[হেবা রউফ ইজ্জত (জন্ম : ১৯৬৫) একজন মিশরীয় চিন্তক, একাডেমিশিয়ান ও রাজনৈতিক কর্মী। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ, এমএ ও পিএইচডি সম্পন্ন করে তিন দশকেরও বেশি সময় সেখানে উনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে উনি তুরস্কের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব ও সভ্যতা স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। একাডেমিক জীবনে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রোতে খণ্ডকালীন প্রফেসর হিসেবে এবং অক্সফোর্ড, বার্কলে, ওয়েস্টমিনস্টার ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করছেন।
হেবার গবেষণা মূলত পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তা, ইসলামি রাজনৈতিক তত্ত্ব, নারী ও রাজনীতি, নাগরিকত্ব ও শহর, বৈশ্বিক সিভিল সোসাইটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে ঘিরে। তাঁর মসজিদভিত্তিক সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘মঙ্গলবারের পাঠ ও সংলাপ’ মিশরের তরুণ-তরুণীদের মাঝে একসময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, মুকাদ্দিমাহ ইবনে খালদুনকে কেন্দ্র করে টানা সাত মাস চলার পর সরকারি নির্দেশে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এর ধারাবাহিকতা অনলাইন ও ইস্তাম্বুলে চালু থাকে।
২০১৫ সালে হেবা জিগমুন্ড বাউম্যানের লিকুইড মডার্নিটি সিরিজের পূর্ণ আরবি অনুবাদের তত্ত্বাবধান ও ভূমিকায় কাজ করেন। উনার এমএ থিসিস ছিল : আল-মারআহ ওয়াল আমালুস সিয়াসিয়্যু : রুয়াতুন ইসলামিয়্যাহ। নাহওয়ু উমরান জাদিদ, আল-খিয়ালুস সিয়াসিয়্যু লিল-ইসলামিয়্যিন : মা কবলাদ দাওলাহ ওয়ামা বা’দাহা, আদ-দীন ওয়াল ইসনানিয়্যাহ ওয়াল আলাম, ফিকহুল ওয়াকে’ লিত-তুরাসিস সিয়াসিয়্যিল ইসলামি, ইসলামুস সুউক, আল-মারআ ওয়াদ দীন ওয়াল আখলাক—উনার উল্লেখযোগ্য কাজের কিছু। হেবা রউফ বিভিন্ন সময় নানান এওয়ার্ড পেয়েছেন। অনলাইনে তাঁর অসংখ্য লেকচার ও সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়।]
১,
ফিতরতকে[1]মানুশের স্বভাবজাত প্রকৃতি, জন্মগত ন্যাচার। ইসলামি তুরাসের স্থানীয় ধারণা ধরা হয়, কারণ কোরআন-হাদিসে বহু জায়গায় এর উল্লেখ হইছে এবং ইসলামের তুরাসি টেক্সগুলাতেও জায়গায় জায়গায় যুক্তি-দলিলের উপস্থাপনে ও প্রমাণে এর ব্যবহার হইছে।
ফিতরত একটা ত্রয়ীমূল শব্দ : ف – ط – ر । কেউ এই ধাতুমূল থেকে উৎপন্ন শব্দমালার দিকে খেয়াল করলে স্পষ্টই বুঝতে পারবে, এর উৎসমূল অর্থের ওপর কীরকম অর্থগত পরিবর্তন আর বিকাশ ঘটে গেছে, কতটা সে প্রভাবিত হইছে প্রথমে কোরআন-সুন্নাহর টেক্সটের অর্থমালা থেকে, এরপর ইসলামি তুরাসের টেক্সটের অর্থমালা থেকে।
فَطْرٌ (ফাতরুন) মানে : ফাটল, চিড়ল, ভাঙ্গন। কতক ভাষাবিদ বলছেন, কোনোকিছুর প্রথম ফাটল যেটা, তাকেই ফাতরুন বলে। আল্লাহ বলেন, ‘দেখতে কি পাও কোনো ফাটল (فطور)?’, আরেক স্থানে বলেন, ‘যখন আসমান বিদীর্ণ হবে (انفطرت)’ । ফিতরত মানে : আরম্ভ, উদ্ভাবন, সৃষ্টি। আল্লাহ প্রকৃতিকে (خَلْقُٗ) সৃষ্টি (فَطَرَ) করছেন, অর্থাৎ সৃষ্টি ঘটায়ে তার সূচনা করছেন।
হাদিসে আসছে : প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের ওপর জন্মায়, পরে বাবা-মা ও পরিবেশই তাদের বানায় ইহুদি, নাসারা, অগ্নিপূজক; যেমন একটা পশু, সে জন্ম দেয় পূর্ণগঠন সুস্থসবল বাচ্চা—তোমরা কি দেখতে পাও জন্ম থেকেই ওদের কেউ কানকাটা বিকৃত? আবু হুরায়রা তখন তেলাওয়াত করে ওঠেন, “আল্লাহর দেওয়া ফিতরত মোতাবেকই তোমরা চলো, যেই ফিতরতের ওপর আল্লাহ সৃষ্টি করছেন মানুশ। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনও অদলবদল নাই। এ-ই হচ্ছে সরল-সঠিক দীন।”
ইসলামি দর্শনে সৃষ্টির সূচনা জড়ায়ে আছে মানুশের আখের ও পরিণতির সাথে। সূচনা (بدء) আর প্রত্যাবর্তন (رجعى)—উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ফুঁটে ওঠে কোরআনের এই আয়াতে—“আমি কেনই বা ওই সত্তার বন্দেগি করব না, যিনি আমাকে সৃষ্টি করছেন এবং যার দিকেই ফিরে যাইতে হবে তোমাদের?”[2]ইয়াসিন : ২২
একইভাবে আমরা দেখতে পাই ইসলামি দর্শনে ফিতরত একত্ববাদ ও দীনের সাথেও নিবিড়ভাবে জড়ায়ে; তাওহিদ আছে ফিতরতে, আল্লাহ বনি আদম থেকে যে পয়লা শপথ নিছিলেন তা লুকায়িত আছে ফিতরতে। আবার এই ফিতরত-সচেতনতা প্রভাবিতও হয় পরিবেশ, পরিবার ও সমাজ দ্বারা। ফলে এই পর্যন্ত এসে, ফিতরতকে আমরা আবিষ্কার করি ইসলামি দর্শনে মানুশের পয়দায়েশির ‘আদি পবিত্রতা’ হিশেবে, একপ্রকার খ্রিস্টধর্মের ‘আদি পাপ’ ধারণার বিপরীতে।
“নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো একনিষ্ঠভাবে সরল-সহজ দীনের ওপর; চলো ওই ফিতরত মোতাবেক, যার ওপর আল্লাহ সৃষ্টি (فَطَرَ) করছেন মানুশ। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনও অদলবদল নাই। এ-ই হল সরল-সঠিক দীন।”[3]সুরা রোম : ৩০
কোরআনের আয়াতগুলাও আমাদের নজর কাড়ে এই দিকেই যে, ইনসানি ফিতরত কীভাবে জড়ায়ে আছে আসমান-জমিনের সৃষ্টির সাথে। আল্লাহই হচ্ছেন ফাতির (স্রষ্টা) আর তাঁর সৃষ্ট অন্তরজগত (আনফুস) ও মহাজগতের (আফাক) নিয়ম-কানুন—সব একসাথে হয়ে আছে জড়িত। —“আমি নিজের মুখ ফেরাচ্ছি ওই সত্তার দিকে, যিনি সৃষ্টি করছেন (فَطَرَ) আকাশমণ্ডল ও জমিন; আর আমি বহু-খোদাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।”[4]আনআম : ৭
“তিনি আকাশমণ্ডল ও জমিনের সৃষ্টিকারী (فاطر)।”[5]আনআম : ১৪
আল্লাহ মানুশকে সৃষ্টি করলেন যেই ফিতরতের ওপর, সেই ফিতরত হেদায়েতের উৎস ও সত্যের সাথে সংযোগ হিশেবেও প্রতিভাত হয়, আল্লাহ যা বান্দাদের অন্তরে অন্তরে দিয়ে রাখছেন। —“আমার রিশতা তো শুধুই ওই সত্তার সাথে, আমাকে পয়দা করছেন (فطرني) যিনি; তিনিই আমার রেহনুমায়ি করবেন সহজ-সরল পথে।”[6]জুখরুফ : ২৫
“না, বরং তিনি তোমাদের রব, যিনি আকাশমণ্ডল ও জমিনের রব, যিনি এসবের সৃষ্টিকর্তা (فاطر); এই ব্যাপারে আমি তোমাদের সামনে একজন সাক্ষী।”[7]আম্বিয়া : ৫৬
জীবনে চলার পথে আলো হয় যখন ঈমান, তখন এই ফিতরত যাবতীয় অন্যায়-অবিচারকেও মাইনা নিতে নারাজ হয়ে ওঠে। —“জাদুকররা বলল, কসম ওই সত্তার যিনি আমাদের সৃষ্টি (فطرنا) করছেন, আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পর আমরা তোমাকে সেগুলার ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না; যা করতে চাও করে নাও, তুমি তো এই ইহজীবনেই ব্যস যা করার করবা।”[8]ত্বাহা : ৭২
“হে আমার কওম, এই কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনও প্রতিদান চাই না; আমার প্রতিদান তো খোদ ওই সত্তার জিম্মায় যিনি সৃষ্টি করছেন আমাকে (فَطَرَني); তোমরা কি একটুও নিজেদের বুদ্ধি খাটাবা না?”[9]হুদ : ৫১
“এরপর ওরা বলবে যে : আমাদের আবার সৃষ্টি করবে কে? বলে দেন : যিনি তোমাদের পয়লাবার সৃষ্টি করছেন তিনিই। তখন ওরা বলবে : তো এইটা হইতেছে কবে? বলুন : হতে পারে এই শীঘ্রই।”[10]বনি ইসরাইল : ৫১
ফিতরত হচ্ছে একটা জামে’-মানে’ ধারণা। ‘জামে’ মানে সে নিজ ধারণার মধ্যে নর-নারী উভয়কে জমা করে। আর ‘মানে’ মানে সে মানুশকে জ্বীন ও ফেরেশতা থেকে আলাদা করে। —“আল্লাহ মানুশকে সৃষ্টি করছেন ফিতরতের ওপর।”
ফিতরত চারটা মৌলিক ধারণার সমন্বিত রূপ—যা ইনসানি আমানত ও খেলাফতের সাথে সম্পৃক্ত এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দাদের থেকে যার হিশাব নিবেন—এই চারটা আমরা কিতাবুল্লায় খোলাদৃষ্টি দিলে দেখতে পাই : ১. স্বয়ং ফিতরত, ২. আকল, ৩. ওহি এবং ৪. পরিস্থিতির মোকাবেলা ও চিন্তাভাবনা থেকে অর্জিত জগতের নীতিমালা।[11]সুনান
এসবের ওপর নির্ভর করে বলতে হয় যে, যেই ফিতরতের ধারণা এতদিন কেবল শরীরের সেবা-যত্ন ও হুকুকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, আমাদের ইসলামি চিন্তাধারার প্রয়োজন সেই ‘সুন্নাতুল ফিতরাহ’কে পুনর্বিবেচনা করা, যাতে করে ইসলামি চিন্তা ফিতরত ধারণাকে এমন দিগন্তে নিয়ে যাইতে পারে, যেইখানে ফিতরত মানবাত্মায় কীভাবে কাজ করে [ব্যক্তিক হালতে, সামাজিক হালতে ও সভ্যতার নির্মাণ হালতে] সেই বৈশিষ্ট্য আর নিদর্শন ইসলামি চিন্তা বুঝতে পারবে ও ব্যাখ্যা করতে পারবে। এইখানে এসে গুরুত্বের দাবীদার হবে কুরআনিক গল্পগুলা; এছাড়া ইনসান, উম্মত, কওম, মদিনা, বনি আদম, মানব, মানবতা ইত্যাদি সব শব্দ ও সেসবের সাথে সম্পৃক্ত কোরআনিক বিষয়াবলিও ফিতরত আলাপের সাথে জরুরিভাবে জড়িত।
২,
ফিতরতের আলাপ ব্যাপক তর্ক সহকারে জড়ায়ে আছে দর্শনের ইতিহাসজুড়ে, মানবচিন্তায় বড় জরুরি স্থান দখল করে, এই প্রশ্নকে ঘিরে যে—মানব-প্রকৃতির স্বরূপ কী? এরই সাথে জড়ায়ে আছে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, শক্তি ও সমাজ-প্রকৃতির মতো তত্ত্ব-বিষয়। ফলে যারা মনে করে যে মনুশ্য প্রকৃতির মূল হচ্ছে ভালো ও কল্যাণ, তারা এমনসব তত্ত্ব প্রস্তাব করে যা মুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক, যেখানে সমাজের ভূমিকা ও কার্যকারিতা গুরুত্ব পায়, আর ফলেই তাদের প্রস্তাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও ভূমিকার স্পেস হয়ে থাকে প্রয়োজনমতো সীমিত। অন্যদিকে যারা মনে করে মনুশ্য প্রকৃতির মধ্যে খারাবিই প্রভাবশালী, তারা মানুশ ও সমাজের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, এবং রাষ্ট্রই মাসলাহাত (সার্বিক কল্যাণ) ও মাকাছেদের (সার্বিক উদ্দেশ্য) হেফাজতকারী বলে মনে করে ।
এই আলাপের নিদর্শন মেলে গ্রিক দর্শনে; নগর বিবেচিত হয় সেখানে মানবতা পূর্ণতার পূর্বশর্ত হিশেবে। তাদের মতে ব্যক্তির ফিতরত একা একাই সভ্যতা গড়ে তুলতে এবং মানবতা সংরক্ষণ করতে পারে না। অন্যদিকে ইবনে তোফায়েল ও ইবনে সিনা ‘হাই ইবনে ইয়াকজান’-এ তারা তাদের দার্শনিক আলাপে একক ব্যক্তির চরিত্রকে সামনে রেখে যুক্তি দেখান ব্যক্তিকে প্রাধান্যের পক্ষে। এই একই বিতর্ক দর্শনের ইতিহাসে খেলাফত আর উমরান (সভ্যতা) সম্পর্কিত তত্ত্বচিন্তা গড়ে তুলছে; যারা মনে করেন যে, শাসকশক্তিই শরিয়াহ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয়, তারা শাসকের ক্ষমতা প্রসারে বিশ্বাসী এবং শাসকের ওপর বিদ্রোহের তারা বিরোধিতা করেন, অন্যদিকে যারা মনে করেন যে, উম্মাহই শরিয়াহর মোহাফেজ ও রক্ষাকারী, এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বই সর্বাধিক জরুরি, তারা শাসক না বরং শাসিতদের পক্ষে প্রাধান্য দেন।
ফিতরত ধারণা মানবতা ও বৃহত্তর মানবজাতি ধারণার সাথেও জড়ায়ে আছে। প্রাকৃতিক আইন ও বিশ্ব নাগরিকত্ব সম্পর্কে যেই সকল তত্ত্বের উদ্ভব হইছিল, এথেন্স পতনের পর উদিত স্টোয়িক দর্শন থেকে শুরু করে ফারাবির আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা, অসাম্প্রদায়িকতাবাদ (Cosmopolitanism) ও বিশ্বায়ন (Globalization)—সবই একটা অভিন্ন মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই নির্মিত। তাই ফিতরত এইসব তর্কে সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হইতে প্রাসঙ্গিক থেকে আসছে, কারণ ফিতরতের যেমন ধর্মীয় উৎসারণের জায়গা আছে, তেমনই ফিতরত ধারণ করে তাওহিদের মর্মমালা ও আলামতকে এবং অভিন্ন সব মানবিকতাকেও।
৩,
আমরা ইবনে খালদুনের দিকে ফিরলে দেখি উনি বলতেছেন—
“জাইনা রাখো যে, সভ্যতার আশল যেই মানবসমাজ, তার কথাই হইতেছে ইতিহাসের বাস্তবতা, এবং এই সভ্যতার ফিতরত মোতাবেক মানবসমাজ যেই নানান হালতের সম্মুখীন হয়—বর্বরতা ও সভ্যতা, গোত্রপ্রীতি ও একে অপরের ওপর মনুশ্য আধিপত্যের শ্রেণিভেদ, এইসব হালত থিকা গইড়া ওঠা শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্র পর রাষ্ট্র আর বিচিত্র সব স্তর-মরতবা, মানবজাতির তার কর্ম আর প্রচেষ্টা দিয়া হাছিল করা জীবিকা, জীবনোপরকণ, জ্ঞান, শিল্পকলা আর ফিতরতী হাল থিকা ঘটা ইত্যাদি বাকি সব ক্ষেত্র—যাবতীয় এই সমস্তই ইতিহাসের বাস্তবতা।”[12]পৃষ্ঠা ৩৫।
এখান থেকে আমরা পাই—ফিতরত ধারণার আমাদের প্রয়োজন এইটা পষ্ট হতেও যে—ইনসানি ফিতরতের ওপর দিয়ে কী কী বয়ে যায় যখন সে সভ্য (تأنس) হালতের ভিতর দিয়ে পাড়ি দেয় আর যখন সে বন্য (توحش) হালতের ভিতর দিয়ে পাড়ি দেয়, এবং সমাজে যখন বন্যতা গালেব হয়ে যায় তখন ফিতরতকে ওই গালেবির প্রভাব থেকেই বা কীভাবে উদ্ধার করা যায়—যাতে করে পুনরায় ব্যক্তি ও সমাজকে আমরা সভ্য হালতের দিকে ফিরায়ে আনতে পারি।
সহজাত ফিতরতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে—অ-মানুশিক যত প্রবণতা আছে ব্যক্তি আর সমাজে [যেগুলা আশলে ফিতরতের মধ্যেই পড়ে না, বরং এন্টি-ফিতরত] ফিতরতকে সেগুলার ওপর উঁচা ও গালেব করতে হবে। এইটাও বুঝতে হবে যে, শরিয়তের যাবতীয় সামাজিক রিলেশনের যেই সামঞ্জস্যপূর্ণ উসুল, সেইগুলার লক্ষ্য কেবল মাকাছেদে কুল্লিয়া (সামগ্রিক উদ্দেশ্য) রক্ষা করাই না, বরং যুদ্ধ-জেহাদ আর দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে ইনসানি ফিতরতকে অধঃপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোও। এইভাবে, ফিতরত ধারণা ফিকহুল জিহাদ ও জিহাদের আখলাকিয়তেও শামিল হয় এবং দীনের দাওয়াতের মৌলিক উপাদান ও মূলনীতির বোঝাপড়ায়ও শামিল হয়।
আয়েশা আব্দুর রহমান[13]ছদ্মনাম বিনতুশ শাতে (১৯১৩-১৯৯৮)। প্রথম আরব নারী যিনি আরবি ভাষা-সাহিত্যে কিং … Continue reading পৃথক প্রবন্ধ লিখছেন ‘মাকাল ফিল ইনসান’ নামে ফিতরত নিয়ে; শায়েখ মুহাম্মদ গাজালি তাঁর তাকরির আর লেখাপত্রে বারবার বলছেন ‘রিহান আলাল ফিতরাহ’—ফিতরতের ওপর আস্থা রাখতে; শায়েখ আব্দুল্লাহ দারাজ[14]১৯৯৪ সালে জন্মান আব্দুল্লাহ দারাজ। ইমাম শাতিবির ‘আল-মুওয়াফাকাত’-এর … Continue reading ও তার পরে শায়েখ ফারিদ আনসারির[15]মরোক্কান আলেম, দাঈ, সাহিত্যিক ফরিদ আল-আনসারি (১৯৬০-২০০৯)। রাজনীতিকেন্দ্রিক … Continue reading লেখালেখিতেও আমরা দেখতে পাই মুসলিমদের আখলাকি দস্তুর হিশেবে ফিতরতকে কতই তাগিদ দেওয়া হইছে। কিন্তু যদি ফিতরত ধারণাকে এইসকল লেখাপত্র থেকে আজাদ করে একটা তাত্ত্বিক ও সৃজনশীল ধারণায় সৃজন দেওয়া যায়, যা আজকের মুসলিম আকলের সামনে উত্থাপিত নানান সমস্যা ও সংকটের সমাধানে কার্যকারী ভূমিকা হিশেবে ফায়দা দেবে—তাহলে ফিতরত ধারণা না-ই কেবল আমাদের বর্তমান সমস্যাদির নিরসনে কাজে দেবে, বরং ফেকাহশাস্ত্রের পুনর্পাঠেও কাজে দেবে—ফকিহগণ তাঁদের ইজতেহাদি পরিক্রমায় একে ব্যবহার করবেন এবং মাসালিহ ও মাফাসিদ-এর মাপকাঠিতেও প্রয়োগ করবেন।
অবশেষে সময় আসছে ফিতরত ধারণাকে তার সুবিস্তৃত পরিসর নিয়ে প্রয়োগ করার—ফিতরত ধারণা, যা চিরন্তন সাক্ষ্যকে এই দুনিয়ায় জুড়ে দেয় তাওহিদের সাথে, হেদায়েতের সাথে, সুপথগামিতার সাথে এবং স্থাপন করে আখেরাতের হিশাবকিতাবের মাপকাঠি—সময় আসছে একে প্রতিষ্ঠা করা ইসলামি চিন্তার অগ্রযাত্রা হিশেবে এবং মানবসমাজের চলমান নানান ইস্যুর বিতর্কে ইসলামি চিন্তার অবদান রাখতে উপায় হিশেবে। একইসঙ্গে এইটা হতে পারে ইসলামি প্রকল্প আর ইসলামি দাওয়াতের মজবুত বুনিয়াদ—চলমান এমন এক তাজদিদি মারহালায়, যেইখানে ইসলামের ভবিষ্যত-দিগন্ত উন্মোচিত হবে আর তার পয়গাম তামাম দুনিয়ার সামনে রহমত হিশেবে উদ্ভাসিত হবে।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | মানুশের স্বভাবজাত প্রকৃতি, জন্মগত ন্যাচার। |
|---|---|
| ↑2 | ইয়াসিন : ২২ |
| ↑3 | সুরা রোম : ৩০ |
| ↑4 | আনআম : ৭ |
| ↑5 | আনআম : ১৪ |
| ↑6 | জুখরুফ : ২৫ |
| ↑7 | আম্বিয়া : ৫৬ |
| ↑8 | ত্বাহা : ৭২ |
| ↑9 | হুদ : ৫১ |
| ↑10 | বনি ইসরাইল : ৫১ |
| ↑11 | সুনান |
| ↑12 | পৃষ্ঠা ৩৫। |
| ↑13 | ছদ্মনাম বিনতুশ শাতে (১৯১৩-১৯৯৮)। প্রথম আরব নারী যিনি আরবি ভাষা-সাহিত্যে কিং ফয়সাল এওয়ার্ড লাভ করেন। আল-আজহারে তরুণদের সামনে প্রথম বক্তৃতা দেওয়া নারীও উনি। সাহিত্য, তফসির, সিরাতের ওপর উনার একাধিক কাজ সমাদৃত ও আলোচিত। আত-তাফসিরুল বায়ানিয়্যু লিল-কুরআনিল কারিম, আল-কুরআন ওয়া কদ্বায়াল ইনসান, তারাজিমু সাইয়্যিদাতি বাইতিন নুবুওয়্যাহ উনার উল্লেখযোগ্য কারনামা। |
| ↑14 |
১৯৯৪ সালে জন্মান আব্দুল্লাহ দারাজ। ইমাম শাতিবির ‘আল-মুওয়াফাকাত’-এর ব্যাখ্যাকার উনি। আল-আজহারে পড়াশোনা করেন, ডক্টরেট করেন সার্বোন ইউনিভার্সিটি থেকে, থিসিসের শিরোনাম ছিল (La Morale Du Koran) ‘আখলাকুল কুরআন’। কোরআন গবেষণায় মালেক বিন নবি ও আব্দুল্লাহ দারাজের চিন্তায় সাদৃশ্য পাওয়া যায়, মালেক নবির ‘আজ-জাহিরাতুল কুরআনিয়্যা’য় ভূমিকা লিখতে গিয়ে দারাজ এইটা স্পষ্ট করেন। ইসলামি কালচার ও পশ্চিমা কালচার উভয়ের গভীর টেক্সচুয়াল পাঠ ছিল উনার। উনি পূর্ববর্তীদের মতো ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে শুরু করার পরিবর্তে লজিকাল ও হিস্টোরিকাল বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে তফসির শুরু করেন। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মুখতার শানকিতির মতে, কোরআন গবেষণার মধ্য দিয়ে দারাজ দুইটা নতুন জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করেন—১. আখলাকুল কোরআন ২. মাসদারুল কোরআন; যথাক্রমে উনার (দুস্তুরুল আখলাক ফিল কুরআন, আন-নাবাউল আজিম, মাদখাল ইলাল কুরআনিল কারিম) কিতাব থেকে এই ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৫৮ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলনের লক্ষ্যে লাহোরে অবস্থানকালে উনি ইন্তেকাল করেন। |
| ↑15 | মরোক্কান আলেম, দাঈ, সাহিত্যিক ফরিদ আল-আনসারি (১৯৬০-২০০৯)। রাজনীতিকেন্দ্রিক ইসলামি আন্দোলনের তীব্র সমালোচক হয়ে কুরআনকেন্দ্রিক দাওয়াহ ও আধ্যাত্মিকতার দিকে ফেরার ডাক দেন উনি। মওলাই ইসমাঈল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন এবং একজন উসুলবিদ ছিলেন। উনার (আল-বায়ানুদ দা’ওইয়ু : জাহিরাতুত তাদাক্ষুমুস সিয়াসি, আল-আখতাউস সিত্তাতু লিল-হারাকাতিল ইসলামি বিল-মাগরিব, আল-ফুজুরুস সিয়াসিয়্যু ওয়াল হারাকাতুল ইসলামিয়্যাতু বিল-মাগরিব, আল-ফিতরিয়্যাহ : বা’ছাতুত তাজদিদিল মুকবিলাতি মিনাল হারাকাতিল ইসলামিয়্যাহ ইলা দাওয়াতিল ইসলাম) গ্রন্থ দ্রষ্টব্য; এবং উনার (৩ খণ্ডের মাজালিসুল কুরআন, জামালিয়্যাতুদ দীন : মা’আরিজুল কলব ইলা হায়াতির রুহ, হাজিহি রিসালাতুল কুরআন) ইত্যাদি বইপত্রে দেখা যায় মসজিদকে সমাজ-গঠনের কেন্দ্র, কোরআনকে জীবনের দিশারী, দাওয়াতকে রাজনীতির চেয়ে বড় মিশন হিশেবে দেখাইছেন। সাঈদ নুরসিকে নিয়ে (আখিরুল ফুরসান) ও ফাতহুল্লাহ গোলেনকে নিয়ে (আউদাতুল ফুরসান) নামে উনার দুটা উপন্যাসও পাওয়া যায়। উনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তুরস্কে ইন্তেকাল করেন। |