কবি থেকে বিপ্লবী : হাদির শক্তি হাদির ফানা

পলিয়ার ওয়াহিদ

শহীদ ওসমান হাদির ৩২ বছরের ছোট্ট জীবন। কিন্তু তার কাজের ব্যাপ্তি ছিল বৃহৎ। চিন্তার জগত ছিল ত্রিভূবনময়। ফলে সারাজীবনের কাজ সে মাত্র ১ বছরে শেষ করেছে। সাধারণ জ্ঞানে অসাধারণ হাদিকে নিয়ে কোথা থেকে লেখা শুরু করব? যেখানে তার বিপ্লবী কথামালাও হীরের মতো অমূল্য হয়ে উঠেছে। আমি শুধু কবি থেকে বিপ্লবী হাদি হবার পরিবর্তন নিয়ে লিখি।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৫ বছর শাসন ছিল কবি হাদি থেকে বিপ্লবী হাদি হবার মূল মঞ্চ। কারণ আমাদের জীবনের স্বপ্ন ও যৌবনের সবচেয়ে সোনালী সময় কেড়ে নিয়েছে খুনি সরকার। তার শাসনামল চিন্তাশীল যুবকদের জাহান্নামের উপলব্ধি দিয়েছে। এই সময়ে যেসব তরুণ সময় ও ইতিহাস সচেতন ছিল তাদের কোনোভাবেই দমানো যায়নি। সেই সব প্রতিবাদী নেতৃত্বেই জুলাই সংঘঠিত হয়েছে। আর সেই জুলাই স্পিরিটধারী প্রথম আইকন শহীদ ওসমান বিন হাদি।

কবি হাদি বুঝতে পেরেছিলেন শুধু কবিতা দিয়ে জালেমের মূর্তি ভাঙা যাবে না। ফলে তখন তিনি রাজনৈতিক ও কালচারাল মোকাবেলা করবার প্রস্তুতি নেন। তার কথা ও কাজ থেকে বোঝা যায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে শানিত করেছে। এবং আমরা যখন জুলাই স্পিরিট বলে গলা ফাটাচ্ছি তখন হাদি একাই জুলাইয়ের স্পিরিট কাকে বলে তা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন। আর এ কারণেই জুলাই জজবার যে আগ্রাসনবিরোধী শহীদি মিছিল শুরু হল—তার ফলাফল হাদির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব না আসা পর্যন্ত চলতে থাকবে।

শরিফ ওসমান হাদি অনেক কিছুর উদাহরণ দাঁড় করিয়ে গেলেন। তার মধ্যে একটি, কবিরাই প্রকৃত বিপ্লবী। কবি হয়েও রাজনীতি জয় করা সম্ভব। আমাদের কবিরা বলেন, আমাদের দিয়ে রাজনীতি হবে না। আমরা ইন্টেলেকচুয়াল উইং হিসেবে রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দেব। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কবিরাও যে রাজনীতির মাঠে যোগ্য হয়ে উঠতে পারেন তার প্রমাণও হাদি। একইসঙ্গে কালচারাল লড়াই দিয়ে যে রাজনীতির খেলনোলচে পরিবর্তন সম্ভব সেটার জলন্ত উদাহরণ। তাই বলতে হবে, এখন সময় রাজনীতি করবার। এখন সময় আগ্রাসন রুখে দেবার।

এখন খুঁজতে হবে হাদির শক্তি কোথায়? কোথায় তার শহীদ হবার সাহস? তার মূল শক্তি তার স্পষ্ট সত্যবাদিতা ও সততা। সত্য এমন এক অস্ত্র যার সঙ্গে অন্য সব তরবারি পরাজিত হয়। আমরা এখনো অনেকে বুঝতে পারছি না। তাই প্রশ্ন করছি হাদির রাজনৈতিক ইমান কেন এত মজবুত? কারণ তার দৃঢ়চেতা বিশ্বাস ও স্বপ্ন। সে কবিতা লিখে বুঝতে পেরেছে সমাজ তথা রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে সিলসিলা সেটা কাব্য দিয়ে হবে না। ফলে হাদি রাজনীতির মাঠে নেমেছে কালচার নিয়ে। কারণ আমাদের কালচার ও রাজনীতি সেই দিল্লিবাদী আধিপাত্যবাদে ডুবে আছে। তাকে উদ্ধার করতে হলে আগে কালচারাল রেভ্যুলেশন প্রয়োজন। সেই দূরদর্শীতা থেকে প্রতিষ্ঠা করেন কালাচারাল সেন্টার। বলা যেতে পারে এটা তথাকথিত আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরদের মুখে চপেটাঘাত। কারণ সেই কারিগররা জুলাই হত্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করেনি। ফলে এই আলোর নিচে কলোনিয়াল দাসত্বের অন্ধকারকে হাদি চ্যালেঞ্জ করেছে। অথচ কালচার সবর্দা মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু সেই মানবদরদ আমরা কোলকাতাবাদীদের থেকে পাইনি। হাদির প্রতিবাদী মন এটা মেনে নিতে পারেনি। সে কারণে দেশি ও বিদেশি কালচারাল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হাদি হয়ে ওঠে ধনিক-বণিক ও সুশীল শ্রেণির থ্রেট।

দ্বিতীয়ত তার অড়ম্বরহীন নতুন রাজনৈতিক ধারা। সে পরিষ্কার বলেছে, আমি আপনাদের জন্য কাজ করব। ফলে আপনরাই আমার পাশে দাঁড়ান। আমাকে সাহায্য করেন। মানুষও তার কথা ও কাজের মিল পেয়ে সাহায্য করা শুরু করেছিল। এটা দেশের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত। এই  পরিবর্তনই করতে চেয়েছিল হাদি। সে গণচাঁদা দিয়ে রাজনীতির খরচ মেটানোর উদাহরণ তৈরি করেছিল। মানুষ তাকে লাখ লাখ টাকা দিয়েছে। সে সবের হিসাব ও খতিয়ানও জনতার সমানে হাজির করেছে। এটা ছিল স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে এক দাঁতভাঙা জবাব। পেশিশক্তির বিরুদ্ধে গণশক্তির উত্থান। একইসঙ্গে কুক্ষিগত ক্ষমতা থেকে ক্ষমতার মালিকানা গণমানুষকে ফিরিয়ে দেবার প্রতিজ্ঞা। কিন্তু এটা মুখে যত সহজ কাজে তত কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন কাজও হাদি পানির মতো বাস্তবে পরিণত করেছিল। আর সেটাই হয়েছে বাংলাদেশপন্থীর হাদির কাল। মুহূর্তে সে হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি কালো চক্রের বিরুদ্ধে এক সুউচ্চ প্রাচীর। আর শত্রুরা তার জনপ্রিয়তার অস্ত্র সহজ জীবনকে দুর্বলতা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এবং নতুন রাজনৈতিক আয়নাকে ভেঙে করেছে টুকরো টুকরো।

শেষের যে কথাটি সবচেয়ে জরুরি। হাদির শহীদি ফানা। দৃশ্যমান হাদির চেয়ে অদৃশ্য হাদি এখন বেশি শক্তিশালী। কারণ হাদি সেই অদৃশ্যকেই দৃশ্যে পরিণত করবার যুদ্ধ শুরু করেছিল। কিন্তু একজন হাদিকে মেরে আপনারা হাজারো হাদির জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। জুলাইয়ের সেই কালচারাল ও পলিটিক্যাল স্পিরিট যুগে যুগে জ্বলবে। যতদিন না হাদির স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ নির্মাণ করতে না পারছি। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। শহীদ হাদি অমর হবে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments