বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবী

আহমাদ সাব্বির

বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি নিহিত আছে। এই নবযুগের বিদ্বৎসমাজ ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুসলমানবর্জিত। নববঙ্গের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস লিখতে গেলে তাই মুসলমান সমাজের অবস্থার বিশ্লেষণ অনিবার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ঐতিহাসিক আলোচনায় এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে। অথচ তাদের অনুপস্থিতি বোঝা না গেলে নব্যবঙ্গের রেনেসাঁসের পূর্ণ ছবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন বাংলার পুরাতন সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ভেঙে নতুন ধনিক ও শিক্ষিত শ্রেণি গঠিত হচ্ছিল, তখন মুসলমান সমাজ ছিল একেবারেই বিপর্যস্ত। মুসলমান শাসনামলের সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়েছে; তাদের ঐশ্বর্য, জমিদারি, সামাজিক মর্যাদা—সবই হারিয়ে গেছে। ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে নতুন যে ইংরেজপন্থি হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, তাতে মুসলমান সমাজের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না।

ব্রিটিশ লেখক ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার তাঁর The Indian Mussalmans গ্রন্থে এই করুণ চিত্রটি স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘গত পঁচাত্তর বছরে বাংলার মুসলমান সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ কলকাতার শোভাবাজার, বাগবাজার, পাথুরিয়াঘাটা প্রভৃতি অঞ্চলে যখন নবীন হিন্দু সম্ভ্রান্ত সমাজ ধন ও শিক্ষার উজ্জ্বল বিকাশ ঘটাচ্ছে, তখন মুর্শিদাবাদ, হুগলি ও ঢাকা অঞ্চলের মুসলমান সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো ক্রমশ নিঃশেষিত হচ্ছে। ইংরেজ শাসনের প্রথম শতকে মুসলমান সমাজের মধ্যে তীব্র ইংরেজবিদ্বেষ ছিল। তারা নিজেদের রাজ্যচ্যুতির অপমান ভুলতে পারেনি, বরং প্রতিশোধস্পৃহায় ইংরেজদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়নি।

এই অসহযোগ মনোভাবই মুসলমানদের শিক্ষাবিমুখতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা ইংরেজি শিক্ষা, প্রশাসনিক চাকরি কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কোনো সুযোগ গ্রহণ করেনি। বিপরীতে, ইংরেজ শাসকরা সুযোগ বুঝে হিন্দু সমাজকে শিক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনে উৎসাহিত করে এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের বীজ বপন করে নিজেদের শাসনকে দৃঢ় করে তোলে।

১৮৩৫ সালে বেন্টিঙ্ক ও ম্যাকলে ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করলে কলকাতার মুসলমান সমাজ তার তীব্র প্রতিবাদ করে। আট হাজার মুসলমান স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদপত্র তখন সরকারের কাছে পাঠানো হয়। ১৮৫০ সালে কলকাতা মাদরাসায় যখন ইউরোপীয় অধ্যক্ষ ডক্টর স্প্রেঙ্গার নিয়োগ পান, তখন ছাত্রদের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়—তারা ইটপাটকেল ও পচা ফল ছুড়ে তার ওপর আক্রমণ করে। এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, মুসলমান সমাজের দৃষ্টিতে ইংরেজ শিক্ষা ছিল ‘ধর্মদূষণ’-এর সমার্থক।

অন্যদিকে, হিন্দু সমাজে তখন জন্ম নিচ্ছে এক নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি—ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, প্রশাসনিক চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত, ও পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় প্রভাবিত। এই শ্রেণির হাত ধরেই গঠিত হয় বাংলার নবজাগরণের বিদ্বৎসমাজ। অথচ মুসলমান সমাজে তখনও কোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেনি। ফলে সামাজিক বাস্তবতার দিক থেকে ‘গোলদীঘি’ (হিন্দু কলেজ) ও ‘জানবাজার’ (মাদরাসা)—এই দুই কেন্দ্রের মধ্যে কেবল ভৌগোলিক নয়, মানসিক দূরত্বও সৃষ্টি হয়েছিল এক যুগের ব্যবধানের সমান।

১৮৭২ সালে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর এক সরকারি চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন, ‘আমরা মুসলমানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সুবিচার করিনি। শিক্ষা বিভাগের ইনস্পেকশন থেকে শুরু করে শিক্ষক পদ পর্যন্ত কোথাও মুসলমান নেই।’ হান্টার তাঁর একই গ্রন্থে সরকারি কর্মচারীদের একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন—২১১১ জন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর মধ্যে ইউরোপীয় ১৩৩৮ জন, হিন্দু ৬৮১ জন, এবং মুসলমান মাত্র ৯২ জন! এই করুণ বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে মুসলমান সমাজ তখন শিক্ষা ও প্রশাসন—দুই ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণভাবে প্রান্তিক ও পরিত্যক্ত।

তবে এই ট্র্যাজেডির জন্য মুসলমান সমাজ এককভাবে দায়ী নয়। ব্রিটিশ নীতি ও উদীয়মান হিন্দু সম্ভ্রান্ত সমাজ উভয়ের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু সমাজে হিন্দুত্বপ্রীতির প্রবণতা যেমন ছিল, তেমনি মুসলমান সমাজের প্রতি নিরাসক্তিও ছিল। ‘ধর্মসভা’ নামক সংগঠনটি এর এক নিদর্শন। ইয়ং বেঙ্গলের তরুণ বিদ্রোহীরা যেমন হিন্দু সমাজের কুসংস্কারকে আঘাত করেছিলেন, তেমনই তাঁরা কোনো ধর্মীয় ঘৃণার ধারক ছিলেন না। কিন্তু তবুও নবজাগরণের পরিধি সীমিত হয়ে পড়ে মূলত হিন্দু সমাজে। এর কারণ ছিল, প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য যে মিডল ক্লাস ও আরবান কালচার প্রয়োজন, তা হিন্দু সমাজে তৈরি হলেও মুসলমান সমাজে তখনও অনুপস্থিত ছিল। ঐতিহাসিক পোলার্ড যথার্থই বলেছেন—‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও শহুরে জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো নবজাগরণ সম্ভব নয়।’

অতএব বাংলার রেনেসাঁস ছিল প্রকৃতপক্ষে ‘হিন্দু রেনেসাঁস’—যদিও তার উদ্দেশ্য ছিল মানবিকতার প্রসার, তবু তার সামাজিক পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল একটি সম্প্রদায়ের ভেতরে। মুসলমান সমাজে সে সময় কোনো প্রগতিশীল আন্দোলন, নতুন চিন্তা বা সাহিত্য-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাদের প্রাণশক্তি তখনও দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতার মধ্যে বন্দি।

তবু এই পরিস্থিতি একেবারে স্থায়ী ছিল না। ১৮৭০ সালের পর যখন ব্রিটিশ সরকার মুসলমান সমাজের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি দেয়, তখন তা কোনো মানবিক সহানুভূতি থেকে নয়, বরং কৌশলগত কারণে। তখন হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজে জাতীয়তাবাদী চেতনা জেগে উঠেছে—ইংরেজ শাসনের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইংরেজরা মুসলমান সমাজকে প্রলোভন দেখিয়ে নতুন সুযোগ দেয়, যাতে এক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ তৈরি হয় এবং সমাজে বিভাজন বজায় থাকে।

এই সময় থেকেই মুসলমান সমাজের ভেতরে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়, এবং ধীরে ধীরে একটি নতুন শিক্ষিত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরই ফলশ্রুতিতে আলিগড় আন্দোলনের মতো শিক্ষা-সচেতনতা বাংলার মুসলমান সমাজেও প্রতিফলিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও এক ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী বিদ্বৎসমাজ গড়ে উঠতে শুরু করে।

অন্যদিকে, ঠিক এই সময়েই হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি একপ্রকার পরিপূর্ণতায় পৌঁছে গিয়ে তার অধোগতি শুরু করে। ইতিহাসের পরিহাস, হিন্দু সমাজের উত্থানযাত্রার শেষে যখন ক্লান্তি আসে, তখনই মুসলমান সমাজ নবজাগরণের প্রারম্ভিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এই উত্থান-পতনের যুগসন্ধিক্ষণেই বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীর ইতিহাসের প্রকৃত ট্র্যাজেডি নিহিত। নবজাগরণের প্রথম অধ্যায়ে মুসলমানদের অনুপস্থিতি যেমন এক জাতিগত ক্ষতি, তেমনই পরবর্তী অধ্যায়ে তাদের দেরিতে আগমনও এক অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতি।

বাংলার মুসলমান সমাজ দীর্ঘদিন রাজশক্তির গৌরব ও ঐশ্বর্যে ডুবে থেকে নতুন সময়ের চেতনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অন্যদিকে, হিন্দু সমাজ তার সামাজিক জড়তা ও ধর্মীয় অনাচার ভেঙে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয়েছে। মুসলমান সমাজের দেরিতে জাগরণ তাই কেবল সামাজিক বা অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার ফল নয়, বরং এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক মানসিকতার ফল।

তবে পরবর্তীকালে মুসলমান সমাজের নবজাগরণ যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল, তা নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিশ শতকের প্রথম ভাগে সৈয়দ আমির আলি, নওয়াব আবদুল লতিফ, খাজা আতাউর রহমান, দোহা ইমামুদ্দিন প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা মুসলমান সমাজের শিক্ষাবিস্তার ও সামাজিক সংস্কারের জন্য কাজ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন সচেতনতা জন্ম নেয়—যা ধীরে ধীরে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে।

তবু ইতিহাসের বিচারে, ‘বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবী’-এর উত্থান ঘটেছে অনেক দেরিতে। নবজাগরণের মূল প্রবাহ তখন ইতিমধ্যেই হিন্দু সমাজকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। তাই বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীর জন্ম এক দেরিতে আসা ইতিহাস—যেখানে আছে আত্মসমালোচনার বেদনা, দারিদ্র্যের চিহ্ন, কিন্তু আছে নবজাগরণের আকাঙ্ক্ষাও।

বাংলার ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের শেখায়, কোনো জাতি শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত থাকলে তার সমাজ অচিরেই পিছিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ নীতি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ গোঁড়ামি—এই তিনের সম্মিলিত ফলে বাংলার মুসলমান বুদ্ধিজীবীর জন্ম বিলম্বিত হয়েছে। কিন্তু একবার সেই চেতনা জেগে ওঠার পর, তা পরবর্তী শতকে সাহিত্য, রাজনীতি ও সামাজিক চিন্তায় এক প্রবল ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments