শহিদ ওসমান হাদি : ইনসাফের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা ও আত্মপ্রত্যয়ী জাতি গঠনে অমর অগ্রনায়ক

আরিফ খান সাদ

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি আজ কেবল একটি নাম নয়; ওসমান হাদি নিজের নামের সীমানা অতিক্রম করে পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে এক জাগরণ ও বিপ্লবের প্রতীকে। তার বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবন জাতীয় গণমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। তার জীবন, মিশন ও ভিশন নিয়ে চলছে গবেষণা ও গভীর আলোচনা।

দেশের সচেতন মহলে ওসমান হাদি পরিচিতি লাভ করেন ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে। আর সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তার নাম পৌঁছে যায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পর। যে জুমাবারে তিনি গুলিবিদ্ধ হন, সেই জুমাবার থেকে মৃত্যুবরণের জুমাবার পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহেই ওসমান হাদি হয়ে ওঠেন সর্বত্র উচ্চারিত একটি নাম। মৃত্যুর পর তার জীবনদর্শন, মিশন ও ভিশন প্রবেশ করে সর্বশ্রেণির ইনসাফপ্রিয় মানুষের হৃদয়ের গভীরে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার, জুমার নামাজের পর চলন্ত একটি রিকশার পেছন থেকে গুলি করে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। জুলাই বিপ্লবের কণ্ঠস্বর এই সংগ্রামী নেতা ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন, ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং ২০ ডিসেম্বর শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে শাহবাগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাতের ঘটনা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। বিশ্ব মিডিয়াতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় তার জীবন, সংগ্রাম ও বীরত্বগাঁথা। অল্প সময়েই তাকে কেন্দ্র করে রচিত হয় অসংখ্য কবিতা, সঙ্গীত, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার। শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন খোদাদাদ যোগ্যতা, ক্ষুরধার মেধা ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, অনলবর্ষী বক্তা, কবি, চিন্তক, ‍বুদ্ধিজীবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, রাজপথের সাহসী সংগ্রামী, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক দল ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সমন্বয়কারী এবং ইনসাফের রাজনীতি দর্শনের প্রবক্তা। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই বিপ্লবী তরুণ মাত্র দেড় বছরের মধ্যে বিস্ময়কর জাগরণ সৃষ্টি করে একটি কিংবদন্তিতূল্য অবস্থান নির্মাণ করেন। এমন ক্ষণজন্মা প্রতিভার আকস্মিক বিদায় দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে, অসংখ্য চোখের জলে ভিজেছে জায়নামাজ।

 

এক নজরে শহীদ ওসমান হাদির জীবন

মূল নাম ওসমান গনী। বংশীয় নাম শরিফ। বাবার নাম মাওলানা আবদুল হাদি। বাবার নাম এবং বংশীয় নাম যোগ করে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন শরিফ ওসমান বিন হাদি বা ওসমান হাদি নামে। ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার খাসমহল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মাওলানা আবদুল হাদি (ইন্তেকাল ২০১২) ছিলেন নলছিটি সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার মুদাররিস এবং খাসমহল জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব। এলাকায় তিনি ‘হাদি হুজুর’ নামে খ্যাত ছিলেন। ওসমান হাদি ছিলেন ৬ ভাইবোনের (৩ ভাই, ৩ বোন) মধ্যে সবার ছোট। বড় ভাই ড. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক বরিশালের বিখ্যাত গুঠিয়া বাইতুল আমান জামে মসজিদের খতিব, মেঝো ভাই ওমর ফারুক এবং তৃতীয় ভাই আমাদের আলোচিত ব্যক্তিত্ব শহীদ ওসমান গনী বা ওসমান হাদি। ওসমান হাদি ঝালকাঠি নেছারাবাদ কামিল মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে দাখিল ও আলিম পাশ করে মিসরের জামিয়াতুল আজহার এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ লাভ করেছিলেন। তবে তিনি বিদেশে না গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০–১১ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। এখানেই উচ্চ সিজিপিএসহ অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি ২০১৩ সাল থেকে প্রায় দশ বছর দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি প্রশিক্ষণকেন্দ্র সাইফুর’স কোচিংয়ে সিনিয়র আইইএলটিএস ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজধানীর বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্সে কিছুদিন ইংরেজি বিভাগে এবং বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বিতার্কিক ও আবৃত্তিকার। আবৃত্তি, বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতায় ৫ বার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় তিনি রামপুরা এলাকার সমন্বয়কারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ১৩ আগস্ট থেকে সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি আওয়ামী লীগকে সাংবিধানিকভাবে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন।

 

রাজপথে কাঙ্ক্ষিত গৌরবময় শাহাদাত

গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি একটি টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “একজন বিপ্লবীর মৃত্যু হবে রাজপথে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে—একটা গ্লোরির মৃত্যু। আমি তো ভীষণভাবে প্রত্যাশা করি, একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে রাজপথে, সেই মিছিলের সামনে আমি আছি, একটা বুলেট এসে আমার বুকটা বিদ্ধ করে দিয়েছে, আমি হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে যাচ্ছি। সবাই যখন মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পায়, আমি তখন হাসতে হাসতে ভীষণ সন্তুষ্টি নিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছুতে চাই। ধরেন আমি ৫০ বছর বাঁচলাম, কিন্তু আমাকে দিয়ে দেশের জন্য জাতির জন্য উম্মাহর জন্য কোনো ইমপ্যাক্ট তৈরি হলো না; কিন্তু তারচেয়ে আমি যদি ৫ বছর বাঁচি, আর সেটার মধ্য দিয়ে যদি আগামী ৫০ বছরের ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়, তাহলে অনেক দিন বেঁচে থাকা কি সাফল্যের, বলেন?”

তার আগে ১৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি তার ভেরিফাইড ফেসবুকে একটি পোস্টে জানিয়েছিলেন, “গত তিন ঘণ্টায় আমার নাম্বারে লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশী নাম্বার থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সামারি হলো— আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে। ১৭ তারিখ খুনি হাসিনার রায় হবে। ১৪০০ শহীদের রক্তের ঋণ মেটাতে কেবল আমার বাড়ি-ঘর না, যদি আমাকেও জ্বালিয়ে দেয়া হয়, ইনসাফের এই লড়াই হতে আমি এক চুলও নড়বো না, ইনশাআল্লাহ। এক আবরারকে হত্যার মধ্য দিয়ে হাজারো আবরার জন্মেছে এদেশে। এক হাদিকে হত্যা করা হলে তাওহীদের এই জমিনে আল্লাহ লক্ষ হাদি তৈরি করে দেবেন। স্বাধীনতার এই ক্রুদ্ধ স্বরকে কোনোদিন রুদ্ধ করা যাবে না। লড়াইয়ের ময়দানে আমি আমার আল্লাহর কাছে আরও সাহস ও শক্তি চাই। আরশওয়ালার কাছে আমি হাসিমুখে শহীদি মৃত্যু চাই। আমার পরিবার ও আমার কলিজার সহযোদ্ধাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কুদরতি কদমে সোপর্দ করলাম। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে। হাসবিয়াল্লাহ।” এভাবে একাধিকবার তিনি শাহাদাতের তামান্না ব্যক্ত করেছেন এবং সেসব বক্তব্যের ভিডিওক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেশ-বিদেশের মানুষকে আন্দোলিত করেছে।

শরিফ ওসমান হাদি ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকার পল্টন এলাকায় চলন্ত বাহনে দুর্বৃত্তের আক্রমণের শিকার হন। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, রমনা ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত) থেকে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। ফজরের নামাজের পর থেকে টানা নির্বাচনী প্রচারণার কাজ শেষে দলবল নিয়ে জুমার নামাজ পড়েন মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে। সেখানে কিছুক্ষণ নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে যাত্রা করেন পরবর্তী গন্তব্যে। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় ছিলেন ওসমান হাদি। সঙ্গে ছিলেন তার মেঝো ভাই ওমর ফারুক। ফকিরাপুলের দিক থেকে তারা বিজয়নগরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের পেছন থেকে অনুসরণ করছিল একটি মোটরসাইকেল। তাদের রিকশা যখন পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড অতিক্রম করছিল, বেলা ২টা ২৪ মিনিটে রিকশা চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা দুর্বৃত্ত ওসমান হাদির মাথা লক্ষ করে গুলি করে। ফাঁকা রাস্তায় মোটরসাইকেলটি দ্রুতবেগে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান জানান, একটি গুলি ওসমান হাদির কানের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাকে ‘লাইফ সাপোর্টে’ নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা ওসমান হাদির প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য রাত আটটার দিকে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে উন্নত নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল ও ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক দল তাকে লাইফ সাপোর্টে রেখে সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অপরিবর্তনীয় মস্তিষ্ক ক্ষতি এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার শিকার হন। হামলার ছয় দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ বৃহস্পতিবার রাত ৯.৩০ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে অপারেশন চলাকালীন অবস্থায়, ৩৩ বছর বয়সে শরিফ ওসমান হাদি শাহাদাত বরণ করেন।

এই হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ ও র‍্যাবের তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন নামের দুইজনকে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী এবং আদাবর থানার সাবেক সভাপতি। র‍্যাব এই ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদের স্ত্রী, তার বান্ধবি ও তার শ্যালককে আটক করে। তদন্তে উঠে আসে, ফয়সালের সঙ্গে আটক প্রত্যেক ব্যক্তিরই এই হামলার আগে ও পরে কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ফয়সালের বাবা-মা-ও হামলার পর তাকে আত্মগোপনে যেতে ও নিরাপদে পালিয়ে থাকতে সহায়তা করেন। এ কারণে তদন্তের অংশ হিসেবে তাদেরও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের একটি পক্ষ থেকে জানানো হয়, গুলিবর্ষণকারী ফয়সাল সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

 

রাজকীয় জানাজা ও দাফন

২০ ডিসেম্বর ২০২৫ শনিবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় (মানিক মিয়া এভিনিউ) প্রায় বিশ লক্ষ মানুষের বিশাল সমাবেশে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বিকাল ৪টায় শাহবাগে জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের পাশে তাকে দাফন করা হয়। ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক ও ছুটি ঘোষণা করা হয়। জানাজা উপলক্ষে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ১৮টি প্রবেশপথে তিন স্তরের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে জনস্রোত সহজ করা হয়। জানাজার সময় ছিল বেলা দুইটা, তবে সকাল থেকেই থাকে সারা দেশ থেকে আসতে থাকে বিপুল জনস্রোত। জানাজা শুরুর দুই ঘণ্টা আগেই সংসদ ভবনের সামনের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। দুপুর একটার আগেই সংসদ ভবনের সামনের সড়ক ও আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ভিড়। হাতে, মাথায় ও শরীরে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে জানাজায় আসা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে ছিল জিকির, কালিমা ও নানা শ্লোগান—‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ ইত্যাদি ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং হাদি হত্যার বিচার দাবি করে নানা স্লোগান।

দুপুর ২টার আগ মুহূর্তে সংসদ ভবনের মাঠ ও আশপাশের সড়কে লাগানো বড় বড় স্ক্রিন ও মাইক সচল হয়। প্রায় বিশ লক্ষ মানুষের সমাবেশের সব দৃশ্য সব জায়গায় থেকেই বড় স্ক্রিনে দৃশ্যমান হতে থাকে। ড্রোন ক্যামেরায় সংসদ ভবনের মাঠ ও সামনের সড়কের ছবি বিশ্লেষণ করে দেশ-বিদেশের কয়েকটি সংস্থা জানায়, প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়েছে জানাজায়। তবে ড্রোন ক্যামেরার আওতার বাইরেও ছিল বিপুল মানুষের সমাবেশ। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলগণ উপস্থিত হলে শুরু হয় জানাজার কার্যক্রম। জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং ওসমান হাদির জীবনী পড়ে শোনান। তারপর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বক্তব্য দেন। আবদুল্লাহ জাবের ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবি করেন এবং সরকারের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। লাখো মানুষের কণ্ঠে শ্লোগান ছড়িয়ে দেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। জাবেরের পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘বীর ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছ এবং চিরদিন, বাংলাদেশ যত দিন আছে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। কেউ সরাতে পারবে না।’ তারপর বক্তব্য দেন ওসমান হাদির বড় ভাই বরিশালের বিখ্যাত গুঠিয়া মসজিদের খতিব ড. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য দেশের ১৮-২০ কোটি মানুষের কাছে একটি বার্তা দিয়েছিলেন—কীভাবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয়। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে বড় ভাই বলেন, ‘সাত থেকে আট দিন হয়ে গেল; দিবালোকে, প্রকাশ্যে রাজধানী ঢাকায় জুমার নামাজের পরে খুনি যদি প্রকাশ্যে গুলি করে পার পেয়ে যায়, এর চেয়ে লজ্জার আমাদের আর কিছু নেই।’ বড় ভাইয়ের বক্তৃতার সময় লাখো মানুষের চোখ থেকে কান্নার জল ঝরতে দেখা যায়। ৫ মিনিট বক্তব্য দিয়ে ঠিক দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে তিনি জানাজার নামাজের ইমামতি করেন।

জানাজা শেষে সংসদ ভবনের সামনে থেকে ওসমান হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে নেওয়া হয়। জানাজা শেষে ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদির মরদেহ নিয়ে যান। বেলা ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কবি নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে পৌঁছানোর পর ৪টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। দাফন করা হয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের কবরের দক্ষিণ পাশে। দাফন কাজে তদারকি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. নিয়াজ আহমদ খান। উপস্থিত ছিলেন শহীদ ওসমান হাদির পরিবারের সদস্যরাও। দাফন শেষে ঢাবি ভিসি ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, হাদি এখন আর শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি ইতিহাস, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

ইনসাফ ও ইনকিলাবের স্বপ্নদ্রষ্টা

ইনসাফ ও ইনকিলাব দুটো আরবি শব্দ। আরবি ইনসাফ শব্দটি এসেছে ‘নিসফ’ বা অর্ধেক থেকে। একটি আপেল বা আনার সমান দুই ভাগ করলে যে সাম্য তৈরি হয়, সেটাকে বলা হয় ইনসাফ। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে খালিক ও মাখলুক বা স্রষ্টা ও সৃষ্টির সব হক ও অধিকার সমানভাবে অর্থাৎ যথাযথভাবে আদায় করার নাম ইনসাফ। শরিফ ওসমান হাদি দেশের রাজনীতিতে নতুন করে ইনসাফ শব্দটিতে আলাদা একটি মাত্রা যোগ করেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি আমার শত্রুর সাথেও ইনসাফ চাই’। শুধু তা-ই নয়, ইনসাফের সাথে তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি জাগরণের, বিপ্লবের ও ইনকিলাবের। জাগরণ, বিপ্লব, ইনকিলাব শব্দগুলোর মধ্যে তিনি ইনকিলাব শব্দটিকে বেছে নিয়েছিলেন এবং রাজনীতির টেবিলে পরিচিত করে তুলেছিলেন। তিনি ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সার্বিক ইনকিলাব ও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে থাকবে ইনসাফ ও আত্মপ্রত্যয়। এজন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন রাজনৈতিক সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি উপলব্ধি করেন দেশ ও জাতিকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে। পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে হবে। এজন্য তরুণ প্রজন্মকেও নতুন করে শিক্ষায় ও প্রজ্ঞায় গড়ে তুলতে হবে। দেশের মাটিতে শিকড় গেড়ে বসা ভারতীয় সংস্কৃতি দূর করতে হবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে। এসব ভাবনা থেকে তিনি ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে ৩০ জন অনুসারী নিয়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন। জুলাই বিপ্লবের সাথে সংহতি রেখে ইনকিলাব মঞ্চ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করেন। যেমন, দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও শ্লোগান পুনর্লিখন কর্মসূচি, শহীদি সপ্তাহ পালন, দাবি আদায়ে অনশন, শহীদি স্মৃতিকথা, গণসেজদা ও দ্রোহের গান কর্মসূচি, স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবি প্রদর্শনী ও ভিডিও ডকুমেন্টেশন, দেশব্যাপী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত-নিহতদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ ইত্যাদি। একই সময় রাজধানীর বাংলামোটরে প্রতিষ্ঠা করেন তার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, তার এই কালচারাল সেন্টার একদিন ২০ তলা ভবন বিশিষ্ট্য একটি ইসলাম ভিত্তিক ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলাদেশী সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

 

শিক্ষকতা ও লেখালেখি

শরিফ ওসমান হাদি প্রায় দশ বছর ইংরেজি শেখার জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘সাইফুরস’ (Saifur’s)-এ শিক্ষকতা করেছেন।  প্রতিষ্ঠানটির রাজধানীর মৌচাক, পান্থপথ ও ফার্মগেট ব্রাঞ্চের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। সাইফুরসে শিক্ষকতার সময়ে ‘VARSITY ভর্তি CHANCE PLUS প্রস্তুতিমূলক সাধারণজ্ঞানের বই’ রচনা করে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার জনপ্রিয় বই ‘English Therapy’ একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পায়। দীর্ঘদিন ‘সাইফুর’স’ (Saifur’s)-এর সাথে যুক্ত থাকায় তার লেখা অনেক বই যৌথভাবে বা প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে তার স্বনামে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ইংরেজি শেখার বই হচ্ছে—১. ‘English Therapy’। ইংরেজি উচ্চারণের জড়তা কাটানোর কৌশলগত একটি বই। ২. ‘Vocab Therapy’। শব্দভাণ্ডার বা ভোকাবুলারি সমৃদ্ধ করার জন্য বিশেষ বই। ৩. ‘সহজ ভাষায় ইংলিশ গ্রামার’। সাধারণ এবং সাবলীল ভাষায় গ্রামারের মৌলিক বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেন যেকোনো স্তরের শিক্ষার্থী বুঝতে পারে। ৪. ‘ছোটদের English Therapy’। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি-ভীতি ছাড়াই বড় হতে পারে। ৫. ‘English Therapy Practice Book’। ওয়ার্কবুক বা অনুশীলনী বই। শিক্ষার্থীরা মূল বই থেকে যা শেখে, তা এখানে হাতে-কলমে অনুশীলনের সুযোগ পায়। তার এসব বই রকমারি, ওয়াফিলাইফ এবং বইবাজার-এর মতো প্ল্যাটফর্মে বেস্টসেলার তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়াও তিনি ছিলেন রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস (University of Scholars)-এ বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ এবং ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক।

শরিফ ওসমান হাদি ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ নামে একটি কবিতার বই রচনা করেছেন। ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের একুশে বইমেলায় ‘দুয়ার প্রকাশনী’ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। আওয়ামী অপশাসনের নজরদারি এড়াতে বইটিতে লেখকের নাম হিসেবে সীমান্ত শরিফ ছদ্মনাম ব্যবহৃত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত কালচারাল সেন্টার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার সম্পাদিত দুটো বই ‘জুলাইয়ের গ্রাফিতি ও গাইলসমগ্র’ এবং ‘জাতিসংঘ প্রতিবেদনে জুলাই অভ্যুত্থান : মানবাধিকার সংকট ও সমাধান’। এই বইয়ে একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকাও লিখেছেন তিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার রাজপথের রক্তাক্ত স্মৃতি উপজীব্য করে লেখা ‘লাল জুলাই’ কবিতা বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এছাড়াও শরিফ ওসমান হাদি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার থেকে ‘জন্মদাগ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ চূড়ান্ত করেছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে পত্রিকাটি বাজারে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ রাতে তিনি জন্মদাগ পত্রিকার বিষয়ে মিটিং করেছিলেন এবং তিনি নিজেও একটি লেখা প্রস্তুত করছিলেন।

 

নির্বাচনী প্রচারণা ও ফজর ক্যাম্পেইন

ওসমান হাদি দেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নতুন সংস্কৃতি চালু করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। নির্বাচনে শক্তি দেখিয়ে প্রচারের মাঠ দখলে রাখতে চান ভোটপ্রার্থীরা। টাকার বিনিময়ে ভোট কেনেন। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে ফেলেন মাঠ-ঘাট। মানুষ ও যানবাহন চলাচলের রাস্তাঘাটে দলীয় নেতাকর্মীরা সমাবেশ ডাকেন। মাইকে উচ্চ শব্দে বক্তৃতা করা হয়। নির্বাচন প্রচারণার এসব সনাতনী পদ্ধতি পরিবর্তন করতে ওসমান হাদি নিজেই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কীভাবে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা করতে হয়, ভোট সংগ্রহ করতে হয়। ওসমান হাদি বলেছিলেন, নির্বাচনে জিততেই হবে এমন মানসিকতা তিনি লালন করেন না। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণটা যেন মার্জিত হয়, তার জন্যই তার সংগ্রাম। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের নির্বাচনটা আমাদের লড়াইয়ের একটা অংশ।’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমাদের ইচ্ছা, আমরা একটা রোল মডেল তৈরি করবো বাংলাদেশের রাজনীতিতে। যে ঐতিহাসিক জুলাই হলো, এটাকে কেন্দ্র করে নতুন করে কিছু শুরু করবো; যা আগে হয়নি, যা মানুষ পছন্দ করে। আমরা খুব সাহস নিয়ে শুরু করলাম। নিঃসঙ্গ লড়াই ছিল; কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ এখন আল্লাহ এর সঙ্গে এত মানুষ জোগাড় করে দিয়েছেন।’

ওসমান হাদির নির্বাচন প্রচারণার একটি নতুন সংযোজন ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক নির্বাচনী কার্যক্রম। প্রচারণা কর্মীদের নিয়ে ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচটি মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, নামাজের পর মুসল্লিদের হাতে প্রচারণা পত্র বিতরণ করতেন এবং আশপাশের এলাকায় ভোটারযোগ করতেন। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর রাজধানীর পরিবাগ মসজিদে ফজরের নামাজের পর শুরু করেন তার ‘ফজর ক্যাম্পেইন’ এবং ১২ ডিসেম্বর মতিঝিলের ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজের পর সর্বশেষ ক্যাম্পেইন করেন। ওয়াপদা মসজিদ মহল্লায় নির্বাচনী প্রচারণা শেষে পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার পথেই তিনি হামলার শিকার হন। ১ নভেম্বর ফজর ক্যাম্পেইনের সূচনার আগের রাতে তার সহকর্মীদের বলছিলেন, ‘এমপি না হতে পারলেও সব এমপি প্রার্থীদের ঘুম হারাম করে দেবো। বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তন এনে ছাড়বো। আমি তো এমনিতেই ঘুমাই না, তোমরাও কিন্তু ঘুমাতে পারবা না।’ ফজর ক্যাম্পেইনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তার এক সহকর্মী বলেন, ‘ফজর ক্যাম্পেইনের প্রথম দিন ছিল আজানের সঙ্গে সঙ্গে উঠে অজু করে পরীবাগ জামে মসজিদে নামাজ আদায় করা। নামাজ শেষে মুসল্লিদের হাতে হাতে লিফলেট দিচ্ছিলেন। মানুষ অবাক হয়ে বলছিল, এমন একটা মানুষই বাংলাদেশ চায়। মুরুব্বীরা বুকে টেনে নিচ্ছিলেন। বাসায় দাওয়াত দিচ্ছিলেন, নাস্তার জন্য তখনই নিয়ে যাইতে চেষ্টা করছিলেন। এতো আগ্রহ দেখে এরপর থেকে প্রত্যেক ফজরে কোনো না কোনো মসজিদে ভাইকে নিয়ে যাওয়া হতো। শেষে নাস্তা করতাম হাতিরপুলের নামকরা হোটেল আলমে। সেখানেও মানুষ ভালোবাসতে শুরু করে। মানুষ যখন সবেমাত্র মনে গেঁথে নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে নিজের জীবনকে হায়েনাদের বুলেটের সামনে দিয়ে ভাই আমার শহীদ হয়ে গেলেন।’

 

সহজ-সরল জীবন যাপন

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন সময় সচেতন একজন রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী। সময়ের প্রয়োজন অনুধাবন করে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন ব্যক্তিগত সংবাদকর্মী। তার জীবনের অধিকাংশ গল্প ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তার সহকর্মীদের বিভিন্ন ও প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তার যাপিত জীবনের চিত্র এক কথায় বলতে গেলে প্রসিদ্ধ আরবি প্রবাদটি সামনে চলে আসে :

سيد القوم خادمهم

‘জাতির নেতা তিনিই, যিনি তাদের খাদেম ও সেবক।’

ওসমান হাদি ছিলেন তার সহকর্মীদের খাদেম, পরিবারের খাদেম, সমাজের খাদেম এবং দেশের খাদেম। তিনি অন্যের জন্য জায়নামাজ বিছাতেন, নিজের পাত্রের খাবার অন্যের মুখে তুলে দিতেন। সহকর্মীর ময়লা কাপড় ধুয়ে শুকোতে দিতেন, রাতে নিজের মাথার নিচ থেকে বালিশ অন্যের মাথার নিচে রেখে দিতেন, পরিবারের জন্য খাবারের তরকারি নিজ হাতে কেটে দিতেন। বিপুল অর্থবিত্তের হাতছানি উপেক্ষা করে রামপুরায় একটি ভবনের ছয় তলা উপরের একটি ছোট চিলেকোঠায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি নিজেই একাধিকবার বলেছেন, ব্যস্ততার কারণে মৃত্যুর আগের দশ মাসে দশদিনও দপুরের খাবার খেতে পারেননি। ফজরের পরে কাজে বেরিয়ে পড়তেন এবং রাত দুইটায় বাসায় ফিরতেন। তিনি বলেছেন, দশ মাসে তার দশ মাস বয়সী সন্তানকে ৩০ মিনিটও কোলে নিতে পারেননি। অন্যান্য রাজনীতিবিদরা যেখানে নিজেদের পক্ষ থেকে ইশতেহার ঘোষণা করেন, সেখানে ওসমান হাদি সব জায়গায় একটি হোয়াইট বোর্ড নিয়ে যেতেন, মানুষ যেসব দাবি লিখে জানাবে তিনি সেসব তার ইশতিহারে যোগ করবেন। খাবার অপচয়ের ব্যাপারেও তিনি অনেক সোচ্চার ছিলেন।

 

শহীদ হাদির জীবন থেকে শিক্ষা

শহীদ ওসমান হাদি মাত্র ৩৩ বছরের একটি কর্মমুখর ও বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন। তার জীবনের পরতে পরতে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা উপাদান। তার জীবন আমাদের জীবন্তরূপে শেখায় সত্যবাদিতা, সাহসিহকতা, সংগ্রাম, সততা, সরলতা, আন্তরিকতা, বিনয়, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অধ্যয়ন, অধ্যাবসায়, মৃত্যুর প্রস্তুতি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় শাহাদাত বরণের আকাঙ্ক্ষা। তিনি সবসময় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথে শাহাদাতের মউত কামনা করতেন। আল্লাহ তার প্রত্যাশা কবুল করেছেন এবং জান্নাতিদের যে বয়স হবে, ঠিক সে বয়সেই তাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জান্নাতের বাসিন্দারা জান্নাতে প্রবেশ করবে লোমহীন, শ্মশ্রুহীন ও সুরমা চোখে। তখন তাদের বয়স হবে ত্রিশ বা তেত্রিশ বছরের যুবকের মতো।’[1]জামে তিরমিজি, হাদিস নং : ২৫৪৫

শহীদ ওসমান হাদি পৃথিবীবাসীর চোখে মৃত্যুবরণকারী হলেও বাস্তবে তিনি জীবিত। মরেও তিনি অমর। কুরআন-হাদিসের ভাষায় এবং আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী শহীদরা মৃত নন, বরং জীবিত ও উত্তম রিজিকপ্রাপ্ত। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তারা তাদের রবের নিকট থেকে রিজিকপ্রাপ্ত হচ্ছে।’[2]সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৯

এ আয়াত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শাহাদাত কোনো সমাপ্তি নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও সম্মানের ভেতর দিয়ে শুরু হওয়া অনন্য এক জীবন। শহীদরা পৃথিবীর ক্ষুদ্র জগত ছেড়ে জান্নাতের অসীম জগতে বিচরণ করেন সবুজ পাখিদের দলে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমরা উক্ত আয়াত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন,

‘শহীদদের রুহ জান্নাতের সবুজ পাখির অভ্যন্তরে রাখা হয়। তারা আরশের সাথে ঝুলন্ত ঝাড়বাতির ভেতর বসবাস করে। জান্নাতে তারা ইচ্ছেমতো বিচরণ করে এবং শেষে সেই ঝাড়বাতিগুলোতে ফিরে এসে আশ্রয় নেয়।’[3]সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭৩২

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি আমাদের আরেকটি জিনিস শিখিয়েছেন। পৃথিবীতে বসে যদি আসমানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যায়, তাহলে আসমান থেকে তার জন্য অবতীর্ণ হয় ভালোবাসার শিশির। তিনি প্রতিদিন রাতে তার সহকর্মীদের নিয়ে দুই হাত তুলে আঝোরে কান্না করতেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। তার জানাজায় উপস্থিত লক্ষ লক্ষ মানুষ, মৃত্যুর পর প্রতিদিন তার কবরে দোয়াপ্রার্থী মানুষের ভিড় ও সমগ্র বিশ্বব্যাপী তার প্রশংসা আমাদের মনে করিয়ে দেয় হাদিসের বাণী :

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তিনি জিবরাঈল আ.-কে ডেকে বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, অতএব তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরাঈল আ.-ও তাকে ভালোবাসেন এবং জিবরাঈল আ. আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক বান্দাহকে ভালোবাসেন। কাজেই তোমরা তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশবাসী তাকে ভালোবাসতে থাকে। অতঃপর পৃথিবীতেও তার মাকবুলিয়াত ও সর্বজনগ্রহণযোগ্যতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’[4]সহীহ বুখারি, হাদিস নং : ২৯৮২

শহীদ ওসমান হাদির ধূমকেতুর মতো জীবন—হঠাৎ আগমন, তীব্র আলোর বিকীরণ এবং রাজকীয় বিদায় আমাদের সামনে প্রতিধ্বনিত করে যায় কবির কথা: ‘প্রথম যেদিন ‍তুমি এসেছিলে ভবে, কেঁদেছিলে একা তুমি হেসেছিলো সবে। এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 জামে তিরমিজি, হাদিস নং : ২৫৪৫
2 সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৯
3 সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭৩২
4 সহীহ বুখারি, হাদিস নং : ২৯৮২

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments