উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তৃত ইতিহাসে বহু আন্দোলন ও গণজাগরণের উল্লেখ আছে, আছে বহু রক্তাক্ত ঘটনার দলিল। কিন্তু সেই একই ইতিহাসের পরতে পরতে গুছিয়ে রাখা আছে কিছু ভয়াবহ অধ্যায়, যেগুলোর ওপর সময়ের ধুলো এতটাই পুঞ্জীভূত হয়েছে যে, সেসব আজ প্রায় বিস্মৃত, প্রায় অনালোচিত। ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারির সলঙ্গা বিদ্রোহ এমনই একটি ঘটনা—যা জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের থেকেও ভয়াবহ ছিল, কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি কখনোই। শতবর্ষ পেরিয়েও সলঙ্গার এই গণহত্যা যেন আমাদের জাতীয় স্মৃতির বাইরে পড়ে আছে।
সলঙ্গার ঘটনাটি বোঝার জন্য যেতে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশশক্তি ক্ষতবিক্ষত, আর ভারতীয়দের প্রতি তাদের অবিশ্বাস ও শোষণচর্চা আরও উগ্র রূপ ধারণ করে। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের মতামত না নিয়েই হাজার হাজার সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। সেই ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয় ১৯১৯ সালের কুখ্যাত রাওলাট আইন পাস হওয়ার পর। এই আইনে ন্যূনতম অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে গ্রেপ্তার, জেল, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। দেশজুড়ে শুরু হয় দমননীতি, তৈরি হয় আতঙ্কের আবহ। এই প্রেক্ষাপটেই ঘটে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা—যেখানে শত শত মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি ছুড়ে ব্রিটিশ সরকার তাদের আসল মুখোশ উন্মোচন করে।
একই সময়ে ভারতীয় মুসলমানেরা উদ্বেগে ছিলেন তুরস্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের মুখে তাদের খলিফার মর্যাদা বিপন্ন হয়ে পড়ায় ভারতজুড়ে শুরু হয় খিলাফত আন্দোলন। মুসলমানদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, আর এর মধ্য দিয়েই হিন্দু-মুসলমানের এক নতুন যুগ্ম সংগ্রামের সূচনা হয়। রাওলাট আইন ও খিলাফত আন্দোলনের উত্তাপে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসহযোগ আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এই আন্দোলনে মানুষ স্কুল-কলেজ, আদালত, চাকরি বর্জন করে। ব্রিটিশ পণ্যের বিরুদ্ধে শুরু হয় বর্জন ও বয়কট আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ ছুঁয়ে যায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও—তারই অন্যতম হলো সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা।
১৯২২ সালের জানুয়ারির শেষভাগে, সলঙ্গার উত্তরে চান্দাইকোনা হাটে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। উত্তেজনার পারদ তখন তুঙ্গে। এর ঠিক তিন দিন পরে, ২৭ জানুয়ারি, শুক্রবার—সলঙ্গায় ছিল বড় হাট। নৌকার সারি নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় দেড় মাইল জুড়ে। কংগ্রেস ও খিলাফত কমিটির কর্মীরা বিলেতি পণ্য বর্জনের প্রচার চালাচ্ছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ কংগ্রেসকর্মী আবদুর রশিদ, যিনি পরবর্তীকালে হয়ে উঠবেন বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ।
হাটের মানুষের ভিড়ের মধ্যে আচমকাই হাজির হন পাবনা জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর এন দাস, সিরাজগঞ্জ মহকুমার এসডিও সুনীল কুমার সিংহ ও ব্রিটিশ পুলিশ সুপার—সঙ্গে ৪০ জন বন্দুকধারী আর্মড পুলিশ। তাদের চোখে আবদুর রশিদ ছিলেন ‘উস্কানিদাতা’। তাই কোনও কথা না শুনেই পুলিশ সুপার তর্কবাগীশকে নির্মমভাবে প্রহার করতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে তার দেহ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে, আর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
হাটের সাধারণ মানুষ—যারা আবদুর রশিদের পরিবারের ভক্ত-মুরিদ—এই দৃশ্য দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন পুলিশ সুপারের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে। ইংরেজ অফিসার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপরই শুরু হয় ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়।
পুলিশ সুপার ও ম্যাজিস্ট্রেট পরিস্থিতি সামলানোর জন্য এক ভীতিকর সিদ্ধান্ত নেন—গুলির নির্দেশ। ৩৯টি রাইফেল একসঙ্গে ফেটে পড়ে। হাটের ওপর চলে অবিরাম গুলিবর্ষণ। মানুষের চিৎকার, আর্তনাদ, দৌড়াদৌড়ি—সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়াবহ নরকযন্ত্রণা তৈরি হয় সেদিন। আবদুর রশিদের চোখের সামনে সাতজন মানুষ পড়ে যায় গুলিতে। কিন্তু নিহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়—হতাহতের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন—এ সংখ্যা আরও বহু গুণ বেশি। অনেকেই পালাতে গিয়ে পথেঘাটে, ঝোপে-জঙ্গলে মারা যান। ব্রিটিশের ভয় ও প্রতিহিংসার আশঙ্কায় স্বজনরাও নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করেননি।
গুলির আওয়াজ থেমে গেলে দেখা যায়—পুলিশের গুলি শেষ। হাটের লক্ষাধিক মানুষ তখন চারদিক ঘিরে উত্তেজনায় ফুটছে। যে কোনও মুহূর্তে আরও বড় সংঘর্ষ বাঁধতে পারে—এমন অবস্থায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রশিদকে মুক্ত করে অনুরোধ করেন জনতাকে শান্ত করতে। তর্কবাগীশ তাঁর নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে জনতাকে সংযত হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু জনতার বুকে তখন তীব্র ক্ষোভ। কেউ কেউ বলেন, “গান্ধী রাজারে খবর দেন, সেও তার সৈন্য পাঠাক।” উত্তরে তর্কবাগীশ বলেন—“গান্ধীর সৈন্য তো আমরাই।” তখন জনতার কণ্ঠে উঠে আসে বেদনামিশ্রিত হতাশার সুর—“তাহলে ওই পচা ভেড়ার লেজ ধরেছেন কেন?”
এভাবে কোনোমতে রক্তক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হলেও সেদিনের গণহত্যা চাপা পড়ে যায়। পরে কলকাতা, ঢাকা, সিরাজগঞ্জসহ নানা জায়গা থেকে কংগ্রেস ও খিলাফত কর্মীরা সলঙ্গায় ছুটে আসেন। বিভিন্ন পত্রিকা সরকারি তদন্তের দাবি তোলে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আন্দোলন প্রত্যাহার হয়ে গেলে সলঙ্গার গণহত্যাও হারিয়ে যায় আলোচনার আড়ালে।
সলঙ্গার পরপরই ঘটে চৌরি-চৌরা ঘটনা—যেখানে আন্দোলনকারীরা ক্ষোভে থানায় আগুন দিলে ২৩ জন পুলিশ মারা যায়। গান্ধী তখন আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ভেঙে যায়, এবং অগ্নিশিখার মতো ছড়িয়ে পড়া অসহযোগ আন্দোলন থেমে যায় মাঝপথে। ইতিহাসবিদেরা বলেন—যদি আন্দোলন থামানো না হতো, ভারত ২৫ বছর আগেই স্বাধীন হতে পারত।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এত বড় ঘটনার পরও গান্ধী সলঙ্গায় আসেননি, কোনও বিবৃতিও দেননি। রবীন্দ্রনাথও নীরব থেকেছেন। অথচ জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনায় নাইট উপাধি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি গোটা পৃথিবীকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছিলেন। সলঙ্গার ওপর তাঁর নীরবতা আজও প্রশ্ন জাগায়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো—সলঙ্গা নিয়ে নাটক-গল্প-উপন্যাস লেখা হয়নি, সিনেমা হয়নি, উল্লেখযোগ্য গবেষণাও নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এই অধ্যায় যেন চাপা পড়ে আছে। নদীতীরে অবস্থিত সলঙ্গার হাট ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র, আর সেই হাটেই রক্তে রাঙা হয়েছিল মাটি। কিন্তু স্মৃতিতে রয়ে গেছে কেবল আবদুর রশিদের বয়ানের মতো কিছু বিচ্ছিন্ন গল্প। [1]লেখক সলংগা বিদ্রোহ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন—সলংগা। শিঘ্রই এর ২য় মুদ্রণ ও নয়া … Continue reading
অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন শেষ হওয়ার পর হিন্দু-মুসলমান আবার বিভেদের পথে হাঁটে। আর তরুণ আবদুর রশিদ—যিনি সেদিনের ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখেছিলেন—জীবনের পথ ঘুরিয়ে নেন দেওবন্দের দিকে।
সলঙ্গার বিদ্রোহ নিছক একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বৃহৎ, অথচ বিস্মৃত অধ্যায়। যে গণহত্যা জালিয়ানওয়ালাবাগের থেকেও ভয়াবহ, কিন্তু ইতিহাসে যে স্থানের প্রাপ্য, তা আজও পায়নি। সলঙ্গা শুধু রক্তের গল্প নয়—এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, অধিকারবোধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। শত বছর পরে আজও সলঙ্গার মাটিতে সেই দিনটির রক্তাক্ত স্মৃতি ভেসে ওঠে—যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা বিনা মূল্যে পাওয়া নয়; তার পেছনে আছে বহু অজানা, অবহেলিত আত্মত্যাগের কাহিনি।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | লেখক সলংগা বিদ্রোহ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন—সলংগা। শিঘ্রই এর ২য় মুদ্রণ ও নয়া সংস্করণ বাজারে আসছে। |
|---|
জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে একটা আলাপ দিয়েন।
চেষ্টা করব ভাই
সলঙ্গা বইটা পুরো পড়ছিলাম
mashallah
tnx