কালচার প্রসঙ্গ : নাহদা, তুরাস, আধুনিকতা ও বিবিধ সুলুক-সন্ধান

মূল : ইমাম আহমদ তৈয়ব

শেখ মুজাহিদুল ইসলাম

নোট : কোনো সভ্যতার পতন যতটা না অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক, তারচেয়েও বেশি গভীর থেকে ঘটে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও ‘সাংস্কৃতিক খরা’র ফলে। আরব-মুসলিম বিশ্বের বিগত দুই শতকের পুনর্জাগরণের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়—জাগরণের একাধিক তরঙ্গ আসলেও সেই প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈয়ার করতে পারে নাই। সমকালীন মুসলিম চিন্তাজগতের এই অচলবস্থা শুধু অতীতের স্মৃতের চেয়েও বেশি; আজকের সামাজিক ও রাজনৈতিক পক্ষাঘাতের প্রধান কারণ।

​উপস্থাপিত প্রবন্ধে শাইখুল আজহার আহমদ তৈয়ব এই গভীর সংকটের বয়ানকে তলিয়ে দেখতে চেয়েছেন। একদিকে বিস্তারিত ব্যবচ্ছেদ করেছেন ইসলামকে স্রেফ ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানে বন্দি করতে চাওয়া সেকুলার পশ্চিমায়নবাদকে; অন্যদিকে ইশারায় এনেছেন শরিয়তের প্রসারতা ও রহমতকে হরণ করে ধর্মকে কঠোর ‘নিষেধাজ্ঞার তালিকা’য় রূপান্তর করা নব-উত্থিত চরমপন্থাকে। এই দুই উগ্রতার মাঝে দাঁড়িয়ে উনি তুলে ধরেছেন এই সংকট নিরসনে ইমাম মুহাম্মদ আবদুহুর সেই ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থাকে, যেখানে ঐতিহ্যে (তুরাস) শক্ত পা রেখে আধুনিকতাকে নেওয়া হয়েছিল সমালোচনামূলক নজরে।

​আকল (যুক্তি) ও নকলের (টেক্সট) চিরন্তন বন্ধন, ওহির সাথে মানবীয় প্রগতির মেলবন্ধন, শরিয়ত ও দর্শনের পরস্পরতা এবং ইসলামি দর্শনের কসমোলজির ক্লাসিক ভিত্তিগুলোকে নিবিড়ভাবে পরখ করার মধ্য দিয়ে আগায় এই পাঠ। আধুনিকতা, সেকুলারিজম ও ঐতিহ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে নিজেদের চিন্তার কম্পাসকে সিধা দিশায় রাখার প্রশ্নে, প্রবন্ধটি খারাপ না। — শেমু

শব্দগুচ্ছ : কালচার, নাহদা, তুরাস, আধুনিকতা, কলোনিয়ালিজম, জুলাই বিপ্লব, সাংস্কৃতিক খরা, ওয়েস্টার্নাইজেশন, সেকুলারিজম, এক্সট্রিমিজম, আকল, নকল, ওহি, তাজদিদ, শরিয়ত, ফালসাফা, মুহাম্মদ আবদুহু, রাফে রিফাত তাহতাবি, ইবনে রুশদ, মোল্লা সদরা, মাসকাল, ক্রিশ্চিয়ানিটি, সভ্যতা।

 

আজকের আরব-মুসলিম উম্মাহ যে ক্রুশিয়াল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসের ঠিক দুই শতাব্দী আগের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। অতীতে এই একই ধরনের পরিস্থিতি আমাদের প্রথম আরব নাহদার[1]প্রথম আরব নাহদা : ১৮ শতকের শেষভাগে শুরু হওয়া আরব রেনেসাঁ আন্দোলন। নাহদা … Continue reading কারণোপকরণ তৈরি করেছিল। আজ সেই একই পরিস্থিতি আবার ফিরে আসছে নাহদাকে সেই আছাড় থেকে উঠায়ে তোলার জন্য, যার চক্করে পড়ে প্রথম নাহদা কোনো ফল ফলাবার, ন্যাচরাল আউটপুট দেওয়ার আগেই, বন্ধ্যা হয়ে পড়েছিল—যে ফলাফল পুব-পশ্চিমের যেকোনো সমকক্ষ জাগরণ, বেশ স্বাভাবিকভাবেই দিতে পারত।

মূলত, যেকোনো অনুন্নত জাতির পতনের পেছনেই এই ইনক্যাপাসিটি ও পিছু হটবার মতিগতি, গোলমালে পরিবেশ—অবধারিত ভূমিকা ও অবজেক্টিভ কন্ডিশন হিসেবে কাজ করে। যারা জেগে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ভুল ডিরেকশনে পা বাড়ানোর কারণে খুব দ্রুতই পথ হারায়ে আবার একদম জিরো পয়েন্টে ফিরে আসছে, তাদের দশা এমনই হয়।

আমাদের দুইশত বছরের নাহদার ইতিহাসের দিকে তাকালে এই একই থিওরি খাটবে। আমরা জানি, আরব রেনেসাঁর আইকন রাফে রিফাত তাহতাবি[2]রিফাত রাফে তাহতাবি ছিলেন আধুনিক আরব রেনেসাঁ বা নাহদার অন্যতম পথিকৃৎ। … Continue reading তার ১৮০১ থেকে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের যাপিত জীবনের সময়কালে একটা প্রগ্রেসিভ ও সাস্টেইনেবল জাগরণের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুলুক-সন্ধান করেছিলেন—ডেমোক্রেসি, সংবিধান, সংসদ, সরকারী কাজের তদারকি, আইনের লিমিটেশন আরোপ, স্বৈরতন্ত্রের অবসান এবং ওয়ুমেন এমপাওয়ারমেন্টের মতো ইসুগুলো—যেগুলো, আশ্চর্যের বিষয়, আজ আমাদের সময়ে আবার নতুন করে সামনে আসছে; যেন এগুলো নিয়ে অতীতে কোনো রিসার্চ, থিওরি কিংবা একাডেমিক ডিবেটই হয় নাই।

অথচ তাহতাবির ডাক অরণ্যে রোদন ছিল—তা না, তাঁর সুরে সুর মিলিয়েছিলেন আরও বহু লিডার, যারা এর পেরেশানী কান্ধে নিয়ে রেনেসাঁর প্রশ্নকে সামনে আগায়ে নিয়ে গেছেন। জামালুদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আবদুহু, আবদুর রহমান কাওয়াকেবি, রশিদ রেজা, ইবনুল বাদিস—উনাদের মতো পুরোধা রুহেদের নাম আমরা এইখানে ইয়াদ করতে পারি। এই গ্রেট নামগুলো তো কেবল নমুনা মাত্র; তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের পরে যেই জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবীরা আসছেন, তাদের তালিকা ভালোরকম দীর্ঘ।

ঐতিহাসিকেরা আরব নাহদা প্রকল্পের দুই ফেইজের কথা বলেন :

প্রথম ফেইজ : ফাউন্ডেশন পিরিয়ড

১৯ শতকের প্রথম ভাগে মিশরে মোহাম্মদ আলী ও তাঁর ছেলে ইব্রাহিম পাশার হাত ধরে এই ফেইজের সূচনা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মডার্ন আর্মি, অ্যাডভান্সড ইন্ডাস্ট্রি ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ভর করে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি করা। কিন্তু পশ্চিমা উপনিবেশ শক্তির আগ্রাসনের মুখে এই চেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে। উপনিবেশ শক্তি সুযোগ খুঁজছিল মিশর ও আরব প্রাচ্যের ওপর কীভাবে ঝাঁপায়ে পড়া যায়। ঠিক একই সময়ে মিশরের পাশাপাশি তিউনিশ ও মরক্কোর মতো অন্যান্য আরব দেশেও এই ধরনের জাগরণের চেষ্টা চলছিল—কিন্তু উপনিবেশ শক্তির যথাক্রমে অভিভাবকত্ব ও প্রোটেক্টোরেট আরোপ এবং ডিরেক্ট অকুপেশন কারণে—সেগুলোর পরিণতিও একইরকম হয়।

দ্বিতীয় ফেইজ : জুলাই বিপ্লব পিরিয়ড

২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এই ফেইজের শুরু। এই বিপ্লবের ইশতেহার আমাদের ডেভেলপমেন্ট, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন, অবৈতনিক শিক্ষা, মিলিটারি ও ইকোনমিক পাওয়ার বিল্ডআপ এবং আরব বিশ্বের ভিতর-বাহিরের ন্যাশনাল লিবারেশন মুভমেন্টগুলোর সাপোর্ট—ইত্যাদির মতো বড় বড় স্বপ্নের ব্লু-প্রিন্ট দেখায়।

৬০-এর দশকে মিশরের এই দ্বিতীয় রেনেসাঁর সমান্তরালে সিরিয়া, ইরাক ও আলজেরিয়াতেও একই হাওয়া লাগে। কিন্তু এই দ্বিতীয় রেনেসাঁর ভাগ্যও প্রথমটার চেয়ে ভালো ছিল না। ১৯৬৭ সালের জুনের পরাজয়ের (আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ) পর মিশরের এই প্রকল্পে ধস নামে এবং তার সাথে সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্দোলনও কোলাপ্স করে।

তবে এই সংক্ষিপ্ত পেপারে আমার অভিপ্রায় রেনেসাঁর এই দুই ফেইজের পতন ও ব্যর্থতার পলিটিক্যাল-ইকোনমিকাল কারণোপকরণ খুঁড়ে বের করা না কিংবা এ ডিবেট করাও না যে, অন্যান্য দেশ যেখানে আমাদের সাথে বা পরে শুরু করেও গ্লোবাল লিডারশিপের জায়গায় পৌঁছে গেল, সেখানে আমরা কেন বারবার প্রায় জিরো পয়েন্টে ফিরে এসে হাত পাতার মতো অবস্থায় দাঁড়ালাম।

বরং আমার আসল ফোকাস হলো কালচারের হালহকিকত—যা একসময় অত্যন্ত স্ট্রং, প্রমিজিং ও ডাইনামিক একটা শুরুওয়াত পেলেও, ধীরে ধীরে কাউন্টডাউন শুরু করে আজ প্রায় একটা ‘কালচারাল ভ্যাকুয়াম’ বা সাংস্কৃতিক খরায় এসে ঠেকেছে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি বা তার আগের কালচারাল হাইটের সাথে তুলনা করলেই এই খরা টের পাওয়া যায়।

আমি দাবি করছি না, আমি পাঠকের সামনে ইসলামি কালচারের ভিশনারি টেনশন ও গোলযোগের আসল রোগ আঙুল দিয়ে দেখায়ে দিতে পারব—এটা অত্যন্ত জটিল ও সেনসিটিভ এলাকা। তবে আমি যদি সরাসরি এই দাবি করি যে—ইসলামি কালচারের পেরেশানি আসলে আমাদের সার্বিক কালচারাল পেরেশানিরই বাই-প্রোডাক্ট—খুব একটা হয়তো ভুল বলা হবে না।

 

সাংস্কৃতিক খরা : ইসলাম, ক্রিশচিয়ানিটি, সেকুলারিজম

আজকের দিনে ইসলামি কালচারের এই পেরেশানিই তার নিজস্ব চিহ্ন; এ পেরেশানিই দুনিয়ার অন্যসব ধর্মীয় কালচার থেকে তাকে আলাদা করে—যেহেতু ইসলাম ছাড়া অন্য যেকোনো ধর্মীয় কালচার সাধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেও নিজের মতো বিকশিত হতে পারে, যেহেতু সেসব কালচারের ডিসকোর্স মূলত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং ব্যক্তির চারপাশের পলিটিক্যাল, সোশ্যাল, কালচারাল ও আর্টিস্টিক সিস্টেমের গভর্ন্যান্স—যার ছায়াতলে বেঁচেবর্তে থাকে ব্যক্তি—তার সাথে আলাপে যেতে চায় না।

ফলে ইসলামি কালচারের এই যে সমাজ ও সভ্যতার যাবতীয় পরিঘটনায় ওতপ্রোতভাবে জড়ায়ে থাকা এবং অন্যান্য ধর্মের কেবল ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ থাকা—এ স্বয়ং ইসলাম ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের মৌলিক স্বভাবের তফাত; ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাসের সাথে ধর্মের সম্পর্কের তফাত। একই সাথে এটা পুব ও পশ্চিমের ওহি, নবুওয়ত ও ধর্ম বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিরও বড় তফাত।

যেখানে পুবের সভ্যতায় ওহি পবিত্র, পরম, মহিমান্বিত; মানুশ, সমাজ এবং খোদ ইতিহাসেরও ঊর্ধ্বে অবস্থিত; হেদায়েতকারী, দিকপ্রদর্শক, শোধনকারী শক্তির নাম; নশ্বর জিন্দেগির কিংবা অনন্তকালের রাহে সত্যের, সুন্দরের, কল্যাণের, মূল্যবোধের ভাব-অর্থ উন্মোচনকারী নাম—সেখানে এই পবিত্র সব উৎসের বিষয়ে পশ্চিমা সভ্যতার নজর পুরোই ভিন্ন; তার কাছে মানুশের রুহের বদলে, তার বডি আর প্লেজারই হলো পবিত্র, মানুশই সেখানে মহাবিশ্বের অক্ষ আর কেন্দ্র।

তাই ধর্মকে পশ্চিমা সভ্যতায় কাজ করতে হয় এই অত্যন্ত ন্যারো আর দমবন্ধ করা সীমানার ভিতরে, ফলে সেখানে ধর্ম শুধু ব্যক্তির পার্সোনাল চয়েসের একটা প্রাইভেট ম্যাটারেই পরিণত হয়েছে—ব্যক্তির স্বাধীনতা একে ভালো মনে করলে ভালো, আর মন্দ মনে করলে মন্দ।

এভাবেই ধর্মকে সেখানে একটা কর্নারড ও প্যাথেটিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজের সংস্কৃতি, সভ্যতা, এটিকেটের পথপ্রদর্শক যে সক্রিয় মূল্যবোধের কাঠামো—তা থেকে ধর্ম পুরোপুরি অবসর নিয়েছে। আর পশ্চিমের কালচারে এই দীন-দুনিয়ার বিচ্ছেদের পেছনে জরুরি সহায়তা করেছে ক্রিশ্চিয়ানিটির সেই ক্লাসিক বাইনারি—যাতে খোদার পাওনা আর সিজারের পাওনাকে সেপারেটলি দেখা হয়েছে[3]বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের বিখ্যাত বাক্যাংশ : “যা সিজারের, তা সিজারকে দাও; … Continue reading; এটাই আলটিমেটলি সেকুলারিজমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করেছে, সমাজের পথপ্রদর্শনের যাবতীয় কেন্দ্র থেকে সার্বিকভাবে তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

এই মুসিবত দেখে খ্রিস্টধর্মের কিছু মুখলিস উলামা বাইবেলের নতুন ইন্টারপ্রিটেশন এবং চার্চের ফাংশন রি-ডিফাইন করার কোশেশ করেছেন; আশা করেছেন সমকালীন ওয়েস্টার্ন মানুশের ভাবমূর্তিতে ইঞ্জিলের মূল্যবোধ আর মডার্ন সোসাইটির মূল্যবোধ উভয়ের একটা রিকনসিলিয়েশন ঘটানো যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা সমাজের ইউটিলিটি, সেলফ-ইন্টারেস্ট, কনজিউমারিজম এবং ওভার-প্রোডাকশনের যে ম্যাটেরিয়ালিস্টিক মূল্যবোধের স্রোত—তার কাছে এই চেষ্টা ভেসে গেছে। এইজন্য মাসকাল সাহেব ‘সেকুলারাইজেশন অব ক্রিশ্চিয়ানিটি’ বইতে তার বিখ্যাত কথাটা বলেছেন :

