কিংবদন্তীর চোখে ঈসা খান (পর্ব-১)

‘দেওয়ান ইশাখাঁ মসনদালি’ পালায় ঈসা খানের জীবনের চিত্রায়ন

মাহমুদ আহমাদ

পালাগান কী?

পালাগান হলো কাহিনীমূলক লোকগীতি। পালাগান প্রধানত পৌরাণিক ও লৌকিক আখ্যান নিয়ে রচিত। পালাগানে প্রস্তাবনা ও ভূমিকা থাকে। এতে গদ্যের অংশ থাকে কম এবং তত্ত্বব্যাখ্যা, শ্লোক ও দীর্ঘ গানের সংখ্যা থাকে বেশি। পালাগানের কবিকে বলা হয় পদকর্তা বা অধিকারী।

পালাগানে একজন মূল গায়েন বা বয়াতি থাকেন। তিনি দোহারদের সহযোগে গান পরিবেশন করেন। এ গান কাহিনীমূলক হওয়ায় তা কথোপকথন আকারে পরিবেশিত হয়। এ ক্ষেত্রে মূল গায়েনই বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেন। কখনও কখনও দোহাররা তাকে এ কাজে সাহায্য করে।

পালাগানের উৎসভূমি ময়মনসিংহ। সেখানকার গীতিকাগুলিকে সাধারণভাবে পালা বলা হয়। পূর্ব ময়মনসিংহের অনেক বাস্তব ঘটনা নিয়েও প্রচুর পালাগীতিকা রচিত হয়েছে। কাহিনীর মনোরম বর্ণনা ও জীবনমুখী চরিত্রাঙ্কন এসব পালাগানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং এর রচয়িতাগণ অসাধারণ কবিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। গ্রামের অমার্জিত ভাষা, লোকগীতির রাগিণীভিত্তিক ছন্দ এবং আঞ্চলিক শব্দে এই পালাগুলি রচিত। পালাগুলি যারা রচনা করেছেন তাদের সবার নাম পাওয়া যায়নি, মাত্র কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে; যেমন  মনসুর বয়াতি (দেওয়ানা মদিনা), ফকির ফৈজু (ছুরত জামাল ও অধূয়া সুন্দরী), দ্বিজ কানাই,  চন্দ্রাবতী, দ্বিজ ঈশান, সুলাগাইন (মহিলা) ইত্যাদি। উল্লিখিত পালাগানগুলির মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজের অনেক চিত্র ফুটে উঠেছে। দীনেশচন্দ্র সেনের প্রচেষ্টায় মৈমনসিংহ-গীতিকা পূর্ববঙ্গ-গীতিকা নামে কয়েক খন্ডে পালাগানগুলির সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে।[1]বাংলাপিডিয়া, পালাগান ভুক্তি দ্রষ্টব্য।

পালাগান কি ইতিহাসের প্রমাণ্য কোনো সূত্র? এই প্রশ্নের জবাব একটাই। কক্ষনো না। পালাগান হলো লোকমুখে প্রচলিত গল্পকাহিনীর ছন্দবদ্ধরূপ। পালাগান দিয়ে ঐতিহাসিক কোনো তথ্য প্রমাণ করা না গেলেও জনমানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য খুবই সহায়ক। ঐতিহাসিক কোনো চরিত্র সম্পর্কে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাবনা কেমন ছিলো, তারা বিষয়টিকে কীভাবে দেখতেন, এসব জানা যায় পালাগান থেকে। যেমন, ঈসা খান মসনদ-ই-আলা। রায়বাহাদুর ড. দিনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গ গীতিকার দ্বিতীয় খণ্ডে ‘দেওয়ান ইশা খাঁ মসনদালী’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ গাথা প্রকাশ করেছেন। তবে এসব লোকগাথা খুব প্রাচীন নয়; এগুলোয় যে ঈসা খানকে চিত্রিত করা হয়েছে, তিনি ইতিহাসের ঈসা খান নন, তিনি কিংবদন্তির ঈসা খান।

‘ইশাখাঁ দেওয়ানের পালা’র রচয়িতা কে ছিলেন, সে বিষয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। পূর্ববঙ্গ গীতিকার দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংখ্যায় রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, “ইশাখাঁ এবং তাঁহার বংশধরদিগের কীর্ত্তিকাহিনী অবলম্বনে বিরচিত মোট চারিটি পালাগান আমরা পাইয়াছি। কোনও অজ্ঞাতনামা কবি কর্তৃক সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত একটি পালা সর্বপ্রথমে সংগৃহীত হয়। কিঞ্চিদধিক একশত বৎসর পূর্ব্বে কিশোরগঞ্জ মহকুমার গলাচিপা গ্রামের মুনসী আবদুল করিম রচিত পালাটি আমাদের দ্বিতীয় সংগ্রহ এই পালাটি অনেকটা কল্পনামূলক বলিয়া মনে হয়। তৃতীয় পালাটি মুখ্যতঃ ইশাখাঁর পৌত্র মনুয়ার খাঁর জীবনী অবলম্বনে রচিত; ইহাতে প্রসঙ্গক্রমে ইশাখাঁর কথা আছে। চতুর্থটি এক অজ্ঞাতনামা মুসলমান লেখক-বিরচিত; পালার নাম ‘দেওয়ান ফিরোজ খাঁর গান’।”[2]পূর্ববঙ্গ গীতিকা, দীনেশচন্দ্র সেন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৩।

অনুমান করা যায়, সপ্তদশ শতকে অজ্ঞাতনামা কবির রচিত পালাটিই হলো ‘দেওয়ান ইশাখাঁ মসনদালী’। আবার এটাও হতে পারে যে, প্রথম দুটি পালার সমন্বয়ে একটি পালা তৈরি করা হয়েছে। তবে এটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। কারণ উনিবিংশ শতকে কিশোরগঞ্জের গলাচিপা গ্রামের আবদুল করিম রচিত পালাটি ড. সেন অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত বলে মত দিয়েছেন এবং এর অনেক মতকে তিনি অযৌক্তিক ও অপ্রমাণ্য প্রমাণ করেছেন।

পদ্য ও ছন্দ আকারে রচিত ‘দেওয়ান ইশাখাঁ মসনদালী’ পালাটিকে এখানে আমরা কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে গদ্য ভাষ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এবং প্রতিটি পালার পরে ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘটনাপর্ব বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। ‘দেওয়ান ইশাখাঁ মসনদালী’ মোট ১১ টি পালায় বিভক্ত। এখানে আমরা প্রথম কয়েকটি পালা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তাই—ইতিহাসের প্রামাণ্যতার বাইরে গিয়ে বাংলার জনমানুষের অবিসংবাদিত নেতা ও মোগলদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রধাণ প্রতিরোধযোদ্ধা সাধারণ মানুষের কাছে কেমন ছিলেন, ‘দেওয়ান ইশা খাঁ মসনদালী’ পালার ভাষ্য থেকে চলুন সেটা জেনে আসি।

 

পালা-১

পশ্চিমের কোনো এক দেশে ধনপৎ সিং নামের একজন রাজা বাস করতেন। তিনি  ছিলেন খুব শক্তিধর ও প্রচুর ধণসম্পদের অধিকারী। তার খাদেম সেবক ও দাস দাসীর কোনো অভাব ছিলো না। দিল্লির বাদশাহর সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। বিপদে আপদে তারা একে অন্যর পাশে থাকতেন। এই ধনপৎ রাজার বংশধর ছিলেন ভগীরথ নামের একজন শাসক। তিনি খুবই প্রজাবৎসল ছিলেন। প্রজাদের ভালোর জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দিতেও কসুর করতেন না।

একবার রাজা ভগীরথ তীর্থদর্শনে বাংলায় এলেন। দেশ-বিদেশের নানান যায়গা ঘুরে তিনি গৌড়ে পৌঁছলেন। সেখানে তখন গিয়াসুদ্দিন নামের একজন বাদশাহ শাসন করতেন। বাদশাহ গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। রাজদরবারে তাকে খুব সমাদর করা হলো। গৌড়ে নিজের এতো সমাদর দেখে তিনি সেখানেই থেকে গেলেন। একজন দেওয়ান হয়ে তিনি বাংলায় বসবাস করতে লাগলেন।

তার অধীনে প্রজারা খুবই শান্তিতে ছিলো। তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। সবাইকে তিনি আত্মজ মনে করতেন। ফলে প্রজাদের কাছে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করলেন।

তার বংশের ছেলে হলেন দেওয়ান কালিদাস। তিনি ‘জৈনউদ্দিন’-এর দেওয়ান হয়ে গৌড়ে বাস করতেন। তিনি ছিলেন খুবই সুদর্শন। রূপের কারণে তার বিশেষ খ্যাতি ছিলো। এর পাশাপাশি কালিদাস ছিলেন খুবই ধার্মিক। প্রতিদিন তিনি গরিব দুঃখী অভাবীদের দান করতেন। তার দরবার সময় সময় পণ্ডিত ফকিরদের দিয়ে পূর্ণ থাকতো। তিনি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই কাজ করতেন। প্রতিদিন তিনি একটা (স্বর্ণের) হাতি ব্রাহ্মণদের দান করতেন। তাই তার নাম হয়ে গেলো কালিদাস গজদানী। তিনি ছিলেন খুবই সরল মেজাজের মানুষ। হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে তিনি কোনো ভেদাভেদ করতেন না। সবাইকে তিনি সমান চোখে দেখতেন। তিনি প্রতি বছর দোল উৎসব দূর্গাপূজার আয়োজন করতেন। এই সব বিষয় তিনি কখনোই ভুলতেন না।

কালিদাস ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। দুনিয়ার তাবত জিনিস তার কাছে সঞ্চিত ছিলো। কেউ কোনো কিছু চাইতে গেলে তাকে খালি হাতে ফিরতে হতো না। দূর দেশ থেকে মেহমানরা এসে তার ঘরে আশ্রয় নিতো। তিনি তাদেরতে যত্ন করে আপ্যায়ন করতেন। তাদের পাতে খাবার তুলে না দিয়ে দেওয়ান কালিদাস নিজে খাবার মুখে তুলতেন না।

তখন গৌড়ের নবান ছিলেন বাহাদুর সাহেব। তিনি ছিলেন খুব ধর্মপরায়ন একজন শাসক। কিন্তু তার কোনো পুত্র ছিলো না। এই নিয়ে তার মনে দুঃখের সীমা ছিলো না। একদিন তিনি ইন্তেকাল করলেন। আল্লাহর মেহমান হয়ে গেলেন। তার পরে গৌড়ের শাসক হলেন নবাব জালালুদ্দিন। দেওয়ান কালিদাস গজদানী তার শাসনকালেই বাংলার কোনো এক অঞ্চলের দেওয়ান ছিলেন।

 

ইতিহাস নিরীক্ষা :

পদকর্তা এখানে ঈসা খানের বংশ-পরিচয় এবং তারা কী করে বাংলার অধিবাসী হলেন, সেই বিবরণ তুলে ধরেছেন। এই মতের সমর্থন আকবরনামাতেও পাওয়া যায়। ঈসা খানের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আকবরনামার রচয়িতা আবুল ফজল বলেছেন, “এই প্রধানের (ঈসা খান) পিতা বাইশ রাজপুত বংশভুক্ত ছিলেন। ভাটির মতো নদীবেষ্টিত অঞ্চলে তিনি অহংকার ও অবাধ্যতা প্রকাশ করতে থাকেন।”[3]আকবরনামা, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : 647।

ইতিহাস গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেছেন, “ঈসা খানের পিতা ছিলেন একজন রাজপুত বংশভুক্ত হিন্দু। তার নাম ছিলো কালিদাস গজদানী। বর্তমান ভারতের উত্তরপ্রদেশে বাইশওয়ারা পরগনায় রাজপুতদের বাইশটি গোত্র ছিল। তারা রাজস্থান থেকে এসে অযোধ্যার এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী জাতি। তাদের মধ্যে একটি গোত্রের জনৈক ধনপত সিংহের পুত্র ভগীরথ বাইশওয়ার থেকে ভাগ্যান্বেষণে বাংলায় এসে গৌড়ের সুলতানের দ্বারস্থ হন। সে সময় আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ছিলেন (১৪৯৩-১৫১৯) বাংলার সুলতান। তিনি ভগীরথকে দিওয়ান নিযুক্ত করলেন। ভগীরথের মৃত্যুর পর তার পুত্র কালীদাস দিওয়ানি লাভ করলেন।[4]মসনদ-ই-আলা ঈসা খান, মাহবুব সিদ্দিকী, পৃষ্ঠা : ১৪।

বাইশ রাজপুতদের পরিচয় নির্ধারণ করে ঢাকা মিউজিয়ামের (বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর) প্রথম কিউরেটর ও ইতিহাসবিদ এন. কে. ভট্টাশালী বলেছেন, “বাইশ রাজপুতদের ক্ষেত্রে বলা হয়—তারা উচের বাইসওয়ারা অঞ্চল থেকে আগত। এই নামটি উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক এলাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেশ কয়েকটি পরগণা (ঐতিহ্যগতভাবে বাইশটি), যা উন্নাও জেলার পূর্বাংশ, রায়বেরেলি জেলার পশ্চিমাংশ এবং লখনৌ জেলার দক্ষিণ অংশজুড়ে বিস্তৃত, এর মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার বর্গমাইল। ত্রয়োদশ শতকে বাইশ রাজপুতরা প্রথম এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বলা হয়, তারা ডেকানের মুঙ্গি-পাতান অঞ্চল থেকে এখানে এসেছিলো। এই অঞ্চলটির নাম হিন্দির পূর্বাঞ্চলীয় একটি উপভাষার নামকরণেও প্রভাব ফেলেছে। এখানকার মানুষ আজও সাহসিকতা এবং যুদ্ধবীরতার জন্য প্রসিদ্ধ। [5]Imperial Gazetteer, ‘Baiswara’, ১৯০৮, পৃষ্ঠা : 218।

ধনপত, ভগীরথ ও কালীদাসের মধ্যে কেমন সম্পর্ক ছিলো সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। পালায় উল্লিখিত বক্তব্য পাঠে অনুমিত হয় যে, তারা একে অন্যের বংশধর ছিলেন, তবে তাদের মধ্যে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ছিলো না। পূর্ববঙ্গ গীতিকার দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংখ্যার ভূমিকায় ড. দীনেশচন্দ্র সেন এই বিষয়টি প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। পক্ষান্তরে মাহবুব সিদ্দিকীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, তাদের মধ্যে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ছিলো। দীনেশচন্দ্র সেনের মতটিই এখানে প্রনিধাণযোগ্য বলে প্রতিয়মান হয়।

পদকর্তা এখানে বাংলার কয়েকজন শাসকের নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন গিয়াসুদ্দিন; যার সময়ে ভগীরথ বাংলায় এসেছিলেন এবং দেওয়ানি লাভ করেছিলেন। জৈনুদ্দিন; তার শাসনকালে কালিদাস (সুলাইমান খান) বাংলার কোনো এক অঞ্চলের দেওয়ান ছিলেন। জৈনুদ্দিন নিঃসন্তান হওয়ায় তার মৃত্যুর পরে বাংলার শাসক হন জালালুদ্দিন। পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাবো, (পদকর্তার ভাষ্যমতে) এই জালালুদ্দিনের কণ্যা মমিনা খাতুনকেই কালীদাস বিয়ে করেছিলেন।

বাকি দুইজন শাসককে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় না।

গিয়াসুদ্দিন নামে বাংলায় চারজন প্রসিদ্ধ শাসক ছিলেন। তারা হলেন, ইলিয়াসশাহী রাজবংশের গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯–১৪১১), ইলিয়াসশাহী রাজবংশের দ্বিতীয় পর্যায়ের শাসক গিয়াসউদ্দীন বারবাক শাহ (১৪৫৯–১৪৭৪), প্রথম হাবশী শাসক গিয়াসউদ্দিন শাহজাদা বারবাক (১৪৮৭–১৪৮৯) এবং হুসাইনশাহী বংশের শেষ শাসক গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩–১৫৩৮)। টাইম ফ্রেমের হিসেব করলে এই চারজনের কারো সঙ্গেই ভগীরথের বাংলায় অবস্থানের সময়কালকে মেলানো যায় না। আর জৈনুদ্দিন নামে বাংলায় কোনো শাসক ছিলেন কি না সে বিষয়ে বিশেষ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

 

পালা-২

নবাব জালালুদ্দিনের একটি কণ্যা সন্তান ছিলো। নাম মমিনা খাতুন। তার রূপ সৌন্দর্য ছিলো অতুলনীয়। অনেক দেশ থেকে রাজা বাদশা নবাবের পুত্ররা তার কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালো। কিন্তু সবাইকে ফিরিয়ে দিলেন। কারো সঙ্গেই তার মনের মিল হলো না। মমিনা খাতুন ছিলেন খুবই অপরূপ একটি মেয়ে। তার গায়ের রং ছিলো আগুণের স্ফূলিঙ্গের মতো জ্বলজ্বলে। মাথার চুল কোমরের নিচ অব্দি প্রলম্বিত। চেহারা ছিলো পূর্ণিমার চাঁদের মতো মাধূর্যময়। চোখ ছিলো হরিণীর মতো মায়া ভরা। তার পা দুটি ছিলো কলাগাছের মতো মসৃণ; আকাশের হুরপরিরাও যেন তার রূপের কাছে পরাজিত হয়। মমিনা খাতুনের তখন প্রথম যৌবন। হাঁটতে গেলে তার রূপলাবণ্য যেন মাটিতে খসে পড়তো। ভরাট স্তনের ভারে তিনি সামনে ঝুঁকে পড়তেন। সখিসাথি প্রতিবেশিদের সঙ্গে তিনি হেসে হেসে কথা বলতেন। তার রূপ এতোই বেশি ছিলো যে, আল্লাহ তাকে যেন বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন।

সমবয়সি মেয়েদের নিয়ে একদিন মমিনা খাতুন গোসল করতে বের হলেন।। আনন্দের আতিশয্যে শৃঙ্খলা না মেনে তিনি পথে বের হয়ে পড়লেন। সেখানে তিনি কালিদাসকে দেখতে পেলেন। কালিদাসকে দেখে মমিনা খাতুন যেন হুঁশ হারিয়ে ফেললেন। চোখ ভরে তিনি কালিদাসকে দেখতে লাগলেন। সেদিনের পর থেকে মমিনা খাতুন নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিলেন। সারা রাত তার চোখে ঘুম আসে না। দু চোখের পাতা এক হয় না। শেষে মমিনা খাতুন একটি চিঠি লিখলেন—

‘শোনো কালিদাস, তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি কাতর হয়ে আছি। যেদিন তোমাকে আমি দেখেছি, মনে হচ্ছে ঘরবাড়ি সব কিছু ছেড়ে তোমার কাছে ছুটে যাই। তোমার বাহুতে বন্দি হয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিই। তুমিই এখন আমার একমাত্র ভরসা।’

চিঠি নিয়ে মমিনা খাতুনের বাঁদী কালিদাসের কাছে গেলো। কালিদাস মন দিয়ে চিঠিটি পড়লো। সে মনে মনে হাসতে শুরু করলো। তারপর সে নিভৃতে চিঠির উত্তর লিখতে বসলো—

‘আমার কথা মন দিয়ে শোনো। তোমার কাছে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি একজন হিন্দু আর তুমি হলে মুসলিম। হিন্দু মুসলিমের মধ্যে বিবাহ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তোমার রূপের কারণে আমি নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে মুসলিম হয়ে যাবো, সেটাও কোনোভাবে সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে আমি মানুষের কাছে চেয়ে ভিক্ষা করে খাবো। তবুও আমি কোনো মুসলিম মেয়েকে বিবাহ করে নিজের ধর্মকে কলুষিত করবো না। তবে আমি হিন্দু না হয়ে যদি মুসলিম হতাম, তাহলে তোমার মনোকামনা আমি অপূর্ণ রাখতাম না। নিজের ভুলে আমি যদি কোনো অধর্ম করে ফেলি, তাহলে সাত জনম আমাকে নরক ভোগ করতে হবে। তুমি আমার থেকে মন ফিরিয়ে নাও এবং আমাকে ক্ষমা করে দাও।’

কালিদাসের চিঠি নিয়ে বাঁদী মুমিনা খাতুনের কাছে ফিরে এলো।

 

ইতিহাস নিরীক্ষা :

এই পালায় মূলত অতিরঞ্জিত আবেগের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। গান ও পালাকে শ্রোতার সামনে আরও উপভোগ্য করে তোলার জন্য এই ধরণের অতিরঞ্জনের উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে প্রচুর পাওয়া যায়। এই পালার পরবর্তী অংশে ঈসা খানের ক্ষেত্রেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ আমরা দেখতে পাবো।

 

পালা-৩

কালিদাসের চিঠি পড়ে মমিনা খাতুন খুব লজ্জা পেলেন।  আশাভঙ্গের বেদনায় তিনি মূহ্যমান হয়ে পড়লেন। ঘুম খাওয়াদাওয়া যেন তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলো। কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। কালিদাসকে পাওয়ার জন্য শেষ চেষ্টা করার সংকল্প তিনি গ্রহণ করলেন। অনেক চিন্তাভাবনা করে তিনি একটা বুদ্ধি বের করলেন—যে কোনো উপায়ে কালিদাসের জাত নষ্ট তিনি করবেন। একদিন মমিনা খাতুন কালিদাসের রাধুনিকে একান্তে ডাকলেন। রাধুনি যদি তার কাজ করে দিতে পারে, তাহলে তাকে দেয়া হবে বাড়ি ঘর সহ জমিজমা। তার জন্য এনে দেয়া হবে সুন্দরী স্ত্রী। রাধুনি মমিনা খাতুনের কথায় রাজি হলো। তারা দুইজন মিলে পরিকল্পনা করলো। তারা জানতো, রাধুনি যদি দেওয়ানের জন্য কোনো খাবার নিয়ে যায়, তাহলে সে কোনো সন্দেহ না করে খেয়ে ফেলবে। তখন মমিনা খাতুন ভেড়ার গোশত দিয়ে কাবাব বানালেন। গরুর গোশত রান্না করলেন। সেগুলোর সাথে কোর্মা কোপ্তা অনেক কিছু বানালেন। তারপর রাধুনির মাধ্যমে কালিদাসের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। খাবার সামনে রেখে রাধুনি কালিদাসকে বললো, আপনার জন্য আজকে নতুন ধরনের কাবার তৈরি করেছি। কালিদাস পেট ভরে খাবার খেলো এবং আনন্দচিত্তে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন সকালে রাধুনি কালিদাসকে জানালো, ছল করে গত কাল তাকে গরুর গোশত খাওয়ানো হয়েছে। এতে আপনার জাত চলে গেছে। এই কথা বলে রাধূনি পালিয়ে গেলো।

 

ইতিহাস নিরীক্ষা :

কালীদাস আসলে কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর ইতিহাসবিদেরা আমাদের দেননি। তবে কিছু তথ্য প্রমাণ ও ঐতিহাসিক মতামত বিশ্লেষণ করে আমরা এই প্রশ্নের সমাধান উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস অনুসন্ধানে সর্বপ্রথম সচেষ্ট হয়েছেন উনিশ শতকে ঢাকার সিভিল সার্জন ড. জেমস ওয়াইজ [6]ড. জেমস ওয়াইজ ছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলায় কর্মরত একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক ও … Continue reading। তিনি বাংলার ইতিহাসে বারো ভূঁইয়াদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেন। ঈসা খানসহ মোট ৫ জন ভূঁইয়ার অনুসন্ধানী আলোচনা করেছেন। তিনি ঈসা খান প্রসঙ্গে তথ্য সংগ্রহের জন্য জঙ্গলবাড়ি পরিবারে অনুসন্ধান চালিছেলেন। তিনি বলেছেন, ‘পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে, হোসেন শাহের শাসনকালে (১৪৯৩–১৫২০) অযোধ্যার বাইশ রাজপুত কালীদাস গজদানি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সুলায়মান খান উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজপরিবারের এক কন্যাকে বিয়ে করেন। বলা হয়, এক যুদ্ধে তিনি সালিম খান ও তাজ খানের হাতে নিহত হন। মৃত্যুকালে তিনি তিনটি সন্তান রেখে যান—ঈসা, ইসমাঈল ও শাহিনশাহ বিবি নামে এক কন্যা। পিতার মৃত্যুর পর ঈসা ও ইসমাঈল বন্দি হন এবং দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যান। পরে তাদের চাচা কুতুবউদ্দিন তাদের চিহ্নিত করে তুরান থেকে ফিরিয়ে আনেন।’[7]On the Barah Bhuyas of Eastern Bengal, জেমস ওয়াইজ, জার্নাল অব দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি-১৯৭৪, পৃষ্ঠা : … Continue reading

জেমস ওয়াইজের বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি, কালিদাস গজদানি হোসেনশাহী বংশের প্রতাপশালী সুলতান হোসেন শাহের শাসনকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পরে তার নাম হয় সুলাইমান এবং তাকে ‘খান’ উপাধি প্রদান করা হয়। অর্থাৎ তিনি ১৫২০ সালের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

ঈসা খানের পিতা সুলাইমান খান কি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, না ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কোথাও আলোচনা করা হয়নি। তবে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সূত্রে কালিদাসের ইসলাম গ্রহণের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। সেখানে মোটাদাগে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এক হলো, গোমাংশ ভক্ষণে বাধ্য করে কালিদাসের জাত নষ্ট করা হয়, পরে তিনি বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণে করেন। আরেকটি মত হলো, মুসলমান মুমিনগণের জ্ঞানগর্ভ উপদেশে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিলেন।

কালিদাস গজদানীর বংশ, চরিত্র ও ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন, ‘অযোধ্যাতে বাইশওয়ার পরগনায় ভগীরথ নামক এক ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। ইনি দিল্লীশ্বরের সামন্ত রাজা এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। ভগীরথ বঙ্গদেশে তীর্থদর্শনে আসিয়া সুলতান গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে প্রীতিসূত্রে আবদ্ধ হন এবং অবশেষে সুলতানের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়া বঙ্গদেশে থাকিয়া যান। ভগীরথের বংশে কালিদাস জন্মগ্রহণ করেন; ইনি অতি পণ্ডিত, নিষ্ঠাবান ও প্রিয়দর্শন পুরুষ ছিলেন। কথিত আছে, প্রত্যহই ইনি একটি ছোট সোনার হাতী নির্মাণ করিয়া তাহা ভাগ করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে দান করিতেন। এজন্য তিনি ‘কালিদাস গজদানী’ নামে খ্যাত হন। কাহারও কাহারও মতে সুলতান জালালুদ্দিনের তৃতীয় কন্যা মমিনা খাতুন, কাহারও মতে হুসেন সাহের এক কন্যা—কালিদাসের গঙ্গাস্নাত সুন্দর গৌর বপু ও সুদর্শন মুখচোখ দেখিয়া যাচিয়া তাঁহাকে পতিত্বে বরণ করেন। নিষ্ঠাবান হিন্দু কালিদাস সুলতানের কন্যার কাছে যে উত্তর লেখেন, তাহাতে অনেক সদুপদেশ ছিল এবং তাহার শেষ কথা ছিল—কুমারীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। ক্রুদ্ধ ও অপমানিত হইয়া রাজকুমারী কৌশলক্রমে তাঁহাকে গোমাংস খাওয়াইয়া তাঁহার জাতি নষ্ট করেন। অনন্যোপায় হইয়া কালিদাস গজদানী ইসলামধৰ্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক মমিনা খাতুনকে বিবাহ করিতে স্বীকৃত হন। ইহার মুসলমানী নাম হইল-সোলেমান খাঁ। কয়েকজন মুসলমান পল্লীগীতিকার এই ভালবাসার ব্যাপার বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়াছেন।[8]বৃহৎবঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৭৮৭।

এই বক্তব্যের পরে রায়বাহাদুর দীনেশ চন্দ্র সেন ছোট্ট করে বলেছেন, ‘কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, মুসলমান মমিনগণের জ্ঞানগর্ভ উপদেশে কালিদাস স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইসলামধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছিলেন। দেওয়ান পরিবারের ইতিহাসে এই সকল কথা লিপিবদ্ধ আছে।’[9]বৃহৎবঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৭৮৭।

সুলাইমান খানের পরবর্তী জীবন থেকে তার স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের সাক্ষ্য মেলে। ইতিহাসের বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, তিনি বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছেন। গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহ ইন্তেকালের পরে বাংলা স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং সুর বংশের অধীনে চলে যায়। তখন বৈবাহিক সূত্রে রাজ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি সুর বংশের সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং বাংলার স্বাধীনতা ও স্বকিয়তা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে যদি ধর্মান্তিরিত হতে বাধ্য করা হতো তাহলে তিনি হোসেনশাহী বংশের প্রতি এতো নিবেদিতপ্রাণ হতেন না। বরং মনে মনে তাদের প্রতি বিদ্বেষই পোষণ করতেন।

 

পালা-৪

চাকরের কথা শুনে কালিদাস কাঁদতে শুরু করলেন। কার কু-পরামর্শে তার এতো বড় সর্বনাশ করা হলো সেটা তিনি ভেবে পেলেন না। জাতি-ধর্ম বিনষ্ট হওয়ার দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে কালিদাসের বেহাল দশা হলো। খাবার পানি আর তার মুখে রুচলো না। তিনি কোনো উপায় না পেয়ে পথে বের হয়ে পড়লেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, জাত যেহেতু গেছে, তাই এই জীবন রাখার আর কোনো মানে হয় না। তিনি গলায় কলসি বেধে পানিতে ডুবে আত্মহত্যা করবেন।

কালিদাসের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে নবাব জালালুদ্দিন তাকে পথ থেকে ধরে নিয়ে এলেন। তাকে নিজের পাশে বসালেন। তিনি কালিদাসকে মধুর কণ্ঠে বললেন, আল্লাহ যা মানুষের ভাগ্যে লিখে রেখেছেন সেটা উপেক্ষা করা যায় না। তোমার ভাগ্যে ছিলো, তাই তুমি মুসলমান হয়ে গেছো। তাই এখন আর পাগলামি করে লাভ নেই। মনের কষ্ট ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো। তুমি যেহেতু মুসলমান হয়ে গেছো তাই তোমাকে প্রস্তাব দিচ্ছি, আমার কন্যাকে তুমি বিয়ে করো। আমার মেয়ে মমিনা খাতুন খুবই খুবসুরত একটি মেয়ে। তাছাড়া আমার কোনো পুত্র সন্তান নেই। আমার মৃত্যুর পরে তুমি আমার উত্তরাধিকারী হবে। আমার সব ধণ দৌলত তোমার হয়ে যাবে।

নবান জালালুদ্দিনের এই সব কথা শুনে দেওয়ান কালিদাস ভাবতে লাগলেন, আমি কীসের কারণে এতো পাগলামি করছি? একবার আমি মুসলমান হয়ে গেছি।[10]সে সময়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিলো, কেউ গো মাংষ ভক্ষণ করলে সে মুসলিম হয়ে … Continue reading হিন্দু ঘরে তো আর ফিরে যেতে পারবো না! তাই অমূল্য এই জীবনটা বৃথা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। মমিনা খাতুনতে বিয়ে করলে আমি গৌড় শহরে থাকতে পারবো। নবাবের দায়িত্বও একদিন আমার হাতে আসবে।

কালিদাস নবাব জালালুদ্দিনের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। তখন তার নাম রাখা হলো সুলাইমান। এরপর শুল্কপক্ষের এক শুক্রবারে মমিনা খাতুনের সঙ্গে তার বিবাহ হলো। বিয়ে করার পরে সুলাইমানের জীবনে সুখ নেমে এলো। মমিনা খাতুনকে নিয়ে সে সংসার করতে লাগলো। সুলাইমান আর মমিনার ঘর আলো করে দুটি পুত্র সন্তানের জন্ম হলো। অনেক ভেবে চিন্তে তাদের নাম রাখা হলো—দাউদ ও ইশাখাঁ।

পনেরো বছর নবাবের দায়িত্ব পালন করার পরে সুলাইমানের ইন্তেকাল হয়ে গেলো। তারপর এই দায়িত্ব চলে গেলো তার পুত্র দাউদ খাঁর হাতে। তিনি হলেন গৌড়ের অধিপতি। তিনি নিজেকে শক্তিমান প্রমাণ করতে দিল্লির শাসককে কর দেয়া বন্ধ করে দিলেন। তখন দিল্লি থেকে বাদশাহ কর চেয়ে লোক পাঠালেন। কিন্তু দাউদ তাকে অপমান করে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। দাউদের কাছে অপমানিত হয়ে বাদশাহর দূত দিল্লি ফিরে গেলো। সে বাদশাহকে জানালো, দাউদ তার সঙ্গে ভীষণ অন্যায় আচরণ করেছে। মেরে মেরে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যথাজর্জর বানিয়ে দিয়েছে। এমন শত্রুকে টিকিয়ে রাখা মোটেই উচিত হবে না।

দাউদের আচারণে রেগে গিয়ে বাদশা গৌড়ের অভিমুখে সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। তাদেরকে আদেশ দিলেন, দাউদকে যেন বেঁধে দিল্লি নিয়ে আসা হয়। দিল্লির সেনাবাহিনীর সঙ্গে গৌড়ে দাউদের যুদ্ধ হলো। এই যুদ্ধে দাউদ নিহত হলেন।

 

ইতিহাস নিরীক্ষা :

এই পালায় বেশ কয়েকটি তথ্য রয়েছে, ইতিহাস নিরীক্ষায় যেগুলো ভুল প্রমাণিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো, কালীদাস গজদানী ইসলাম গ্রহণ করে সুলাইমান খান নাম গ্রহণ করে বাংলার যে সুলতানের কণ্যাকে বিবাহ করেছিলেন, তার নাম হলো জালালুদ্দিন। এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক!

এক. সুলাইমান খান কোন সুলতাদের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন? এই এই প্রসঙ্গেও একাধিক মত পাওয়া যায়। জেমস ওয়াইজ বলেছেন, তিনি রাজ পরিবারের একজন কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। জঙ্গলবাড়ি জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংকলিত মুসনাদালি লিহুশ[11]এই গ্রন্থের নামের প্রকৃতরূপ এবং রচয়িতার সন্ধান পাওয়া যায়নি। নলিনীকান্ত … Continue reading গ্রন্থে সেই সুলতানকে ‘জালা শাহ’ বলা হয়েছে। ড. সেনের সংকলন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত পূবর্ববঙ্গ-গীতিকায়ও সুলতানের নাম জালালুদ্দিন উল্লেখ করা হয়েছে।[12]ইশা খাঁ দেওয়নের পালা, পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা, খন্ড : ২ পৃষ্ঠা : ৩৫২। যদি কালিদাসের মুসলমান হওয়ার কাহিনী সত্য হয়, তাহলে নিম্নলিখিত কালক্রম থেকে বোঝা যাবে—তিনি কোন সুলতানের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন।

আকবরনামা অনুযায়ী ঈসা খানের পিতা সুলাইমান খানের দুটি বিদ্রোহ এবং মৃত্যুর ঘটনা ইসলাম শাহের শাসনকালে ঘটেছিল। ইসলাম শাহ ১৫৪৫–১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে শাসন করেছিলেন। এই সময়কালের মধ্যে কালিদাসের দুটি বিদ্রোহ, তার মৃত্যু এবং ঈসা খান ও তার ভাইকে দাস হিসেবে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। আর সুলতান গিয়াসুদ্দিন জালাল শাহের শাসনকাল ছিলো ১৫৬০-১৫৬৩ পর্যন্ত। এর আগে শত বছরের মধ্যে অন্য কোনো জালাল শাহের অস্তিত্বের প্রমাণ ইতিহাসে নেই। তাই এ কথা বলাই যায় যে, সুলাইমান খান জালাল শাহের শাসনের অন্তত ১৫ বছর আগে নিহত হয়েছিলেন। কাজেই তার পক্ষে জালাল শাহের কন্যাকে বিয়ে করার সম্ভবনা নেই।

উপরের আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম, কালক্রমের বিচারে সুলাইমান খানের পক্ষে জালালুদ্দিনের কন্যাকে বিয়ে করা এক প্রকার অসম্ভব ছিলো। তাই সোলায়মানের পক্ষে গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের মেয়ে বিয়ে করা যেমন সম্ভব, আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মেয়ে বিয়ে করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে অন্য একটি কারণে গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের মেয়ে বিয়ে করার সম্ভাবনা বেশি। গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ-শাহের রাজত্বকাল ১৫৩২ থেকে ১৫৩৮ খ্রি. পর্যন্ত। সকল সূত্রেই বলা হয়েছে—সুলতান রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় সোলায়মানের বিয়ে হয় এবং ঐ সময়ের কোনো এক সালে ঈসা খানের জন্ম হয়। এই হিসাবে ইসলাম শাহ কর্তৃক সোলায়মানের হত্যার সময় ঈসা খানের বয়স হয় ১২ অথবা ১৩ বছর, বেশির পক্ষে ১৫ বছর। এ হিসেবে ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খানের মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৬৪ বা ৬৫ বছর কিংবা সামান্য বেশি। ঈসা খানের কর্মময় জীবন এই কালক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অন্যদিকে সোলায়মান খান হোসেন শাহর মেয়ে বিয়ে করলে পিতার মৃত্যুর সময় ঈসা খানের বয়স হবে প্রায় ৩২ বা ৩৩ বছর কিংবা কিছু বেশি, এবং ঈসা খানের মৃত্যুর সময় তার বয়স প্রায় ৮০ বছর বা তারও বেশি হয়ে যায়। যদিও প্রামাণ্য সূত্রে পাওয়া যায় না, কিংবদন্তী মতে ঈসা খান মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে মানসিংহের সঙ্গে একক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং মানসিংহকে পরাজিত করেন।

কিংবদন্তী সত্য হোক বা মিথ্যা, এটা সত্য যে, ১৫৯৬-৯৭ খ্রিস্টাব্দে মোগলদের বিরুদ্ধে ঈসা খানের কয়েকবার সংঘর্ষ হয় এবং ঈসা খান এই সংঘর্ষে বীরত্বের পরিচয় দেন। ৮০ বৎসর বয়সে কারও পক্ষে এতো বীরত্বের পরিচয় দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবিচল থাকা সম্ভব নয়। কাজেই সুলাইমান খানের পক্ষে গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যাকে বিবাহ করার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য।

দুই. পদকর্তা এখানে আরেকটি ভুল করেছেন। ঈসা খানের পিতা সুলাইমান খানকে তিনি কররানী বংশের প্রতাপশালী শাসক সুলাইমান কররানীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন, তাকে বাংলার শাসক বলেছেন এবং দাউদ খান কররানীকে ঈসা খানের ভাই বলেছেন। কিন্তু এই মতটি ইতিহাস সমর্থিত নয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন,

“ইহা নিশ্চিত রূপে জানা যাইতেছে যে, দাউদ খাঁ সুলেমান কাররাণির পুত্র। রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিতেও একথার উল্লেখ আছে। প্রতাপাদিত্য চরিতকার লিখিয়াছেন যে, তাঁহার গ্রন্থ কোনও পারসীক পুস্তক অবলম্বনে লিখিত। প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য দাউদ খাঁর মন্ত্রী ছিলেন। দাউদ খাঁ ইশা খাঁর ভ্রাতা হইলে রামরাম বসু নিশ্চয়ই তাহার উল্লেখ করিতেন; কারণ তাঁহার গ্রন্থে দাউদ খাঁ সম্বন্ধে প্রায় সমস্ত জ্ঞাতব্য বিবরণই প্রদত্ত হইয়াছে। আরও আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, আইন-ই-আকবরীতে লিখিত আছে, দাউদ খাঁ খানজাহান কর্তৃক ধৃত ও নিহত হইলে তাঁহার বৃদ্ধা মাতা খান জাহানের কৃপাভিক্ষা করিয়া তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ইশা খাঁ তাঁহার অপর পুত্র হইলে এই বৃদ্ধা রমণী কি কখনও এইরূপ পুত্র-হন্তার শরণ লওয়ার হীনতা স্বীকার করিতেন? আইন-ই-আকবরীতে দাউদ খাঁর অনেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনের নামোল্লেখ আছে, কিন্তু তাহাতে ইশা খাঁর নাম নাই। উক্ত প্রখ্যাত বাহারিস্তানগ্রন্থে ইশা খাঁর বংশাবলী, তাঁহার পিতার মৃত্যু, শৈশবে তাঁহার দাসরূপে বিক্রীত হওয়া এবং সেইরূপ হীনভাবে কিছু দিন তুরাণে অবস্থিতি প্রভৃতি বিবরণ পাওয়া যায়।”[13]পূর্ববঙ্গ গীতিকা, খণ্ড : ২, সংখ্যা : ২, পৃষ্ঠা : ৪৭-৪৮।

এইচ. ই. স্টেপেলটন ‘Note on Seven Sixteenth Century Cannon recently discovered in the Dacca District’ প্রবন্ধে ঈসা খানের বংশ তালিকা প্রদান করেছেন। সেখানে তিনি সুলাইমান খান (কলিদাস গজদানী) এর তিনজন সন্তানের নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন, ঈসা খান, ইসমাইল ও শাহেনশাহ বিবি।[14]জার্নাল অব দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৯০৯, পৃষ্ঠা : ৩৭২। এখানে দাউদ নামের কারো কথা উল্লেখ নেই। কাজেই পদকর্তার এই মতটি ইতিহাস নিরীক্ষায় অসমর্থিত ও অতিরঞ্জিত।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 বাংলাপিডিয়া, পালাগান ভুক্তি দ্রষ্টব্য।
2 পূর্ববঙ্গ গীতিকা, দীনেশচন্দ্র সেন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৩।
3 আকবরনামা, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : 647।
4 মসনদ-ই-আলা ঈসা খান, মাহবুব সিদ্দিকী, পৃষ্ঠা : ১৪।
5 Imperial Gazetteer, ‘Baiswara’, ১৯০৮, পৃষ্ঠা : 218।
6 ড. জেমস ওয়াইজ ছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলায় কর্মরত একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক ও পুরাতত্ত্ব-গবেষক। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বেঙ্গল মেডিকেল সার্ভিসে যোগ দেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কেবল চিকিৎসক নন, তিনি বাংলার ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও ভূগোল নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন স্থাপত্য, মসজিদ, মন্দির, শিলালিপি, প্রত্নবস্তু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করেন। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বিক্রমপুর, বগুড়া ও কুমিল্লা অঞ্চলের বহু প্রাচীন নিদর্শন তাঁর লেখার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।

তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা হলো “Notes on the Races, Castes and Trades of Eastern Bengal” (১৮৮৩)—যেখানে তিনি পূর্ববঙ্গের জনগোষ্ঠী, পেশা, জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এছাড়া তিনি Journal of the Asiatic Society of Bengal-এ বাংলার ইতিহাস-পুরাতত্ত্ববিষয়ক অসংখ্য প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ড. ওয়াইজের নথিভুক্ত তথ্য পরবর্তীতে বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। গবেষকরা আজও তাঁর কাজকে প্রাথমিক দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন।

7 On the Barah Bhuyas of Eastern Bengal, জেমস ওয়াইজ, জার্নাল অব দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি-১৯৭৪, পৃষ্ঠা : ২১০।
8, 9 বৃহৎবঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৭৮৭।
10 সে সময়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিলো, কেউ গো মাংষ ভক্ষণ করলে সে মুসলিম হয়ে যায়।
11 এই গ্রন্থের নামের প্রকৃতরূপ এবং রচয়িতার সন্ধান পাওয়া যায়নি। নলিনীকান্ত ভট্টাশালী BENGAL CHIEFS’ STRUGGLE FOR INDEPENDENCE IN THE REIGN OF AKBAR AND JAHANGIR প্রবন্ধে এই নামটি উল্লেখ করেছেন।
12 ইশা খাঁ দেওয়নের পালা, পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা, খন্ড : ২ পৃষ্ঠা : ৩৫২।
13 পূর্ববঙ্গ গীতিকা, খণ্ড : ২, সংখ্যা : ২, পৃষ্ঠা : ৪৭-৪৮।
14 জার্নাল অব দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-১৯০৯, পৃষ্ঠা : ৩৭২।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
শাব্বীর মুহাম্মদ
শাব্বীর মুহাম্মদ
7 months ago

মাশাআল্লাহ, চমৎকার!