অবতরণিকা
আরবদের স্বভাবগত কবিতাপ্রীতি এবং তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির কারণে জাহিলী যুগের কাব্য-সাহিত্যের একটি বড় অংশ আজও সংরক্ষিত। মৌখিক পরম্পরার শক্তিতে রক্ষিত সেসব কবিতা পরে সংকলিতরূপে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং এখনো পাঠকের মুগ্ধতা জাগায়।
কিন্তু জাহিলী আরবদের মনোজগতের ভাববিনিময়ে যে বিপুল গদ্য-সাহিত্যের জন্ম হয়েছিল, লেখালেখি ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবের কারণে তার সামান্যই ইতিহাসে টিকে থাকতে পেরেছে। তবু কিছু ব্যক্তির বক্তৃতা, উপদেশ, গল্প, দার্শনিক বাণী ও গুণগাথা—যেগুলো তাদের ভাষাশৈলীর মোহে মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে ছিল—পরবর্তী যুগে ঐতিহাসিকদের হাতে সংরক্ষিত হয়ে আজকের পাঠকের সামনে এসেছে। আর সেগুলোই মূলত প্রাচীন আরবি গদ্য সাহিত্যের প্রকৃত স্মারক।
এর পরেই সূচনা ঘটে ইসলামী আরবি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ, শিক্ষা ও নির্দেশনার ভাষা যেহেতু আরবি, তাই কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা, বিধান ও উপদেশকে সুন্দরভাবে পরিবেশনের জন্য মুসলিম সমাজে পদ্য ও গদ্য—উভয় ধারাতেই ব্যাপক সাহিত্যচর্চার স্রোত জন্ম নেয়। আকীদা, ইবাদত, লেনদেন, আইন-বিচার, নৈতিকতা, চিন্তাধারা, রাষ্ট্রনীতি—এমন বিবিধ ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষিদের অসাধারণ রচনায় আরবি সাহিত্য নতুন মাত্রায় সমৃদ্ধ হয়। একই সঙ্গে ইসলামী ভাবধারায় আরবি ভাষাকে আরও পরিশীলিত ও শিল্পসমৃদ্ধ করে তোলাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সেই লক্ষ্য থেকেই উদ্ভব ঘটে আরবি মাকামা সাহিত্যের।
সমকালীন মিশরীয় সাহিত্যিক, ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ আহমাদ হাসান যাইয়াত মাকামার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লেখেন—
المقامة حكاية قصيرة أنيقة الأسلوب تشتمل على عظة أو ملحة
অর্থাৎ, মাকামা হলো রম্যশৈলীতে রচিত এমন সংক্ষিপ্ত কাহিনি, যাতে কোনো উপদেশ অথবা রসাত্মক বর্ণনা থাকে।
মাকামার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন—মাকামার উদ্দেশ্য মনোরম গল্প বলা, আবেগময় উপদেশ প্রদান কিংবা গভীর কোনো গবেষণা পেশ করা নয়। এটি মূলত সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র শিল্পধারা—শিল্পের জন্য শিল্প। এতে নতুন শব্দের চমৎকার বিন্যাস, ছন্দময় বাক্যগঠন এবং সৃজনশীল অলংকারশৈলী প্রধান হয়ে ওঠে। পাঠক কাহিনির ঘটনা বা চরিত্রের তুলনায় বেশি তৃপ্তি পায় ভাষার শিল্পভঙ্গি ও শব্দসুষমায়। তাই এ ধরনের রচনায় প্রচলিত গল্প বা উপন্যাসের নিয়ম-কাঠামোর প্রতি অবলীলায় অবহেলা দেখানো হয়। মাকামা রচয়িতার মূল মনোযোগ থাকে ভাষার গাঁথুনি, শব্দের সংগীত, বাক্য নির্মাণের অভিনবত্ব, মাধুর্য ও শক্তিতে—গল্পের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে নয়।
মাকামা সাহিত্যের ইতিহাস
গল্পসাহিত্যের এই স্বতন্ত্র ও শিল্পসমৃদ্ধ শাখাটির উদ্ভব ঘটে আব্বাসীয় যুগের মধ্যভাগে—হিজরী তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতকের কোনো এক সময়ে। তখন আরবি সাহিত্য তার পূর্ণ যৌবনে উদ্ভাসিত, সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার চূড়ান্ত বিকাশে উজ্জ্বল। জনশ্রুতি আছে—মাকামা রচনার প্রথম দিকের ধারাটি আবিষ্কার করেছিলেন বিখ্যাত ভাষাবিদ আহমাদ ইবনে ফারেস (মৃ. ৩৯৫ হি.)। পরে তাঁর অনুসরণে তাঁরই ছাত্র বদিউজ্জামান হামদানী (মৃ. ৩৯৮ হি.) মাকামা সাহিত্যকে সুসংগঠিত রূপ দেন।
তবে ভাষাবিদ আহমাদ হাসান যাইয়াত ইতিহাসের আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মাকামা সাহিত্যের প্রকৃত সূচনা ইবনে দুরাইদ মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (মৃ. ৩২১ হি.) এর হাত ধরেই। তিনি গল্প আকারে চল্লিশটি নিবন্ধ রচনা করেন, যা ছিল মাকামা রচনার প্রাথমিক আভাস। পরবর্তীতে আহমাদ ইবনে ফারেসের শিষ্য বদিউজ্জামান হামদানী ইবনে দুরাইদের পথ অনুসরণ করে বিভিন্ন বিষয়ে চার শতাধিক মাকামা রচনা করেন এবং ধারাটিকে পূর্ণতা ও জনপ্রিয়তা দেন।
আহমাদ হাসান যাইয়াত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তারীখুল আদাবিল আরাবী–তে বদিউজ্জামান হামদানীর গদ্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন—হামদানীর গদ্য পাঠকের অন্তরকে আবিষ্ট করে, ভাবনাকে করায়ত্ত করে। তাঁর গদ্য যেন গদ্যকবিতারই রূপ—ছন্দ, শব্দ ও ভাবের শৈল্পিক সমন্বয়ে পরিপূর্ণ। তবু এতে কৃত্রিমতার লেশমাত্র নেই। ভাষার চাতুর্য পাঠকে ক্লান্ত করে না, বরং তার নিগূঢ়তা ও সজীব প্রবাহ পাঠকরুচিকে আরও শাণিত করে। হামদানীর রচনায় একদিকে শব্দের গাম্ভীর্য, অন্যদিকে অর্থের সৌন্দর্য; বর্ণনার উৎকর্ষ যেমন আছে, তেমনি আছে চিন্তার সূক্ষ্মতা। তিনি সাহিত্যের প্রাচীন বহু ধারায় নবজাগরণ সৃষ্টি করেন এবং বিভিন্ন রিসালা রচনায় অভিনবত্বের দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাই তিনি যথার্থই ইবনুল আমীর সাহিত্যধারার এক অকুতোভয় অশ্বারোহী—একজন স্বীকৃত ও অনন্য ব্যতিক্রমী শিল্পস্রষ্টা।
এই বিবেচনায় বদিউজ্জামান হামদানী নিঃসন্দেহে মাকামা সাহিত্যের সম্রাট এবং পরবর্তী সকল রচয়িতার অনুসরণীয় আদর্শ। দুঃখের বিষয়, তাঁর রচিত অসংখ্য অনবদ্য মাকামার মধ্য থেকে মাত্র তিপ্পান্নটি আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকতে পেরেছে।
হামদানীর পর আবু মুহাম্মাদ আল-কাসিম ইবনে আলী আল-হারীরী আল-বসরী তাঁর অনুকরণে পঞ্চাশটি অতুলনীয় মাকামা রচনা করেন, যা আরবি সাহিত্যে আরও গভীর প্রভাব বিস্তার করে। হারীরীর মাকামা—অলংকার, ভাষাশৈলী, ব্যাকরণ ও বর্ণনাভঙ্গির উৎকর্ষে—আরবি গদ্যের এক নতুন পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে শাহ ফাইরুয ইবনে সাদ, ইবনে আত-তামীমী, আল্লামা যমখশারীসহ আরও বহু আরবি সাহিত্যিক মাকামা রচনাকে তাঁদের সাহিত্যচর্চার অবলম্বন করেন। তবে শিল্পমান, সাহিত্যিক ব্যঞ্জনা ও ভাষার মাধুর্যের বিচারে কেউই বদিউজ্জামান হামদানী বা আল-হারীরীর মতো খ্যাতি, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারেননি।
মাকামা গল্পের ধরন
আরবি সাহিত্যের এই বহুল সমাদৃত মাকামা সাহিত্য মূলত আবর্তিত হয় কোনো সাধারণ ও দৈনন্দিন ঘটনার কেন্দ্র ধরে; কিন্তু সেই সাধারণতা রচয়িতার শিল্পে পরিণত হয় এক অদ্ভুত, চাতুর্যমণ্ডিত এবং নানা বিচিত্রতায় ভরপুর কাহিনিতে। মাকামাগুলোর প্রধান নায়ক সাধারণত এমন এক ব্যক্তি—বুদ্ধিদীপ্ত, ধূর্ত, কখনও প্রতারক, কখনও রঙ্গরসিক—যিনি অসামান্য ভাষাচাতুর্য ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় পাঠককে বিস্মিত করেন।
এই নায়কের ছায়াসঙ্গীর মতো আরেক ব্যক্তি থাকেন, যিনি তার প্রতিটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন, প্রতিটি আসরে তার কথাবার্তা শোনেন এবং প্রায়ই আকস্মিকভাবে সেই নায়কের প্রতিটি রহস্যময় পরিবেশে উপস্থিত হন। তিনি নায়কের আচরণ, কৌশল, চাতুর্য—যা কিছু দেখেন, তা জনসমক্ষে বর্ণনা করেন। এই ব্যক্তিই মাকামায় “রাবী”—অর্থাৎ বর্ণনাকারী। গল্পের ভিতরকার সত্য আর নায়কের ধূর্ততার মাঝে যে মধুর টানাপোড়েন, তা এই রাবীর ভাষ্যেই ফুটে ওঠে প্রাণবন্তভাবে।
বিশিষ্ট মাকামা সাহিত্যিক আল্লামা ইবনে আলী আল-হারীরী
মাকামা সাহিত্যের অঙ্গনে যিনি অমর খ্যাতির অধিকারী, তিনি হলেন আল্লামা ইবনে আলী আল-হারীরী। তাঁর মূল নাম আল-কাসিম, উপনাম আবু মুহাম্মাদ। তাঁর পিতার নাম আলী। বংশগতভাবে তাঁদের পরিবার রেশম ব্যবসায় যুক্ত থাকায় তাদেরকে “হারীরী”—অর্থাৎ রেশমী পরিবার—নামে পরিচিত করা হতো, এবং সাহিত্যজগতে এই নামেই তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
আব্বাসীয় আমলের ইরাকের বসরা নগরীর নিকটবর্তী মাশান নামক স্থানে ৪৪৬ হিজরী সনে তাঁর জন্ম। পরবর্তীতে তিনি বসরার বনু হারাম অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বিভিন্ন শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য ও ভাষাশাস্ত্রে শিক্ষা নেন সে যুগের বিখ্যাত আলেম ও ভাষাবিদ—আল্লামা কাসবীনী রহ. ও আল্লামা আবুল হাসান আলী আল-মুজাশিয়ী রহ.—এর কাছ থেকে।
আল্লামা হারীরী ছিলেন তীক্ষ্ণবুদ্ধি, প্রখর মেধাশক্তি ও সূক্ষ্ম চিন্তাধারার অধিকারী এক ধ্রুপদী সাহিত্যপুরুষ। আরবি অভিধান, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা, নাহু-সারফ এবং অলংকারশাস্ত্রে তিনি ছিলেন অনন্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী। ভাষার সৌকর্যে, শব্দচয়নে, বাগরীতির অভিনবত্বে এবং সাহিত্যিক উচ্ছলতায় তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যা তাঁকে আরবি গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে বিরল এক প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
আল্লামা হারীরীর গদ্যসাহিত্য
আরবি গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে আল্লামা হারীরীকে এক অলৌকিক শক্তিধর শিল্পী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর রচনার প্রতিটি বাক্য যেন কোনো স্বর্গীয় অনুপ্রেরণায় গঠিত—সুনিপুণ শব্দচয়ন, শৈল্পিক বাঁক, ছন্দময় আবহ ও অলংকারের মেধাবী প্রয়োগে তা নিজেই এক অনন্য সৌন্দর্য লাভ করেছে। কোথাও তাঁর ভাষা শান্ত প্রভাতবেলার মৃদুমন্দ বাতাসের মতো কোমল, আবার কোথাও তা স্ফুলিঙ্গের মতো চঞ্চল ও প্রবল আবেগময়।
বলা হয়ে থাকে—যদি ভাষার শক্তিতে পাথর গলে যেতে পারে কিংবা প্রজ্বলিত আগুন নিভে যেতে পারে, তবে তা কেবল হারীরীর ভাষার মাধ্যমেই সম্ভব হতো। তাঁর গদ্যচর্চার শ্রেষ্ঠ ফসল নিঃসন্দেহে তাঁর রচিত সুবিখ্যাত মাকামাসমূহ—যা আরবি গদ্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছে। এর বিস্তারিত আলোচনা সামনেই আসছে।
আল্লামা হারীরীর পদ্যসাহিত্য
গদ্যসাহিত্যে যেমন তাঁর অবদান অনবদ্য, তেমনি কাব্যচর্চাতেও তিনি ছিলেন সমান সিদ্ধহস্ত। উপদেশ, রম্যরচনা বা ধমক—যে প্রসঙ্গেই হোক না কেন, তিনি মুহূর্তেই একটি চমৎকার, সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থগর্ভ কবিতা নির্মাণ করতে পারতেন।
একবার তাঁর সুনাম শুনে এক ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে আসে। কিন্তু লোকটি হারীরীর চেহারা দেখে অভ্যন্তরীণভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা দ্রুত হারীরীর নজরে পড়ে। লোকটি যখন তাঁর কাছে কিছু লেখার অনুরোধ জানায়, তখন হারীরী তাকে নিম্নোক্ত চরণদুটি লিখে দেন—
ما أنت أول سارٍ غرّه القمرُ
ورائدٍ أعجبته خضرةُ الدمنِ
فاختَر لنفسكَ غيري إنني رجلٌ
مثلُ المعيدِيّ، فاسمع بي ولا تَرَنِ
অর্থাৎ, “তুমিই প্রথম নৈশপথিক নও, যাকে চাঁদের আলো বিভ্রান্ত করেছে/এবং তুমিই প্রথম চারণভূমি অন্বেষী নও, ভাগাড়ে উৎপন্ন শ্যামলতা যাকে মুগ্ধ করেছে// সুতরাং তুমি নিজের জন্য আমি ব্যতীত অন্য কাউকে (শিক্ষকরূপে) গ্রহণ করো/কারণ আমি মুআইদীর মতো, কাজেই তুমি আমার কথা শুনো, কিন্তু আমার চেহারা দেখো না//”
এই তীক্ষ্ণ রসিকতামিশ্রিত কবিতা শুনে লোকটি গভীরভাবে লজ্জিত ও বিস্মিত হয়। উল্লেখ্য, মুআইদী ছিলেন এক কল্পিত আরবি গাল্পিক চরিত্র—যোগ্যতা ও মর্যাদায় উঁচু হলেও চেহারায় ছিলেন কুৎসিত।
কাব্যরচনায় হারীরীর অনুকরণীয় আদর্শ ছিলেন জাহিলী যুগের শ্রেষ্ঠ কবিগণ—ইমরুল কাইস, যুহাইর, আমর ইবনে কুলসুম প্রমুখ। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই রচিত হয়েছে ‘বাহরে তাওয়ীল’ ও ‘বাহরে কামিল’—এই দুই দৃষ্টিনন্দন ছন্দবিন্যাসে। তাঁর একটি দিওয়ান বা কাব্যসমগ্রও বিদ্যমান।
মোটকথা, গদ্য ও পদ্য—উভয় ধারাতেই আল্লামা হারীরী ছিলেন সমান দক্ষ, সমান সমুজ্জ্বল।