এমন হয়-হাজার চেষ্টাতেও অনেকে বুঝতে পারে না, সে কার হয়ে কথা বলে চলেছে। শিশিরভেজা ঘাস শীতের পক্ষ নিয়ে একটা সুন্দর সকালের জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের মাড়িয়ে সেই সকাল আসার আগে আমরা তিনজন কোথায় যাইতেছি?
চারদিকের মর্মরহীনতা কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে। হয়ত ভোর হবার কিছু বাকি। একটু আলো-আঁধার ভাব। তবু সবই যেন আন্দাজ করতে পারতেছিলাম আমরা। কোনো পাখির তেমন উড়াউড়ি দেখতেছি না এই দিকে। একটা দোয়েল যেন সবার আগে পাখিদের হয়ে ডেকে উঠল। পাখির ডাকে মনে একটু আশা জাগল। একটা ভুবনে আমরা আছি মোটামুটি নিশ্চিত।
আমরা তিনজন জোরে পা চালাই সামনে। তিনজনের একজন মেয়ে। আমরা দুইজন তার অনুসরণকারী। অনেক অনেক প্রান্তর দাবড়ায়ে এইখানে আসলাম। আমরা যেন আশাবাদী। তার পিছু পিছু কখনো। কখনো পাশাপাশি। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আমাদের মধ্যে বিশ্বাস জমে গেছে। সোজা কথায় মেয়েটার প্রেমে পড়ছি আমরা দুজন। এখন মেয়েটা যাই বলে তা বিশ্বাস না করে উপায় নেই আমাদের। সে বলল, চলো তোমাদেরকে নিয়ে যাই একটা বাঁশের সাকোর উপর। নদীর ধারে। সেই নদীর কিনারে আছে একটা আজব জামরুল গাছ। সারা বছরই জামরুল ধরে ঐ গাছে।
আমাদের আরও দূরের কোনো পথে কি রওনা দিতে হবে তার সাথে! সেই সফর আমাদের অজানা। শুধু মেয়েটাই চেনে। আমরা আসি নাই কভু এইদিকে। কিন্তু ভাব দেখে মনে হচ্ছে এ জায়গা আমাদের চির চেনা। মাথার উপর বিশাল আকাশ দেখেই মনে হলো এইটা তো পৃথিবীই অন্য কোনো গ্রহ তো না! ভয়ের তো কিছুই নাই। সঙ্গী একজন চিনলেই তো চলে। তার চোখে আমাদের বিশ্বাস ঝলমল করতেছে। অদ্ভুত এক চশমা পরে ছিল সে। চশমার এই পারে আমরা, আর ওপারে সে। তাকে চিনি না, তবু কেন যেন তাকে আপনজন ভাবতেছি। প্রশ্ন জাগে-সে কি সত্যিই চশমার ওপার থেকে আমাদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে? তার চশমারও প্রেমে পড়ে গেছি দেখতেছি আমরা।
আহা একটু বৃষ্টিটিষ্টি যদি হতো। আরেকটু মিহি ঠান্ডা বাতাস পেতাম। ফুলকপি বাগানের ভিতর মূলা আর পালং লাগানো হয়েছে এমন একটা খেত পার হচ্ছি। কি সুন্দর খেজুর বন পথের ধারে। মনটা ভরে গেল। চারদিকে এত সবুজ। মাঠটা একবারে পার হতে মন চাচ্ছে না। এই মাঠেই না হয় আমরা কটা দিন থেকে যাই। আমাদের তাড়া কিসের? মেয়েটার শরীর থেকে বকুল ফুলের গন্ধ বের হচ্ছে। কী এক মিহি সুরে কথা বলতেছে সে। যেন আমাদের একটা মহান কিছু সে করে দিবে। আমরা যেন তারে হারায়ে পাইছি। তারে ছাড়বো না আর কোনোদিন। এমন মনে হচ্ছে কেন!
মেয়েটার পায়ে কেডস জুতা। তার পায়ের জুতার ছাপ মাটিতে ফুটে উঠছে। কিন্তু আমাদের দুজনার পায়ের ছাপ মাটিতে উলি উঠতেছে না। মাটি নরম তবু আমাদের পায়ের ছাপ উঠা উচিত। সামনে বিশাল লাউয়ের খেতের পাশে এসে পথটা বাঁক নিল। তাকে বলি, এবার কোনদিকে যাবো?
দূরে দেখা যাচ্ছে—স্যালো মেশিনের থেকে পানি বের হচ্ছে তো হচ্ছেই। ইচ্ছা হচ্ছে মাটির নিচের সতেজ পানি গিয়ে দুহাত পেতে একটু খেয়ে আসি। মেয়েটা বলল, ঐ যে স্যালো মেশিন দেখছ, তার পাশেই বিঘা বিঘা ধানের জমি। একটু গোলাপ ফুলের চাষ হয় তোমাদের বেড়াতে নিয়ে যাবো। এখন ডান দিকে মোড় নাও। আমাদের আরও কয়েক মাইল হাঁটতে হবে। মনে হচ্ছে এ মেয়েই এই রাজ্যের মালিক।
আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি। ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। চারপাশে কেউ নেই-শুধুই বিশাল এক মাঠ, আর তার ভেতর দিয়ে আমাদের হাঁটা চলতে থাকে, থামে না। হঠাৎ মেয়েটার কাঁধে আমরা দুজন একসঙ্গে হাত রাখলাম।
এখন একটা কিচ্ছা শুরু করো, যার শেষ আর কোনোদিনও না হয়, আমরা বলি।
সে হেসে উত্তর দেয়, তোমরা না বললেও আমি তাই করতাম—আমার নিজের প্রয়োজনেই।
আমরা বলি, “কিচ্ছা আমাদের বাঁচায়ে রাখে।
আপাতত তোমাদের কিচ্ছা তোমাদের কাছেই রাখো। আমার কিচ্ছা শোনো আগে, মেয়েটি বলে।
আমরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই। ঠিক আছে, তবে তোমার কিচ্ছা যেন আমাদের পথের থেকেও লম্বা হয়।
মেয়েটি তার গল্প বলতে শুরু করে—
এক ছিল এক পিঁপড়ার দল। তারা সারাদিন পরিশ্রম করত। দিনে আহার করত না। কারণ আহার করলে সময় নষ্ট হবে। সময় হারাইলে আর পাওয়া যাবে না। এই কথায় তারা সবচাইতে বেশি কান দেয়। দিনে মরারও সময় নাই। দিন হইল আহরণের সময়। তাই তারা রাতে আহারের সিদ্ধান্ত নেয়। একটা পুরানা বুড়া আমগাছের গোড়ার মাটির গর্তে ছিল তাদের বাসা। সেই আম গাছের পাশেই ছিল একটা জামরুল গাছ। পরের দিন সকালে হাড়ভাঙা খাটুনি থাকায় তারা ঐ জামরুল গাছটার নিচে পড়া পাতার নিচে ঘুমাই নিত। এমন ঘুম আসত ঘুম প্রায় ভাঙতই না। যতক্ষণ না একটা আধা খাওয়া বাদুড়ে চাটা জামরুল তাদের গায়ের পর পড়ত। শুকনা পাতার খস খস শব্দে আর জামরুলের ফুল পাতার পতনে তাদের ঘুম ভেঙে যেত। প্রথমে তারা তাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য বাদুড়কে ভর্ৎসনা করত। ক্ষুধায় অবশ্য অনেক সময় তাও ভুলে যেত। পিঁপড়ারা জামরুল ভক্ষণ করতে করতে ওদিকে রাত ভোরের দিকে রওনা দিত। তাদের আর ঘুম হত না। এইভাবে তাদের নির্ঘুম রাতদিন কাটতে থাকল। তারপর একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল…
পিঁপড়াদের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের অর্ধেক বয়স যেন কমে গেল। অবাক হয়ে বলি, তোমার গল্প থামাও। তোমার কিচ্ছা শুনতে শুনতে আমরা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছি! আমাদের এখন কেন এত বালক বালক লাগছে? লজ্জা কাজ করছে। আমরা মেয়েটার কাঁধ থেকে হাত সরালাম, কিন্তু মেয়েটা আমাদের হাত নিজেই নিজের কাঁধে টেনে নিল। এটা কি কোনো ছলনা? না, সে আদর করে আমাদের মুখ মুছে দিল। মনটা ভরে গেল। আমরা সামনে, আকাশের দিকে তাকালাম। চাঁদ তখনও ডুবে যায় নাই। আমরা মেয়েটাকে চাঁদের পাশে উড়তে দেখতে চাইলাম।
আমরাই বা কে, আর সেও বা কে? কোথা থেকে আমরা এলাম, কোথায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো? আদৌ কি কোনো গন্তব্য আছে আমাদের? যদি গন্তব্যই না থাকে, তবে তাকে কি যাত্রা বলা যায়?
মেয়েটার শরীরের গন্ধ আর ঠোঁটের সারাক্ষণের হাসি আমাদের তাকে ঘিরেই আটকে রেখেছে। আমরা মাথা রেখেছি তার কাঁধে। যেন কোথাও কোনো ভয় নেই। সত্যিই কোনো ভয় নেই! মনে হয়, কেউ আমাদের কানে কানে সে কথাই বলে যাচ্ছে।
আমরা আগাইতে আগাইতে কোথায় এসে পড়লাম। ওমা এইটা একটা খাল দেখতেছি। খালের পানিতে আমাদের ছায়া পড়ছে না! মেয়েটার ছায়া পড়তেছে। ওমা আমাদের কোনো ছায়া নাই! কিন্তু আমাদের ছায়া তো ছিল। আমাদের ছায়া আমাদের ছাড়লো কেন! আমরা দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকাই। কিন্তু আমাদের চোখে কোনো সন্দেহ নাই, মেয়েটা ছাড়া। যেন আমরা স্বয়ং সুন্দরের হাত ধরে বসে আছি। সুন্দরের কাছ হইতে গল্প শুনতেছি। গল্পগুলো ক্ষণপ্রাণ হয়ে উঠতেছে। আমাদের বারবার তাই মন উতালা হয়ে উঠছে। আরও গল্প শোনার। গল্প না শুনলে আমাদের কী হবে।
খালের পানি থেকে একটু পচা গন্ধ উঠে আসতেছে আমাদের সেইদিকে ভূক্ষেপ নাই। একটা লেজ নাচুনে আমাদের দেখে উড়ে গেল। আমরা মুগ্ধ যেন কিসে। খালের পাড়ে আকাশ বিস্তারী বড় বড় শিরিষ, শিমুল, আর কড়ই গাছ দেখতেছি বাতাসে দুলতেছে । গাছগুলোর পাতা একবার ঝরে পড়তেছে নিচে মাটিতে, আবার উড়ে গাছে গিয়ে বোঁটার সাথে জোড়া লেগে যাচ্ছে। নাকি ওগুলো সবুজ টিয়া পাখি। পাতা না টিয়া পাখি তা যাচাই করার দিকে আমাদের মন নাই। খাল পাড়ে দেখতেছি তিন পায়ের একটা বকনা বাছুর। আমি ভালো করে খেয়াল না করলে তো বুঝতেই পারতাম না! দেখি পা চারখানই । বার বার গুনতে আমাদের ভুল হইতেছে কেন। ঐ যে তেঁতুলে ভরা একটা গাছ। দেখে মুখে পানি এসে যাওয়ার কথা! কই কিছুই হচ্ছে না! আমরা ঠিক আছি তো!
গালের পাড়ে একটা ওলানঅলা একটা বিশাল গাই গরু। হড় হড় করে গরুটার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই অশ্রু খাচ্ছে কয়েকটা চ্যাঙড়া টাইপের কালো ফিঙে। ওরা গরুটার শিঙে বসে রেস্ট নিতেছে। অথচ পাশের খালের থেকে সে পানি খাইতে পারত!
একটা ফিঙে ধরতে মেয়েটা গাই গরুটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখি ফিঙেটা তারে ভয় পাইতেছে না একটুও। আমাদের হাতে ফিঙেটারে দেয়। আমরা দেখতেছি ওইটা আসলে একটা মাছরাঙা পাখি!
মাছরাঙাটা উড়ে গিয়ে খালের পানিতে কলমি লতার পাশে একটা বাঁশের উপর গিয়ে বসে। পানিতে ঝুপ মারল। কিন্তু তার ঠোঁটে কোনো মাছ দেখলাম না। সে মাঠের দিকে উড়ে গেল। এসব সাধারণ কিছু দৃশ্যে কী আর আমরা আটকে থাকি। দেখি তিনটা পথ তিন গ্রাম থেকে এই খালে এসে মিশেছে।
আমাদের কি তিনজনের আলাদা পথে ছড়িয়ে পড়তেই হবে? মেয়েটি হঠাৎ আমাদের শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে, ত্রিমুখী পথ আমার ভীষণ ভয় লাগে।
আমরা শান্ত স্বরে জবাব দিই, অচেনা পথে গল্পগুলিও তো অচেনা হয়ে ওঠছে।
ততক্ষণে আমরা খালের উপর দিয়ে টেলিফোন পোলে তারগুলো বহুদূর কোথায় গিয়ে মিলিত হয়েছে তার দিকে তাকিয়ে আছি। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসতেছে। এক ঘন কুয়াশারাশি আমাদেরকে ঢেকে ফেলছে। মেয়েটিকে কুয়াশায় হারিয়ে ফেলি কিনা! শুধু ডর লাগতেছে! দুই হাত দিয়ে মেয়েটার মুখের উপর থেকে কুয়াশা সরাই। ও বলে, কুয়াশারে ভয় পাইলে হবে! আমরা বলি, তোমার মুখ ঢাকা পড়লে আপাতত আমরা কী দেখে বাঁচবো।
দূরে কিছু টালির ছাউনি লাল বাড়ি দেখা যাইতেছে। যেন আমাদের আপন কোনো খালা গরম ভাত বেড়ে আমাদের জন্য ওয়েট করতেছে। আমাদের কেবলি দেরি হয়ে যাইতেছে। দূরে খালের উপর একটা কাঠের ব্রিজ দেখতেছি । চলো, ওইটার উপর আমরা কিছুক্ষণ কাটাই, মেয়েটা বলে। ওইটার উপর দিয়ে হাঁটতে গেলে আমরা পানিতে পড়ে যেতে পারি । আমরা দুজনেই সাঁতার জানি না। নিশ্চয় মেয়েটা সাঁতার জানে।
মেয়েটা আস্তে করে বলে, চলো তাহলে খালটার পাড়ে গিয়ে একটু বসি। আমরা অবশ্য এতদূর হাঁটছি তবু ক্লান্তি কাবু করতে পারে নাই। আমাদের একটু পানি তেষ্টা পেয়েছে। মেয়েটা বলে, আরেকটা গল্প শোনো তাহলে পানির কথা ভুলে যাবে। মেয়েটার মাতৃসুলভ কথা বলায়—হঠাৎ আমাদের দুজনেরই খারাপ লাগে। ও হেসে বলে, দুই দুষ্টু ! এবার আবার মেয়েটাকে আমাদের আগের মতো ভালো লাগে।
সে বলে, আমাকে আরও শক্ত করে ধরে রাখো। আমি যেন তোমাদের হাতছাড়া না হই। আমি যেন তোমাদেরকে না হারাই। আমাদের তাকে বেশি ভাল লাগে তখন। সে বলে আমি তোমাদের আরেকটা গল্প বলবো। আমরা বলি, একটা না অনেক অনেক গল্প বলতে হবে। আমরা তোমার কাছে সত্যি আর কিছুই চাই না। বিশ্বাস করো। সে এমন ভাবে তাকায় আমাদের জীবনে যেন এমন বিশ্বাসী মানুষ আর দেখি নাই । সে গল্প বলে ব’লে আমরা বেঁচে যাই—আমরা বিশ্বাস করি। সে বলতে থাকে—
তিনজন বন্ধু । একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন কোথায় যাইতেছিল। পথে এক ধর্মগুরুর সাথে দেখা । তিন বন্ধু তাকে দেখে জিগাস করল, গুরুজি মরণের পর মানুষ কোথায় যায়? উইয়ের ঢিবির তলে। আমি কী করে বলবো? যারা মরেছে তারাই ঠিকঠাক বলতে পারবে। তুমি বলতে পারবে না, তাহলে তুমি কিসের ধর্মগুরু? সে বলল, এই যে পথটা দেখছ এই পথটা ধরে সামনে আগাইতে থাকবা। পথে যেতে যেতে ৩জনের সাথে দেখা হবে। তাদের ভেতর দুইজন মরণের থেকে উঠে এসেছে। যদিও তারা দুইজন স্বীকার করতে চাইবে না। তাদের চেহারা পৃথিবীর যেকোনো মানুষের চাইতে আলাদা সুন্দর। শুধু এইটুকুই নিশানা। তারপর তারা সেই পথ ধরে চলল। তিনবন্ধু ঠিকই অনেক দূরে গিয়ে দেখা পায় সেই ৩জন মানুষকে। কিন্তু তারা ভুলে যায় ধর্মগুরুর কথা। মানুষ মরে গেলে কোথায যায়? —এই প্রশ্নটা করতে ভুলে যায় …
আমরা বলি, তুমি তোমার গল্প বলা থামাও। আমাদের কেমন যেন ভীষণ খারাপ লাগতেছে। আমরা যেন হারাই যাচ্ছি কোথায়! আমাদেরকে ধরো! আমরা ছোট হয়ে যাচ্ছি। তুমি এমন ভাবে গল্প বল আমরা তা না শুনেও পারি না, বিশ্বাস না করেও পারি না!
আমাদের নদীর কাছে যেতে আরও অনেক পথ বাকি। পথ দেখিয়ে মেয়েটা নিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে। হঠাৎ একটা বাতাসের ঝড় উঠে। আমরা দুজন ভয়ে কাঁপতে থাকি। মেয়েটার সাথে সামনের দিকে দৌড়তে থাকি। তার হাত ছাড়ি না। যেন সে আমাদেরই শরীরের অঙ্গ। মাঝে মাঝে সে আমাদের হাত ছাড়ায়ে নিচ্ছে অনিচ্ছাতে। তাতেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
আমরা যেন হঠাৎ নাম-না-জানা এক ভরসার নদীর ধারে এসে পড়ি। নদীর উপর রাতটা ঝুলে আছে বাদুড়ের মতো, তার সঙ্গী কেবল স্তূপ স্তূপ কুয়াশা। পাশেই চোখে পড়ল এক বিশাল জামরুল গাছ। আমরা তিনজন গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। মেয়েটা আমাদের থেকে আস্তে করে জামরুল গাছের আড়ালে চলে গেল। ওকে ধরতে যাই। ধরতে পারি না।
জামরুল গাছটায় হাজার হাজার পেরেক পোতা। কারা করেছে এই কাজ?
মেয়েটি বলল, “সবগুলো পেরেক যদি তুলতে পারো, তবে তোমরা জেগে উঠবে।
শুনে, মুহূর্তেই আমরা দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ে হুড়মুড় করে পেরেকগুলো তোলার চেষ্টা করি। একটা পেরেকও উঠাতে পারতেছি না। আর দেখি কী বিশাল জামরুল গাছটার ডালে বসে কয়েকশ লক্ষীপেচা জিকির করতেছে। লক্ষীপেচাগুলোর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
ওদিকে দেখি-নদীর ভেতর থেকে এক সুন্দর ছেলে ঘোড়ার পিঠে ভেসে উঠছে। ঠিক তখনই মেয়েটা আমাদের দিকে এগিয়ে এসে আমাদের দুজনার হাতে তার চশমাটা ধরিয়ে দিল। তারপর হেসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের ডাকনাম কী? তাও তো জানা হলো না!
আমরা বললাম, “জীবন।
আমাদের নাম শুনে মেয়েটা উচ্চৈস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসির পর থেকে আমরা আমাদের আগের কিছুই মনে করতে পারছি না। মনে হচ্ছে গল্পের পিঁপড়াগুলো আমাদের সব স্মৃতি খেয়ে ফেলেছে! আমাদের জিহ্ববা আটকে আসছে। আমরাই যেন মরে ফের দুনিয়াতে ফেরত আসছি। মেয়েটাকে তখন বড় অপরিচিত মনে হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নদীর ওপার থেকে আসা ছেলেটার ঘোড়ায় চড়ে একসাথে ওপারে চলে গেল।
মেয়েটা চলে যাওয়ার পর আমরা নিজেদের দিকে তাকালাম। আমাদের দেহ যেন ছোট হয়ে আসছে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে আমরা দুইটা শিশির কণায় পরিণত হলাম। আমরা গোঙাইতেছি। পাশাপাশি দুইটা শিশির কণা হয়ে মেয়েটার রেখে যাওয়া চশমার লেন্সের এপারে বসে আছি। আমরা কি আসলেই শিশির কণা, নাকি চশমার ওপার থেকে আমাদেরকে এ রকম শিশির কণার মতো দেখা যাচ্ছে। তাই আমরা নিজেদেরকে শিশির কণা ভাবছি?
আমরা কারা—আমি আর তুমি শুধু?
আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছো? বাঁচার কোনো উপায় জানা থাকলে বলো। অল্পস্বল্প, আধা, ফিসফিস করে বলো।
আমি একটা কাহিনি বলি, তুমি শুন। তুমি একটা কাহিনি বলো, আমি শুনি।
আমার জিহ্বায় পেরেক মারা কেন!
আমার জিহ্বার ওপর লোহা গরম করে দাগ দেয়া হয়েছে! দেখো তো, কত গভীর গর্ত!
আমাদের জিহ্বা সারাতে হবে?
আমরা স্বপ্নে আছি নাকি বাস্তবে—এ নিয়ে তর্কে যাওয়ার সময় এখন নয়। চল দেখি, তোতলাইতে তোতলাইতে আমরা আমাদের কাহিনি বলতে পারি কি না!