বই : স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ
লেখক : সালমান সাদিক
প্রকাশক : চিলেকোঠা
ধরন : গল্প
গায়ের দাম : ৩৮০৳
সালমান সাদিকের গল্পগ্রন্থ স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ এক শনিবার মেলায় কিনলাম। ওই রাত্রে হেদায়ার গভীর গভীর তত্ত্ব পাশে ফেলে গল্পগুলা শেষ করে ফেলি। ভালো লাগছিল। শেষ রাতে কাঁথার ভিতর টর্চ জ্বালিয়ে পড়ছিলাম, বেশি হাঁটার কারণে পায়ের গোছায় রগগুলা ছিঁবড়াচ্ছিল, একটা মাদকতা জাগাচ্ছিল। বইটা সামনে রেখে বিস্তার না হলেও এজমালি কিছু বলি।
উনিশটা গল্পের বেশ কিছু আগেও পড়েছি। লেখকের মনস্তত্ত্ব বোঝাটা গল্পগুলা বুঝতে সহায়তা করবে ভালো। একজন মাদরাসা-তরুণের বিভিন্ন প্রত্যাখ্যান আর বঞ্চনার শিকার হতে হতে বিষিত বা ব্যঙ্গাত্মক একটা মনস্তাপ গল্পগুলার পিছে কাজ করে।
প্রধানত গল্পগুলা সরলরৈখিক না। ফলাফলে এগুলা আমাদেরকে জটিল মাজাঝ ও মেটাফোরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। তার এই মাজাঝটুকু ধরতে পারাটা তার গল্পপাঠের স্বার্থকতা। এখানেই সামথিং ইউনিক।
এরপর আসে তার বিষয়বস্তুর বিচিত্রতা। বিষয়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে স্টাইলকে খাপ খাইয়ে নেয়া। কারণ এইসব বঞ্চনার পর লেখকের মনস্তাপ কখনও দার্শনিক হয়ে ওঠে, কখনও ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠে, কখনও হতাশাবাদী হয়ে ওঠে। বহু মানুষ সমাজ সংস্কার ভাষা মিউজিক বইপত্তর পাড়ি দিয়ে একটা ‘সামগ্রিক বিষিত হৃদয়’ এর সুর আমরা দেখি।
আরেকটা ব্যাপার খুব সৃষ্টিশীল। ‘বিদেশি ভাষার অনুপ্রবেশ’ ও ‘দৃশ্যপট নির্মাণ’। আমি বিদেশি শব্দ ঢুকানোর ক্ষেত্রে একটা সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব রাখতাম। কিন্তু রূপরেখা কীরকম হবে বুঝতাম না। গড়পড়তা ঢুকাতাম। এল জলাম, গয়াহেব, নুকতা বায়দা—এইরকম আরবি সংস্কার স্টাবলিশ করা এবং সুযোগ বুঝে ঢুকানোর ভারসাম্য বোঝা আমাদের আদর্শবাদের জন্য বহুত জরুরি। দৃশ্যপট নির্মাণে দেশিবিদেশি বিভাজন করতে তিনি নারাজ। তবু কিছু বাইরের কিছু দেশের এই যে মিশ্র দৃশ্যনির্মাণ এবং এটাকে খাপ খাইয়ে নেয়া, পাঠকের কাছে খুব আজনবি মনে না হওয়া এই ভারসাম্যটাও একটা আবকারিয়্যা।
রোমান্টিসিজম ও ফ্যান্টাসির আটপৌরে হাউকাউ তার গল্পের উপাত্ত নয়। সুতরাং এখানে মানবিক এই মাশায়ের, আবেগ খুঁজে লাভ নাই।
‘আমার চোখ’ গল্পটা পড়ে খুব ফলাফলশূন্যতায় ছিলাম। ‘ছায়া ও অবয়ব’ ‘যা হওয়ার নয় তাই হতো যদি’ এইরকমের গল্পগুলা পড়ে আমরা বুঝতে পারি তিনি বস্তুজগতের ঊর্ধ্বেও আরেকটা মাজাঝি জগত, যেখানে আরেকটা আমরা আছি, সবসময় এমন একটা রূপকের ধারণা দিতে চান। যে জগতের সাথে বাস্তবের আমাদেরকে তুলনাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। আমাদের চোখেও এমন ঘটেছে, হয়তো দৃশ্যের ওপাশে একদল সৈন্য লেফট রাইট করছে বহু আগে থেকেই, আর আমরা অলস খেয়ে ঘুমাই। আমাদের জীবনের নিরুত্তাপ গতি মহান কোনো সমর বা বিপ্লবের বার্তা ছুঁতে পারছে না। অদৃশ্যে ঘটা লেফট রাইটের মহান উত্তাপ আমাদের শীতল জিন্দেগিতে কোনো তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারছে না। আমাদের অভাবটা কী?
একটা গল্প যুক্তিবাদ নিয়ে। সেখানে স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আমরা দেখি একজন তরুণ হন্যে হয়ে অস্তিত্বের যুক্তি খুঁজছে। সমস্ত ব্যক্তি, বইপত্তর, ব্যাখ্যা তরুণরে শান্ত করতে পারছে না। তরুণের ইমানে টানাপোড়েন পড়ছে। কিন্তু সবশেষে বৃক্ষে বসা বৃদ্ধ তরুণরে দেখায় আত্মা আর মাশায়েরের পথ। এর সমাধান ব্যাখ্যা আর যুক্তিতে নাই। আছে হৃদয়ের সুকুনে, আত্মার স্থিরতায়। ‘পলায়ন’ গল্পটা মাজাঝের নিখাদ উদাহরণ। মাদরাসার আটবছরের জীবনকে হয়তো জেলবাসের সাথে তুলনা করা হচ্ছে এবং শিক্ষাজীবন শেষে একজন শিক্ষার্থীরে চাকরি দেয়া হচ্ছে রাস্তাঝাড়ুর মতো অপমানকর কাজ। এই ব্যাপারগুলাই ‘স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ’ গল্পটায় আরও পষ্ট ও তীব্র ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এই গল্পের বন্দার চরিত্র খুব মারাত্মক এক চরিত্র। বুঝি এই চরিত্রের ওপর একজীবনের এক লেখালেখির সংগ্রামমুখর ভিত দাঁড়িয়ে আছে।
‘প্রজন্মান্তর’, ‘জীবন্মৃত’ গল্পগুলা ব্যঙ্গাত্মক শ্লেষের ভালো উদাহরণ। প্রথমটায় দেখানো হয় বিপ্লবীরা ঐতিহ্যবাদের নাম ভেঙে সংগ্রাম করতে চায়। সৃষ্টিশীল কিছু করতে চায় না। জীবন্মৃত গল্পে লেখক বলে, তন্বি, আশিক, পারভেজ এরা বেঁচে আছে আবার মরেও গেছে। এখানে মানুষ মানুষরে খায়। যারা বিপ্লব করতে চায়, মানুষ তাদের খেয়ে ফেলে। তাদের মুখে বিপ্লবীদের মাংস লেগে থাকে। এক মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে আরেক মানুষরে মরতে হচ্ছে। মৃত মানুষটা বেঁচে থাকছে তার গোশত আরেকজনরে খাইতে দিয়ে। এভাবে মানুষ মরে গেছে আবার বেঁচেও আছে। না মরেছে না বেঁচে আছে। বেঁচে থাকাটা একটা ভান।
‘গুবরে পোকার পেটে’ গল্পে আমরা দেখি শহুরে জীবনে মানুষের কদর্যতা, ভনিতা, কৃত্রিমতার ঠাট্টামূলক বিন্যাস। ‘হসপিটাল ও তুলনাত্মক মডার্ন আর্ট বিশ্লেষণ’ গল্পটায় দেখা যায় তরুণী জ্ঞানের ভান করে। অথচ তরুণী ওয়ালে ঝোলা আর্টের যে বিশ্লেষণ দিল সেগুলো একটি শিশুও দিতে পারে। যেগুলার কোনো অর্থ নাই। এখানে দেখা যায় ওই তরুণীরে গল্পের তরুণ জিগ্যেস করে, সিগ্রেট ধরাতে পারি? এই রক্ষণশীলতার এখানে আলাদা কী মানে থাকে? নাকি দেশীয় রক্ষণশীল প্রচলন ধরে রাখা হলো? নাকি বাঙালি তরুণ একজন তরুণীর কাছে নিজেরে একটু পবিত্র উপস্থাপন করতে সুখ পায়? এভাবে মুগ্ধ নারীরে মুগ্ধ করতে চায়? এই গল্পে চুরিকে প্রতিবাদের অভিনব তরিকা হিসাবে দেখানোও হচ্ছে। ‘আজও কি বসন্ত আসে’ গল্পেও বই চুরির কথাটা খুব কৌতুককর। এখানে বইচোরের মা ইংলিশ বই দেখে কয়, বাংলা ভালো উপন্যাস আনতে পারিস না? এই গল্পে মাদরাসা সিস্টেমের ওপর এখান হালকা পলকা দ্রোহের আলাপ ফুটে ওঠে।
আমার ভাবনা
আমি খুব উপমাপ্রিয় মানুষ। উপমা একটা সৃষ্টিশীল জিনিস। এইটা দিয়ে যারে তারে বিচার করা আমার কুস্বভাব। তার গল্পের অর্থগুলো অর্থাৎ সামগ্রিক ফলটুকু তো রূপকই। ক্ষুদ্র বা বাক্যকেন্দ্রিক উপমা আমি তার কাছে আরও আশা করব। সমসাময়িক কিছু সমালোচনাপদ্ধতি তার বর্ণানাভঙ্গিকে প্রশ্ন করতে চায়। তবে আমি ভাবলাম, অর্থকে টিকিয়ে রাখতে এমন প্রথাবিরোধে সমস্যা নাই। এগুলো তাই তাসলিম করে নিছি। মাঝেমধ্যে হুটহাট দার্শনিক স্টাইল চলে আসে। যেমন, সন্ধ্যার কুয়াশায় খুঁজতে থাকা অবয়বগুলা জোনাকের সন্ধান দেয়, এমন একটা বাক্যে উদ্দেশ্য, বিধেয়, বিশেষণ মিলাতে আমার পাঁচ মিনিট লেগে যায়। সিয়াক সিবাক দিয়ে মিলাতে হলো। এইটা তেমন সমস্যা না। সবমিলিয়ে তার গদ্য যেখানে তাত্ত্বিক যেখানে সরলচিত্র যেখানে দ্রোহী হওয়া দরকার সেখানেই সেই অনুপাতে চেইঞ্জ হয়ে যায়। তার রচনা কারুর অনুকরণ নয়। প্রচলিত দেশীয়দের সাথে মিলানো দায় হয়ে পড়বে। তার রচনা তার।
গল্পকার সালমান সাদিকের গল্প কেন টিকে থাকবে? আরও বিশেষ করে বললে, গল্পের শরীরে এই যে দর্শনপ্রিয় তালেবুল ইলম দার্শনিক প্রলেপ লাগিয়ে নতুন ফুৎকার মারলেন বাঙলাসাহিত্যের জংধরা শিঙ্গায়, সেটা চলমান গল্প-উপন্যাসের টিপিক্যাল আবেগি বর্ণনারে যদি ধাক্কা মেরে দেয়, আমরা অবাক হব না৷ দীর্ঘদিনের চর্চিত কোমল সাহিত্য, শুধু মনের সুখ হাসিলের জন্যে শখের বসে সাহিত্যপাঠের যে বিশাল বৃহৎ পাঠক মনস্তত্ত্ব গইড়া উঠছে, সমাজ ও প্রজন্মের স্বার্থ-জাতপরিচয়-হাওয়িয়্যত নির্মাণে এইসব কোমল সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিকতায় যে বিশাল শূন্যতা তৈয়ার করছে… তার বিপরীতে সালমান সাদিকের গল্প একটা শক্ত অবস্থান নিতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী। তার বর্ণনার ভিতর দিয়া সাহিত্যের একটা যুক্তিমাতৃক ও চিন্তক ধারা এবং মনন তৈয়ার হোক।

ছবি : ‘স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ’ গল্পগ্রন্থের প্রচ্ছদ
বইটা সংগ্রহ করব ইন শা আল্লাহ