উদিত দুঃখের দেশ (নবম পর্ব)

মূল : জুলফা কাতু’

আবিদা সুলতানা উমামা

শুকনামুখে আমি কেনানের দিকে তাকিয়ে আছি। গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনাকে কেউ এত ভিন্নভাবে নিতে পারে তা ওর দিকে তাকিয়ে থেকেও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। 

চোখ সরে যায় অন্যপাশে, শোবার ঘরের দরজায়। দেখি, এলোমেলো চুলের নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে ইউসুফের চোখজোড়া।

তের বছরের একটা ছেলে, বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে গিয়ে যার পেছনে ফেলে আসার কথা শৈশবের অতল বিস্ময়। সেসবের লেশমাত্র দেখি না আমি। দেখি নিজেকে গুটিয়ে নেয়া এক ভীত-সন্ত্রস্ত শিশু, যেকোনো মূল্যে ফিরে যেতে চায় সেই নিরাপদ দিনগুলোতে। যখন মা-বাবা বেঁচে ছিল, যখন ওর সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল বাড়তি একঘন্টা কার্টুন দেখার অনুমতি পাবে কি না। অথচ এখন ওর দীঘল চোখজোড়া জলে ভেজা। ভাইয়ার সিদ্ধান্ত আর পরিণাম সবই ও বোঝে এখন।

ওর ভেতর আমি লায়লাকে খুঁজে পাই। দেখি, প্রতিবার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আলাপ এড়িয়ে গেলে যে ভয় লায়লার চেহারায় ফুটে ওঠে ঠিক সেই ভয় ঘিরে আছে ওকে।

ও আল্লাহ! আল্লাহ গো! আমার যদি কিছু হয়, লায়লা শেষ হয়ে যাবে। তার চেয়ে ও মৃত্যুকেই শ্রেয় ভাববে।

এ কথা ভাবতেই আমার হাতে কাঁপুনি ধরে। দুহাতে মুখ ঢেকে আমি নিজেকে আদেশ করি, গভীর শ্বাস নাও।

আমার কথাগুলোও কি ওর কানে এভাবেই বাজে? আমাকে কি ওরও মনে হয় এত জেদি যে আমি দেখতেই পাই না কিভাবে কাছের মানুষদের তছনছ করে দিচ্ছে আমার কাজকর্ম? যত মহিমান্বিত কাজই হোক, ওদের ক্ষতি তো কম করবে না

চলে যেতে হবে এখান থেকে। লায়লাকে নিয়ে আমার এখান থেকে বের হতেই হবে। আমি মরে গেলে ও বাঁচতে পারবে না আর ও মরে গেলে আমি।

লায়লা, পরিবারে আমার সর্বশেষ আশ্রয়—আমার বোন—ও মরে গেলে আমি একটা রয়ে যাব শুধু একটা  খোলস হয়ে। গত অক্টোবরে ও অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছে। ও চলে গেলে আমি কী করব?

খাওফের মুখটেপা হাসি চোখে পড়তেই ও মাথা ঝাঁকিয়ে হাসতে শুরু করে।

“এবার বোঝো ঠ্যালা,” ওর মন্তব্য।

কপাল চাপড়ে নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেকে অভিশাপ দিতে গিয়ে মনে হয়, খাওফের কথাই ঠিক ছিল। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমি লায়লার নিরাপত্তাই চাই।

আমাকে যেতে হবে।

সিদ্ধান্তটা আমার হৃদয়ে এক নীল বেদনার ফুল ফোটায়। চোখ জ্বালা করে গড়িয়ে পড়তে না চাওয়া পানির ভারে। কী করে এমন অন্ধ ছিলাম আমি? উপরে তাকিয়ে আরেকবার খাওফকে দেখি, কেনানের পেছনে দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ও পরে আছে তৃপ্তির হাসি।

চোখ টিপে ও, “এখন শুধু আমের সাথে বোঝাপড়া বাকি!”

মাথা ঘুরায় আমার।

গায়ের জ্যাকেটটা ঝেড়ে সোজা হয় খাওফ। “আমার কথামত আমি এখন চলে যাচ্ছি। কিন্তু আবার দেখতে আসবো তোমাকে।”

পলক ফেলতেই ও গায়েব।

চোখ নিচু হয়ে যায় আমার। দেখি, কেনান আঙুল ফোটানোর মাঝে তাকিয়ে আছে।

“আ… সালামা,” প্রতিটা শব্দ এমনভাবে উচ্চারণ করে যেন পলকা কোনো ফুলদানি ধরে আছে হাতে, “আপনি ঠিক আছেন?”

“জ্বী,” একটু দ্রুতই জবাব দিয়ে ফেলি। “কেন?”

মাথা চুলকে বলে, “জানি না। আপনি এমন ভাবে আমার মাথার পেছনে তাকায়ে ছিলেন, যেন ভূত দেখতেছেন। আমি যে মাথা ঘুরায়ে নিজে দেখব সেই সাহসই হইতেছিলো না।”

গলার স্বর সহজ হয়ে আসে কেনানের, ঠোঁটে ফোটে সাময়িক মশকরার হাসি।

বৃথা হাসার চেষ্টা করি। “প্যারা নাই, আমি ঠিক আছি।” এ ছাড়া আর কীই বা করার আছে এখন।

কেনানকে আশ্বস্ত হতে দেখে বুঝতে পারি, আমি বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলিনি। এমন দীর্ঘ নিরবতার পর হাসি দিয়ে কি আর পরিস্থিতি সহজ করা যায়?

গলা ঝেড়ে বলি, “যদিও আমি এখানে থেকে যাওয়া নিয়ে আপনার সাথে একমত না।”

কী যেন ভেবে নিয়ে কেনান প্রশ্ন করে, “আপনি না আন্দোলনকারীদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেন?”

“তাতে কী? আমি শুধু হিপোক্রেটিসের শপথনামা পালন করতেছি। আপনি যা করতেছেন, তাতে নিজের ভাইবোনদের ক্রসফায়ারে দাঁড় করাইতেছেন।”

ও কাঁধ নাড়ে। “হয়ত আমি সিরিয়াকে এত ভালোবাসি যে পরে কী হবে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নাই।”

আমার কেমন যেন লাগে। “তার মানে চলে যাইতে বলতেছি বলে আমার দেশপ্রেম নাই?”

ও সতর্ক হয়ে ওঠে, “আরে না, না। আমি সেটা বলি নাই। আমি… সালামা, এই দেশই আমার আশ্রয়। সারা জীবন ধরে—এই উনিশটা বছর—অন্য কোথাও যাইনি আমি। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া মানে আমার কলিজা ছিঁড়ে ফেলা। এই ভূমিই আমি এবং আমিই আমার দেশ। আমার ইতিহাস, আমার পূর্বপুরুষ, আমার পরিবার—সবকিছু এখানেই।”

ওর দৃঢ়তা আমাকে হামযা আর ওর তেজস্বী ভাষণগুলো মনে করিয়ে দেয়। বাবার সাথে আন্দোলনে যোগ দিয়ে এসে প্রতিবার ও এভাবেই কথা বলতো। ও থাকলে কেনানকে অবশ্যই পছন্দ করতো। এইটুকু ভাবতেই আমার পেটে চিপ ধরছে।

মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবি হামযাকে দেয়া ওয়াদার কথা। আর ভাবি লায়লা কতোটা খুশী হবে যখন ওকে বলবো, এতদিন আমিই ভুল ছিলাম, যখন এই কথা বলে ক্ষমা চাইবো। যদিও আমি জানি, আসলে কেনানই ঠিক।

এখান থেকে চলে যাওয়া সহজ হবে না। আমার ভেতরটা ভেঙে চুরচুর হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে সিরিয়ার তীরভূমে। আমার মানুষগুলোর কান্না আমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাড়া করে বেড়াবে।

 

 

ঝাঁকি খেয়ে ঘুমটা ভাঙতেই দ্রুত হিজাবে হাত যায়। এমনভাবে জট পেকে গেছে যে মাথা থেকে প্রায় খুলেই যাচ্ছিলো। মাথা চেপে ধরে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করি। ফজরের সময় কেনান ডেকে তুলেছিলো, নামাজটা পড়তেই আবার ঘুমে তলিয়ে গেছি।

“উফ” স্বরে কাতরে কপাল ঘষতে ঘষতে হিজাব ঠিক করলাম। তাকিয়ে দেখি, লামার ছোট্ট শরীরটা নড়েচড়ে উঠছে। দ্রুত ওর কাছে গিয়ে গালে হাত দিয়ে যখন দেখি—জ্বরজ্বর ভাবটা আর নেই—স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেকি আমি। তখনই কেনান রান্নাঘর গরম চায়ের কাপ নিয়ে এসে একটা আমার হাতে দেয়। সারামাথার চুল এলোমেলো হয়ে আছে ওর। গালে গোলাপি আভা আর ঝলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বুক ধকধক করতে শুরু করে।

“গুড মর্নিং,” জানায় আমাকে।

“থ্যাঙ্কিউ।” চায়ের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। “লামা এখন বেশ ভালো আছে, আলহামদুলিল্লাহ।”

গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বুঝতে পারি পুদিনার চা। লায়লার খুব পছন্দ।

লায়লা!

চা আমার গলায় আটকে যায়। কেনান চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকায়, “কী হইছে?”

“না, ঠিক আছি।” গরম চায়ে জিভ পুড়ে চোখে পানি এসে গেছে। “লায়লার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি। আমার যাওয়া দরকার। কয়টা বাজে? হাসপাতালেও যাইতে হবে। ইয়াল্লাহ, আমি কয়ঘন্টা ঘুমাইছি! লায়লার কাছে যাইতে হবে এখনই। আপনার বোনের কী হয় খেয়াল রাখবেন, ঠিক আছে? ও এখন ভালো আছে কিন্তু ওর এন্টিবায়োটিক যেন মিস না যায়। চায়ের জন্য থ্যাঙ্কিউ।”

এক ঢোকে সবটুকু চা শেষ করতে গিয়ে জিভ পুরোটাই পুড়ে ফেলে আমি উঠে দাঁড়াই।

“কেনান, এখন কয়টা বাজে?” বলতে বলতে আয়নায় নিজের দিকে চোখ যায় আমার। আল্লাহ! এ কী অবস্থা আমার! ল্যাবকোটটা বগলদাবা করে ধ্বসেপড়া ব্যালকনির দিকে ছুটে যাই। ওখানের চাদরটা কেনান নামিয়ে ফেলেছে যাতে বাতাস আসে। গরমে পুড়ে যাওয়া আমার সারা গা এই তাজা হাওয়াটাই চাচ্ছিলো।

“এখন কি নিরাপদ সব?” ল্যাবকোট গায়ে চড়িয়ে নিই। “স্নাইপাররা কি আছে এখনো? লায়লার জন্য চিন্তা হচ্ছে। আল্লাহ যেন ওকে ঠিক রাখে। কেনান, কয়টা বাজে এখন? হাসপাতালে আমার ডিউটি আছে।” বাইরের রাস্তা দেখতে দেখতে কেনানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি তুড়ি বাজিয়ে। রাস্তা বেশ খালি, কোনো ছাদে কেউ লুকিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে না।

তখনই টের পাই, কেনান অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে আছে। ওর দিকে ঘুরতেই দেখি, আরাম করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খুবই মজা করে আমার অস্থিরতায় ফেটে পড়া দেখছে।

“আপনি জবাব দিচ্ছেন না কেন?” আমার প্রশ্ন শুনে চায়ে আরেকটা চুমুক দেয় ও, তারপর কাপটা রাখে মেঝেতে।

“আপনার এত লম্বা চওড়া মনোলগের মধ্যে সুযোগ পেলাম কই?” দাঁত বের করে হাসে ও।

“উপভোগ করেছেন জেনে খুশি হলাম।” বলে চোখ পাকাই। তাতে ওর থোড়াই ডর।

“আপনি কি সবসময়ই এরকম?”

“কী রকম?” ভ্রু তুলে প্রশ্ন করি।

“সবসময়ই এরকম প্যানিক করেন?”

“প্রায় দিনই।”

“ভালোই তো।” এখনো হাসছে ও। বিদ্রুপ করছে কি না তাও বুঝতে পারছি না। যাইহোক, ওর স্বর আর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করার সময় এখন আমার হাতে নেই।

“আচ্ছা। আমি বের হবো এখন। বাইরে কি স্নাইপার আছে এখন?” ব্যাগটা কাঁধে ভালোভাবে টেনে তুলি। প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে। এই মুহূর্তে কেন—কুঁচকানো হিজাবে আমাকে কেমন বাজে দেখাচ্ছে—এই চিন্তা কাজ করবে। 

“সেটা আমি কিভাবে বলবো?” ওর জবাব। “ওরা নিয়মিত টাইমিং পালটায়। আবার কখনো কখনো ফ্রি সিরিয়ান আর্মিও ওদের ঠেকিয়ে দেয়।”

“ঠিক আছে। আমি ম্যানেজ করে নিব।” কিছুটা বিরাগ নিয়ে কথাটা বলে দরজার দিকে হাঁটা ধরি।

কেনান দরজার সামনে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে পথরোধ করে, “কোথায় যাওয়া হচ্ছে, শুনি?”

“কোথায় আবার? ঘরে?”

“আপনার ধারণা, আমি আপনাকে একা যাইতে দিব? বাইরে স্নাইপার ওঁৎ পেতে থাকতে পারে জেনেও?”

“তাহলে কি আপনার সিক্রেট অদৃশ্য প্লেনে করে যাব?”

“দাঁড়ান, আমি আসতেছি সাথে।” জ্যাকেট গায়ে দিতে দিতে বলে ও।

“না, কোনো দরকার নাই। আপনার বোনের কাছে থাকা বেশি প্রয়োজন।”

“হইছে, আমার আম্মু সাজা লাগবে না। নিজের সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি, থ্যাঙ্কিউ ভেরি মাচ। এখন চলেন।”

“আপনার যাওয়া ঠিক হবে না—” জোর দিয়ে নিষেধ করার জন্য হাত নেড়ে বলি।

“আমি না আসা পর্যন্ত ইউসুফ সব দেখে রাখতে পারবে। এইটুকু ও পারে।”

আমাকে উত্তর দেয়ার কোন সুযোগ না দিয়েই ও বের হয়ে যায়। 

ঘোড়াড্ডিম! এই লোকের জীবন মরণের চিন্তা ও এবার আমার করা লাগবে। 

নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে ইউসুফ। লামার পাশে বসতে গিয়ে একবার আমার দিকে লাজুক দৃষ্টি ফেলে। 

“ওকে দেখে রেখো, ঠিক আছে? নিজেও সতর্ক থাকবে।” আমার কথায় মাথা নাড়ে ও। ওর গায়ের ছিন্নভিন্ন পোশাকের দৃশ্য আমাকে প্রচন্ড বেদনাহত করলেও তা এড়িয়ে যাই।

কেনানকে যেতে হবে—সিদ্ধান্ত নিই আমি—নয়ত এই ভাইকেও দাফনের ভার এই বাচ্চাদের ঘাড়ে এসে পড়বে।

 

 

ঝলমলে সূর্য আলো দিচ্ছে বাইরে, আনন্দ-ভয়ের মিশেল নিয়ে উঁকি দেই। একদিকে এই আলো শীতের বিদায়ী বার্তা আর অন্যদিকে, স্নাইপারদের জন্য মোক্ষম সুযোগ। 

অল্প কিছু লোক কেনানদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো। চায়ের কাপ হাতে ওরা আলাপচারিতায় মগ্ন। আর আশপাশে কিছু ছেলেমেয়ে হৈ-হল্লা করে যাচ্ছে। ওদের হাসির শব্দে মনে হয় নির্মলতার ছিঁটেফোঁটা এখনো তাহলে টিকে আছে, লড়ে যাচ্ছে। তাই মুহূর্তটা বুকে জড়িয়ে ধরি পরম যত্নে।

জুতার তলার নুড়িপাথরের কড়কড় নড়াচড়া নিয়ে আমরা বাড়ির পথে হাঁটি। পথে একটা ভাঙাচোরা বেকারির খোলা দেখতে পাই। তার বাইরে মানুষের লম্বা লাইন। দাঁড়িয়ে থেকে তারা ক্রমাগত হাত ঘষছে উষ্ণ রাখবে বলে। ওরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে, চোখ-মুখে অধৈর্য্যের ছাপ নিয়ে—যদি রুটি শেষ হয়ে যায় আর বাড়ি ফিরতে হয় খালি হাতে।

হাঁটতে হাঁটতে কাল রাতে নেয়া সিদ্ধান্তটা পাকাপোক্ত করি। ভয়াল অন্ধকারের বিপরীতে মোমের মরা আলোয় তো সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিলো, নিজের কাছে গচ্ছিত রাখা গোপন কথার মত ছিল। কিন্তু ঝকঝকে দিনের আলো যখন আমার ভেতরেও পৌঁছে যাচ্ছে, সিদ্ধান্তটাকে মনে হচ্ছে অপমানের নীল ছাপ মেরে দিয়েছে কেউ।

কেনানের দীর্ঘ অবয়বের দিকে চোখ যায়। সাইজে বড় জ্যাকেটেও ওর হাড্ডিসার অবস্থা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ওকে তো এমন দেখানোর কথা ছিলো না। ভাইবোনদের নিয়ে ওর তো সুস্থ-নিরাপদ আর আনন্দে থাকার কথা ছিল। ওর তো এখন স্টুডিও জিবলিতে ঢোকার জন্য জাপানিজ শেখার কথা ছিল।

ওর এখানে থাকা চলবে না।

“আপনারা কি আসলেই হোমসে থেকে যাবেন?” আলতোভাবে প্রশ্ন করি। “এখানেই কি জীবন যাবে আপনার?”

হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে ঘুরে তাকায় একরাশ বিস্ময় নিয়ে।

ধীরে ধীরে বলে, “মরে যাওয়ার প্ল্যান তো আমি করতেছি না।”

মাথা নাড়ি আমি। “যেভাবে উচ্চাশা আর বিপজ্জনক চিন্তাভাবনা নিয়ে আপনি চলতেছেন, এইটাই যথেষ্ট আপনার জীবন-কাহিনির ইতি টানার জন্য। আপনার মা-বাবা কি তা মেনে নিবে? আপনি চলে যাওয়ার পর আপনার ভাই বোনেরা একা হয়ে পড়বে না? আপনার শোকে যন্ত্রণায় ভুগবে না? আপনার বাবাকে দেয়া ওয়াদার কী হবে?”

চেহারায় গভীর বেদনার ছাপ নিয়ে ও তাকিয়ে থাকে।

“আমি পরিবারের একমাত্র মেয়ে ছিলাম। শুধু এক বড় ভাই ছিল, হামযা। আমার দুনিয়া ছিল ও। আমার বন্ধু। আমার সবকিছু। ও আর আব্বু একটা আন্দোলনে গেছিলো, মিলিটারি আসার আগে ওরা বের হয়ে আসতে পারে নাই। এক সপ্তাহ পর আমাদের বিল্ডিংয়ে বোমা হামলায় আম্মু মারা যায়।”

“সালামা!” ওর স্বর ভীষণ নরম, আমার কথার ভয়ে ভীত।

কিন্তু আমি বলতেই থাকি। “আমার পরিবার আমি হারায় ফেলছি, আর আপনারটা এখনো আছে। এই দৃশ্য রোজ দেখতে হয় আমার হাসপাতালে—মানুষ পারলে তাদের আত্মা বেঁচে দেয় আরেকটা মিনিট প্রিয়জনকে ধরে রাখার জন্য। আমিও পারলে সেটাই করতাম।”

চোখ জ্বালা করতে থাকে আমার, কোনমতে ভেঙে পড়া থেকে বিরত রাখি নিজেকে।

ডেইজিস ডেইজিস মিষ্টি-গন্ধা ডেইজিস

“জেলে গিয়ে দেখা করার চেষ্টা করছিলাম আমি। কিন্তু অনুমতি দেয় নাই। উলটা আমারেই এরেস্ট করে নিতেছিলো প্রায়, কিন্তু কিভাবে যেন ছেড়ে দিলো। আর যেন কখনো না যাই, ধমকাইলো।”

কেনানের নিঃশ্বাস কাঁপে। দ্রুত হাতে আমি গাল অব্দি গড়িয়ে আসা চোখের পানি মুছে ফেলি।

সবকিছু মনে পড়তে থাকে আবার—শুকনো রক্তের কড়া গন্ধ, গগনবিদারী চিৎকার। হোমসে অবরোধ পড়ার কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা। জেলখানাটা পুরান হোমসের বাইরে। গায়ের কাপুনি নিয়ে আমি জেলখানায় হাজির হয়েছিলাম। মাথার পেছনের আঘাতটা তখন প্রাথমিক ক্ষতচিহ্নের অবস্থায় ছিল, আমার রাতগুলো দূর্বিষহ হতে শুরু করেছিলো খওফের আনাগোনায়। আমি কি করছি সে বিষয়ে  লায়লার বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না কারণ ও নিজেই শোকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো আর চোখজোড়া থেকে অনবরত প্রবাহিত হতো অশ্রুনদী।

“সালামা কাশশাব,” চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়া মিলিটারি লোকটা কফির দাগ পড়া তালিকাটায় চোখ বুলিয়ে বলেছিল। মনে মনে আশা করছিলাম, দাগটা যেন কফিরই হয়।

“জ্বী,” 

ঘোঁৎঘোঁৎ করলো লোকটা। রূপালি সানগ্লাসের কারণে আমি ওর চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। 

“আপনার বাপ ভাই তো ভালই ঝামেলা পাকাইছে,” তার সোজাসাপটা কথায় আমি বিপদের আভাস পাচ্ছিলাম।

“প্লিজ,” বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা হচ্ছিল আমার। “প্লিজ, ওরা দুইজন ছাড়া আমার আর কেউ নাই, আমার মা না—আব্বু হাইপারটেনশনের রোগী। উনার ওষুধপত্র দরকার। আর আমার ভাই…” থেমে যাই আমি। লায়লার কথা ওদের বলা যাবে না। ওরা তাহলে ওকে ব্যবহার করে হামযাকে শাস্তি দিবে।

“এই একই নাকিকান্না আমি কতবার শুনি, সেইটা জানেন?” ক্রুদ্ধস্বরে বলে ওঠে লোকটা। “প্লিজ আমার মারে ছাইড়া দেন, উনি এসব কিছুই জানতো না। প্লিজ আমার ছেলেরে ছাইড়া দেন, ও ছাড়া দুনিয়াতে আমার কেউ নাই। প্লিজ আমার মেয়েরে ছাইড়া দেন, ও বুঝবার পারে নাই এইটা যে অপরাধ। প্লিজ আমার হাজবেন্ডরে ছাইড়া দেন, উনি বুড়া মানুষ।” লিস্টটা টেবিলে ছুঁড়ে মারতেই আমি শিউরে উঠি। “না, না, না। ওগোরে তো আমি বাইরাইতে দিমু না। ওরা আইন ভাঙছে। এইসব নিয়া ওরা দেশের শান্তি নষ্ট করছে।”

হঠাৎ কারো আর্তনাদ কানে আসে। চোখ বন্ধ করে ফেলি ভয়ে। সেই চোখ মেলে আবার তাকিয়ে থাকি সামনের লোকটার দিকে যে আমার পরিবারকে আটকে রেখে হাতে ধরে আছে আমার ভাগ্যলিপি। এত ঘৃণা হচ্ছিলো ওকে!

“আমি কখনো কোন আন্দোলনে যাইনি, আর কখনো যাবোও না। কসম করে বলতেছি। প্লিজ, প্লিজ আমার দিকে তাকিয়ে ওদেরকে ছেড়ে দেন। ওরা আর কখনো এরকম কিছু করবে না, আমি কথা দিচ্ছি।” কন্ঠে যথাসম্ভব অনুনয়ের সুর এনে বলি আমি, আর এজন্য নিজের প্রতিও ঘৃণা হয় আমার। বিদ্রোহ করলে পরিণতি কি হবে সেটা সরকার অনেক আগেই বলে দিয়েছিল। ৫০ বছর ধরে আমরা যেসব ভয় নিয়ে বেঁচে ছিলাম তার সব বাস্তবে রূপ নিয়েছে। 

সবগুলো হলুদ তার দেখিয়ে লোকটা হাসলো। তারপর উঠে দাঁড়ানো সিট থেকে। 

“ছোট খুকি, ওদের সাথে তোমারেও জেলে রাখার আগেই বিদায় হও।”

“আমি খুবই দুঃখিত,” কেনানের নিচুস্বর আমাকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে ডেকে তোলে।

“আমার জন্য তো দুঃখিত হতে হবে না, নিজের ভাইবোনের জন্য হন। এখানেই যদি থাকেন, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেইলেন না।”

ও কাঁধ টানটান করে। ঠিক এই মুহূর্তে বুঝতে পারি কেন ও এসব করছে। ঠিকই, বুঝতে পারছি। কিন্তু এভাবে তো হয় না। আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে লামার রক্ত বয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যখন ও লামার সাহসের বর্ণনা দিয়ে গেছে—ইউসুফ হারিয়েছে কথা বলার শক্তি এই আঘাতের কারণে—এসবের পরেও কি থাকা যায়? ওদের সাহায্য দরকার, কিন্তু সেটা হোমসে নয়। ওদেরকে তো ওদের প্রাপ্য শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে।

তবে কেনানের চোখের অগ্নিশিখা আর শব্দের আড়ালে চাপা যন্ত্রণারা প্রতিনিয়ত বলে যায়ঃ এখানে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে কেবলই অন্ধকার। বোকা তো ও নয়। কিন্তু এই অন্ধকারের ভয় দিয়ে ওর দেশের জন্য বুকভরা ভালোবাসাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। আসল ব্যাপার হলো—সমুদ্র-ঝড়ের গল্প শোনা আর সেই ঝড়ে আটকে পড়া তো কখনো এক জিনিস না।

“আপনি আসলে কী রেকর্ড করেন, কেনান?” আমার প্রশ্ন শুনে ভড়কে যায় ও।

“আ, আন্দোলন রেকর্ড করি বলছিলাম না? বিপ্লবের গান করি।”

“আর মানুষের মরে যাওয়া?”

চোখ মুখ কুঁচকে যায় ওর। “গুলির শব্দ পেলেই কাজ বন্ধ করে দৌড়ে পালাই।”

আমি এক ঝলক তার দিকে তাকাই, তারপর মাথা নেড়ে সামনে হাঁটা শুরু করি। মাথার ভেতর এলোমেলো ভাবনা ভেসে ওঠে, কিন্তু কেনানের গলা খাঁকারিতে সেটা ভেঙে যায়।

“আমার আম্মু একজন হামভি।” শান্তস্বর কেনানের।

কথাটা আমাকে থামিয়ে দেয়।

“হামা ম্যাসাকার থেকে বেঁচে ফেরে মানুষটা।” ওর কথা শুনে আমি ঘুরে তাকাই। “মিলিটারি যখন উনাদের শহর আক্রমণ করে একমাস পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালাইছিলো, উনি বেঁচে গেছিলেন। আম্মুর বয়স ছিল তখন সাত বছর, ওই বয়সে উনি নয়-বছর বয়সি বড়ভাইকে মাথায় গুলি লাগতে দেখছে। ভাইয়ের মগজ ছিটকে চারপাশে ছড়ায় পড়তে দেখছে। পরিবারের বাকিদের সাথে উনাকেও না খেয়ে থাকতে হইছে। তিন দিনে একদিন খাবার পাইতেন উনারা। আমার জন্মের আগেই আমি আমার পরিবার হারায় ফেলছি, সালামা। জন্মের পর থেকে আমি শুধু অন্যায়ই দেখতেছি।” বিরতি নিয়ে ও আমার দিকে তাকায়। ওই চোখে আছে কেবল কঠিন সংকল্প। সেটা এত তীব্র, আমার  গা কেঁপ ওঠে। “এই জন্যই আমি আন্দোলনে।যাই। এজন্যই রেকর্ড করি। এজন্য এখানে থাকতে হবে আমার। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগের এই এতগুলো বছর। এই স্বৈরাচার কি আপনার পরিবার কেড়ে নেয় নাই, সালামা?” 

জবাবটা ওর জানাই আছে। স্বৈরাচারীর নির্মমতার হাত থেকে কোন সিরিয়ান পরিবারই রেহাই পায়নি। হামা ম্যাসাকারে আমরা দুজনেই আমাদের জন্মের আগেই আমাদের পরিবার হারিয়েছি। কিন্তু কেনানের এই ক্ষত ওকে শৈশব থেকেই সঙ্কল্পিত করেছে। এই সঙ্কল্পই ওকে বড়ে করেছে, গড়ে তুলেছে। বিপরীতে আমি? বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগ পর্যন্ত কেবল এড়িয়েই গেছি।

গলার ভেতর কী যেন দলা পাকিয়ে আসে আমার। কান্নায় ফেটে না পড়লে এটা গিলে ফেলা সম্ভব না। তাই বাড়ির পথে হাঁটি আবার। এক সেকেন্ডের বিরতিতে কেনানও হাঁটে।

পথ কমে আসতে আসতে আমার উদ্বেগ বাড়ে। লায়লাকে আমার ছুঁয়ে দেখতে হবে যে ও বেঁচে আছে, ভালো আছে। বাচ্চাটা আমাদের পরিকল্পনা উলটে দিয়ে আগেই এসে পড়েছে কি না সেটাও একটা চিন্তা।

বাকি পথ আমরা নিজ নিজ চিন্তা আর দুশ্চিন্তার ভেতর থেকেই পাড়ি দেই, নিঃশব্দে। দৃষ্টিতে বাড়ির প্রতিবিম্ব ধরা দিতেই বুকে স্বস্তির হাওয়া বয়ে যায়। চারপাশটা নীরব একদম৷ কেনান আর আমি ছাড়া রাস্তায় কেউ নেই। সবকিছু যতটুকু স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব ততটুকুই আছে। রং ধুয়ে যাওয়া নীল দরজাটাও অক্ষত। চাবি বের করে দ্রুত হাত চালাই।

দেয়ালে হেলান দিয়ে কেনান বলে, “আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”

“কীহ! কেউ গুলি মারার আগে ঘরে ঢুকেন।” ও ঢুকতেই আমি দরজাটা বন্ধ করে দেই।

ঘরটা নীরব। লিভিং রুমের জানালা দিয়ে কোনো আলো আসে না। ভেতরে কেবল ছায়ার নৃত্য আর বাইরের চেয়ে বেশি শীতলতা।

“এখানে থাকেন,” ওকে বলি। মাথা নেড়ে ও মূল দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়, হুট করে লায়লা এসে পড়লে যেন ওর নজরে না পড়ে।

জোর গলায় হাঁক ছাড়ি, “লায়লা, আমি আসছি!”

ওর জবাব আসে না কোনো। পেটের ভেতর জট পাকায় আনার।

“ঘুমাচ্ছে কি না?” দরজামুখী থেকেই কেনান বলে।

“হইতে পারে।”

ও সাধারণত লিভিং রুমেই ঘুমায় কিন্তু সেটাও খালি আর অস্বাভাবিকরকম ঠান্ডা হয়ে আছে। কারণ আড়াল থেকে কোন আসছে না। রান্নাঘরটাও যেন বোবা হয়ে গেছে। আমার সারা শরীরের ভেতরে লতার মত বাড়তে থাকে অস্বস্তি।

“লায়লা!”, আবার ডেকে আমি হলওয়ের দিকে হাঁটি। 

ভয়ে আমার কলিজা যেন গলা অব্দি উঠে এসেছে। লাফিয়েই চলেছে পাখির ছানার মত। ওর রুমের দরজা বন্ধ। আমি প্রথমে নিজের রুম দেখে আসার সিদ্ধান্ত নেই।

আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে যখন দরজাটা খুলি, স্বস্তিতে এমনভাবে হাঁফ ছাড়ি যে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম মাটিতে।

আমার বালিশ বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে লায়লা। চোখজোড়া মুদিত, নিরব প্রার্থনায় কাঁপছে ঠোঁট।

“লায়লা!” ডাকার সাথে সাথেই ও চোখ খুলে তাকায়।

“সালামা!” প্রায় লাফিয়ে নামে ও বিছানা থেকে।

ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরি একজন আরেকজনকে। আমার সারা হাত কাঁপছে, ওর চুল এসে পড়ছে মুখে। কিন্তু সেটা ব্যাপার না। ও বেঁচে আছে আর এখনো সন্তানসম্ভবা, সেটাই আমার কাছে মুখ্য।

পিছে সরে আমার কাঁধ ধরে ঝাকি দেয় ও, “কোথায় হারায় গেছিলা তুমি? হ্যাঁ?”

“এক রোগীকে ওর বাসা থেকে আনা যাচ্ছিল না তাই বাসায় গিয়ে অপারেশন করতে হইছে। আর এরপরেই হঠাৎ বাইরে ঝামেলা শুরু হইছিল তাই আমি আর আসতে পারিনি,” এক নিঃশ্বাসে সবগুলো কথা বলি।

ওর চোখজোড়া লাল হয়ে আছে, গাল বিবর্ণ। তবু একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে, “আচ্ছা ঠিকাছে।”

“রোগীর ভাই আমাকে ঘরে নিয়াসছে। উনি, আ-ইয়ে-এখানেই দাঁড়ানো,” ক্যাজুয়ালি বলার চেষ্টা করি।

আমার কাঁধের উপর দিয়ে তাকায় ও, “এখানে? মানে, আমাদের ঘরে?”

আমি মাথা নাড়ি।

ওর বুঝতে সময় লাগে আর যতক্ষণে বোঝে ততক্ষণে প্রতি শব্দে ওর স্ক্যান্ডালাস শক। “ইয়াল্লাহ, সালামা! এই তুমি সারারাত একটা ছেলের বাসায় ছিলা?” 

ওর কাঁধে আলতো ধাক্কা দিতেই ও খিলখিল করে হেসে ওঠে।

“এমন কইরো না ভাই।” আমি বলি, “টেনশনের ঠ্যালায় আমি অসুস্থ হয়ে যাইতেছিলাম। তোমারে কলও দিছিলাম, ধরো নাই কেন?”

সরুচোখে তাকিয়ে ও জবাব দেয়, “তুমি ভালো করেই জানো আমি অপরিচিত নাম্বারের কল ধরিনা।”

“ঠিকাছেএএ, যাক আলহামদুলিল্লাহ তুমি ঠিক আছো, এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”

“হ্যাঁ।”

“আমার কেনানকে বলতে হবে, তুমি ঠিক আছো। তুমি চাইলে একবার হাই হ্যালো দিয়ে আসতে পারো।”

ওই রাগী চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে নিজের দিকে দেখায়। এলোমেলো চুল, ভেজা চোখ, দুমড়ানো মোচড়ানো কাপড়-চোপড়। “এমনে যাব হাই-হ্যালো দিতে? না ভাই, থ্যাঙ্কিউ। আমি এখানেই ঠিক আছি।” 

হেসে মাথা নাড়ি আমি।

আমি রুম থেকে বের হয়ে এসে দেখি কেনান এখনো পিছন ফিরে আছে। 

চুপ করে ওর চওড়া কাঁধের দিকে। হাত দুটো পকেটে রেখে ও বুটের হিলে ভর দিয়ে সামনে-পিছে দুলছে। এই ধুলোভরা হলওয়েতে এক মুহূর্তের জন্য আবারও সেই সম্ভাব্য জীবনের কল্পনা ভেসে ওঠে। যেন আমার জীবন এখন নিজে আঁকা স্টুডিও জিবলির মুভি। যেন এখন পৃথিবীতে আমাদের নিজস্ব হাসি-আনন্দ আছে, যেন আমার অনামিকায় জড়িয়ে আছে ওর পরানো সোনালি আঙ্গুঠি। শুধু ভাবতেই আমার গাল রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। তবু ভেবে যাই। অন্তত কল্পনার সুখটুকু তো আমার পাওনা।

“কেনান, এদিক ফিরতে পারেন আপনি। লায়লা আসবে না।”

দৃষ্টি অবনমিত রেখেই ও ঘুরে দাঁড়ায়।

“উনি ঠিকাছে?” প্রশ্ন করে।

আমি মাথা নাড়ি।

হলওয়ের জরাজীর্ণতার দিকে দৃষ্টি দেয় ও। কিছুই বলে না তবু ওর চেহারায় ফুটে ওঠে বিষণ্ণতার ছাপ।

“আপনি শিওর, উনি ঠিকাছে?” আবার প্রশ্ন করে। “আমি কিছু এনে দিব আপনাদের? মানে… রুটি বা দুধ—যদি দোকানে থাকে?”

মাথা নেড়ে নিষেধ করি। “থ্যাঙ্কিউ। ও ঠিক আছে, কিছু লাগবে না এখন।”

দম ফেলে ও। “ঠিক আছে। আচ্ছা, বিদায় নিব তাইলে এখন।”

বিমর্ষ করে দেয় আমাকে শব্দটা। কী বিচ্ছির লাগে এই শব্দ, বিদায়।

তবুও বলি, “আচ্ছা ঠিক আছে।”

দরজা খুলে বের হওয়ার আগে একবার মাথা নেড়ে আবার পেছন ফিরে তাকায় ও। “থ্যাঙ্কিউ, সালামা, সবকিছুর জন্য। আপনি শুধু লামার না, আমার আর ইউসুফেরও জীবন বাঁচায়ে দিছেন।”

ওর উষ্ণ হাসি সবুজ চোখের উজ্জ্বলতা যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে আরো।

শুধু এই মুহূর্তেই হয়ত।

ও বের হয়ে যায়। আর সেই কালো অবয়বের এলোমেলো ভাবনারা অবশেষে আমার ঠোঁটে শব্দের আকার পায়।

“কেনান!” আমার চিৎকারে ও থেমে যায় একফুট দূরেই।

“জ্বী?”

হেঁটে ওর দিকে এগিয়ে যাই আমি। ওদের তিন ভাইবোনকে আমি বাঁচাতে পারব, আমি জানি আমি পারব।

“আপনি হাসপাতালে রেকর্ড করতে পারেন।” ওর কাছাকাছি পৌঁছে বলি।

ওকে হতবাক মনে হয়। “কী?”

“আপনি হাসপাতালে আহতদের রেকর্ড করতে পারেন। এখানে কী হইতেছে সেটা আপনি বাইরের পৃথিবীতে দেখাইতে চাইতেছেন না? হাসপাতালের চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর হয় না। বিক্ষোভগুলো যেহেতু রাতে হয়, আর বাইরে অন্ধকার থাকার কারণে ক্যামেরায় অত ভালো তো আসে না। কিন্তু হাসপাতালে আপনি স্প…ওইখানে করাটা বেশি কাজে দিবে আরকি।” আমার আওয়াজ ধীরে ধীরে নেমে আসে।

ওর চোখজোড়া নরম হয়ে আসে আমার কথা শুনে। মিনিটখানেক তাকিয়ে থেকে এরপর জিজ্ঞেস করে, “কেন?”

“কেন মানে?”

“আপনি তো বললেন আমার কাজ আপনার কাছে বিপজ্জনক মনে হয় তাইলে কেন আপনি চাইতেছেন এটা আমি আরও করি তাও আবার আপনার কাছাকাছি জায়গায়?”

রক্তে একটা উদ্বেগী স্রোত বয়ে যায়। সেটা দূর করার জন্য আমি আঙ্গুল মোড়াই।

কারণ যখন আপনি মৃত্যু পথযাত্রীদের দেখবেন, যখন বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শিশুদের দেখবেন আর ওদের ভয়-যন্ত্রণা মেশানো আর্তনাদ শুনবেন—হয়ত তখন বুঝবেন আপনার এই ভালো থাকাটা, এইখান থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকাটা কতো সৌভাগ্যের বিষয়।

সেটা না বলে আমি শীতল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। “আমি ভাবতেই পারি এটা বিপজ্জনক কিন্তু তাতে এটা বদলে যাবে না যে আমি দেশটাকেও ভালবাসি। আর এভাবে আরো মানুষ মারা যাক আমি সেটা চাই না।”

ওর কান লাল হয়ে যায়। এক হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। “আ-আমি আসলে সরি। আমি এরক—”

“প্যারা নাই। আমি জানি আপনি ঐরকম কিছু মনে করে বলেন নাই। যাইহোক আমি আপনাকে জোর করতেছি না। আপনি করতে চাইলে বইলেন।”

আরো একবার ওর উজ্জ্বল সবুজ চোখে চোখ পড়ে আমার।

“হ্যাঁ, আমি করবো”

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে আমার ভেতর থেকে। “গুড। ডক্টর যিয়াদের অনুমতি লাগবে আমাদের, আমার মনে হয় উনি দিয়ে দিবেন। কারণ নিজের সবকিছু উৎসর্গ করে দিছেন উনি এই যুদ্ধে।”

“বিপ্লব, সালামা,” কেনান বলে। ওর মুখে বিষণ্ণ হাসি। “এটা একটা বিপ্লব।”

“তাহলে কালকে সকাল নয়টায় হাসপাতালে আসেন।”

 

 

আমি আবার ভেতরে ফিরতেই দেখি, দরজার সামনে লায়লা দাঁড়িয়ে আছে। মুখজোড়া ভরে আছে একানওকান হাসি।

“কেনান, হুমমম?” ভুরু নাচিয়ে বলে ও আর আমি বিরক্তি দেখাই।

“খুব তুলুতুলু মনে হইতেছিলো তোমাকে ওইখানে। আমি তো আর একটু হইলে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যাইতাম, কী হচ্ছে দেখার জন্য।”

কান গরম হয়ে যায় আমার, ওকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করি। কিন্তু দ্রুত হাতে ও আমারকে টেনে ঘুরিয়ে ধরে।

“তুমি লজ্জা পাচ্ছো কেন, হ্যাঁ?” জিজ্ঞেস করে।

“না তো,” কথা আটকে যায় আমার।

চোখ সরু করে তাকায় লায়লা। “উনি কি তোমার পরিচিত?”

“হ্যাঁ?”

“হায় আল্লাহ! তোমার কাছ থেকে যদি এভাবে টানাটানি করে উত্তর নিতে হয়, আমি কিন্তু মাথায় বাড়ি মারব,” তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বলে ও।

“ঠিকাছেএএ! আমি—আম—ও হচ্ছে ওই ছেলেটা, গত বছর যার আমাদের বাসায় আসার কথা ছিলো মাকে নিয়ে, ওই যে বিয়ের আলাপে।” কোনোমতে এক নিশ্বাসে বলি কথাটা।

নিশ্চুপ সব। তারপর…

“কীইইইই!”

লায়লা যখন একটানা বকতে শুরু করে তখন আর আমার কথা বলার কোনো সুযোগই থাকে না। আমি যা ভাবছিলাম আর যা ভাবিনি, সবই ওর মুখে খইয়ের মত ফুটতে থাকে—কেনান আর আমি একে অপরের জন্যই জন্মেছি। তাকদীর এমনই। আমি খুব সুখী হবো। আমি বিয়ে করব। আমরা হবো পাওয়ার কাপল। আমাদের বাচ্চারা ওকে প্রিয় খালামনি বলে ভালোবাসবে। কী অসাধারণ। আমাদের বাচ্চারা একসাথে বড় হবে। আমরা বেঁচে থাকব।

ওর এই বকবক আমার পিছু নেয় রান্নাঘর থেকে আমার রুম পর্যন্ত। আমি সেখানে গিয়ে কাপড় বদলে নতুন সোয়েটার পরে নেই, তার উপর আবার ল্যাব কোটটা গায়ে চাপাই—কারণ হাসপাতালের শিফটের জন্য এরমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে—তারপর আবার সামনের দরজার দিকে হাঁটি।

“লায়লা, এই সবই শুনতে দারুণ সুন্দর,” ও দম ফেলতে থামলে আমি বলি। “কিন্তু আমাদের সমস্যা আরো অনেক বড়।”

এক গভীর শ্বাস নিয়ে, নিজেকে শক্ত করি, নিজের কথাতেই ভেঙে পড়ার জন্য “আমি সিদ্ধান্ত নিছি, আমরা চলে যাবো। আমি আ’মের সাথে কথা বলব আর নৌকার খরচ জোগাড় করার একটা উপায় খুঁজে বের করব।”

লায়লার মুখ হা হয়ে যায়। “কী? কী কারণে তুমি সিদ্ধান্ত বদলাইছো?” নিচুস্বরে প্রশ্ন করে ও।

“বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়ে দিছে।”

লায়লা হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধ ধরে আমাকে জড়িয়ে ধরে। “আমি জানি এটা তোমার জন্য অনেক কঠিন একটা সিদ্ধান্ত। কিন্তু তুমি কিছু ভুল করতেছো না, বুঝছো?”

আমি চুপচাপ শুধু ওর গায়ের ডেইজির গন্ধটা টেনে নিই।

“আমাকে বলো,” ও জোর করে “বলো তুমি কিছু ভুল করতেছো না এই সিদ্ধান্ত নিয়ে।”

আমি হেসে ফেলি, “আমি… চলে গিয়ে কিছু ভুল করছিনা।”

আলিঙ্গন ছেড়ে আমার গালে হাত বুলিয়ে দেয়। “ভালো মেয়ে।”

আমি বের হতেই ও আমার হাত ধরে। আমি ফিরে তাকাই।

“সালামা,” লায়লা হাসতে হাসতে বলে। আর চিড় ধরা দরজার ফাঁক গলে রোদ মুখে পড়ে, ওকে একদম আগের লায়লার মতো দেখায়। লালচে গাল, সমুদ্রের মতো নীল চোখে প্রাণোচ্ছলতার ঝিলিক। “ভবিষ্যতের কথা ভাবলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবেনা রে। মরে যাবো বলে তো আর জীবন থেমে যাবে না। পৃথিবীর যে কেউই যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় মরে যাইতে পারে। আমরাও তার ব্যতিক্রম না। আমরা শুধু বাকিদের চেয়ে মৃত্যুটা বেশি ঘনঘন দেখি, এই আরকি।”

আবারও ভাবনার অলিন্দে ফিরে আসে কেনান আর ওকে ঘিরে সেই সম্ভাব্য জীবন। শনিবার রাতে জিবলি মুভির ম্যারাথন। ছোটছোট চারাগাছ সংগ্রহ করে ঘরটাকে প্রাণস্পন্দিত করে রাখা। লায়লা আর সালামাবাবুকে ডিনারের দাওয়াত। হামযা ভাই আর কেনানের সকার বা ভিডিও গেইমস নিয়ে হুটোপুটি।

অথচ আমি গলা খাকারি দিয়ে ওকে বলি, “ঠিক আছে, রাতে দেখা হবে, লায়লা।”

ওর হাসিতে প্রতিবিম্বিত হয় কেনানের হাসিতে মাখা বিষণ্ণতা।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments