একটি ধোঁয়াগ্রস্ত নগর

এনাম মুরতাজা

এটা একটা লম্বালম্বি ভূমি। সাতাশ আটাশ বর্গকিলোমিটার হতে পারে। এর ভিতরে গ্রাম, নগর, নদী, খাল, মরুভূমি, শিল্পকারখানা, বানিজ্যিক প্রকল্প সবই পাওয়া যায়। এলাকাটার যে প্রান্তে আমরা জন্মাইছি সেটা অনেক সবুজ ছিলো। নির্মল বাতাসে ন্যাংটা থেকে কাপড় পড়া শিখেছি। শৈশবের একটা গল্প না বললেই নয়, দাঁতুলা কাজী আহ। মানে ওর সামনের দুটা দাঁত ঠোঁটের উপর দিয়ে বাহির হয়ে থাকতো। আমাদের বাড়িঘর থেকে অনেক দূরে এলাকার অন্যপ্রান্তে ধোঁয়া উড়তে দেখা যেতো। আমরা ওই দিকটায় ভয়ে ভয়ে তেমন ভিড়তাম না। তো কাজীরে একদিন ধোঁয়া ওড়া বিল্ডিংগুলার দিকে নিয়ে গেলাম আমরা। ওই একবারই আমরা ওদিকে গেছিলাম। একটা বিল্ডিং থেকে মোটা পাইপ দিয়ে ধোঁয়ার হলকা বাহির হচ্ছিলো, আমরা কাজীরে টাইনা ওটার কাছে নিয়ে গেলাম। যেতে ছেঁচড়ামি করতেছিলো। আমরা ধরে উলঙ্গ করে দিলাম হালারে। কার কাছে জানি ভাঙারি বাটন ফোন ছিলো একটা, ওটা দিয়ে ধোঁয়ার তাপের সামনে ওর উহ-আহ লাফালাফির ভিডিও তুলে ফেলি আমরা। হালায় এরপর যখনই আমাদের সাথে তিড়িং বিড়িং করতে চাইতো, ভিডিওর কথা ওরে স্মরণ করিয়ে দিতাম। ছেলেটা এরপর থেকে কাছিমের খোলসে মাথা ঢুকিয়ে রাখার মতো শান্তশিষ্ট হয়ে যায়।

যাক, এরপর আমরা যে যার মতো বড় হয়ে গেলাম। ভূমিটার অন্য প্রান্তে কালো ধোঁয়ার পরিধি বেড়ে যায়। এলাকার সবুজ অংশের দিকে ধোঁয়াগুলো একটু একটু এগিয়ে আসতে লাগে। সবুজ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু দূরের কালো ধোঁয়ার ঘনীভূত হওয়া দেখি। সেগুলি ঘন কৃষ হয়, উপর নিচে অদ্ভুতভাবে ছোটাছুটি করে, ডান থেকে বাঁ দিকে এবং বাঁ দিক থেকে ডান দিকে পাইপ ফুঁড়ে ফুঁড়ে ধোঁয়ার বিচ্ছুরণ বের হয়। একাধিক দিক থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসা ধোঁয়াগুলি পরস্পর বাড়ি খেয়ে কুণ্ডলী পাকায়। দূর থেকে এটা খালেস কৃষ্ণগহ্বরের মতো দেখায়।

আমরা বালেগ হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম আমরা ধোঁয়া-গহ্বরের দিকে আকর্ষণ বোধ করি। আমাদের কদম অটোমেটিক সেদিকে এগিয়ে যায়। ওদিকে যাওয়াটা ভয়ের চেয়ে লজ্জা পাওয়ার ব্যাপার ছিলো বেশি। আমরা ওইদিকে যাওয়ার জন্যে আমাদের বাবা মা আত্মীয়স্বজন চাচামামাদের কাছে বিভিন্ন কৈফিয়তও দিলাম। যেমন ধোঁয়ার তাপে ধেয়ে আসা বাতাস লেগে আমাদের ঘরবাড়ির দেয়াল কালো হয়ে আসছে, গরম বেড়ে যাচ্ছে, ফাঁপর লেগে আসছে, সবুজ ঘাসগুলা মরে যাচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু তারা মুখের উপর এমন সব জবাব দিয়ে দিলো, লজ্জায় আমরা মাথানত করে ফেললাম। একদিন আমাদের উপর ইলহাম হলো যে, ধোঁয়া-গহ্বরই তোমাদের কর্মক্ষেত্র হওয়া উচিত। এটাই একমাত্র গতিপথ ও গন্তব্য।

আত্মীয়দের যেনো-তেনো একটা ঘোড়া বুঝ দিয়ে ঠিকই একদিন আমরা বেরিয়ে গেলাম। আমাদের শরীরের রগে রগে তীব্র ছটফটানি অনুভব হচ্ছিলো ধোঁয়া-এলাকায় যেতে। আমরা রাস্তায় গিয়ে দু ধরনের বাহন পেলাম, মেষ আর উট৷ শয়ে শয়ে মেষ একটার পিছনে আরেকটা জোড়া লাগিয়ে মেষ গাড়ি তৈরি হয়। মেষ গাড়ি চলার জন্যে দীর্ঘ রাস্তাজুড়ে রাবারের সরু দুটা লাইন বসানো হয়েছে জমিনের সাথে। আমরা জিজ্ঞাস করলাম এটা কেন করা হলো। আমাদেরকে অভিজ্ঞরা বললো, একটু দূরে গিয়ে যখন ধোঁয়ার মরুভূমিতে পড়বেন তখন পুচপুচে নরম জমিন পাবেন। সেখানে মেষ জরুরি ভিত্তিতে দেবে যাবে, তাই বিশেষ ধরনের এই মজবুত রাবারের পথ নির্মাণ করা হয়েছে। এটার উপর দিয়ে স্মুথলি মেষ পার হয়ে যেতে পারে। আমরা বললাম, অ। আর উটের ব্যবহার আমরা আগ থেকেই জানি। দশ মিটার লম্বা গাড়িটায় চল্লিশজন যাত্রী অনায়াসে বসতে পারে। উটে চড়লে যাত্রীদের বেশি নড়াচড়া করা থেকে বেঁচে থাকতে হয় নাইলে যেকোনো সময় এটা এক্সিডেন্ট করতে পারে৷

আমরা উটে চড়েছি। পূর্বে বর্ণিত সেই বিকট মরুটা পার হচ্ছি এখন। এটা ছাব্বিশ বর্গকিলো ভূমিটার মাঝামাঝি একটা জায়গা। আমার সিট জানলার পাশেই। লক্ষ করলাম পুরা প্রকৃতিটাই এখানে হলুদ রঙে ছাওয়া। বাইরের গাছ মানুষ, পাহাড়, আকাশ, গিরি সবই হলুদ। আর মাটি একেবারে কালো কুচকুচে, মানুশের সিদ্ধ বা পোড়া চামড়ার মতো অনেকটা৷ রাস্তা, ঘাট, পথপ্রান্তর আর মাঠে পোড়া পোড়া চামড়া বিছানো আছে। কোথাও কোথাও দেখলাম চামড়ার একাধিক স্তর দিয়ে মাটিতে ঢিবি হয়ে গেছে। জানলার কাচে মাঝেমধ্যে ধোঁয়ার শেল এসে বাড়ি খাচ্ছে। আকাশে হলুদ একপ্রকার পাখিও উড়তেছে, সেগুলা মুখ থেকে মার্বেলের মতো হলুদ কি সব ছু্ঁড়ে ফেলতেছে। উটের ছাদে সেগুলা বাড়ি খেয়ে টুংটাং আওয়াজ হচ্ছে। মার্বেলগুলা বাতাসে ভাসতে ভাসতে গাঢ় ধোঁয়াটে পদার্থের রূপ নিচ্ছে, মার্বেল ছোঁড়া শেষ হলে পাখিগুলাও কালো রঙ ধারণ করতেছে, তাদের গা থেকে ধোঁয়া গলে গলে বের হচ্ছে। পুরা ব্যাপারটায় আমরা আতঙ্কিত।

সিটের ধারে জানলা সব লাগানো। আমার বন্ধু হারেক জানলা লাগাতে দেরি করলো। ফলে ও শুধু একটা ধোঁয়ার শেলের আঘাত খেলো৷ যাত্রীদের মাঝখানে ও উত্তেজিত রূপে হাঁটতে লাগলো। অস্থির হয়ে একবার গাড়ির পিছনে আরেকবার সামনে হাঁটতে লাগলো। ওর গা থেকে গরম ভাপ বের হচ্ছে। মাংসের গন্ধযুক্ত ধোঁয়া উড়তেছে ওর মাথার উপর দিয়ে। ওর শরীর ধীরে ধীরে সিদ্ধ হয়ে আসতেছে। সে তার আসন গ্রহণ করলো। ঠিক সে সময়ে ওর চামড়াগুলা গলে পায়ের নিচ দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলো। ওর হাত পা মুখের চামড়াহীন দগদগে মাংসগুলা দেখে আমরা ভয় পেতে লাগলাম। ওর শরীরের আঁচে ওর পাশে বসা লোকগুলাও ঝলসে যাচ্ছে। ওর পাশ থেকে লোকগুলা সরে এসে আমাদের দিকে গাদাগাদি করতে লাগলো। ওদের গা থেকে ঝলসানো উত্তাপ আমাদের গায়েও ট্রান্সফার হতে লাগলো। আমরা এই লোকগুলির সাথে ক্যাওয়াজ শুরু করে দিলাম এবং অনেক ভয়ও পেলাম। পরক্ষণেই আমরা লক্ষ করলাম যে হারেকের গায়ে নতুন চামড়া গজিয়েছে। লোকগুলা আশ্বস্ত হয়ে তার কাছাকাছি গেলো। ওরা ভয় কিছুটা কাটিয়ে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলো। কিছু কৌতূহলী পোলা ঘুমালো না। ওরা ঘুমন্ত হারেকের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওদের বিস্ময় কাটতেছে না। ওরা জীবের বিবর্তন বিষয়ক তর্কাতর্কি জুড়িয়ে দিলো, ওদের গুনগুন আওয়াজের তরঙ্গ আমার দিকে ভেসে আসছে। এরই মাঝে তর্ক করা পোলাগুলি দেখলো হারেকের গা থেকে আবারও ধোঁয়া উড়তেছে। আস্তে আস্তে চামড়াও সিদ্ধ হচ্ছে। একটা পর্যায়ে টুপ করে চামড়াটা খসে পায়ের নিচ দিয়ে গলে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। পোলাগুলি সেখান থেকে ছিটকে সরে গেলো।

হারেকের গায়ে নতুন চামড়া লাগে আর খানিকবাদে সেটা থেকে ধোঁয়া ওড়ে। এবং চামড়া খসে পড়ে। এভাবে বারবার ঘটে। হারেকের ব্যাপারটা যখন পুরাপুরি আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হলো, আমাদের চামড়া থেকেও ধোঁয়া উড়তে ও চামড়া খসতে লাগলো। চামড়া উত্তপ্ত হওয়া আর খসতে থাকার আবর্তনে আমরা এক মায়াগ্রস্ত হলাম। মোলায়েম উষ্ণ এক ঘোর আমাদের ছেয়ে ধরলো। দগ্ধতা আর পীড়ন আর সিটের ঝাঁকুনির মাঝে নারীজাতীয় সুখের মতো এটা। আচ্ছন্ন চোখে আমরা জীবনের দূরবর্তী অথচ সবচে নিকটতর অবয়বের অপ্সরীর সাথে সঙ্গম করলাম। আত্মার চেয়েও আপন আঁকারের স্তন, পেট, যোনী বা কাঁধ আমরা নেড়েচেড়ে দেখলাম কল্পনার অনেক দূরবর্তী অচেনা গিরিগুহায়।

উট আমাদেরকে নামিয়ে দিলো। সাতাশ কিলো নগরের ধোঁয়া-গহ্বরে আমরা পৌঁছে গেলাম, আমাদের এতদিনের স্বপ্নিত স্থান। বাতাসে শুধু ধোঁয়া আর হলদে রঙ। সড়কের ব্যস্ততা, যানবাহনের হুড়ুমদুড়ুম শব্দে আমরা খানিকক্ষণ বিস্ময়ে আবৃত থাকলাম। সন্ধ্যা নামলো। আমরা চায়ের দোকানের নিচে দাঁড়িয়ে নতুন জায়গার শব্দগুলা তন্ময়ে শুনলাম। কোথায় যাব এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে থাকলাম। যেহেতু আমাদের প্রকল্পের পথঘাট সম্পর্কে অত বিস্তারিত বলা হয় নাই, আমরা সড়কের বিভিন্ন গলিঘুপচির মুখগুলা গুনে নিলাম। এরপর জড়ো হয়ে ঠিক করলাম কোন গলি দিয়ে আগানো উচিত। আমাদেরকে বহন করার জন্যে বিভিন্ন ঘোড়া ও গাধা ডাকাডাকি করতেছে। প্যা পো হর্ণ বেজে চলতেছে। আমরা উদ্ভ্রান্তের মতো একটা গাধায় চড়ে বসলাম। সার সার গাধা পিলপিল করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখলাম কিছু গাধার পিছনে নায়ক নায়িকার অন্তরঙ্গ পোস্টার লাগানো, পোস্টারের উপরে ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা অথবা লেখা ‘মায়ের দোয়া’। রাস্তায় প্যা পো আওয়াজের সাথে আজানের ধ্বনি মিলিত হচ্ছে। গাধা চালকেরা বিভিন্ন গাধার পিছনে নায়িকাদের স্তনের ছবি দেখে পেশিতে তীব্র বল পাচ্ছে এবং তীব্র গতিতে গাধা হাঁকিয়ে নিচ্ছে। এগুলো দেখে তাদের মধ্যে একটা নেশা কাজ করতেছে, এবং ঘোরের মধ্যে প্রজন্মরে আগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হুড়মুড় করে।

গাধা আমাদের নামিয়ে দিলো। বললো আর যাওয়ার অনুমতি নাই। কিছুক্ষণ হাঁটুন, সামনে ঘোড়া পেয়ে যাবেন। আমরা নগরের প্রাচীর ধরে হাঁটতেছি। কালো, উঁচা আর দুর্ভেদ্য দেওয়াল। নগরের ওপারে কি থাকতে পারে, বা ওপারে আমাদের নগরের মতো আরও নগর আছে কিনা কল্পনা করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের বাপ দাদারাও কখনও সাতাশ কিলো নগরের বাইরে বের হতে পারে নাই। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা নির্জন জায়গা দেখলাম, হারেক হালায় রশি ধরে মজবুত দেয়ালটা টপকাতে চেষ্টা করলো। তখনই বিভিন্ন দিক থেকে ধোঁয়ার বড় বড় গোলা ধেঁয়ে আসলো ওর দিকে। ধোঁয়ার জ্বালায় ছটফট করতে করতে রশি ছিঁড়ে পড়ে গেলো। তার হাঁড়গোড় থেতলে গেলো, আমরা তার চিকিৎসা করার ব্যাপারে পেরেশান হলাম। নতুন জায়গায় কিছুই জানি না। আমরা তারে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম বিধ্বস্ত অবস্থায়। ধোঁয়ার শেল ঘন ঘন আঘাত করতেছে আর ঘন ঘন আমাদের চামড়া খসে পড়তেছে। হারেক ব্যথায় উহ আহ করতেছে।

আমরা একটা পরিত্যক্ত কাঠের এলাকা পেলাম। মোটা মোটা পুরানা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে ছিটিবিটি হয়ে। দূরে কাঠের একটা খুপরি দেখলাম, টিমটিম আলো জ্বলতেছে। কাঠের ঘরটার বারান্দায় হারেকরে কোনোরকম তুললাম। এক বুড়া যে মাত্র চা তুলে দিয়েছিলো সে হারেকরে একরকম হাতুড়ি চিকিৎসা দিতে চেষ্টা করলো। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে সেটা ব্যবহার করলো ভাঙা হাড়গুলোতে। বৃদ্ধ একটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছে। ধ্যান করতে করতে তার চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। জ্বলন্ত আগুনের দিকে চেয়ে ভাবতেছে বেহেশতের কথা বা দোজখের কথা। বৃদ্ধ সাউন্ড বক্সের সাথে বাটন মোবাইলের সংযোগ করে গান বাজাচ্ছে। সবগুলা মেয়ে কণ্ঠের গান। বৃদ্ধ চিন্তার ঝিমুনি থেকে হঠাৎ চিক্কুর দিয়ে উঠলো এবং কাঁদতে লাগলো এবং একটা হেঁচকি দিলো। এরপরে মোবাইলের প্লে লিস্টের গান চেইঞ্জ করলো :

আমি ফুলবাগিচার কলি এসো মনের কথা বলি/

আমি রূপনগরের রানী ওই দিলের কথা জানি /

আমরা কাঠের চেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে জিরিয়ে নিচ্ছি। আকাশে ধোঁয়া আর হলুদ রঙের মিক্সড দেখতেছি। আমরা বুঝতে পারতেছি আমাদের শরীরে একটা খারাপ রসায়ন ঘটে গেছে। চামড়া নতুম গজায় কিন্তু চামড়ার নিচের মাংসগুলায় বিভিন্ন গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। জখমগুলা আমাদের অনবরত খুচিয়ে যাচ্ছে। ব্যথার নেশায় আমাদের কল্পনা গতিশীল হচ্ছে। আমরা চোখে আমাদের ছবি দেখতেছি। আমরা দেখতেছি আমাদের দুটা করে ছবি সামনে ছোটাছুটি করতেছে। একটা ছবি চুল পাকা বয়সের, আরেকটা ছবি ন্যাংটা বয়সের। আমরা অনুভব করতেছি আমাদের মাঝের বয়সটা হাইড হয়ে গেছে। আমরা অশরীরী হয়ে চেয়ারে শুয়ে আছি। আমাদের বৃদ্ধকালীন কাঠামো আর ন্যাংটা কালের কাঠামো দুটি জীবনের চলচ্চিত্র উপস্থাপন করতেছে। আমরা ব্যাপারটা ভেবে কুল পাচ্ছি না যে মাঝখান দিয়ে আমাদের জীবন্ত তারুণ্য কীভাবে মুছে যেতে পারে! যৌবনের অস্তিত্ব নাই কিন্তু শৈশব ও বার্ধক্য ঠিকই অস্তিত্ব পেলো, এটা কীভাবে ঘটলো।

আমরা চেয়ারে আধশোয়া হয়ে থাকলাম। চামড়ার তলের খচখচানিতে আমাদের অনুভূতি আমুদে হয়ে উঠলো। চোখ ঢুলতে লাগলো। পুরানা কাঠের তক্তা আর গাছের গুড়িগুলা দূর থেকে লম্বা লম্বা ছায়া ফেলতেছে। আমরা ছায়ার আলো-আঁধার পটভূমিতে অনেকগুলি মাইয়ার পদচারণা দেখলাম। আমার পরিচিত অনেক মাইয়ারেই আমি দেখতে পেলাম। চামড়ার নিচের যন্ত্রণাগুলা উন্মাদ হলো। আমরা মাইয়াগুলার গলা জড়িয়ে গাছের গুড়ির চিপাগুলিতে নিয়ে সঙ্গম শুরু করলাম। আমাদের একটা ব্যাপার উপলব্ধ হলো যে মাইয়াগুলির সাথে অন্তরঙ্গতার চরম মুহূর্তে পৃথিবীরে অন্ধকার দেখতে পাই, আমাদের মাথায় তখন মেধা ও জ্ঞানরে শূন্য পাই, এগুলি যেন মাথার এক অন্ধকার গহ্বরে নিষিক্ত ও অবশ হয়ে যায়। অন্তরঙ্গতার তীব্র অন্ধকারের মধ্যে আমরা দেখতেছি শুধু মাইয়াগুলি আলো চমকাচ্ছে। ওদের চামড়া থেকে আলো ফেটে বের হয়ে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ওদের সত্তায় বিলুপ্ত করে ফেলতেছে। আমি খানসা ও শেফা দুজন মেয়ের সাথে পরপর সঙ্গম করলাম। এব্যাপারে নিজেরে খুব অপরিপক্ক মনে হলো। খানসা ফরশা ও মোটা টাইপের মাইয়া। স্তন অতিরিক্ত ঝুলে থাকে আর এপাশ ওপাশ এলিয়ে যায়। মাংস নরম, তাই মাংসের ভিতর প্রবেশ করে অতিরিক্ত উষ্ণতা অনুভব করলাম। এই গভীরতায় আমি দ্রুত গলে যেতে বাধ্য হলাম। কিন্তু শেফা পাতলা ও সুঠাম টাইপের মেয়ে। স্তনগুলা কবুতরের বাচ্চার মতো ছোট ও উষ্ণ। গমের মতো রঙের মাইয়াটা দীর্ঘক্ষণ গায়ের সাথে লেপ্টে থাকলো। তারে একটা দ্রতগামী চাল-ভাঙা কলের মতো লাগলো। যন্ত্রটা ফেলে রাখা গাছের কাণ্ডে ঠেস দিয়ে বসে ছিলো, ওর কোমর আর কাঠে বাড়ি খেয়ে ঠক ঠক শব্দ হচ্ছিলো। যন্ত্রটা অতৃপ্তি নিয়ে আমার উপরে উঠে বসলো। নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে আমারে গাছের কাণ্ডের সাথে ঠেলতেই থাকলো। আমার কোমরে কাঠের খোচা বিঁধে গেলো অনেকগুলা। আমি যন্ত্রণায় ও মানবীয় তরলের শূন্যতায় ভীষণ ককিয়ে উঠলাম। সেই মুহূর্তে আমি দেখলাম আমার চুল-পাকা ছবিটা ধিং ধিং নাচেতেছে আর খিলখিল হাসতেছে, এবং হাতের বইটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে শেফার ন্যাংটা গায়ে ফেলতেছে। আমার বৃদ্ধ কায়াটার মাথা থেকে চুল ঝরে যাচ্ছে, ঝরন্ত চুলগুলা কেমন তরল টাইপের। মনে হচ্ছে চকচকে বীর্য মাথা থেকে ঝরে যাচ্ছে।

আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম যে সঙ্গম না করেও বৃদ্ধ কায়া থেকে বীর্য ঝরতেছে আবার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ছু্ড়ে ফেলতেছে! গাছের একটা কাণ্ডে একলা বসে আছি, আমার ভীষণ ক্লান্তিবোধ হলো। অন্য সঙ্গীরা এখনও মাইয়াদের লাগিয়ে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত কাঠের তক্তাগুলার বিভিন্ন আড়াল থেকে ঠকঠক, খটখট আওয়াজ ছুটে আসতেছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম যদি কাঠের খুপরিতে বসে থাকা বৃদ্ধ খেপে যায়। এমন বিপন্ন অবস্থায় চেয়ারে আধশোয়া আমার আচ্ছন্নতা কেটে গেলো। চমকে উঠে বৃদ্ধের শিয়রে গিয়ে বসলাম। আশ্চর্য, অন্য সঙ্গীদের এখানে দেখতেছি না। বৃদ্ধরে বললাম, আমার বৃদ্ধ কায়ার মাথা থেকে বীর্য ঝরে পড়লো, এটা কেন হলো? বৃদ্ধ বললো, একটা সময়ে আমিও নিজেরে খুব পূর্ণ মনে করতাম। পরে বুঝলাম মানুষ হিশাবে পূর্ণ কেবল নবীই হতে পারে। আমি বললাম, তোমার ঠিক কখন থেকে এটা মনে হতে লাগলো। সে বললো, আমরা এলাকার কিছু বিদ্বান যুবক মাঝেমধ্যেই আড্ডা দিতাম। আমরা মানুষের কুপ্রথা, অন্যায়, শিরক, বিদাত বিষয়ক তর্কাতর্কি করতাম। চা টানতে টানতে আঙুল উঁচিয়ে আমাদের দাবির পক্ষে বড় বড় চিন্তক ও দার্শনিকের কথা উল্লেখ করতাম। কিছুদিন যাওয়ার পর আমরা নিজেদের মধ্যে একটা ব্যাপার মিল দেখলাম যে আমরা রসহীন লোক। গম্ভীরতারে আমরা জ্ঞানের পোশাক ভাবতে ভালো পাই। আমাদের ভিতর রোমান্টিকতা জাগলে আমরা সেটা প্রকাশও করি না। লোকেরা ভাবতো আমরাও কি ওগলা করতে পারি!? তাই আমরা লোকদের বলতামও না যে অমুক মাইয়া আমার ভালো লেগেছে। আমরা তখন বুঝলাম আমরা সাহসী নই। … আমরা প্রত্যেকেই নির্জনে অনেক খারাপ চিন্তা করতাম। কল্পনায় বিভিন্ন মাইয়ারে লাগাতাম।… আমরা এই ভয় ও দ্বিধারে নির্লজ্জভাবে প্রশ্রয় দিয়েই গেলাম। একটা পর্যায়ে আমাদের মনে হলো যে খোদা আমাদেরকে শুধু শৈশব ও বার্ধক্য দিছেন। আমাদের যৌবনটা অজানা কারণে উজুদ থেকে হাইড হয়ে গেছে। এভাবে কল্পনায় মাইয়াদের লাগাতে লাগাতে আমরা আসক্ত হয়ে পড়লাম। আড্ডায় বসে মানুষদের অন্য অন্যায়গুলা নিয়ে আলাপ করা কমিয়ে দিলাম। রোমান্টিকতার ব্যাপারে মানুষ কেন আমাদের দূর দূর ভাবে আমরা সেটাতে ফোকাস করতে চাইলাম। এই প্রকল্পের অংশ হিশাবে আমরা বিভিন্ন এলাকার সমবয়সী মাইয়াদের সাথে বসে আলাপ করলাম, বাজারের জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আমরা লোকদের দীর্ঘ বয়ান দিলাম। আমরা কণ্ঠ খুব জ্বালাময়ী করলাম। কিন্তু মেয়েরা ও লোকেরা আমাদের কথা খুব একটা কানেক্ট করতে পারলো না। তারা বললো, ‘আমরা তোমাদের বেশিরভাগ কথা বুঝতে পারি না, আমরা তোমাদেরকে আমাদের মাঝে দুর্বল পাই।’ সবকিছু থেকে নিরাশ হয়ে আমরা নতুন করে ভাবতে শুরু করলাম। আমরা এই ফলাফলে আসলাম, আসলে আমাদের এর আগের কথাগুলাও লোকেরা কানেক্ট করতে পারে নাই। আমরা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়াই সেখানে আমাদের ছোট ছোট স্বার্থ আছে বলে। এটা জাগতিক স্বার্থ নয়, মানুষদের খোঁচাতে গেলে আমাদের এমনি একটা মানসিক প্রশান্তি অনুভব হয় আরকি। মানুষরা যদি ন্যায়ের উপর আমল করতে রাজিও হয়, সেখানে তারাও আগে নিজেদের স্বার্থটা দেখবে। আমাদের স্বার্থ ক্ষুদ্র, মানুষদের স্বার্থ ক্ষুদ্র। স্বার্থ ছাড়া কোনো সংগ্রাম ও স্বাধীনতার জন্ম দিতে পারে না মানুষ। আল্লার কিরা, এর ব্যতিক্রম ঘটানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

বৃদ্ধ বললো, আমরা দেখলাম আপন চরিত্র থেকে বাহির হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা শুধু আমাদের চরিত্রের সীমানায় দাঁড়িয়েই চিন্তা করি। আমরা নিজেদের চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীতে ন্যায় কায়েম করতে চেয়েছি। আমরা যদি অন্যদের চরিত্রে দাঁড়িয়ে হক প্রতিষ্ঠা করতে যাই তবুও সেটা ত্রুটিপূর্ণ হবে। এখানেও সমস্ত চরিত্র ধারণ করে চিন্তা করতে না পারার দুর্বলতা রয়েছে। আল্লার কিরা, মানুষের পক্ষে এর ব্যতিক্রমভাবে চিন্তা করা সম্ভব নয়। একই মুহূর্তে মানুষের সমগ্র চরিত্র ধারণ করতে পারা পয়গম্বরের পক্ষেই কেবল সম্ভব; সেদিন থেকেই কথাটা আমরা একিন করে নিলাম। আমি বললাম, তুমি এখানে কেন? বৃদ্ধ বললো, পয়গম্বরই পূর্ণরূপে চিন্তা করতে পারে এবং যেসব লোকরে পয়গম্বরিয়তের রশ্মি দেয়া হয়েছে তারাই মানবীয় চরিত্রের যাবতীয় দিক পূর্ণরূপে ধারণ করতে পারে, এটা যখন আমরা আবিষ্কার করলাম, আমরা মানুষদের শুদ্ধ করার প্রকল্প ত্যাগ করলাম। আমরা আপন চরিত্রে নিমজ্জিত হলাম, শুধু বইপত্র পাঠ আর কল্পনায় মাইয়াদের লাগাতে লাগাতে কিছুদিন পার করলাম। আমাদের চুলে কিছু কিছু পাকন ধরলো। একদিন আমি ঘুরতে ঘুরতে পরিত্যক্ত এই কাঠের মিল পাহারা দেয়ার দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। মাসে মাসে একবার এখানে বড় ট্রাক আসে। আমি তদারকি করে ঘুন-ধরা কাঠগুলা ট্রাকে উঠিয়ে দেই। আমাদের এখানটায় ঝুরঝুরে কাঠের মূল্য খুব বেশি, এগুলি শক্তিশালী ধোঁয়া উৎপাদনে খুব কার্যকর।

 

***

 

আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় ঘোড়া পাওয়ার কোনো আশা নাই৷ হারেকের অবস্থা বেগতিক। একজন সঙ্গী দিয়ে তারে আমরা বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম সুচিকিৎসার জন্যে। আমরা ভীষণ ক্লান্ত, চোখমুখে ধোঁয়ার কালির মোটা আস্তর। আমরা ভোর রাতে উদ্দিষ্ট  প্রকল্পে পৌঁছে গেলাম। সুরম্য শাদা এক বিল্ডিং। জায়গাটা একটু মনোরম, ধোঁয়া লেপ্টা কিছু ঘাস, গুল্ম, ক্ষেত ও গাছ দিয়ে বেষ্টিত জায়গাটা৷ আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বিশেষ করে আমাদের মধ্যে এই ভয়টা কাজ করলো যে আমাদের দেহের উদগ্র যৌনতার দাগ নিয়ে কর্মকর্তাদের মুখামুখি হওয়া খুবই অপবিত্র কাজ হবে। আমরা কিছুক্ষণ পরেই প্রকল্পের নেতাদের কাছে ইন্টারভিউ দিব। আমরা দুরু দুরু বুকে নেতাদের কামরায় প্রবেশ করলাম। খুব গম্ভীর হয়ে তারা বসে আছে। আমাদের সামনে জটিল সব বই খুলে দেয়া হলো, সেখান থেকে পড়ে পড়ে কথাগুলো ব্যাখ্যা করতে বলা হলো। ব্যাখ্যা অবশ্যই লেখক যেটা বুঝাইছেন সেটা হতে হবে, অথবা যে ব্যাখ্যাটা উপবিষ্ট কর্তাদের কাছে প্রচলিত সেটা হতে হবে। যার যার বোধ অনুপাতে আমরা ব্যাখ্যা করলাম, আমাদেরকে বলা হলো এটা তো অমুক শায়েখ ভুল প্রমাণ করেছেন, উনার নতুন ব্যাখ্যাটা বিশুদ্ধ। আমরা পরীক্ষকদের তখন বলতে চাইলাম, আপনারা সবাই তো লেখকের কয়েক শো বছর পর জন্ম নিছেন, লেখক ঠিক কোন ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য করেছেন সেটা নিয়ে এযুগে এত মাথা ঘামানোর কী আছে? আমরা একটা ব্যাপারকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখার অবকাশ রাখতে চাই। আমরা বরখাস্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে এগুলি বললাম না।

নগরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার যুবক এসেছে প্রকল্পের সদস্য হতে। এর মধ্যে আমরা শ খানেক পোলা ফরম পাইলাম। কয়েক পৃষ্ঠা যাবৎ ফরমের ফাকা ঘর পূরণ করলাম আমরা। এতে আমাদেরকে বিগত জীবনের ডিটেইলস লেখতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আমরা মানুষ হিশাবে উগ্র কিনা, আমরা বড়দের গুরু হিশাবে মানি কিনা এগুলো জানতে চাওয়া হলো। আমরা বুঝে উঠতে পারলাম না, প্রকল্পের এই নিবন্ধনে আমাদের যৌনজীবনের কথা উল্লেখ করবো কিনা, অথবা আমাদের খারাপ দিকগুলার প্রতি প্রকল্পের এত আগ্রহ বোধ হচ্ছে কেন! এটাও জানতে চাওয়া হলো প্রজেক্ট সম্পন্ন করে আমরা ইলমের কোন লাইনে কাজ করতে আগ্রহী। এটা দেখে আমাদের খুব রাগ হলো। আমরা এই ঘরটায় লিখলাম, আমরা ভাষা-শিল্প-সাহিত্যের লাইনে কাজ করতে আগ্রহী। কারণ মানুষদের আমরা বলতে শুনেছি, তারা আমাদের বেশিরভাগ কথা কানেক্ট করতে পারে না, তারা আমাদেরকে তাদের মাঝে দুর্বল পায়। আমরা জানি কর্তৃপক্ষ এই উত্তরটা গ্রহণ করবে না, তবু আমরা ইচ্ছা করে এটা লিখলাম। আমরা ফরমটা পূরণ করার পর লিখিত পরীক্ষা দিলাম। সবকিছু লিখতে সময় কুলায়নি। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম ফলাফলের। আমরা এটাকে একটা বরকতের ব্যাপার মনে করলাম। হাজার হলেও উক্ত প্রকল্পে হাজারে পাঁচ থেকে ছয়জন যুবককে বেছে নেয়া হয়। এখানে অংশগ্রহণটাই যুবকদের কাছে অনেক বড় গৌরবের ব্যাপার। ফলাফলের অপেক্ষায় আমরা সেখানেই রাত যাপন করলাম। আমাদেরকে মসজিদে থাকতে দেয়া হলো। রাত দুটার পরে আমাদের ঘুম ভেঙে গেলো। আমরা দেখলাম আমাদের স্বপ্নদোষ হয়েছে। যৌনতার লেশ এখনও আমাদের ছাড়ে নাই। আমি উঠে বসে কিছুক্ষণ শেফার রূপ কল্পনা করলাম, কিছুক্ষণ পবিত্র প্রকল্পে কামতাড়িত হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি চিন্তা করলাম। আমরা বাথরুমে গিয়ে গোসল করে ফেললাম, এবং জামার ময়লা অংশগুলা ধুয়ে জামা পরে ফেললাম। আমরা বুঝে নিলাম এটা একটা খারাপ ইঙ্গিত। আমরা পরীক্ষায় টিকবো না। আমরা ভয়গ্রস্ত অবস্থায় ভোর নামার আগেই প্রজেক্ট থেকে পালিয়ে গেলাম।

আমরা ধোঁয়া-গহ্বরের প্রধান সড়কে ভাবলেশহীন বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। আমরা বিহ্বল বিস্মিত ও ভয়গ্রস্ত। আমাদের ক্ষুধা পেয়েছে। রোজার দিন সকালে কোনো খাবার পাওয়া যায় না, দোকানও বন্ধ থাকে। আমরা অবাক হয়ে একটা কুত্তারে বাসি কলার খোসা অর্ধেক খেয়ে ফেলতে দেখলাম। আমরা একটু দূরে গিয়ে একটা পর্দাঘেরা চায়ের দোকানে ঢুকলাম। আমরা গত ইফতারির বাসি বুট-মুড়ি-চানাচুর পেলাম। আমরা প্লাস্টিকের বাটিতে নিয়ে এগুলি চিবাতে লাগলাম। সামনের বেঞ্চে বসা দুজন সিগারেট টানতে টানতে আমাদের মুড়ি গেলা দেখলো। আমরা ওদের বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ার বিভিন্ন এঙ্গেলের দিকে প্রতিক্রিয়াহীন চেয়ে থাকলাম। কারুর কোনো কথা বিনিময় হলো না। এরপরে আমরা ধোঁয়া-গহবরে এবং ধোঁয়া-গহ্বরের বাইরেও বিভিন্ন এলাকার নানান প্রজেক্টে অংশ নেয়ার চেষ্টা করলাম। সবখানেই প্রজেক্টের কর্তারা আমাদের কথা কানেক্ট করতে পারলো না। আমরা প্রজেক্ট থেকে প্রজেক্টে ছোটাছুটি করতে থাকলাম। কয়েকবছর পার হয়ে গেলো। এটা আমাদের নেশায় পরিণত হলো। সফর করতে করতে আমাদের কাঁধ ও চোয়াল শক্ত হতে লাগলো। কাঁধের দুধারে ব্যাগের রশি দাগ বসিয়ে এক ইঞ্চি গর্ত করে দিলো। আমরা এইসব ছোটাছুটিতে সাধারণত মেষ ব্যবহার করি। মেষের ভাড়া কম, সেবাও ভালো। আমরা যখন মেষে চড়ি, রাবারের রাস্তার উপর এটা আপ-ডাউন করে চলে। এটা সেই রকম স্পন্স করে। আমরা যেখানেই থাকি সবসময় মনে হয় আমরা মেষের উপর চড়ে আছি, আমরা ঝুলতেছি। মানুষ, বাতাস, রাস্তা, পদার্থ, খসে পড়া চামড়ার স্তুপ আমাদেরকে দোলাইতেছে। আমরা সবকিছুর ঠিক মাঝখানে ঝুলতে থাকি। ঝুলতে ঝুলতে ঝোলার প্রতি আলাদা মহব্বত তৈরি হলো। এটাকে আমাদের অস্তিত্ব জুড়ে নেশারূপে পেলাম। আমরা এত মজবুতভাবে ঝুলি যে একটা পিঁপড়ার মাথায়ও ঠুস করে ছিঁড়ে পড়ি না। যদি ভুলক্রমে কারো মাথায় ছিঁড়ে পড়েও যাই, লোকেরা বিস্ময় নিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে থাকে। তারা আমাদেরকে কানেক্ট করতে পারে না। আমরা এই গুরবত থেকে বাঁচতে আবারও স্বস্থানে উঠে ঝুলে যাওয়া নিরাপদ মনে করি। একদিন আমরা মেষে চড়ে ছিলাম। আমরা ঝোলাঝুলিতে নেশাগ্রস্ত ছিলাম। আমাদের চামড়ার নিচের যন্ত্রণাগুলা উসকে গেলো। আমরা খানসা ও শেফাদের লাগাতে লাগলাম। আমরা রোমান্টিকতার মজ্জায় ঢুকে গেলাম। একজন আমড়াঅলা মেষে উঠলো। লুঙ্গির কোমরের দিকটা ময়লা এবং তাতে একটা গামছা বান্ধা। সে খুব ঘামাচ্ছে। পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। ওর গলার ভাঁজগুলায় ময়লাগুলা ঘামে দলা বেঁধে গেছে। আমরা নেশার তালে ওর আমড়াগুলা সব কিনে নিলাম। বললাম যাও বাসায়, রাত হয়েছে, একটু মাইয়া লাগালাগি করো। এটা বলে আমরা তার মুখে খিকখিক হেসে দিলাম।

একদিন সাতাশ বর্গকিলো নগরের মাঝখানের মরুভূমিতে মেষ চলতে চলতে বিকল হয়ে গেলো। আমরা এই তিহ মরুভূমিতে নেমে পড়লাম। সেদিন ছিলো ধোঁয়ার তীব্র আক্রমণ। ধোঁয়ার আজদহা টিলাগুলা উড়ে এসে আমাদের ছেঁয়ে ফেললো। আমাদের গা খালি ঝলসে যাচ্ছিলো। চামড়াগুলা দ্রুত খুলতেছিলো আর নতুন চামড়া গায়ে উঠতেছিলো। বাতাসে এক অদৃশ্য আগুন লেগে গেলো। আমরা তিহ মরুর এক খোলা প্রান্তরে এক পার্টিতে যোগ দিলাম। এখানে একটা চুলা ঘিরে বসে একদল তরুণ-তরুণী উত্তপ্ত আলাপ করতেছিলো। তারা মোটা-মোটা কালো বিড়ি টানতেছিলো, সাথে ছিলো বিভিন্ন পদের মদ। আমরা ওদের সাথে তাল মিলায়ে গেলাম। এটাওটা বহুত কিছু খেলাম। পেট ঢোল হয়ে গেলো। নেশায় চোখ বেরিয়ে আসতে চাইলো। ওদের কথাবার্তা থেকে আমরা যেটা বুঝলাম, নগরে খুব উত্তাপ চলতেছে। তরুণরা একটা বিদ্রোহ চায়। এবং এ বিষয়ে রীতিমতো দুটা দল সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্রোহী গ্রুপটা নগরের কোনায় কোনায় দানা বাঁধতেছে। ওরা আমাদের এক মহিলা নেতারে উৎখাত করতে চায়, এটা সেই অশরীরী সুপারপাওয়ার নারী যে নগরের সমস্ত ধোঁয়া সৃষ্টির কারিগর, যার হাতে ধোঁয়ার অপ্রতিরোধ্য শক্তির মালিকানা। অন্যদিকে আছে অশরীরী মহিলার দল, যারা ধোঁয়াপ্রবণ এলাকায় বাস করে বেশি। ওরা কখনও ধোঁয়ার ছায়া থেকে বের হতে চায় না। ওদের মতে ধোঁয়াহীন জায়গাগুলা অনুন্নত, সেসব জায়গাতে বাস করলে ওদের শক্তি কমে আসে। দানা বেঁধে ওঠা এই বিদ্রোহরে ওরা ঠেকিয়ে দিতে চায়। ওরা ধোঁয়ার জাল বিস্তার করে পুরা নগর নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। অন্যদিকে বিদ্রোহী দলটা ধোঁয়ার বলয় ভেদ করে ধোঁয়ামুক্ত নগর কায়েম করতে চায়। এরা মনে করে অশরীরি মহিলার লোকেরা তাদেরকে ছোট চোখে দেখে, মহিলার লোকেরাই নগরটারে দুর্ভেদ্য দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছে। এরা এইসব দেয়াল ভেঙে ফেলতে চায়।

নগরে এক বিপন্ন অবস্থা শুরু হলো। ধোঁয়ার উপদ্রব বেড়ে গেলো। এখানে সেখানে ধোঁয়ার উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হলো। তরুণরা একদল জানবাজ বিদ্রোহী নিয়ে ধোঁয়া-গহ্বরের দিকে ধেঁয়ে গেলো। ধোঁয়া-গহ্বরের প্রধান সড়কগুলা দখল করে নিলো। তাদের অবস্থান দীর্ঘ হলো। আমরা তটস্থ আর দিশেহারা হয়ে বাড়িতে চলে গেলাম। আমরা এই আসন্ন সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে এলাম বলা চলে। আমাদের গ্রামের লোকেরা বিদ্রোহে যোগ দিবে কিনা দ্বিধায় পড়লো। বৃদ্ধ আর বালক টাইপের ছেলেরা যোগদানের ব্যাপারে উসখুস করতেছে। তরুণ বুদ্ধিজীবীরা সংগ্রামটা জায়েঝ হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে একমত হতে পারতেছে না৷ বিশেষ করে হারেক ও তার শাগরেদ কাজী এটা নাজায়েঝ হওয়ার পক্ষে। তারা এটারে গৃহযুদ্ধ বা ফেতনার যুদ্ধ নামে আখ্যা দিলো। হারেক গ্রামের দূরে এক প্রান্তে একটা গর্ত খুঁড়ে তাতে বসে কোরান তেলাওয়াত করে সারাদিন। সেই আস্তানায় কাজীসহ অনেকেই দরবার বসালো যে না নৈরাজ্য করা জায়েজ নাই। তারা সবাইরে এটা থেকে বিরত থাকার আহ্বান করতে লাগলো। কিন্তু হারেকের বালক পুত্র একদল সংগ্রামীরে নেতৃত্ব দিয়ে ধোঁয়া-গহ্বরের দিকে নিয়ে গেলো। তাদেরকে ঠেকানো গেলো না। আমরা থমথমে পরিস্থিতিতে বিমূঢ় হয়ে থাকলাম। ঘরে বসে থাকলাম আর ফেসবুকের ওয়ালে নজর রাখতে লাগলাম। আর সন্ধ্যা নামলে আমরা গ্রামের চায়ের দোকানে এসে জড়ো হতাম, গ্রামে এক অমোঘ ধোঁয়ার ঝাঁক উড়ে আসে সন্ধ্যায়, আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে যায়, আমরা খানিকক্ষণ অবশ থাকি, তীব্র আতঙ্ক গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে।

যুদ্ধটা ঘটলোই। কয়েকদিন পর আমরা হারেকের বালক পুত্রের লাশ পেলাম। তার কানের উপর দিয়ে একটা গুলি প্রবেশ করে মাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারলাম যুদ্ধটা খুবই হেঁয়ালিপূর্ণ। হারেকের পুত্রের সম্মুখ দিয়েও গুলি লাগে নাই, পেছন দিক দিয়েও গুলি লাগে নাই, এটাই এটার প্রমাণ বহন করে যে বিদ্রোহীরা অজ্ঞাত পজিশনে ছিলো। তাদের টার্গেট ঠিকঠাক বাতলে দেয়া হয় নি। হারেকের পুত্ররে তার বাবার দরবারে এনে রাখা হলো। হারেক তখন অন্তিম মুহূর্ত পার করতেছে। গর্তে গুটি-শুটি মেরে এক তালে কোরান তেলাওয়াত করেই যাচ্ছে। তার ভক্তরা গর্তের চারপাশে তারে ঘিরে রেখেছে। হারেকের মুখ নিসৃত প্রতিটা শব্দ তারা কান পেতে শুনতেছে। কান্না থমথমে এক পরিবেশ। হারেক একটা ভেড়ার কোলে কাত হয়ে আছে। সে ভেড়ার লোম আদর করে দিচ্ছে। তার কান্না ঝরে ঝরে ভেড়ার একটা অংশ ভিজায়ে ফেলতেছে। হারেক ও তার শাগরেদরা মৃত পুত্রের প্রতি কোনো ভ্রক্ষেপই করলো না। তারা আছে এক অমোঘ ধ্যানের মধ্যে। হারেকের মুখ থেকে কোরানের শব্দ বের হচ্ছে আর একটু একটু মৃত্যুর সুরা পান করতেছে। মৃত্যুর পরেই একটা আজদহা ধোঁয়ার ঝাপ্টা এসে সকলকে বাড়ি দিয়ে গেলো। সবার চামড়া একবার খুলে গিয়ে নতুন চামড়া গজালো। হারেক ও তার পুত্রেরও এটা হলো। আমরা চাইলাম পিতা পুত্রের কবর পাশাপাশি রচনা করা হোক। হাজার হলেও হারেকের পুত্র গ্রামের প্রথম শহিদ। আমরা বিপরীতমুখী দুটি প্রতীকরে পাশাপাশি শোয়াতে চাইলাম স্মৃতি হিশাবে। কিন্তু হারেকের ভক্তরা কিছুতেই পিতার সাথে পুত্রের কবর হতে দিবে না। পুত্রের সমর্থক আর পিতার সমর্থকদের মাঝে প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হলো। কিছু কিছু মারপিটও হলো।

ফিরে আসা গাজিদের মুখে আমরা যুদ্ধের কিছু কিছু পরিস্থিতি সম্পর্কে জানলাম। তাদের একজন যে সমর সম্পর্কে ভালো ব্যুৎপত্তি রাখে, সে আমাদেরকে জানালো, যুদ্ধের স্ট্রাটেজি ছিলো খুব ধোঁয়াশাপূর্ণ। আমাদেরকে দিনের পর দিন সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। আমরা বিভিন্ন হুংকার দিয়ে সড়ক কাঁপালাম। আমরা ধীরে ধীরে এটা বুঝতে পারলাম যে আমাদের কথাগুলা অশরীরী মহিলার লোকেরা কানেক্টেড করতে পারতেছে না। অন্যদিকে ওরা কথা কম বলে শুরু থেকেই কিছু কিছু হাত লাগাচ্ছিলো । আমরা আমাদের নেতাদের বললাম, ‘ওরা আমাদের মুখের ভাষা কানেক্ট করতে পারতেছে, এসব বিষয়ে তারা আমাদেরকে দুর্বলরূপে দেখে। আমরা হাত লাগাতে চাই। ওরা কেবল হাত লাগানোর ব্যাপারে আমাদেরকে দুর্বল মনে করে না, ওরা এই ব্যাপারটারেই আমাদেরকে কিছু কিছু ভয় পেতে চায়। সুতরাং আমরা হাত লাগাতে চাই।’ নেতারা আমাদের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করবে কিনা ভাবতেছে। তারা একরকম ধন্দে পড়ে গেলো। তাদের কেউ বললো অশরীরী মহিলার আস্তানায় একযোগে আঘাত হানা উচিত, কেউ বললো মহিলার লোকেদের ঘরবাড়িতে হাত লাগানো উচিত, কেউ বললো নগরপ্রাচীর ভাঙার কাজে মনযোগী হওয়া উচিত। আমরা ভাবলাম যাক নেতারা দ্রতই যেকোনো একটা কাজে হাত লাগাতে আমাদের নির্দেশ দিবেন। কিন্তু পরক্ষণেই তারা যেন হাত লাগানোর ব্যাপারটা ভুলে গেলো। কি এক অদৃশ্য মায়ায় তারা সড়কে অবস্থান ত্যাগ করতে চাইলো না। তারা আমাদেরকে ধৈর্যের সাথে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে বললো। আমরা জ্বালাময়ী স্লোগান দিতে থাকলাম, নেতারা আগুনঝরা বক্তৃতায় তুষ্ট থাকলো। আমাদের হাত লাগানোর স্বপ্ন ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে গেলো। সড়কে দাঁড়িয়ে থাকার একরাতে আমাদের মাথার উপর ধোঁয়ার এক অমানিষা নামলো। একটার পর একটা ধোঁয়ার ঢেউ আমাদের মাথায় আছড়ে পড়লো। প্রত্যেকটা নিচের ঢেউয়ের চেয়ে উপরের ঢেউ বেশি নিকষ কালো। আমরা খকখক করে কাশতে লাগলাম। দম বন্ধ হয়ে আসলো। আমাদের পুরা শরীর শুধু খিঁচ মারতে থাকলো। এক বিন্দু আলো নাই। আমরা ধোঁয়ার অতল থেকে সাঁতার কেটে কেটে একটুকরা আলোর জন্যে উপরে উঠতেই আরও কঠিন ধোঁয়ার ঢেউগুলা আমাদের তলিয়ে দেয়। আমাদের সে রাতে খুব আলোর তৃষ্ণা পেলো। সে রাতে আমরা আল্লারে ডেকে বললাম, হে নুর, একটু নুর দাও গো। মহিলার লোকেরা এবার চূড়ান্ত হাত লাগালো। হাতের ভাষা ঝনঝন করে বাতাসে বাজলো। তারা আঘাত করলো সাইড থেকে, সামনে থেকেও না পিছন থেকেও না৷ শক্তিতে বেশি যে দল, তাদেরকে কখনও সামনে বা পিছনে থেকে আঘাত করা হয় না। একটুপর আমাদের লাশগুলা জড়ো করা হলো। ধোঁয়ার উড়ন্ত গাড়িগুলা এসে লাশগুলি উঠিয়ে ফরফর করে উড়ে গেলো। হারেকের পুত্রের লাশটা কীভাবে জানি শূন্য থেকে পড়ে গেলো। আমরা সেটা কুড়ায়ে একটা বাড়ির গ্যারেজে ঢুকাতে সক্ষম হলাম। পরদিন আমরা জান হাতে নিয়ে মহিলার লোকেদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শহিদরে সন্তর্পণে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলাম।

গ্রামের গাজিরা হারেকের লোকদের উপর খুব খেপে গেলো। তারা পাঁচ-সাত দিন গ্রাম থেকে গায়েব থাকলো, হঠাৎই কোথায় জানি চলে গেলো। তারা বিভিন্ন এলাকায় গেলো, সেখানকার যারা সংগ্রামে গেছিলো, যারা ফেরত আসেনি, যাদের লাশ উড়ন্ত গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে অশরীরি নারীর ধোঁয়ার গহ্বরে গায়েব করে ফেলেছে, তাদের নাম ধাম ঠিকানা লিস্টি করে আনলো। শয়ে শয়ে শহিদের তালিকা নিয়ে তারা হাজির হলো গ্রামে। শহিদদের ভিতর বালক ও কম বয়সি তরুণদেরই নাম আমরা বেশি দেখলাম। আমাদের গ্রামের গাজীরা তালিকাটা নিয়ে সরাসরি হারেকের আস্তানায় হাজির হলো, বিশাল দলবল নিয়ে। তারা প্রত্যেকটা শহিদের নাম নিয়ে নিয়ে গায়েবানা জানাযা পড়লো। এবং শত শত কবর খুঁড়ে শহিদদের কবর দিলো হারেকের আস্তানার পাশেই। তারা এটা করলো হারেকের ভক্তদের প্রতি প্রতিশোধ নিতেই। এতে কাজীসহ হারেকের ভক্তদের গায়ে খুব জ্বালাপোড়া শুরু হলো। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকেরা এসে শহিদদের কবরে এসে নাম ধরে ধরে দোয়া করে যায়, ফলক ছুঁয়ে ছুঁয়ে অশ্রু ফেলে যায়। সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগলো। হারেকের দরবারের চাহিদা কমতে লাগলো। আজকাল মানুষ ওটা ভুলেই গেছে প্রায়।

 

জুন ২০২৪

নওগাঁ।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments