জ্ঞানের ইনতিজাম : ইলম ও হায়াতের বিভাজন মোচনে এক নতুন সভ্যতার ইশতেহার

আনাস ইসলাম

বর্তমান মুসলিম উম্মাহ এক গভীর ও বহুমাত্রিক অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকটকে যদি কেবল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তা হবে এক ধরনের বৌদ্ধিক সরলীকরণ। বাস্তবিক অর্থে, এই সংকটের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—এটি মূলত একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) সংকট—যা মানুষের জ্ঞান-উৎপাদন, মূল্যবোধ নির্মাণ এবং বাস্তবতার ব্যাখ্যা প্রদানের কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপর্যয়ের ফলশ্রুতিতে মুসলিম মানস আজ এক দ্বিধাবিভক্ত[1]তহা আবদুর রহমান “تجديد المنهج في تقويم التراث” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মুসলিমরা … Continue reading অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে অনালোচিত ঐতিহ্য-অনুকরণ (uncritical traditionalism), অন্যদিকে অন্ধ আধুনিকতা-অনুসরণ (uncritical modernism)। উভয় প্রবণতাই প্রকৃত বৌদ্ধিক স্বাধীনতার পরিপন্থি, কারণ এ দুটোই চিন্তার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে এবং নিরন্তর রুদ্ধ করে যায় সৃজনশীল পুনর্গঠনের পথ।[2]তহা বলেন: “إن العقل الإسلامي المعاصر عقل مستقيل” অর্থাৎ, সমকালীন মুসলিম আকল মূলত … Continue reading

ফলে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অপরিহার্য একটি মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর—এক ধরনের ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেনেসাঁ’, যা ঐতিহ্য (tradition) ও আধুনিকতার (modernity) মধ্যকার সৃজনশীল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি আখলাকি ওয়ার্ল্ডভিউ নির্মাণে সক্ষম হবে। এই প্রক্রিয়া নিছক সমন্বয় নয়; বরং এটি হবে সমালোচনামূলক আত্ম-সমীক্ষা ও পুনঃনির্মাণের এক অবিরাম যাত্রা।

এই বৌদ্ধিক সফরে আমরা অগ্রসর হব ইতিহাসের বিভিন্ন মনীষীর চিন্তার মধ্য দিয়ে—ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি থেকে শুরু করে মালেক বিন নাবির সভ্যতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, আল্লামা ইকবালের আত্মচেতনা ও খুদির দর্শন অতিক্রম করে তহা আবদুর রহমানের আখলাকি-দার্শনিক প্রস্তাবনা পর্যন্ত—এবং এর-ও পরবর্তী সম্ভাবনার দিকে।

এই সমগ্র আলাপের চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি নতুন সভ্যতার ইশতেহার নির্মাণ—যেখানে ইলম ও আখলাক পরস্পরবিচ্ছিন্ন না থেকে আবির্ভূত হবে একীভূত এক সত্তা হিসেবে। যেখানে মিলেমিশে যাবে এমন এক সভ্যতার স্বপ্ন, যা কেবল জ্ঞানের উৎপাদনেই নয়, বরং মানবিকতার উৎকর্ষেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

 

তহার দর্শনে তাকলিদ থেকে ইজতিহাদে উত্তরণ

সভ্যতার স্থবিরতা কিংবা গতিশীলতা কোনো বাহ্যিক উপকরণে নির্ধারিত হয় না; সেটা বরং নির্ভর করে সেই সভ্যতার অন্তর্গত মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীল আত্মীকরণের সক্ষমতার ওপর। যখন একটি সমাজ নিজের বৌদ্ধিক স্বাতন্ত্র্য হারায়, তখন তার জ্ঞানচর্চা ধীরে ধীরে অনুকরণে পর্যবসিত হয়; আর এই অনুকরণই শেষপর্যন্ত তাকে স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয়। আধুনিক মুসলিম দর্শনে এই অবস্থাকেই যথার্থভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘বৌদ্ধিক দাসত্ব’ (intellectual dependency) হিসেবে।[3]روح الحداثة গ্রন্থে তহা দেখিয়েছেন যে, সমকালীন মুসলিম মানস পশ্চিমের ‘তৈরি … Continue reading

এই প্রেক্ষাপটে তহা আবদুর রহমান দেখিয়েছেন, সমকালীন মুসলিম মানস আসলে দুই বিপরীতধর্মী অথচ সমভাবে সমস্যাজনক প্রবণতার মধ্যে আবদ্ধ—একদিকে অনুকরণমূলক আধুনিকতা (الحداثة التقليدية),[4]তহা বলেন: “إننا استوردنا نواتج الحداثة ولم نستورد روحها” অর্থাৎ, আমরা আধুনিকতার … Continue reading অন্যদিকে স্থবির ঐতিহ্যবাদ (التقليدية الجامدة)।[5]তহা দেখিয়েছেন যে, ঐতিহ্যবাদীরা ঐতিহ্যের ‘আক্ষরিক’ (Literal) অনুকরণে মত্ত, … Continue reading এই দ্বৈততার ভেতরেই নিহিত আছে এক গভীর অনুকরণ-সংকট, যার দুইটি মুখ স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত।[6]তহা একে একটি চমৎকার রূপকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন: “এতিম আকল”। অর্থাৎ, … Continue reading

প্রথমত, পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক অনুকরণ—যাকে তহা অভিহিত করেন “ব্যাবহারিক অনুকরণ” (الحداثة التطبيقية) হিসেবে। এর দ্বারা বোঝানো হয় পশ্চিমা জ্ঞানতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান (institutions) ও জীবনদর্শনকে সমালোচনাহীনভাবে গ্রহণ করা, যেখানে ‘আকল’ বা যুক্তিবোধ নিজস্ব ভিত্তি হারিয়ে পশ্চিমা বৌদ্ধিক কাঠামোর অনুগত হয়ে পড়ে। এতে জ্ঞানচর্চা আর সৃজনশীল থাকে না; বরং তা পরিণত হয় প্রতিলিপি নির্মাণের এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।

দ্বিতীয়ত, অতীতকেন্দ্রিক অনুকরণ—যা মূলত ইতিহাসের রোমন্থনে আবদ্ধ এক মানসিকতা। এ প্রসঙ্গে ইবনে খালদুনের গভীর অন্তর্দৃষ্টি স্মরণীয়। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, যখন কোনো জাতি তার প্রাণশক্তি (vitality) হারিয়ে ফেলে, তখন সে তার বর্তমানের শূন্যতাকে ঢাকতে অতীতের গৌরবকেই আশ্রয় করে। কিন্তু এই আশ্রয় জীবন্ত ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ নয়; বরং তা ঐতিহ্যের এক প্রকার ‘মমি সংরক্ষণ’—যেখানে রূপ থাকে, প্রাণ থাকে না।

এই দ্বিমুখী সংকটের কার্যকর সমাধান নিহিত রয়েছে সৃজনশীল সম্পৃক্ততা (critical engagement)-এর মধ্যে। এটি কেবল গ্রহণ বা বর্জনের সরল দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি একটি ‘ইজতিহাদি’ প্রক্রিয়া—যেখানে কোনো ধারণাকে বিশ্লেষণ, সমালোচনা এবং পুনর্গঠনের (reconstruction) মাধ্যমে নিজস্ব ওয়ার্ল্ডভিউর অংশে রূপান্তর করা হয়।[7]এখানে আল্লামা ইকবালের “Reconstruction” এবং তহা আবদুর রহমানের “التبيئة”  … Continue reading

এই ইজতিহাদি সম্পৃক্ততার একটি সুসংবদ্ধ পদ্ধতি নির্মাণের জন্য আমরা তিনজন মনীষীর ধারণাকে একটি সমন্বিত বৌদ্ধিক ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।

প্রথমত, ইবনে খালদুনের ‘সামাজিক বাস্তবতা’ (social impact) বিশ্লেষণ। তাঁর মুকাদ্দিমা-য় তিনি দেখিয়েছেন, অন্ধ অনুকরণ একটি সমাজের ‘আসাবিয়াহ’—অর্থাৎ সামাজিক সংহতি—ক্ষয় করে। ফলে, কোনো নতুন ধারণা গ্রহণের পূর্বে তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন অপরিহার্য—এটি কি সমাজকে অধিকতর সংহত করে, নাকি বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে?

দ্বিতীয়ত, তহা আবদুর রহমানের ‘আখলাকি মানদণ্ড’ (ethical grounding)। তাঁর দৃষ্টিতে, আখলাক-বিচ্ছিন্ন জ্ঞান কখনো প্রকৃত জ্ঞান হতে পারে না; বরং একটা পর্যায় সেটা পরিণত হয় ধ্বংসাত্মক শক্তিতে। তিনি ধারণা গ্রহণের তিনস্তরীয় প্রক্রিয়া নির্দেশ করেন—

(১) গ্রহণ (روح الحداثة): যা সার্বজনীন কল্যাণ বহন করে।[8]তহা একে বলেন আধুনিকতার সেই সৃজনশীল চেতনা যা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নয়, বরং … Continue reading

(২) বর্জন (الحداثة المنقولة): যা নৈতিকভাবে ক্ষতিকর বা আধিপত্যবাদী।[9]এটি হলো সেইসব অনৈসর্গিক জীবনদর্শন যা মানুষের ফিতরাত বা নৈতিকতার বিরোধী। … Continue reading

(৩) পুনর্গঠন (التبيئة): যা নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন অর্থে রূপায়িত।[10]এটি তহার দর্শনের অনন্য উদ্ভাবন। তিনি বলেন, বাইরের জ্ঞানকে সরাসরি … Continue reading

তৃতীয়ত, মালেক বিন নাবীর ‘সভ্যতার মনস্তত্ত্ব’ (psychological infrastructure)। তাঁর বিখ্যাত ফর্মুলা—মানুষ, মাটি ও সময়—ইঙ্গিত করে যে, সভ্যতা কোনো বাহ্যিক অনুকরণের ফল নয়; বরং এটি একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া। তাঁর মতে, আমাদের করণীয় হলো অন্যের ধারণাকে কেবল কনজিউম না করে সেই ধারণা উৎপাদনের অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া ও মেকানিজম আয়ত্ত করা।[11]বিন নাবি বলেন: “الحضارة هي التي تلد منتجاتها” অর্থাৎ সভ্যতা নিজেই নিজের … Continue reading

এই তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে একটি কার্যকর ‘বৌদ্ধিক ছাঁকনি’ (intellectual filter) নির্মাণ সম্ভব—যেখানে ইবনে খালদুনের সামাজিক বিশ্লেষণ আমাদের দেখাবে প্রভাব, তহা আবদুর রহমানের আখলাকি দর্শন নির্ধারণ করবে মানদণ্ড, এবং মালেক বিন নাবীর সভ্যতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি নির্দেশ করবে রূপান্তরের পদ্ধতি।

এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘তাকলিদ’ থেকে ‘ইজতিহাদ’-এ উত্তরণ। আল্লামা ইকবাল যাকে আখ্যায়িত করেছিলেন Reconstruction of Religious Thought—অর্থাৎ ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন।[12]আল্লামা ইকবাল বলেন:

“The spirit of Islamic culture is a constant struggle for creative freedom.”

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ইজতিহাদকে একটি ত্রিস্তরীয় পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করা যায়—

১) নির্ণয় (diagnosis):

কোনো ধারণার উৎস, প্রেক্ষাপট ও অন্তর্নিহিত দার্শনিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করা—যেমন পুঁজিবাদ (capitalism) বা লিবারেলিজম (liberalism)-এর বৌদ্ধিক উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য অনুধাবন।[13]এখানে তহা আবদুর রহমানের ‘তাকউইম’ বা ব্যবচ্ছেদ তত্ত্বটি সরাসরি … Continue reading

২) মূল্যায়ন (evaluation):

এরপর সেই জিনিসটি মানব-ফিতরাত, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও মানবিক ইনসাফের  সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এই প্রশ্নের আলোকে বিচার করা।[14]মালেক বিন নাবির ‘আখলাকি ইমিউনিটি’ এবং তহার ‘আমানতদারি দর্শন’ এখানে … Continue reading

৩) আত্মীকরণ (integration):

যদি কোনো উপাদান কল্যাণকর প্রতীয়মান হয়, তাহলে সেটিকে ‘তাওহিদী’ ওয়ার্ল্ডভিউর কাঠামোর মধ্যে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে আত্মস্থ করা।[15]এটা ইসমাইল রাজি আল-ফারুকীর ‘Islamization of Knowledge’ এবং তহার ‘তবিয়্যাহ’ (التبيئة) … Continue reading

এইভাবে অন্ধ গ্রহণ বা পরিত্যাগের দ্বৈততা অতিক্রম করে যে মধ্যপন্থা নির্মিত হয়, সেটিই একটি জীবন্ত, সৃজনশীল ও গতিশীল সভ্যতার প্রধান লক্ষণ—যেখানে জ্ঞান কেবল ধার করা হয় না, বরং পুনর্জন্ম লাভ করে।[16]ইকবাল একে বলেছেন ‘Creative Assimilation’।

 

তহার “জ্ঞানের ইনতিজাম’ : ইলম ও হায়াতের সমন্বিত কাঠামো

আধুনিক মুসলিম মানসের অন্যতম একটি গভীর ট্র্যাজেডি হলো—সে নিজের জীবনজগৎকে দুইটি সমান্তরাল অথচ পরস্পর-বিচ্ছিন্ন পরিসরে বিভক্ত করে ফেলেছে। বর্তমান শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো এক ধরনের ফলস বাইনারির[17]ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে এই বিভাজন কীভাবে আমাদের ওপর আরোপিত হয়েছে, তার … Continue reading ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে ‘দুনিয়া বনাম দ্বীন’, ‘আকল বনাম ওহী’—এমন বিভাজনগুলোকে স্বাভাবিক ও অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান করা হয়। অথচ এই বিভাজন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ইসলামী বৌদ্ধিক বিকাশের ফল নয়; বরং এটি একটি ধার করা সংকট, এক প্রকার আরোপিত জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা—যাকে যথার্থভাবেই বলা যায় epistemological fragmentation।[18]তহা এই খণ্ডিত জ্ঞানব্যবস্থাকে “المعرفة المنشطرة” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে এর শিকড় নিহিত ইউরোপীয় বৌদ্ধিক ইতিহাসে। ইউরোপিয়ান রেনেসাঁ এবং পরবর্তী এনলাইটেনমেন্টের প্রেক্ষাপটে চার্চ ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব যে তীব্রতা লাভ করে, তার ফলশ্রুতিতেই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ (secularism)-এর উদ্ভব ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানকে দুইটি পৃথক ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়—একদিকে পাবলিক ডোমেইন (বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি), অন্যদিকে প্রাইভেট ডোমেইন (ধর্ম, বিশ্বাস, নৈতিকতা)।[19]ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের ফলে সৃষ্ট এই বিভাজনকে তহা আবদুর রহমান তাঁর “بؤس … Continue reading পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মাধ্যমে এই দ্বৈত জ্ঞান-ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বে প্রতিস্থাপিত হয়, এবং ধীরে ধীরে এমন এক মানসিকতা তৈরি করে—যেখানে আধুনিকতা মানেই ধর্মহীনতা, আর ঐতিহ্য মানেই পশ্চাৎপদতা।

এই বিভাজনের আরেকটি গভীর দিক হলো—‘আকল’ ও ‘ওহী’-এর মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ স্থাপন। ধারণা করা হয়, আকল কেবল বস্তুজগতের বিশ্লেষণে প্রযোজ্য, আর ওহী সীমাবদ্ধ পরকাল বা আধ্যাত্মিকতার গণ্ডিতে। অথচ এই ধারণা ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের মৌলিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।[20]ইকবাল একে বলেছেন ‘Organic Unity’। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলামী শিক্ষায় জড় ও আত্মার … Continue reading

এই প্রেক্ষাপটে তহা আবদুর রহমানের দর্শন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ‘জ্ঞানের ইনতিজাম’ তত্ত্বের[21]তহা আবদুর রহমান তাঁর প্রধান কাজগুলোতে الانتظام المعرفي শব্দবন্ধটি হুবহু এই … Continue reading কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো—জ্ঞান ও জীবনকে খণ্ডিত করা যায় না; এগুলো মূলত একটি সমন্বিত আখলাকি-অস্তিত্বগত কাঠামোর অংশ। তাঁর ভাষায়, যে আধুনিকতা জীবনকে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে, সেটি প্রকৃত আধুনিকতা নয়; বরং সেটি এক ধরনের ‘বিচ্ছিন্ন আধুনিকতা’ (fragmented modernity)।[22]তহা এটাকে বলেন “একটি রুগ্ন আধুনিকতা”।

তহা আবদুর রহমান দেখান, যখন ব্যবসা কেবল মুনাফা অর্জনের উপায় না হয়ে আখলাকের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং রাজনীতি ক্ষমতা-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা না হয়ে ‘আমানাহ’ (trust) হিসেবে প্রতিভাত হয়, তখনই দুনিয়া ও দ্বীনের প্রকৃত সমন্বয় সাধিত হয়। তাঁর প্রস্তাবিত ‘রূহুল হাদাছা’ এই অর্থেই—আধুনিকতার রূপ নয়, বরং তার নৈতিক আত্মাকে পুনরুদ্ধার করা।[23]তহা প্রচলিত ‘সেকুলারিজম’-এর বিপরীতে “الائتمانية” (আল-ই’তিমানিয়্যাহ) বা … Continue reading

এই প্রেক্ষিতে তাঁর একটি মৌলিক উক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—নৈতিকতা ও যুক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে তার দৃষ্টিভঙ্গি হলো: আকলহীন আখলাক অন্ধ, আর আখলাকহীন আকল ধ্বংসাত্মক।[24]এইটা তহার “سؤال الأخلاق” গ্রন্থের সারাংশ। এই সূত্র থেকেই তিনি প্রচলিত ‘reason’-এর পরিবর্তে ‘ethical reason’ (العقل الأخلاقي)-এর ধারণা উপস্থাপন করেন—যেখানে আকল ও আখলাক পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।[25]তহা প্রচলিত পাশ্চাত্য ‘Reason’ কে ‘العقل المجرد’ (বিযুক্ত আকল) বলে … Continue reading

এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র নতুন অর্থ লাভ করে। অর্থনীতি আর নিছক পুঁজি সঞ্চয়ের যন্ত্র থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ‘আদল’ ও ‘ইহসান’ বাস্তবায়নের মাধ্যম। রাজনীতি আর ম্যাকিয়াভেলীয় কৌশলের ক্ষেত্র নয়; বরং তা আমানাহ—যেখানে শাসক জনগণের সেবক এবং পরম দায়বদ্ধ এক আখলাকি সত্তা। শিক্ষা ব্যবস্থাও কেবল পেশাগত স্কিল অর্জনের উপায় নয়; বরং তা ‘ইনসান’—এক পূর্ণাঙ্গ আখলাক-সচেতন মানুষের গঠনপ্রক্রিয়া।

এই সমন্বিত চেতনার সর্বোচ্চ রূপটি প্রতিফলিত হয় কুরআনের সেই ঘোষণায়—“বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবই বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য।”[26]সূরা আন’আমের ১৬২ নম্বর আয়াতটাই ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের ‘Unity of Knowledge’ … Continue reading

এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় ঘোষণা নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত ইশতেহার। এর মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি কার্যক্রম একটি একক আখলাকি কেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত হয়, এবং তথাকথিত ‘সেকুলার’ ও ‘রিলিজিয়াস’-এর মধ্যবর্তী কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে পড়ে।

ফলে, এই দ্বৈততা ভাঙার আহ্বান মানে ধর্মকে কেবল মসজিদের সীমানায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা—বাজারের নীতিতে, ল্যাবরেটরির অনুসন্ধানে, এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে। এই পুনঃস্থাপনই প্রকৃত তাওহিদী একীভবন—যেখানে জীবন বিভক্ত নয়, বরং একীভূত; যেখানে জ্ঞান বিচ্ছিন্ন নয়, বরং অর্থপূর্ণভাবে সংযুক্ত; এবং যেখানে মানুষ কেবল ভোগকারী নয়, বরং আখলাকের কাছে দায়বদ্ধ এক সৃজনশীল সত্তা।

 

তথ্য থেকে চরিত্র : জ্ঞানের আখলাকি পুনর্জাগরণ

আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আরেকটি অন্যতম গভীর ট্র্যাজেডি হলো—এটি জ্ঞানকে ক্রমশই এক প্রকার ‘পণ্য’ (commodity)-এ রূপান্তরিত করেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ক্যারিয়ার নির্মাণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে জ্ঞান আর কোনো “আখলাকি” বা অস্তিত্বগত রূপান্তরের মাধ্যম থাকে না; বরং হয়ে উঠে এক ধরনের বাজারজাত দক্ষতা। কিন্তু ইসলামী ওয়ার্ল্ডভিউতে ‘ইলম’ কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়—এটি এক গভীর আমানত, যা মানুষের সত্তা, চরিত্র ও জীবনবোধকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করে।

বর্তমান শিক্ষা-ব্যবস্থা মানুষকে এক প্রকার ‘তথ্য-আধার’-এ পরিণত করে, যেখানে জ্ঞান সঞ্চিত হয়, কিন্তু জীবন্ত হয়ে ওঠে না। তহা আবদুর রহমান এই অবস্থাকে অভিহিত করেছেন “বিযুক্ত জ্ঞান” (العلم المفصول) হিসেবে—এক ধরনের জ্ঞান যা মস্তিষ্কে অবস্থান করে, কিন্তু হৃদয়ে প্রবেশ করে না এবং আচরণে প্রতিফলিত হয় না। তাঁর মতে, যে জ্ঞান মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ ঘটাতে ব্যর্থ, তা প্রকৃত জ্ঞান নয়; বরং সেটি ‘জাহিলিয়াত’-এরই এক আধুনিক ছদ্মবেশ।

এই প্রেক্ষাপটে গাজালির ‘ইলম’ ও ‘আমল’-এর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং তহা আবদুর রহমানের আখলাকি জ্ঞানতত্ত্বকে সমন্বিত করে একটি ত্রিমাত্রিক শিক্ষা-মডেল নির্মাণ করা যেতে পারে—যা জ্ঞানকে তথ্য থেকে সত্তায় রূপান্তরের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করবে—

১. কগনিটিভ স্তর (জানা) :

এটি জ্ঞানের প্রাথমিক স্তর, যেখানে ব্যক্তি তথ্য সংগ্রহ করে। এখানে ‘সততা’ একটি ধারণা হিসেবে শেখা হয়; মুখস্থ করা হয় তার সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, বা উদাহরণ। এই স্তরটি মূলত স্মৃতিনির্ভর এবং বাহ্যিক।[27]তহা এটাকে বলেন “العقل المجرد” (Abstract Reason) বা বিযুক্ত বুদ্ধির স্তর। আর গাজালি একে … Continue reading

২. অ্যানালিটিক্যাল স্তর (বোঝা) :

এখানে জ্ঞান বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা লাভ করে। ব্যক্তি উপলব্ধি করতে শেখে কেন সততা অপরিহার্য এবং এর অনুপস্থিতিতে সমাজ কীভাবে ভেঙে পড়ে। ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায়, আখলাকের অবক্ষয় একটি সমাজের ‘আসাবিয়াহ’ বা সংহতিকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু এই স্তরের সীমাবদ্ধতা হলো—বোঝাপড়া থাকা সত্ত্বেও “ব্যক্তি” আচরণগত রূপান্তরে পৌঁছাতে পারে না।[28]এই স্তরের জ্ঞান তহা বলেন “العقل المسدد” (Directed Reason)। এটি যুক্তিবাদী, কিন্তু … Continue reading

৩. ট্রান্সফরমেটিভ স্তর (হওয়া) :

এখানেই জ্ঞানের প্রকৃত পূর্ণতা। তহা আবদুর রহমানের ভাষায় এটি ‘তাযকিয়া’—অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি ও অন্তর রূপান্তর। এই স্তরে জ্ঞান আর বাহ্যিক কোনো উপাদান থাকে না; বরং সেটি পরিণত হয় ব্যক্তি-সত্তার অংশে। ‘সততা’ তখন আর একটি শেখা ধারণা নয়—ব্যক্তি নিজেই হয়ে ওঠে ‘সৎ’। এখানেই একীভূত হয়ে পড়ে—জ্ঞান (knowledge) ও সত্তা (being)।[29]তহা একে বলেন “العقل المؤيد” (Supported/Inspired Reason)। এটি সেই জ্ঞান যা আত্মশুদ্ধি বা … Continue reading

এই রূপান্তরমূলক জ্ঞানের জন্য অবশ্যক একটি উপাদান হলো জবাবদিহিতার চেতনা—যাকে কুরআনের পরিভাষায় বলা হয় ‘তাকওয়া’। জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দায়িত্বে রূপ নেয়।[30]এটাই তহার “الائتمانية” বা আমানতদারি দর্শনের মূল কথা। কোনো সত্য জানা মানেই সেই সত্যকে ধারণ, প্রচার এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করা। অন্যথায়, জ্ঞান নিছক তথ্য হয়ে থাকে—যা মানুষকে যান্ত্রিক করে তোলে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, তথ্য যদি আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে মানুষ ধীরে ধীরে ‘রোবট’-সদৃশ সত্তায় পরিণত হয়ে পড়ে—যেখানে দক্ষতা আছে, কিন্তু উদ্দেশ্য নেই; ক্ষমতা আছে, কিন্তু দায়িত্ববোধ নেই। বিপরীতে, জ্ঞান যখন আখলাকের সাথে সংযুক্ত হয়, তখন মানুষ হয়ে উঠে ‘খলিফা’—আত্মপ্রকাশ করে এক দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে।

উদাহরণস্বরূপ, একজন চিকিৎসকের কথা ধরা যাক—তার অ্যানাটমি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান যদি কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা আংশিক জ্ঞান। কিন্তু যখন সেই জ্ঞানের সাথে রোগীর জীবনের প্রতি মমত্ববোধ, দায়িত্ব ও আখলাকি অঙ্গীকার যুক্ত হয়, তখনই তার জ্ঞান ‘রূপান্তরিত জ্ঞান’-এ পরিণত হয়।[31]যখন একজন চিকিৎসকের ‘অ্যানাটমি’র জ্ঞান ‘মমত্ববোধ’-এর সাথে মিশে যায়, … Continue reading

এই অর্থে, তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে জ্ঞান এক আলোকস্বরূপ—যা কেবল মস্তিষ্ককে আলোকিত করে না, বরং মানুষের অন্তর, চরিত্র ও কর্মকে উজ্জ্বল করে তুলে। এই transformative knowledge-ই পারে একটি স্থবির বা মৃতপ্রায় সভ্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে—কারণ এটি মানুষকে কেবল তথ্য দিয়েই থেমে থাকে না, পাল্টেও দেয়।

 

ইজতিহাদ : বৌদ্ধিক স্থবিরতা ভাঙার মাস্টার-কি

“ইজতিহাদ” ধারণাটিই মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্রীয় শক্তি হতে পারে। এটি কেবল একটি ফিকহী টুল নয়; বরং একে বুঝতে হবে একটি সভ্যতাগত গতিশীলতার নীতি (principle of intellectual dynamism) হিসেবে।[32]আল্লামা ইকবাল একে অভিহিত করেছেন The Principle of Movement হিসেবে। প্রচলিত ধারণায় ইজতিহাদকে প্রায়ই সীমাবদ্ধ করা হয় কিছু আংশিক আইনি প্রশ্নে—যেমন ইবাদতের সূক্ষ্ম পার্থক্য বা খাদ্যবিধান। কিন্তু এই সংকীর্ণতা ইজতিহাদের প্রকৃত শক্তিকে আড়াল করে। বাস্তবে, ইজতিহাদ হলো এমন এক ‘মাস্টার-কি’—যার মাধ্যমে একটি সভ্যতা নিজের চিন্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে, সময়ের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং নতুন বাস্তবতায় নিজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক অবস্থান পুনর্নির্মাণ করে।

চিরাচরিত সংজ্ঞায় ইজতিহাদ বলতে বোঝায় শরীয়াহর উৎসসমূহ—কুরআন ও সুন্নাহ—থেকে আইনি বিধান আহরণ। কিন্তু সমকালীন জটিলতা—প্রযুক্তি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক কাঠামো, জ্ঞানতত্ত্বের রূপান্তর—এই সবকিছুই এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কেবল আইনি ইজতিহাদ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এক সম্প্রসারিত ইজতিহাদ—যা আইনের পাশাপাশি দর্শন (philosophy) ও পদ্ধতিবিদ্যা (methodology)-এর ক্ষেত্রেও সক্রিয় হবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির বৌদ্ধিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় আল্লামা ইকবালের চিন্তায়। তিনি দেখিয়েছেন, জগত নিজেই একটি গতিশীল প্রক্রিয়া—অতএব ইসলামী চিন্তাকাঠামোও স্থবির হতে পারে না। তাঁর ‘creative reasoning’-এর আহ্বান মূলত এটাই যে, আমরা কেবল অতীতের ফতোয়া পুনরাবৃত্তি করব না; বরং কুরআন ও সুন্নাহর চিরন্তন নীতিমালাকে নতুন প্রেক্ষাপটে পুনরায় প্রয়োগ করব—সাহসের সাথে, সৃজনশীলতার সাথে।

এই ধারায় তহা আবদুর রহমান একটি মৌলিক মাত্রা যোগ করেন। তাঁর মতে, ইজতিহাদ কেবল যুক্তির অনুশীলন বা আইনি কৌশল নয়; এটি হতে হবে আখলাকি ইজতিহাদ। অর্থাৎ কোনো বিধানের বাহ্যিক সঠিকতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার আখলাকি উদ্দেশ্য (moral telos)।[33]তহা দেখিয়েছেন যে, কোনো বিধান কেবল বাহ্যিকভাবে ‘সঠিক’ হলেই চলে না, তাকে … Continue reading তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই সত্যের দিকে যে, ইজতিহাদকে কেবল ফিকহের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রেও ইজতিহাদ অপরিহার্য। আমরা কীভাবে জ্ঞান অর্জন করি, বিজ্ঞান ও ওহীর সম্পর্ক কী, মানবিক বোধ ও প্রযুক্তিগত শক্তির সীমা কোথায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও ইজতিহাদের মাধ্যমেই পুনর্গঠিত হতে হবে।[34]তহা যুক্তি দেন যে, ফিকহী ইজতিহাদ কেবল ‘শাখা’ (Branches) নিয়ে কাজ করে, কিন্তু … Continue reading

এই প্রেক্ষাপটে ‘সম্প্রসারিত ইজতিহাদ’-এর কিছু বাস্তব ক্ষেত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও বায়ো-এথিক্স:

এখানে প্রশ্ন কেবল ‘হালাল-হারাম’ নয়; বরং ‘মানুষ’ হওয়ার অর্থ কী, মানবিক মর্যাদার সীমা কোথায়, এবং প্রযুক্তি কি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করছে—এসব প্রশ্নে একটি দার্শনিক ইজতিহাদ প্রয়োজন।

২. গ্লোবাল অর্থনীতি:

সুদমুক্ত ব্যাংকিং কেবল সূচনা। প্রকৃত ইজতিহাদ হলো সম্পদ বণ্টনের ইনসাফ, শ্রমের মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের আখলাকি সমাধান নিয়ে চিন্তা করা। এ ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের শ্রমতত্ত্ব[35]ইবনে খালদুন স্পষ্টভাবে বলেছেন, “العمل هو أصل الكسب” (শ্রমই হলো উপার্জনের মূল … Continue reading ও সামাজিক গতিশীলতার বিশ্লেষণ আমাদের একটি গভীর ভিত্তি প্রদান করতে পারে।

৩. রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতি:

এখানে অন্ধ অনুকরণ না করে ‘শুরা’ ও ‘আদল’-এর ভিত্তিতে একটি সমকালীন প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণই হবে প্রকৃত ইজতিহাদ। এটি হবে না কেবল গণতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের প্রতিলিপি; এটি হবে একটি আখলাকি-রাজনৈতিক পুনর্গঠন।[৩৬]

এই সম্প্রসারিত ইজতিহাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভের ওপর—ইবনে খালদুন আমাদের শেখান বাস্তবতার সামাজিক নিয়ম (social laws) বুঝতে; আল্লামা ইকবাল আমাদের চিন্তায় গতিশীলতা ও সৃজনশীল সাহস জাগিয়ে তোলেন; এবং তহা আবদুর রহমান নিশ্চিত করেন যে, আমাদের প্রতিটি বৌদ্ধিক প্রয়াস যেন আখলাকের শেকড় থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়ে।

ফলে, ‘সম্প্রসারিত ইজতিহাদ’ মানে পুরনো ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ না করে সেই ঐতিহ্যের আলোকেই নতুন বাস্তবতার অন্ধকারে পথ খুঁজে নেওয়া। এটি কেবল মুফতিদের একক দায়িত্ব নয়; বরং এটি আলেম, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের সম্মিলিত এক বৌদ্ধিক জিহাদ—যেখানে জ্ঞান কেবল সংরক্ষিত হয় না, বরং পুনরুজ্জীবিত হয়; এবং সভ্যতা কেবল টিকে থাকে না, বরং নতুন প্রাণ লাভ করে।[36]আল্লামা ইকবাল তাঁর লেকচারে প্রস্তাব করেছিলেন যে, বর্তমান যুগে ইজতিহাদ … Continue reading

 

তহা ও বিন নাবি : আখলাকি আধুনিকতা ও সভ্যতার পুনর্গঠন

মালেক বিন নাবির চিন্তার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও অস্বস্তিকর সত্যগুলোর একটি হলো—সমস্যা কেবল ‘উপনিবেশ’ (colonization) নয়; বরং তার চেয়েও গভীর হলো আমাদের অন্তর্গত ‘উপনিবেশযোগ্যতা’ (colonizability)। এই ধারণা—কাবিলিয়্যাতুল ইস্তি‘মার—কেবল একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ভাবলে ভুল হবে; এটি মূলত একটি সভ্যতার আত্মারোগ নির্ণয়—যেখানে সমাজের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতাই বহিরাগত আধিপত্যের পথ প্রশস্ত করে।[37]তিনি شروط النهضة ও في مهب المعركة গ্রন্থ দুটিতে বিস্তারিত আলাপ করেছেন।

মালেক বিন নাবি প্রচলিত ‘ভিকটিম-ন্যারেটিভ’-কে চ্যালেঞ্জ করে দেখান, আমরা প্রায়ই আমাদের পশ্চাৎপদতার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিকেই একমাত্র দায়ী করি, অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গি আংশিক এবং আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিকতা একটি ফল (effect), মূল কারণ (cause) নয়। প্রকৃত কারণ হলো—একটি সমাজের অভ্যন্তরে সভ্যতা-গঠনকারী উপাদানগুলোর অবক্ষয়: আদর্শের ক্ষয়, আখলাকের দুর্বলতা এবং সৃজনশীল শক্তির নিঃশেষ।

এই বিশ্লেষণকে বোঝার জন্য একটি শক্তিশালী উপমা ব্যবহার করা যায়—ইমিউনিটি-র উপমা। যেমন একটি শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে সামান্য জীবাণুও তাকে আক্রান্ত করতে পারে, তেমনি একটি সমাজ তার ‘সভ্যতাগত ইমিউনিটি’ হারালে বহিরাগত শক্তির জন্য তা সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে, শত্রুর শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের দুর্বলতা।

এই প্রেক্ষাপটে বিন নাবির আরেকটি মৌলিক বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—সভ্যতা কখনো আমদানি করা যায় না।[38]এই সত্যটি বিন নাবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। তিনি একে “التكديس” বা … Continue reading আমরা যদি প্রযুক্তি, অবকাঠামো, কিংবা শিক্ষা-ব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ অন্য সভ্যতা থেকে গ্রহণও করি, তবুও আমরা প্রকৃত অর্থে ‘সভ্য’ হয়ে উঠতে পারব না। কারণ আমরা তো তখন কেবল ‘বস্তু’ (objects) স্থানান্তর করছি, কিন্তু সেই বস্তু উৎপাদনের অন্তর্নিহিত রূহ, সৃজনশীলতা ও আখলাকি শক্তিকে আত্মস্থ করছি না।

তাঁর বিখ্যাত সূত্র—মানুষ+মাটি+সময়—এই সত্যকেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু এই সমীকরণ তখনই কার্যকর হয়, যখন এর সাথে যুক্ত হয় একটি শক্তিশালী ধর্মীয় আদর্শ (religious idea), যা মানুষের চেতনা ও কর্মকে এক অভিন্ন উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করে। এই আদর্শই ‘জড়’ উপাদানগুলোকে ‘জীবন্ত’ সভ্যতায় রূপান্তরিত করে।

এই বিশ্লেষণের আলোকে, বিন নাবি আমাদের সামনে একটি আত্মসমালোচনামূলক ও রূপান্তরমুখী কর্মসূচি উপস্থাপন করেন।

১. Passive থেকে Active হওয়া:

একটি পরনির্ভর ভোক্তা-মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীল উৎপাদক (creative producer) হওয়া। অন্যের ধারণা কেবল গ্রহণ করেই থেমে থাকা নয়, বরং নতুন ধারণা নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করা।[39]বিন নাবির পরিভাষা হলো الفعالية।

২. আখলাকি শক্তির পুনর্গঠন:

আখলাক যদি কেবল ব্যক্তিগত গুণ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি সভ্যতা গড়তে পারে না। কিন্তু আখলাক যখন একটি সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়, তখনই সমাজ তার ‘উপনিবেশযোগ্যতা’ অতিক্রম করে।[40]বিন নাবির পরিভাষা হলো التوجيه الأخلاقي।

৩. আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার:

নিজস্ব ঐতিহ্যের শিকড় থেকে শক্তি গ্রহণ করে সমকালীন বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। এটি অতীতে ফিরে যাওয়া নয়; বরং অতীতকে জীবন্ত করে বর্তমানকে রূপান্তরিত করা।[41]বিন নাবির পরিভাষা হলো الأصالة।

এই জায়গাতেই তহা আবদুর রহমানের ‘আখলাকি আধুনিকতা’ এবং মালেক বিন নাবীর ‘সভ্যতা মেকানিক্স’ এক গভীর সমন্বয়ে উপনীত হয়। বিন নাবী আমাদের দেখান—সভ্যতা কীভাবে কাজ করে, তার গঠনমূলক উপাদান কী; আর তহা আবদুর রহমান দেখান—এই কাঠামোর ভেতরে আখলাকি প্রাণ কীভাবে সঞ্চার করতে হয়।

ফলে, প্রকৃত মুক্তি কেবল ভূখণ্ডগত স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা শুরু হয় মানসিক মুক্তি দিয়ে। শত্রুকে বহিষ্কার করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ভেতরকার ‘দাসত্ব’কে উৎখাত করা। যখন একটি জাতি তার চিন্তায় স্বাধীন হয়, আখলাকে দৃঢ় হয়, এবং সৃজনশীলতায় হয় সক্রিয়—তখনই সে ‘ঘুমন্ত সভ্যতা’ থেকে ‘জাগ্রত সভ্যতা’-য় উত্তীর্ণ হতে পারে।

 

ইনতিজাম থেকে ইমারত : সভ্যতা নির্মাণের ধাপসমূহ

এখন প্রশ্নটি কেবল তত্ত্ব নির্মাণের পরিবর্তে সেই তাত্ত্বিক স্থাপত্যকে বাস্তবতার মাটিতে রোপণ করার। একটি সভ্যতার পুনর্জাগরণ কখনোই আকস্মিক কোনো বিস্ফোরণ কিংবা নিছক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ফল না। এটি একটি দীর্ঘ, জৈবনিক (organic) রূপান্তরপ্রক্রিয়া—যা মানুষের অন্তর্জগৎ থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে সামাজিক ও সভ্যতাগত পরিসরে রূপ লাভ করে। মালেক বিন নাবী, তহা আবদুর রহমান এবং ইবনে খালদুনের চিন্তার নির্যাসে নির্মিত এই চার-স্তরের রোডম্যাপ মূলত সেই টেকসই রূপান্তরেরই একটি সুসংবদ্ধ নকশা।

প্রথম স্তর: ব্যক্তি (The Individual — আত্ম-শৃঙ্খলা ও নৈতিক জাগরণ)

সবকিছুর সূচনা ঘটে ব্যক্তিমানুষ থেকে। মালেক বিন নাবীর ভাষায়, মানুষই সভ্যতার মৌলিক একক; আর তহা আবদুর রহমানের পরিভাষায়, এই স্তরটি ‘আধ্যাত্মিক আধুনিকতা’র ভিত্তি। যখন ব্যক্তির অন্তরে ‘আমানাহ’ ও ‘মাসউলিয়্যাহ’-এর চেতনা জাগ্রত হয়, তখন সে কেবল একটি সমাজের সদস্য থাকে না—সে হয়ে ওঠে একটি civilizational agent। এখানে মূল কাজ হলো আত্ম-শৃঙ্খলা ও আখলাকি সচেতনতা (ethical consciousness) গঠন করা। এই ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী সব স্তরই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয় স্তর: শিক্ষা (The Education — সমন্বিত জ্ঞানব্যবস্থা)

এই স্তরে এসে শুরু হয় ‘দ্বৈততা ভাঙার’ প্রকৃত কাজ। তহা আবদুর রহমানের ‘জ্ঞানের ইনতিজাম’ ধারণা অনুসারে, জ্ঞানকে আর বিচ্ছিন্ন খণ্ডে ভাগ করে দেখা যাবে না। বিজ্ঞান (science) ও আখলাক (ethics), আকল (reason) ও ওহী (revelation)—এগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পুনর্গঠন করতে হবে। এর অর্থ হলো এমন একটি কারিকুলাম নির্মাণ, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতাও আখলাকি উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একজন প্রকৌশলী কেবল সেতু নির্মাণের প্রযুক্তি জানবে না; বরং তার নির্মাণে কাজ করবে ‘আদল’-এর চেতনা। এখানে শিক্ষা কেবল পেশা না—একটি আখলাকি-জ্ঞানতাত্ত্বিক গঠনপ্রক্রিয়াও।

তৃতীয় স্তর: সমাজ (The Society — ইনসাফ, আমানাহ ও আখলাকি ইকোসিস্টেম)

এই স্তরে ব্যক্তিগত আখলাক রূপ নেয় সামাজিক শক্তিতে। ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় দেখিয়েছেন, একটি সমাজ তখনই টেকসই হয়, যখন তার মধ্যে ‘আসাবিয়াহ’—অর্থাৎ সামাজিক সংহতি—দৃঢ় থাকে। তহা আবদুর রহমান এই সংহতিকে আরও গভীর করেন ‘trust culture’-এর ধারণার মাধ্যমে, যেখানে সমাজ কেবল আইনের শাসনে নয়, বরং পারস্পরিক “আমানাহ” (mutual trust) ও ‘ইহসান”-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে কাজটি হলো একটি moral ecosystem তৈরি করা—যেখানে সৎকর্ম করা সহজ, আর অসৎকর্ম করা কঠিন। তাহলে ইনসাফ তখন কেবল আইনি কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে পরিণত হবে সামাজিক চেতনার অংশে।

চতুর্থ স্তর: সভ্যতা (The Civilization — বৌদ্ধিক স্বায়ত্তশাসন ও আখলাকি আধুনিকতা)

এই স্তরটি পূর্ববর্তী তিন স্তরের সমন্বিত ফলাফল। যখন ব্যক্তি হয় আখলাকের চেতনায় রূপান্তরিত ও শিক্ষা সমন্বিত এবং সমাজ হয় আস্থাভিত্তিক—তখনই একটি জাতি বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব কণ্ঠে কথা বলতে সক্ষম হয়। এখানেই জন্ম নেয় বৌদ্ধিক সার্বভৌমত্ব (intellectual sovereignty)। তহা আবদুর রহমানের ভাষায়, এটিই ‘রূহুল হাদাছা’—একটি এমন আধুনিকতা, যা যান্ত্রিক অনুকরণ নয়; বরং আখলাক, মানবমর্যাদা এবং স্রষ্টার সার্বভৌমত্বকে ধারণ করে। এখানে একটি জাতি আর অন্যের কাঠামো ধার করে না; বরং নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে বিশ্বকে নতুন পথনির্দেশনা দেয়।

অতএব, এই চার-স্তরের রোডম্যাপ আমাদের একটি মৌলিক সত্যের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়—সভ্যতার পুনর্জাগরণ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা তথ্যভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব নৈতিকভাবে রূপান্তরিত মানুষ গঠনের মাধ্যমে।

ইবনে খালদুন আমাদের শেখান বাস্তবতার নিয়ম, মালেক বিন নাবী উন্মোচন করেন সভ্যতার অভ্যন্তরীণ যন্ত্রকাঠামো, তহা আবদুর রহমান নির্ধারণ করেন আখলাকের দিকনির্দেশনা এবং আল্লামা ইকবাল সেই কাঠামোর ভেতর সঞ্চার করেন এক সৃজনশীল প্রাণ।

শেষ পর্যন্ত, উম্মাহর পুনর্জাগরণ কোনো বিমূর্ত স্বপ্ন থাকে না; এটি হয়ে উঠে একটি আখলাকি-অস্তিত্বগত দায়িত্ব। আর তখন আমাদের কর্তব্য প্রতিফলিত হয় তিনটি স্তরে —বোঝা (to understand), আখলাকি হওয়া (to become ethical), এবং নতুনভাবে নির্মাণ করা (to reconstruct)। এই ত্রয়ীর সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে এক জাগ্রত, সৃজনশীল এবং আখলাকের পাটাতনে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 তহা আবদুর রহমান “تجديد المنهج في تقويم التراث” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মুসলিমরা এখন ‘প্যারাসাইটিক থিঙ্কিং’ বা পরজীবী চিন্তায় আক্রান্ত।
2 তহা বলেন:

“إن العقل الإسلامي المعاصر عقل مستقيل”

অর্থাৎ, সমকালীন মুসলিম আকল মূলত একটি ‘ইস্তফা দেওয়া’ বা নিষ্ক্রিয় আকল।

3 روح الحداثة গ্রন্থে তহা দেখিয়েছেন যে, সমকালীন মুসলিম মানস পশ্চিমের ‘তৈরি করা’ (Ready-made) আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে গিয়ে নিজের বিচারবুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়েছে। তিনি একে বলেন “التبعية الفكرية”।
4 তহা বলেন:

“إننا استوردنا نواتج الحداثة ولم نستورد روحها”

অর্থাৎ, আমরা আধুনিকতার উৎপাদিত পণ্য আমদানি করেছি, কিন্তু তার আত্মা আমদানি করিনি।

5 তহা দেখিয়েছেন যে, ঐতিহ্যবাদীরা ঐতিহ্যের ‘আক্ষরিক’ (Literal) অনুকরণে মত্ত, কিন্তু ঐতিহ্যের “মাকাসিদ” বা ‘রূহ’  পুনর্গঠনে ব্যর্থ। একে তিনি নাম দেন “الجمود التراثي”। তিনি বলেন:

“التقليد في التراث هو تكرار للأجوبة القديمة لأسئلة لم تعد قائمة”

অর্থাৎ, ঐতিহ্যের অন্ধ অনুকরণ হলো—অস্তিত্বহীন প্রশ্নের জন্য পুরনো উত্তরের পুনরাবৃত্তি করা।

6 তহা একে একটি চমৎকার রূপকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন: “এতিম আকল”। অর্থাৎ, যে আকলের কোনো নিজস্ব অভিভাবকত্ব বা ভিত্তি নেই। তিনি বলেন:

“الإبداع واجب أخلاقي، والتقليد سلب للأمانة”

অর্থাৎ, সৃজনশীলতা একটি নৈতিক দায়িত্ব, আর অনুকরণ হলো আমানতের খেয়ানত।

7 এখানে আল্লামা ইকবালের “Reconstruction” এবং তহা আবদুর রহমানের “التبيئة”  তত্ত্বের মিলন ঘটেছে।
8 তহা একে বলেন আধুনিকতার সেই সৃজনশীল চেতনা যা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নয়, বরং বিশ্বজনীন (যেমন: বৈজ্ঞানিক নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা)।
9 এটি হলো সেইসব অনৈসর্গিক জীবনদর্শন যা মানুষের ফিতরাত বা নৈতিকতার বিরোধী। তহা একে “التبعية” (পরনির্ভরশীলতা) হিসেবে বর্জনের নির্দেশ দেন।
10 এটি তহার দর্শনের অনন্য উদ্ভাবন। তিনি বলেন, বাইরের জ্ঞানকে সরাসরি ‘ইমপোর্ট’ না করে তাকে নিজস্ব ঐতিহ্যের মাটিতে ‘রোপণ’ করতে হবে। তহার ভাষায়: “لا حداثة بلا أخلاق”।
11 বিন নাবি বলেন:

“الحضارة هي التي تلد منتجاتها” অর্থাৎ সভ্যতা নিজেই নিজের প্রয়োজনীয় পণ্য ও ধারণা জন্ম দেয়।

12 আল্লামা ইকবাল বলেন:

“The spirit of Islamic culture is a constant struggle for creative freedom.”

13 এখানে তহা আবদুর রহমানের ‘তাকউইম’ বা ব্যবচ্ছেদ তত্ত্বটি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। তহা বলেন, কোনো জ্ঞান বা আদর্শ যখন এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় যায়, তখন তার সাথে সেই সভ্যতার ‘ঐতিহাসিক বোঝা’ ও ‘দার্শনিক বিষ’ যুক্ত থাকে। তিনি একে বলেন “الخلفية الفلسفية” (দার্শনিক প্রেক্ষাপট)।
14 মালেক বিন নাবির ‘আখলাকি ইমিউনিটি’ এবং তহার ‘আমানতদারি দর্শন’ এখানে প্রাসঙ্গিক।
15 এটা ইসমাইল রাজি আল-ফারুকীর ‘Islamization of Knowledge’ এবং তহার ‘তবিয়্যাহ’ (التبيئة) ধারণার মিলনস্থল।
16 ইকবাল একে বলেছেন ‘Creative Assimilation’।
17 ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে এই বিভাজন কীভাবে আমাদের ওপর আরোপিত হয়েছে, তার দলিল পাওয়া যায় মালেক বিন নাবির “وجهة العالم الإسلامي” গ্রন্থে। তিনি দেখিয়েছেন যে, ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা (Colonial Education) পরিকল্পিতভাবে মুসলিম মানসে একটি ‘মানসিক সিজোফ্রেনিয়া’ তৈরি করেছে।
18 তহা এই খণ্ডিত জ্ঞানব্যবস্থাকে “المعرفة المنشطرة” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
19 ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের ফলে সৃষ্ট এই বিভাজনকে তহা আবদুর রহমান তাঁর “بؤس الدهرانية” গ্রন্থে কঠোরভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সেকুলারিজম বা ‘দাহরানিয়্যাহ’ কেবল রাজনীতি ও ধর্মের বিচ্ছেদ নয়, বরং এটি হলো “আখলাক থেকে ধর্মের বিচ্ছেদ’। তিনি একে বলেন “الخروج من الائتمانية”।
20 ইকবাল একে বলেছেন ‘Organic Unity’। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলামী শিক্ষায় জড় ও আত্মার কোনো বিভাজন নেই। এমনকি একটি জাগতিক রাষ্ট্র পরিচালনাও যদি আল্লাহর ইবাদত বা ‘আমানাহ’ হিসেবে করা হয়, তবে তা ‘রিলিজিয়াস’ বা দ্বীনি কাজ হিসেবে গণ্য।
21 তহা আবদুর রহমান তাঁর প্রধান কাজগুলোতে الانتظام المعرفي শব্দবন্ধটি হুবহু এই টেকনিক্যাল ফর্মে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি যে শব্দটি ব্যবহার করেন এবং যার মাধ্যমে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হলো النظم المعرفي অথবা النسق المعرفي। তিনি যখন জ্ঞানের ইনতিজাম নিয়ে কথা বলেন, তখন মূলত তিনটি ধারণার সমন্বয় করেন:

১. التكامل المعرفي— অর্থাৎ ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সংহতি’। তিনি মনে করেন জ্ঞান বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়, বরং শরীয়াহ, দর্শন এবং তাসাউফ—এই তিনের পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়ই হলো আসল বিন্যাস।

২. النسق الأخلاقي—তিনি ‘ইনতিজাম’ বলতে বোঝান জ্ঞানের এমন এক কাঠামো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে আখলাক।

৩. الابتذال المعرفي—তিনি আধুনিক সেকুলার জ্ঞানতত্ত্বকে ‘ইবতিদাল’ বা বিশৃঙ্খলা ও সস্তা অনুকরণ বলেন। এর বিপরীতে তিনি ‘আল-ইবদা’ বা সৃজনশীল বিন্যাসের কথা বলেন।

তহার দর্শনে এই  ‘ইনতিজাম’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, বুদ্ধি কেবল চিন্তা করা নয়, বরং চিন্তাগুলোকে একটি আখলাকি শৃঙ্খলায় সাজানো। তিনি ‘রুহুল হাদাছা’-তে লিখেছেন:

“إن العقلانية التي ندعو إليها هي عقلانية موصولة بالقيم، منظومة بضوابط الشرع.”

এখানে তিনি ‘মানজুমাহ’ (منظومة) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এটা মূলত ‘ইনতিজাম’ বা ‘নাযম’-এর সমার্থক। এই ইনতিজামের তিনটি প্রক্রিয়াও দিয়েছেন:

১. المستوى العباري—গভীর অর্থ উপলব্ধি।

২. المستوى الإشاري—গভীর ইঙ্গিত উপলব্ধি।

৩. المستوى الاستبصاري—সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন।

ওয়ায়েল হাল্লাকসহ তহার অন্যান্য অনুসারী গবেষকগণ তাঁর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেলকেই “ইনতিজামুল মারিফি” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

22 তহা এটাকে বলেন “একটি রুগ্ন আধুনিকতা”।
23 তহা প্রচলিত ‘সেকুলারিজম’-এর বিপরীতে “الائتمانية” (আল-ই’তিমানিয়্যাহ) বা আমানতদারি দর্শন প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, রাজনীতি বা অর্থনীতি আল্লাহর সাথে মানুষের যে আদি অঙ্গীকার, তার অংশ।
24 এইটা তহার “سؤال الأخلاق” গ্রন্থের সারাংশ।
25 তহা প্রচলিত পাশ্চাত্য ‘Reason’ কে ‘العقل المجرد’ (বিযুক্ত আকল) বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একে বলেন এমন এক বুদ্ধি যা কেবল বস্তুগত লাভ-ক্ষতি বোঝে কিন্তু নৈতিকতা বোঝে না। এর পরিবর্তে তিনি “العقل المؤيد”  বা ওহী ও আখলাক দ্বারা সমর্থিত বুদ্ধির কথা বলেন।
26 সূরা আন’আমের ১৬২ নম্বর আয়াতটাই ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের ‘Unity of Knowledge’ (জ্ঞানের একত্ববাদ)-এর চূড়ান্ত দলিল। আল্লামা ইকবাল দেখিয়েছেন যে, ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে ‘পবিত্র’ (Sacred) এবং ‘অপবিত্র’ (Profane) বলে আলাদা কোনো জগত নেই। তহা এটাকেই ব্যক্ত করেন “تزكية المعرفة” বা জ্ঞানের তাজকিয়া নামে। যখন জ্ঞান বাজার, রাষ্ট্র বা ল্যাবরেটরিতে আখলাকের সাথে যুক্ত হয়, তখনই সেটা প্রকৃত ‘তাওহীদ’-এর প্রতিফলন ঘটায়।
27 তহা এটাকে বলেন “العقل المجرد” (Abstract Reason) বা বিযুক্ত বুদ্ধির স্তর। আর গাজালি একে বলেছেন “علم اللسان”। এটি কেবল মুখে উচ্চারিত হয় বা কাগজে সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে না। এটি কেবল তথ্যের (Information) স্তরেই সীমাবদ্ধ।
28 এই স্তরের জ্ঞান তহা বলেন “العقل المسدد” (Directed Reason)। এটি যুক্তিবাদী, কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ যতক্ষণ না তা চরিত্রে প্রতিফলিত হয়।
29 তহা একে বলেন “العقل المؤيد” (Supported/Inspired Reason)। এটি সেই জ্ঞান যা আত্মশুদ্ধি বা ‘তাযকিয়া’ (تزكية)-র মাধ্যমে অর্জিত হয়। গাজালির ভাষায় এটিই হলো “العلم الحقيقي” (Real Knowledge), যার ফল হলো আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) এবং চারিত্রিক সৌন্দর্য।
30 এটাই তহার “الائتمانية” বা আমানতদারি দর্শনের মূল কথা।
31 যখন একজন চিকিৎসকের ‘অ্যানাটমি’র জ্ঞান ‘মমত্ববোধ’-এর সাথে মিশে যায়, তখন সেটি কেবল ইলম থাকে না, হয় উঠে  ‘হিকমাহ’।
32 আল্লামা ইকবাল একে অভিহিত করেছেন The Principle of Movement হিসেবে।
33 তহা দেখিয়েছেন যে, কোনো বিধান কেবল বাহ্যিকভাবে ‘সঠিক’ হলেই চলে না, তাকে অবশ্যই তার আখলাকি উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। একে তিনি বলেন “المقاصدية الأخلاقية”।
34 তহা যুক্তি দেন যে, ফিকহী ইজতিহাদ কেবল ‘শাখা’ (Branches) নিয়ে কাজ করে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন ‘মূল’ (Roots) বা পদ্ধতিবিদ্যা নিয়ে ইজতিহাদ করা।
35 ইবনে খালদুন স্পষ্টভাবে বলেছেন, “العمل هو أصل الكسب” (শ্রমই হলো উপার্জনের মূল ভিত্তি)। তিনি কৃত্রিমভাবে অর্থ উপার্জনের (যেমন অতিরিক্ত ফাটকা বা সুদ) চেয়ে শ্রমভিত্তিক উৎপাদনশীলতাকে সভ্যতার স্থায়ীত্বের শর্ত বলেছেন।
36 আল্লামা ইকবাল তাঁর লেকচারে প্রস্তাব করেছিলেন যে, বর্তমান যুগে ইজতিহাদ কোনো একক ব্যক্তির কাজ হওয়া কঠিন; বরং এটি হতে হবে একটি ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা বিশেষজ্ঞ দলের কাজ, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের পণ্ডিতরা ইসলামের মূলনীতির আলোকে সমাধান খুঁজবেন।
37 তিনি شروط النهضة ও في مهب المعركة গ্রন্থ দুটিতে বিস্তারিত আলাপ করেছেন।
38 এই সত্যটি বিন নাবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। তিনি একে “التكديس” বা ‘স্তূপীকরণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
39 বিন নাবির পরিভাষা হলো الفعالية।
40 বিন নাবির পরিভাষা হলো التوجيه الأخلاقي।
41 বিন নাবির পরিভাষা হলো الأصالة।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments