারণ আবেগ এবং অন্তর্দৃষ্টির সাথে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি ইকবালের সমস্ত বৌদ্ধিক উপাদানের উপলব্ধি ও উপস্থাপনের যথাযথ হক আদায় করেছেন। এবং কেবলমাত্র তাঁর মতো ব্যক্তিত্বই তা করতে পারতেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে কেবল তাঁরাই ইকবাল চিন্তার বোঝাপড়া করতে পারেন সত্যিকার অর্থে, যাদের মন ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে প্রোথিত, যিনি ইসলামের গতিশীল, বিপ্লবী উপাদান সম্বন্ধে সচেতন, যিনি সম্যকভাবে ইসলাম অধ্যয়ন করেছেন।
আলী নদভির ‘রাওয়াইয়ু ইকবাল’ বা ‘নুকুশ-এ-ইকবাল’ ইকবাল-অধ্যয়নের ক্ষেত্রে নিছক একটি সংযোজন মাত্র নয়, বরং ইকবাল অধ্যয়ন ও উপলব্ধির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক এবং চিরন্তন মর্যাদা রাখে। এ ক্ষেত্রে আলী নদভির কৃতিত্ব মৌলিক এবং চিরস্বীকৃত। স্বয়ং ইকবালপুত্র ড. জাভেদ ইকবাল বলেন, ‘আপনি ইকবাল চিন্তার বিভিন্ন দিক এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, খুব সম্ভব যে, ইকবাল তেমনই অনুভব করতেন বা চাইতেন।’[15]নুকূশে ইকবাল পৃ. ৬-৭।
এভাবে, দৈনিক জঙ্গ করাচির ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭৩ সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়: ‘আবুল হাসান আলী নদভির মতো একজন বিশ্বস্ত ইলমি এবং দ্বীনি ব্যক্তিত্ব ‘ইকবালিয়্যাত’-এর উপর কলম ধরেছিলেন, এটি নিজেই সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মহান ঘটনা। তিনি আরবি ভাষায় মূল বইটি লিখে ইসলামি বিশ্বের ঐক্যের নকিব ইকবালকে আরব বিশ্বের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করানোর উজ্জ্বল প্রচেষ্টা করেছেন।’[16]প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫।
মান্যবর সাহিত্য-সমালোচক, কবি ও সাহিত্যিক মাহির-উল-কাদরি ‘নুকূশ-এ-ইকবাল’-এর এক পর্যালোচনায় লেখেন, ‘মহান লেখক যে সূক্ষ্মতা এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ইকবালের কবিতার ব্যাখ্যা ও তর্জুমানি করেছেন, তা যতই প্রশংসা করা হোক, যথেষ্ট হবে না। বইটি পড়ার সময় অনুভূত হয় শিবলির কলম, গাজ্জালির চিন্তা, ইবনে তাইমিয়ার উদ্দীপনা ও ঐকান্তিকতা এই রচনায় সমান্তরালভাবে ক্রিয়াশীল। ইকবালের উপর অনেক ভালো বই আছে, কিন্তু এ বইটি সেই মুজাহিদ আলিমের রচনা, যিনি ইকবালের ‘মরদে মুমিন’-এর বাস্তব উদাহরণ। তাই ‘নুকূশ-এ-ইকবাল’ অধ্যয়ন করার সময় অনুভূত হয় ইকবালের চিন্তা এবং আত্মা এখানে তেমনই একীভূত, যেমন ফুলের ভেতর সুবাস এবং নক্ষত্রের ভেতর আলো।’[17]মাহনামা ফারান, করাচি, মে, ১৯৭১।
আলি নদভি ইকবালকে আধুনিক শিক্ষার গর্ভ থেকে উঠে আসা সবচেয়ে ভালো উদাহরণ এবং আধুনিক প্রাচ্যের সবচেয়ে পরিণত চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচনা করতেন। পশ্চিমা সভ্যতার দুর্বল ও গর্হিত দিকগুলির ওপর ইকবালের দূরদর্শী সমালোচনা আলি নদভিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। নদভির বিচারে, প্রাচ্যের জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিগত শতাব্দীতে এমন কেউ ছিল না যে পশ্চিমা সভ্যতা এবং এর ধ্যানধারণাকে এতটা গভীরতর দৃষ্টির সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সাহসের সাথে এর সমালোচনা হাজির করেছেন।[18]মুসলিমবিশ্বে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের সংঘাত, আবুল হাসান আলী নদভী, কাজী একরাম … Continue reading
এ প্রসঙ্গে আলি নদভির গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং খুতবায় সর্বত্র ইকবালের কবিতা এবং ইকবালের চিন্তার উল্লেখ ও উদ্ধৃতি পাওয়া যায়, যা ইকবালের চিন্তা ও বার্তার সাথে আলি নদভির চিন্তাগত সামঞ্জস্য ও ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ বহন করে। সফীর আখতার যেমন লেখেন, ‘আলি নদভি ইকবালের পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমালোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁর মতে, গত শতাব্দীতে আধুনিক শ্রেণীর মধ্যে তাঁর চেয়ে বড় ‘দিব্যব্যক্তিত্বের’ আবির্ভাব ঘটেনি, যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার দুর্বলতাগুলোকে এতটা সাহসের সঙ্গে উন্মোচিত করেছেন। ইকবাল নিজে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার উৎপাদন ছিলেন এবং বর্তমান যুগযন্ত্রণার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তাই নদভি বলেন, এই ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর সমালোচনা বাস্তবসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য।’[19]হায়াত ওয়া আফকার কে চান্দ্ পেহলু, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০।
আল্লামা ইকবালের মতো, আলী নদভিও পশ্চিমা ঝড়ের বিরুদ্ধে পর্বতসম দৃঢ়তায় অবিচল ছিলেন। আলী নদভি জানতেন, পাশ্চাত্য সভ্যতার অভিঘাত প্রাচ্যের চিন্তানৈতিক বুনিয়াদকে নড়বড়ে করে দেবে। ইকবালের মতো নদভিও পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন, পশ্চিমা সভ্যতার নির্বিচার অনুকরণ ইসলামি দেশগুলোর সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, তাদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পারা তো খামখেয়াল মাত্র। তাই তিনি পূর্ণ সচেতনতার সাথে পশ্চিমা সভ্যতা ও এর মানবতা-বিধ্বংসী চিন্তা-দর্শনের প্রতিরোধযুদ্ধে সতত নিয়োজিত থেকেছেন এবং মুসলিম দুনিয়া ও প্রাচ্য সভ্যতাকে এর প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করেছেন।
ইকবাল ব্যক্তিত্বের এরূপ ভক্ত-অনুরাগী হয়েও, ইকবাল চিন্তার আত্মোৎসাহী ভাষ্যকার এবং সর্বোচ্চ ধারক ও প্রচারক হয়েও, আলি নদভির কোথাও মধ্যপন্থা ও সংযমভাব হারায়নি। তিনি ইকবালকে একেবারে ত্রুটি-বিচ্যুতির অতীত কোনো পবিত্র সত্তা মনে করেন না। তাঁর প্রশংসা ও তাঁর কালামের প্রতি নির্ভরতার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনের সীমায়ও পৌঁছে যান না।
আলি নদভি বরং, যেমনটা তিনি লিখেন, ‘ইকবালকে আমি নিস্পাপ ও পবিত্র বলে মনে করি না, আর না আমি তাঁর প্রশংসাকীর্তনে প্রান্তিকতার পর্যায়ে চলে যাই—যা তাঁর কিছু ভক্তবৃন্দের অভ্যাস। আমার মতে, ইকবালের বয়ানে ইসলামি বিশ্বাস ও দর্শনের এমন কিছু ব্যাখ্যাও লক্ষ করা যায়, যার সাথে ঐকমত্য পোষণ করা মুশকিল। এমন অনেক ধারণা ও চিন্তাভাবনাও রয়েছে, যাকে আহলুস সুন্নাহর ইজমাঈ অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা কঠিন বলে মনে হয়। নদভি জানান, ‘ইসলামকে ইকবালের চেয়ে ভালো কেউ বুঝতেই পারেনি, এবং তিনি ছাড়া কেউ ইসলামের জ্ঞান-সত্যে পৌঁছাতে পারেননি—এ জাতীয় কথায় বিশ্বাসী আমি নই। আমি বরং আমার জীবনভর তাঁকে এভাবে দেখেছি যে, ইকবাল ছিলেন ইসলামের একনিষ্ঠ জ্ঞানার্থী এবং তিনি তাঁর প্রভাবশালী সমসাময়িকদের কাছ থেকে অব্যাহতভাবে উপকৃত হয়েছিলেন!’[20]নুকুশে ইকবাল, পৃ.২৯। তাঁর দুর্লভ ব্যক্তিত্বের মধ্যে কতিপয় এমন দুর্বল দিকও ছিল, তাঁর জ্ঞান, শিল্প এবং পয়গামের মহত্ত্বের সাথে যা যায় না।[21]তাঁর মাদরাসে প্রদত্ত বক্তব্যসমূহে এমন কতেক চিন্তা ও অভিভাষ্য লক্ষ্য করা … Continue reading এবং যা তিনি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাননি। তবে, আমি এই সত্যে বিশ্বাস করি, ইকবাল হচ্ছেন এমন কবি—যার যবান দিয়ে আল্লাহ এ কালের উপযোগী এমন কিছু প্রজ্ঞা ও সত্যকে ব্যক্ত করিয়েছেন, যা সমসাময়িক অন্য কোনো কবি ও চিন্তকের যবানে উঠে আসেনি।’[22]নুকুশে ইকবাল, পৃ. ৪০।
আলি নদভি বিশ্বাস করেন, মুহাম্মদি পয়গামের অবিনশ্বরত্ব, মুসলিম উম্মাহর স্থায়িত্ব ও তাঁর নেতৃত্বসুলভ ক্ষমতা, আধুনিক মতাদর্শ ও দর্শনের দারিদ্রতা ও অসারতার প্রতি তাঁর দৃঢ় আস্থা, আল্লামা ইকবালের চিন্তাধারায় স্পষ্টতা ও পরিপক্বতা এনে দিয়েছে এবং তাঁর আত্মসত্তার নির্মাণ করেছে। এই ক্ষেত্রে ইকবাল, বিশেষভাবে ধর্মীয় জ্ঞানের সেই সকল আলিমের চেয়ে এগিয়ে আছেন, যারা পাশ্চাত্য সভ্যতার বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন এবং যাদের মধ্যে এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আর ইতিহাস সম্পর্কেও গভীর বোঝাপড়া নেই।[23]প্রাগুক্ত।
কাজেই বলতে হয়, গভীর আগ্রহ ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এই মহান ব্যক্তিত্বের কাব্য-কালামকে আমরা উলামাদের বোঝার চেষ্টা করা স্বয়ং আমাদের জন্যই খুবই প্রয়োজনীয় এবং ভালো লক্ষণ; কারণ, ধর্ম ও জীবনের উপলব্ধি ও বোঝাপড়া বর্তমানে সেইভাবে এবং সেই প্রেক্ষিতে করা হয়, যা আমরা আল্লামা ইকবালের এখানে পাই।[24]প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | নুকূশে ইকবাল, আবুল হাসান আলি নদভি, ১৯৮৫, পৃ. ৩৩। |
|---|---|
| ↑2 | প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩। |
| ↑3, ↑5 | প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪। |
| ↑4 | প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪-৩৬। |
| ↑6 | প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭-৩৮। |
| ↑7, ↑14, ↑23 | প্রাগুক্ত। |
| ↑8 | আল মুসলিমুন, সংখ্যা, ৩, খণ্ড ৬, উদ্ধৃত : নুকূশে ইকবাল, প্রাগুক্ত, ৩৮-৩৯। |
| ↑9 | প্রাগুক্ত, ৩৯। |
| ↑10 | সিদকে জাদীদ, ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭০। |
| ↑11 | মাহনামা মাআরিফ, মার্চ, ১৯৭১। |
| ↑12 | নুকূশে ইকবাল পৃ. পৃ. ২৫-২৬। |
| ↑13 | শেরে ইকবাল কী হাকীকী কদর ও কীমত পর আলী নদভী কা নুকতায়ে নজর, দলিল ডট পি কে, ৯ নভেম্বর ২০১৬। |
| ↑15 | নুকূশে ইকবাল পৃ. ৬-৭। |
| ↑16 | প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫। |
| ↑17 | মাহনামা ফারান, করাচি, মে, ১৯৭১। |
| ↑18 | মুসলিমবিশ্বে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের সংঘাত, আবুল হাসান আলী নদভী, কাজী একরাম অনুদিত, পৃ. ৭৪। |
| ↑19 | হায়াত ওয়া আফকার কে চান্দ্ পেহলু, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০। |
| ↑20 | নুকুশে ইকবাল, পৃ.২৯। |
| ↑21 | তাঁর মাদরাসে প্রদত্ত বক্তব্যসমূহে এমন কতেক চিন্তা ও অভিভাষ্য লক্ষ্য করা যায়, যার যৌক্তিকতা প্রতিপাদন করা এবং আহলুস সুন্নাহর সর্ববাদী সিদ্ধান্তের সাথে যার সমন্বয় বিধান করা অত্যন্ত মুশকিল হয়ে পড়ে। এমনই উপলব্ধি ছিল উস্তাদ সাইয়েদ সোলাইমান নদভির। বক্তব্যগুলো পরে The Reconstruction Of Religious Thought In Islam নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। |
| ↑22 | নুকুশে ইকবাল, পৃ. ৪০। |
| ↑24 | প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪। |