গটগট করে আমার পা জোড়া সোজা আ‘মের দিকে হেঁটে চলে, লোকটা এখনো সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। মেডিকেল স্টাফের ঘাটতি থাকাটা এখন আমার কাজে দেয়। নিজের একটা ময়লা কাপড় দিয়ে আ‘ম মেয়ের গলায় একহাতে চাপ দিয়ে ধরে রেখেছে, কিন্তু রক্তের স্রোত সে কাপড় ভিজিয়ে মেয়েটার হলুদ জামা অব্দি চলে এসেছে। কিছু একটা হয়ে যাওয়ার আগেই আমার কাজটা করে ফেলা লাগবে।
‘আমার সাথে আসেন’ বলে ডাক দিতেই ওর চোখ আমার দিকে পড়ল। এলোমেলো, চেঁচামেচিরত রোগীদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে অবশেষে আমরা এক পুরনো অপারেটিং টেবিলে খুঁজে পাই।
“আস্তে আস্তে ওকে শোয়ায়ে দেন।” আমার স্বর এত অনুভূতিহীন শোনায়, নিজের কাছেই অচেনা ঠেকে।
দ্রুত হাতে গজ ছিঁড়ে নিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরতে ধরতে ওর পালস চেক করি। ভীষণ দুর্বল। অল্পের জন্য বুলেট ধমনীতে লাগেনি। পারব আমি। ওকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। আগেও এ কাজ করেছি আমি।
কিন্তু আমার হাত চলে না। ভয়ংকর চিন্তাটা মগজে চেপে বসে থাকে। আশপাশে কোথাও কেনান আছে কি না, রেকর্ড করছে কি না দেখে নিই একবার। কিন্তু ওকে কোথাও দেখা যায় না। কাজটা এখন করে ফেললে কেউ জানবেই না।
মেয়েটার ঘাড়ে ক্রমাগত চাপ দিতে দেখে হিসহিসিয়ে জানতে চায় আ’ম, “কী করতেসো তুমি? বাঁচাও ওকে!”
“তাহলে আমার নৌকার ব্যবস্থা করো,” একইরকম অনুভূতিহীন স্বরে বলি।
“কীইহ!”
“নৌকার ব্যবস্থা করলে ওরে বাঁচাইতে পারি, নয়তো আমি হাত সরায়ে ফেললাম।” এত বড় কথা আমি বলেছি তা নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।
চোখ বিস্ফারিত দেখায় আ‘মের, ভ্রুজোড়া যেন আর একটু উপরে উঠলেই হারিয়ে যাবে চুলের ভেতর।
রাগে ওর সারা গা কাঁপছে। আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখেও আমি এক পা ও নড়ি না।
“তোমার—” ক্ষোভে ফোঁসফোঁস করছে ও, চেহারা পুরো বেগুনি হয়ে গেছে। “এত সাহস কী করে হয় তোমার? এই-ই তোমার ফার্মাসিস্ট পরিচয়? ওরে তুমি মরতে দেখবা?”
আমার বুক এত জোরে ধুকপুক করছে যে আ‘মের কথা প্রায় শোনাই যাচ্ছে না।
“রাগ করে অযথা মেয়েকে কষ্ট দিচ্ছো। ওর কিন্তু সময় বেশি নাই।”
ভাওতা দিলাম। কিন্তু ও সেটা বুঝবে না। এইটুকু আমার করাই লাগবে, শুধু লায়লা আর ওর সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য। আমার ভাতিজীর জন্য। আমার ওয়াদা রক্ষার জন্য।
আমার হাতের তলে মেয়েটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। যেন জীবনের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। আমার চোখ চলে যায় আ‘ম থেকে চারপাশের লোকজনের দিকে। কিন্তু কেউ এদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সবাই ডুবে আছে যার যার জগতে।
“ঠিক আছে!” ছলছল চোখে চিৎকার করে আ’ম। “আমি ব্যবস্থা করব, তুমি শুধু ওরে বাঁচাও, প্লিজ!”
আমার পেছনের দাঁড়িয়ে খওফ যে পরিতৃপ্তির হাসি হাসছে, তা আমি না তাকিয়েই টের পাই। হাজারটা ঘাড় সেলাইয়ের অভিজ্ঞতার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে আমি কাজ শুরু করি। অতিরিক্ত রক্তপাত ছাড়াই দ্রুতহাতে কাজটা করতে পারি আমি এখন।
মেয়ের চুলে আলতো বিলি কাটে আ’ম। “আব্বু আছি, সামার। কোনো ভয় নাই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তখনই পাশ দিয়ে নূরকে যেতে দেখে চেঁচিয়ে বলি রক্তদানের যন্ত্রটা এনে দিতে।
মেশিন নিয়ে আসলে ওকে দায়িত্বটা তুলে দিই, “সেলাইটা শেষ করো।”
চিকন সুঁইয়ের একটা আমি নিজের শিরায় ঢুকিয়ে আরেকটা সামারের শিরায় বসাই। আমার মত সামারেরও ফ্যাকাশে চামড়ায় শিরা এত স্পষ্ট দেখা যায় যে খুব একটা খোঁচাখুঁচি করাই লাগে না। পাতলা নলের ভেতর দিয়ে আমার রক্ত ধীরে ধীরে সামারের শরীরে প্রবেশ করার দৃশ্যটা দেখতে থাকি। যে জঘন্য কাজ আমি করেছি এবং যা করতে যাচ্ছি, তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে বুক চিরে প্রার্থনা বেরিয়ে আসে, মেয়েটা যেন সুস্থ হয়ে যায়।
“হয়ে গেছেএ!” গায়ের ল্যাবকোটে হাত মুছতে মুছতে বলে নূর। “ও সেরে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।”
আমার “ধন্যবাদ” শোনার জন্য দাঁড়ায় না ও, আরেক ডাক্তারকে সাহায্য করতে ছুটে যায়।
এবার আমার মাথা ঘুরতে শুরু করে। জ্ঞান হারানোর আগেই তাই সুঁইটা খুলে নিই। অভিজ্ঞতা আমাকে কখন থামতে হবে সেটাও শিখিয়েছে।
তারপর আ‘মের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখভরা কৌতূহল নিয়ে ও আমাকে দেখছে। ওর দৃষ্টিতে এখনও আমার প্রতি অশ্রদ্ধা থাকলেও, কৃতজ্ঞতার মিশেলও সেখানে আছে। আর তা লুকানোর কী চেষ্টাটাই না ও করছে।
গলা-মুখ শুকিয়ে গেছে। তবু জোর করে বলি। “আমাদের জন্য একটা নৌকার ব্যবস্থা করবা কিন্তু সেটা ওই চার হাজার ডলারে না।”
রূঢ় হাসি হেসে ও বলে, “তোমার কেন মনে হইলো আমি কথা রাখব? ওর জীবন তো তুমি বাঁচায়ে দিসোই। যদি না আবার গলা কাটার চিন্তা করে থাকো। অবশ্য, একটু আগে যা করসো তারপর তুমি গলা কাটলেও আমি অবাক হবো না। ডাক্তার যিয়াদ এই ঘটনা শুনলে কী বলবে, বলো তো?”
ব্যাপারটা ভাবতেই আমার বুকে পিনপিনে ব্যথা হয়। আ‘মের অপমানগুলো আমি হৃদয়ের অতল অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলি। লায়লা যদি বেঁচে বেরোতে পারে, তাহলে কাপুরুষ হতে হলেও আমি তাই হব।
আমি ওর মেয়ের গলার সেলাইয়ের দিকে মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করি। মেয়েটার মিশকালো চুল কপালের রক্তে লেপ্টে আছে। “ওষুধ তো লাগবে তোমার।”
আ‘ম অবিশ্বাসের হাসি হাসে। “আর সেটা যখন আমি তোমাদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করব তখন দিবা?”
“সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য আমরা যথেষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দিব, কিন্তু প্যানাডল দেয়া হয় খুব সীমিত। এইটা এখানে সবারই দরকার। হাসপাতাল যা দিবে তার চেয়ে বেশি আমি দিতে পারি। আর বিশ্বাস করো, সামারের এগুলা লাগবেই। এই ব্যথা সহজে যাবে না।”
লায়লা আর নিজের জন্য জমিয়ে রাখা দুই বাক্স প্যানাডল আমার কুরবানি করতে হবে। কিন্তু একবার জার্মানিতে পৌঁছাতে পারলে, এসবের আর দরকার পড়বে না। কিছুই না দরকার পড়বে না।
আ‘মের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, চেহারায় লেগে থাকে বিরক্তির ছাপ।
“দুইটা ফ্রি সিট দিয়ে কিছুই হবে না। পথের যাইতেই অনেক টাকা লাগবে। আমি আগেও বলসি, এখান থেকে তারতুস পর্যন্ত যত সীমান্ত, সব জায়গার প্রহরীদের ঘুষ দেয়া লাগে।”
আমি এক মিনিট সময় নিয়ে ভাবি। ওর কথাটা ঠিকই। সারাটা রাস্তায় এত এত সব চেকপয়েন্ট, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা যে কাউকে নিয়ে যেতে পারে।
তবু আমি অবিচল থাকি। “আমি তোমাকে একটা সোনার হার দেব, সাথে এক হাজার ডলার। হারটার দামও প্রায় এক হাজার ডলার। চলবে?”
লায়লার বিয়ের সময়ের মোহরের অংশ হিসেবে হারটা কেনার সময় আমি মায়ের সাথে ছিলাম।
আ‘ম ঠোঁট চেপে ধরে একটু ভেবে নেয়। “হ্যাঁ।”
বিছানায় শুয়ে থাকা সামারের নিঃশ্বাসে সাঁসাঁ আওয়াজ হচ্ছে। হার্টবিট চেক করে দেখি স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে ধীরে।
“ওর শরীরে এখন আমার রক্ত,” নিচুস্বরে বলি। রক্ত দেয়ার কারণে প্রচন্ড বমি পাচ্ছে। “আমি এখন ওরই অংশ। তুমি আমার কাছে ঋণী।”
ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে আ’ম। সামারের ছোট্ট হাতটা নিজের রুক্ষ হাতের মুঠোয় পুরে নেয়। “কালকে সকাল নয়টায় টাকা আর স্বর্ণ নিয়ে এখানে থাকবা।” বলে ও থামে। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “তোমারে আন্ডারিস্টিমেট করা আমার ঠিক হয় নাই। দেখে বুঝা যায় না এত কুটিল তুমি।”
আমার কনুইয়ের ভাঁজে ফুটোটা হাত দিয়ে চেপে ধরি। “আমি কত খারাপ তা কেউ জানে না।”
“তা তো অবশ্যই।”
“এখানেই থাকো। এন্টিবায়োটিকগুলো নিয়ে আসি।”
নিরাবেগ হাসি ফোটে আ‘মের মুখে। “তোমার কাছে আমার মেয়েরে রেখে আমি কোথাও যাব না।”
চোখে জমতে শুরু করা জলটুকু দ্রুত হাতে মুছে আমি চলে আসি। কাঁপাকাঁপা দুই হাত চেপে ধরে রাখি বুকে।
এ আমি কী করলাম!
ওষুধ আনতে যাওয়ার আগে ভালো করে দুই হাত ধুয়ে পরিস্কার করি। রক্তের শেষ দাগটুকু ধুয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঘষে ঘষে হাত লাল করে ফেলি।
স্টকরুমে ফিরে আসি সম্পূর্ণ একা। দুহাতে পেট চেপে ধরে লুটিয়ে পড়ি মেঝেতে। গায়ের কাঁপুনি কিছুতেই থামে না। পাহাড়সম অপরাধবোধে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, চোখের পানিও আর বাধ মানে না। মা জানতে পারলে কী বলতো আমাকে? আর হামযা? আমার ভাই তো এই হাসপাতালেরই আবাসিক ডাক্তার হওয়ার কথা ছিলো।
এইটুখানি মেয়ের জীবন আমি বাজি ধরেছি। ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছি।
“এইটুকু তুমি বাধ্য হয়েই করসো।” পেছনে দাঁড়িয়ে খওফ বলে ওঠে। “আর ব্যর্থ তো হয় নাই। হামযা থাকলেও বুঝতো। আর যদি নাও বুঝতো, তাও বিপদ তো বিপদই। তোমারও তো জীবন বাঁচানো ফরজ।”
“সামার তো মরে যাইতো!” হেঁচকি উঠে যায় আমার। “একটা মাসুম শিশু হত্যার বোঝা চেপে থাকতো আমার বিবেকের ঘাড়ে।”
“কিন্তু মরে নাই তো! ও বেঁচে আছে, আর তুমিও তোমার নৌকা পেয়ে গেসো। এখন উঠো, নাক মুছো। যাও আ’মকে আজকের এন্টিবায়োটিক দিয়ে আসো। এই সবকিছুই তুমি লায়লার জন্য করতেসো, ভুলে যায়ো না।”
লায়লা! ও কি বুঝবে? নাকি সব শুনে আতঙ্কে জমে যাবে? এই ঘটনা ওকে আমি কোনোদিনই বলতে পারব না।
খওফ পা নাচায়। “যাও তুমি এখন। এই কথা ছড়ায়ে গেলে ডাক্তার যিয়াদ কী করবে ভালো করেই জানো। তোমার মান-ইজ্জত ধুলায় মিশে যাবে।”
আ‘মের হাতে এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেটগুলো তুলে দিতে গিয়ে টের পাই ওর যেন এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না একটু আগে কী ঘটেছে। অবশ্য আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। নিজেকে মনে হচ্ছে দেহ থেকে বের হয়ে আসা এক পরিদর্শক, যে শরীরটাকে নিজে নিজে নড়াচড়া করতে দেখছে।
দ্রুত পায়ে আবার স্টকরুমে ফিরে আসি। পথে ডাক্তার যিয়াদের সাথের দেখা হয়। তার হাসিমুখ দেখে আমার অনুশোচনা আর গাঢ় হয়ে আসে। আমাকে এখানে কাজ করতে দেয়া উচিৎ না। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পর আমি আর ভরসাযোগ্য না।
স্টকরুমে একাহাতে ওষুধ সাজাতে সাজাতে ভীষণ কান্না পায় আমার।
“ডেইজি… ডেইজি… মিষ্টি.. মিষ্টিগন্ধা ডেইজি—” বলতে বলতে ভয়ঙ্কর এক উপলব্ধিতে সমস্ত শরীর ভেঙে কান্না আসে আমার। চোখের পানি গড়িয়ে টপটপ করে আমার পায়ের পাতার কাছে পড়তে থাকে।
আমি হয়ত সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাব। আমার পাজোড়া স্পর্শ করবে ইউরোপের বেলাভূমি। উত্তাল সমুদ্রের ঢেঊ এসে হয়ত খেলা করবে আমার কাঁপাকাঁপা পায় ছাপিয়ে। নোনাবাতাসে হয়ত ছেয়ে যাবে ঠোঁটজোড়া। পাবো নিরাপত্তাও।
কিন্তু তারপরেও কি বাঁচতে পারব?
(চলবে…)