রেডিকেল অস্তিত্ব

সালমান সাদিক

দিনের পর দিন আমি ঘুম থেকে জাগি এবং ঘুমিয়ে পড়ি। আমার দিনের শুরু হয় ঘুম থেকে জাগার মধ্য দিয়ে। আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি। আমি সবসময় ভোরবেলা ঘুম থেকে জাগতে চাই। কিন্তু আমার ঘুম ভাঙে সকাল সাতটায়। আমি তখন তাড়াহুড়ো করে দাঁত মাজি, নাস্তা করি। আমি প্রতিদিনই ছোটখাটো কিছু ব্যায়াম দিয়ে দিন শুরু করতে চাই। কিন্তু কোনোদিনই আমি ব্যায়াম করার সময় পাই না। আমি সবসময় চাইছি আমার পেশিগুলো থাকবে শক্ত মজবুত। কোনোরকম থলথলে মাংস বা ভুড়ি আমি চাইনি। কিন্তু দিনদিন আমার শরীরের পেশিগুলো মাংসের দলা হয়ে হাড্ডির সাথে কোনোরকম নিজেদের আটকে রাখছে। আমি এটা একদমই মেনে নিতে পারি না।

আমি সকালে কাজে বের হই। যাওয়ার পথে আমি এক ঘণ্টার মতো হাঁটি। কখনো দৌড়াই। ফলে সারাদেহে আমার পায়ের পেশিগুলোই বেশি মজবুত। আমি চাইছিলাম প্রতিদিন কয়েক কিলো দৌড়াতে। কিন্তু আমি দম ধরে রাখতে পারি না। পাঁচ মিনিট দৌড়ালেই আমি হাপিয়ে যাই। পায়ের পেশিতে খিচ ধরে আসে। আমার মনে হয় আমার শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি নেই। আমার মনে শক্তি নেই বলেও মনে হয়েছে কখনো কখনো। আমি নিজেকে সবকিছুর উপরে ভাবতে চাইছি। আমি চাইছি আমি যেভাবে হাঁটি, যেভাবে মাড়িয়ে যাই মাটি আর পিচঢালা পথ, যেভাবে ক্ষয় করি জুতার ছোল ঠিক সেভাবেই আমি চেয়েছি জীবনের সব গুরুত্ব সব চাওয়া-পাওয়া আবেগ-অনুভূতি মাড়িয়ে যেতে। আমার আবেগ-অনুভূতি একদমই ফালতু মনে হয়েছে। আমি দেখেছি এইসব ফালতু জিনিস বোঝার মতো আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিয়ে চলেছে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আমি কেন হাঁটি বা হুদাই না হেঁটে রিক্সা বা বাসে যাওয়া আসা করি না কেন তখন আমি বলব এমনিই হাঁটি, ভাল্লাগে তাই হাঁটি। কিন্তু এটা আসলে সঠিক উত্তর না। আসল উত্তরটা হলো, আমি সবকিছু মাড়িয়ে পিষ্ট করতে চাই, নিজেরে একদম শেষ পর্যন্ত ক্ষয় করে মরে যেতে চাই।

মরে যাওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো আফসোস নেই। আমি মরে যেতে ভয় পাই না। এরপর কী পরিণাম আমার জন্য অপেক্ষা করছে আমি সেটা দেখতে চাই। আমি কীভাবে বা কোথায় জন্ম নিতে চাই বা মরে যাওয়ার ব্যাপারটাকে আমার কেমন লাগে; এমন প্রশ্ন নিয়ে আমি ভেবে দেখেছি। জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি নির্দিষ্ট কোনোকিছুই ভেবে বের করতে পারিনি। হয়ত আমি ভয়ানক মজবুত একটা কিছু হতে চাইছি। কিন্তু ঠিক কেন এমনটা চাইছি তা ভেবে উঠতে পারিনি! এর পিছনে বড় ব্যাপার হিসেবে কাজ করেছে জীবন আমার কাছে কীভাবে ধরা দেয় আর মরণরে আমি কীভাবে দেখি। আমি আগেই বলেছি জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গই আমার কাছে খুব ফালতু মনে হয়। শিল্প সাহিত্য মিউজিক আর্ট এইসব ব্যাপার নিয়ে আমি ভেবে দেখেছি। আর এসবকিছুর একবারে গভীরে আমি কিছুই পাইনি। মানে এইসব জিনিস এই জীবনের ফালতু হওয়াটাকেই আমার সামনে আরো বেশি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেছে। এই জন্য কি শিল্প সাহিত্য কোনো কাজে এসেছে? না, শিল্প সাহিত্য মূলগতভাবেই একদম অর্থহীন বেকার জিনিস। শিল্প সাহিত্যে সব ওই অনুভূতি, জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়েই আলাপ করা হয়। আর পুরা জীবনটাতে জন্তু-জানোয়ার আর মানুষের মধ্যে আমি কোনো ফারাক দেখতে পাই না। 

আমি শক্তপোক্ত হওয়া আর মৃত্যু বিষয়ক তুমুল আলাপের সুযোগ পাই একদিন শনির আখড়ায় বরিশালের দাড়িওয়ালা হুজুরের চায়ের দোকানে একটা ছোটখাটো মেয়ের সাথে। অন্যান্য আর সকল মেয়ের মতোই তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো ময়লা থেকে প্লাস্টিকের বোতল আর পলিথিন সংগ্রহ করার সময়। সে ছিলো আমার চেয়ে বড় কিন্তু আকারে একদম ছোট্ট। তার পাজরের হাড় কোমরের সাথে গিয়ে মিশেছে যেন তার পাজর আর কোমরের মাঝে আর এতটুকু ফাঁক নেই। আর তার মূত্রথলি ছিলো অত্যধিক ক্ষুদ্র। যার কারণে আমরা কয়েকবার বিপাকে পড়ি। উন্মুক্ত প্রস্রাবখানা না থাকায় বা বড় মূত্রথলিওয়ালা মানুষের জন্য থাকা সুযোগ সুবিধাগুলো না থাকায় আমরা অনেক ঘুরেছি শুধুমাত্র তার মূত্র বিসর্জনের একটা জায়গা খুঁজে পেতে। 

মৃত্যু বিষয়ক আলাপের আগে সে আমাকে কিছু সংগীতের পাঠ দেয়। আমি সেগুলা শুনি। তার কণ্ঠ চিকন সরু চিনচিন, আওয়াজ ভালোই লাগে। কিন্তু একটা বিষয় হলো, গানগুলার কোনো অর্থ আমার মনে ধরছিলো না। সবকিছু আপনার মনে করার উপর। যেমন ধরুন রবিন্দ্রনাথ গান লিখলো, আপনিও গানের অনুভূতি নিয়ে শুনলেন বা গাইলেন আর তার প্রতিটা শব্দ মিলিয়ে অর্থপূর্ণ বাক্যও হলো। হৃদয় শান্ত হলো। পুরো ব্যাপারটাই ঘটল এই জন্য যে, রবিন্দ্রনাথ গান লিখলে সেটা চোখ বুজে নাহয় হাত নাড়িয়ে এদিক-ওদিক হেলে গাইতে হবে আর মনেরে বুঝ দিতে হবে এটা ভালো, খুবই প্রশান্তি দিচ্ছে। আসলে এসবকিছুই না। এগুলা শব্দ-বাক্য একটা বকোয়াজ গায়েবি উদ্বৃতি, কোনো বাস্তবতা নাই, মনের ভিতর আলোড়ন তুলে নারীকণ্ঠের চিকন আওয়াজ আপনার মনরে সুখী করে। আর সেজন্যই সে যখন গাইছিলো আমি তখন বিড়ি ফুঁকছিলাম আর পুদিনা পাতা, চাল ভাজা, কালিজিরা, লেবুর খোসা ও কোয়াযুক্ত অদ্ভূত স্বাদের চায়ে কতটুক চিনি আছে আর এটা কতটুক স্বাদের হয়েছে সেটাই ভাবছিলাম। আর আমার হুট করে মনে হলো, পুদিনা পাতার স্বাদ আর মিন্ট চকলেটের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নাই! 

সে তখন গুনগুনাচ্ছিলো আর তার গানের মাঝেই আমি তারে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা পুদিনা পাতার স্বাদটা খেয়াল করছো একদম মিন্টের মত লাগে।

সে বলল, পুদিনা পাতাই মিন্ট। তুমি জানো না!

আমি বললাম, অদ্ভূত! পুদিনা পাতা মিন্ট হলে এলাচি না লবঙ্গ ওটা কী! 

সে বলল, পুদিনা পাতাই মিন্ট। 

আমি তার কথা মেনে নেই। কারণ সে জ্ঞানীগুণীদের মজলিশে সময় দেয় এবং বিপ্লব বিষয়ে কিছু ধ্যান-ধারণা লালন করে। আমার কাছে পুরোটাই বকোয়াজ। মানে সিস্টেম চেঞ্জ করা, পুঁজিবাদ ধ্বংস করা, পুঁজিবাদ ও কম্যুনিজমরে তুলনা দেওয়া বা বর্তমান কম্যুনিজম বনাম পুরান কম্যুনিজমের মধ্যেকার পার্থক্য বিষয় আলোচনা বা এসব আইঘুই তর্ক-বিতর্ক আমাদের মতো মানুষের জীবনে কোনোরকম গুরুত্ব রাখে না। 

আমরা হলাম কিছু মানুষ, যারা বর্জ্য পরিষ্কার করি, রাস্তা পরিচ্ছন্ন করি যাতে পথচারী যেতে পারে আর গাড়িগুলা থেকে ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেটগুলা উড়তে না পারে। বা আমরা রাস্তা নির্মাণ করি, রডের আগায় মাথা রেখে মরে যাই, যাতে পিলারগুলা রক্ত গিলে মজবুত হয় বা দাগ থাকে মানুষের মনে ধ্বসে পড়া মস্ত বড় টুকরা একটা গল্প হয়ে সবার মনে ব্যথা বা আহ-উহ নামক অনুভূতিরে জাগ্রত রাখে আর যানজট কমে, মানুষ মাটির উপর দিয়ে যাবে আর নিচে রোদ পড়বে না, ধুলা জমবে, উপরেরটা পরিষ্কার রাখো নিচেরটা আর দরকার নাই, থাক কাদা; আমরা এভাবে উন্নতির জন্য কাজ করি চাই কম্যুনিজম হোক বা পুঁজিবাদ সবাই মুক্তভাবে আমাদেরকে চুদে চুদে এসব উন্নত সিঁড়ি ও সরণির জন্ম দেয়। তাই তার সঙ্গ আমরা অনুভব করি এবং মনে মনে বলি আমার মতো চোদনা একটা ছেলেমানুষের সাথে তোমার মতো ভার্সিটিপড়ুয়া এস্থেটিক রবীন্দ্র-আর্ট-বিপ্লব চোদানো নারীর সময় দেওয়ার মতো ভাগ্যবান আমি কি না বা আমার এই সময়টুকু কতটা গভীরভাবে অনুভব করা উচিত। 

এগুলি ছিলো বেশকিছুদিন আগের চিন্তা ভাবনা। সে আমাকে বোঝাচ্ছিলো কীভাবে রেডিকেল না হয়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। আমি তাকে যতই বোঝাই সে বোঝে না। আমি তাকে বলি, আরে ভাই অস্তিত্ব জিনিসটাই তো রেডিকেল। হঠাৎ করে তার সাথে এই আলাপগুলি বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিলো। আমি সেদিন বাসায় আমার অন্ধকার খুপরিতে বসে বসে কিছু হিসাব-নিকাশ করছি। এ সময়ে এই বাসাটা যে কানা গলিতে সেই গলির মাথায় মাইক দিয়ে ঘোষণা করছে এই জায়গাটি অমুক রিসোর্টের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। খুব শীঘ্রই এখানে কাজ শুরু হবে। সুতরাং গলির সকলে যেন গলিটি ত্যাগ করে।

ব্যাপারটা আমার জন্য বেশ বড় একটা আঘাত ছিলো। সেই যে কারাগার থেকে মুক্ত হলাম, সেই থেকে আমার একান্ত কিছু যদি থাকে তা এই বাসাটা। এখানে কেউ আমাকে বিরক্ত করে না, আমিও কাউকে নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমি আমার প্রাত্যহিক রুটিনে এই ঘর থেকে বের হই, কাজে যাই, কাজ সেরে আবার বাসায় ফিরে আসি। এই বাসায় থেকেই আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি সমস্ত অর্থহীনতার মাঝে। ব্যাপারটা আমার জন্য এমন ছিলো যে, আমি যেদিক আগাই সেদিকটাই আমার যুক্তি তর্কের বিচারে দুর্বল আর ঠুনকো মনে হতে থাকে। কখনো প্রতিক্রিয়াহীন হতে চেয়েছি, কিন্তু দিনশেষে আমি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গেছি। আমি বিচার করতে চাইনি, কিন্তু দেখা গেছে আমি কাউকে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। ব্যাপারটা এমন, যে আমি যেদিক গেছি সেদিকটাই একটি অতল গহ্বরে ধ্বসে পড়ে হারিয়ে গেছে। তাই আমি যথা সম্ভব এই ঘরের অন্ধকারেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। যেমন ডক্টর স্ট্রেঞ্জ একটা ক্রিস্টাল বলের ভিতর সারাজীবন থাকতে চেয়েছে।

কিন্তু এই ঘোষণা আমার সেই সব স্মৃতি, আমার শান্তি; সবকিছু নষ্ট করে দিলো। গলিতে যে শান্তিপূর্ণ আবহ ছিলো, যে কারণেই মূলত এই গলিতে আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন চিন্তা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছি; সেই ছোট্ট গলিটাই এখন কোলাহল, হৈ হট্টোগলে ভরে গেছে। সর্বপ্রথম যে ব্যাপারটা ঘটলো, গলির মাথায় যে বড় দুটা গাছ আছে একদিন কিছু লেবার শ্রেণির লোক এসে সেই গাছগুলি কেটে ফেলল। এই গাছগুলি কাটা নিয়েই গলিতে কেওয়াজের শুরু। এটা নিয়ে গলির ময়-মুরুব্বিদের সাথে লেবারদের ছোটখাটো গণ্ডগোল বাধে। এর কারণ এই গাছগুলি দুপুরের দিকের রোদটাকে গলিতে আসতে দিত না। যার ফলে মুরুব্বিরা খুব আরামে এই সময়ে একটা ঘুম দিতে পারত। এছাড়াও গাছ দুটি থাকার কারণে গলিতে একটা শীতল ভাব সব সময় বিরাজমান ছিলো। এদের ভিতর একটি ছিলো মেহগনি গাছ। এই গাছের ফল নিয়ে বাচ্চারা খেলতো। এজন্য এই গাছটি ছিলো এলাকার বাচ্চাদের প্রিয় গাছ, এবং তারা এই গাছের নিচেই নানাবিধ খেলায় মেতে থাকতো। অপর গাছটি ছিলো একটি প্রকাণ্ড গাছ, এই গাছ সম্পর্কে আমার জানা নাই। এই গাছে লাল গুটি ফল হত।

যতই কেওয়াজ আর কাউতালি হোক না কেন গাছ দুটা শেষ পর্যন্ত কেটেই ফেলল তারা। মুরুব্বিরা যখন সেখানে গেল এবং এই লেবারগুলির সাথে চিল্লাচিল্লি শুরু করল তখন লেবারদের নেতা যে লোকটি সে কাকে যেন ফোন দিল আর অল্পক্ষণ পরেই একটা গ্রুপ এসে মুরুব্বিগুলিকে রীতিমতো দৌড়ানি দিয়ে গলির ভিতর ঢুকিয়ে ‍দিল। এরপর আমি যা শুনছি তা হলো, মোটা গাছের গুড়িতে বিদ্যুতিক করাতের একঘেয়ে ক্যারক্যার শব্দ। গাছগুলি যখন শিকড় থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ল ধরনী কেপে উঠল আর ততক্ষণে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ফলে আমি গাছগুলো কাটার কারণে আমার কী সমস্যা হয়েছে তা বুঝতে পারলাম ন। 

পরেরদিন সকালে উঠে যখন দেখলাম গলিটা কেমন উলঙ্গ তখন বুঝলাম কিছু একটা নাই। তারপর আরো বেলা হলো, সূর্যও হেলে পড়লো আর আমি কাজ থেকে ফিরে যখন আমার কামরাটায় আসলাম তখন আসল খেলাটা ধরতে পারলাম। পুরা ঘর তীব্র গরম, মনে হচ্ছে ঘরের সবকিছু আগুনে ভেজে মচমচে চিপস বানিয়ে রাখা হয়েছে। বুঝতে পারলাম আমার এই জীবনে গাছ দুটির কী অবদান রয়েছে। আমি এই বিষয়টাও খেয়াল করেছি, এই গাছগুলি কাটার পর গলির অধিবাসী সকলেই চুপসে গেছে, সকলেই মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি যেদিন তারা এখানে ঘোষণা দিতে আসলো সেদিন বুড়োরা হেসেছে। আর আজ তাদের মুখের দিকে তাকালে দেখা যায় আসলে তাদের কতটা বয়স হয়েছে। কারো কারো চামড়া চোয়ালের হাড় থেকে ছাড়িয়ে ঝুলে পড়েছে। 

পুরা এলাকায় একটা থমথমে ভাব কাজ করছে। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখানে কেউ বাবা হয়েছে, বউ হয়েছে, নাতি-নাতনি পেয়েছে আবার মারাও গেছে। কিছু কিছু ফ্যামিলি এমন যে এদের জন্য এখানকার ইটগুলি, ধুলিগুলি, বিলাই এবং কুত্তাগুলি এতটাই স্পর্শকাতর আবেগের জায়গা তৈরি করেছে যে, এগুলি হারাতে হবে ভেবে তাদের হৃদয় কম্পমান, প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাদের চেহারাগুলিতে যে বিপন্ন রেখাগুলি দেখা দিচ্ছে সেগুলি যেন প্রকারান্তরে রোজ হাশরে মানুষের পেরেশানিরই একটি নমুনা–চিত্র।

আমার ব্যাপারে যদি জানতে চান তাহলে বলব, আমার কিছু বলার নাই। এগুলি কোনো কিছুই আমাকে প্রভাবিত করে না। আমি প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে চেয়েছি সব পরিস্থিতিতে। আমার বন্দি জীবন শেষ হওয়ার পর থেকে আমি কিছু ব্যাপার দেখেছি এবং একটি ছোট্ট জানালা দিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা অর্জন করেছি। সেজন্য আমার কাছে এগুলি আসলে কিছুই না। আমি বিভিন্ন সময়ে দেখেছি মানুষই মানুষকে গরু–ছাগল–গাধার অধম জ্ঞান করছে, তাদের প্রতি এমনই আচরণ করছে ক্ষমতাবানরা, যেন তারা এগুলি প্রাণীরও অধম। আমি নিজেও ওরকম অনুভূতি নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। ফলে আমার ভিতর মানবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রবণতা প্রবল হয়েছে। আমি সময়ে সময়ে অস্বীকার করি যে, আমি এই সমাজ বা রাষ্ট্রে বিলং করি। তবে এটা ঠিক যে আমার শান্তি নষ্ট হওয়ায় আমি কিঞ্চিত বিরক্ত হয়েছি। আমি ভেবেছি প্লাস্টিকের গুদামে এক কোণে আমি নিজের জন্য জায়গা করে নেব, যদি একান্তই এই ডেরাটা ছেড়ে দিতে হয়। তবে আমি শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা দেখব নিয়ত করেছি।

গাছ কাটাটা ছিলো প্রথম পদক্ষেপ। কতৃপক্ষ এবার দ্বিতীয় পদক্ষেপে যায়। এটা একটা মানসিক নির্যাতন হিসেবে দেখছি আমি। তারা এবার কিছু ভয়াল দর্শন লোককে পাঠায়। এরা হঠাৎ হঠাৎ এলাকায় আসে আর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঢুকে থ্রেট দিয়ে যায়। বাসা ছেড়ে না দিলে কী কী হতে পারে সেইসব বলে যায়। যারা গলির সাথে অত্যধিক সম্পর্ক আর আবেগ রাখে না বা নতুন দম্পত্তি বা ছোট বাচ্চাসহ যে কবুতরের জোড়ার মত ফ্যামিলি; তারা কেউ কেউ আস্তে আস্তে গলি থেকে নিজেদের আবাস গুটিয়ে নেয়। মোটামুটি গাছ কাটার এক মাসের মাথায় গলির বাসিন্দা অর্ধেকেরও নিচে নেমে যায়। একটা সময় রাতে কুকুরের ডাকটা যতটা আপন মনে হতো এখন আর তেমনটা লাগে না। মনে হয় অজানা কোনো হুমকি টুঁটি চেপে ধরেছে পুরা ধরার। 

এই সময়ে এসে আমি কিছু ভয়াবহ ব্যাপার লক্ষ্য করি। একদিন কাজ থেকে ফিরলাম রাত আটটা বাজে। গলিতে ঢুকে আজকে অত্যন্ত নিরব মনে হলো। কিছুটা যেতে আমার পায়ে কিছু ঠেকল। আমি নিচু হয়ে হাত দিয়ে অনুভব করি এটা আমাদের গলির কুত্তাদের লিডার কালা কুত্তাটার মরদেহ। ভাবি, কোনো কারণে হয়ত মরে গেছে।

পরেরদিন সকালে গলিতে দুই ভ্যান পুলিশ আসে। গলির মাতব্বর গোছের যে লোকটি, যার নাম আছমত, সে মারা গেছে। তার পরিবারের ভাষ্য, তাকে কেউ ফজরের ওয়াক্তে খুন করেছে। পুলিশ বলছে, তাহলে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য দিতে হবে। তারা রাজি হচ্ছে না, যার ফলে সেখানে একটা কেওয়াজ বেধে গেছে। আমি তখন কাজে যাচ্ছি বলে পুরা ব্যাপারটা দেখে যেতে পারিনি। 

রাতে যখন আমি ফিরছি তখন গলিতে ঢুকতেই বাধা পাই। গলির মুখে একদল লোক গাট্টি-বোচকা, আসবাবপত্র নিয়ে বলদের মত দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভিতরে যেতে চাইলে কিছু লোক বলে, ভিতরে আর কেউ যেতে পারবে না। আমি বললাম, আমি এখানে থাকি আর আমার সমস্ত জিনিসপত্র আমার ঘরে। তারা বলে যত যা–ই হোক না কেন আমি আর যেতে পারব না। তারা আমাদেরকে এটাই জানালো যে, এই গলিতে এমন কিছু সমস্যা হয়েছে, যার ফলে এটা বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারা পুরা জায়গাটা ডাইনামাইট দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।

এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া ছিলো অভূতপূর্ব। গলির সামনে সমস্ত লোকজন যেমন ভীতু হয়ে গেছিলো আর ঝিমিয়ে পড়ছিলো তাতে করে আমার মনে হয়েছিলো যে, এরা আর যা–ই হোক কোনোরূপ প্রতিবাদেরই ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু এই ঘোষণা তাদের ভিতর কী এমন চিন্তার উদ্রেক করলো যে, তারা ওই লোকগুলির ব্যারিকেডে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তুমুল মারামারি শুরু হল। একদিকে অস্তিত্বের জন্য লড়াই, অন্যদিকে শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতা প্রদর্শনীর লড়াই।

লড়াইটি এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছুলো, যে কোনো পক্ষই আর পেছানোর সুযোগ নাই। এই সময়ে দুই ভ্যান পুলিশ আসলো। জনগণকে ইচ্ছামতো পেটালো। মিডিয়া আসলো, সাংবাদিকেরা নিউজ করলো, সরকারি জমি দখল করে দীর্ঘদিন বসবাস, উচ্ছেদের নির্দেশে সরকারি সম্পদ ধ্বংস করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। এই রাতটা শেষ হবে কিছু লাশ সঙ্গে নিয়ে, যাদের রূহ ঘুমালে উড়ে যায় আবার ফিরে আসে ভোরে তাদের কারো কারো রূহ একেবারেই উড়ে যাবে, চাই সেটা প্রচণ্ড চাপে পিষ্ট হয়ে, চাই সেটা পুলিশের আঘাতে, চাই সেটা আরো ঠুনকো কোনো কারণে।

মজার বিষয়গুলি দেখলাম পরদিন ভোরে। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় বেশ আয়োজন করে সরকার বনাম দখলদার শিরোনামে খবরটা এমনই রসালো করে ছাপছে, যে দৈনিক এনকেলাবে বিকেল বেলায় এই সংবাদ পড়ে নিজের অজান্তে বলে উঠলাম ‘আরিশশালা!’ 

এই ঘটনাগুলি খুব দ্রুত সময়ের ভিতর ঘটছে মনে হলেও পুরা প্রক্রিয়াটা সারতে সময় লেগেছে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস। মজার বিষয় এই এলাকার কেউ কেউ সরকারি চাকরি করতো। এমনকি দুজন তো জানি পুলিশেরও ছিলো। আজব ব্যাপার বড় কোনো বিলাস প্রকল্পের জন্য সরকার এখানে থাকা কতগুলি মানুষের জীবন এলেমেলো করে দিলো। যাদের মধ্যে কেউ কেউ কি না সরকারের হয়েই কাজ করে বা ধরুন আমার কথাই, এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেতনের একটা অংশ দেওয়া লাগত সরকারকেই। ধরে নেওয়া যায় যে, আমার টাকাতেই আমাকে পুটকি মেরে দিলো সরকার। 

আমি এখন প্লাস্টিকের গুদামের আস্তানায় আছি। বেশ কিছুদিন বাদে দুটি সংবাদ আমি পাই। এই সংবাদ দুটি পুরা ঘটনার সাথে সরাসরি সংযোগ না রাখলেও কেন যেন মনে হয় এগুলি এই ঘটনারই অংশ। হতে পারে এটাই মেকানিজমের খেলা।

সংবাদ এক : ডাইনামাইট দিয়ে ষোলটি দালান ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। যদিও দালানগুলিতে থাকা কোনো পরিবার এই ঘটনায় মারা যায়নি। (কিন্তু আমার জানামতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কালা কুত্তাসহ অন্তত আঠারোটি রূহ দেহ ত্যাগ করেছে।)

সংবাদ দুই : সেই যে ক্ষুদ্রাকৃতির মেয়েটি, সে বিয়ে করেছে এক প্রকৌশলীকে। এটা জানতে পারি যখন এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে আসেন মহামান্য নগরপিতা। তার পাশে ছবিতে দেখা যায় প্রকল্পের প্রকৌশলী ও তার স্ত্রীকে। আমি ঠিকঠিক চিনতে পারি মেয়েটিকে।

বিজ্ঞাপন

guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
শেখ মুজাহিদ
শেখ মুজাহিদ
9 months ago

সালমান সাদিকের গল্প আলাদা করা যায়। এইটাও ব্যতিক্রম না। লাগে মর্ডান, লাগে ক্লাসিক।

মুহাম্মদ
মুহাম্মদ
9 months ago

হতাশ লেখক 😀

Sharif Hasanat
Sharif Hasanat
8 months ago

গল্পের শুরুতে এতো ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করছে, সামনে এগোতে কষ্ট হচ্ছিল। কিছুদূর যাবার পর থেকে ভালো লাগলো।