ডিউটি শেষ করে দেখি কেনান হাসপাতালের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। গভীর মনোযোগে ক্যামেরা নাড়াচাড়া করছে। একটু থমকে গিয়ে ওর মুখের দিকে মুগ্ধতার অনুভূতি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। যে অনুভূতির সাথে দুঃখ-কষ্ট-লজ্জার কোনো সম্পর্ক নেই। যে অনুভূতি মনে করিয়ে দেয় বসন্ত শেষের বিকেলগুলোর কথা। ওকে এভাবে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে উলের সোয়েটার পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতর কোথাও একটা নীল বেদনার ঢেউ জাগে—সেই না হওয়া জীবনের জন্য, যে জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে আমার কাছ থেকে। আমাদের দু’জনের কাছ থেকে।
সেই জীবনে হয়ত, আমি এখানে প্রশিক্ষণ নিতাম, আর কেনান হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করত, স্কেচবুকে ছবি আঁকত। তারপর নিয়ে যেত আল-হালাবি ডেজার্টসে, বুজা খাওয়াত, আর সেই ছোট্ট জাপানি শহরের গল্প করত যেখানে আমাদের চলে যাওয়ার কথা। হয়ত আমাকে কয়েকটা জাপানি অক্ষর শেখাত, আমার উচ্চারণে হেসে ফেলত। তবু ধৈর্য ধরে শিখিয়ে যেত, আমি ঠিকঠাক শেখা পর্যন্ত। হয়ত পরের ফার্মাকোলজি পরীক্ষার পড়া ধরত। কিন্তু দ্রুতই পড়াশোনা খেই হারিয়ে ফেলত আমাদের অন্য কথার ভেতর। আমি হয়ত বলতে বসতাম মাথার ভেতর স্টুডিও ঝিবলির মতো জমে থাকা গল্পগুলো। আমিও যে এই পৃথিবীতেই ম্যাজিকাল কিছু মুহূর্ত খুঁজে পাই, আর সেগুলোই আমার গল্পে আরও বড় করে ফুটিয়ে তুলি।
আমার ডাক শুনে কেনান চমকে উঠলেও আমাকে দেখে হেসে ফেলে। ওকে বলি, “কিছু হইছে? কিছু লাগবে?”
“না আমি ঠিক আছি। আপনার শিফট শেষ?”
“হ্যাঁ?”
“আচ্ছা।” ও সোজা হয়ে দাঁড়াতেই আমি পিছে হেলে আসি। “চলেন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।”
আয়হায়! কী বলে!
“আরে না, না! লাগবে না।”
মাথা দোলায় ও, “সমস্যা নাই, চলেন।”
“লামার চিকিৎসার জন্য বারবার আপনার এভাবে ঋণ শোধের চেষ্টা করতে হবে? আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে বাইরে আপনার যেটুকু সময় যাবে, তাতে তো আপনার বিপদ বাড়াবে।”
ওর দীর্ঘ চাহনির সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাত ঘামতে শুরু করে। যেন এই জায়গায় আমি ছাড়া আর কোনো জনমানুষ নেই।
“সালামা।” ওর মুখে নিজের নাম শুনতেই বুক ধক করে ওঠে। কী কোমল আর উষ্ণ! “আমি আপনাকে দিয়ে আসতে চাচ্ছি।”
আমার বোকামন ফিসফিসিয়ে বলে, ঠিক আছে ও যদি এতই চায়, তাহলে চলুক।
“যদি আপনি বিরক্তবোধ না করেন,” হঠাৎ আতঙ্কিত কণ্ঠে দ্রুত বলে ও, “স্যরি, আমি আসলে…”
“আরে, না, না। বিরক্ত হচ্ছি না। দ্রুত মাথা নেড়ে বলি।
ওর দ্বিধামাখা হাসি দেখে আমার দুশ্চিন্তারা সব নিমেষেই উবে যায়।
পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করি দুজন। নুড়ি-পাথরের ওপর দুজনের পায়ের শব্দ আমার কানে অস্বাভাবিক জোরালো শোনায়। শুকনো পাতার মর্মর, পাতাহীন ডালের ওপর বসে থাকা কোনো দুঃখী পাখির ডাক, আর দূরে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের চাপা তর্ক ভেসে আসে। কেনানের প্রতিটা নিঃশ্বাস কানে এসে লাগে, আর আমার বুকের ভেতরটা এত জোরে ঢিবঢিব করে যেন এই শব্দেই কান ফেটে যাবে।
হঠাৎ হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি—লাল ছোপছোপ দাগ। সামারের রক্তের মতো লাল। আর একটু হলেই চিৎকার করে ফেলতাম ভয়ে—কারণ আমি তো হাত ধুয়েছি, পুরো দশ মিনিট ধরে। আবার তাকাতেই দেখি কোনো দাগ নেই। কিন্তু চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন চিৎকার করে করে আমাকে বলছে, খুনি।
“সালামা!” সমস্ত চিৎকার ভেদ করে কেনানের স্বর আমার কানে এসে ঢোকে, তখনই যেন দম নেয়ার সুযোগটা পাই।
চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারি—আমি মাটিতে বসে পড়েছি, সামনে কেনান দাঁড়িয়ে। ওর চোখে-মুখে ভীষণ ভয়।
আমার জন্য ভীত ও!
“সালামা, ঠিক আছেন আপনি?” হাঁটুগেড়ে বসে প্রশ্ন করে, “কোথাও লেগেছে?”
মাথা নাড়ি। আমার চোখ বরাবর, এত কাছাকাছি ঝুঁকে এসেছে ও—গা থেকে লেবুর মৃদু সুগন্ধি ভেসে আসছে। নাকি তাও আমার কল্পনা?
“তাহলে কী হইছে?”
চারদিকে তাকিয়ে দেখি কোথাও খওফ আছে কি না। কেনানের পেছনেই কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে ও। ঠোঁটে তীক্ষ্ণ, তৃপ্ত এক হাসি। আজকের ঘটনার ফলাফলে যেন ও সন্তুষ্ট। চোখটা বন্ধ করে ওকে দূর করার চেষ্টা করি। ওর উপস্থিতি যেন বুকের উপর জগদ্দল এক পাথর, আমাকে ডুবোতে ডুবোতে নিয়ে যায় কোন অচেনা অতলে, মনে করিয়ে দিতে থাকে সমস্ত কিছু। যা হারিয়েছি, আর যা কিছু হারাতে থাকব সারাজীবন।
ভাঙাচোরা কিছু বাড়িঘর দাঁড়িয়ে আছে নির্জন রাস্তায়। আর কিছুদূর গেলেই আমার বাড়ি। এই মুহূর্তে এখানে শুধু আমি আর কেনান ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে আছি।
কিন্তু খওফ এখনো দাঁড়িয়ে। আর ওর কারণে নিজের কৃতকর্ম ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারছি না এখন আমি। আমার যেন গা থেকে সবটুকু রক্ত ঝরে যাচ্ছে এমন মনে হতেই দ্রুত বলে বসি, “আমাকে ভালো কিছু বলেন।”
কেনানের বিভ্রান্তি বাড়ে। “জ্বী?”
“কেনান, প্লিজ,” মিনতি করে চোখ তুলে ওর দিকে তাকাই। “প্লিজ।”
আমার দৃষ্টিকে অনুসরণ করলেও খওফকে ও দেখতে পায় না। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খুঁটেখুঁটে ওকে দেখি আর বিড়বিড় করে বলতে শুরু করি, “ডেইজি। মিষ্টিগন্ধা ডেইজি। সাদা পাপড়ি। হলুদ বৃন্ত।”
কেনানের গাল দুটো অপুষ্টিতে দেবে গেছে। তবু মনে হয় সুস্থ থাকলেও ওর চিকবোন দুটো এত ধারালো হতো, ছুঁলেই যেন হাত কেটে যাবে। ও আবার আমার দিকে তাকায়। ওকে দেখে বুঝতে পারছি ওর মনে হাজারটা প্রশ্ন, কিন্তু নিজের সাথে লড়াই করে ও সব চেপে রাখছে।
এবার ও গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করে, “আমার সবচেয়ে প্রিয় স্টুডিও ঝিবলির মুভি হচ্ছে ক্যাসেল ইন দ্য স্কাই। এটা দেখার পর থেকে আমার দুনিয়া দেখার ধরণই বদলে গেছে। কী এক জাদুকরী দুনিয়া, সালামা! একটা ছেলে—তার স্বপ্ন একটা ভাসমান দ্বীপ দেখবে। আর একটা মেয়ে—ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক জাতির সর্বশেষ মানুষ। আর এই দুটো বাচ্চা যেভাবে এক ক্ষমতালোভী মানুষের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচায়। তারপর আরো আছে রোবট, জাদুকরী লকেট, আবার এত চমৎকার একটা এন্ডিং থিম সং আছে, সেরা!”
ও টুপ করে হেসে ফেলে, যেন নিজের কথার ভেতরেই ডুবে আছে। আমার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে আসে। ওর কথাগুলো শুনতে থাকি। শেষ কবে সিনেমাটা দেখেছি মনে নেই, কিন্তু দৃশ্যগুলো এখনো স্পষ্ট মনে ভাসে।
“ওইখানে একটা দৃশ্য আছে এরকম,” কেনান আবার বলে, “রাতের বেলা পাজু আর শীতা এয়ারশিপের ওপর দাঁড়ায়ে থাকে। অ্যানিমেশন হইলেও আকাশটাকে মনে হয়… অন্তহীন। ওরা নিজেদের ভয় নিয়ে কথা বলে, কিভাবে একটার পর একটা দূর্ঘটনা ওদেরকে এক জায়গায় নিয়ে আসছে সেই কথা বলে। আমি মাত্র দশ বছর বয়সে মুভিটা প্রথম দেখি। কিন্তু ওই দৃশ্যটা আমাকে এত গভীরভাবে নাড়া দিছিল! মুভিটা আমারই বয়সী দুইটা বাচ্চার গল্প, যারা ভয় পেয়েও ঠিক কাজটা করে ফেলছে। তখনই মনে হইছিলো—আমারও এমন সাহসী হওয়া লাগবে। আমারও এভাবে নিজের গল্প বলতে হবে। নিজের একটা দুনিয়া গড়তে হবে। আর তখন মনে হইতো—কোনো একদিন আমিও এমন এডভেঞ্চারে যাব, আমারও নিজের শীতার সাথে দেখা হবে।”
পুরোটা সময় ওর দৃষ্টি আমার দিকে ছিলো। কিন্তু একবারও মনে হয়নি ও আমাকে দেখছে। চোখজুড়ে ওর স্বপ্নীল আভা, সারা চেহারায় মেখে থাকা শান্তির ছটার দিকে আমার তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে।
আমাদের চারপাশে থেমে গেছে সমূহ কোলাহল। শুধু খানিক মৃদু বাতাস আমাদের মাঝখান দিয়ে শব্দ করে বয়ে যায়। আমার ভেতরের আতঙ্কিত স্রোত থেমে যায় ধীরেধীরে। মনে হয়, চিরকাল যদি এভাবেই বসে থাকতে পারতাম, ওর কথামালায় তৈরি এই পরমাশ্রয়ের জগতে।
কিন্তু তারপরই ওর চাহনি তীক্ষ্ণ হয়ে আসে, এবার যখন আমাকে দেখতে পায়, সাথে সাথে গোলাপি আভা ফুটে ওঠে দুই গালে। ওর গায়ের রং আমার চেয়ে ফ্যাকাশে, আর চেহারার রং লুকোনোয় বড়ই আনাড়ি ও।
গলা খাকারি দিয়ে নিরবতা ভাঙে কেনান। “ভালো কিছু কি বলতে পারছি?”
হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে এই মুহূর্তটাকে বুকের ভেতর গুঁজে রাখি আলতো পরশে, যেন দুঃখ ফিরে এলে আবার বের করে দেখতে পারি।
কেনান হাসে, “আচ্ছা।”
উঠে দাঁড়িয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করি। কী হয়েছে না হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন ও না করায় কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেছে আমার। কিন্তু একেবারে চুপচাপ থাকাটাও কেমন যেন লাগে।
তাই ক্যামেরার দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, “যেভাবে চাইতেছিলেন সেভাবে পাইছেন?”
“ও হ্যাঁ। যারা স্নাইপার হামলার শিকার, ওদের ফুটেজ নিছি। একটা পরিবার ছিল—ওরা চেহারা ব্লার করতে চায়নি। ওরা চায় সত্যিটা স্পষ্টভাবে সবাই দেখুক।”
আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। ও তাহলে সত্যিই স্নাইপার ভিকটিমদের ফুটেজ নিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম ও নিশ্চিত আশেপাশে নেই। কিন্তু তখন আমি এতটাই উত্তেজনা আর ভয়ের ভেতর ছিলাম—হয়তো খেয়ালই করিনি।
“ও…” স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলি, “কী ধরনের শট নিছেন?”
“আমি তখন অন্য রুমে এক পরিবারের ইন্টারভিউ নিতেছিলাম। স্নাইপার ভিকটিমরা আসার পর যখন পৌঁছাইছি, তখন এত ভিড় ছিল, আমি সামনে যাইতেই পারি নাই। আবার কারো কাজেও বাগড়া দিতে চাই নাই আসলে। আমার সবচেয়ে কাছে ছিলেন ডা. যিয়াদ, তাই উনার আর উনার রোগীর ফুটেজই নিছি।”
স্বস্তিতে বুকের ভারটা নেমে যায়। কিন্তু প্রতিটা শ্বাসের সাথে অপরাধবোধও গাঢ় হয়ে ওঠে আমার।
“কিন্তু আপনাকে দেখছিলাম একটা মেয়েকে বাঁচাইছেন,” স্বরে মুগ্ধতা মেখে বলে ও। “আমি তাকিয়ে দেখি ওর গলায় সেলাই করতেছিলেন। গুলিটা সোজা ভেতর দিয়ে চলে গেছিলো, না?”
আবারও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। “জ্বী!”
আর দশ ফিট দূরেই, কোণে আমার বাসা।
“ওরে বাঁচায়ে আসলে আপনি ওর বাবাকে বাঁচাইছেন।” ওর কথা শুনে মনে হয়, ভাগ্যিস লজ্জায় আমার কানকাটা যাওয়ার অবস্থাটা ও খেয়াল করেনি। কিন্তু ওর বলার ভঙ্গিতে কিছু তো একটা ছিলো, যার কারণে আমি চোখ তুলে তাকাতে বাধ্য হই। ওকে দেখে ভীষণ ভীত মনে হয়। কিন্তু চোখাচোখি হতেই সে ভয় মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নেয় একরাশ হাসি, “আপনি আসলেই অসাধারণ!”
প্রশংসাটা শুনে সায়ানাইডের মতো তিতা হয়ে আসে মুখ। চোখের পানি গিলে ফেলতে হয়। আল্লাহ! এই প্রশংসা, এইসব ভালোকথা—এগুলোর যোগ্য তো আমি না।
“এসে পড়ছি,” কেনান বলে। চোখ তুলে তাকাতেই আমার নীল দরজাটা দেখা যায়।
কাঁপা হাতে বাসার চাবি বের করি।
“আচ্ছা, শুনেন।” কেনানের স্বর। দ্রুততার সাথে চেহারায় নির্লিপ্ততার রেখা টেনে ওর দিকে তাকাই।
“আপনি বলছিলেন, লায়লা সাত মাসের প্রেগন্যান্ট, না?”
“জ্বী,” ধীর গলায় বলি।
নিজের চুলে হাত চালিয়ে নেয় ও, হঠাৎ একটু অপ্রস্তুত দেখায়।
“আমি জানি, আমাদের পরিচয় খুব সামান্য সময়ের। কিন্তু আমি একটা অল্টারনেট ইউনিভার্সে বিশ্বাস করতে চাই—যেখানে এইটা…” সে আমাদের দু’জনের মাঝখানে ইশারা করে, “খুব সুন্দরভাবে আগাইতে পারত। আপনাদের—মানে আপনার বা তার—যদি কিছু দরকার হয়, প্লিজ আমাকে বলবেন।”
আমার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।
আমি কিছু না বলায় ও আরও বিব্রত হয়ে পড়ে।
“মানে… এই সময় তো, আপনি জানেন, স্নাইপার থাকতে পারে… এই অবস্থায় লায়লার বাইরে গিয়ে বাজার করা ঠিক না। আর আপনারও না—”
“থ্যাঙ্কিউ,” থামিয়ে দিই ওকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও।
“কিন্তু লায়লা এমনিতেও বাসা থেকে বের হয় না।”
ও ভ্রু কুঁচকে তাকায়। “উনি কি ঠিক আছে?”
আমি মাথা নাড়ি, চাবি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলি, “গত অক্টোবরে একটা ঘটনা ঘটছিল। লায়লা তখন বাজার থেকে ফিরতেছিল। ওইখানে…”
ধুলোমাখা রাস্তার শেষ প্রান্তে ভেঙে পড়ে থাকা একটা বিশাল বৈদ্যুতিক খুঁটির দিকে ইশারা করি। বিকেলের আলোয় ধাতব শরীরটা ঝিলমিল করছে। নিচের রাস্তায় শুকনো রক্তের দাগ এখনো লেগে আছে। “হঠাৎ স্নাইপাররা গুলি শুরু করে। লায়লা একা ছিল না। ওইদিন তিনজন মহিলা আর একজন পুরুষ মারা যায়। লায়লা আর আরেকটা বাচ্চা ছাড়া আর কেউ বাঁচে নাই। চারপাশ নিরাপদ হওয়া পর্যন্ত ও ভাঙা ধ্বংসস্তূপের একটা টুকরোর নিচে লুকিয়ে ছিল।” বলে গভীর একটা শ্বাস নিই। সেদিন আমাদের এলাকায় মিলিটারি স্নাইপার আছে শুনে যে ভয়টা পেয়েছিলাম, এমন ভয় সারাজীবনে কোনোদিন পাইনি।
এক দৌড়ে বাসায় গেছি, নিজের নিরাপত্তার কথা একবারও ভাবিনি। মাথার ভেতর শুধু হামযার কণ্ঠটা ভাঙা ক্যাসেটের মতো বারবার বাজছিল। স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য ওর মিনতি। বাসায় পৌঁছে দেখি রক্তে ভেজা রাস্তা, কাঁচের টুকরো আর ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে ফাঁকে লাল দাগ গড়িয়ে যাচ্ছে। শহীদদের ইতোমধ্যে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চারপাশে শুধু এক অসহনীয় নীরবতা, মনে হচ্ছিল ওল্ড হোমসের এই কোণাটার প্রাণটাই যেন পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনোমতে পা টেনে দরজার কাছে পৌঁছাতে পারি। দরজা খুলে দেখি, লায়লা তখন ভেতরে, মেঝেতে বসে, খসে পড়া ওয়ালপেপারের দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঁদছে। চোখের পানিতে ভেজা গাল, কপাল আর হাতে ছোট ছোট কাটা দাগ। আমি ওকে জড়িয়ে ধরি। শরীর থেকে ধ্বংসস্তূপ, ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধ আসছিল—কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। ও বেঁচে আছে।
“তুমি আছো” কান্না চেপে বলতে বলতে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। “তুমি বেঁচে আছো…”
সেদিনের পর থেকেই লায়লা সিরিয়া ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে যায়।
“ইয়া আল্লাহ…” কেনান আস্তে করে বলে, “আমি… কল্পনাও করতে পারছি না…”
“পারবেন,” আমি জবাব দিই, চাবিটা শক্ত করে চেপে ধরি যতক্ষণ না ব্যথা লাগে।
“আপনি কল্পনা করতে পারেন, কেনান। সেদিন লায়লা ভুক্তভোগী ছিল আর আল্লাহর রহমতেই ও বেঁচে ফিরছে। আজ, কাল, দুই সপ্তাহ পরে লামা হইতে পারে, ইউসুফ হইতে পারে। কিন্তু ওরা হয়ত এতটা ভাগ্যবান নাও হইতে পারে।”
কেনানের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আমি আর চাপ দিই না। মনে মনে শুধু চাই স্নাইপার ভিকটিমদের গল্প, ওই পরিবারগুলোর কথা, আর আমার কথাগুলো শুনে, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ওর ভেতরের জেদটা যেন ভেঙে যায়। এই নতুন করে জন্ম নেয়া ভয়গুলোকে সময় দিতে হবে অস্পষ্ট, এলোমেলো অনুভূতি থেকে ধীরে ধীরে পরিষ্কার চিন্তা আর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। আমি শুধু এই ভাবনাগুলো ওর সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারি।
“আমি মনে করি,” এবার একটু জোরে, স্পষ্ট করে বলি। ও সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
“আমি মনে করি—আপনার এডভেঞ্চার এখানেই শেষ হয়ে যাবে এমন কিছু না।”
কেনানের চোখজোড়া কোমল হয়ে আসে। চোখের মণির চারপাশে সোনালি আভা ঝিলমিল করে ওঠে। আরেকবার আমাদের চোখাচোখি হয়। আর তখনই আমার মনে হয়, এই যে পুরোনো সোয়েটার পরা, এলোমেলো বাদামি চুলের ছেলেটা, যে নিজের অনুভূতি লুকাতে পারে না—সে আসলে কতটা সুন্দর। এই ধ্বংসস্তূপে ভরা, ছিন্নভিন্ন শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওকে ভীষণ সত্যি, ভীষণ প্রাণবন্ত আর সুন্দর মনে হয়।
কে জানে, ও কী ভাবছে! যে কথাটা বলতে গিয়ে আমি লজ্জায় চুপসে যাচ্ছি, তার বাকিটা কি ও নিজের মনে বলে নিচ্ছে যে, কেনানও একদিন তার নিজের শীতাকে খুঁজে পাবে? ওর হাসি দেখে মনে হয়—হয়ত ও তাই ভাবছে।
“তাহলে আজ চলি, কাল দেখা হবে?” সে জিজ্ঞেস করে। ওর স্বরের উষ্ণতা যেন এক কাপ জহুরাত চা। এবার আর গালে কোনো রক্তিম আভা নেই, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন আমরা ধার করা সময় রেখায় দাঁড়িয়ে নেই আর বরং সামনে পড়ে আছে অনন্ত কাল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই,” হাসিমুখে বিদায় দেই।