“আমরা আসলে দুনিয়াকে খ্রিস্টধর্মে ঢুকানোর বদলে, খ্রিস্টধর্মকেই দুনিয়ার ভিতর ঢুকায়ে দিতে চাচ্ছি।”[4]সৈয়দ নকিব আল-আত্তাস, Prolegomena to the Metaphysics of Islam : An Exposition of the Fundamental Elements of the Worldview of Islam, পৃ : ৩১; … Continue reading

পশ্চিমে ধর্মীয় কালচারকে যেভাবে পুরোপুরি ডিশমিশ করে দেওয়া হয়েছে, ইসলামি পুববিশ্বে তেমনটা ঘটা কখনই সম্ভব না; কারণ ইসলামি কালচারের ছাতা স্বয়ং ইসলামের মতোই বিস্তৃত; ইসলামের শরিয়তের প্রতিনিয়ত নতুন হয়ে উঠবার ‘তাজদিদি’ শক্তি থেকেই এ কালচারের জান ও জাহান উৎসাহিত। এখানে কোনো অবস্থাতেই দীন-দুনিয়াকে আলাদা করার সুযোগই নাই; কারণ—ইসলামের নজরে—এ দুই মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আর এ তো জানা কথাই যে, ইসলামের সভ্যতাই হয়ে থাকবে একমাত্র ব্যতিক্রম, যে নিজের দর্শনের মাধ্যমে এমন প্রধান দ্বিমুখী ধারণাগুলোকে হাতে হাত মিলিয়েছে—যেগুলো অন্য কোনো সভ্যতায় কখনো হাত মিলাতে পারে নাই—যেমন দুনিয়া ও আখেরাত, ধর্ম ও রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও সমাজ, দেহ ও রুহের মতো দ্বৈতগুলোর সে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

এর সরাসরি মানে হলো—ইসলামি সিস্টেম এবং সেকুলার সিস্টেম দুই পরস্পরবিরোধী সত্তা—এরা কখনোই এক বিন্দুতে মিলতে পারে না। কারণ সেকুলারিজম হলো ওয়ান-ডাইমেনশনাল এবং এক্সক্লুসিভ—‘আইদার-অর’ (হয় এটা, নয় ওটা) লজিকে চলে। অন্যদিকে ইসলাম হলো টু-ডাইমেনশনাল এবং ইন্টিগ্রেটেড—‘দিস-উইথ-দ্যাট’ (এটার সাথে ওটাও) লজিকে বিশ্বাস করে।

তাই মুসলিম সমাজে ইসলামি কালচারকে খতম করে তার জায়গায় সেকুলার অর্ডার ইমপোজ করার অতীতের সমস্ত চেষ্টা যেভাবে ফেইল করেছে, ভবিষ্যতের যেকোনো উদ্যোগও ঠিক একই পরিণতির মুখোমুখি হবে। তবে হ্যাঁ, যদি ইসলামকে তার রুট থেকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলা যায়, অথবা নিদেনপক্ষে, একে কোনো রকমের লিগ্যাল কোড ছাড়া স্রেফ একটা এবস্ট্রাক্ট মোরাল কোডে পরিণত করা যায়—কেবল সেই কন্ডিশনেই, ইসলামি শরিয়তের অল্টারনেটিভ হিসেবে একটা সেকুলার সিস্টেমের কথা কল্পনা করা যেতে পারে।

সুতরাং লোকে যেমন বলে ‘সেকুলারিজম অথবা সর্বনাশ’—সমাধান কখনোই তা না; কারণ একটা সমাজ একই সাথে ইসলামি এবং সেকুলার হবে—এমন কল্পনা ইল্লজিক্যালি। কারণ সেকুলারিজম কোনো পরিপূরক বিষয় না, এটা ধর্মের একটা অল্টারনেটিভ সিস্টেম যা ধর্মকেই খারিজ করে দেয়। সেকুলারিজম তার বেস্ট-কেস সিনারিওতেও পরিবার, ইকোনমি, পলিটিক্স, এডুকেশন, আর্ট, কালচার বা মিডিয়ার মতো সোশ্যাল ইনস্টিটিউশনগুলো থেকে ধর্মের প্রভাবকে পুরোপুরি ছেটে দেয়। সেকুলার ব্যবস্থা এগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই ধর্মসমূহের, তার মাকাসেদের, সর্বজনীন হেদায়েতের, পরোয়া করে না।

যেমন সেকুলার পশ্চিমে পরিবার নামক কাঠামো কোনো ডিভাইন ল’ বা ধর্মীয় হালাল-হারামের বাউন্ডারি মেনে দাঁড়ায় না। সেখানে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক যেভাবে খুশি গড়ে উঠতে পারে এবং ধর্মীয় অর্থে কোনো আখলাকি বা রুহানি মাত্রা ছাড়াই তা ঘটতে পারে। বড়জোর অত্যন্ত সেনসিটিভ এই সম্পর্কটাকে একটা শুকনো লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের নজরে কেবল ‘অধিকার’ আর ‘দায়িত্বে’র ছকে মাপা হতে পারে।

আরেকটা নমুনা বলা যায় : হোমোসেক্সুয়ালিটি ফেনোমেনা বা নারী-পুরুষ সমলিঙ্গ বিয়ে। সেকুলার সমাজে এটা একটা বেসিক হিউম্যান রাইট এবং পার্সোনাল ফ্রিডম; আইন দ্বারা সুরক্ষিত; আইন সমকামী দম্পতির উত্তরাধিকার ও পালক সন্তান নেওয়ার মতো সমস্ত লিগ্যাল রাইটস তদারকি করে, আর সমাজ তার জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ পাওয়ার দিয়ে একে হেফাজত করে।

দু-চারদিন আগে খবরের কাগজ হরেক আজব খবরের সাথে এই খবর নিয়ে আসল যে—সমকামিতার বিকৃতি এক প্রকার পবিত্রতাও হাসিল করে ফেলেছে। কী সর্বনাশ! একজন সমকামী আমেরিকার চার্চে ইলেকশনের মাধ্যমে ‘বিশপ’ নির্বাচিত হয়েছে, তার দায়িত্ব—খ্রিস্টীয় নৈতিকতা রক্ষা করা এবং তা মানুষের কাছে বিশ্বস্ততার সাথে ডেলিভার করা; এহেন পরিস্থিতিতে নাকি সমকামিতা ও সামকামিদের পক্ষে তাঁর প্রোপাগান্ডা ও প্রচারের পথ বন্ধ করার রাইটও কারোর নাই!

মূলত এই হলো সেই সর্বনাশ, যার কথা দার্শনিক মাসকাল আমাদের আগেই সতর্ক করে বলেছেন : সেকুলারিজমের চক্করে খ্রিস্টধর্মই দুনিয়ার গহ্বরে ঢুকে যাবে, দুনিয়াকে আর খ্রিস্টধর্মের রঙে রাঙানো হবে না। মাসকালের কথাই সত্য হয়েছে; কারণ সেকুলার সিস্টেমে মূল্যবোধের মাপকাঠিই হলো : লাভ, স্বার্থ আর ভোগ—তা এখন বৈধ হোক আর অবৈধ, নীতির অনুগত হোক আর দুর্গত—তাতে কিছু যায় আসে না।

সেকুলারিজম কোনো মূল্যবোধের শাশ্বততায় ও বিধানের পরমতায় বিশ্বাস করে না। তার নজরে মহাবিশ্বের সবকিছুই ডাইনামিক, বা ইতিহাসের বিবর্তনের সাথে পরিবর্তনযোগ্য। গতকাল যা ভালো ছিল, আজ তা মন্দ হতে পারে, আবার আজ যা জাস্টিফাইড, কাল তা আনজাস্টিফাইড বলে গণ্য হতে পারে।

যেহেতু সেকুলার দর্শনের প্রথম স্বতঃসিদ্ধই হলো ‘রাষ্ট্র থেকে ধর্মের বিচ্ছেদ’—তাই এই খিলানের ওপর দাঁড়ায়ে আসা সকল ফলাফলই নিজের স্কুল অফ লজিক অনুযায়ী সঠিক, সুষম, গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু ভালো-মন্দের বিচারক হিশেবে যখন ধর্মকে মাপকাঠি থেকে বাদ করে দেওয়া হবে, তখন মানবিক মূল্যবোধের দাড়িপাল্লা যে ডগমগ করে ভেঙে পড়বেই—তা আর কী বিচিত্র!

আমরা কোনোভাবেই এ কথা ডিনাই করি না যে, পশ্চিমা সভ্যতায় এমন বহু কিছু আছে, যা প্রশংসার দাবিদার এবং যা দেখলে চোখ ধাঁধাবেই। টেকনোলজিকাল, সায়েন্টিফিক ও ইন্টেলেকচুয়াল স্তরে, এমনকি হিউম্যানিটারিয়ান স্তরেও, এই সভ্যতা মানব ও মানবতার অসামান্য উপকার করেছে। কিন্তু এই বিশাল সভ্যতা যখন আসমানি আলোর দিশা থেকে নিজেকে মাহরুম করেছে, তখন সে যে ‘সর্বনাশে’র গর্তে গিয়ে পড়েছে, তার ভয়বহতাকে না-দেখা করা কঠিন। আমার নজরে এই সভ্যতা ডান হাতে আমাদের যা দিয়েছে, বাম হাতে তার চেয়েও অনেক বেশি কেড়ে নিয়েছে।

 

পুবের সংস্কার ও ইমাম মুহাম্মদ আবদুহুর অভিজ্ঞতা

আমাদের আরব দুনিয়ায় নেওয়া যত রেনেসাঁর প্রকল্প—তা থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ খারিজ করার সেকুলার ফিলোসফিই ছিল আমাদের ন্যাশনাল কালচারের কফিনে ঠোকা প্রথম পেরেক। এ কথাটি আমাদের ইসলামি কালচারের বেলায় আরও বেশি সত্যি।

আমরা যদি একটু চিন্তা করে দেখি, ইমাম মুহাম্মদ আবদুহুর অভিজ্ঞতা এক সময় পর্যন্ত দারুণভাবে সফল হলেও, পরে কেন মুখ থুবড়ে পড়ল? কেন আজকের দিনের বুদ্ধিজীবীরা—এমনকি যারা ইসলামি কালচারের টুঁটি চেপে ধরতে চায় তারাও—ইমাম আবদুহু ও তাঁর ছাত্রদের অভিজ্ঞতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে এবং একেই অনুসরণ-দরকার আদর্শ নমুনা বলে মনে করে?

এর প্রধান কারণ যথাসম্ভবত এই যে, ইমামের অভিজ্ঞতা সঠিক দিশায় এগিয়েছিল। তিনি এক কলমের খোঁচায় হাজার বছরের ‘তুরাস’কে বাতিল করে ময়লার স্তূপে ফেলে দেন নাই, আবার পশ্চিমা সভ্যতার সাথে শূন্য হাতেও মুআমালা করেন নাই। তিনি প্রথমে নিজের তুরাসের জমিনে পা গেড়ে দাঁড়িয়েছেন এবং সেই শক্তির ওপর ভর করেই পশ্চিমের সায়েন্টিফিক ও পলিটিক্যাল অর্জনগুলোর ওপর নিজের ক্রিটিক্যাল বুদ্ধিবৃত্তিক নজর খাটিয়েছেন।

তাঁর মডেল একটা চমৎকার সিন্থেসিস ছিল—সেখানে একদিকে ছিল পশ্চিমা সভ্যতার হিউম্যানিটারিয়ান ও এথিক্যাল কনসেপ্টগুলো, আর অন্যদিকে ছিল ইসলামি ঐতিহ্যের অন্তর্গত নমনীয় শরয়ী পলিটিক্যাল কনসেপ্টগুলো—যেখানে ‘নুসুস’, ‘অকাট্য টেক্সট’ ও ‘ফাহাম’ তিনটাই ছিল। এই তরতিবের মাধ্যমে ইমাম ইসলামের সহজতা, উদারতা ও তার মডারেশন অফ সিভিলাইজেশনের সাথে পশ্চিমা সভ্যতার হিউম্যানিস্টিক-এথিকাল দিকটার সমীকরণ করেছিলেন।

ইমাম মুহাম্মদ আবদুহু ও তাঁর মুখলিস ছাত্ররা অতি সাধারণ একটা স্বতঃসিদ্ধের ওপর ভিত্তি করে কাজ শুরু করেছিলেন যে—ইসলামি সভ্যতা পশ্চিমা সভ্যতা থেকে তেমন যেকোনো কিছু গ্রহণ করতে পারে যা তার নিজের কাছে নাই—যতক্ষণ না তা ইসলামের ফান্ডামেন্টাল, প্রিন্সিপাল ও অকাট্য টেক্সটের সাথে কনফ্লিক্ট করছে। যেমন আহলে কিতাবদের ভিতরে থাকা ইনসাফপূর্ণ বিধিরেখার মুসলিম সমাজে প্রয়োগ জায়েজ হওয়ার সপক্ষে ইমাম আবদুহু ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়ার জবানে এই তুরাসি কায়েদার ওপর ভর করেছিলেন যে—“ন্যায় ও ইনসাফের আলামত যে পথেই প্রকাশ পাক না কেন, তা-ই মূলত আল্লাহর শরিয়ত ও তাঁর দীন।”[5]ইবনুল কাইয়্যিম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা : ১/৩১, দারু আলামিল ফাওয়ায়েদ, ১ম … Continue reading

ঠিক একইভাবে তিনি ইসলামের তুরাসের ওপর ভর করে ইসলামের রাষ্ট্রকাঠামো থিওক্রেটিক বা ‘ধর্মরাষ্ট্র’—এহেন ধারণা রিজেক্ট করেছিলেন; কারণ শাসক নিযুক্ত করার ও বরখাস্ত করার অথরিটি তো হলো জনতা, “সুতরাং শাসক সর্বতোভাবেই একজন সিভিল রুলার মাত্র।”[6]মুহাম্মদ ইমারা, আল-ইসলাম ওয়া কদায়াল আসর : ২/৪৫, রওয়াবিত লিন-নাশর, ২০০৮ হি.

 

পশ্চিমায়ন ও তুরাসের ইনকার

আমরা মূলত যেই কনক্লুশনে পৌঁছাতে চাচ্ছি তা হলো—ইমাম আবদুহুর এই অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই পশ্চিমা সভ্যতার নোংরা, আন-এথিক্যাল উপাদানের সাথে উম্মাহর জীবনব্যবস্থার সমীকরণের ঘটনা ছিল না। আর তা কীভাবেই বা সম্ভব? এই দুই পরস্পরবিরোধী সত্তা তো কখনো এক বিন্দুতে মিলতে পারে না। কিন্তু এই সফল অভিজ্ঞতা দ্রুতই পশ্চিমায়িতদের হাতে গিয়ে ধর্মকে ডিনাই করার ও ঐতিহ্যের সাথে এপিস্টেমোলজিক্যাল ব্রেক করার সংকটে পড়ে গেল, এবং আকারে ও প্রকারে—পশ্চিমের সাথে একাত্ম হতে চাইল; উম্মতের তুরাস, ইতিহাস ও ধর্মের অল্টারনেটিভ হিসেবে বামপন্থী ও লিবারেল—এ দুই ডানার সেকুলারিজম এবং ন্যাশনালিজম প্রতিষ্ঠার ডাক দিল। এই পশ্চিমায়িত গ্রুপ তুরাসের ওপর আক্রমণ চালাতে, একে অবমূল্যায়ন করতে কোনো দ্বিধা করল না, তারা প্রোপাগান্ডা ছড়াতে লাগল—এই ঐতিহ্য উন্নতি ও রেনেসাঁর পথের পাথরস্বরূপ এবং ট্রাডিশন ও মডার্নিটি হলো বিপরীত দুই মেরু; ফলে যতক্ষণ না আমরা নিজেদের হাত থেকে ঐতিহ্যের ধুলাবালি ধুয়ে সাফ করছি, ততক্ষণ আমাদের রেনেসাঁর প্রকল্প নিজ পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারবে না।

ঠিক এই মোড়েই ইসলামি কালচার—যা ইমামের মডেলের অনন্য শক্তির উৎস ছিল—এমন এক ক্রাইসিসে পড়ল যার মাশুল তাকে আজও দিতে হচ্ছে। যদিও ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ও তার পরবর্তী গ্লোবাল পলিটিক্সের ভয়াবহ সন্দেহজনক ইমপ্যাক্ট দেখে, এই পশ্চিমায়িত  গ্রুপের অনেকেরই মোহভঙ্গ হয়েছে এবং তারা নিজেদের পজিশন রিভিউ করে কিছুটা রেসপন্সিবল আচরণ করতে শুরু করেছে। তবুও ময়দান এখনো তুরাসের প্রতি বৈরিতা ও উপহাসে ভরে আছে; অবস্থা এমন হয়েছে যে, কোরানের আয়াত—“তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির জন্য যাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর ওপর ঈমান রাখো”[7]আলে ইমরান : ১১০—নিয়েও এক পশ্চিমায়নবাদীর[8]সচেতনভাবেই লেখক, এখানে এবং সামনে, ব্যক্তিটির নাম অনুল্লেখ রাখবেন। ইসলামি … Continue reading পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিতে মুখে বাধে নাই।

কারণ মুহতারামের লজিকে নাকি মনে হয়েছে, এই আয়াত মুসলমানদের মনে সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সের জন্ম দেয়; অথচ সেই বুদ্ধিজীবী মহদয়ের আরেক আয়াতে গিয়ে কবরের মতো নিশ্চুপ হয়ে থাকা আমার বুঝে ধরল না, যেখানে বনী ইসরাইলকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে :

“হে বনী ইসরাইল, স্মরণ করো আমার সেই নেয়ামতকে যা আমি তোমাদের দান করেছি, এবং এই যে, আমি তোমাদের জগতবাসীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।”[9]আল-বাকারাহ : ৪৭

আজও পশ্চিমায়িতদের লিট্রেচারে আমাদের ইসলামি কালচারকে ট্রোল করা হয় এই বলে যে, এটা ‘তোতাপাখির কালচার, যেখানে ছাত্ররা না বুঝেই শুধু মুখস্ত করে এবং এটা ফরাসি দার্শনিক কঁদর্সে-র থিওরির সাথেও মেলে না—এটা বরং অন্ধবিশ্বাসপূর্ণ, ইন্ট্রুডাকশন কালচার, যার পেডাগজি ভরা অন্ধকার—যা মানুশের মনে ফোবিয়া আর হিস্টিরিয়া পয়দা করে। আরও বলা হয়—এই কালচার ফিলোসফির সাথে লড়াই করে, ফিলোসফারদের কাফের বলে, টেক্সটের অনুকরণের (নকল) স্বার্থে রিজনের (আকল) গলা চেপে ধরে, নারীদের প্রতি বৈরিতা ছড়ায় এবং অমুসলিমদের প্রতি দুশমনি শেখায়; এছাড়াও শেখায় এভুলুশন না, পারমানেন্সই হলো খোদার দেওয়া জগৎ-প্রকৃতির নিয়ম!

আর এসব সংকট নিরসনে এই (ইসলামি কালচারের!) রিফরমিস্টের সলিউশন : আমাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার স্থলে, এনলাইটিং শিক্ষাব্যবস্থা—স্পেসেফিকলি হয়তো ফ্রেঞ্চ শিক্ষাব্যবস্থা—চালু করা।

 

ঐতিহ্যের হাকিকত : শরিয়ত ও ফিলোসফির মেলবন্ধন

যেই এইসব কথাবার্তা পড়বে, তার মন ভারী হয়ে উঠবে এই ভেবে যে, কতিপয় কলমগুলো কত নিচে নেমে গেছে। কোনো ধরনের সোর্স ডকুমেন্ট ছাড়া, কিংবা যে বিষয়ের ওপর কথা বলছেন তার প্রাইমারি সোর্সেসগুলোতে সামান্য চোখ বুলানো ছাড়া, এমন সব সেনসিটিভ একাডেমিক বিষয়ে যেই ক্যাজুয়াল রায় তারা দিয়ে বসেন, সত্যিই সারপ্রাইজিং।

তাদের এইসব কথা যে কতটা বেসলেস এবং কোনো রেসপন্সিবল স্কলারের কথা না, বরং চায়ের দোকানের আড্ডার কথা, তা প্রমাণের জন্য আমি আমাদের মজলুম ঐতিহ্যের কয়েকটা কুইক ফিচার ইনসাফগার পাঠকের সামনে তুলে ধরছি; যাতে বোঝা যাবে, আধুনিকায়ন ও তাজদিদের বুলি আউড়ে আমাদের মাথা খারাপ করে দেওয়া এই ক্রিটিকরা আসলে তুরাসের কাছে কতটা আউটসাইডার ও ইগনোরেন্ট :

প্রথমত : আমাদের কালচার রিজনিংকে ডিনাই করে—এই দাবি সত্য নয়; বরং সত্য এর ঠিক উল্টাটা। এ তুরাসের সাথে পরিচিত যেকোনো জুনিয়র স্টুডেন্টও যে গোল্ডেন রুলটা মুখস্থ রাখে তা হলো : “

যখন আকল (রিজন) আর নকলের (টেক্সট) মাঝে বিরোধ দেখা দিবে, তখন আকলকেই প্রেফারেন্স দেওয়া হবে এবং নকলের ইন্টারপ্রিটেশন করা হবে।”

অর্থাৎ কোরান বা হাদিসের কোনো টেক্সটের লিটারেল মিনিংয়ের সাথে যদি যুক্তির সিদ্ধান্তের কনফ্লিক্ট হয়, তবে নিয়ম হলো—যুক্তির সিদ্ধান্তকেই হোল্ড করা এবং সেই টেক্সটকে এমনভাবে তফসির-তাওয়িল করা, যা যুক্তির সাথে মিলে যায়। আমাদের ইসলামি কালচারে আকল তো হলো শরিয়তেরই প্যারালাল এক এন্টিটি; ইমাম গাজালি আকলকে বলেছেন ‘ইন্টারনাল শরিয়ত’ আর শরিয়তকে বলেছেন ‘এক্সটারনাল আকল’।[10]ইমাম গাজালির ‘মাআরিজুল কুদস’ কিতাব থেকে। গাজালি প্রথাগত অর্থে … Continue reading

ইনসাফগার পাঠকের বুঝবার জন্য এই এক দলিলই যথেষ্ট যে, ইসলামি কালচারের হৃদয়ে রিজন ও রেশনালিটি কতটা গভীরভাবে প্রোথিত—আল্লাহর ওপর ঈমান আনার প্রথম কদমটাই হলো একটা রেশনাল কদম। এমনকি রসুলের নবুওয়তের সত্যতার প্রমাণও একটা রেশনাল এভিডেন্স; সেখানে শুধু নকল বা টেক্সট দিয়ে কাজ হয় না। তুরাসের খবর রাখা যেকোনো শিক্ষিতজন জানেন যে, মোজেযার সত্যতা প্রমাণের ভিত্তিও এমনকি লজিক্যাল, টেক্সুয়াল না। খোদার ওয়ুজুদের প্রমাণ দাঁড়ায়ে আছে যুক্তির ওপর, কেবল টেক্সটের ওপর তা দাঁড়াতে পারে না, কারণ নকল দিয়ে খোদার ওয়ুজুদ প্রমাণ করতে গেলে এক ধরনের লজিক্যাল ফ্যালাসি : অসম্ভব আবর্তনের জন্ম হয়, যা লজিক্যালি ইম্পসিবল।

আমাদের কালচার নিয়ে মশকরাকারী বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, বাস্তবতা হলো—কোরানে ‘আকল’, ‘ফিকির’, ‘নজর’ ধাতুর শব্দ এবং সেগুলো থেকে আগত শব্দ ১২০ বারেরও বেশি ব্যবহার হয়েছে। কোরান এলেম ও একিনের স্তরকে শক ও জনের স্তর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। কোরান ‘হুজ্জত’ ও ‘বুরহান’কে বলেছে দলিল হিশেবে পেশ করার একমাত্র পথ। যারা নিজেদের আকল খাটায় না এবং বাপ-দাদার বা চিন্তার খরায় ভোগা মুরুব্বিদের তাকলিদ করে অলস বসে থাকে, কোরান তাদের পষ্ট তীব্র ভাষায় ধীক্কার দিয়েছে। এই সমস্ত ফান্ডামেন্টালের ওপর দাঁড়ায়ে যে কালচারের জন্ম, তা কখনো আকলের সাথে লড়াই করতে পারে?

দ্বিতীয়ত : আমাদের কালচার ফিলোসফি ও ফিলোসফারদের শত্রু—এই দাবিও সম্পূর্ণ ভুল। আমাদের উপহাসকারী বুদ্ধিজীবী মহোদয়কে বলব তার কেবল একটি ক্লাসিক কিতাবের দিকে নজর ফিরানোই যথেষ্ট হবে—আর সেটি হল ইবনে রুশদের ক্লাসিক ফাসলুল মাকাল ফি-মা বাইনাল হিকমাতি ওয়াত তাশরি মিনাল ইত্তিসাল[11]ফাসলুল মাকালের দুইটা ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যায়। একটা ব্রিটিশ ফিলোসফার ও … Continue reading; এই কিতাব লেখাই হয়েছে ফিলোসফি (যাকে তুরাসের ভাষায় ‘হেকমত’ বলে) ও শরিয়তের মধ্যকার নিবিড় সহাবস্থানকে ডিকোড করার জন্য। এই কিতাবে ইবনে রুশদ পরিষ্কার করে বলেছেন :

“আমরা মুসলমানেরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, ডেমোনস্ট্রেটিভ রিজনিং (নজরে বুরজানি) কখনোই শরিয়তের অকাট্য বিষয়ের বিপরীত হতে পারে না; কারণ সত্য কখনো সত্যের বিরোধী হতে পারে না, বরং সত্য সর্বদা অন্য সত্যের সাথে হাত মিলায় এবং তার সত্যতার সাক্ষ্য দেয় (…) হেকমত (দর্শন) হলো শরিয়তের সখী এবং তার বুকের দুধের বোন…

 

শরিয়ত আর ফিলোসফি বাইনেচার একে-অপরের সহযাত্রী, এসেন্স ও প্রবৃত্তির টানেই তারা একে-অপরের দিলদার।[12]ফাসলুল মাকাল : ৩১, ড. মুহাম্মদ ইমারার তাহকিককৃত, দারুল মাআরিফ

আমাদের কালচার যদি ফিলোসফি আর ফিলোসফারদের বিরুদ্ধেই হয়ে থাকত, তবে আমাদের আরব-মুসলিম দুনিয়ার ইসলামি ও জেনারেল ইউনিভার্সিটিগুলোতে কীভাবে ডজন ডজন ফিলোসফি ডিপার্টমেন্ট আছে? শুধু তাই কেন, খোদ পশ্চিম, আমেরিকা ও জাপানের ইউনিভার্সিটিগুলোতে কেন ‘ইসলামিক ফিলোসফি’র ওপর আলাদা স্পেশালাইজেশন চলতেছে?

তৃতীয়ত : আমাদের কালচার নাকি ‘অবসকিউরান্টিস্ট’ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন। অথচ চরম সত্য হলো, একমাত্র ইসলামি কালচারই প্রথম ‘নুর’-তত্ত্বকে জগতবাসীর সামনে ফুটিয়ে তুলেছে। কোরান পাকের একটা সুরার নাম ‘আন-নুর’, এবং ‘নুর’ খোদ আল্লাহ পাকের  একটি নাম। পুরো কোরানে ‘নুর’ শব্দ আসছে মোট ৪৯ বার। আমাদের এমন শত শত ক্লাসিকাল বইয়ের খোঁজ মিলবে যার শিরোনাম হয়েছে ‘নুর’ ও ‘আনোয়ার’ নামে।

যেখানে পশ্চিমা দর্শনে সোর্স অফ নজেল আজ পর্যন্ত কেবল ‘ইন্দ্রিয়’ আর ‘রিজনে’-র খাঁচায় বন্দি হয়ে ঝিমোচ্ছে—সেখানে ইসলামি দর্শনে ‘নুর’ এমন সোর্স অফ নজেল—যার ধ্রুবতা ক্ষেত্রবিশেষে রিজন ও ইন্দ্রিয়র সোর্স থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী।

ইসলামি কালচারে নুরের কনসেপ্ট অত্যন্ত সমৃদ্ধ, উর্বর ও বিচিত্র : এখানে আল্লাহ নুর, কোরান নুর, তওরাত ও ইঞ্জিল নুর, আমাদের নবি নুর, পূর্ববর্তী সমস্ত নবী-রসুল নুর, জ্ঞান নুর, আবার অজ্ঞতা আন্ধার, অন্তর্দৃষ্টি নুর, আবার অন্তরের অন্ধত্ব আন্ধার, আল্লাহর প্রতি ঈমান নুর, আবার বেঈমনি আন্ধার।

চতুর্থত : আমাদের কালচার শুধু স্থবিরতা ও জড়তাকে লালন করে এবং বিকাশ ও নবায়নকে ইনকার করে—এই দাবীও মিথ্যা। বাস্তবতা হলো—যে দীনকে কেন্দ্র করে আমাদের এই কালচারের বিকাশ, তাজদিদের বুনিয়াদ তার কাঠামোতেই প্রথিত :

১. ‘পরিবর্তন’ একটা কোরানিক প্রিন্সিপাল, আরও ভালো তরক্কি লাভের প্রধান শর্ত। কোরানের এরশাদ : “আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির হাল পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভিতরের হাল পরিবর্তন করে।”[13]আর-রাদ: ১১

২. দীনের মধ্যে তাজদীদ থাকবে, এর ধারাবাহিকতা ও সাস্টেইনেবিলিটি থাকবে—এটা একটা বাস্তবতা, রসুলুল্লাহর সাফ জবানিতে সাব্যস্ত। তিনি সরাসরি ‘তাজদিদ’ শব্দ ব্যবহার করে হাদিসে বলছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতি শতাব্দীর মাথায় এই উম্মতের জন্য এমন লোকেদের পাঠাবেন, যারা তাদের জন্য তাদের দীনের তাজদিদ করবে।”[14]আবু দাউদ : ৪২৯১

৩. আমাদের ‘ইলমুল কালাম’ বা থিওলজির ট্রাডিশনে, মহাবিশ্বের কল্পনা করতে গিয়ে এবং মেটাফিজিক্সের আলাপ করতে গিয়ে ‘তাজাদ্দুদে লাহজি’ বা কনস্ট্যান্ট চেঞ্জ (মুহূর্মুহূ নয়া রূপ ধারণ) ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। আশআরী স্কুলের ‘খলকে মুতাজাদ্দিদ’ বা ‘ক্রমাগত সৃজন’ তত্তের (Theory of Continuous Creation) দিকে তাকালে এ নিয়ে আর কোনো তর্ক থাকে না।

তাঁদের মতে, কোনো ‘আরজ’ (এক্সিডেন্ট) পরপর দুই সেকেন্ড স্থায়ী হয় না—তা প্রতি মুহূর্তে বিলুপ্ত হয় এবং তার ঠিক পরের মুহূর্তেই আবার নতুন করে অস্তিত্ব পায়।

মুতাজিলা ঘরানার দার্শনিকেরা—যেমন নাজ্জাম ও কাবী—আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন : “প্রতিটা জড়পদার্থই প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন রূপ লাভ করে।”[15]ইজ্জুদ্দিন ইজি, আল-মাওয়াকিফ : ১/৮৯। এতে আরও এসেছে : “একইভাবে [ইবরাহিম] নাজ্জাম … Continue reading যার সহজ অর্থ হলো—মহাবিশ্ব স্থির নয়, সদা-পরিবর্তনশীল, প্রতি মুহূর্তে এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে।

মুসলিম ফিলোসফার সদরুদ্দিন শিরাজি[16]কন্টেম্পরারি একাডেমিয়ায় মোল্লা সদরা মেটাফিজিক্স, চেতনতত্ত্ব, … Continue reading (১৬৪০ খ্রি.), যিনি মোল্লা সদর নামে পরিচিত, রেশনাল ফিলোসফির ইতিহাসে এক অনন্যতা যোগ করেছেন তাঁর ‘আল-হারাকাতুল জাওহারিয়্যা’ বা সারবত্তার গতিশীলতা তত্ত্ব (Substantial Motion) দিয়ে। পোস্ট-শিরাজি কালে যেখানে দার্শনিকেরা এরিস্টটলের দ্বী-গোলক মহাবিশ্ব (Two-Sphere Universe) ধারণা নিয়েই জবর কাটছিল, যেখানে উর্ধ্বলোক (Supralunar) ও নিম্নলোকের (Sublunar) প্রকৃতিকে এসিস্টটল বলেছেন স্থির—সেখানে মোল্লা সদরা পশ্চিমের হেনরি বার্গসেনের[[17]অঁরি বার্গসঁ (Henri Bergson : ১৮৫৯–১৯৪১) আধুনিক ফরাসি বিবর্তনবাদী, … Continue reading মতো ‘স্থিতিকাল’ ও ‘হয়ে-ওঠা’-বাদী (Duration and Becoming) দার্শনিকদেরও অনেক আগে বলে গেছেন :

“চাঁদ-সুরুজের অবস্থাও আমাদের চারপাশের মানুশেরই মতো—তারাও প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে, পুরানা হচ্ছে, ফানা হয়ে যাচ্ছে (…) আসমানের বুকেও যে মেষ, মহিষ আর শস্যমঞ্জরি[18]আকাশের নক্ষত্রের রূপক।—তা জমিনের বুকে থাকা মেষ, মহিষ আর শস্যমঞ্জরিরই মতো—উভয়ের প্রত্যেকের সত্তাই প্রতি মুহূর্তে নতুন হয়ে উঠছে।”[19]ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গইব : ৩৯৮

এমনকি আমাদের সুফি ধারার ওলামাদের চেতনা থেকেও এই আইডিয়া হারায়ে যায় নাই। ইবনে আরাবি সোজাসাপটা বলেই দিয়েছেন :

“সমস্ত অস্তিত্ব, দুনিয়া ও আখেরাতে, অবিরাম গতিশীল।”[20]আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়্যা : ৫/৪৯৯

শুধু তাই না, আমাদের থিওলজি ডিপার্টমেন্টের একদম প্রাথমিক ছাত্রও এই সবক জানে যে, আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রথম স্বতঃসিদ্ধই হলো : এই মহাবিশ্বের নিয়ত পরিবর্তনশীলতা ও রূপান্তরতা। সে লজিকের এই চেইনটি বুঝে, শুনে, মুখস্থ করে :

“মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল; আর প্রত্যেক পরিবর্তনশীল সৃষ্টি; আর প্রত্যেক সৃষ্টিরই একজন স্রষ্টা অবধারিত।”

 

দ্বিমুখী মুসিবত : পশ্চিমায়ন ও উগ্রায়ন

আমাদের ইসলামি কালচার একদিকে যেমন তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা পশ্চিমায়ন শিবিরের কারণে মারাত্মকভাবে সাফার করেছে, আজও করছে—ঠিক তেমনি উলটা পিঠে সে সমপরিমাণ মুসিবত পোহাচ্ছে চরমপন্থী, কট্টরপন্থী শিবিরের কারণেও। গ্রুপটি ইদানীং ময়দানে আবির্ভূত হয়ে নিজেদের ইসলামের ‘একমাত্র অফিশিয়াল মুখপাত্র’ হিসেবে দাবি করতে শুরু করেছে। তারা ইসলামের মতো রহমত, ইনসাফ, মানবিকতা ও বিশ্বজনীনতার ধর্মকে সংকুচিত করে স্রেফ ‘নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিসের’ ট্রাজিক তালিকায় পরিণত করেছে; মাকরূহ (অপছন্দনীয়) আর হারামের (নিষিদ্ধ) মধ্যকার বাউন্ডারি লাইনটি ভ্যানিশ হয়ে গেছে; মানদুব (পছন্দনীয়) আর ওয়াজিবের (আবশ্যক) মধ্যকার দেওয়াল সড়ায়ে গেছে—তাদের বাজে তফসির আর ভুল তাওয়িলের কারণে এমন হারাম কর্মকাণ্ড বৈধতা পেয়েছে, যা কোনো অবস্থাতেই বৈধ হতে পারে না।

তাই আমাদের ইসলামি কালচারকে ওলটপালট করে দিতে, রেনেসাঁর প্রকল্পে তার সক্রিয়তাকে নষ্ট করে দিতে, পশ্চিমায়নের মুসবিত আমাদের যতটুকু বিভ্রান্ত করেছে—এক্সট্রিমিজমের মুসবিত কোনো অংশেই তারচেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতি করে নাই।

 

[প্রবন্ধের রচনাকাল : ২০১১ ঈ.]

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 প্রথম আরব নাহদা : ১৮ শতকের শেষভাগে শুরু হওয়া আরব রেনেসাঁ আন্দোলন। নাহদা মানে রেনেসাঁ, নবজাগরণ। একে প্রথম নাহদা বলা হচ্ছে কারণ, আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে আরব পরাজয়ের পর, আরব বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আত্ম-সমালোচনা, নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান এবং ফেইলিয়র থেকে উত্তরণের পথ তালাশের ঢেউ সৃষ্টি হয়। সে যে নাকসা-পরবর্তী সময় থেকে তার শুরু হয়েছে, আজ তা বর্তমান; ১ম নাহদার গতিপথ সংশোধনের এক চলমান প্রচেষ্টার নাম, ২য় নাহদা।
2 রিফাত রাফে তাহতাবি ছিলেন আধুনিক আরব রেনেসাঁ বা নাহদার অন্যতম পথিকৃৎ। মোহাম্মদ আলী পাশার যুগে মিশরিয় শিক্ষার্থীদের যে দলটাকে প্যারিসে পাঠানো হয়েছিল, তাহতাবি ছিলেন তাদের ইমাম। ফ্রান্সের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ করে তাহতাবি তাঁর বিখ্যাত বই ‘তখলিসুল ইবরিজ ফি তলখিসি প্যারিস’ রচনা করেন। ফরাসি সোশিওলজিস্ট ও দার্শনিক অগাস্ট কান্ট তার ব্যাপারে বলেছিলেন : “উসমানী সাম্রাজ্যে বিদ্যমান একমাত্র পাগড়িধারী, যার পাগড়ির তলে একটা চিন্তা করতে পারা মাথা আছে।” ইসলামি ফিকহের সাথে আধুনিক শাসনতন্ত্র, নারীশিক্ষা ও নাগরিক অধিকারের সমন্বয় ঘটানোর প্রথম সুসংহত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তাহতাবিই। — শেমু
3 বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের বিখ্যাত বাক্যাংশ : “যা সিজারের, তা সিজারকে দাও; আর যা ঈশ্বরের, তা ঈশ্বরকে দাও” (ম্যাথু ২২:২১)। ক্রিশনিয়ান মেটাফিজিক্সে এই নীতিই পরে রাষ্ট্র (সিজার/রাজনীতি) এবং গির্জা (ঈশ্বর/ধর্ম)-র মধ্যকার বাইনারির উৎস হিসেবে কাজ করেছে, যা সেকুলারিজমের আইনি ভিত্তিকে ত্বরান্বিত করেছে। আহমদ তৈয়ব দেখাচ্ছেন, ইসলামি কালচারে রাষ্ট্র ও ধর্মের এই দ্বৈততা স্বভাবজাতভাবেই অনুপস্থিত। — শেমু
4 সৈয়দ নকিব আল-আত্তাস, Prolegomena to the Metaphysics of Islam : An Exposition of the Fundamental Elements of the Worldview of Islam, পৃ : ৩১; মুহাম্মদ তাহের আল-মিসাওয়ি কর্তৃক আরবি অনূদিত, আইএসটিএসি, মালোশিয়া প্রকাশিত, ২০০০ ঈ.
5 ইবনুল কাইয়্যিম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা : ১/৩১, দারু আলামিল ফাওয়ায়েদ, ১ম সংস্করণ, ১৪২৬ হি.
6 মুহাম্মদ ইমারা, আল-ইসলাম ওয়া কদায়াল আসর : ২/৪৫, রওয়াবিত লিন-নাশর, ২০০৮ হি.
7 আলে ইমরান : ১১০
8 সচেতনভাবেই লেখক, এখানে এবং সামনে, ব্যক্তিটির নাম অনুল্লেখ রাখবেন। ইসলামি ট্রাডিশনে খণ্ডন-সাহিত্যে এটা একটা কমন চর্চা। ব্যক্তির নাম নিয়ে ব্যক্তি-আক্রমণ করার চেয়ে, ব্যক্তির চিন্তাকাঠামো, প্রবণতা ও স্কুল অফ থটকে ব্যবচ্ছেদ করাই এখানে মূল উদ্দেশ্য। — শেমু
9 আল-বাকারাহ : ৪৭
10 ইমাম গাজালির ‘মাআরিজুল কুদস’ কিতাব থেকে। গাজালি প্রথাগত অর্থে রেশনালিজমের সমালোচক হলেও আকলকে খোদায়ী আলোর পরিপূরক মনে করতেন। তাঁর মতে, মানুষের ভেতরের ‘আকল’ বা ইন্টালেক্ট হলো একপ্রকার অভ্যন্তরীণ আসমানি কানুন, আর বাইরে থেকে আসা ওহি বা ‘শরিয়ত’ হলো বহিঃস্থ ইন্টালেক্ট—“উভয়ে তারা পরিপূরক, বরং ঐক্যবদ্ধ।” — শেমু
11 ফাসলুল মাকালের দুইটা ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যায়। একটা ব্রিটিশ ফিলোসফার ও হিস্টোরিয়ান জর্জ এফ. হুরানি অনূদিত On the Harmony of Religions and Philosophy – ১৯৬১ সালে AVERROES – AbeBooks (Messrs. Luzac & Co. লন্ডন) থেকে প্রকাশিত; আরেকটা স্ট্রসিয়ান স্কুলের ফিলোসফার চার্লস ই. বাটারওয়ার্থ অনূদিত Decisive Treatise and Epistle Dedicatory – এটা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১/২০০২ সালে Decisive Treatise – University of Chicago Press থেকে। — শেমু
12 ফাসলুল মাকাল : ৩১, ড. মুহাম্মদ ইমারার তাহকিককৃত, দারুল মাআরিফ
13 আর-রাদ: ১১
14 আবু দাউদ : ৪২৯১
15 ইজ্জুদ্দিন ইজি, আল-মাওয়াকিফ : ১/৮৯। এতে আরও এসেছে : “একইভাবে [ইবরাহিম] নাজ্জাম বলেন : যাবতীয় শরীর স্থায়ী নয়; মুহূর্তে মুহূর্তে সেগুলো নতুন হচ্ছে।”
16 কন্টেম্পরারি একাডেমিয়ায় মোল্লা সদরা মেটাফিজিক্স, চেতনতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব, ধর্মদর্শন এবং তুলনামূলক দর্শনের আলাপের দুনিয়ায় ক্রমবর্ধমান এক জরুরি নাম। স্পেশালি তাঁর আসালাতুল উজুদ (Primacy of Existence) ও আল-হারাকাহ আল-জাওহারিয়্যাহ (Substantial Motion) তত্ত্বকে আধুনিক অস্তিত্বতত্ত্ব, প্রক্রিয়াদর্শন (process philosophy) এবং চেতনার দর্শনের সঙ্গে সংলাপে পড়া হচ্ছে। হেনরি করবাঁ, সাইয়েদ হোসেইন নসর, জেমস মরিস, মোহাম্মদ লেগেনহাউজেন, ক্রিশ্চিয়ান জাম্বে প্রমুখ গবেষকের কাজের মাধ্যমে মোল্লা সদরা গ্লোবাল একাডেমিতে নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁকে ইসলামী দর্শনের ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবেও চেয়ে বেশি—সমকালীন দার্শনিক প্রশ্ন : অস্তিত্ব, আত্মসত্তা, জ্ঞান ও বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে গ্লোবাল ইন্টালেকচুয়াল আলাপের একজন জরুরি সক্রিয় শরিক হিসেবে পাঠ করা হচ্ছে।
17 অঁরি বার্গসঁ (Henri Bergson : ১৮৫৯–১৯৪১) আধুনিক ফরাসি বিবর্তনবাদী, প্রক্রিয়া-দার্শনিক। সময়ের প্রথাগত গাণিতিক পরিমাপের বদলে ‘Duration’ (স্থিতিকাল) এবং ‘Becoming’ (হয়ে-ওঠা) তত্ত্ব উপস্থাপন করেন তিনি। তাঁর মতে, মহাবিশ্বের কোনো কিছুই স্থির নয়; সত্তা মূলত অবিরাম পরিবর্তন ও গতিশীলতার এক প্রবাহের নাম। জিল দেল্যুজসহ বহু আধুনিক দার্শনিক তাঁর চিন্তাকে পুনর্ব্যাখ্যা করে বর্তমান দর্শনচর্চায় জরুরি করে তুলেছেন। আহমদ তৈয়ব ইশারা করছেন যে, পশ্চিমা দর্শনে বার্গসঁ যে ‘প্রসেস ফিলোসফি’ বা বিবর্তনশীল সত্তার ধারণা এনে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন, তার বহু আগেই মুসলিম দার্শনিক মোল্লা সদরা তাঁর ‘আল-হারাকাতুল জাওহারিয়্যা’ (সারবত্তার গতিশীলতা) তত্ত্বের মাধ্যমে মহাবিশ্বের এই নিরন্তর রূপান্তরশীলতাকে প্রমাণ করে গেছেন। — শেমু
18 আকাশের নক্ষত্রের রূপক।
19 ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গইব : ৩৯৮
20 আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়্যা : ৫/৪৯৯

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments