জানি না সে কোন অচেনা বনের তরুণী হাস্নাহেনা
চিরদিন মোর অচেনা থেকেও হয়েছে পরম চেনা; চেনা-অচেনার হাসনাহেনার মালঞ্চে চির-সাথি
রাত শেষ হয় কাহিনি তোমার অশেষ শাহেরজাদি।
—ফররুখ আহমদ
কতদিন পর চিঠি আসল আমার নামে। সে চিঠি হাতে আমি এখন যমুনার পাড়ে বসে আছি। আমার খুব কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শান্ত যমুনার জল। একটা নদী এতটা নীরব হয় কীভাবে আমার জানা নেই! কোথাও ঢেউয়ের আস্ফালন নেই, মুহুর্মুহু জলের ঘূর্ণি নেই। কেবল কান পাতলে শোনা যায় স্রোতের কলকল ধ্বনি। যেনবা কোনো মরমী সংগীত বেজে চলেছে অনন্ত কাল ধরে।
সে সংগীতের ডানায় ভর করে কি না, বহুদিন পর এক বিরহের রাত নেমে আসে এই যমুনার সর্বজুড়ে। আর আমার মনে হয় বিরহের কাসিদা পাঠ করতে আসমান থেকে নেমে এসেছে কোনো কাসিদাপাঠক, যার ভরাট কণ্ঠস্বরে গমগম করছে চারপাশ। অথবা ফুরাত নদীর রক্তের রেখা মিশে গেছে এই হিন্দুস্তানি নদীর সাথে। কিন্তু আমি নাচিজ ইনসান বুঝতে পারছি না কিছুই।
আমি চিঠিটা আবার পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার মাথার উপরের আসমান হিমেল কুয়াশায় চাঁদের আলো জমাট করে ফেলে, ফলে নিজের অতীতের মত চারপাশে নেমে আসে দুর্ভেদ্য অন্ধকার। আমি হাতড়ে কেবল মাটি আর কিছু মরা ঘাসের অস্তিত্ব পাই।
আমার চোখে পৃথিবীর সব রঙ ফুরিয়ে গেলে আবার ফিরে এসেছি হিন্দুস্তান। ঘর-গেরস্তের আলো মুসাফিরকে টানে। কিন্তু আমি পথে নামলেই কেবল কুয়াশা দেখি। আমার পথ ভুল হয় বারবার; যেমন ভুল হয় মানুষ, ফলে আমি কোথাও ফিরতে পারি না, যেখানে পাব আমার ঘর অথবা প্রিয়জন। তবু মানুষ আশ্রয় খুঁজে। দিল্লির পথে-ঘাটে, পুরানো খানকাহ আর দরসগাহগুলোতে আমি ঘুরে ফিরি প্রতিদিন। পুরানো কোনো সাথীর দেখা পাই যদি। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত বস্তু হচ্ছে মানুষ। এই দুনিয়ার দৃশ্যপট থেকে সবচেয়ে দ্রুত সরে পড়ে মানুষ। সময় মানুষকে খেয়ে ফেলে। ফলে, দিনের পর দিন গেলেও আমি কারো সাক্ষাৎ পাই না।
তেমনি একদিন, আকাশে তখন গনগনে সূর্য, তবু বাজারে মানুষের উপচে পড়া ভিড়, আর আমি হাঁটছি সে ভিড় ঠেলে। আচমকা হাত ধরে পিছন থেকে টান দিল কেউ। বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখি পঞ্চাশোর্ধ্ব এক প্রৌঢ়। যার চেহারার বলিরেখা অজস্র জনপদের ধুলোবালির সাক্ষ্য বহন করছে। আমাকে ইশারায় রাস্তার কিনারে নিয়ে আসলেন। তাকে অনুসরণ করতে বলে ঢুকে গেলেন একটা সরু গলির ভেতর। গলি ধরে সামান্য পথ এগোতেই আমার সামনে আরেক দুনিয়া ভেসে উঠল। মনে হলো গ্রীষ্মের গা জ্বালানি দিবস অতিক্রম করে আমি বসন্তের শীতল কোনো সকালে এসে পড়েছি। চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে মাতালকরা আতরের ঘ্রাণ। তিনি আমাকে নিয়ে একটি দোকানের ভেতর ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পর পিতলের পাত্রে আনারের শরবত আসল, আর সাথে খুবানি, কাটা তরমুজ। আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, তরমুজটা নাও। কান্দাহারি তরমুজ। রুক্ষ জমিনে এমন রসেটইটম্বুর জিনিস চাষ হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। পাতলা খোসা, কিন্তু ভেতরের শাঁস গাঢ় লাল। আর খুব মিষ্টি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই আতরের দোকান কি আপনার?
তিনি প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। উল্টো প্রশ্ন করলেন আমাকে।
এই তপ্ত রোদে বাইরে বাইরে ঘুরছো কেন, আর যাচ্ছিলে বা কোথায়?
এরকম ওস্তাদি প্রশ্ন বিরক্ত লাগে আমার। পৃথিবীর অকর্মণ্য ব্যক্তিদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ হচ্ছে অন্যদের উপর ওস্তাদি ফেলানো। কিন্তু চমকে উঠলাম তার ভাষা শুনে। এতক্ষণ তিনি কথা বলছিলেন স্থানীয় ভাষায়। কিন্তু এবার নেমে এলেন বাঙলায়। বহুদিন পর কারো মুখে বাঙলা শুনে আমি তাকিয়ে রইলাম।
কাজের সুবাদে কিছুদিন বাঙলা অঞ্চলে ছিলাম। যতটুকু জানি, তুমিও সে এলাকার সন্তান। নাকি যমুনার প্রবাহ তোমার অতীত সব ধুয়ে ফেলেছে?
অতীত কি সব মুছে ফেলা যায়? স্মৃতি অবলম্বন করেই তো বেঁচে থাকে মানুষ। মানব ইতিহাসের পুরোটাই কি এক স্মৃতির সমুদ্র না? আমি একবার ভাবার চেষ্টা করি অতীতের কথা, আমার জন্মভূমির কথা, আমার প্রেম, বিরহ, প্রেয়সীর কথা। অনেক কিছুই মনে পড়ে, তবে আমার ভেতর কোনো বোধ জাগ্রত হয় না।
এর মধ্যে জানতে পারি বৃদ্ধের পরিচয়। তার নাম আজরাফ। বাদশাহর বিশেষ খুশবুদার সে। দেশ-বিদেশের সুগন্ধি নিয়েই তার কারবার। সে উপলক্ষ্যে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়। পারস্যের নামী গোলাপ কিংবা ইয়ামানের লোবান, তিব্বতের কস্তুরি, অথবা সিরিয়ার পাহাড়ি জেসমিনের খুশবু—সবই তৈরি হয় তার আতরমহলে।
তিনি জানতে চান আমি কে, কী আমার আসল পরিচয়!
আমি বলি, আমি উল্লেখযোগ্য কেউ না৷ আমি সাধারণ একজন মুসাফির! কোনো এক ভোরে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলাম। তারপর পৃথিবীর নানাপথ ঘুরে আবার ফিরছি কোথাও!
তার বিশ্বাস হয় না। গুরুত্বপূর্ণ কেউ না হলে আমার কাছে একটা চিঠি পৌঁছাতে কেন কেউ হাজার দিরহাম খরচ করবে?
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, কীসের চিঠি?
কাঠের বাক্সের তালা খোলার শব্দ হয়। যত্ন করে কাপড়ে মোড়ানো একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দেন।
এ চিঠি দামেশক থেকে এসেছে। বন্দরে আব্বাসের এক ব্যবসায়ী তাকে দিয়ে বলেছিল দিল্লি পৌঁছতে পারলে যেন আমাকে খুঁজে বের করে। এছাড়া চিঠির প্রেরক সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারেনি খুশবুদার আজরাফ।
আমি ভাবি, কী অদ্ভুত মানুষের নিয়তি! হাজার মাইল দূরের একজন খুশবুদার অচেনা এক যুবককে খুঁজে বের করে ফেলেছে কারো মৌখিক বর্ণনা শুনে।
ফেরার সময় জানতে চান আমি দামেশক আবার যাচ্ছি কবে। গেলে যেন চিঠির প্রেরককে জানাই, তিনি চিঠি পৌঁছানোর কাজটা সহিসালামতে করেছিলেন।
আমি মনে মনে বলি, প্রকৃত মুসাফির কখনো তার পদচিহ্নে পা রাখে না। যে পথ একবার ছেড়ে এসেছি, সে পথে আর কখনো ফেরা হবে না আমার।
খুশবুদার আজরাফ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আবার রাস্তায় নেমে আসি। দিল্লির রাজপথের ধূলোয় হেঁটে বেড়াচ্ছে কত বিচিত্র জনপদের মানুষ। কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। রাস্তার পাশে পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানি। ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে নানাভাবে ডেকে যাচ্ছে। খটখট শব্দ তুলে একটা ঘোড়ার গাড়ি বেপরোয়া ভঙ্গিতে আমার পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায়।
হাঁটতে হাঁটতে আমি শহর ছেড়ে আসি। বিকালের আলো ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যার প্রস্তুতি চলছে, আমি জেব থেকে চিঠিটা বের করি। অনেক মজবুত করে সিলগালা করা। প্রেরকের নাম লেখা নেই। কেবল খামের মুখে লাল রঙের মোম চাপা দেওয়া। মোম ভেঙে বের করলাম সমরকন্দি কাগজে লেখা এক পৃষ্ঠার একটা চিঠি। শুরুতে কোনো সম্বোধন নেই। বরং ছোট্ট করে জেসমিন ফুলের অবয়ব আঁকা। পড়তে গিয়ে আমি টের পাই, এই হস্তাক্ষর উপেক্ষা করার কোনো শক্তি আমাকে দেয়নি খোদা। আমি কাগজ থেকে পাহাড়ি জেসমিনের খুশবু পাই, অথবা কোনো অনাঘ্রাত গোলাপের। এই খুশবু তার শহরের, অথবা খোদ তারই। কিংবা কে জানে সবটা আমার কল্পনা। এরকম জাগতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ভেতর আমায় মত্ত রেখে আকস্মিক চিঠির প্রেরক সামনে এসে দাঁড়ায়। জীবনের এইসব অনাহুত মুহূর্তে কী করতে হয় আমি বুঝে উঠতে পারি না। আমার মনে পড়ে দামেশকের জামে মসজিদের সামনে দাঁড়ানো ঘোড়ার টাঙার কথা। অথবা এক অভিজাত পিতার প্রাসাদোপম বাড়ির ঝুল বারান্দার কথা। অথবা জোছনার আলোয় ভেসে যাওয়া পাহাড়ি পথ আর কলকল শব্দে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটির কথা। সে নদীর নাম মেহরান, অথবা নারীর নাম। নদীর অজানা পথে বয়ে চলার মতো সে নারীও কারো বুক চিরে বয়ে চলেছে জনম জনম ধরে।
আপনি এখনও বাড়ি ফিরেননি?
আমি কোথায়!
এইযে আপনি দিল্লি শহরের বাইরে যমুনার তীরে বেখেয়ালি বসে আছেন। একটু নড়াচড়া করলেই ধপাস করে নীচে পড়ে যেতে পারেন। সে হাসে মৃদুস্বরে।
একবার মনে হয় ভেসে যাচ্ছি আমি যমুনার শান্ত জলে। কিন্তু আশপাশে বাঁচাবার কেউ নেই। প্রচন্ড মৃত্যুভয়ে শিহরণ খেলে যায় আমার সর্ব জুড়ে।
আমার ভয়ার্তভাব দেখেই কি না, এবার একটু জোরেই হেসে উঠে সে। আর আমি, আবার ফিরে যাই সেই পাহাড়ে, যেখানে জেসমিন ফুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে ভরে উঠত সবুজ উপত্যকা।
আপনি কিন্তু আমার চিঠিটা এখনো পড়েননি।
আমি বলি, পড়লাম তো বহুবার।
তাহলে বলুন, কী লেখা এই চিঠিতে।
সে চিঠিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। এবার সত্যিই আমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ি। বারবার চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না, কী লেখা ছিল সে চিঠিতে। আবার ভাবি, চিঠিই বা তার হাতে গেল কীভাবে। আমি বলি, আমাকে ধোঁকা দিচ্ছো তুমি, মেহরান। তোমার বাড়ি সেই কতদূর, শাম দেশের দামেশক শহরের এক নিরিবিলি এলাকায়। যেখানে শহরের কোলাহল নেই। মানুষের আনাগোনা নেই। এতদূর থেকে তুমি একা একা আসতে পারো না।
সে আবারও হাসে, তবে এ হাসিতে তার সবুজাভ চোখ ভিজে যায়।
ধোঁকা তাহলে আপনিও দিয়েছেন। আপনার বাড়িও তো কমদূরে নয়। বাঙলা মুলুকের কোনো এক অচিন গাঁয়ে। কতবার শুনেছি সে দেশের কথা। আপনার মুখে, আপনার চিঠিপত্রে। বলেছিলেন এমন দেশ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সে দেশের আলো-বাতাস গায়ে মেখে শতায়ু হয় মানুষ। এই দেশে শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই। আছে শীতল পরশ বোলানো মায়াবী প্রকৃতি। তবু আপনি এমন দেশ ছেড়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন হাজার মাইল দূরের এক শহরে, অথবা কারো হৃদয়ের ভেতর।
তখন অনন্ত ঘুমের ভেতর যত স্বপ্নের রঙ ঝিলমিল, সব ফুরিয়ে গেলে হিম কুয়াশার বুকের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে চাঁদ, আর আমি দেখি যমুনার চরাচর ভেসে যাচ্ছে ধোঁয়াটে জোছনায়।
বাইজিদ ভাইয়ের গল্প কেমন ঘোরগ্ৰস্ত করে তুলে ।
যেন চুপচাপ বসে খানকায় শুনছি দরবেশের বয়ান। ইতিহাসের সময়কল্পকে তুলে আনতে তার জুড়ি মেলা ভার।বারাকাল্লাহ
শেষমেশ গল্পটি প্রকাশ পেল, পড়া হলো।
লেখকের গল্পটা পড়ে মনে হলো—এটা কোনো সাধারণ কাহিনি না, যেন এক হারিয়ে যাওয়া মুসাফিরের আত্মার ডায়েরি আমি পড়ছি।
লেখক যে চিঠিটাকে কেন্দ্র করে পুরো বয়ান দাঁড় করিয়েছেন, সেটা আসলে স্মৃতি আর বিরহের এক গোপন দরজা হয়ে উঠেছে—যেটা খুললেই মানুষ নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।
মেহরান চরিত্রটা লেখক যেভাবে এঁকেছেন, সে আর নিছক মানুষ থাকে না—সে হয়ে ওঠে এক অনির্বচনীয় অনুভব, এক চির-অপ্রাপ্তির প্রতীক।
লেখকের কাহিনির ভেতরে যে বাস্তব আর মায়ার মিশ্রণ, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে—আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আর সেই বিভ্রান্তিটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর।
আর ওনার ভাষাশৈলী—সত্যি বলতে কী, এই বাচনভঙ্গি সবাই পারে না।
প্রতিটা বাক্য যেন ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া কোনো দরবেশি মরমী সুর।
লেখক আরবি-ফারসি ঘেঁষা শব্দগুলো যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা ভাষাকে শুধু ভারী করেনি—বরং এক রাজসিক সৌন্দর্য এনে দিয়েছে।
লেখকের বাক্যের ভেতরে যে দীর্ঘ, ধ্যানমগ্ন প্রবাহ—সেটা পাঠককে থামিয়ে দেয়, ভাবতে বাধ্য করে।
সবশেষে একটা কথাই বলি—ওনি কোনো গল্প লেখেননি, একটা আবহ সৃষ্টি করেছেন।
আর সেই আবহে ঢুকলে, সহজে আর বের হয়ে আসা যায় না।