উম্মে কুলসুমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তিরিশ বছর আগে। বহু বছর নিঃসন্তান থাকার পর একদিন জানতে পারলাম, শহরের মধ্যভাগে একজন পুতঃপবিত্রা নারী থাকেন। যিনি মানুষকে সৎ কাজের উপদেশ দেন, এছাড়াও বহু রোগীকে আল্লার কালাম পড়ে তদবির করেন। তার উছিলায় বহু নারী ইতোমধ্যেই গর্ভ ধারণ করেছেন। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই পুতঃপবিত্রা সেই নারীকে খুঁজে বের করে ফেললাম। আমি ঠিক জানি না, উম্মে কুলসুম কতটা ধর্মপরায়ণা আর পবিত্র নারী। সকাল থেকে সন্ধ্যা, তার প্রতিটি কাজে প্রভুর নাম উপস্থিত থাকে। যখন সে ঘুমায়, তার ঠোঁটের দিকে তাকালে যে কারও মনে হতে পারে, মহিলা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে প্রভুর নাম জপ করছে। উম্মে কুলসুম হাফেজে কোরআন। মিহি, চিক্কন গলায় সুর তুলে যখন সে খোদার কিতাবের আয়াতগুলো পড়ে, মনে হয় সেই সুরের ঐকতানে বাতাস বেহুশ হয়ে যাবে। সে গুনগুন করে বাচ্চাদের ছবক দেয় আর বাচ্চারা পরম মমতা পেয়ে কোরআনের আয়াতগুলো একটানা তেলাওয়াত করতে থাকে। যেহেতু আমার কোনো সন্তানাদি ছিল না আর আমি ছিলাম নিভৃতচারী একজন মানুষ। আমার স্বামী আমাকে রেখে প্রতিদিন কাজে বেরিয়ে পড়ত আর আমি তখন পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তাম। আমার এমন কোনো প্রতিবেশীও ছিল না যার সঙ্গে মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বলে নিজেকে ভারমুক্ত করা যায়। এমন চরম সংকট আর নিরর্থক সময়ে উম্মে কুলসুমকে আমি বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলাম।
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রধান সড়কের পেট চিরে একটা সরু গলি চলে গেছে ভেতরের দিকে। গলিটার দুপাশে গাছপালার নিচে ছোট ছোট বাড়ি-ঘর। তিন চারটা বাড়ি পেরিয়ে পতিত এক সমতল ভূমির ওপর ঘাসের বিছানা। আরেকটু আগালেই পুরনো আমলের পানা পুকুর। সেই পুকুরের একপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা লম্বা ঘরটিতে মহিলা হাফেজি মাদ্রাসা। যেখানে উম্মে কুলসুম মোহতামিম হিসেবে মেয়ে বাচ্চাদের হেফজ পড়ায়। তার মুখমণ্ডল ফরসা, গোলাকার। আয়াত চোখ, ভ্রুযুগোল গাছের কচি পাতার মতো নরম আর বাঁকা। চুলগুলো এতটাই মিচমিচে আঁধার, মাথার দিকে তাকালে কারো চোখ এড়ানো সম্ভব নয়। ফজরের নামাজের পর খোদার এই স্বেচ্ছাসেবক কোরআন খুলে এক দেড় পাতা পড়ে নেয়। বাঁশির সুরের মত মোহনীয় তার কণ্ঠস্বর, আরবি উচ্চারণ আরবদের মতো সাবলীল। তার সাহচর্যে আর দোয়া ঝাড়ফুঁকে আমার পেটে সন্তানাদি হতেও পারে আমি সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করলাম। যেহেতু জায়গাটি নির্জন, আমার আর উম্মে কুলসুমের থাকার জায়গা কাঠের দোতলা মাছার ওপর। আমরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বহু ধরনের গল্প করি। এমনকি আমি এবং আমার স্বামীর একান্ত সময়ের কথাগুলো। আমি তার সব কথা অত্যন্ত মনযোগ সহকারে বাধ্য শ্রোতার মতো শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাই। আর প্রতি রাতেই উম্মে কুলসুমকে নিয়ে নানান ধরনের বাজে স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নগুলো যদি একত্র করা হয় তবে সেটার ভাবার্থ দাঁড়ায়—মোহতামিম আর পরহেজগার রমণীর আড়ালে উম্মে কুলসুম একজন অসত্য, মিথ্যেবাদী আর ব্যাভিচারিণী। তবে বাস্তবিক অর্থে আমি তার ভেতরে সেরকম কিছু দেখিনি।
প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে মহিলা হাফেজি মাদ্রাসায় পাড়া-মহল্লা থেমে বোরখাপরা কতগুলো মেয়েলোক আসে। তারা পবিত্র হয়ে স্রষ্টার উদ্দেশে ধ্যানমগ্ন হয়ে আসন করে বসে। মধ্যমণি হয়ে সেখানে ইসলামের মর্মবাণী নিয়ে আলোচনা করে উম্মে কুলসুম। যখন সে ইসলাম ধর্মের গৌরবোজ্জ্বল কাহিনিগুলো আবেগ মিশিয়ে বলা শুরু করে, আমার হৃদয়ের ভেতর কেমন যেন জল ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে দেখি, মধ্যবয়সি রমণীগুলোর গাল বেয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ছে। তারা ইহকালের অদৃশ্য পর্দা ভেদ করে অপার্থিব জগতে হারিয়ে যায়। আমি উম্মে কুলসুমের ইসলাম ধর্মের আধ্যাত্ম প্রেমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করলাম।
একদিন এলাকার একজন নারী মৃত্যুবরণ করায় তার লাশ কবরে রাখার প্রস্তুতির জন্য উম্মে কুলসুমের ডাক পড়ল। শহরের মাঝ বরাবর যে সড়কটা পশ্চিম থেকে পূবের দিকে চলে গেছে, সেখানকার অনেকের কাছেই উম্মে কুলসুম পরিচিত নাম। মুসলমান নারী মৃত্যুবরণ করলেই ডাক পড়ে তার। সে মৃত নারীকে পরিশুদ্ধভাবে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরাতে জানে। সেদিন যে লাশটি এসেছে, সেটি কবরের রাখার জন্য প্রস্তুত করার যাবতীয় কর্মকাণ্ড খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। যখন উম্মে কুলসুম মেয়েলোকটিকে গোসলের জন্য প্রস্তুত করে, সে কখনোই বিবস্ত্র মৃতের শরীরের দিকে নজর করে না। সামান্য দূরে থেকে দুহাত সমান তালে চালিয়ে তাহারাতের কাজগুলো সেরে নেয়। তারপর কুসুম গরম জলে বরইপাতাগুলো ভালো করে চুবিয়ে সেই জল দিয়ে মৃত নারীর পুরো শরীরে জল ঢালতে শুরু করে। যখন কাজটি সুসম্পন্ন হয়, উম্মে কুলসুম মৃতকে সুন্দর করে কাপড় পরায়। তারপর লাশের নাক ও কানের তুলাগুলো একবার পরখ করে মাথা ও পায়ের দিকের কাপড় দলা পাঁকিয়ে প্যাকেটের মতো করে মৃতের উদ্দেশে দোয়া পড়তে শুরু করে—মিনহা খালকনাকুম ও ফিহা নুইদিকুম ও মিনহা নুখরিজিকুম তারাতান উখরা।
অন্দরের মেয়েলোকগুলো উম্মে কুলসুমের কাজের প্রশংসা করে। মৃতের আত্মীয়রা মরহুমের নামে উম্মে কুলসুমকে কোরআন খতম দেয়ার অগ্রিম পারিশ্রমিক দিয়ে তার পবিত্র শ্রমের প্রতি সম্মান জানায়। এককথায় বলা যায়—শহরের এই প্রান্তে এমন নেককার মেয়েলোক আর দ্বিতীয়টি নেই। আমিও ধীরে ধীরে উম্মে কুলসুমের খোদার রেজামন্দি হাসিলের একাগ্র চেষ্টার ভক্ত হয়ে উঠি। প্রতি ওয়াক্ত নামাযে আমি তার সঙ্গী হই। যখন সে তেলাওয়াত করে, আমি একাগ্রচিত্তে মধুর বাণীর মতো হৃদয়াঙ্গম করি। তাকে অজুর জল তুলে দিয়ে, খাবার প্রস্তুত করে দিয়ে ভেতর থেকে তৃপ্ত হয়ে উঠি। উম্মে কুলসুম আমার কাছে হয়ে উঠল ইসলামের সেই মহিমান্বিত নারীর মত দ্বিতীয় রাবেয়া বসরী।
একদিন ভোরের দিকে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। পাশ ফিরে দেখি উম্মে কুলসুম আমার পাশে নেই। সে টিনের ট্রাংকের ভেতর হাত দিয়ে আলো জ্বালিয়ে কী যেন দেখছে। ফজরের আজানের পর সে হাতের জিনিসটা অত্যন্ত যত্ন সহকারে ট্রাংকের ভেতর রেখে দিয়ে অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। রাতের শেষপ্রান্তে তার মুখনিসৃত কোরআনের সুর শুনে আমার এতটাই মোহমুগ্ধ লাগে, ইচ্ছে করে সারজীবন এই পবিত্র রমনীর কাছে থেকে যাই।
আরেকদিন রাতে দ্বিতীয়বারের মতো উম্মে কুলসুমকে সেই ট্রাংকের কাছে দেখি। যক্ষ যেভাবে মাটির ভেতরে পুঁতে রাখা গুপ্তধন সতর্কতার সাথে পাহারা দেয়, উম্মে কুলসুম ঠিক সেভাবেই নিজের জিনিসটা আগলে রেখে সেটার দিকে ধ্যানমগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি প্রতিরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টির জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, কোন অমূল্য জিনিস ট্রাংকের ভেতর থেকে বের করে উম্মে কুলসুম ধ্যানমগ্ন হয়ে দেখতে শুরু করবে। কোনোদিন সেই সুযোগটা আমার জন্য সত্যিই চলে আসে আবার কোনোদিন বেহুশের মত এমনভাবে ঘুমিয়ে থাকি, আমার বহু প্রতিক্ষীত সময়টি পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়।
এভাবে কয়েক রাত তার লুকিয়ে কোনোকিছু দেখার অদ্ভুত ঘটনাটি আমার কাছে কৌতূহলের হয়ে ওঠে। চতুর্থবার যখন তাকে একই নিয়মে ট্রাংকের ভেতর কোনো গুপ্ত জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখি, আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিছানা থেকে উঠে যাই। পায়ের গোড়ালি উপরের দিকে তুলে উম্মে কুলসুমকে অনুসরণ করি। কী এমন গুপ্ত বিষয়, যা প্রতিরাতের শেষভাগে সে ধ্যানমগ্ন হয়ে দেখে! আমার কাছে যা কিছু অদৃশ্য আর কৌতূহলের আমি সেই রহস্যকে উদ্ধার করতে চাই। আমি চুপি চুপি উম্মে কুলসুমের পিঠের কাছে পেছন দিক থেকে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার ভেতরে এক অতৃপ্ত বাসনা। এমন একটা কিছু দেখার জন্য আমি ছটফট করতে থাকি, যা আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। আমি পিঠটা ধনুকের মত বাঁকা করে উম্মে কুলসুমের হাতের দিকে নজর দিই। তারপর যা দেখলাম, তা সত্যিই বিস্ময়কর। একজন পূণ্যবতী নারী খোদার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার আগে একবার করে কয়েকটা পুরনো আর জরাজীর্ণ ফটো দেখে নেয়। আমি ঠিক জানি না, ছবিগুলো সনাতন ধর্মের কোন দেবতার, তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এটা নিশ্চয়ই কোনো পরমেশ্বরের ফটো। উম্মে কুলসুম প্রতিদিন সেই ফটোর দিকে ধ্যানমগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি চুপ করে পেছন ফিরে চলে গেলাম। আমার শরীর থিরথির করে কাঁপতে থাকে। মুহূর্তেই আমার বিশ্বাসের কোথায় যেন এমনভাবে কেউ আঘাত করে বসল, আমি অনেকক্ষণ ধরে বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। উম্মে কুলসুমকে কোনোকিছু জিগ্যেস না করেই চুপ করে শুয়ে পড়লাম।
তিন চারদিন বিষণ্ন মৌনতায় দিনগুলো কেটে যেতে থাকে। যে মানুষটি একবার কথা বলতে শুরু করলে অনর্গল বলতে থাকে, সেই মানুষটি একেবারে চুপ হয়ে গেল। উম্মে কুলসুম এতটাই ভাবনায় ডুবে গেল, সে সময় করে খাওয়ার কথাও মনে করে না। বাচ্চাদের ছবক দিতে গিয়ে ভুলভাল উচ্চারণে কোরআন পড়তে থাকে। কয়েকদিনের ব্যবধানে তার চেহারায় এমন বিষণ্নতার ছাপ পড়ল, মনে হয় আমি যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো অঞ্চলের একজন রোগা মানুষকে দেখছি। একদিন উম্মে কুলসুমকে সাহস করে তার ট্রাংকের ভেতর কাঠের বাক্সের রহস্য জানতে চাইলাম। তখন উম্মে কুলসুম তার শৈশবের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলতে শুরু করল—
সংক্ষেপে বলতে গেলে ঘটনাটা এমন—যখন আমার বয়স তেরো, আমরা ভারতের বনগা স্টেশন থেকে সামান্য দূরের একটা নিভৃত গ্রামে বসবাস করতাম। সংসারে আমরা চারজন মানুষ, আমার বাবা অজয় পাল আর মা ইন্দুবালা। আমি কৃষ্ণারানি পাল আর আমার ছোট একটা ভাই ছিল ওকে আমি আদর করে দাদা বলে ডাকতাম। আমি আর আমার ভাই সবসময় একসঙ্গে থাকতাম। আমার ভাইকে আমি এতটাই ভালোবাসতাম ওকে কখনোই আমার চোখের আড়াল করতাম না। আমর মনে হতো, দাদাকে নিয়ে অনন্তকাল এভাবেই আমার কেটে যাবে। কখনও, কোনোদিন এই মধুর সময়গুলো ফুরিয়ে যেতে পারে না।
দেশ, সময় আর চলমান ঘটনা সম্পর্কে বোঝার মতো অতটা জ্ঞান ছিলনা আমার। শিশুমন যেভাবে স্বপ্ন দেখে আর খেলাধুলা করে সময়টা পার করে দেয়, সেভাবেই চলছিল আমাদের। আর আমাদের জানা ছিল না জাতি-ধর্ম আর হিন্দু-মুসলমানের ব্যবধান। আমরা মুসলমান ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে একই পাড়ায় হেসেখেলে বেড়াতাম। পুজোর সময় আমরা সবচেয়ে বেশি আনন্দ করতাম। প্রতিবেশীদের বাড়ি গিয়ে প্রসাদ খেতাম। মেলায় গিয়ে হরেক রকমের জিনিসপত্তর কিনতাম। তাছাড়া পুরুত মশায় মাইকে যখন গীতার পদগুলো পড়তে থাকত, আমি এককোণের কোনো খুঁটি ধরে বিস্ময় নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। শৈশবের সেই আনন্দের মতো সময় আর কখনও ফিরে আসবে না। আমাদের ধর্মের কোনো বেড়ি ছিল না বিধায় আমরা এতটাই স্বাধীন জীবন যাপন করতাম, কখনওই মনে হতো না কোনো একদিন এই সুখের সময়গুলো সুদূর অতীত হয়ে যাবে। একদিন হঠাৎ এই স্বাভাবিক পরিবেশটা পাল্টে গেলো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রাম্য হাটখোলা খুব একটা দূরে ছিল না। একদিন হঠাৎ বাজারের ধারে পুলের ওপর কতগুলো মানুষের উচ্চস্বরে গলার আওয়াজ শোনা যায়। কখনো বজ্রধ্বনির মত বাতাসে ভেসে আসে—আল্লাহু আকবর। শব্দটা যখন থেমে থেমে আসে মনে হয় মাটি বিদীর্ণ হয়ে বাড়ি-ঘর সব অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। স্লোগান দিতে দিতে আওয়াজটা যখন একেবারে নিকটে এসে নিঃশব্দ হয়ে যায়, তখন পুবের দিক থেকে আরেকটি আওয়াজ বাতাস ভারি করে তোলে। কতগুলো উচ্চকিত কণ্ঠ থেকে ভেসে আসে—বন্দে মাতেরম স্লোগান। আর অন্যদিক থেকে শত শত মানুষের পদধ্বনির তালে শুনতে পেলাম—জয় শ্রীরাম।
মুহূর্তেই গ্রামের ভেতর একটা হট্টগোল বেঁধে গেলো। হিন্দু-মুসলমানের ভেতর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেঁধে যায়। তখন আমি এতটাই ছোট ছিলাম আর আমার হৃদয় দারুণভাবে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। আমাদের পাশের বাড়ি তখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল আর লাশ পড়তে শুরু করল একটা একটা করে। সেটা সত্যিই অভাবনীয় ছিল, আমরা যে মুসলমান প্রতিবেশীদের বাড়ির উঠানে গিয়ে খেলা করতাম আর তারা ছিল আমাদের পরমাত্মীয়। সেইসব লোকেরা হঠাৎ করেই আমাদের শত্রু হয়ে গেলো। প্রতিটি ঘরের মেয়েলোকদের ওপর শুরু হল বর্ণনাতীত আচরণ। বাড়ির পুরুষদের হত্যা করা হলো, মেয়েদেরকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে সম্ভ্রম নষ্ট করা হলো। হিন্দুর ঘর পোড়াতে শুরু করল মুসলমান আর মুসলমানের ভিটা উচ্ছেদ করল হিন্দুরা। জাতিগত দাঙ্গা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে হতে একসময় দীর্ঘজীবী হলো। প্রতিদিন হিন্দু কিংবা মুসলমান পাড়ায় কেউ না কেউ খুন হতে থাকল। ধুম্রজালের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল চরম অস্থিরতা। আমরা নিজভূমেও অসহায় মানুষের মতো কোনঠাসা হয়ে পড়লাম।
একদিন রায়টের ছায়া এসে আমাদের বাড়িতেও পড়ল। দুপুরের দিকে কাঁথা বিছিয়ে মৃত মানুষের মতো ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ বাইরের দিকে কতগুলি মানুষের পায়ের শব্দ আর উচ্চকণ্ঠের ধ্বনিতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। যখন আমি জেগে উঠলাম, আমার চোখের সামনেই একদল মুসলমান আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে আমাদের ঘরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। একটা অস্ত্রধারী দল আমার বাবা অজয় পালকে টেনে হিঁচড়ে বাইরের দিকে নিয়ে গেল। আমার মা ছোট ভাইটিকে নিয়ে কখন চোখের আড়াল হলো, কিছুই টের পেলাম না। চারপাশ থেকে প্রতিবেশীর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার মতো আমার সময় ছিল না। নিজের জীবন বাঁচাতে আমি আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। আমার বাবা অজয় পালকে আমার চোখের সামনেই হত্যা করল ওরা। মুসলমানরা যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। অনেক্ষণ আড়াল থেকে না বেরিয়ে উঠানে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা বাবার নিথর দেহটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাত যখন আরেকটু গভীর হল, ভাগ্যগুনে বেঁচে যাওয়া তিনজন প্রতিবেশী এসে বাবার লাশের কাছে বসে কী যেন বলাবলি করতে লাগল। আমি আড়াল থেকে বের হয়ে পরিচিত মুখগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। রাতের শেষভাগেই আমাদের পুড়ে যাওয়া ঘরের কাছে বাবার দেহটি রেখে প্রতিবেশী সেই কাকুরা তাকে দাহ করার আয়োজন করল। বাবার দেহ পোড়ানোর দৃশ্যটা দেখতে পারবোনা আমি। সেজন্য ঘর থেকে বেরিয়ে সামান্য দূরে গিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। প্রতিবেশী লোকজন ধর্মীয় সংস্কার মেনে বাবার দেহভষ্ম একটি মাটির লোটার ভেতর ভরে আমার হাতে দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। তখন পূবের দিকে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
দিনের আলোতে মাকে বহু খোঁজাখুঁজি করলাম কিন্তু কোথাও তাকে পেলাম না। পুড়ে ছাই হওয়া বাড়িটা নিঃসঙ্গ মানুষের মত চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি একা কোথায় যাব ভেবে পেলাম না। তখন আমার হাতে মূল্যবান দুটি জিনিষ, একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স। যার ভেতর শ্রী কৃষ্ণের সুন্দর একটা ফটো। গোকুলের সেই শিশু প্রভূর মুখে আমি স্বর্গের হাসি দেখে হারিয়ে যেতাম। কৃষ্ণ ঠাকুরের ছবিটা আমার এতটাই প্রিয় ছিল, আমি ওটাকে চোট্ট একটা কাঠের বাক্সে ভরে নিজের আয়ত্তের ভেতরই রাখতাম। আমার মা বাবার যখন বিয়ে হয়, তখনকার সময়ে মধুর স্মৃতিবহ একটি ফটোও রেখেছিলাম সেই কাঠের বাক্সটার ভেতর। সারাদিন মাকে খুঁজে না পেয়ে বিকেলের দিকে মেসোদের বাড়িতে গেলাম। সেখানেও কাউকে না পেয়ে নানুর বাড়িতে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম তখন আমার সমস্ত শরীর হীম হয়ে গেলো। পুরো বাড়িটা শ্মশানভূমির মত নিস্পন্দ হয়ে আছে। কোথাও কারো সারাশব্দ নেই। আমি মাটির লোটা আর কাঠের বাক্সটা নিয়ে আবার নিজের বাড়ি ফিরলাম। পুরো গ্রাম তখন শ্মশানভূমি, কোথাও মানুষের টিকি পাত্তাও নেই। যে যেভাবে পেরেছে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে অজানা উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছে। আমি বাবার দেহভষ্ম আর প্রিয় কাঠের বাক্সটা নিয়ে নিজেদের ভিটায় তিন চারদিন অপেক্ষা করলাম। একদিন দুপুরে শুনলাম, শহর থেকে গ্রাম, দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। গত দু দিনে কয়েকশ মুসলমান খুন হয়েছে আর তারা পশ্চিমের সীমান্ত হয়ে পাকিস্থানের দিকে চলে যাচ্ছে। সেদিন বিকেলের দিকে দেখলাম, দূর-দূরান্ত থেকে পুরুষ-নারী আর শিশুদের দল পায়ে হেঁটে পূবের সীমান্তের দিকে এগিয়ে চলছে। আমিও কোনোকিছু না ভেবে বিলের ভেতর নেমে সেই দলটাকে অনুসরণ করে সীমান্তের কাছে চলে এলাম। কোনো বাঁধা ছাড়াই শত শত মুসলমান দলের সাথে যশোর অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়লাম।
সীমান্ত দিয়ে এপারে যখন ঢুকে পড়ি তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। আমার বোধশক্তি কোনো কাজ করছিল না। আমি একজন ডুবন্ত মানুষের মত নিজেকে অনুভব করলাম। পৃথিবীতে আমি কী করে টিকে আছি সেটাই আমার কাছে বিস্ময়। এপারের কোথায় গিয়ে আমার নিশ্চিন্ত ঠিকানা হতে পারে তা ভেবে পেলাম না। সেই যে বিভ্রম, তখনও আমি প্রিয় বস্তুর মত কাঠের বাক্সটা আর আমার বাবার দেহভষ্ম দুটোকেই আগলে রেখে বিভ্রান্তের মত পথ চলতেই থাকলাম। একটু পর চরাচরে নেমে আসে ধূ ধূ অন্ধকার। ধীরে ধীরে আমার সাথে চলার মানুষজন একেক রাস্তায় ভাগ হতে হতে পাতলা হয়ে যাচ্ছে। তখন আমি ভয়ে ভয়ে পথ চলছি, একটু পর একটা বাজারের সামনে এসে দাঁড়ালাম। অল্পকিছু লোকজন সেখানে বাজার সদাই করছে। দু’চারটা দোকান খোলা। একটা পরিত্যাক্ত দোকানের সামনে টুলের ওপর ধপাস করে বসে পড়লাম। হঠাৎ রাজ্যের ঘুম এসে আমার দুচোখ ভরে গেলো। আমি ময়লা, জরাজীর্ণ আর কুকুরের বিচরণস্থানে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরের দিকে উঠে দেখি, আমার বাক্সটা হাতে তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধা রমনী। মুখে ভাঁজপরা, মাথার কাপড়টা সামনের দিকে টেনে দেয়া বুড়িকে দেখে আমি নমস্কার জানালাম। বুড়ি তার ভ্রু ভঙ্গিমা কুঞ্চিত করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল আর বলল, কোনঠে যাবু বাছা?
আমি বুড়ির কাছে আমার সাথে ঘটে যাওয়া আদ্যপান্ত খুলে বললাম। সে কী যেন ভেবে তার পেছেন পেছন আমাকে যেতে বলল। আমি কাঠের বাক্স আর বাবার দেহভষ্ম নিয়ে বুড়ির সাথে চললাম। বুড়ি একটি দরিদ্র গ্রামের শেষপ্রান্তে দরিদ্র পরিবেশে বসবাস করত। গ্রামের কাচা রাস্তা ধরে দীর্ঘ পথ। পথের ধারে গবাদি পশুর বিষ্ঠা। বুড়ি গরুগুলো দেখিয়ে জানালো, এগুলি ফেলে হেঁদুরা ওপারে চলে গেছে। এখন মুসলমানরা এসবের পাহারাদার। বুড়ি ছিল নিঃসন্তান, স্বামীও মৃত্যুবরণ করেছে বহু বছর আগে তাছাড়া তার আয়োজন করা সংসারও ছিল না। সে ছোট্ট একটা কুড়ে ঘরে কোনো মতে দিনাতিপাত করত। আমি বুড়ির ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। যেহেতু বুড়ি ছিল মুসলমান আর তার ছিল খোদার প্রতি অঘাত বিশ্বাস। অন্য ধর্মের যে কোনো মানুষকে তার কাছে মনে হত কাফের। তবে আমাকে সে প্রথমদিকে সম্বোধন করত, নোমোর ছুরি বলে। তার ভাঁজপরা গালের হাসির সঙ্গে নোমো শব্দটা জড়িয়ে যেত তবে সেসবে আমি তেমনকিছু মনে করতাম না। যেহেতু আমি হিন্দুর মেয়ে, বুড়ি আমাকে পরিশুদ্ধ করে ঘরে তুলতে চায়। আর পরিশুদ্ধের জন্য সে আমাকে স্নান করানোর আয়োজন করল—সেটা ছিল সত্যিই অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর। প্রথমে মাটির কলসে ভরে নদী থেকে জোয়ারের জল এনে বুড়ি বাড়ির আঙিনার এক পাশে রেখে দেয়। তারপর আমাকে কাঠের পিঁড়িতে বসিয়ে আমার জামা কাপড় খুলে নেয়। তখন আমার চোখেমুখে লজ্জা থাকার কথা কিন্তু সেসবের কোনো বালাই ছিলনা। অথচ, তখন আমার যৌনাঙ্গের চারপাশে গোপন লোম গজাতে শুরু করেছে আর আমার স্তনের বোঁটাগুলো মাত্র গজিয়ে উঠেছে। আমি অনাবৃত হতে বাধা দিতেই বুড়ি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। একটা হ্যাচকা টান দিয়ে মুহূর্তেই আমাকে বিবস্ত্র করে ফেলল।
প্রথমে আমার মাথার ওপর এক থোক কচি আমপাতা রেখে বুড়ি কতক্ষণ বিড়বিড় করল। ব্লেড দিয়ে আমার মাথার চুলগুলো চেঁছে ফেলল এমনকি আমার বগলে তিন চারগাছি পশম। আমাকে লম্বা একটা কাঠের তক্তায় শুইয়ে দিয়ে সারা শরীরে মাটি মেখে আমার যৌনাঙ্গের পাপড়ির মত গজিয়ে ওঠা লোমগুলো ফেলে দেয়। গোসল সম্পন্ন হলে আমাকে সুন্দর করে জল মুছিয়ে সেলাইবিহীন মার্কিন কাপড় পরায়। সেটা সত্যিই এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা ছিল, আমি এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতি কখনো মোকাবেলা করিনি।
এভাবে স্নান করিয়ে আমি পরিশুদ্ধ হওয়ার পর বুড়ি আমাকে পাটি বিছিয়ে কেবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসায়। তারপর আমার ডান হাতটা তার বাম হাতের তালুর ওপর রেখে মুসলমান হওয়ার ছবক দিতে শুরু করে। বুড়ি জড়ানোকণ্ঠে বলে—লা এলাহা এল্লালাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আমি বুড়ির মুখের চলনভঙ্গির দিকে তাকিয়ে চাপাকণ্ঠে তার পঠিত পদ আওড়াতে থাকি। আমি ঠিক জানিনা, ধর্মচ্যুত হতে আমাকে আর কী কী বিষয় সইতে হবে! তবে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকি আর মনে মনে ঠাকুরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। কেননা, সেই মুহূর্তে আমার সাথে যা যা হচ্ছিল, আমি সেসবের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তবে বুড়ি ছিল ধর্মের ব্যাপারে অন্তপ্রাণ, সে মসজিদের এক মোয়াজ্জিন ডেকে আমাকে নবধর্মে দিক্ষিত করার বাকি কাজটুকু সেরে নিল। বুড়ি হাসত, পুরনো দিনের গল্প করত, অথচ সে ছিল একজন নির্দয় আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির নারী। আমি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য যতটা সম্ভব ধৈর্য ধারণ করে সামনের পথটুকু নিরবিচ্ছিন্ন করার জন্য চলতে লাগলাম। মোয়াজ্জিনের সুবাদে এলাকায় রাষ্ট্র হয়ে গেল—নোমোর ঘরের এক অভিশপ্ত বালিকা বুড়ির সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে।
চারদিক থেকে আমাদের ওপর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অভিসাপ নেমে এল। একদিন রাতে বুড়ির হাত ধরে সীমান্তের সেই গ্রাম ত্যাগ করে বহুদূরের পথে যাত্রা করলাম। সন্ধ্যার পর একটা দীর্ঘ সড়কের বামপাশ ধরে আমরা চলতে থাকলাম। পথেঘাটে খুব একটা মানুষজন দেখা যায় না। তারপর শূন্য পথ, বিল, বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে মস্ত এক জাঙ্গাল। পথের ধারে বাহারি ফুলের গাছ আর সেসবের কাছাকাছি হিন্দুদের বাড়ি। সম্ভবত সেইসব বাড়িঘর মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। পথের ধারে কয়েকটা কুকুর বসে বসে শলাপরামর্শ করছে। বোবাধন, না জানি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া প্রভূদের কথা স্মরণ করে ওরা পথের ধারে ধুকছে। ভোর হতে হতে স্টেশন।
একগলির এই পুরনো শহরটাতে যখন পৌঁছি তখন দিনের মধ্যভাগ পেরিয়ে গেছে। আকাশে দিরিম দিরিম মেঘের শব্দ। আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতেই ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, সেটা ছিল বুড়ির বাপের বাড়ি। আমি নতুন পরিবারে এসে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। বুড়ির ভাই বয়োঃজ্যেষ্ঠ আর তার ছেলেরা ধর্মীয় শিক্ষার আলেম। তারা বাবরি চুল রাখে, প্রত্যেকের আজানুলম্বিত দাড়ি। চাছা গোঁফ আর চোখের পাপড়িতে সুরমা মাখানো। বাড়ির চারদিকে কলার পাতা কেটে পর্দায় ঢেকে বাড়িটা আড়াল করেছে। অন্দরের মেয়েলোকগুলো কাঠির মত চিকন, তারা শরীর ঢেকে রাখে এমনকি প্রত্যেক কাজের শুরুতে খোদার নামে প্রশংসা করে নেয়। বাড়িটি পুরনো, খাওয়া দাওয়ার কমতি নেই। বাড়ির সামনে সরু খালের ধারে ব্যাপারিদের নৌকার সারি। পাশেই ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা। বুড়ি তার ভাই আর ভাইপোদের কী বলল জানিনা তবে পরদিন থেকে আমার জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হল। আমি নুরানি কায়দা বিভাগের ছাত্রী হয়ে গেলাম। কৃষ্ণারানী থেকে হয়ে গেলাম উম্মে কুলসুম।
প্রতি ভোররাতে এক পুরোদস্তুর হাফেজা মহিলার কাছে আমার ছবক শুরু হয়। ফজরের আজান পড়লে নামাযে দাঁড়িয়ে যাই। আমি প্রতি ওয়াক্তে কোরআনের একটি আয়াত পড়েই নামায শেষ করে ফেলি। কারণ, তখন সেটা ছাড়া অন্য কোনো ছুরা কালাম আমার জানা ছিলনা। যখন আমি হেফজ বিভাগের প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ করি, আমার প্রশংসায় মাদ্রাসার মহিলা মোহতামিমগুলো আহ্লাদে ফেটে পড়ে। তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই। তবে আমার বাবার দেহভষ্ম তখনো কোনো সদ্গতি করতে পারিনি। আমি যখন পনেরো পাড়া মুখস্ত করে ফেললাম, আমার ইয়াদ এতটাই স্বচ্ছ আর স্পষ্ট ছিল, মোহতামিমরা আমাকে নিয়ে গর্ব করে বলত, সুদূর থেকে আসা এক মেয়ে আমাদের তাজ্জব করে দিল। সেসব প্রশংসা আমাকে মোটেও আন্দোলিত করত না। আমি মনে মনে বাবার দেহভষ্ম সদ্গতি করার পরিকল্পনা করলাম। যেহেতু আমি ছিলাম অন্য দেশের, অন্য মানুষ। আমার পক্ষে দূরে কোথাও যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি মনে মনে পরিকল্পনা করি, যে করেই হোক, বাবার দেহভষ্মের একটা পরিপূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে।
একদিন সুবহে সাদেকের সময় মুহতামিম আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। আমি তাহারাতের কাজ সম্পন্ন করে তিলাওয়তে বসে পড়লাম। হঠাৎ আমার মনের ভেতর থেকে বারবার আমার বাবা অজয় পালের আত্মার ডাক শুনতে পেলাম। মনে হল, দেবলোক থেকে বাবার বিদেহি আত্মা আমার কাছে মুক্তি চাইছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই আমি মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে পড়লাম।
আমি স্রোতস্বনী খালের পাড় ধরে উজান অভিমুখে এগিয়ে চললাম। নদীপাড় থেকে বহু দূরে দূরে একেকটা বাড়ি-ঘর। আবহাওয়া অনুকূল না হওয়ার কারণে গোরুর পাল, রাখালের দল কিংবা মাঠে যাওয়া কোনো কৃষকেরও দেখা মিলল না। আমি মাটির লোটাটা কাপড়ের একটা পোটলার ভেতর ভরে নিলাম। যেহেতু বৃষ্টি হতে পারে তাই একটা পলেথিন দিয়ে ঢেকে সোজা পূবের দিকে হাঁটতে থাকলাম। যেতে যেতে এমন এক নির্জন স্থানে পৌঁছুলাম, যেখানে ছোট ছোট গাছের সাথে বুনো লতা পেচিয়ে জায়গাটা আঁধার করে রেখেছে। আমি সেটাকেই উপযুক্ত জায়গা বিবেচনা করে ধীরে ধীরে খালের স্রোতের কাছে এগিয়ে গেলাম। প্রথমে পোটলাটা খুলে ওর ভেতর থেকে মাটির লোটা বের করলাম। ওটার ভেতর থেকে কাপড়ে পেচানো গিড়াটা খুলে সাদা ছাইগুলো হাতের তালুতে রাখলাম। তারপর অতি সতর্কতার সাথে সেগুলো জলের স্রোতে ভাসিয়ে দিলাম। শান্ত, নিষ্কম্প সেই ভোরবেলায় একফোঁটা ছাইও বাতাসে উড়ে গেলো না। যা দু চারটা হাতের তালুতে লেগেছিল, ওগুলো চেটেপুটে খেলাম। তারপর মাথার ওপর স্রোতের জল ছিটিয়ে, মাটির লোটাটা জলে ডুবিয়ে দিয়ে উপরে উঠে এলাম। এছাড়াও আরেকটি মূল্যবান বস্তু আমার কাছে ছিল যা সেই নির্জন স্থানে পুঁতে রাখলে বাবার স্মৃতিটুকু কখনোই আর দেখা সম্ভব হত না। মাদ্রাসার ফিরে সেখানকার আঙিণার এক কোণে ছোট্ট একটা গর্ত করে বাবার দেহাবশেষ পুঁতে রাখলাম। যদিও আমার জন্য সেটা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর তবুও বহু খুঁজেটুজে একটা তুলসি গাছও সেখানে লাগিয়েছিলাম। তবে এখন আর গাছটির চিহ্নমাত্র নেই।
যখন আমার বয়স পনেরো, আমার চুলগুলো লম্বা হয়ে কোমড়ের নিচে নেমে গেলো। আমার সৌন্দর্য মহিমায় মোহতামিমরা এতটাই আপ্লুত হত, আমার মুখের দিকে তাদের নজর পড়লে শুদ্ধতার সাথে বলে উঠত—ছোবাহানাল্লাহ। আমি ততদিনে হেফজ শেষ করে নাদিয়ায় ভর্তি হলাম। আমার সেই আশ্রয়দাত্রী বুড়িও আমাকে এতিম করে চলে গেলো। আমি যেন অকূল পাথারে পড়লাম। যে পরিবারে আমার আশ্রয়, তারা আমাকে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিল। কিন্তু মৃত্যুর সময় আমার সম্পর্কে বুড়ির বলে যাওয়া সত্যবাক্যে এক মূহূর্তে আমার সবকিছু চুরমার হয়ে গেলো। আশ্রয়দাতা পরিবারটি আমাকে এখানকার মোহতামিম করে দায় থেকে উদ্ধার হয়ে গেলো। আর আমি ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় প্রহর গুনতে থাকলাম।
আমি সত্যদ্রষ্টাকে বিশ্বাস করি আর আমি স্মরণ করি আমার পিতামাতাকে। প্রতিদিন ভোররাতে যখন আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি কাঠের বাক্সটা খুলে ছোটবেলার সেই প্রিয় ফটোগুলো দেখে স্মৃতিচারণ করি। আমি প্রতিদিন ভগবান শ্রী কৃষ্ণের ফটোর ভেতরে আমার শৈশব দেখি, তারপর খোদার ইবাদত করে মনকে তৃপ্ত করে গুনগুন করে তিলাওয়াতে মশগুল হই। দিনশেষে আমি এই সত্যটা উচ্চারণ করি, স্রষ্টার পৃথিবীতে আমি একজন উদার মানুষ ছাড়া আর কিছু-ই নই। আর মৃত্যুর আগের দিন হলেও আমি আমার জন্ম ভিটায় ফিরে যেতে চাই।
এই গল্পে মেসেজ কী ছিল!
লেখার হাত চমৎকার।