তহা আবদুর রহমানের চিন্তায় আধুনিকতার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি

মূল : জাওয়াদী আল-জীলানী

নাইম আল-ইসলাম সজীব

ভূমিকা

নিঃসন্দেহে আধুনিকতা জ্ঞানচর্চার সকল ক্ষেত্রে ইউরোপীয় আকল বা যুক্তিকে (Rationality) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এটি মানবমুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং মানুষের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে। আধুনিকতানির্ভর অগ্রগতি মূলত এমন এক প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা মানুষকে সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বের নীতি প্রদান করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমা আধুনিকতা বহু চিন্তাবিদের আলোচনা ও সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মরক্কোর চিন্তাবিদ তহা আবদুর রহমান, যিনি আধুনিকতার নীতি, শর্ত ও মূল্যবোধ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে এগুলোর যথার্থতা নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর আধুনিকতা-বিষয়ক গবেষণায় আমরা এ বিষয়টি লক্ষ করি। তাই প্রশ্ন আসে: তহা আবদুর রহমানের চিন্তায় আধুনিকতার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি কী?

 

প্রথম পাঠ: তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্য আকলের সমালোচনা

তহা আবদুর রহমান পশ্চিমা আধুনিকতার সমালোচনা শুরু করেন যুক্তিবাদের নীতি (rationalism) বা যাকে তিনি বিমূর্ততাবাদ (abstractionism) বলে থাকেন, সেই নীতিকে কেন্দ্র করে, যেটিকে পশ্চিমা আধুনিকতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেহেতু তিনি মনে করেন, যুক্তিবাদের নীতি ইসলামি রিসালতের প্রতি বিশ্বাসের যে নীতি, সেটির মোখালেফ। কারণ পাশ্চাত্যের মানুষ রায় বা বিচারবিবেচনার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র যুক্তি বা আকলকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু মুসলমানের ক্ষেত্রে যুক্তির পাশাপাশি রয়েছে ওহি বা ঐশী বার্তা। তিনি বলেন:

“এই যুক্তিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষকে ওহি থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ফলে এটি ঐশী বার্তার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে। এই ধরনের যুক্তিবাদকে ‘বিমূর্ত যুক্তিবাদ (abstract rationalism)’ বলে নামকরণ করা হয়েছে, এবং এর বিমূর্ততা দৃশ্যমান হয় ওহির সম্পৃক্ততা বাদ দিয়ে শুধু মানবীয় যুক্তি বা আকল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে।”[1]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ৯৭–৯৮

এটি প্রমাণ করে যে এই বিমূর্ত যুক্তিবাদ (অর্থাৎ তাত্ত্বিক যুক্তিবাদ) ইসলামি শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ মানুষের বিচারবিবেচনার ক্ষেত্রে যদি কেবল আকল বা যুক্তিকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড ধরা হয়, তবে মানুষ ও পশুর মাঝে পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কারণ তাঁর মতে:

“নৈতিকতাই একমাত্র জিনিস যা মানুষকে প্রাণী থেকে আলাদা করে। প্রাণী যে তার জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে সততা বা নৈতিকতা খোঁজে না, এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। বরং সে তার নিজ আকল ব্যবহার করে জীবিকা অর্জন করে। সুতরাং নৈতিকতাই সেই মূল ভিত্তি, যেখান থেকে মানুষের সকল গুণের উদ্ভব ঘটে। মানুষের সঙ্গে যে যুক্তিবাদ সম্পর্কিত, সেটা এই নৈতিক ভিত্তির অধীন হওয়া বাঞ্ছনীয়।”[2]সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ১৪

এর মানে হলো, মানুষের পরিচয় মূলত নৈতিক পরিচয়ে। কারণ নৈতিকতাই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে, আর পশু মূল্যবোধ উপলব্ধি করতে পারে না।

অন্যদিকে, পাশ্চাত্য আকলের দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো “জাগতিকতাবাদ” বা প্রচলিত পরিভাষায় “সেকুলারিজম”, যেখানে আধুনিকতাবাদী মানুষ কেবল পার্থিব জীবনের দিকে মনোযোগ দেবে, কিন্তু পরকালকে একেবারেই উপেক্ষা করবে। এ প্রসঙ্গে তহা আবদুর রহমান বলেন:

“মানুষের পরকালের প্রতি মনোযোগ দেওয়া মানে দুনিয়ার ব্যাপারে উদাসীন হওয়া নয়। বরং পরকালের চিন্তা মানুষকে দুনিয়ার দিকে আরও মনোযোগী করে তোলে, যা পরকালের প্রতি মনোযোগ না থাকলে এতটা ভালোভাবে সম্ভব হতো না…”[3]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ৯৮–৯৯

এটি ইঙ্গিত করে যে তাঁর মতে আধুনিকতাবাদীরা সকল ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যকে জাগতিকতাবাদী কিংবা সেক্যুলার রঙে রাঙিয়ে দেয়। তারা ধর্মকে আকল বা যুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে, বিমূর্ত যুক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানায় এবং ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে এই যুক্তিতে যে, তা নাকি যুক্তিবাদের ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি আংশিকভাবে আদনান আলী আল-রিদা আল-নাহভির মতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি আধুনিকতাবাদী প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন:

“ইসলামি চিন্তার বাস্তবতায় সবচেয়ে বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডগুলোর একটি হলো, বিভিন্ন পতাকা ও স্লোগানের আড়ালে ইসলামি কর্ম-অঙ্গনে প্রবেশ করা জিনিসগুলো। ফলে গণতন্ত্রকে ইসলামি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সমাজতন্ত্রকেও ইসলামি বিষয় বলা হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত এমন লোকও দেখা গেছে, যারা আধুনিকতার বিষয়টিকে তুচ্ছজ্ঞান করে একটা ‘ইসলামি আধুনিকতা’র আহ্বান জানায়।”[4]তাকওয়ীমু নাযারিয়্যাতিল হাদাসাহ, পৃ. ১২৬

তহা আবদুর রহমান মনে করেন, পাশ্চাত্য আকলের ফল হিসেবে উদ্ভূত বিশ্বায়ন (globalization) একটি ধারাবাহিক যুক্তিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, যার লক্ষ্য হলো পৃথিবীকে একক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে রূপান্তর করা। এই বিশ্বায়ন বিভিন্ন সমাজের মানুষকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসে একটি অভিন্ন বা বিশ্বজনীন সমাজে পরিণত করে। তিনি বলেন:

“এই একক বৈশ্বিক পরিসরে সম্পর্কের লক্ষণ হলো অন্তহীন ও অবিচ্ছিন্ন আন্তঃসংযোগ (interconnection)।”[5]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৭৮

এটি বৈশ্বিক পরিসরের ক্রমবর্ধমান আন্তঃসম্পর্ককে নির্দেশ করে, যা কিনা একক ও সমন্বিত কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে।

আর এই বিশ্বায়ন ব্যবস্থা, যাকে আধুনিকতার পশ্চিমা চর্চার (western practice) উত্তরসূরী হিসেবে ধরা হয় (আর এটা সমগ্র বিশ্বে সেটার বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়), এটির মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি তহা সমালোচনার তীর ছুড়েছেন, যেগুলো কিনা ব্যাহত হয়েছে খোদ এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই, তার তিন আধিপত্যবাদী নীতির মধ্য দিয়ে যা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

১. উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনীতির আধিপত্য এবং ‘তাজকিয়া’ বা নৈতিক পরিশুদ্ধতার নীতির অবক্ষয়:

তহা আবদুর রহমান মনে করেন, বিশ্বায়ন তার অব্যাহত কার্যক্রমের মাধ্যমে সব ধরনের উন্নয়নকে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপ দিতে চায়। এর অর্থ হলো, উন্নয়ন এখন এমন একটি সভ্যতাগত লক্ষ্য হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যে লক্ষ্য মূলত পশ্চিমা আধুনিকতার চাহিদা ও প্রয়োজন থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

এ কারণে, তিনি মনে করেন যে, বিশ্বায়ন যে উন্নয়নের ধারণা প্রচার করে, তা প্রকৃত উন্নয়নের বিরোধী, বিশেষ করে ‘তাজকিয়া’ নীতির, যা মানুষের সংশোধন, নৈতিক বিকাশ এবং চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি বলে তিনি মনে করেন। এর ফলে উন্নয়ন কেবল বস্তুগত লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তহা বলেন:

“সুতরাং বিশ্বায়নের ধারকরা তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে উপকার করে, কিন্তু সংশোধন করে না। তারা সম্পদ আহরণ করে, কিন্তু পরিশুদ্ধ করে না। তারা নিজেদের সম্পদের উন্নয়নে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু নিজেদের নৈতিকতার উন্নয়নকে উপেক্ষা করে।”[6]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮০

২. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির আধিপত্য এবং কর্মনীতির ব্যাঘাত:

তহা আবদুর রহমান মনে করেন, প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সঙ্গে মিশে গেছে আর বিজ্ঞান এখন তার হাতে শুধু একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এখন প্রযুক্তি বিজ্ঞানকে তার ভোগবাদী চাহিদা অনুযায়ী পরিচালিত করছে, যে চাহিদাগুলো বৈশ্বিক বাজার নির্ধারণ করে। অথবা প্রযুক্তি বিজ্ঞানকে তার বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত করে। এই প্রভাবের ফলে জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের গতি দ্রুততর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই সঙ্গে এই দ্রুততা মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ও ঝুঁকির আশঙ্কাও সৃষ্টি করতে শুরু করেছে।[7]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮১

৩. যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কের আধিপত্য এবং প্রকৃত যোগাযোগের নীতির ব্যাঘাত:

নেটওয়ার্কের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রেরক ও গ্রাহকের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক, তা বাস্তব জীবনের মতো সরাসরি আর স্বাভাবিকভাবে ঘটে না। কারণ নেটওয়ার্ক মূলত এমন কিছু বিষয়বস্তু (content) মাত্র, যা গ্রাহক গ্রহণ করে কিংবা প্রেরক প্রেরণ করে। এগুলো ধারাবাহিক সংকেতের আকারে থাকে, যাকে ‘তথ্য’ বা information বলা হয়, এগুলোর মাধ্যমেই যন্ত্রগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।

এই কারণে তহা আবদুর রহমান মনে করেন:

“বিশ্বায়নের অনুসারীরা তাদের যোগাযোগ-সম্পর্কগুলোর (Communicative relations) ক্ষেত্রে শুধু তথ্য আদান-প্রদানেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু ব্যক্তি-অভিজ্ঞতাগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয় না। তাদের নৈতিকতা এমন লোকদের মতো, যারা তথ্যকে এমন পবিত্র মনে করে, যেন তা ঐশী বাণীর মতোই পবিত্র। আমাদের চারপাশে যে ‘তথ্যগত বিভ্রান্তি’ দেখা যাচ্ছে, তা এই যোগাযোগকে দেবত্ব দেওয়ারই নমুনা।”[8]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮৪

এ প্রেক্ষিতে তহা পাশ্চাত্য পরিবারের সমালোচনা করেন, যা আধুনিক চেতনার পশ্চিমা চর্চার উত্তরসূরী। কিন্তু তিনি মনে করেন, এই পরিবার আধুনিক চর্চার চেতনায় অর্জিত নৈতিক নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তিনি বলেন:

“কাজের পরিবারই মানুষের মাঝে নৈতিক সম্পর্কের প্রকৃত উৎস। অর্থাৎ নৈতিকতা ছাড়া প্রকৃত মানবিক সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই।”[9]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১০০

এর মাধ্যমে তহা আবদুর রহমান মানবসভ্যতার এমন কিছু ধাপ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো অতিক্রম করতে গিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে নৈতিকতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছে। বিশেষ করে এনলাইটেনমেন্ট যুগের চিন্তাবিদদের মধ্যে এই প্রবণতা স্পষ্ট। তাঁরা নৈতিকতাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের কর্তৃত্ব থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি কয়েকটি মৌলিক নীতির মাধ্যমে প্রকাশ পায়:

১. মানবকেন্দ্রিকতার নীতি:

এই মত অনুযায়ী, মানুষ নিজেই নিজের জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম। কোনো অতীন্দ্রিয় শক্তির সাহায্য ছাড়াই বা কোনো উচ্চতর সত্তার ওপর নির্ভর না করেই তারা নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। ফলে এই নীতি ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্নতার আহ্বান জানায়।

২. যুক্তিনির্ভরতার নীতি:

এই মতে, মানুষের মধ্যে আকল বা যুক্তিই হলো একটি অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব, যার মাধ্যমে সে নিজেই সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। এই নীতির অনুসারীরা মনে করে, সত্যের দিকে পরিচালিত করার জন্য কোনো বাহ্যিক কর্তৃত্ব নেই। ফলে এই নীতি আত্মা বা রুহ থেকে বিচ্ছিন্নতার আহ্বান জানায়।

৩. দুনিয়ার প্রতি আসক্তির নীতি:

এই নীতির অনুসারীদের মতে, মানুষের প্রকৃত আবাসস্থল হলো এই পার্থিব জীবন। দুনিয়াতেই তার সাফল্য ও কল্যাণ নিহিত, যা হাসিল হয় তার ধারাবাহিক, উন্নত ও সমন্বিত বা পূর্ণাঙ্গ অর্জনগুলোর মাধ্যমে। ফলে এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চিন্তা ও প্রচেষ্টাকে কেবল দুনিয়ামুখী করে তোলে এবং পরকাল (আখিরাত)-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়।[10]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১০১

আধুনিকতার এই সাধারণ নীতিগুলো, যেমন মানবকেন্দ্রিকতা, যুক্তিনির্ভরতা এবং দুনিয়াবাদ, নিয়ে আলোচনা করার পর তহা আবদুর রহমান পশ্চিমা আধুনিকতার চর্চাগুলো যেসব দিক নিয়ে এসেছে, সেগুলোর ত্রুটি বা বিপর্যয় নির্ধারণ করেন। তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার মূল্যবোধে আপেক্ষিকতার রোগ প্রবেশ করেছে। ফলে স্বাধীনতা ধর্মীয় পরম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, এবং আধুনিক মানুষ পরমের পরিবর্তে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে সৃজনশীলতার মূল্যবোধে বিচ্ছিন্নতার আপদ প্রবেশ করেছে। এর ফলে সৃজনশীলতা পূর্ববর্তী সবকিছু থেকে, বিশেষ করে ঐতিহ্য থেকে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আবার যুক্তিবাদের মূল্যবোধে উপকরণবাদ (ইনস্ট্রুমেন্টালিজম) প্রবেশ করেছে, যা একে এমন কিছু চিন্তার পদ্ধতি ও মূলনীতিতে পরিণত করেছে, যেগুলো কিনা শুধু প্রযুক্তি উৎপাদন ও তা উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মূল্যবোধেও বস্তুবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে এই মূল্যবোধ আত্মিক উৎকর্ষ থেকে সরে গিয়ে বস্তুগত সাফল্য ও ভোগকেন্দ্রিক মানসিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব প্রবণতার সম্মিলিত প্রভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের স্বাভাবিক ও সুষম গতিপথ ব্যাহত হয় এবং মানবজীবনের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।[11]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১৪৮–১৪৯

এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আধুনিকতা যেমন দিয়েছে, তেমনি একই সঙ্গে কেড়েও নিয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে এটি সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অবদান রেখেছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে এমন ঝুঁকি ও ত্রুটি যুক্ত হয়েছে, যা বহু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

দ্বিতীয় পাঠ: তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে আরব আধুনিকতা

আধুনিকতা তার বহু উপাদানের মাধ্যমে চিন্তাবিদদের ধারণায় বহু পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব বৌদ্ধিক প্রকল্প অনুযায়ী এই ধারণাগুলোকে নতুন রূপ দিয়েছেন, যেমন নবায়ন, আধুনিকীকরণ ইত্যাদি।

আধুনিকতা প্রায়ই ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমালোচনা করে। সে এটি করে মূলত পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এবং শরিয়তের ওপর আকলের প্রাধান্য দানের আহ্বান জানিয়ে। কিন্তু এই অবস্থানের বিরুদ্ধে অনেক চিন্তাবিদ আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের মধ্যে তহাই উল্লেখযোগ্য। তিনি মনে করেন:

“আধুনিকতা হলো কোনো একটি জাতির, যে জাতিই হোক, মানব ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া। যার ফলে সেই জাতি অন্যদের তুলনায় ওই সময়ের বৈশিষ্ট্যে বিশেষ হয়ে ওঠে এবং মানবজাতির পূর্ণতা সাধনের শেষ লক্ষ্য পর্যন্ত এর দায়িত্ব বহন করে।”[12]আল হাদাসাহ ওয়াল মুকাওয়ামাহ, পৃ. ২০

এই কারণে তহা আবদুর রহমান চান যে, আধুনিক কার্যক্রমের সুফল সব জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, যাতে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি অর্জন করতে পারে।

এখানে তহা আধুনিকতা বা হাদাসা (حداثة)-কে ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, আমরা যখন বলি حدث الشيء এর মানে হলো صيره حديثا তথা কোনো কিছুকে নতুন করে তোলা। অর্থাৎ পুরোনো অবস্থা থেকে নতুন একটা অবস্থায় স্থানান্তর করা। তাই যখন বলা হয় “আরব-ইসলামি চিন্তার আধুনিকীকরণ”, তখন তার অর্থ হয় নবায়নের কাজে নিযুক্ত হওয়া।[13]রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১৫৪

এর মানে, আধুনিকতা হলো নবায়ন ও পরিবর্তনের আহ্বান, কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ না করেই। অর্থাৎ আরব-মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর সঙ্গে কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) বিচ্ছেদ সৃষ্টি না করেই। যেমনটি মুহাম্মদ আবেদ আল-জাবেরি তাঁর আধুনিকতাবাদী প্রকল্পে বলেছেন।

তহা আবদুর রহমান মনে করেন যে পশ্চিমা বিশ্ব সাধারণভাবে তাদের ঐতিহ্যের সমালোচনা করেনি এবং এর সঙ্গে কোনো বিচ্ছেদও ঘটায়নি। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি তথাকথিত রেনেসাঁকে উল্লেখ করেন, যা তাঁর মতে গ্রিক ঐতিহ্যের দিকে সমালোচনাহীন প্রত্যাবর্তন মাত্র। ইউরোপীয় রেনেসাঁর শুরুতে যে সমালোচনা দেখা গিয়েছিল, তা ছিল গির্জার ঐতিহ্য ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি হিসেবে ঐতিহ্য তখন সমালোচনার মুখে পড়েনি।[14]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১৩৩

আরব আধুনিকতাবাদীদের ব্যাপারে তহা আবদুর রহমান মনে করেন, তারা পশ্চিমের পথ অনুসরণ করেছে এবং পশ্চিমকে সংস্কৃতি ও সভ্যতার আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা মনে করেছে, উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য ঐতিহ্যের সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটানো প্রয়োজন। তিনি এ বিষয়ে বলেন:

“আরব আধুনিকতার প্রশ্নে আমি মনে করি, আদতে আরব আধুনিকতা বলতে কিছু নেই। আরব আধুনিকতাবাদীরা মূলত স্পষ্ট মুকাল্লিদ বা অন্ধানুসরণকারী। উদাহরণস্বরূপ, যখন ডিকনস্ট্রাকশন (deconstruction) আসে, তারা ডিকনস্ট্রাকশনবাদী হয়ে যায়। যখন স্ট্রাকচারালিজম (structuralism) আসে, তারা স্ট্রাকচারালিস্ট হয়ে যায়, এভাবেই চলতে থাকে।”[15]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১০৪

তাঁর মতে, আধুনিকতার মূল নীতি হলো সৃজনশীলতা, তাকলিদ বা অনুকরণ নয়। তাই তিনি পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ প্রত্যাখ্যান করেছেন, তবে তা সম্পর্কে জানাকে নিষেধ করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে, প্রয়োজন হলো পশ্চিমকে হুবহু নকল বা পুনরাবৃত্তি করা নয়, বরং নিজস্ব পদ্ধতিতে নতুনভাবে সৃজন করা।[16]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১০৫

কারণ আরব-ইসলামি জাতির প্রয়োজন ও পরিস্থিতি পশ্চিমা বিশ্বের প্রয়োজন ও অবস্থার মতো নয়। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা রয়েছে, যেগুলো অর্জনের জন্য তারা চেষ্টা করবে।

এই ভিত্তিতে, তহা আবদুর রহমান মনে করেন আধুনিকতা হলো সহাবস্থান এবং ইতিবাচক পারস্পরিক ক্রিয়া, যা এক ধরনের সভ্যতাগত অভিযাত্রার প্রতি জোর দেয়, যা কিনা সৃজনশীলতা ও ইজতিহাদের আহ্বান জানায়। এর লক্ষ্য হলো সেই বিদ্যমান বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা, যা পশ্চিমা ঐতিহ্যের অনুসরণে গড়ে উঠেছে এবং যা আরব বাস্তবতার ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, কারণ তারা অন্যের সংস্কৃতির আহ্বান জানাচ্ছে, যা তাদের কাছে বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত। তিনি বলেন:

“মৌলিকতার আহ্বান মানে হলো একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাস, (প্রাচীনের সঙ্গে) সংযোগ, (সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ব্যাপারে) উষ্ণতা অনুভব এবং নিজের সত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যের আহ্বান।”[17]মাদারাতুল হাদাসাহ, সাবিলা, পৃ. ২৫৩

এটি প্রমাণ করে যে চিন্তাবিদ তহা আবদুর রহমান মৌলিকতার প্রতি অনুগত থাকার এবং তুরাস বা ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের প্রতি আহ্বান জানান, যা আমাদের সভ্যতাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর মূল্যায়নমূলক গবেষণায় তিনি অনুসারীদের দুই ধরনের মধ্যে পার্থক্য করেন:

১. এক ধরনের মানুষ যারা ইসলামি আধুনিকতার ভিত্তি স্থাপনের চেষ্টা করে, যেখানে ভাষা ও ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২. আরেক ধরনের মানুষ যারা পশ্চিমা সভ্যতার বস্তুবাদী দিক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাকে অগ্রগতি ও উন্নয়নের মডেল হিসেবে গ্রহণ করে।

এ প্রসঙ্গে তহা আবদুর রহমান বলেন:

“আধুনিকতাকে পশ্চিমা শর্ত অনুযায়ী কেবল নকল করার চেয়ে তাসিল (মৌলিক ভিত্তি স্থাপন) অধিক ইজতিহাদপূর্ণ কাজ। সুতরাং যে ব্যক্তি ইসলামি ডিসকারসিভ পরিসরে অর্থগুলোকে তাসিল করার চেষ্টা করে, সে ভুল করলেও একজন মুজতাহিদ। এবং সে এমন এক ধরনের সৃজনশীলতা নিশ্চিত করে, যা সরাসরি অনুকরণে স্থবির আধুনিকতাবাদী অর্জন করতে পারে না।”[18]হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১০৪

এতে বোঝা যায় যে তহা আবদুর রহমান মৌলিকতাকে প্রাধান্য দেন এবং সৃজনশীলতা আনার চেষ্টা করেন, অন্য ঐতিহ্য থেকে নকল করা ছাড়াই। যেহেতু অন্য থেকে নকলের কাজটি সৃজনশীলতার প্রভাবশূন্য এক ধরনের সমসাময়িকতাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

উপরের আলোচনা থেকে তথাকথিত আরব আধুনিকতা সম্পর্কে তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়, যে আধুনিকতার দিকে অনেক চিন্তাবিদ অগ্রসর হতে চেয়েছেন। তিনি আধুনিকতার বাস্তবতা ও আধুনিকতার স্পিরিটের মধ্যে পার্থক্য করেন। আধুনিকতার বাস্তবতা নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে ঘটে, কিন্তু আধুনিকতার স্পিরিট, যার দিকে তহা রহমান আহ্বান করেন, সেটা যেকোনো সময় ও যেকোনো স্থানে ঘটতে পারে এবং তা মানুষের সভ্যতাগত অস্তিত্বকে উন্নত করার ক্ষমতা রাখে।

 

তৃতীয় অধ্যায়: আরব রেনেসাঁ এবং পশ্চিমা আধুনিকতার তুলনা

আধুনিকতা চিন্তার গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি পশ্চিমা ও আরব-ইসলামি উভয় সভ্যতায় জ্ঞান ও সচেতনতার পরিসর বিস্তৃত করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে “আধুনিকীকরণ” ও “নবায়ন”-এর নামে বহু প্রকল্পের জন্ম হয়েছে, যা আধুনিক মডেল বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ও অবস্থান দেখা যায়। আমরা এখানে পশ্চিমা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য এবং আরব-ইসলামি সভ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করব, যেগুলোকে অনেক চিন্তাবিদ সভ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। নিম্নে সেগুলো উপস্থাপন করা হলো:

১. পশ্চিমা আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য

পশ্চিমা আধুনিকতা আকল বা যুক্তিকে একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থান দিয়েছে। সেখানে আকলকেই সকল জ্ঞানের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করেছে, ফলে মানুষ তার মত প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে, কারণ মানুষ মূলত স্বাধীন সত্তা। সে তার নিজস্ব যুক্তির মাধ্যমে নিজের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার রাখে, কোনো বাহ্যিক সহায়তা ছাড়াই। হাবারমাস (১৯২৯) এ বিষয়ে বলেন: “আধুনিকতা একটি আইডিওলজিতে পরিণত হয়েছে, যা একটি পরোক্ষ ভাষ্য তৈরি করেছে, আকল বা যুক্তিকে দেবত্ব দিয়েছে ও সেটিকে একটি যন্ত্রে পরিণত করেছে এবং ধর্মকে এমন চিন্তা হিসেবে বাদ দিয়েছে যা যুক্তিবাদের বিরোধী।”

“ধর্মনিরপেক্ষতা” বা দুনিয়াবাদকে পশ্চিমা আধুনিকতার একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মানুষকে পার্থিব জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে, তা কেবল নিয়ে চিন্তা করতে এবং শুধুমাত্র সেই দিকেই মনোযোগ দিতে আহ্বান জানায়।

পশ্চিমা আধুনিকতা এমন একটি সভ্যতাগত প্রকল্প, যা বর্তমান সময়ে প্রচলিত অনুকরণের সব ধরনের প্রাধান্যকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ সেগুলো অতিক্রম করে তা পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটাতে চায়।

পশ্চিমা আধুনিকতা এমন এক বাস্তব অনুশীলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রাচীন সংস্কৃতিগুলোর ভিত্তির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। কারণ সেগুলো ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, বা যাকে বিশ্বায়ন বলা হয়, যা পশ্চিমা চিন্তাধারায় আধিপত্য করেছে, তাকে ধর্মীয় নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতার একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি সমাজের মৌলিক নীতিগুলোর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঘটেছে (যেমন কর্মের নীতি, যোগাযোগের নীতি এবং আত্মশুদ্ধির নীতি)। ফলে আধুনিকতাবাদী ব্যক্তি ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকারকে আর বিশ্বাস করে না, বরং এটিকে অতীতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এভাবে আধুনিকতাবাদীরা তথ্যবিদ্রোহ বা বিপ্লবে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে, যা সব ক্ষেত্রেই শুধু পরিবর্তন ও উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

২. আরব রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য

আরব রেনেসাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সভ্যতার পূর্ণতর স্তরে উন্নীত করা, কারণ এটি এমন কিছু নীতির সমষ্টি যা মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিশ্চিত করে।

আরব রেনেসাঁ ছিল পশ্চাৎপদতা প্রত্যাখ্যান এবং সমাজকে সব ধরনের অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ছিল সমাজের সংস্কার। যেমন মুহাম্মদ আবদুহু বলেছেন:

“আমি চিন্তাকে তাকলিদ বা অনুকরণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য আমার কণ্ঠ উচ্চ করেছি, এবং ইসলাম ঘোষণা করেছে যে মানুষকে লাগাম দিয়ে পরিচালিত হওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। বরং সে স্বভাবতই জ্ঞান ও তথ্যের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।”[19]রিসালাতুত তাওহীদ, আবদুহু, পৃ. ৭৫

তহা আবদুর রহমানের মতে বলা যায় যে, আরব রেনেসাঁ সৃজনশীলতার চেয়ে অনুকরণপ্রবণ ছিল বেশি। কারণ অধিকাংশ আরব চিন্তাবিদ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার (ঐতিহ্য)-এর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটাতে চেয়েছিলেন, এটিকে পশ্চাৎপদতার নমুনা হিসেবে বিবেচনা করে। এবং তারা পশ্চিমা সভ্যতাকে অগ্রগতি ও উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে সেটির পথ ধরেছিল।

আরব আধুনিকতাবাদীদের পদ্ধতিতে সমাজকে উন্নত করার ক্ষেত্রে বিভিন্নতা দেখা যায়। কেউ জাতির বাস্তব অবস্থা সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন, যা নির্দিষ্ট সময়পর্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কেউ জাতির আত্মা বা চেতনার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যা সকল সময় ও সকল স্থানে স্থায়ী থাকে।

আরব আধুনিকতা একটি বৌদ্ধিক প্রকল্প, যার লক্ষ্য মুসলিম মনের কাঠামোকে নবায়ন ও আধুনিকীকরণ করা (যে মন অতীতে আবদ্ধ ছিল) এবং তাকে একটি সভ্যতামুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মুক্ত করা।

 

উপসংহার:

পশ্চিমা আধুনিকতা একটি কোপার্নিকান বিপ্লবের মতো আবির্ভূত হয়েছিল, যা ইউরোপীয় যুক্তিকে পোপদের কর্তৃত্বাধীন সব বাধা থেকে মুক্ত করেছিল। তাই এটি মানব আকলকে সব কিছুর প্রকৃত বিধানদাতা হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু মুসলমানের ক্ষেত্রে বিচার নির্ধারণে আকলের পাশাপাশি শরিয়ত বা ওহিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তহা আবদুর রহমানের মতে, পশ্চিমা আধুনিকতা নৈতিক মাত্রা থেকে বঞ্চিত। কারণ এটি তাত্ত্বিক (বিমূর্ত) আকলের ওপর ভিত্তি করে, যে আকল মানুষ ও প্রাণী উভয়ের মধ্যেই আংশিকভাবে থাকতে পারে। কিন্তু যে আকল মানুষকে প্রকৃত মানবিকতা দেয়, তা নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই কারণে তাঁর দৃষ্টিতে পশ্চিমা আধুনিকতা নৈতিক দিক থেকে ঘাটতিপূর্ণ।

পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী ব্যক্তি দুনিয়ামুখী নীতিতে বিশ্বাস করে, যা মানুষকে কেবল পার্থিব জীবনের প্রতি মনোযোগী করে তোলে এবং আখিরাতকে উপেক্ষা করতে প্ররোচিত করে। এই নীতি ইসলামি শরিয়তের বিরোধী, এবং এ কারণেই তহা আবদুর রহমান পশ্চিমা আধুনিকতার এই দিকটি প্রত্যাখ্যান করেন।

তহা আবদুর রহমান বিশ্বায়নের ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেন, যা একটি বৈশ্বিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। যদিও এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তবুও এটি বহু সংকট ও ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরব রেনেসাঁকে অনুকরণমূলক আধুনিকতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন, সৃজনশীল নয়। কারণ এটি পশ্চিমা নীতি ও ধারণাগুলোকে পুনর্গঠন না করে সরাসরি গ্রহণ করেছে। এর ফলে এটি ইসলামি শরিয়তের নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

তহা আবদুর রহমান মনে করেন, আরব আধুনিকতায় সৃজনশীলতার অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, আধুনিকতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সৃজনশীলতা। কিন্তু আরব রেনেসাঁয় এই উপাদানটি অনুপস্থিত, যা তাকে সব ক্ষেত্রে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিতে পারত।

আরব আধুনিকতা এমন এক রেনেসাঁর রূপে এসেছে, যা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার (ঐতিহ্য)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তহা আবদুর রহমান এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও নবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। একই প্রবণতা আমরা জাবেরির নবজাগরণমূলক প্রকল্পেও দেখতে পাই।

তহা আবদুর রহমান সৃজনশীলতার ওপর ভিত্তি করে সহাবস্থান ও সভ্যতাগত পারস্পরিক ক্রিয়ার আহ্বান জানান, যার উদ্দেশ্য বাস্তব অবস্থাকে পরিবর্তন করা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: “আধুনিকতা হলো একটি জাতির তার সময়ের দায়িত্বসমূহ পালন করা।” এর অর্থ হলো, ইসলামি উম্মাহ যখন তার সকল দায়িত্ব পূরণ করবে, তখনই সে তার নিজস্ব আধুনিকতা অর্জন করবে।

মোদ্দা কথা, তহার মতে পশ্চিমা আধুনিকতা ও আরব রেনেসাঁর মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে, উভয়ের লক্ষ্য নবায়ন, পরিবর্তন এবং এমন সব ঐতিহ্যগত বাধা থেকে মুক্তি, যা অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে প্রত্যেকটির নিজস্ব যুক্তি ও প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা বিবেচনা করা উচিত। পশ্চিমা আধুনিকতার ভিত্তি যে নীতিগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো ইসলামি শরিয়তের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এ বিষয়টি তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন এবং এই বিষয়টাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, আরব রেনেসাঁর কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এটিই আরব আধুনিকতার সৃজনশীল রূপ হিসেবে গণ্য হয়।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ৯৭–৯৮
2 সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ১৪
3 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ৯৮–৯৯
4 তাকওয়ীমু নাযারিয়্যাতিল হাদাসাহ, পৃ. ১২৬
5 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৭৮
6 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮০
7 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮১
8 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ৮৪
9 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১০০
10 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১০১
11 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১৪৮–১৪৯
12 আল হাদাসাহ ওয়াল মুকাওয়ামাহ, পৃ. ২০
13 রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১৫৪
14 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১৩৩
15, 18 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১০৪
16 হিওয়ার উফুকান লিল ফিকর, পৃ. ১০৫
17 মাদারাতুল হাদাসাহ, সাবিলা, পৃ. ২৫৩
19 রিসালাতুত তাওহীদ, আবদুহু, পৃ. ৭৫

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments