আমাদের ভাষা সমস্যা

আবু তাহের তারেক

বাংলা ভাষা নিয়ে নানামুনির নানা মত ও পথ আছে। মতের দিক দিয়া, ‘কলকাতাকেন্দ্রিক চেরাগায়নপন্থিরা’ বাংলা ভাষারে ‘সংস্কৃতের প্যারাডাইম’ দিয়া দেখতে পছন্দ করেন। বলা ভাল, কি বাংলাদেশে, কি কলকাতায়—সবখানে এই মতের মানুষেরই জোর বেশী। এর বাইরে যে মত নাই, তা না।  অইসব মতের প্রকাশ ও বিকাশ অল্প। এদিকে, ফকির, বাউল ইত্যাদি ঘরানার মানুষের বাংলা ভাষা নিয়া তেমন কুনু মতামত আমরা না জানলেও, তাদের গান ও চর্চার জায়গা হইতে, আমরা তাদের ভাষা-বিষয়ক ভাবনা অনেকটাই পাঠ করতে সক্ষম।

বংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ বিষয়ক স্টাডি নিঃসন্দেহে একটা জটিল ঘটনা। ওয়েল, আমাদের পক্ষে এইটা কুনু ভাল বেপার হইবে না, যদি আমরা আমাদের ভাষা বিষয়ে স্থির সব স্বীদ্ধান্ত নিয়া বইসা থাকি। বাংলারে ‘সংস্কৃতের প্যারাডাইম’ হইতে দেখার ঘটনা, মূলত, স্থির সংকল্পের বেপার।

সংস্কৃতভাষী বৈদিকরা বাংলা মূলুকে খুব বেশীদিন আগে কলোনি স্থাপন করেন নাই। বাংলা, অঞ্চল হিসাবে, ‘পূর্ব ভারতে’ অবস্থিত। বৈদিকরা সর্বপ্রথমে আসেন ‘উত্তর ভারতে’। হজরত ঈসা নবীর জন্মের হাজার-দুই হাজার সন আগে। উত্তর ভারতীয় অঞ্চলরে তারা ‘আর্যাবর্ত্য’ বলতেন। ‘আর্যাবর্ত্য’ হইতে তারা বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়াইয়া পইড়া, ‘মহাভারতের’ যেই বয়ান প্রতিষ্টিত করেন, তা করতে সময়ের হিসাবে, একদিন-দুইদিন লাগে নাই।

বৈদকরা বংগে, বা পূর্ব ভারতে, বা বৃহত্তর মগধে আসার আগে, এইখানে আদমের বসবাস ছিল নিশ্চয়! নাই যদি থাকবে, আর্যভাষীরা তবে কিভাবে ‘রামায়ন-মহাভারত’ কান্ড ঘটাইবে এই অঞ্চলে! এদিকে, মানুষ থাকবে, তার জবান থাকবে না—এও কি হয়! মানে, আর্য আগমন-পূর্ব বাংলা মূলুক কি ‘ভাষাহীন’ আছিল!

‘জেনেটিক মেইক আপ’ নামক একখান বেপার এখন পপুলার হইতেছে। বাংগালিদের জেনেটিক মেইক আপ আমাদের ইতিহাস বিষয়ে অনেক কথাই বলে। এইসব কথা-বার্তারে আমাদের ‘ভাষার ইতিহাসের’ আলাপেও অনূদিত করা সম্ভব।

এইটা খুবই অবাক করা ঘটনা যে, আমরা বাংগালিরা আদিতে বৈদিক বা আর্যভাষী না হইলেও, অনেকে আমাদের ভাষার আদিরূপকে সংস্কৃত বা আর্যভাষা মনে করেন।

মনে করা-করি কখনোই খারাপ বেপার নয়। যতক্ষণ না, তা ‘ডক্ট্রিন’ আকারে চর্চিত হয় ও সেই ডক্ট্রিনে লোকজনরে কঠোরভাবে দীক্ষিত করা হয়।

বাংলা ভাষার অরিজিন যাই হউক, এই ভাষায় যে অগণিত ভাষার প্রভাব ও ছাপ আছে, তা কি মিছা! খিয়াল করলে দেখবেন, বাংলা ভাষায় পালি-প্রাকৃত, সংস্কৃত, ও হিন্দুস্থানি প্যারাডাইম সবচাইতে বেশী প্রমিনেন্ট।

পূর্ব ভারতীয় শ্রমণিক ধর্মসমূহের ভাষা, অর্থাৎ, পালি-প্রাকৃত দ্বারা বাংলা ভাষা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। পরবর্তীতে, এই অঞ্চলে কিতাবাদির ভাষা যখন সংস্কৃতে শিফট করে, তার দ্বারাও বাংলা ভাষা প্রভাবিত হয়। ‘হিন্দুস্থানি’ ভাষা একটা সংকর ভাষাব্যবস্থা হইলেও, এইটা সমাজ-বীক্ষার ইরান-তুরানি (মুসলিম/মুসলমানি/ইসলামিকেইট) প্যারাডাইমরে উর্বর করে তোলে।

অর্থাৎ, বাংলা ভাষা আমাদের সভ্যতার শ্রমণিক, বৈদিক ও মুসলমানি প্যারাডাইম দ্বারা সুসংগঠিত। এদিকে, কলোনির আমলে যোগ হইছে পশ্চিমা লেন্সও।

কলোনির আমলের বাংলা ভাষা-চর্চা বা বাংলা ভাষা-চিন্তা একটা জটিল আবর্তে পাঁক খায়। ইংলিশদের মারফতে, আমরা একখানা পশ্চিমরে আবিস্কার ও চর্চা করতে সক্ষম হই। যার ফলে, আমাদের সাহিত্যে ‘আধুনিক’ প্রপঞ্চ তৈয়ার হয়। এর গোড়ায় পানি দেয় পচ্চিমাদের ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বা চেরাগায়ন নামক ধারণা। কলকাতার হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা (কলকাতাকেন্দ্রিক চেরাগায়নপন্থিরা) এরে একটা বৈদিক রূপ দিবার কুশিশ করেন। ফলত, কলোনির আমলের বাংলা, আগের যেকুনু সময়ের চাইতে বেশী পরিমাণে সংস্কৃতায়িত হয়।

বাংলা ভাষা চর্চায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী উত্থানের ফলে, আমরা বাংলা ভাষার শ্রমণিক, বৈদিক, মুসলিম ও পরে পশ্চিমা সভ্যতাকেন্দ্রিক বিচিত্র জারণ-বিজারণরে সংস্কৃতের একশিলা পাথরের নিক্তিতে মাপতে শুরু করি। যদিও, আমাদের ভাষায় রচিত ক্লাসিক কিতাবাদি কেবলমাত্র সংস্কৃতের হেজিমনির থোড়াই স্বাক্ষ্য দেয়।

বাংলায় রচিত বিচিত্র পুথি, গান ও ফোক লিটারেচার, যেইগুলারে আমরা ট্রাডিশনাল লিটারেচারের হিস্ট্রিতে পাঠ করতে এখনো অনভ্যস্ত, তাদের বাকরীতি রীতিমত ‘জংগম’। এই বাংলায় সভ্যতাকেদ্রিক বিচিত্র প্যারাডাইমরে আত্মীকৃতই করা হয় নাই, বরঞ্চ, বাংলা অঞ্চলের বিচিত্র আঞ্চলিক রূপরেও স্বীকৃতি দেওয়া হইছে। বিশেষ করে, বাউল-ফকিরদের রচনায় বাংলার আঞ্চলিক রূপ ‘বাণী’ পাইছে।

ফলত, আমরা বাংলা ভাষাকে ‘জংগম’ ভাষা হিসাবে পাঠ ও চর্চা করতে আগ্রহী। বলা ভাল, কলকাতাকেন্দ্রিক চেরাগায়নপন্থিদের আগের বাংলাও জংগম আছিল। কলোনীর আমলে চেরাগায়নপন্থিদের স্রোত যখন প্রবল, তখনও, বাংলার আনাচে কানাচে রচিত পুথি সাহিত্যের ভাষা জংগম আছিল। এমনকি, খোদ কলকাতায় বইসা অনেকেই চেরাগায়নবাদীদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ-পুষ্ট আধুনিকতারে কেয়ার না কইরা সাহিত্য রচনা করছেন। মোটাদাগে, ফোক লিটারেচারের ভাষা ‘প্রমিত’ আছিল না। ‘আধুনিকতা’ বাংলা সাহিত্যের ‘গ্রেট ট্রাডিশন’ হইতে ফোকরে মাইনর ঘটনায় রূপান্তরিত করছে।

এর ফলে, সমাজ ও জ্ঞানকান্ডের নানা পর্যায়ে নানারূপ ধাক্কা লাগছে। বিশেষ করে, তর্জমা সাহিত্যে একটা ভজঘট অবস্থা তৈয়ার হইছে। কলকাতার আধুনিকতাবাদ দ্বারা শিক্ষিত শ্রেণী যখন কোরান-হাদিস বা ইসলামি তুরাসের কুনু ক্লাসিক বাংলায় অনুবাদ করেন, তখন তারা বেশীরভাগেই, ‘প্যারাডাইম’ চুজ করতে গিয়া নাকানি চুবানি খান। তারা অনেকেই, ‘বাংলা ভাষা’ চর্চা করতে গিয়া, ইসলামি তুরাসের প্রায় সকল জনপ্রিয় টার্মিনলজিরে ‘তথাকথিত বাংলা’, অর্থাৎ তৎসম, বা তদ্ভব করতে উদ্যত হন। তারা এই বেপারটা মোটেও বুঝতে পারেন না, যে বাংলা ভাষা মোটাদাগে তিনটা, অর্থাৎ শ্রমণিক, বৈদিক ও মুসলিম প্যারাডাইমে সুসংগঠিত একটা ভাষা। ফলত, ইসলামি জ্ঞানকান্ডের প্রায় সকল টার্মই এই ভাষায় আত্মীকৃত ও বহুলভাবে চর্চিত বিষয়। যেইসকল টার্ম এখনো আমাদের ভাষায় পপুলার না, আমাদের উচিত, সেইগুলারেও নিজরূপে বাংলায় নিয়া আসার কুশিশ করা।

এইসব অনুবাদকদের সমস্যা কেবল ‘ইসলামি টার্মিনলজিতেই’ সীমাবদ্ধ নয়। তারা একটা কল্পিত ‘শুদ্ধভাষা’, বা ‘প্রমিত ভাষার’ চর্চা করতে গিয়া, বাংলা অঞ্চলে হরহামেশা ব্যবহৃত অগণিত শব্দরাজীরেও পাঠকের ভাবজগতে নিয়া আসতে সংকোচ বোধ করেন।

খালি তর্জমার বেপারেই কেন বলব! যখন দেখি কওমির ফারেগ একজন মওলভি তার কবিতায় ‘আল্লা’ না লেইখা ‘ইশ্বর’ লেখেন, তখন বুঝতে পারি, সমস্যা কত গভীরে প্রোথিত।

এইটা শুধু মৌলভীর সমস্যা নয়। আপনে যখন কুনু হিন্দুর করা বেদের বাংলা অনুবাদ পড়বেন, তখন এই সমস্যার আরেক মাত্রা বুঝতে পারবেন। দেখা যাবে, উনার বাংলা অনুবাদে বেদ পড়ার চাইতে, ইংলিশে অনূদিত বেদ পইড়া বেশী করে কমিউনিকেট করা সম্ভব!

এদিকে, মাস্টারদের ভাষা বিষয়ক অযু যাওয়া যাওয়ির বেপার ত ব্যপক মশহুর! ইদানিং তাদের পক্ষ হইতে ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’ ইত্যাদি শব্দ নিয়া যে আপত্তি আসছে, তা প্রমাণ করে, বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ তুরাছের অল্প কিতাবই তারা পাঠ করছেন। এদিকে, ভাষা কিভাবে সমৃদ্ধ হয়, বাঁক লাভ করে, তার বেপারেও তাদের বুঝবুদ্ধি প্রশ্নবিদ্ধ।

ওয়েল, বাংলা ভাষার উৎপত্তি-বিষয়ক প্রশ্নই কেবল জটিল—তা নয়। বাংলা ভাষার ব্যবহারের প্রশ্নও কম জটিল নয়। স্বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মানুষের বাংলা ভাষা, আর ভারত নামক ইউনিয়নের অধীনে বসবাস করা  বাংগালিদের বাংলা ভাষার প্যারাডাইম মোটেও এক নয়। ফলত, আমরা বাংলাদেশীরা কুন বাংলার চর্চা করব, কিভাবে করব, তার রূপরেখা কলোনির আমলের হিন্দু জাতীয়তাবাদী পন্ডিতদের কিতাবাদীতে মোটাদাগে অনুপস্থিত থাকবারই কথা।

যারা বাংলা ভাষায় লেখালেখি করবেন, ও যারা এই ভাষায় কুনুকিছু তর্জমা করবেন, এই আলাপে তাদের জন্য দুইটা পয়েন্ট বর্ণনা করা হইল—

এক. বাংলা ভাষার বিকাশে একক কুনু ভাষার বা একক কুনু সভ্যতাকেন্দ্রিক প্যারাডাইমের অবদান নেই। এই জবানে বহু ভাষার ও বহু সমাজ-বীক্ষার মিশ্রণ ঘটছে।

দুই. লেখায় ও অনুবাদে বাংলা ভাষায় হাজির থাকা কুন প্যারাডাইমরে কতটুকু প্রাসংগিক করবেন, সেইটা নির্ভর করবে আপনার ইতিহাস-চেতনা, সমাজ-বীক্ষা ও রাজনীতির উপর। অবশ্য, যার রাজনীতি নাই, সে কি কখনো ইতিহাসের কর্তা হইয়া উঠতে পারে!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments