হুমায়ূন সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ : বহুমাত্রিক আলোচনা

মো. রেজাউল করিম

[হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কথাশিল্পী, যিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, চলচ্চিত্র ও গানে সমান দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যকে তিনি সহজ, সংলাপপ্রধান ও জীবনঘনিষ্ঠ ভাষায় নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তার সৃষ্ট হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র আজও পাঠকের হৃদয়ে জীবন্ত। বিজ্ঞান কল্পকাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস—সবখানেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। শিক্ষকতা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে আত্মনিয়োগ করে তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ ও চলচ্চিত্র। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদকসহ বহু সম্মানে ভূষিত এই স্রষ্টা আজও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।

১৯ সে জুলাই ছিল লেখকের মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা লেখককে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।—সম্পাদক]

 

হুমায়ূন আহমেদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এমন এক প্রবাদপ্রতিম জাদুকর, যিনি আপন কথাসাহিত্যের সম্মোহনী শক্তিতে কোটি পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের টানাপোড়েন, সাধারণ আবেগ, আনন্দ-বেদনা আর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে তিনি অতি সহজ, সাবলীল এবং রসবোধসম্পন্ন গদ্যে রূপ দিয়েছেন—যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। মিসির আলি কিংবা হিমুর মতো কালজয়ী চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করেছিলেন, অন্যদিকে তাঁর ক্ষুরধার ও হিউমারসমৃদ্ধ লেখনী দিয়ে আমাদের চেনাজানা সমাজটাকে এক নতুন আলোয় চিনিয়েছেন। কেবল ঔপন্যাসিক হিসেবেই নন; নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং গীতিকার হিসেবেও তাঁর বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সংস্কৃতির পরিমণ্ডলকে গভীরভাবে ঋদ্ধ করেছে। সামগ্রিক বিচারে, হুমায়ূন আহমেদ কেবল একজন তুমুল জনপ্রিয় লেখকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাঙালি পাঠকমানস ও মনন গঠনের এক যুগান্তকারী রূপকার, যাঁর সৃষ্টি সম্ভার নিয়ে আলোচনা যেকোনো সাহিত্যিক প্রবন্ধের জন্য এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও অনিবার্য অধ্যায়।

হুমায়ূন আহমেদের লেখার এমন কিছু অনন্য ও সবল দিক ছিল, যা তাঁকে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী লেখকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর লেখার প্রধান সবল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: 

জটিল তত্ত্ব বা গুরুগম্ভীর শব্দের জাল বুনে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ ও কথ্য ভাষাকে তিনি এক জাদুকরি রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর ছোট ছোট বাক্য এবং ঝরঝরে গদ্য যেকোনো স্তরের পাঠকের কাছে সহজে বোধগম্য হতো। বিষাদ কিংবা গম্ভীর পরিস্থিতির ভেতরেও সূক্ষ্ম রসবোধ এবং হিউমার তৈরি করায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর লেখার এই কৌতুকরস পাঠককে কখনো হাসাতো, আবার একই সাথে ভাবিয়ে তুলতো। তিনি এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যা কল্পকাহিনির গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির মননে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যুক্তিবাদী ‘মিসির আলি’, ছন্নছাড়া ও বাউন্ডুলে ‘হিমু’, কিংবা চিরতরুণ ‘শুভ্র’—এই চরিত্রগুলো পাঠককে গভীরভাবে সম্মোহিত করে রেখেছে। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের চেনা টানাপোড়েন, ছোট ছোট আনন্দ, মান-অভিমান, আর সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলোকে তিনি এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেন যে পাঠক সহজেই গল্পের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পেতেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের সংলাপগুলো ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, ধারালো এবং বাস্তবসম্মত। নাটুকেপনাহীন এই সংলাপগুলোর মাধ্যমেই তিনি চরিত্রের গভীরতা ও গল্পের নাটকীয়তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি যুক্তির সমান্তরালে এক ধরনের মায়াবী পরাবাস্তবতা (Magical Realism) এবং অতিপ্রাকৃতিক আবহ তৈরি করতে পারতেন। জোছনা, বৃষ্টি বা নির্জন রাতের প্রতি তাঁর চরিত্রের টান পাঠকদের মাঝে এক ধরনের রোমান্টিক ও নস্টালজিক আবেগের জন্ম দিত।

আশির দশকের প্রারম্ভে ‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাস দ্বয়ের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর প্রতিভার অসামান্য স্বাক্ষর রাখেন। তবে পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তার চাপে তিনি দীর্ঘ ও গভীর উপন্যাসের চেয়ে স্বল্প অবয়বের কাহিনি ও নভেলা রচনায় বেশি মনোযোগী হন; যার উজ্জ্বল উদাহরণ ‘গৌরীপুর জংশন’। নভেলা আকৃতির এই বইটির ভেতরের আখ্যানভাগ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, একে অনায়াসেই একটি মাস্টারপিস উপন্যাসে বিস্তৃত করা যেত। যদিও তাঁর বিপুল সৃষ্টির ভাণ্ডারে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘মধ্যাহ্ন’ কিংবা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’-এর মতো কিছু ঋদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস রয়েছে, কিন্তু তাঁর প্রায় তিন শত উপন্যাসের সংখ্যার তুলনায় এমন কালোত্তীর্ণ কাজের সংখ্যা সত্যিই যৎসামান্য।

যেকোনো মহান লেখকের মতোই হুমায়ূন আহমেদের লেখারও কিছু নিজস্ব সীমাবদ্ধতা বা দুর্বল দিক ছিল। কালজয়ী সাহিত্যের বিচারে এবং সমালোচকদের দৃষ্টিতে তাঁর লেখার প্রধান দুর্বল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: 

কাহিনির পুনরাবৃত্তি ও ফর্মুলাধর্মিতা: বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে জীবনের শেষভাগে তিনি প্রচুর লিখেছেন। ফলে অনেক উপন্যাসের প্লট, চরিত্র ও ঘটনার বিন্যাসে এক ধরনের পুনরাবৃত্তি দেখা যেত। নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা বা ধাঁচের ওপর ভিত্তি করে গল্প এগিয়ে নেওয়ার একটা প্রবণতা তাঁর অনেক লেখায় স্পষ্ট ছিল। 

জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের অনুপস্থিতি: তাঁর সমসাময়িক বা পূর্বসূরি অনেক কালজয়ী লেখকের মতো হুমায়ূন আহমেদের লেখায় বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রান্তিক মানুষের শ্রেণিসংগ্রামের মতো গভীর বিষয়গুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি মূলত মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মনস্তত্ত্বের ভেতরেই তাঁর পরিমণ্ডলকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। 

গভীর দর্শনের অভাব ও অতি-সরলীকরণ: তাঁর লেখার ভাষা যেমন সহজ ছিল, ঠিক তেমনি অনেক গভীর বা জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাকেও তিনি খুব সহজে বা হালকাভাবে সমাধান করে ফেলতেন। সমালোচকদের মতে, কালজয়ী সাহিত্যের জন্য যে দার্শনিক গভীরতা বা জীবনজিজ্ঞাসা প্রয়োজন, অনেক সময় তা অতি-জনপ্রিয়তার খাতিরে সরলীকৃত রূপ পেয়েছে। 

চরিত্রের অতিপ্রাকৃতিক বা অযৌক্তিক আচরণ: হিমু বা মিসির আলির মতো জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর কিছু আচরণ এবং উপন্যাসের কিছু ঘটনা যুক্তিকে ছাড়িয়ে সম্পূর্ণ কাকতালীয় বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ের ওপর নির্ভর করতো। এটি সাধারণ পাঠকের কাছে উপভোগ্য হলেও, বাস্তবসম্মত ও ধ্রুপদী সাহিত্যের মাপকাঠিতে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়। 

দ্রুত সমাপ্তি ও শিথিল বাঁধন: হুমায়ূন আহমেদের অনেক উপন্যাসের শেষ অংশ বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখা বলে মনে হয়। গল্পের ক্লাইম্যাক্স বা সমাপ্তি হুট করে চলে আসায় অনেক চরিত্র বা উপপ্লট (Subplot) পূর্ণতা পেত না, যা উপন্যাসের কাঠামোগত বাঁধনকে কিছুটা শিথিল করে দিত।

একজন লেখকের তুমুল জনপ্রিয়তা যেমন তাঁর শক্তির জায়গা, তেমনি সেই জনপ্রিয়তার জোয়ারে অনেক সময় ধ্রুপদী সাহিত্যের সূক্ষ্ম বিচারগুলো ঢাকা পড়ে যায়। তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দেশের প্রথম সারির একাডেমিশিয়ান, ধ্রুপদী ধারার সমালোচক এবং সিরিয়াস সাহিত্য পাঠকদের একটি বড় অংশেরই সমবেত কণ্ঠস্বর। সাহিত্যিক গভীরতা, ভাষা শৈলী এবং কালজয়ী আবেদনের মাপকাঠিতে আপনার এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহিত্যের আঙিনায় যে ধরনের বিশ্লেষণ ও অভিমত প্রচলিত রয়েছে, তা কয়েকটি প্রধান বিন্দুতে দেখা যেতে পারে: 

মাস্টারপিস বনাম বিপুল জনপ্রিয়তা: সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লালসালু বা চাঁদের অমাবস্যা এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই কিংবা খোয়াবনামা বাংলা সাহিত্যের একেকটি মহীরুহ। তাঁরা সংখ্যায় কম লিখেছেন, কিন্তু যা লিখেছেন তার প্রতিটি শব্দে ছিল সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি এবং মানব মনস্তত্ত্বের এক অতুলনীয় ও জটিল ব্যবচ্ছেদ। অন্যদিকে, হুমায়ূন আহমেদ বাণিজ্যিক ধারায় যে বিপুল সংখ্যক উপন্যাস লিখেছেন, তার সিংহভাগই ছিল একরৈখিক এবং ফর্মুলাধর্মী। ধ্রুপদী বা ‘মাস্টারপিস’ সাহিত্যের যে বহুমাত্রিকতা ও দার্শনিক গভীরতা থাকে, তা হুমায়ূন আহমেদের প্রায় ৩০০ উপন্যাসের ভিড়ে সত্যিই বিরল।

প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যসূচি ও সাহিত্যের মানদণ্ড: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগে যখন হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী (যেমন প্রদোষে প্রাকৃতজন), কিংবা সেলিনা হোসেনদের লেখা পড়ানো হয়, তখন মূলত তাঁদের ভাষা-প্রয়োগের নিরীক্ষা, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজবাস্তবতা এবং শিল্পতাত্ত্বিক সার্থকতাকে বিবেচনা করা হয়। হুমায়ূন আহমেদের গদ্য অত্যন্ত সহজ এবং তরল হওয়ায় তা সাধারণ পাঠক তৈরিতে যতটা ভূমিকা রেখেছে, অ্যাকাডেমিক ব্যবচ্ছেদ বা গবেষণার উপাদান হিসেবে ততটা সমৃদ্ধ নয়। ফলে সাহিত্যের উচ্চতর স্তরে বা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যসূচিতে স্থান না পাওয়ার বিষয়টি তাঁর হালকা ও বাণিজ্যিক ঘরানার লিখনশৈলীর কারণেই যুক্তিযুক্ত।

পাঠকের রূপান্তর ও বয়সের মনস্তত্ত্ব: তরুণ বয়সে হিমু বা মিসির আলির রোমাঞ্চে বুঁদ হলেও, বয়স এবং চেতনার পরিপক্বতার সাথে সাথে হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়া তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের মূল পাঠকশ্রেণি সব সময়ই ছিল সদ্য তরুণ বা কিশোরেরা। মানুষের যখন জীবনের জটিলতা, দর্শন ও মনস্তত্ত্বের গভীরতা বোঝার বয়স হয়, তখন স্বভাবতই হুমায়ূন আহমেদের অতি-সরলীকৃত জগৎ আর তাকে টানে না; পাঠক তখন ওয়ালিউল্লাহ বা ইলিয়াসের মতো লেখকদের আশ্রয় খোঁজে।

 

তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকাটি কোথায়? 

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকে ধ্রুপদী মানদণ্ডে ‘হালকা’ বা ‘বাণিজ্যিক’ বললেও, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর একটি বড় ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল:

আশির ও নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ বইপড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল এবং ওপার বাংলার বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল, তখন হুমায়ূন আহমেদ একক শক্তিতে এদেশের কোটি মানুষকে বইমুখী করেছিলেন। এছাড়া তাঁর বইয়ের বাণিজ্যিক সাফল্যের ওপর ভর করেই এদেশের প্রকাশনা শিল্প একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে অন্যান্য সিরিয়াস লেখকদের বই প্রকাশের পথও সুগম করেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদ কোনো ‘মাস্টারপিস’ বা ধ্রুপদী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেননি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে স্থান পেতে পারে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ‘পপুলার ফিকশন’ বা জনপ্রিয় ধারার লেখক। ইলিয়াস বা ওয়ালিউল্লাহরা যেখানে সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে আছেন, হুমায়ূন আহমেদ সেখানে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমের চেনা আলো হয়ে রয়ে গেছেন। সাহিত্যিক গভীরতার বিচারে তাঁর স্থান নিশ্চিতভাবেই তাঁদের সমকক্ষ নন, তবে পাঠক তৈরির কারিগর হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে একেবারে অস্বীকার করাও কঠিন।

মাস্টারপিস বনাম বেস্টসেলার (পশ্চিমা ও বিশ্বসাহিত্যের উদাহরণ): পশ্চিমা ও বিশ্বসাহিত্যের মূল ধারায় জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা ফ্রানৎস কাফকা যা লিখেছেন, তা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। কিন্তু তাঁদের লেখা ইউলিসিস বা মেটামরফোসিস মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে স্পর্শ করেছে। ঠিক একইভাবে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর জাদুকরী পরাবাস্তবতায় ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড-এর মতো কালজয়ী মহাকাব্য কিংবা নোবেলজয়ী লেখক আবদুলরাজাক গুরনাহ উত্তর-ঔপনিবেশিক স্থানচ্যুতি ও শরণার্থীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে যে তীব্র গভীর ও সীমিত সংখ্যার সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের চিরকালীন ‘মাস্টারপিস’।

অন্যদিকে, আগাথা ক্রিস্টি বা আধুনিক যুগের ড্যান ব্রাউন শত শত বই লিখে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কপি বিক্রি করে ‘বেস্টসেলার’ হয়েছেন, কিন্তু অ্যাকাডেমিক সার্কেলে তাঁদের সাহিত্যিক গভীরতা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন ছিল। তবে এই দুই অনড় ধারার মাঝখানে জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি এক পরম বিস্ময় ও কৌতূহল। তিনি কোন ধারায় পড়বেন, তা নিয়ে খোদ বিশ্বসাহিত্য বোদ্ধারাই নিশ্চিত নন। একদিকে মুরাকামির বই বাজারে আসা মাত্রই পপ-কালচারের রকস্টারের মতো লাখ লাখ কপি বিক্রি হয় (বেস্টসেলার), আবার অন্যদিকে তাঁর গল্পের নিঃসঙ্গতা, পরাবাস্তব জাদু (Magical Realism) এবং মানুষের অবচেতনের জটিল বুনন নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁকে বছরের পর বছর ধরে রাখছে। তিনি যেন একই সাথে ‘পপুলার ফিকশন’ এবং ‘এলিট লিটারেচার’-এর দেয়াল ভেঙে দেওয়া এক অদ্ভুত জাদুকর। মুরাকামির এই দ্বৈত চরিত্র সাহিত্যের ব্যাকরণকে কিছুটা ওলটপালট করে দেয়। তিনি আমাদের দেখান যে, তীব্র জনপ্রিয় হয়েও গভীর মনস্তত্ত্বের অতলে ডুব দেওয়া সম্ভব, যা হুমায়ূন আহমেদ বা অন্যান্য নিখাদ বাণিজ্যিক লেখকদের ক্ষেত্রে সচরাচর ঘটে না।

ধ্রুপদী সাহিত্যের স্থায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবচ্ছেদ: পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইংরেজি বা তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগেও ঠিক একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে উইলিয়াম শেকসপিয়র, ফিওদর দস্তয়েভস্কি কিংবা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর উপন্যাস বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। কারণ তাঁদের গদ্যের ভাষা, শৈলী এবং রাজনৈতিক-সামাজিক দর্শনের গভীরতা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। কিন্তু কোটি কোটি কপি বিক্রি হওয়া ড্যান ব্রাউনের দ্য দা ভিঞ্চি কোড বা জে. কে. রাওলিং-এর হ্যারি পটার পপুলার ফিকশন হিসেবে লাইব্রেরির তাক মাতালেও, সাহিত্যের উচ্চতর তাত্ত্বিক ক্লাসরুমে স্থান পায় না।

বাজারের চাহিদা বনাম শিল্পের দায়বদ্ধতা: পশ্চিমা প্রকাশনা জগতেও এটি স্বীকৃত যে, জনপ্রিয় ধারার লেখকেরা মূলত একটি নির্দিষ্ট ‘ফর্মুলা’ বা চেনা ছক ব্যবহার করে পাঠকদের সাময়িক বিনোদন দেন। প্রকাশনা সংস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং ব্যবসা সফল করতে এই বাণিজ্যিক লেখকদের অবদান অনস্বীকার্য। ঠিক যেমন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তেমনি পশ্চিমেও এই বেস্টসেলার লেখকেরা পুরো বুক-মার্কেটকে সচল রাখেন। কিন্তু ধ্রুপদী লেখকেরা বাজারের চাহিদার পরোয়া না করে ভাষার নিরীক্ষা ও জীবনের জটিল সত্যকে উন্মোচন করেন, যা চটজলদি ফুরিয়ে যায় না, বরং শতাব্দী ধরে টিকে থাকে। মূল কথা, জনপ্রিয় সাহিত্য হলো এক পশলা বৃষ্টির মতো—যা তাৎক্ষণিকভাবে তৃষ্ণা মেটায় এবং এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে আপ্লুত করে। আর ধ্রুপদী সাহিত্য হলো গভীর সমুদ্রের মতো—যার তলদেশ ছোঁয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, কিন্তু সেখানে লুকিয়ে থাকে মানব সভ্যতার আসল রত্ন। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের বেস্টসেলার লেখকেরা প্রথম দলভুক্ত, আর ওয়ালিউল্লাহ, ইলিয়াস কিংবা দস্তয়েভস্কিরা চিরকাল দ্বিতীয় দলেরই অধিপতি।

পশ্চিমবাংলার সাহিত্যের একচেটিয়া আধিপত্য থেকে বাংলাদেশের পাঠককে মুক্ত করা—এটাই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক সত্য। আশির দশকে তাঁর এই ভূমিকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম:

আশির দশকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বসার ঘর ও পড়ার টেবিল একচেটিয়াভাবে দখল করে রেখেছিল ওপার বাংলার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার কিংবা বুদ্ধদেব গুহদের লেখা। সেই চেনা আবেশ থেকে এদেশের এক বিশাল পাঠককুলকে টেনে এনে নিজেদের চেনা চারপাশের গল্পে মগ্ন করানো মোটেও সহজ কাজ ছিল না।

হুমায়ূন আহমেদ ঢাকার চিরচেনা রিকশা, জ্যাম, মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের আড্ডা, আর আমাদের বর্ষা-জোছনাকে এমন এক মায়াবী রূপ দিলেন যে, এদেশের পাঠকেরা ওপার বাংলার উপন্যাসের আলপাইন অরণ্য বা কলকাতার কফি হাউসের মোহ ছেড়ে নিজেদের মাটির সুবাস পেতে শুরু করলেন। তিনি যখন এদেশের পাঠকদের মনে এই বিশ্বাসটি গেঁথে দিতে পারলেন যে ‘আমাদের গল্পও চমৎকার হতে পারে’, তখনই মূলত সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে দেশীয় লেখকদের জন্য এক বিশাল ও উর্বর পাঠকশ্রেণি তৈরি হলো।

সংক্ষেপে বলতে গেলে তিনি এককভাবে পুরো প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচিয়ে না রাখলেও, বাংলাদেশের পাঠকমানসকে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক স্বনির্ভরতা’ দিয়েছিলেন। ওপার বাংলার সাহিত্যের প্রবল জোয়ারের মুখে বাঁধ দিয়ে দেশীয় সাহিত্যের নিজস্ব এক জোয়ার তৈরি করার এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের কারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম একটি বিশেষ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। তরুণদের লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করা এবং সেই অনুকরণের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিষয়টি এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:

লেখার অনুপ্রেরণা ও নকলের ফাঁদ: হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় জাদু ছিল তাঁর সহজবোধ্যতা। অনেক তরুণ পাঠক তাঁর লেখা পড়ে অবচেতনভাবেই ভেবে বসেছিলেন- ‘আরে, এত সহজ ভাষায় তো আমিও লিখতে পারি!’ এই আত্মবিশ্বাস হাজার হাজার তরুণকে কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু সংকট তৈরি হলো তখনই, যখন তারা অনুধাবন করতে পারল না যে, হুমায়ূন আহমেদের ওই ‘সহজ’ গদ্যের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের মেদহীন ভাষা ভাঙার এক নিজস্ব সাধনা। ফলে, সেই সহজাত প্রতিভাকে না বুঝে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে গিয়ে তারা মূলত তাঁর লেখার বাহ্যিক রূপটুকুই ধার করল, কোনো গভীরতা তৈরি করতে পারল না।

ক্লোন চরিত্রের সস্তা সংস্করণ: হুমায়ূন আহমেদের অন্ধ অনুসারী লেখকেরা মৌলিক কোনো জগৎ সৃষ্টি করতে পারেননি। তাঁরা নিজেদের গল্পে জোর করে এমন সব চরিত্র নিয়ে এলেন যারা হিমুর মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটে কিংবা মিসির আলির মতো চায়ের কাপে আঙুল ডুবিয়ে রহস্য খোঁজে। মূল স্রষ্টার হাতে যে চরিত্রগুলো মায়াবী বা রহস্যময় ছিল, অনুকারীদের দুর্বল লেখনীতে তা হয়ে উঠল চরম কৃত্রিম, সস্তা এবং হাস্যকর।

ফর্মুলা নির্ভর সাহিত্যের অন্ধকার গলি: হুমায়ূন আহমেদের লেখার ফর্মুলাধর্মিতা—সেটাই অনুকারী লেখকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। চটজলদি রোমান্টিকতা, কিছু চটুল সংলাপ, আর হুট করে মেলোড্রামাটিক সমাপ্তি—এই সস্তা ফর্মুলা ব্যবহার করে কিছু লেখক প্রতি বইমেলায় সস্তা পপুলার ফিকশনের বন্যা বইয়ে দিলেন। সমালোচক এবং সিরিয়াস পাঠকদের কাছে এই ধারাটি খুব দ্রুতই ‘লঘুরস’ বা ‘হালকা বিনোদন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হলো।

হুমায়ূন আহমেদ তরুণদের সাহিত্যের উঠোনে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু যারা তাঁর আঙিনাতেই চিরকাল আটকে রইল, তারা কোনোদিন নিজেদের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেল না। বিশ্বসাহিত্যের নিয়মই তাই—যেকোনো বড় বৃক্ষের ছায়াতলে শুধু পরজীবী লতা জন্মায়, নতুন কোনো মহীরুহ নয়। ফলে, অনুকারীরা সস্তা সাহিত্যিকের তকমা নিয়েই হারিয়ে গেছে, আর যাঁরা প্রকৃত অর্থে লেখক হতে পেরেছেন, তাঁদের হুমায়ূনের এই বলয় ভেঙে সম্পূর্ণ নিজস্ব গদ্যশৈলী ও দর্শনের জন্ম দিতে হয়েছে।

তুলনামূলক সাহিত্য আলোচনার (Comparative Literature) বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মানদণ্ডে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য কতটুকু রেখাপাত করতে পারে—তা এক অত্যন্ত কৌতূহল উদ্দীপক প্রশ্ন। সাহিত্যের এই উচ্চতর শাখায় যখন আলোচনা হয়, তখন কেবল জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কোনো লেখককে বিচার করা হয় না, বরং দেখা হয় তাঁর সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের কোনো বৃহৎ ধারাকে ধারণ করে কি না, কিংবা তিনি নিজ ভাষায় নতুন কোনো বয়ান বা শৈলী যুক্ত করতে পেরেছেন কি না। এই প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক সাহিত্যে তাঁর অবস্থান ও প্রভাবকে তিনটি সুনির্দিষ্ট কোণ থেকে মূল্যায়ন করা সম্ভব:

ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম বা পরাবাস্তবতার নিজস্ব বয়ান (মার্কেস বনাম হুমায়ূন): তুলনামূলক সাহিত্যে লাতিন আমেরিকার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কিংবা জাপানের হারুকি মুরাকামির পরাবাস্তববাদী বা জাদুকরী বাস্তবতার (Magical Realism) ধারার সাথে হুমায়ূন আহমেদের কিছু কাজের তুলনা হতে পারে। তবে পার্থক্যটি আকাশ-পাতাল। মার্কেসের পরাবাস্তবতা যেখানে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ক্ষত, রক্তাক্ত ইতিহাস ও উপনিবেশবাদের এক মহাকাব্যিক দলিল, হুমায়ূন আহমেদের জোছনা, বৃষ্টি, কিংবা অতিপ্রাকৃতিক আবহ (যেমন তাঁর কিছু ভৌতিক বা সাইকোলজিক্যাল উপন্যাস) সেখানে মূলত ব্যক্তির একাকীত্ব ও মধ্যবিত্তের নস্টালজিয়া তৈরির হাতিয়ার। বিশ্বসাহিত্যের তাত্ত্বিক বিচারে তাঁর পরাবাস্তবতায় কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক বা দার্শনিক ইশতেহার না থাকায়, তা মার্কেস বা মুরাকামির মতো গভীর রেখাপাত করতে পারে না, বরং তা ‘আঞ্চলিক রূপকথা’ বা ‘রোমান্টিক মেটাফর’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

পপুলার কালচার ও সমাজতাত্ত্বিক পাঠ: তুলনামূলক সাহিত্যের একটি বড় অংশ জুড়ে এখন রয়েছে ‘কালচারাল স্টাডিজ’ (Cultural Studies)। এই শাখায় হুমায়ূন আহমেদ এক অত্যন্ত উর্বর গবেষণার উপাদান হতে পারেন। কোনো ধ্রুপদী সাহিত্যিক মাস্টারপিস সৃষ্টির জন্য নয়, বরং “কীভাবে একজন লেখক একটি অনগ্রসর বা পরিবর্তনশীল মধ্যবিত্ত সমাজকে একক শক্তিতে বইমুখী করতে পারেন”—এই সমাজতাত্ত্বিক তুলনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের স্টিফেন কিং, জে. কে. রাওলিং কিংবা জাপানের পপ-কালচার লেখকদের সমান্তরালে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বড় রকমের অ্যাকাডেমিক আলোচনা সম্ভব। বিশেষ করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক একটি দেশে ওপার বাংলার (কলকাতা কেন্দ্রিক) সাহিত্যিক আধিপত্য ভেঙে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বাদের ‘দেশীয় পপ-ফিকশন’ গড়ে তোলার যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তিনি ঘটিয়েছেন, তা তুলনামূলক সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি অনন্য কেইস স্টাডি।

ভাষার বিনির্মাণ ও সরলীকরণ (ডিকলোনাইজেশন বনাম লঘুকরণ): বিশ্বসাহিত্যের বড় বড় লেখকেরা (যেমন নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ বা জেমস জয়েস) তাঁদের গদ্যের ভাষা দিয়ে ঔপনিবেশিক ভাষাকাঠামোকে ভেঙে নতুন এক জটিল বুনন তৈরি করেছেন। তুলনামূলক গদ্যশৈলীর বিচারে হুমায়ূন আহমেদ সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। তিনি বাংলাকে কোনো জটিল তাত্ত্বিক বা নিরীক্ষাধর্মী রূপ দেননি, বরং ভাষাকে করেছেন নজিরবিহীনভাবে তরল ও গতিশীল। অ্যাকাডেমিক সাহিত্য সমালোচনায় এই গদ্যকে ‘মেদহীন ও আধুনিক’ বলা হলেও, তা ধ্রুপদী সাহিত্যের গভীর চিন্তাকে বহন করার মতো ভার বা ব্যাপ্তি ধারণ করে না। ফলে, বিশ্ব গদ্যের বিবর্তনের ইতিহাসে তাঁর ভাষা-শৈলী কোনো বড় রেখাপাত বা তাত্ত্বিক আলোড়ন তৈরি করতে ব্যর্থ।

সংক্ষেপে অভিমত: তুলনামূলক সাহিত্যের মূল মঞ্চে—-যেখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা কিংবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লালসালু মানব অস্তিত্বের ও শ্রেণির লড়াইয়ের গভীরতার কারণে বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী সৃষ্টির পাশে স্থান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে—সেখানে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক টেক্সট খুব একটা রেখাপাত করতে পারবে না। তবে, ‘সাহিত্য এবং পাঠক-মনস্তত্ত্বের সমাজবিজ্ঞান’ (Sociology of Literature) বিষয়ের আলোচনা ও গবেষণায় হুমায়ূন আহমেদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এক অনিবার্য ও শক্তিশালী নাম হিসেবেই টিকে থাকবেন।

সাহিত্যিক গভীরতার বিচারে হুমায়ূন আহমেদ নিশ্চিতভাবেই ধ্রুপদী লেখকদের সারিতে থাকবেন না এবং প্রবীণ বা সিরিয়াস পাঠকেরা একসময় তাঁর লেখা পড়া ছেড়ে দেবেন—এটাই স্বাভাবিক ও চিরায়ত নিয়ম। কিন্তু জেমস জয়েস বা কাফকার পাশে ড্যান ব্রাউন বা আগাথা ক্রিস্টি যেমন টিকে থাকেন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের পাঠক তৈরির কারিগর ও সাংস্কৃতিক স্বনির্ভরতার ঐতিহাসিক বাঁক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদও এদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে নিজের মতো করে অনিবার্য হয়ে থাকবেন।  

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments