সোভিয়েত লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া : যার মৃত্যুদণ্ড বদলে দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস

রাকিব হুসাইন

থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেই কিংবদন্তি গুপ্তচর, যাকে বিশ্ব চেনে ‘লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া’ নামে। আরবদের মিথ্যা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যিনি আগুন ধরিয়েছিলেন। এই বিখ্যাত লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া ব্রিটিশ নাগরিক হলেও আজকে আমি কথা বলবো সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘লরেন্স অভ অ্যারাবিয়া’ সম্পর্কে।

তিনি হলেন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাজনীতিক; কমিউনিজমের মুখপাত্র; সোভিয়েত কূটনীতির অবিশ্বাস্য প্রতিভাধর ব্যক্তি কারিম আব্দুরউফোভিচ খাকিমভ। যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘কারিম খাকিমভ’ নামে।

থমাস এওয়ার্ড লরেন্স যেহেতু আরবে ব্রিটিশ প্রভাব ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছিল সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে তার সোভিয়েত ভার্সন অবশ্যই কমিউনিজমের প্রভাব ছড়িয়ে দিবেন আরবের মরু-শায়খদের কুটিরে। 

১৮৯২ সালের ২৮ নভেম্বর। বর্তমান রাশিয়ার বাশকোর্তোস্তান অঞ্চলের দিউসিয়ানোভো গ্রামে এক দরিদ্র তাতার মুসলিম কৃষক পরিবারে জন্ম নেন কারিম খাকিমভ। ১৯১৭ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই তিনি তোমস্কের একটি জিমনেসিয়াম থেকে শিক্ষাগত ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে অক্টোবর বা বলশেভিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। সেখানে রাশিয়ার  অসংখ্য উঠতি তরুণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে খাকিমভও সোৎসাহে এই বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯১৮ সালে তিনি ওরেনবুর্গ মুসলিম সামরিক বিপ্লবী সমিতির সদস্য নিযুক্ত হন। তিনি লাল ফৌজের তাতার রাইফেল ব্রিগেডের রাজনৈতিক প্রধান তুর্কিস্তান ফ্রন্টে মুসলিম ইউনিট সংগঠনের মুখ্য স্থপতি ছিলেন।

১৯২০ সালে বলশেভিক নেতা ও লাল ফৌজের অন্যতম কমান্ডার ভালেরিয়ান কুইবিশেভের সুপারিশে খাকিমভকে সোভিয়েত রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। রেড আর্মিতে মুসলিম জাতীয় ইউনিট গঠনে এবং তুর্কিস্তান ফ্রন্টে রাজনৈতিক কাজেও কারিম খাকিমভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯২০-এর দিকে তিনি তাশকেন্দ ও বুখারায় Bolshevik প্রশাসনের একজন মূল সংগঠক ও নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৮৭৩ সাল থেকে বুখারা আমিরাত রুশ সাম্রাজ্যের একটি আশ্রিত রাষ্ট্র ছিল। ১৯২০ সালে বুখারার বলশেভিকরা বুখারার আমিরকে ক্ষমতাচ্যুত করে ‘সোভিয়েত গণপ্রজাতন্ত্রী বুখারা’ নামে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।

এরপর মস্কো কর্তৃক মধ্য এশিয়ায় জাতিসত্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলাফল হিসেবে ১৯২৫ সালে এই রাষ্ট্রটি বিলুপ্ত হয় এবং এর ভূখণ্ড উজবেক, তাজিক ও তুর্কমেন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর নিকট হস্তান্তর করা হয়।

১৯২১ সালের অক্টোবর থেকে ১৯২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত খাকিমভ খোরাসানের মাশাদ ও রেশতে কনসাল জেনারেল হিসেবে কাজ করার পর ১৯২৪ সালে তাকে পাঠানো হয় হিজাজে—আজকের সৌদি আরব। এসময় আরব উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাশেমী ও সৌদদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। একদিকে হাশেমি শরীফ হুসাইন, অন্যদিকে নজদের আবদুল আজিজ ইবন সৌদ।

হাশেমী এবং সৌদদের মধ্যে কাকে সমর্থন করা উচিত—এই নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন শুরুর দিকে একটু দ্বিধান্বিত ছিল। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিচেরিন খাকিমভকে এই মর্মে নির্দেশ পাঠান যে, সোভিয়েত কূটনীতিকদের উচিত হবে এখন কাউকে সমর্থন না দিয়ে কোন এক পক্ষ বিজয়ী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নজদের সুলতান ইবন সৌদ মক্কা দখল করে নেন। এরপরই খাকিমভ বুঝতে পারেন যে, এই যুদ্ধে ইবন সৌদই শেষ হাসি হাসবেন। তাই তখনই তিনি ইবন সৌদের সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা দেন।

১৯২৫ সালে ইবন সৌদ যখন জেদ্দা অবরোধ করে রেখেছেন, তখন খাকিমভ ওমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করেন। মক্কাতেই খাকিমভ ইবন সৌদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হন ইবন সৌদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা প্রথম বিদেশি কূটনীতিক। কারণ তখন পর্যন্ত কোনো পশ্চিমা কূটনীতিককে ইবন সৌদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। মস্কোতে পাঠানো চিঠিতে খাকিমভ জানান যে, ইবন সৌদের সঙ্গে তার আলোচনা আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে এবং ইবন সৌদ থেকে তিনি ইতিবাচক জবাব পেয়েছেন। আর এই সম্পর্কের ফলেই ১৯২৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল খাকিমভের একক কূটনৈতিক বিজয়। যা তখনও ব্রিটিশরা পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি।

খাকিমভের কারণেই সৌদি আরবে সোভিয়েত পণ্যের ওপর ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, কৃষ্ণসাগর ও হিজাজের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ শুরু হয়, সোভিয়েত চিকিৎসকরা মক্কায় হাজীদের সেবা দিতে আসে, সৌদি বাজারে প্রথমবারের মতো সোভিয়েত কেরোসিন ও বেনজিন বাজারে প্রবেশ করে। যেখানে এতদিন পর্যন্ত ব্রিটিশদের এক চেটিয়া দখল ছিল। এমনকি যুবরাজ ফয়সালের ১৯৩২ সালের মস্কো সফরও ছিল খাকিমভের কূটনৈতিক দক্ষতার ফল।

এরই মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে হঠাৎ ধর্মবিরোধী অভিযান শুরু হয়। মুসলমানদের হজও অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হয়।

এদিকে ইবনে সৌদ মস্কোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ব্রিটেনের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা লাভ করেন। ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা খাকিমভ সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

এর মাঝেই আরেক বিপর্যয় শুরু হয়। স্টালিনের সেই ভয়ংকর ‘শুদ্ধি অভিযান’। ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খাকিমভকে মস্কো ডেকে পাঠানো হয়। সৌদি বাদশাহ বুঝতে পারেন তাকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা হবে তাই তিনি তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক খাকিমভ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তিনি মস্কোর উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ত্যাগ করেন। ফিরে যেতেই তাকে গ্রেপ্তার করে সোভিয়েত গোপন পুলিশ ‘এনকেভিডি’। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গুপ্তচরবৃত্তির! ১৯৩৮ সালে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন তার বয়স মাত্র ৪৫ বছর। এমনকি খাকিমভের নিরপরাধ স্ত্রীকেও ৮ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। 

খাকিমভের মৃত্যুর ঠিক দুই মাস পরই—দাহরানে আবিষ্কৃত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র। এর ফলে ১৯৩৮ সালে মস্কো সৌদি আরবে নতুন একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

উল্লেখ্য, যে খাকিমভ চলে যাওয়ার পর থেকে সৌদি আরবে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের পদটি ফাঁকাই ছিল। কিন্তু ইবন সৌদ খাকিমভের স্থানে অন্য কাউকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। খাকিমভের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তিনি মস্কোকে মুসলিমবিশ্বে বিপ্লব ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

সোভিয়েত–সৌদি সম্পর্ক ৫২ বছরের জন্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব পুরোপুরি মস্কোর বলয়ের বাইরে চলে যায় এবং প্রথমে ব্রিটেন ও পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালের আগে মস্কোর সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপিত হয়নি।

যদি স্তালিন সৌদি আরবকে এতটা উপেক্ষা না করতেন এবং বিশেষত যদি খাকিমভকে মৃত্যুদণ্ড না দিতেন, সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের তেল এবং রাজনীতির ওপর একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত না। সেক্ষেত্রে কোল্ড ওয়ারের ইতিহাস হয়তো অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত।

স্টালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত সরকার খাকিমভকে নির্দোষ ঘোষণা করে। ১৯৭৯ সালে তার জন্মস্থানে জাদুঘর নির্মিত হয়। বর্তমান রাশিয়ার উফা ও ওরেনবুর্গ এবং উজবেকিস্তানের সমরখন্দ ও বুখারায় একটি করে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে খাকিমভের নামে।

২০১৫ সালে বাশকোর্তোস্তান প্রজাতন্ত্রের সরকার মহাসমারোহে খাকিমভের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে। ২০১৯ সালে বাশকোর্তোস্তানের রাজধানী উফা শহরে খাকিমভের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের “লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া” জীবিত অবস্থায় মিথ্যা অভিযোগের বলি হয়ে যথোপযুক্ত সম্মান না পেলেও তাঁর দেশবাসী ঠিকই তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।

কারিম খাকিমভকে মিথ্যা অভিযোগে হত্যা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন হারিয়েছিল আরব দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ। যদি সেদিন খাকিমভকে না মারা হতো, তাহলে তেল রাজনীতি, মার্কিন-সৌদি জোট, এমনকি পুরো কোল্ড ওয়ারের ইতিহাসই হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments