পাকিস্তানের সাহিত্য আকাশে উপন্যাস, ড্রামা, ছোটগল্প ও আধ্যাত্মিক চিন্তার এক অনন্য মিশেল নাম বানু কুদসিয়া। উর্দু সাহিত্যের দুনিয়ায় আদর করে উনি পরিচিত ‘বানু আপা’ নামে। পয়দায়েশ ২৮ নভেম্বর ১৯২৮, ব্রিটিশ ভারতের ফিরোজপুরে; দেশভাগের পর পরিবারসহ স্থায়ী হন লাহোরে।
বানু কুদসিয়ার সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস ‘রাজা গিধ’ আধুনিক উর্দু সাহিত্যের একটি ক্লাসিক। আখলাক, সামাজিক হালাল–হারাম, রুহানি অবক্ষয় ও মানুষের অন্তর্জগৎ উনার সাহিত্যকর্মের মূল ফোকাস। উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায় লিখছেন অসংখ্য টিভি ড্রামা, এরই মধ্যে উনার ‘আধী বাত’ ড্রামা আরেকটি মকবুল ক্লাসিক।
উনার শরিকে হায়াত ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ড্রামাকার আশফাক আহমেদ। পাকিস্তানের ইন্টেলেকচুয়াল ও কালচারাল জীবনে অনন্য যুগল হিশেবে উনাদের চিনপেহচান ছিল। স্বামী আশফাক আহমেদের অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘বাবা সাহেবা’ বানু আপা সম্পন্ন করেন এবং নিজেই সেটার ২য় খণ্ড ‘রাহ-ই-রাওয়াঁ’ লিখে প্রকাশ করেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, ড্রামা সব মিলায়ে উনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ত্রিশেরও বেশি। উনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান হিলাল-ই-ইমতিয়াজসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন।
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ৮৮ বছর বয়সে, লাহোরের জমিনে এই আইকনিক সাহিত্যিক ইন্তেকাল ফরমান। উর্দু সাহিত্যে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার এক গভীর চলমান স্বর হিশেবে বানু কুদসিয়া প্রমিনেন্ট হয়ে আছেন।
তিতা ঘাশের ধুমা তার গলায় ঢুকতেছিল আর চোখ দিয়া অনিয়ন্ত্রিত পানি ঝরতেছিল। উল্টা ঝুইলা থাকার দরুন তার চোখ হইয়া উঠছিল লাল। গায়ে শুধু একটাই কামিজ, কোমর হইতে নিচ তরি বস্ত্রহীন।
‘হুজুর আমি দোষী, মানি, কিন্তু হিজড়া না হুজুর—’
‘আবার সেই একই কথা! মুরগার ওই একটাই ঢেং… এরে উল্টা ঝুলাইয়া রাখো। তবিয়ত সাফ কইরা ফেলো।’
‘একবার, শুধু একবার হুজুর, শেষবারের মতো আমার কথাটা শুনেন—’
‘কথা লম্বা করবা তো আবার ধুমা ধরাইব। জলদি কও। আর শুনো, জান বাঁচাইতে যদি মিথ্যা কইছ অথবা বাজে কিছু বকছ—তো মনে রাইখো আমরা কিন্তু জিনও বাহির করতে জানি।’
‘না হুজুর, বিশ্বাস করেন দোষ আমার। ভুল আমার থিকাই হইছে। কিন্তু আমার ইরাদা এত বড়ো পাপ করার ছিল না জনাবে আলি। হঠাৎ কইরাই—ঠিক যেমন সিনেমায় মানুশ আমরিকায় যাইয়া গাড়িত চইড়া ঘুরে, মেম সাবদের লইয়া মজমস্তি করে—এমনই। আমি নিজের ভিতরের ছুপা শয়তানটারে চিনতামই না হুজুর। বেগম সাহেবার আমার ওপর বড়ো করম আছে। গেছে বছর আমার বউটা যখন বিমার হইল, উনি নিজের হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরায়া দিয়া বললেন, ‘এই নাও পাঁচ হাজার। আরো কোনো দরকার হইলে আমারে ফোন কইরো।’ নিজের হাতে নম্বরও লিখা দিলেন। আমাদের বেগম সাহেবা খুব ভালো হুজুর, দিলের দিক থিকাও বড়ো নরম। খোদা জানে আমার ভিতর কবেকার নাশোকরি ঘাপটি মাইরা ছিল!’
‘হুঁ… তুমি হারামজাদা, প্রথম সারির।’
‘না হুজুর, আমি হারামজাদা না। আমার গাঁয়ে গিয়া জিজ্ঞেশ করেন, সবাই জবান দিবে গোলাম রসুলের দিল নরম, হাত খোলা—’
‘একজন মানুশের কি খালি দিলনরম আর হাতখোলা হইলেই হয় গোলাম রসুল?’
গোলাম রসুল চিন্তায় পইড়া গেল। আজতক সে নিজেরে একজন ভালো মানুশ বইলাই জ্ঞান কইরা আসছিল। রসুইঘরের ছোটোমোটো চুরিচামারি বাদ দিলে তেমন বড়ো কোনো বদকাম সে করে নাই। অগোচরে মাখন-মালাই-কেক-বিস্কুট খায়া ফেলা—টাইম-বেটাইম চা বানায়া নেওয়া—নিজের লিগা পরোটা ভাইজা নেওয়া—ফলের ঝুড়ি সাজাইতে সাজাইতে অল্পসল্প মুখ মাইরা নেওয়া—এইগুলাই; অন্য বাবুর্চিদের মতন না সে কখনো বাজারের বেচাকেনায় কমিশন নিছে, না কখনো সদাই থিকা এক পয়শা সড়াইছে। যদি কখনও সে রসুইঘর থিকা বেরইছে, তো খালি হাতে বেরইছে।
বেগম সাহেবার কাছে আসার আগে সে আরও তিন বাড়িতে খানসামার কাজ করছিল, এবং ওই তিন খুশহাল বাড়িতে থাইকাই সে শিখছিল তিনখান সবক।
১.
প্রফেসর সাহেবের ঘরে এলেমকালামের দরিয়া বইত। সর্বদাই বুদ্ধিজীবী, কলমজীবী, কাগজের নামী সাংবাদিক ও পড়াশোনারেই জানপ্রাণ জ্ঞান করা ছাত্রদের সেইখানে ভিড় থাকত। প্রফেসরের বেগম এই জোর-করানি মেহমানদারি নেহায়েত অপছন্দ করতেন; তবুও তাদের বাড়ির এইটা বিশেষ আলামতই ছিল যে, তাদের দোরগোড়ায় নামিদামি লোকজনের আনাগোনা লাইগাই থাকে। প্রফেসর সাহেবের জ্ঞানবিদ্যার দাবড়ানি দূর-দূর ছড়ায়া ছিল। উনি বইপাগল ছিলেন এতই যে অনেক রাইত তরি তার বেডল্যাম্পের আলো জ্বইলা থাকত, আর যতবারই গোলাম রসুল উইঠা বাহিরগমন করত, উনার জানালার পাশ দিয়া গলা খাখারি মাইরা যাইত, সাহেব যাতে উদিশ পায় যে, না, আমাদের গোলাম রসুল জাগনা আছে।
প্রফেসর সাহেব গোলাম রসুলরে অনেক মোহাব্বত করতেন। সে টাইম-বেটাইম তার ও তার মেহমানদের জন্য চা বানায়া পেশ করত। বেগম সাহেবা বাচ্চাদের নিয়া মশগুল থাকতেন এবং কম আয়ের ফলে কিপটামি ও বলদামির দিনগুজারিরে সংসার-চালানির-কৌশল মনে করতেন। তাদের বড়ো পুত্র ফার্স্ট ইয়ারের ইস্টুডেন, নয়া নয়া পাংখা গজানোয় সে মাঝেমধ্যেই গোলাম রসুলের গায়ে চড়-থাপ্পড়-গাইল বসাইত; কিন্তু গোলাম রসুল এইসব ছোটোমোটো সেকেইলা বিষয়রে গায়ে নিত না; সে জানত, চাকরি করতে হইলে দিল বড়ো রাখতে হয়; ইজ্জত-বেইজ্জতি নিয়া মাথা ঘামাইতে গেলে চাকরি থাকে না। প্রফেসর সাহেবের দুই মাইয়া তখনও ছোটো। গোলাম রসুল নিমগাছের ডালে তাদের দোলনা বানাইয়া দিছিল, তাই গোলাম রসুলের লগে তাদের খাতির না থাকলেও তাদের পুরাটা দিন কাটত গোলাম রসুলেরই চারমিহি।
প্রফেসরনি সাহেবা সারাদিন রান্নাঘরে ঢুইকা থাকতেন। রান্নার রেসিপি বাতলায়া দেওয়ার উনার মেলা শখ। উনার খেয়াল যে উনি গোলাম রসুলের চেয়ে ভালো রাধুনি। মিক্সার চালানি, লবন-মরিচ চেক করা, মশলা ঠিকঠাক মিলল কিনা, তাওয়ায় রুটি উলটানো, আরো ইত্যাদি রকমফের কাজকারবার, যা নিয়া উনি মশগুল থাকতেন, এগুলাই ছিল উনার দিন কাটানোর উপায়।
প্রফেসরের রাহাইখরচে গোলাম রসুলের দুসরা বছর চলতেছিল, হঠাৎ কইরাই তার ভিতর আজিব বদলাভ আসতে শুরু করল। রান্নাঘরে সারাক্ষণ রেডিও বাজতে থাকে। যখন সারা পরিবার টেলিভিশন দেখতে বসে তখন রান্নাঘরের কাজকারবার সাইরা সেও আইসা বইসা পড়ে দোরগোড়ায় পাওপোশের পাশে। স্রেফ ক্লাস ফাইভ তরি পড়লেও, সে প্রফেসর সাহেবের কাছের সংবাদপত্র, সাময়িকী নিয়া নিয়া কোয়ার্টারে বইসা পড়ত। এমনে এমনে যখন গোলাম রসুলের কম্পিউটারে মেলা ইনফরমেশন জমা হইল, তখন হঠাৎ তার জবান যেন খুইলা গেল।
শুরুর দিকে কালক্ষণ বুইঝা সে অল্পস্বল্প বকত। পরে পরিবারের আলাপসালাপে সুযোগমত দুই-একটা হিউমার আর উপস্থিত জবাব দিয়া সে ধীমে ধীমে ইনার সার্কেলে জায়গা কইরা নিলো। সবাই তার কথায় এমন আনন্দ পাইত যেন বান্দরের খেলা দেখতেছে। এখন যখনই প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে কোনো জ্ঞানীগুণী, সাহিত্যিক বা সাংবাদিক দেখা করতে আসত, তখন চা পরিবেশনের কালে ফাঁক বুইঝা গোলাম রসুল অবশ্যই কোনো না কোনো মিসরা শুনাইয়া দিত। প্রফেসর সাহেব একটা উর্দু পত্রিকায় খুব মশহুর কলাম লিখতেন। পত্রিকার সার্কুলেশন ছিল লক্ষাধিকের ঘরে আর সেই অনুপাতে প্রফেসর সাহেবের পাঠকও ছিল বেশুমার। কলামছাপা সেই সংবাদপত্র উনি রোল কইরা বগলে গুঁইজা এম. এ ইকনমিক্সের ক্লাশ নিতে যাইতেন, ফলে পত্রিকার কল্যাণে জায়গায় জায়গায় কলামের প্রশংসা পাওয়া তার জন্য সুবিধাজনক হইত।
ক্রমেই গোলাম রসুল কবুতরের খোপ থিকা বাইর হইয়া আসমানে উঁচা উঁচা উড়ান ভরতে লাগল। খেজুরগাছের মতন সোজা গড়ন, হাওয়াদার উন্মুক্ত চক্ষু, সুপারম্যানের মতন রাফতার—গোলাম রসুল এখন বড়ো বড়ো জবানে কথা বলা লাগাইছিল। যখন গেরাম থিকা সে নয়া নয়া আসছিল, প্রফেসরনি সাহেবার মনে হইত তারে পিপুল গাছতলায় কুড়াইয়া পাওয়া ছিঁড়া কোনো তক্তা; অথচ এখন তার কিমত যেনবা পীরবাবা সমান হইয়া গেছে।
ওইদিন প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে প্রেস কনফারেন্স বসছিল। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রফেসর আমজাদ তার কলামে কিছু কথা লিখছিলেন যেইগুলা নিয়া এখন বড়ো বড়ো দলে নানা রকম সংকট চলতেছে। কয়েকটা পত্রিকার প্রতিনিধি ছোট্ট সরকারি বাংলোর ড্রয়িংরুমে বইসা আছে, দুইজন ক্যামেরাম্যান ছবি তুলতেছে ঘুইরা ঘুইরা, ঠিক তখনই চায়ের ট্রলি ঠেইলা ঠেইলা গোলাম রসুল প্রবেশ করল।
প্রফেসর আমজাদ নিজগুরুত্বে উচ্ছ্বসিত হইয়া, বিলা খওফ বিলা তাকাল্লুফে বাহু, হাত, গলা, চোখ পুরা শরীলের ভাষা কাজে লাগাইয়া নিজের কথার তফসির করতেছিলেন।
‘আমাদের ভালাই নিহিত আছে গণতন্ত্ররে মাইনা লওয়ায় এবং দিল থিকা এরে পালন করায়…’
একজন রিপোর্টার খানিক আগাইয়া জিজ্ঞেশ করল, ‘স্যার তৃতীয় দুনিয়ায় তো শিক্ষার হার কম, গরিবি আমাদের শক্তি কেড়ে নিছে। শ্রেণীভেদের সমাজ। জয়েন্ট ফ্যামিলি আর সাম্প্রদায়িক সিস্টেমে বিভক্ত হয়ে আছে সোসাইটি। এই হালতেও কি গণতন্ত্রেই ভরশা করতে হবে?’
‘গণতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র…’ প্রফেসর গর্জাইয়া উঠলেন—‘গণতন্ত্রই আমাদের একমাত্র ঔষুধ। তবে, শিক্ষাই যেইখানে ব্যাপক নয়, সেইখানে কেই বা ভোট দিবে আর কেনই বা ভোট দিবে? আর সেই ভোটেরই বা—একটি অশিক্ষিত মানুশের ভোটেরই বা—কিরকম মানে আছে?”
কি জানি গোলাম রসুলের ভিতর দিয়া তখন কী গুজরাইল, সে চায়ের কাপ নামায়া রাইখা বড়োই আত্মবিশ্বাসের সহিত আগ বাড়াইয়া বলল—‘হুজুর… তৃতীয় দুনিয়ায় গণতন্ত্র চলবে না। যেইতক সাম্যই না কায়েম হইতেছে এই জমিনে, গণতন্ত্রের চারাগাছই বা লাগবে কেমনে? পারলে আমাদের একজন শের শাহ সুরি আইনা দেন, যে কলকাত্তা থিকা পেশোয়ার তরি সড়ক বানাইয়া দিবে। পারলে আমাদের একজন শরিফ জায়গিরদার আইনা দেন যে মজদুরের খুন চুইষা খাবে না, ইনসাফ করবে। আমাদের গণতন্ত্র লাগবে না হুজুর। গাই, ভেড়া, বকরি ওরা গণতন্ত্র কী চালাবে? আমাদের তো যেইদিকেই হাকাইয়া নিবে আমরা ওইদিকেই হাঁইটা যাব। আমাদের একজন ভালো রাখাল আইনা দেন হুজুর, যার দিলে আমাগোর দুঃখ রবে। গণতন্ত্রের ঢং কইরা আমরার কীই ফায়দা আছে? গণতন্ত্রের রিশতা তালিমের সঙ্গে নয় হুজুর, তার রিশতা সাম্যের সঙ্গে। হাকিকত তো আপনিই জানেন—যেইখানে ভোটটাই সমান নয়, সেইখানে গণতন্ত্র আর কিসের?’
ক্যামেরাগুলার মুখ ঘুইরা গোলাম রসুলের দিকে তাক হইয়া তার ছবি ধারণ করতে লাগল। সাংবাদিকরা তড়িঘড়ি কইরা তার বলা কথাগুলা নোটাইতে শুরু করল।
প্রফেসর আমজাদ চৌখের জবান দিয়া ধমকাইয়া গোলাম রসুলরে মুহূর্তের ভিতর বাইরে পাঠায়া দিলেন। রাইতে প্রফেসর যখন রসুইঘরে ঢুকলেন তখন এরইমধ্যে গোলাম রসুল নিজের পয়লাতম সবক শিখে ফেলছে।
‘আমি বেইনসাফকারী না, নইলে তোমার বেতন অফ কইরা দিতাম। এই লও তোমার টাকা, আর মনে রাইখো—জবান খোলার আগে নিজের ক্লাশ আর মোকাম চিনতে হয়। আনারির হাতের বন্দুক হইয়ো না, মানুশ হওয়ার চেষ্টা করো। নিজের হাইসিয়ত বুঝো। কমবেশি আশলে আমারও দোষ আছে, তোমার মতন জোকারের কথা শুইনা আমি খুশি হইতাম। কিন্তু এখন বুঝে আসছে, ময়ূরপংখ লাগাইলেই কাউয়া ময়ূরপাখি হয়া যায় না। মুখ খুলবার আগে চিন্তা করবা যে কার সাথে কথা বলতেছ—তুমি কে আর সে কে। গেট লস্ট নাও!”
সরকারি বাংলো থিকা বাইর হইলে গোলাম রসুলের চোখে পানি আইসা গেল। প্রফেসর সাব ও তার ঘরদোররে তার কাছে আপন লাগা শুরু হইছিল। বাড়ি থিকা বিদায় করবার সময় কেউ তারে জিগাইল তরি না, যে—‘গোলাম রসুল, তুমিও আমাদের ছাইড়া যাইতে চাও কিনা?’ বাকি হাঁ, একটা বিষয় তার জরুর বুঝে আইসা পড়ল, যে—সমান হইয়া কথা বলার জন্য শুধু গণতন্ত্র না, সাম্যের দরকার; আর এখন তো, মালিক-চাকর সমান না।
২.
এই চাকরিটা বিনা কারণেই চইলা গেল, তার নিজেরই বোকামির দোষে। এরপর টানা ছয় মাস কাটল চরম টানাটানি আর বেকারত্বে। তারপর হঠাৎ নসিব ঘুইরা দাঁড়াইল। সেই দিনগুলায় গোলাম রসুল একটা বড়ো কোঠিতে মজুরির কাজ করতেছিল। হঠাতই তার দেখা হয়া গেল কোঠির মালিকের সঙ্গে, উনি তখন একটা আর্কিটেক্টের পাশে দাঁড়ায়া কথা বলতেছিলেন, ‘আজকাল আমি বড়ো ঝামেলায় আছি। বেগম সাহেবা ইউরোপ গেছেন, এদিকে খানসামাও গেছে হঠাৎ ভাইগা…’
এই ফুরসতে গোলাম রসুল আগ বাড়াইয়া সুধাইল, ‘স্যার আমি খানসামা। আমার আব্বা কর্নেল হকিন্সের খানসামা ছিলেন। কর্নেল হকিন্স যখন রিটায়ার কইরা লন্ডন গেলেন, তখন আব্বাও তাঁর সঙ্গে গেছিলেন। কিন্তু দিল না বসায় পরে ফিরা আসেন। আব্বা একাই সাত কোর্সের খাবার পাকাইয়া ফেলতেন, কোনো এসিস্টেন্ট ছাড়াই, স্যার।’
মালিক তারে গাড়িতে বসাইয়া নিজের সঙ্গে গুলবার্গে নিয়া গেলেন।
যেইসব দিনে গোলাম রসুল ডিফেন্স এলাকার ওই কোঠিতে দিনমজুরি করতে যাইত, তখন সেইখানে ঠিকাদার, মিস্ত্রি আর মজদুরদের মুখ থিকা মালিকরে নিয়া নানা রকম গল্প শুনত। মালিক সাব হালেই একুশতম গ্রেড থিকা রিটায়ার করছেন। গুলবার্গে তার দুইটা কোঠি, তৃতীয়টা ডিফেন্স এলাকায় নির্মাণাধীন। উনি ওয়াসায় ডিরেক্টর ছিলেন বিধায় বেশ লম্বা হাত চালাইছিলেন। ঘুষ এমন খুল্লামখুল্লা নিতেন যে সমস্ত দপ্তর ওয়াকিব থাকলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস করত না। দেশের বাইরে বহু বহু ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্ট। ফ্রান্সে দুইটা রাজকীয় ভিলা আর লন্ডনে একটা অ্যাপার্টমেন্ট নরমালি রেন্টেই দেওয়া থাকত। উনি বলতেন তৃতীয় দুনিয়ায় কেবল টাকাই কামে আসে; এইখানে না মেরিট পথ খুলে আর না শারাফত-শালীনতা চলে—খালি হাত গরম করলেই খুল যা সিম সিম মতন সমস্ত দুয়ার খুইলা যায়। যখন গোলাম রসুল নিজের বেতনের অংক শুনল তার মাথা চক্কর দিয়া উঠল। সতেরো গ্রেডে পৌঁছাইয়া সে মনে মনে ভাবল—সত্যই, দের আয়ে দুরুস্ত আয়ে। দারুণ পরিশ্রম ও কঠিন তৎপরতায় সে নিজের কামাল দেখাইতে শুরু করল। আগে তার পাক ছিল শাদামাটা, সার্ভিস ছিল মামুলি; কিন্তু এখন সে চাইনিজ আর কন্টিনেন্টাল খাবারের পাশাপাশি বেকিং তরিও শিখা ফেলল। ফাস্টফুড বানাইতেও হয়া গেল ওস্তাদ। বাড়ির পিছনের তন্দুরে সে এখন বানাইত খামিরা, ফাতিরা রুটি। তার নান, কুলচা আর সিন্ধি পরোটা পাইছিল সুনাম, খ্যাতি। এত আলা তবকার খানসামা, তদুপরি এত নীরব যার স্বভাব—বাড়ির লোকজন এরওর লগে দেখা হইলেই এইসব নিয়া তারিফ করত।
নিজেদের মধ্যে পুরা খানদান তারে ‘জুয়েল’ বইলা ডাকত। তার মিছাল দিয়া অন্য কর্মচারীদের ভয় দেখানো হইত, তাদের কাজের মান নিচায়া ধরা হইত। গোলাম রসুলরে হয় কোনো ফওজের ব্যাটম্যান নয় কোনো ইংরেজ সাহেবের নওকর লাগত—ওয়াক্তের পাবন্দি, কাজের নৈপুণ্য, সাফাই-সুতরাই… অনেক খুবিই তারিফ পাইতে পাইতে গোলাম রসুলের মধ্যে পয়দা হইয়া গেছিল।
কিন্তু এই লেভেলের নিখুঁত খানসামার ভিতরেও এক আচরের ফাঁক থাইকাই গেল। মাঝেমাঝে যেমন বাইর দিয়া দেখা টকটকে লাল আপেলও ভিতর দিয়া নষ্ট বাইর হয়, তেমনই, বেগম সাহেবা বিষয়েও গোলাম রসুল ভয়ংকর ভেড়িয়া সাবেত হইল।
সেই রাতে ডিনার থিকা ফারেগ হইয়া কোয়ার্টারে আইসা গোলাম রসুল ডেজার্ট কুলার লাগায়া নামাজে দাঁড়াইছিল। রাতের দস্তরখানে দশ-বারোজন মেহমান ছিলেন যারা খানসামার পাকের খুব তারিফ করতেছিলেন; একজন তো কয়েকটা তন্দুরি পরোটা প্যাক করায়া সঙ্গে কইরাও নিয়া গেছেন। বেয়ারা জামিল ঢুকল, মুখে এক আজিব হাসি নিয়া বলল—‘নামাজ শেষ কইরা ভিতরে চইলা যাইয়ো। বেগম সাহেবা জরুরি তলব করছেন।’
বেয়ারাটা যেই চাকরালি আন্দাজে কথা বলল আর তড়িঘড়ি কইরা মুইড়া গেল, তাতে গোলাম রসুলের মনে কোথাও একটা সন্দেহ তো জাগলই; কিন্তু সে বুঝতে পারল না—কোথায় আইসা সে হোঁচট খাইল, কোন কাজটার ফলে বেগম সাহেবার সহনসীমা পার হইল। নামাজ শেষ কইরা সে আফিয়তের দোয়া করল। এত ভালো একটা চাকরি পাইয়া সেও বুজদিল হইয়া পড়ছিল। আরাম-আয়েশ তারে আইলসা-ভোঁতা কইরা তুলতে কোনও কসুর করে নাই।
বাবুর্চিঘরে জুতা খুইলা কার্পেটের ওপর দিয়া হাঁইটা হাঁইটা, ধীরে ধীরে দুয়ার বন্ধ কইরা, হাঁটুতে হাঁটু ঠেকায়া ঠেকায়া, সে বেগম সাহেবার প্রাইভেট ড্রয়িংরুমে পৌঁছাইল।
বেগম সাহেবা ভারী কাঁন্ধের পোক্তা গড়নের মহিলা মানুশ। চেহারা উজবেকি ধরনের, হাত-পাও ফরাসি গড়নের, গলার টোন পাঞ্জাবি।
‘স্লামাইকুম ম্যাডাম।’
বেগম সাহেবা কিছু পড়ায় মশগুল ছিলেন। তার হাতের মধ্যে ঘর সাজানোর মোটা একখান ম্যাগাজিন। নিয়ম মোতাবেক সালামবাদ গোলাম রসুল চুপ কইরা দাঁড়ায়া রইল। কিছুকাল বেগম সাহেবা বড়ো গভীর নিরবতায় মনোযোগী থাইকা, যত্ন কইরা ম্যাগাজিন বন্ধ করলেন, দুনো হাত কোলে রাইখা জিজ্ঞাসাবাদের গম্ভীর স্বরে বললেন—‘গোলাম রসুল, তোমার কাছ থিকা আমি এইটা আশা করি নাই।’
খানসামা মিনমিনায়া ‘জি, ম্যাডাম’ বলল। এখনও তার মাথায় ঢুকে নাই কেন, কিভাবে, কোন কারণেই তারে পাকড়াও করা হইতেছে!
‘আমি কল্পনাও করতে পারি নাই তুমি এত নিচ আর নোংরা কাজ করতে পারবা।’
শেকায়েতের আশল কারণ এখনও তার কাছে সাফ না।
‘ভোদাই, ভাবছিলা আমার কানে কিছুই আসবে না? হারামজাদা জানি কোনহানকার, তুমি লুকায়া লুকায়া বাড়তি কামাই করবা আর খবর আমার কানে পৌঁছাবে না? চোরের বাচ্চা, তুমি শতবার আড়ালে পয়শা বানাবা, মালিকরে লুইটা যাবা—ভাববা গোমর কখনও ফাঁস হবে না?’
সে আবারও ‘জি ম্যাডাম’ বইলা খামোশ রইল।
‘কাল আমি ফলওয়ালার কাছে গেছিলাম। জানতে পারলাম আঙুরের দাম কিলোপ্রতি ষাইট টাকা। আর তুমি কিনা আমারে লেখাইছ একশ টাকা!’
‘জি ম্যাডাম, ভুল হয়া গেছে।’
‘এখন তো ড্রাইভার, পেয়ারা ও ঝাড়ুদার মরিয়ম সবাই সাক্ষ্য দিতেছে, তুমি সমস্ত দোকানেই কমিশন ঠিক কইরা রাখছ। আমরা তোমারে এত বড়ো বেতনে রাখছি, এমন কোয়ার্টার দিছি যেইখানে হিটার, ডেজার্ট কুলার, ফ্যান সমস্তই আছে, ইস্ত্রি ফ্রি, ঠান্ডা-গরম পানির ব্যবস্থা, মেডিকেল ফ্রি—সেইখানে কিনা তুমি খোদ আমাদেরই লুটতেছ!’
গোলাম রসুলের নিজের চাকরির শেষ ঘড়ি নজর আসতে লাগল।
চোখ নামায়া সে ভদ্রভাবে বলল, ‘ম্যাডাম, ভুল হয়া গেছে। মাফ কইরা দেন। সামনে আর এমন হবে না।’
‘শালা পাকিস্তানের মানুশই সব চোর, সেজন্যই ওপরে কোনো সৎ মানুষ আসে না। হুকুমত চলবেই কেমনে যখন বে-ইমানির এমনতর অবস্থা! সবকিছু মিলতেছে তবুও বেইমানির ছাড়ন নাই। বাড়তি লাভের এমন নেশা ধইরা গেছে যে মুখ থিকা আর ছুটনের নাম নাই। আমি তোমারে পুলিশের হাতে তুইলা দিব। কী ভাবতেছ?’
অতঃপর বেগম সাহেবা তার শালীনতা, শিক্ষাদিক্ষা, কালচার সব ছাইড়াছুইড়া তুমুল গালাগালির বর্ষায়নে নাইমা আসলেন। গোলাম রসুলের যখন একিন হইয়া গেল যে চাকরি আর থাকতেছে না, তখন এই জেরাজেরির ভিতর থিকাই সাহস সঞ্চয় কইরা সে বলতে লাগল—‘বেগম সাহেবা, আমাদের গরিব মানুশদের আর কিসেরই বা চুরি… মানুশজন তো ফুতুর কইরা দিছে ব্যাংক, ধ্বংস কইরা দিছে দেশের অর্থনীতি। জেরা হইলে আগে তাদের হওয়া উচিৎ। আমরা গরিবরা আর কীই বা এমন চুরি করব ম্যাডাম… আগে ওপরওয়ালাদের খোঁজ নেন। বড়ো রকমের লুটতারাজি তো তারাই করতেছে। তারাই গরিব মানুশরে চুরি করতে সাহস জুগাইছে। আমরা তো বরং আমাদের বড়োদের থিকাই শিখি, মেডামজি।’
বেগম সাহেবার রাগে মাথা খারাপ হয় অবস্থা। তড়াক কইরা দাঁড়াইয়া হাত কইষা এমন থাপ্পড় বসাইলেন যে গোলাম রসুলের নিজের জন্মদাত্রী মায়ের কথা মনে পড়তে লাগল।
‘কত বড়ো সাহস তোমার! কত বড়ো হিম্মত!’
আবারও গালাগালের বর্ষায়ন।
‘আরে আহম্মক! মানুশ যেমন হবে শাসকও তাদের ওপর তেমনই বসায়া দেওয়া হবে। তুমি ভাবতেছ খালি ওপরওয়ালাদেরই কসুর? সব দোষ তোমাদের গরিবদের। মনে রাইখো—চুরি করা মানে চুরি করাই, লাখ টাকার চুরি আর এক টাকার চুরি একই কথা। খবরদার যদি নিজের উজরগাহিতে মুখ খুলছ তো। তোমাদের মতো লোকেরাই দেশের সবুজ পাসপোর্টের মান খুওয়াইছে। তোমাদের মতো বেয়াদ্দবদের কারণেই বিদেশি পুঁজি এই দেশে ঢুকে না। তোমাদের মতো হতভাগারাই দেশটারে ঋণের জালে জর্জরিত কইরা রাখছে। তোমাদের গরিবি ঘুচাইতে গিয়া সরকাররে দুশমনদের সাথেও তেজারত করতে হয়। তোমাদের মত আওয়াম যেই মুলুকের নসিব হয়, সেই মুলুকের নসিব আর কেমনেই জাগ্রত হইতে পারে? যেই দেশের জনগণ চোর, বেইমান, ঠকবাজ—সেই দেশের আর কীই বা এমন হবে? ওপরের লোকদের কী ফাঁকি দিবা? সমস্ত কসুর তো আওয়ামের। বেদ্দিন, বদআখলাক, দুখদারী মানুশজন, ফাঁকিবাজ—এই জন্যই কি নারা লাগাইছিলা পাকিস্তান কায়েমের ওক্তে? যাতে লুটপাটাইতে পারো, তাই-ই কি মাংছিলা পাকিস্তান?’
‘দূর হয়া যাও আমার নজর থিকা। আমি তোমার মতন দেশদ্রোহীর খোমা দেখতে চাই না। মুনশিজির সাথে হিশাব চুকায়া নিয়ো। সাজবেলা যাতে আমার নজরে না পড়ো। গেট লস্ট নাও!’
গোলাম রসুল এই জবাবদিহির জন্য মোটেই তৈয়ার ছিল না। মালিক সাহেবের কোঠিতে সে রাজার মতন জিন্দেগি গুজার করতেছিল। সমস্ত চাকরদের হুকুমদাতা, যত ভিতর–বাহির চাবির রখওয়ালা, যাবতীয় ফোন ধরা যার অধিকার, সাহেব যার ভক্ত, বেগমের যার প্রতি অগাধ ভরশা। এ যে অবেলায় নাইমা আসা শিলাবৃষ্টি। সে দিগদিদিক হয়া গেল। সাহেবের কাছে মাফ চাইল। বেগম সাহেবার কাছে কতবার কইল, চোরের যেই শাস্তি সেই শাস্তিই সে মাথা পাইতা নিবে, শুধু আরেকটাবার তারে সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু বেগম সাহেবার ডিকশনারিতে ‘আগামি’ বইলা কোনো ওয়ার্ড ছিল না। ফলে পেশাদার ভৃত্য মতন যারা আগে তার আনুগত হইয়া চলত, তারাই এখন বড়ো বইনা গিয়া তারে তসল্লি দিতে লাগল। দিলে দিল খুশ, চেহারায় আর্টিফিশিয়াল বিষণ্ণতা বানাইয়া তারা দল বাঁইধা বেগম সাহেবার দরবারে হাজির হইল, মাফি চাইল; পরে বেগম সাহেবা সবাইরেই ছাঁটাই করার ইরাদা জাহের করলে সবাই মুখ লটকাইয়া সার্ভিস কোয়ার্টারের দিকে ফিরতে ফিরতে গোলাম রসুলরে এই নসিহতই দিতে লাগল—রাস্তা নাইপা নেওয়াতেই মঙ্গল।
গোলাম রসুল কোঠি থিকা এমনভাবে বের হইল যেন কোনো বাদশাহ বনবাস যাইতেছে, জঙ্গলমুখী আগাইতেছে। কিন্তু এইবার কিসমত তার সহায় হইল। যেই বেকারি থিকা রোজ সে জিনিশপাতি কিনত, যেইখানে সে দশ পার্সেন্ট কমিশন নিত, নিজের ছোট্ট কইরা ট্রাঙ্ক আর গাট্টিখানা লইয়া সে ওইখানেই পৌঁছল। এইবার তার ইরাদা গাঁয়ে ফিরা যাবে। কেক-পেস্ট্রির সেকশনে সে নিজের গেরামের ঠিকানা লেখাইতেছিল। দোকানদার খুব ব্যস্তসমেত। ডায়রিতে নাম–ঠিকানা লেখবার মতন সময় যদিও তার ছিল না, কিন্তু গোলাম রসুলেরও এখান থিকা হাজার হাজার পয়শার খরিদির হিস্টোরি ছিল, ফলে চার-পাঁচটা ফোন ধরতে ধরতে আর কয়েকটা অর্ডার সামলাইতে সামলাইতে শেষ তরি দোকানদার তার ঠিকানাটা লেইখাই নিল।
ঠিক সেই সময় মিসেস মেহতাব ঝকঝকে পোশাক পরিহিত দাখেল হইলেন।
দানিশ সাহেব বড়ো পোস্টের ব্যাংকার ছিলেন। সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আইএমএফের মিটিংয়ে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পলিসির পক্ষে সুয়াল করতেন উনি। প্যাশনেটলি উনি মূলত আইনজীবী ছিলেন। ব্যাংক শুরুতে তারে অপারেশনে রাখে, পরে ফরেন এক্সচেঞ্জে ঘষামাজা করে, বাদে লিটিগেশন ডিপার্টমেন্টে জাইগা ওঠে তার মূল কামাল। এরপর ওঠতে ওঠতে একেবারে ভাইস প্রেসিডেন্টে ওইঠা যান। এখন শহরের যত ভিআইপি লোক তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু; তার সোশাল সার্কেল যাবতীয় কাবিলে জিকির শিল্পপতি, সিয়াসতদান আর বুদ্ধিজীবী দিয়া সুসজ্জিত গুলিস্তার মতন।
মিসেস মেহতাব যখন সন্ধ্যার চায়ের জন্য কেক আর পেস্ট্রি দেখতেছিলেন, ঠিক তখনই গোলাম রসুল কাচের দরজা খুইলা বেরোয় যাইতে চাইতেছিল।
‘আরে, তুমি তো আমারে একজন খানসামা আর খুঁইজা দিলা না! কত অসুবিধা হইতেছে আমাদের। তোমার কোনো পরওয়াই নাই।’
৩.
এমন সময় গোলাম রসুলের কিসমত ডাইকা উইঠা তারে পথেঘাটে ঘুইরা বেড়ানো থিকা উদ্ধার করল। ছোট্ট ট্রাঙ্ক আর গাট্টিখানা গাড়ির ডিকিতে তুইলা সে মেহতাব–দানিশ দম্পতির কোঠিতে রাজাহাঁসের মতন গিয়া পৌঁছাইল। পয়লা পার্টিতেই গোলাম রসুলের কদর ফুলের মতন ফুইটা উঠল। এমন নৈপুণ্য এমন রুচির পরিচয় সে দেখাইল, যে রাত্রবেলা বেগম মেহতাব দানিশ সাহেবরে বললেন, ‘জানি না আজ তরি কেন আমাদের এমন মানুশ মিলে নাই। মনে হইতেছে কোনো নেক কাজেরই পুরষ্কার এটা। যাক, যাবতীয় রোনাধোনার বিদায় হইল।’
পরদিন ভোরে ভোরে দাবা দাবা পায়ে গোলাম রসুল খাবার ঘরের দরজায় দুই হাত মিলাইয়া দাঁড়াইল।
‘ম্যাডাম ভিতরে আসতে পারি?’
বেগম সাহেবা সুধিনজরে দানিশ সাহেবের দিকে তাকাইলেন, যেনবা তার আদব-লেহাজের তারিফ করতেছেন।
‘আসো আসো।’
গোলাম রসুল কাছে আইসা সমস্ত হিসাবকিতাব, বাকিবুকি খুচরা টাকাসমেত, বেগম সাহেবার সামনে পায়ের কাছে রাইখা দিল।
‘দয়া করে দেইখা নিবেন।’
মিসেস মেহতাব হিশাব মিলায়া দেখলেন, যোগ-বিয়োগ করলেন, খুচরা টাকা গুইনা পার্সে ঢুকায়া রাখলেন।
‘এই হিশাব তুমি নিজেই লিখছ?’
গোলাম রসুল মাথা নাইড়া হ্যাঁ বলল।
‘পড়াশোনা জানো?’
‘জি ম্যাডাম, ফাইভ ক্লাশ তরি।’
সে প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে বেশুমার ম্যাগাজিন, বইপত্র আর পত্রিকা পড়ছিল। আলাপসালাপ, বিতর্কেও কান ঢুকাইছিল। ডিগ্রির সঙ্গে তার জানপেহচান না থাকলেও ইনফরমেশনের দিক দিয়া তার দিমাগ ছিল সফটওয়্যারভর্তি কম্পিউটার।
‘আচ্ছা গোলাম রসুল, এখন তোমার একটু আমারে সাহায্য করতে হবে। সেক্রেটারি রুমা আসা তরি যাবতীয় ফোনকল তোমাকেই সামলাইতে হবে। আমি বাইরে একটু ফ্রেন্ডদের কাছে যাইতেছি। তুমি নিচে অফিসেও নজর রাখবা। আজ সাহেব আর আমি বাইরে লাঞ্চ করব। বাইরে কর্মচারীদের জন্য বড়ো মাংসের দুইটা প্যাকেট বের করে তাতে কিছু দিয়ে দিয়ো। রাতে আমরা স্যুপ আর হালকা কিছু নিব।’
‘জি, যথাহুকুম।’
দানিশ সাহেবের ছয় ক্যানাল জুইড়া বিস্তৃত কোঠি। নিচতালায় বেগম সাহেবার অফিস, ড্রয়িংরুম আর ফর্মাল মেহমানদের থাকার জন্য আলাদা কয়েকটা কামরা। সামনের ভাগে অফিসের বড়ো রুম, যেইখানে বেগম মেহতাব পোশাকের নকশা কম্পোজ করেন। অফিস সংযুক্ত ঘরগুলাতে আছে দর্জিখানা—চারজন দর্জি আর একজন কাটিংমাস্টার নিরবচ্ছিন্ন হাত চালায়া যান। তাদের চায়ের বন্দোবস্ত হয় নিচতলার একটা ছোট্ট কিচেন থিকা, জরুরতের জিনিশপাতির জোগাড় গোলাম রসুল কইরা দেয়।
একদিন গোলাম রসুল ইনায়াবিনায়া বেগম মেহতাবের সামনে হাজির হইল।
‘স্যার, দর্জিখানার কিচেনের দুধ শেষ, চায়ের পাতাও নাই। এই বিষয়ে কী হুকুম?’
‘তো তুমি কিনে নিয়ে আসো গোলাম রসুল। আর একটা কথা, ওটা দর্জিখানা না, ওটা মেহতাব বুটিক। জানো শহরে আমার বুটিকের কয়টা শোরুম?’
গোলাম রসুল না-মালুমির জানান দিলো।
‘দুইটা শোরুম তো গুলবার্গে। একটায় ক্যাজুয়াল ড্রেস বিক্রি হয়, আর পেস এলাকায় যেইটা সেখানে ফরমাল ড্রেস। ডিফেন্সে একটা শপ আছে। লিংক রোডের সুপারমার্কেটে একটা, আর মডেল টাউনে আরেকটা। ইসলামাবাদেও একটা ব্রাঞ্চ খুলছে সবেই। আমরা যখন লোকজন এন্টারটেইন করি তখন বাদে বাবুর্চিখানার কাজ খুব বেশি একটা না। হাঁ মেহমানদের জন্য কফি, চা, কহওয়া—চুটকিতেই এইসব হাজির করতে হবে। আর আমার ও সাহেবের তো বাইরেই আকছার খাওয়া পড়ে।’
বেগম সাহেবা অদ্ভুত প্রকৃতির মানুশ ছিলেন। হরিণীর মতো শরীর, পারদের মতো মাথা, নড়নচড়ন যান্ত্রিক মতন। ঘরে থাকলে ট্র্যাকস্যুট কিসিমের পোশাক পরতেন। বাইরে থিকা আইসা কাপড় বদলানোর ফুরসত না হইলে পেটিকোট আর হাতাকাটা ব্লাউজ পইরাই মৌমাছির মতন বাড়ি জুইড়া ঘুইরা বেড়াইতেন। ড্রেস ডিজাইনার আসত ওপরওয়ালা পরশনেই, বেগম সাহেবা তখন পেটিকোট আর ব্লাউজ পরিহিতই তার সামনে বইসা নতুন পোশাক ডিজাইন করতেন, রঙ ম্যাচিং করতেন। এছাড়া ফটোগ্রাফারদেরও লাইগা থাকত যাতায়াত। ম্যাগাজিনের প্রতিনিধিরাও আসা–যাওয়া করত রোকঢোক ছাড়াই। এই কাজরে বেগম সাহেবা যেই লার্জ স্কেলে নিয়া করতেছিলেন, তাতে দুইটা বিষয় পরিষ্কার ছিল—এক, উনার কাছে সময়ের ভীষণ কমতি; দুই, অযথা সংকোচ হায়া আর ফুজুল বানোয়াট শরমিন্দিগিরে উনি মোটেও পছন্দ করেতেন না। প্রত্যেক বছর নিজের পোশাকের প্রদর্শনীর জন্য উনার কখনো আমেরিকা, কখনো ইউরোপে যাইতে হইত। এই তৈয়ারিতে উনার মাসের পর মাস কাইটা যাইত। ড্রেসের বিজ্ঞাপনের জন্য দরকার মডেল ছেলে-মেয়ের, যারা বাড়িতে আইসা তার পোশাক পইড়া ছবি তুলবে। বেশ কিছু মডেল মেয়ে যারা পয়লায় তার পোশাকের বিজ্ঞাপনে কাজ করত, এখন তারা টিভি-ফিল্মের নামকরা শিল্পী।
মিডিয়া আর ফ্যাশনের এই দুনিয়া গোলাম রসুলের কাছে নিউইয়র্ক সিটির মতন ঝলমলে অচেনা গোলক। সে কখনও কোনো অওরতরে খুল্লামখুল্লা সিগারেট খাইতে, চটুল রসিকতায় খিল খিল কইরা হাসতে, চুল লেহড়াইতে আর কাঁন্ধা দুলাইতে, নিজের বদনরে এগজিবিশন শো করাইতে দেখে নাই।
গোলাম রসুলের এ সবকিছুই দিল থিকা পছন্দ হইতে লাগল।
সে বুঝতে পারল বাস্তবে আশলে সে এই মহলেরই সাঁতারু। এইখানে থাইকা সে এতটাই সুখী ফিল করতেছিল যে এমন সুখের কথা স্বপ্নেও কখনো সে ভাবে নাই।
নিচের দর্জিখানায় গেলে ফ্যাশন ম্যাগাজিন, কড়া লিকারের চা আর সুন্দরী গ্রাহক খাওয়াতিনদের সঙ্গে মোলাকাত হইত। কিছু আপারক্লাশ বেগমরা তাদের মেয়েদের বিবাহের পুরা জাহেজ মেহতাব বুটিক থিকা বানাইত। তারা অফিস থিকা ফাঁক পাইয়া দর্জিখানায় ঢুইকা পড়ত। দুই–তিনজন কারিগর গ্যারেজে বইসা সালমা, বাদলা আর তারার কাজ করত, সূচিশিল্পে যারা ছিল ওস্তাদ, তাদের কাছ থিকাই ডাউনটাউনের নানান গসিপ গোলাম রসুলের কানে আসত—শহুরে গলিঘুপচির রাজনীতি, খুনাখুনি হানাহানি, অপহরণের কাহিনি। ওপরে গেলে সবসময় চোখে পড়ত টেলিভিশন। বেগম সাহেবার সারাদিন টিভি দেখার সময় না থাকলেও টিভি অন থাকত সারাক্ষণই, সেইখানে ডিশের মিউজিকের প্রোগরাম দেখানো হইত। দুলুনি ডান্স আর কাম জাগানো গান দেইখা গোলাম রসুলের মন ভরত না। বেগম সাহেবার স্পোর্টস মার্সিডিজ গেট পারানির সঙ্গে সঙ্গেই সে নাচগানের এই লাগামহীন দুনিয়ায় গুম হইয়া যাইত। এই নওজয়ান গানেওয়ালাদের গান তো কোনো রেওয়াজের ফলাফল ছিল না, বাকি যেই গানগুলাই ছিল, সব তাজাপাকা ফলের মতন—একটুখানি টক, একটুখানি মিষ্টি, একটুখানি কুদরতি কারওয়াহাট মিশানো ছিল। এই গানগুলার যেই একখান বড়ো খুবি তা হইল—এগুলা শোনামাত্রই মানুশ তার রিদমে হারাইয়া যায়, শরীরের নিম্নাংশে পয়দা হইতে শুরু হয় নাচন। দেখতেই দেখতে গোলাম রসুল নাচনে মাহের হইয়া উঠল। সে বেগম সাহেবার গরহাজিরিতে লাফাইয়া লাফাইয়া নাচত। সামান্য প্রেকটিসে সুরে গলাও বইসা গেল। প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে তারে রসুইঘরেও খাটতে হইত, পড়াপড়িতেও সময় ব্যয় হইত; কিন্তু এইখানে, টেলিভিশনের কাছে শিক্ষা নেওয়ায় কোনো পুঁথিগত বিদ্যার দরকার নাই। গোলাম রসুলের চুলের স্টাইলও বদলায়া গেল। নিচের ট্রেইলর মাস্টারের কাছ থিকা কাফওয়ালা শার্ট আর সুন্দর জ্যাকেট সেলাই করাইল। এখন তারে সহজেই মনে হইত পারত দানিশ সাহেবের বাড়ির গরিব জনৈক রিশতেদার।
এমন সময় যখন গোলাম রসুলের হুলিয়া বেগম সাহেবার বুটিকের সঙ্গে মানানসই হয়া গেল, একদিন অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সেইদিন নিচের অফিসে জর্মন এক পত্রিকার প্রতিনিধি ছবি তুলতে আসছিল। মডেল হাজির ছিল তিনজন মেয়ে। বেগম সাহেবা একটু নার্ভাস হয়া পড়লেন, কারণ মডেল যুবাইর কই যেন আটকায়া গেছে। তার বাড়িতে ফোন করা হইল, যেই বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে সে কাজ করত সেইখানেও ফোন গেল। তিনজন মডেল পুরা প্রস্তুত হইয়া বইসা আছে। নিজেদের ভাঙচুর ইংরেজি দিয়া তারা জর্মন ফটোগ্রাফারের সঙ্গে অনেকটা ফ্লার্টও কইরা ফেলল এবং এখন তাদের ইংরেজিও ফুরায়া আসল। শেষবারের মতন জর্মন ভদ্রলোক নিজের হাতঘড়ির ওপর থিকা সুয়েটারের কাফ তুইলা বেগম মেহতাব দানিশরে সুধাইল—‘আইএম আফ্রেড, যদি এখনই আপনার মডেল না আসে, তাহলে আমি ছবি তুলতে অপারগ হব। আমার এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে।’
বেগম সাহেবা ছিলেন আইডিয়াবাজ মানুশ । উনি ঝটপট ওপরের তলায় উইঠা গেলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোলাম রসুলরে মুঘল আমলের এক খুবসুরত পোশাক পরাইয়া নিচে নামায়া আনলেন। সেলিমশাহী জুতা, মুকুটের মতন সুন্দর টুপি আর লম্বা মখমলি পোশাকে গোলাপের ফুল হাতে নিয়া যখন গোলাম রসুল সিঁড়ি দিয়া নামল, তিনজন মডেল মেয়ে শিটি বাজাইল আর জর্মন ফটোগ্রাফার লম্বা কইরা ‘ওয়াও’ বইলা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করতে শুরু করল।
‘এ কি কোনো মুঘল শেহজাদা?’ জর্মন ফটোগ্রাফার জিজ্ঞেশ করল।
‘আমাদের তারে শেহজাদা সেলিমরূপে পেশ করতে হবে।’
এরপর বেগম সাহেবা আনারকলি, নুরজাহান আর হেরেমের জিন্দেগি নিয়া আনাড়ি কল্পনাপ্রসূত কাহিনি বলতে লাগলেন। ফটোগ্রাফার একের পর এক এত ছবি তুলল যে শাটার অন-অফ হওয়ার মাঝের থামন তরি শুনা গেল না। কাজ থিকা ফারেগ হইলে জর্মন ভদ্রলোক ছোট্ট একটা ডায়েরিতে মডেল মেয়েদের নাম–ঠিকানা আর শরীরের তিনটা মৌলিক মাপ লেইখা নিল। তারপর সে গোলাম রসুলের দিকে ফিরল, ভাঙচুর উর্দুতে তার নাম জানতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে বেগম সাহেবা নিজেই ইনফরমেশন দিতে শুরু করলেন—‘এ হচ্ছে প্রিন্স। আশল নাম গোলাম রসুল, কিন্তু পরিবারে সবাই তারে প্রিন্সই বলে। তুমিই বলো, তারে প্রিন্স সেলিমই লাগতেছে কিনা?’
জর্মন প্রতিনিধি মেয়েদের চেয়েও বেশি ভক্ত হয়া গেল গোলাম রসুলের এবং জর্মনে নিজের বাড়ির পার্সোনাল ঠিকানাও তারে দিয়া গেল।
তিনজন মডেল মেয়ে সিনেমার ঢঙে আবার শিটি বাজাইতে লাগল আর গলা চড়াইয়া ‘ওয়াও ওয়াও’ বইলা এমন ভঙ্গি করতে লাগল যেন কোনো ডিশ চ্যানেলের প্রোগরাম চলতেছে।
সত্য-অসত্য মিশালা বইলা জর্মন প্রতিনিধিরে এয়ারপোর্ট তরি পৌঁছাইয়া দিতে খোদ বেগম সাহেবা তার স্পোর্টস মার্সিডিজ নিয়া গেলেন। গোলাম রসুলরে মডেলরাই সঙ্গে কইরা নিয়া গেল, পুরা পথজুইড়া তারা শুধু তারে ‘প্রিন্স’ বইলাই সম্বোধন করল। মডেল মেয়েদের নামায়া দিয়া যখন গোলাম রসুল ঘরে ফিরল তার দিলোদিমাগ দুইটাই তখন সপ্তম আকাশে। দেরতক সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াইয়া নানান পোজ দিয়া দিয়া গোলাপের ফুল নাকে শুঁংতে থাকল।
সেইদিনের পর থিকাই গোলাম রসুলের নাম হয়া গেল প্রিন্স। রাতে বেগম সাহেবা হাসতে হাসতে সকালবেলার সব ঘটনা দানিশ সাবরে শুনাইলেন আর বারবার গোলাম রসুলরে প্রিন্স বইলা সম্বোধন করলেন। এখন থিকা যখনই উনার কফি, ড্রাইফ্রুট বা কাহওয়ার দরকার হইত, তলব করতেন ‘প্রিন্স’ বইলা। মিসেস মেহতাব দানিশের একমাত্র ছেলে হাসান আবদাল শহরে পড়াশোনা করত, ফোনে তারেও জানানো হইল যে গোলাম রসুলরে এখন সবাই প্রিন্স সেলিম বইলা ডাকে। পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হইলে অবশ্যই জর্মন ফটোগ্রাফারের ও সেই ঘটনার জিকির করা হইত যেইখানে গোলাম রসুল মুঘল শেরওয়ানির বিজ্ঞাপনের জন্য কোনো জর্মন পত্রিকায় ছবি তুলাইছিল।
খুব বেশি সময় যায় নাই এরইমধ্যে গোলাম রসুল আরেক বিপদের মুখে পড়ল। বেগম সাহেবা এক কাজিনের ঢোলকে গেছিলেন। দানিশ সাহেব কোনো মিটিংয়ের জন্য ছিলেন ইসলামাবাদে। গোলাম রসুল ফ্রিজ থিকা নিজের পছন্দের খাবার বাইর কইরা মাইক্রোভেনে গরম করল। পেট ভইরা রোস্ট, কোরমা, কোফতা আর সিন্ধি পরোটা খাইয়া সে টিভির সামনে বসল। কিছুক্ষণ পশ্চিমা পপ মিউজিক শুইনা কালা আমেরিকানদের নাচ-গান তার যুতের লাগল না। সে জানত না, শাদা আমেরিকানরা কত চতুরভাবে কালা আমেরিকানদের তাদের সেরা জিন্দেগির শক্তিশালী প্রবাহ থিকা দূরে সরায়া রাখছে। খেলাধুলা আর গানবাজনায় কালা আমেরিকানরা বিনোদন জুগাইছে আর শাদা আমেরিকানরা সেইটারেই এমনভাবে তুইলা ধরছে, যে খ্যাতি পাইয়া কালা আমেরিকানরা এলেম, সাইন্স ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে পিছাইয়া পড়ার দুঃখটারেও ততখানি টের পাইতে পারে নাই।
চ্যানেল পাল্টাইতে পাল্টাইতে সে এমন এক নাচগানের অনুষ্ঠানে পৌঁছাইল, যেইখানে মেয়েছেলেরা দেখতে পুবদেশীয় হইলেও, গাননাচ উপমহাদেশীয় না; পোশাক পাশ্চাত্য আর নাচগান উন্মুক্ত কাম উদ্রেককারী।
এই গানের মধ্যে এমন একখান তাল লয় দুপ দুপ ছিল যে পয়লায় গোলাম রসুল সোফায় বইসাই দোল খাইতে লাগল, তারপর দাঁড়াইয়া নাচনেওয়ালাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ পা মিলাইল এবং শরীর ছাইড়া দিয়া কামনার উত্তেজনায় তড়পাইতে তড়পাইতে লাগল। ফলে কোনো উদিশই ছিল না তার, যে, কখন কোন দরজা দিয়া মিসেস মেহতাব দানিশ ভিতরে ঢুইকা পড়ছেন। যদিও র্যাপ গানের কথাগুলা হিন্দুস্তানিই ছিল কিন্তু রঙঢঙ ছিল পশ্চিমা; কাউবয়ের হুংকার, ডিস্কোর গোশশা আর কাম উত্তেজনার তীব্রতা সব মিলায়ে আবোহাওয়াই বিশেষ উস্কায়া দিছিল। গান খতম হইলে যখন সে একাই তালি বাজাইতে লাগল ঠিক তখন বেগম সাহেবাও পিছন থিকা তালি দিয়া উঠলেন।
‘আয়হাহ!’ এক মুহূর্তে সে আসমান থিকা জমিনে আইসা পড়ল।
‘না না… তুমি খুব ভালো নাচতেছিলা গোলাম রসুল। আমি তোমার শো-খানা আবার দেখতাম, কিন্তু আমার শরীর খুব খারাপ লাগতেছে। গায়ে কাঁপুনি ধরতেছে। আর এক পাও তুলতে পারতেছি না।’ বলতে বলতেই বেগম সাহেবা দাঁড়ানো থিকা ঢইলা পড়লেন।
প্রিন্স দৌড়ায়া গিয়া তারে ধরল। বেগম সাহেবার গায়ে তখন পাতলা অর্গানজার কাপড়, ভিতরে কেবল সিল্কের স্লিপ, আর কিছু না। এত ঠান্ডার মধ্যেও কোনো গরম কাপড় তার পরনে ছিল না।
‘হায় আমি মইরা যাব প্রিন্স… সাহেবরে ফোন করো, ডাক্তার ডাকো। তাড়াতাড়ি গোলাম রসুল, আমি মইরা যাইতেছি…’
আবারও উনি গোলাম রসুলের বাহুতে ঢইলা পড়লেন। তার দাঁত ঠনঠনাইতে লাগল। যথাসম্ভব উনার ঢোলকের বাড়িতেই ঠান্ডা লাগছিল আর দেরতক নাচতে থাকায় স্টেমিনা ফুরায়া গেছিল। এমনিতেই উনি মেয়েছেলেদের মতন পাতলা-নরম গড়ন মানুশ।
ভীষণ আদবের সহিত গোলাম রসুল তারে তুইলা মাস্টার বেডরুমে নিয়া গেল। বিছানায় শুয়াইয়া দিলো, পায়ের খড়ম খুইলা দিলো, হিটার জ্বালাইয়া কম্বল চাপা দিলো। উনি বেহুশ ছিলেন না অন্য জগতেই ছিলেন—দুই হাতে গোলাম রসুলের হাত ধইরা বললেন—‘আমার পার্স থেকে ডায়েরিটা বের করে ডা. আব্বাসরে ফোন করো। উনি যেন সঙ্গে সঙ্গে আসে।’
ডাক্তাররে ফোন করার পর সে ইসলামাবাদের হোটেলে দানিশ সাবরে ফোন করল। উনি বাইরে ছিলেন। হাসান আবদালরে ফোন লাগল না।
এদিকে মিসেস মেহতাব কান্নায় ভাইঙা পড়লেন। উচা উচা দীর্ঘশ্বাসে, আহাজারি করতে করতে, হেঁচকি তুইলা বলতে লাগলেন, ‘সবারই নিজের পইড়া আছে। কারও আমার খবর নাই। দানিশের নিজের মিটিংয়েরই ফিকির বেশি। ওই হারামজাদা ছেলেটারে কত কষ্ট কইরা মানুশ করলাম—মা মরুক আর বাঁচুক ওর কী? মওজ লুটো, মস্তি করো। আমি কাম করতে করতে শেষ হয়া গেলাম, মইরা গেলাম, কার কী আসে যায়! আল্লাহ করুক দানিশ মইরা যাক… গাধাটারে কখনো সময়মতো পাশে পাইলাম না।’
কাঁনতে কাঁনতে কখনো হঠাৎ বইলা উঠতেছিলেন, ‘আমি জানি, একটু চোখ লাগলেই তুমি কোয়ার্টারে পালাইবা। তোমাদের মতন লুটেরাদের আমার চিনা আছে।’
গোলাম রসুল বারবার তারে আশ্বস্ত করতেছিল যে, সে পালানোর মতো লোক নয়। আর এই আশ্বস্ত করতেই করতেই, প্রিন্স নিজের অওকাত যেন ভুইলা গেছিল।
*
ঘাশের কড়া ধুমা তার বুক আর গলায় আগুন ধরাইয়া দিছিল। তার গায়ে শুধু একটাই কুর্তা, সেইটারও বারোটা বাইজা গেছিল। গোলাম রসুল এত এত মার খাইছিল, এতগুলা কিলঘুষি চড়থাপ্পর লাথি দিয়া তার মেহমান নাওয়াজি হইছিল, যে তার চোখে এখন সবকিছুই ডাবল ডাবল দেখাইতেছিল।
‘না না, থানাদার সাব, বেগম সাহেবার কোনো দোষ নাই। উনি তো আমারে ইজ্জত দিছেন। আমারে প্রিন্স বুলাইতেন। আমি নিজেই নিজের অওকাত ভুইলা গেছিলাম। মানুশের এই একটাই রোগ স্যার—ক্ষমতা পাইলে সে ভুইলা যায় সে কে। আমিও ভুইলা গেছিলাম গোলাম রসুলরে—সত্যই নিজেরে প্রিন্স ভাবতে শুরু করছিলাম। মাইরি, সুলতান সবুক্তগিনও তার পুরানা পশমি জামা বাইর কইরা দেখতেন, না দেখলে উনিও ভুইলা যাইতেন সমস্ত। প্রফেসর সাহেব ভালো মানুশ ছিলেন স্যার, আমিই তখন বেকাবু হইয়া গেছিলাম; আমার কী নেওয়ার ছিল গণতন্ত্র থিকা? আমার কী পাওয়ার ছিল সাম্যের থিকা? হুদাই, এক ছিপি খাইয়াই মানুশ খুব বেশি মাতাল হইয়া যায়। স্যার, আমিও গোলাম রসুলরে ভুইলা গেছিলাম…’
‘আমাদের ধমকাছ, আমাদের শিখাছ! এরে ভালো কইরা বানান দাও। তবিয়ত সাফ কইরা ফেলো!’
এইবার তারে এমনভাবেই ‘সাফ’ করা হইল, যে দোবারা নিজের সাফাই গাওয়ার সুযোগই তার রইল না।
গোলাম রসুল নিজের দোষ মাইনা নিয়া, চিরদিনের মতন চুপ হইয়া গেল।
দারুণ তো। বানু কুদসিয়ার ভক্ত হয়ে গেলাম এক গল্পেই।
অনুবাদও বেশ ছিলো। অনুবাদের এই ধাঁচ সব গল্পের সাথে যাবে না ঠিকই— কিন্তু এই গল্পে পুরোই হিট!