কৃপণমার্কা বৃষ্টিবিকেলে তাহারা জানলো, শাহেরের প্রিয় পানিয় লাল ষাঁড়। আর শোমাইয়ার দেশি ব্যান্ডি। শোমাইয়া যখন ইহা বলতেছিলো, তখন তাহার চকচকে চোখ ছিলো ডোবা পুকুরটার দিকে। যেন পাঁড় মাতালের মতো পুকুরভর্তি সে ব্যান্ডি দেখতেছিলো। চকচকে লালমুখো শোমাইয়ার লিভার পচে গেছে, এমন কলহাস্যের ভেতরে অর্ণবের কাছে জানা গেলো, তার প্রিয় কড়া লিকারের দুধ চা।
হাসি উঠতে গিয়েও চাপা পড়লো। বাড়লো সামান্য বৃষ্টি। পুকুর থেকে ভেসে এলো সুপারসনিক বৃষ্টি পড়ার ঝপঝপ শব্দ। ছড়ানো ছিটানো মানুষ দিকবিদিক পালালো। অর্ণবরাও পালালো কাছের ছাউনির দিকে। একটি মেরামতহীন চায়ের দোকান তখন এলিট মেজাজে ভিজতে থাকলো। অর্ণব দেখলো, মানুষের সাথে দুইটা ছাপড়ি কুত্তাও এদিক ওদিক পালাতে চাইলো, কিন্তু এলিট ছাউনির নিচে ছাপড়িদের কোনো আশ্রয় মিললো না।
বৃষ্টি পড়তেছিলো আর কিছু পাখির কিচিরমিচির শোনা যাইতেছিলো। সেই কিচিরমিচির শুনতেছিলো শুধু অর্ণব। বাকিরা জেন্ডারবিহীন জোড়া খুঁজে হাস্যরসে মেতেছে। অর্ণব একা এবং তার দুইখানা কানে সে শুনতেছিলো ত্রিমুখী শব্দ, পাখির, বৃষ্টির, আর মানুষদের অহেতুক কলহাস্য। সে ধীরে খেয়াল করলো যে, মানুষের হাস্যরস অসহ্য লাগতে শুরু করছে। ছাউনি থেকে ছুটে বের হতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বৃষ্টি পড়তেছে লাগাতার। তখন অসহ্য লাগলো বৃষ্টিকেও। কিন্তু পাখির কিচিরমিচির কানে আরাম দিচ্ছিলো। দৃশ্যপটে তখন আনিকাকে দেখা গেলো দূরে, কুত্তাভেজা হয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে আসতেছে এলিট ছাউনির দিকেই। দৃশ্যটা অদ্ভুত লাগলো। আনিকার তো আজ ক্যাম্পাসেই আসার কথা না। অথচ বৃষ্টিতে ভিজে, কত কসরত করে সে আসতেছে।
ততক্ষণে আনিকা আসলো। একবার বন্ধুদের দিকে হাসি মেরে অর্ণবের হাতটা ধরে হ্যাচকা টান মারলো। আর অর্ণব কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলো সে বৃষ্টিতে ভিজতেছে। একটা হাত আছে আনিকার হাতে। কিছুক্ষণ পর অর্ণব লাল চোখে দাঁড়ালে আনিকা বললো, ‘ভিজে তো গেছিসই, রাগ করেই বা কী! আজকে ভিইজা দেখ আমার সাথে।’
এই বলে আনিকা চুপ গেলে তারা শুনশান ভেজা রাস্তায় হাঁটতে থাকলো ধীরে। তখন আর কোনো পাখির শব্দ শোনা যায় না। মানুষের অহেতুক হাস্যরসও ছুটে আসে না। সমস্ত রিকশাও চলে গেছে গ্যারেজ ও ছাউনিতে। রাস্তায় কোনো সতর্ক সংকেত ভেসে আসে না। অর্ণবের মনে হলো হঠাৎ, আনিকা তো একরকম মুক্তিই দিছে তারে। আরো দিচ্ছে দারুণ এক অভিজ্ঞতাও। এই অভিজ্ঞতার ভেতরে অজানা এক শিহরণ আছে। অর্ণব খেয়াল করে যে, মারদাঙ্গা স্বভাবের আনিকা আজ মারাত্মক চুপচাপ। পছন্দের পুরুষের হাত ধরে বৃষ্টিতে সে নীরবে ফিল নিতেছে। এই দেখে অর্ণব নিজেও কিছু কিছু ফিল নিতে চাইলো। কিঞ্চিৎ ঘেঁষে এলো আনিকার শরীরের দিকে। ভেজা শীতল দেহের ঠোকাঠুকিতেও কিঞ্চিৎ উষ্ণতা টের পেলো সেই বেলা।
ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যা দেখলো অর্ণব। সম্ভবত মেঘও করেছে। আনিকা তো চলে গেছে সেই বৈকালেই। ভেজা শীত লাগা কাঁপা শরীরে। রিকশায় তুলে দিয়ে অর্ণব তাকায়া ছিলো কতক্ষণ। এই প্রথম তার ভেতরে কিছু ফিল উঁকি-ঝুকি মারতে লাগছে। কিন্তু এসব কোনো ভালো কথা না। সে একটা চায়ের দোকান খুঁজতে খুঁজতে হাঁটতে থাকলো। বৃষ্টির আভাস পেয়েই কিনা অনেকে দোকানের ছাউনি গুটিয়ে চলে গেছে। ক্যাম্পাসের চা দোকানের মামাদের এই এক ব্যাপার। তারা দোকানদারী করে নবাবী স্টাইলে। ইচ্ছে হলে খোলে আর কাপে টুংটাং মিউজিক তোলে। এদিকে তার পেয়ে গেছে ধোঁয়া ওঠা চায়ের পিয়াস। দুপুরে বৃষ্টিতে ভিজে মাথাটা ঝিম মেরে আছে। ভয়ে আছে কখন সর্দি নেমে আসে। এই করে সে জামতলা চলে এলে শোমাইয়াকে দেখলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে। মুখের সামনে ভীষণ ব্যস্ত ফোন আঙুল দিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি করছে। অর্ণব শুধু সামান্য হাসিমুখে তাকালো। আর শোমাইয়া যেন গায়ের গন্ধেই টের পেয়ে ঝাঁপিয়ে এসে কোলাকুলি করলো। অর্ণব নিজেকে সামলে নিয়ে লাজুক মুখে বললো, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে।’ আর তাতে করে শোমাইয়া আরো মজা পেয়ে লাল অর্ণবের গাল টিপে দিয়ে বললো, ‘তা তোরা বৃষ্টিতে ভিজে কোথায় কী করলি? তুই শেষ পর্যন্ত গলে যাবি আমরা তো ভাবতেই পারি নাই।’ শুনে হাসতে হাসতে বললো অর্ণব, ‘ওসব আসলে কিছুই না। তখন তো আমাকে টেনে নিয়ে গেলো। হাঁটতে হাঁটতে একটু ভেজা হলো আরকি।’
শোমাইয়া হেঁয়ালি করে তাকায়া বললো, ‘একটু ভেজা হলো খালি, না? চিপাচাপা থেকে সব হিস্টিরি উদ্ধার করা হবে।’ অর্ণব আর শোমাইয়ার কপটচোখের দিকে তাকালো না। মাথা নিচু করে হাসলো। আর ভাবলো যে, আসলেই কিছু না! মনের ভেতরে কি সত্যিই কিঞ্চিৎ দোলা মেরে গেছে আজ? নাকি সে সামান্য সময়ের ভালো লাগা!
সান্ধ্য আড্ডার কালে তখন শায়েরও এলো। এসেই উৎসবের মতো শব্দ করলো অর্ণবকে দেখে। আর অর্ণব রোল অনুযায়ী আবারো হাসলো। এসবের ভেতরে গরম দুধ চা এলে আবারো বৃষ্টি নামলো। চা দোকানের ছাউনির দিকে তারা আবারো দৌড়ে গেলো। সেই দুপুরের মতো। আজকে কেমন যেন এলিট ছাউনির নিচে আটকে যাওয়ার দিন। কিন্তু সন্ধ্যায় পাখির কোনো ডাক শোনা গেলো না। ছাপরি কুত্তাগুলোও কোথাও নাই। অর্ণব ব্যস্ত ছাউনির নিচেও মনোযোগে চা খেতে থাকলো।
তাদের ব্যাপারটা সাধারণ টাইপ গোলমেলে। সেই প্রথম দেখায় আনিকা পছন্দ করে ফেলে অর্ণবকে। স্বভাবের দিক থেকে আনিকা খেপাটে, দুঃসাহসী। অনেক বাঘা টাইপ পোলাপাইনও এড়ায়া চলে তারে। কিন্তু কী আশ্চর্য যে, সে প্রেমে পড়লো সবচেয়ে গোবেচারা ছেলেটির। যাকে দেখলে গড়পড়তা সব মেয়েদের কোলাকুলি করতে ইচ্ছে করে। এবং করেও তা–ই। তেমন মুহূর্তে অর্ণব লাল মুখে দাঁড়ায়া থাকে শুধু। সুতরাং আনিকার ব্যাপারটা জটিল বা সহজ মনস্তাত্ত্বিক কোনো ব্যাপার হবে হয়তো। প্রথমে তাদের সার্কেল ব্যাপারটায় মজা পেলেও এখন সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু বিপত্তি এক জায়গায় আছে বটে। যতই গোবেচারা হোক না কেন অর্ণব মোটেও পাত্তা দেয় না আনিকারে। আড্ডা চলে বেশ, যেহেতু একই সার্কেলে তারা ওঠাবসা করে। কিন্তু ওইটুকুই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একটা জায়গায় আনিকার ক্ষেপাটে স্বভাব মিউমিউ করে। এখন পর্যন্ত জোরাজুরির কোনো নজির সে খাঁড়া করে নাই। সম্ভবত এই প্রথম, অর্ণবরে হাত ধরে টেনে বৃষ্টিতে নামাইছে। এখানেই ইতিহাসের কোনো বাঁকবদল আছে কিনা দেখা যেতে পারে।
বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের তাপমাত্রা বাড়লো রাতে। অর্ণব ভয়েই পথ্য গিলে ফেললো ঘুমানোর আগে। জ্বরটর যাতে ভেঙেচুরে না নেমে আসে। কিন্তু রাতে শোয়ার পরে ঘুমের চেয়ে বেশি ঝেঁপে এলো ঘোর। এই ঘোরের কোনো কূলকিনারা মেলে না। সে দেখে পাহাড় তুলার মতো ফুরফুরা হয়ে উড়িতেছে। কিছু কিছু খণ্ড নেমে আসতেছে তার দিকেও। সেসব খণ্ড সে বুকে জড়ায়া নিয়ে শীতল ফিল খুঁজতে থাকলো। কিন্তু চারিদিকে অদৃশ্য উত্তাপ। সে আরো দেখলো, অগাধ ধুলো-হাওয়া ভেসে আসতেছে। সমস্তই যেন তার চোখে এসে পড়লো। সে চোখ চেপে ধরতেই দৃষ্টি যেন আরো প্রখর হলো। সেই মেয়েটারে সে দেখে যার সাথে কদিন আগে চোখে চোখে আলাপ হয়েছিলো। সেই প্রথম প্রেমের অঠুনকো একটা আভাস সে পেয়ে গেলো। অর্ণব বুঝতে পারলো যে, দিনে দিনে সেই মুখ লিকারের মতো কড়া ভার্সন নিয়ে হাজির হইতেছে। সেখানে আনিকারে খুব ম্লান দেখা গেলো। কিন্তু আনিকা আঠা ভার্সনের এক মেয়ে, তীব্র লেগে থাকা যার স্বভাব। এই জন্যই কিছুটা দ্বিধা হয় তার, সম্ভবত দ্বিধা হয় সেই মেয়েটারও। হয় কী!
এমন এক চিন্তাময় সকাল দৌড়ে পার হলে অর্ণব চোখ কচলে দিনের শুরু করলো। আজ থেকে আনিকারে তার একটু জোর দিয়ে অ্যাভোয়েড করা চাই। প্রয়োজন হলে বদলে ফেলা লাগবে সার্কেল। এই ভাবনা শেষ হতেই তার হালকা লাগলো। রাতের জ্বরটাও বিদায় নিয়েছে। ঝলমলে রোদের ভেতরে সে বের হলো।
আনিকা সেদিন ক্লাসের আগে কাটাকুটি চত্বরে বসলো। গতদিনের কথা তার মনে হলো। ভিজতে ভিজতে অর্ণব সম্ভবত তাকে ভালোভাবেই ফিল করেছে। সেই সূত্রে একটা ফন্দির কথা সে ভাবলো। অথবা আজকে একটা রফাদফা করা যায় কিনা সেটাও মাথায় আসলো। সেই কবে একটা ছেলেকে মন দিয়ে বসে আছে। আজও কোনো সাড়া মেলে নাই। এই রকম মৃত পিরিতি এখন পাথর কোলে করে বেড়ানোর মতো ভার লাগে। এদিকে অর্ণবকে পাঁচ সাতবার কল করার পর তাহা ধরলো বিরক্তি নিয়ে। আনিকা কিঞ্চিৎ হার্ট হয় তবু হাল ছাড়তে নারাজ। অন্তত কাটাকুটি চত্বরে আসতে রাজি হয়েছে বলে সে আয়েশ করে বসে একটা চায়ের অর্ডার করলো। তারপর চায়ে চুমুক দিতে দিতে সেইসব দিনের কথাও মনে পড়লো। কিঞ্চিৎ ভালো লাগার পর যেদিন ফাইনালি ভালো লাগলো, সেদিন সে শেয়ার করেছিলো শোমাইয়ার সাথে। শোমাইয়া অবাক হয় নাই। তবু জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘কী ভালো লাগলো ওর ভেতর?’ আনিকা একটু কপট চোখে কয়, ‘ভালো তো দেখেই লাগছে, বাকিটা আরো কিছু বিষয়। এই যেমন পছন্দ করি কারণ ওকে আমি কখনো বাজে জিনিশ খেতে দেখি না। ও সুষম খাবার খায় এবং সুষম হাগে। ও কয়েকদিন বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর আমি ঢুকে বেশ আরামদায়ক একটা গন্ধ পেয়েছি। সে অদ্ভুত ফিলিংস ছিলো।’ এসব শুনে শোমাইয়া হাসতে হাসতে চোখ-মুখ লাল করে ফেলেছিলো। আর বলেছিলো, ‘ও বোধ হয় রোজ ভাতের সাথে আতর মেখে খায়।’
অর্ণব যখন আসলো তখন আনিকার চায়ের পেয়ালা খালি। আনিকা হাসলো আর অর্ণবের মুখটা কঠিন দেখালো। আনিকা ভাবলো যে, আজকের দিনটা খারাপের আভাস দিতেছে। তবু বললো, ‘চল আজকে আমরা ক্লাস মিস দিই। আজ আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরির একটা প্ল্যান আছে।’ এই বলে সে অর্ণবের হাতের উপর হাতটা রাখলো। আর অর্ণব ঝটকা মেরে হাতটা টেনে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘এসব ঢং কোত্থেকে আসে?’
অর্ণব চলে গেলো হনহন করে। আর আনিকা আকাশ থেকে পড়ার মতো শক্ড। অর্ণবের এমন মুখ অন্তত কখনো সে দেখে নাই। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহ্য মানুষটির মুখোমুখি হয়েছিলো অর্ণব। এই প্রথম অর্ণবের ব্যাপারে আনিকা কেঁদে ফেললো। কেউ যাতে বুঝতে না পারে এমন ঢঙে চোখ মুছে সে চত্বর ত্যাগ করলো। তার চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এলো।
কয়েকদিন আর ক্লাসে এলো না আনিকা। আর অর্ণব যেন স্বস্তি কিংবা অস্বস্তি কোনোটাই নির্ণয় করতে পারলো না। সেই মেয়েটাও দিনে দিনে রহস্য জমাইতেছে। রাত ভোর হয় কিংবা ভোর নতুন একটা দিন ও রাতের ইশারা নিয়ে আসে। চোয়ালজোড়া শক্ত হতে হতে পাথরের মতো হয়ে গেলে আনিকা একদিন অর্ণবের সামনে এসে দাঁড়ালো। অর্ণব হতভম্ব হতে হতে একটু হেসেও ফেললো। কিন্তু আনিকা হাসলো না। সে বললো, ‘একদিন তুই বাথরুম থেকে বের হওয়ার পরেই আমি ঢুকলাম। বিশ্রী গন্ধ পাইলাম। আমার বমি পেয়ে গেলো। আমার মনে হইলো, এটা কি তোর পেচ্ছাবের গন্ধ? না পটির? শেষে মনে হইলো, এটা তোর মনপচা গন্ধ। যেমন পেচ্ছাব শরীরের ভেতরে থাকে, পটিও তাই, মনটাও তো তাই, ভেতরেই থাকে। দেহের ভেতরে লুকানো জিনিশ কি বেশি গন্ধ উৎপাদন করে?’
এমন এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে হনহন করে হেঁটে গেলো আনিকা। আর অর্ণব দুপুরের ছায়ারোদে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে খুন হতে থাকলো।
হা হা হা। হাসলাম অনেক। এন্ডিংটা যে এমন হবে স্বপ্নেও ভাবি নাই।
কেমন যেন লাগল। অশ্লীল না তবু শব্দচয়ন কেমন অশালীন ঠেকল।😑