ইয়াহইয়া সিনওয়ার : ‘তুফানুল আকসা’র স্থপতি ও ইসরায়েলের দুঃস্বপ্ন

মূল : কুসাই উসমান

হুসাইন আহমাদ খান

‘শত্রুরা আমাদের পক্ষ থেকে এমন কিছু দেখবে, যা তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। আমরা নেতানিয়াহুকে বাধ্য করবো সেই দিনটিকে যেন অভিশাপ দেয়, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল। আমরা তাকে এই কামনা করতে বাধ্য করব যে, হায়! গাজা যদি সাগরে ডুবে যেত!’ 

এই কথাগুলোর মাধ্যমেই আবু ইব্রাহিম ইয়াহইয়া সিনওয়ার দখলদার ইহুদিদের সতর্ক করেছিলেন ভবিষ্যতের ব্যাপারে এবং সেই ঐতিহাসিক দিনের ব্যাপারে, যা আমরা স্বচোক্ষে দেখেছি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে। তিনিই কাসসাম ব্রিগেডের কমান্ডার ইয়াহইয়া সিনওয়ার, যিনি দখলদার ইসরায়েলিদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছেন এবং ‘তুফানুল আকসা’ অভিযানের মাধ্যমে তাদের পায়ের নিচের জমিন কাঁপিয়ে দিয়েছেন।

 

বেড়ে ওঠা এবং সংগ্রামী জীবনের কিছু ঝলক

আবু ইব্রাহিম ইয়াহইয়া ইব্রাহিম সিনওয়ার ‘খান ইউনুস’ শরণার্থী শিবিরে ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারকে নাকবা’র ঘটনার বছরে (অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালে, যখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা‌ করা হয় এবং প্রায় ৭/৮ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করা হয়।) আসকালান শহর থেকে উৎখাত করা হয়। তিনি হামাস প্রতিষ্ঠাতা শাইখ আহমদ ইয়াসিনের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

ইয়াহইয়া সিনওয়ার হামাসের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের নিরাপত্তা কাঠামো গঠন এবং শত্রুর অনুপ্রবেশ থেকে সংগঠনকে সুরক্ষিত রাখার পেছনে তার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তিনি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তিনিই ছিলেন ‘তুফানুল আকসা’র স্থপতি।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে আরবি ভাষা বিভাগে অধ্যয়নকালে ছাত্র পরিষদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ধাপে ধাপে তিনি পরিষদের সহ-সভাপতি এবং পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। নেতৃত্বগুণে তার এই উৎকর্ষই তাকে ১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর সংগঠনটির নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় মনোনীত হওয়ার যোগ্য করে তোলে। শাইখ আহমদ ইয়াসিন ১৯৮৬ সালে তারই প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাকে ‘মাজদ’ নামক ‘নিরাপত্তা ও দাওয়াহ বিভাগ’ গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। কেননা আবু ইব্রাহিম ইয়াহইয়া সিনওয়ার খুব অল্প সময়েই নিরাপত্তা কার্যক্রমের গুরুত্ব এবং মুজাহিদদের জন্য সতর্কতা ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছিলেন। কারণ শত্রুরা নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা ও এজেন্টদের শক্তি প্রদর্শন করছিল। এজন্য ‘মাজদ’ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল, গাজায় ইসরায়েলি এজেন্টদের অনুসন্ধান করা এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও তাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গতিবিধি নজরদারি করা। ইয়াহইয়া সিনওয়ার প্রতিরোধ আন্দোলনের জনসমর্থনের ভেতর শত্রুর অনুপ্রবেশ দূর করতে চেয়েছিলেন। কেননা দখলদার ইসরায়েলি শত্রুরা বিভিন্ন মাধ্যমে যুবকদেরকে সহযোগিতার জালে ফেলত—কখনো জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাবকে ব্যবহার করে, আবার কখনো গাজা উপত্যকার বাইরে চিকিৎসার প্রয়োজন তুলে ধরে।

২০১২ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর ইয়াহইয়া সিনওয়ার হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে ২০১৭ সালে গাজা উপত্যকায় আন্দোলনের নেতৃত্বের জন্য মনোনীত হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর মুহাম্মাদ দেইফ ‘তুফানুল আকসা’ যুদ্ধের সূচনা ঘোষণা করেন—যা ইসরায়েলের ক্ষমতার আসন কাঁপিয়ে দেয়, ফিলিস্তিনের সংঘর্ষের সমীকরণ বদলে দেয় এবং আরব বিশ্বে ইসরায়েলের সঙ্গে চলতে থাকা স্বাভাবিকীকরণের গতি থামিয়ে দেয়। এই ‘তুফান’ প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সিনওয়ারকে বিবেচনা করা হয়। ঘটনাপূর্ণ দীর্ঘ পথচলার শেষ প্রান্তে ২০২৪ সালের আগস্টে তেহরানে ইসমাইল হানিয়ার হত্যার ঘটনার পর হামাস তাকে রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

 

গ্রেফতার ও কারাজীবন

এই পৃথিবীর মজলুমদের মতো ইয়াহইয়া সিনওয়ারকেও তিনবার গ্রেফতার করা হয়। শেষবার ১৯৮৮ সালে তাকে ৪২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, শত্রুর দুই সৈন্যকে অপহরণ ও হত্যা এবং শত্রুর এজেন্টদের হত্যা করা, যা তার প্রতিষ্ঠিত ‘মাজদ’ নিরাপত্তা ইউনিটের কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত বলে দখলদার ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তিনি ২৩ বছর ইসরায়েলি কারাগারে সাজা ভোগ করেন। কারাবন্দী অবস্থায় তিনি হামাস বন্দীদের দায়িত্বে ছিলেন এবং কারাগারে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বহুবার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িত হন। তিনি দুইবার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনো বারই সফল হননি।

সিনওয়ার তার কারাজীবনকে শত্রুর ভাষা হিব্রু শেখা এবং ইসরায়েলি রাজনীতি গভীরভাবে অধ্যয়ন করে কাজে লাগান। বন্দিত্বের সময়ও তার কণ্ঠ ছিল প্রভাবশালী। তিনি ইসরায়েল ও বিদেশে অবস্থানরত হামাস নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।

এটাই হচ্ছে প্রস্তুতির মূলকথা, অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত করা। সিনওয়ার তার কারাবাসের বছরগুলো দুঃখে বা নিজের সেলের দেয়াল নিয়ে হতাশায় কাটাননি; বরং তিনি শত্রুকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের কাজে সময় বিনিয়োগ করেছিলেন নিজের মুক্তির দিনের প্রস্তুতির জন্য, যদিও তার সাজা ছিল ৪২০ বছর!

কিন্তু এটাই তো সেই চারা, যা রোপণের নির্দেশ আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন—কেয়ামত এসে গেলেও যেন তা রোপণ করা হয়! কারণ, ১৯৮৮ সালে কারাবরণের আগে যে প্রস্তুতির স্তরে তিনি ছিলেন, যদি শুধু ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতেন, তাহলে ২০২৩ সালে বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্য বদলে দেওয়া ‘অনন্য নেতা’ হিসেবে সিনওয়ারের আবির্ভাব কখনোই সম্ভব হত না।

২০১১ সালে ‘ওয়াফাউল-আহরার’ (বন্দি বিনিময়) চুক্তির আওতায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এটি ছিল ইসরায়েলি সৈনিক গিলাদ শালিত’কে বন্দি করে রাখার বিনিময়ে সম্পন্ন বন্দিবিনিময়। শালিতকে বন্দি ও দীর্ঘদিন গাজা উপত্যকায় আটক রাখতে সিনওয়ারের ভাই মুহাম্মদ সিনওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন যাত্রা—কারাবন্দি ‘ফুল’র মুক্তি। কিন্তু এই মুক্তি ছিল আরেক বৃহত্তর কারাগারে প্রবেশের মতো। অর্থাৎ, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় প্রবেশ, যা কঠোর অবরোধ ও দুঃসহ জীবনযাপনের কষ্টে জর্জরিত।

এইভাবেই সিনওয়ারের কাহিনি আমাদের নিয়ে যায় তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘কাঁটা ও ফুল’র দিকে…

 

কাঁটা ও ফুল

ইয়াহইয়া সিনওয়ার একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং কিছু গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। তবে আমরা এখানে শুধু তার একমাত্র উপন্যাস ‘কাঁটা ও ফুল’ নিয়ে কথা বলব। উপন্যাসটি ৩৫০ পৃষ্ঠার বেশি নয়, কিন্তু এটি যেন একটি জাতির যন্ত্রণা ও নিপীড়নের পূর্ণ এক মহাগ্রন্থ—যে জাতি নিজের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে এবং জায়নিস্টের অপবিত্রতা থেকে নিজের ভূমি মুক্ত করতে সংগ্রাম করে চলেছে।

সিনওয়ার ২০০৪ সালে ‘বিরুস সাবাআ’ কারাগারের অন্ধকার সেলে বসে এই উপন্যাসটি রচনা করেন। উপন্যাসটি ৩০টি অধ্যায়ে বিভক্ত, যেখানে নাকসা’র বছর (অর্থাৎ, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের বছর, যা ফিলিস্তিনি ইতিহাসে এক গভীর রাজনৈতিক ও জাতীয় বিপর্যয়ের কালো অধ্যায়।) থেকে শুরু করে বরকতময় আল-আকসা ইন্তিফাদার সূচনা পর্যন্ত ফিলিস্তিনি সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।

উপন্যাসের শুরুতে সিনওয়ার বলেন—‘এটি আমার ব্যক্তিগত গল্প নয়, আবার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির গল্পও নয়, যদিও এর সব ঘটনাই সত্য। প্রতিটি ঘটনা কিংবা একাধিক ঘটনার সমষ্টি কোনো না কোনো ফিলিস্তিনির জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই রচনায় কল্পনার অংশ শুধু এটুকুই যে, ঘটনাগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের রূপ দেওয়া হয়েছে, যেন তা সাহিত্যিক কাঠামো ও শর্ত পূরণ করে। এর বাইরে যা কিছু আছে, সবই বাস্তব। আমি নিজে তা প্রত্যক্ষ করেছি, আর এর অনেকটাই শুনেছি তাদের মুখে, যারা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের পরিবার-পরিজন ও প্রতিবেশীদের নিয়ে প্রিয় ফিলিস্তিনের ভূমিতে বহু দশক ধরে জীবন যাপন করেছেন। আমি এই গ্রন্থ উৎসর্গ করছি তাদেরকে, যাদের হৃদয় ইসরা ও মেরাজের ভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে—মহাসাগর থেকে উপসাগর পর্যন্ত, বরং এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগর পর্যন্ত।’

উপন্যাসটির সমাপ্তি ইয়াহইয়া সিনওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবেই অধরা রেখে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে এর পরিসমাপ্তি ঘটে উপন্যাস রচনার ঠিক ২০ বছর পর—তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে।

 

শাহাদাত

খুবাইব ইবনে আদি রা.-কে যখন মুশরিকরা বন্দি করে এবং তাকে হত্যার ব্যাপারে একমত হয়, তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করেন—

‘মুসলিম অবস্থায় আমি নিহত হলে তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই

আল্লাহর পথে আমার মৃত্যু কোন পার্শ্বে হবে, তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।

এটা তো আল্লাহরই জন্য; তিনি চাইলে

ছিন্নভিন্ন দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও বরকত দান করতে পারেন।’

একইভাবে আবু ইব্রাহিম সিনওয়ারও আল্লাহর পথে মৃত্যুকে ভয় করেননি। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর বুধবার ‘সিনওয়ারের তুফান’-এর এক বছর পর আবু ইব্রাহিম শাহাদাত বরণ করেন সম্মুখসমরে, পিছু হটে নয়। তিনি যুদ্ধের সরঞ্জাম পরিহিত অবস্থায় অস্ত্র হাতে পকেটে দৈনন্দিন জিকিরের বই ও তাসবিহসহ শহিদ হন। রাফাহ এলাকায় আরেকজন নেতা ও এক যোদ্ধাসহ ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইয়াহইয়া সিনওয়ার ভূমি ও সম্মানের শত্রু অভিশপ্ত জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তিনি আত্মসমর্পণ করেননি, কখনোই কওমের ‘আমানত’ বিক্রি করেননি। তিনি বলেছেন—‘আমরা যদি শৈথিল্য প্রদর্শন বা গাফিলতি করি, তাহলে আল-আকসা মসজিদ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে, আর ইতিহাস আমাদের কপালে লজ্জার কলঙ্ক এঁকে দেবে।’

এভাবেই মুসলমানদের এক নেতার কাহিনি শেষ হলো—ইতিহাসের পাতা তার গল্প গুটিয়ে নিল। তবে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন আরও বহু নেতা। কেননা এই উম্মাহ বন্ধ্যা নয়, বরং সদা প্রসবক্ষম। যেমন শাইখ আহমদ ইয়াসিন, রন্তিসি, জাবারি, গুল, মুকাদামা—তালিকা আরও দীর্ঘ—প্রমুখ চলে গেছেন তেমনি ইয়াহইয়া সিনওয়ারও বিদায় নিয়েছেন। আর আল্লাহর ইচ্ছায় তার পরে আসবেন হাজারো সিনওয়ার।

বিজ্ঞাপন

guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মুহাম্মদ উমর ফারুক
মুহাম্মদ উমর ফারুক
2 months ago

চমৎকার অনুবাদ করেছেন ভাই।

Hossain Ahmad Khan
Hossain Ahmad Khan

শুকরিয়া ভাই

Muhammad Yeamin Hussain
Muhammad Yeamin Hussain
1 month ago

সুন্দর, ঝর্ঝরে অনুবাদ