জীবন ও সাহিত্য

আহমাদ সাব্বির

সাহিত্যের প্রকৃত আধার হলো জীবন। যেমন একটি ইমারতের দৃশ্যমান অংশ—দেয়াল, মিনার, গম্বুজ—যতই চোখে পড়ুক না কেন, তার প্রকৃত ভিত্তি থাকে মাটির গভীরে, তেমনি সাহিত্যের দৃশ্যমান সৌন্দর্যের পেছনে থাকে জীবনের গভীর ও অদৃশ্য বাস্তবতা। জীবন পরমাত্মার সৃষ্টি বলে তা সীমাহীন, রহস্যময় ও মানুষের বোধের অতীত; আর সাহিত্য মানুষের সৃষ্টি হওয়ায় তা বোধগম্য, সংযত ও মানবিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ। এই কারণেই জীবনের কাছে মানুষের জবাবদিহির প্রশ্ন অস্পষ্ট হলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেই জবাবদিহি অনিবার্য। সাহিত্যকে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থেকেই চলতে হয়, কারণ তার দায় মানুষের কাছেই।

জীবনের মূল লক্ষ্য আনন্দ। মানুষ সারাজীবন এই আনন্দের অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকে—কেউ তা খোঁজে সম্পদে, কেউ পরিবারে, কেউ ঐশ্বর্যে, কেউ ভোগে। কিন্তু এই সব আনন্দ ক্ষণস্থায়ী এবং প্রায়ই গ্লানি ও অনুশোচনায় পরিণত হয়। সাহিত্যের আনন্দ এসবের চেয়ে ভিন্ন ও উচ্চতর। সাহিত্যের আনন্দের উৎস হলো সুন্দর ও সত্য। প্রকৃত আনন্দ কখনো ভোগের মধ্যে নয়; তা আসে সৌন্দর্য ও সত্যের সংস্পর্শে। এই অখণ্ড ও অমর আনন্দকে উপলব্ধি করানোই সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য।

ভারতীয় ‍উপমহাদেশের সাহিত্যতত্ত্বে যে নয়টি রসের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও আনন্দের উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি বীভৎস রসও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রথম দর্শনে বীভৎসের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হলেও, গভীরে তাকালে বোঝা যায়—সেখানেও সুন্দর ও সত্য নিহিত। বীভৎসতার চূড়ান্ত রূপ দেখিয়ে সাহিত্য মানুষের মনে উচ্চতর ও পবিত্র আনন্দের জন্য প্রস্তুতি তৈরি করে। সাহিত্য সব রসের মধ্যেই সৌন্দর্য খোঁজে—রাজপ্রাসাদে যেমন, তেমনি দরিদ্রের কুঁড়েঘরে; পাহাড়চূড়ায় যেমন, তেমনি নোংরা নালার ভেতরেও। বরং দরিদ্রের সহজ-সরল জীবনে সৌন্দর্য অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেয়, যেখানে রাজমহলে তা আড়ম্বর ও কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। প্রকৃত আনন্দ কৃত্রিমতা ও ভান থেকে বহু দূরে থাকে। যেখানে মানুষ তার মৌলিক ও অকৃত্রিম রূপে উপস্থিত, সেখানেই আনন্দের আসল আবাস।

এই দৃষ্টিকোণ মনে হয়, সাহিত্যে মূলত একটিই রস—সৌন্দর্য ও অনুরাগবোধ। যে রচনায় সৌন্দর্য নেই, যা কেবল কুৎসিত ভাব জাগায় বা নিছক বাহ্যিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তা সাহিত্য হতে পারে না। এমনকি গোয়েন্দা কাহিনিও তখনই সাহিত্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে ন্যায়বোধ, মানবিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটে।

সত্যের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক তিন ধরনের—জিজ্ঞাসার সম্পর্ক দর্শনের বিষয়, প্রয়োজনের সম্পর্ক বিজ্ঞানের বিষয়, আর আনন্দের সম্পর্ক সাহিত্যের বিষয়। দর্শন সত্যকে বিশ্লেষণ করে, বিজ্ঞান সত্যকে ব্যবহার করে, আর সাহিত্য সত্যকে অনুভবের রসে রূপান্তরিত করে। যেখানে সত্য আনন্দের স্রোত হয়ে হৃদয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানেই সাহিত্য জন্ম নেয়। একই দৃশ্য দার্শনিকের কাছে চিন্তার বিষয়, বিজ্ঞানীর কাছে অনুসন্ধানের বিষয়, কিন্তু সাহিত্যিকের কাছে তা বিহ্বলতার উৎস। এই বিহ্বলতা আত্মসমর্পণের এক অবস্থা, যেখানে ভালো-মন্দ, উঁচু-নিচু, আপন-পর—সব ভেদ লুপ্ত হয়ে যায়।

জীবন কেবল খাওয়া, ঘুমানো, বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার নাম নয়। তা হলে তা পশুর জীবন হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের মধ্যেও পশুপ্রবৃত্তি আছে, কিন্তু মানুষের বিশেষত্ব হলো—তার মধ্যে এমন মনোবৃত্তি রয়েছে, যা তাকে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সামঞ্জস্যে পৌঁছে দিতে পারে। অহংকার, ক্রোধ ও হিংসা এই সামঞ্জস্য নষ্ট করে; তাই এগুলোকে সংযমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তবে কেবল দমন করে নয়, বরং মানুষের ভেতরের সৎ প্রবৃত্তিগুলো জাগিয়ে তুলেই দূষিত প্রবৃত্তিকে শান্ত করা সম্ভব। সাহিত্য এই কাজটিই করে। উপদেশ বা কঠোর শাসন যেখানে ব্যর্থ হয়, সেখানে সাহিত্য হৃদয়ের কোমল তারে স্পর্শ করে মানুষকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যায়।

মানুষের কাছে মানুষই সবচেয়ে নিকটবর্তী। যার সুখ-দুঃখ আমরা বুঝতে পারি, তার সঙ্গেই আমাদের আত্মিক সম্পর্ক গভীর হয়। কিন্তু সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলে পেশা, শ্রেণি বা অবস্থানের ভেদাভেদ মিলিয়ে যায়। সাহিত্য মানুষের মানবতাকে প্রসারিত করে, তাকে শুধু মানবজাতির সঙ্গেই নয়, জড়-চেতন সমগ্র বিশ্বের সঙ্গেও একাত্ম করে তোলে। সাহিত্য সেই জাদুকাঠি, যা ইট-পাথর, গাছপালা, পশু-পাখির মধ্যেও বিশ্বের আত্মার উপস্থিতি অনুভব করায়।

সত্যিকারের সাহিত্যিকের ভাবের মধ্যে থাকে ব্যাপকতা। তিনি নিজের দেশ ও কালের দ্বারা প্রভাবিত হলেও সংকীর্ণ হন না। স্বদেশের দুঃখে তিনি কাঁদেন, কিন্তু সেই কান্না সার্বজনীন হয়ে ওঠে। সাহিত্য কখনো পুরোনো হয় না, কারণ মানবহৃদয়ের মৌলিক অনুভূতিগুলো চিরন্তন। দর্শন ও বিজ্ঞান সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু সাহিত্য চিরকাল নতুন থাকে।

সাহিত্যই প্রকৃত ইতিহাস, কারণ তা কেবল ঘটনার তালিকা নয়, বরং জীবনের অন্তর্গত প্রবাহকে ধারণ করে। রাজাদের যুদ্ধ নয়, বরং মানুষের আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখই ইতিহাসের মূল উপাদান, আর এ ক্ষেত্রে সাহিত্যের তুলনা নেই।

অনেকে মনে করেন সাহিত্যের ব্যবহারিক মূল্য নেই—ভালো মানুষ ভালোই থাকবে, মন্দ মানুষ মন্দই থাকবে। এই ধারণা ভ্রান্ত। মানুষের স্বভাব দেবতুল্য; পরিস্থিতি তাকে বিকৃত করে। সাহিত্য এই দেবত্বকে জাগিয়ে তোলে। নাদির শাহ বা নেপোলিয়নের মতো নিষ্ঠুর মানুষও একটি কবিতার পঙ্‌ক্তি বা মানবিক গল্পে স্পর্শিত হয়ে দয়ার পরিচয় দিয়েছেন। সাহিত্য তিরস্কার করে না, উপদেশ দেয় না—সে অনুভবের মাধ্যমে মানুষকে বদলে দেয়।

একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার সাহিত্যিক আদর্শ। ইউরোপীয় সাহিত্যে সংঘর্ষ ও স্বার্থপরতার প্রতিফলন দেখা যায়, যার প্রভাব সমাজেও পড়েছে। উপমহাদেশীয় সাহিত্যের আদর্শ ত্যাগ ও উৎসর্গ। সাহিত্যিকের দায়িত্ব তাই অত্যন্ত গুরুতর। সাহিত্য ধ্বংস করে না, নির্মাণ করে। কেবল কুৎসিত বাস্তবতার নগ্ন চিত্র অঙ্কন সাহিত্য নয়।

সাহিত্যসেবার জন্য প্রয়োজন সাধনা, সংযম ও আত্মশুদ্ধি। ডিগ্রি বা পাণ্ডিত্য যথেষ্ট নয়; চিত্তের সাধনা অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মহান সাহিত্যিকেরা সবাই সাধক ছিলেন। সাহিত্যের উত্থান মানেই জাতির উত্থান। তাই সত্যিকারের সাহিত্যসেবক, আত্মজ্ঞানী ও সাধকের জন্মই পারে জাতিকে আলোকিত করতে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments