মুহিব খান। কবি। নিজেকে যিনি জাগ্রত কবি বলতেই পছন্দ করেন। তার সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার কাব্যভাবনা, কবিতা প্রসঙ্গ ও দেশ বিদেশের নানা কথা। নিজের ব্যক্তি প্রসঙ্গেই বলেছেন বেশি। আলাপ করেছেন মুহিব খানের শাগরিদ আমীন মুহাম্মদ। ওস্তাদ-শাগরিদের এলো আলাপচারিতায় চিন্তাশীলদের জন্য চিন্তার খোরাক রয়েছে বলে মনে করি। [সম্পাদক]
আমীন মুহাম্মদ
আসসালামু আলাইকুম, হুযুর!
মুহিব খান
ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমীন! কেমন আছো তুমি?
আমীন মুহাম্মদ
জি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। উস্তাদজি আপনি ভালো আছেন?
মুহিব খান
আলহামদুলিল্লাহ!
আমীন মুহাম্মদ
আপনি বলেছিলেন, আমার গান কবিতায় দিল্লি আর ওয়াশিংটনের কথা বারবার এসেছে। এর রহস্যটা কী?
মুহিব খান
দেখো, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই প্রতিপক্ষ হচ্ছে এরা। যখন সবাই চুপ ছিল সেই ২০০১ সনে আমি গাইছি—“এ দেশের শিকড় তো নয় দিল্লিতে বা ওয়াশিংটনে”। এটা ২০২৫ থেকে ২৩ বছর আগে আমি কেন লিখেছি? দেশ তো আরও অনেক ছিল। সৌদি আরব কোনোদিন বাংলাদেশকে এ্যাটাক করবে না। ইরান, বিরাট শক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে কোন সংঘাতের সম্ভাবনা নাই। চীন, এরা রাজনৈতিক সুবিধা ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি ব্যবসায়ী। এদের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকা লাগবে।
আমীন মুহাম্মদ
আপনার কোন পথে বাংলাদেশ? বইটিতেও এমন একটা থিওরি আছে। আপনি লিখেছেন—আওয়ামী লীগ বা ভারতপন্থিদের পতন মানেই দেশ মুক্ত স্বাধীন না। তখন মার্কিনীদের বিষচক্ষুও এদিকে চলে আসতে পারে এবং আসবেই।
মুহিব খান
হুম, আজকের বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখো!
আমীন মুহাম্মদ
আপনি চব্বিশে তারুণ্যের জাগরণকে উৎসাহ দিয়ে ‘সালাম তোমায় ছাত্র’ নামে কবিতা লিখেছেন। এনসিপিকে, বিএনপিকে পাঁচটি করে পরামর্শ দিয়েছেন।
মুহিব খান
এখন এনসিপিকে মিলিয়ে দেখতে বলো, পরামর্শ ৫টি মানলে কী হতো আর না মেনে চলে এখন কী হালত? আর বিএনপিকে নিয়ে তো বারো বছর আগেই লিখনীতে লিখছি—যে ভুলের মাশুল দিচ্ছে আজ বিএনপি। আজকে তারেক জিয়াকে নিয়ে যে হাহুতাশ দেখছো, আমি তখনই তাকে আরেক জিয়া ভাবা যাবে কি না, এ ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তা উপাদান তুলে ধরেছি।
আমীন মুহাম্মদ
একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে বলি। আমরা যদি আপনাকে নিয়ে আরেকটা বই বা পত্রিকা সংখ্যা করতে চাই, কী নাম রাখতে পারি—আপনার পছন্দটা যদি বলতেন!
মুহিব খান
কি নাম রাখবা? ‘একবিংশের কবি’—এটা রাখতে পারো।
আমীন মুহাম্মদ
সুন্দর নাম। আপনার লাল সাগরের ঢেউ বইয়ের ভূমিকা এবং প্রথম কবিতায়ও এই কথাটা লিখেছিলেন!
মুহিব খান
শোনো! প্রতি শতাব্দীর একজন মুজাদ্দিদ থাকে, কবি থাকে। বিংশ শতাব্দীর ছিলেন ইকবাল, নজরুল। এমনই একবিংশ শতাব্দী। আমি গত ২৫ বছর ধরে টানা দুই যুগে সংগীতে কবিতায় ভাষণে বক্তৃতায় বা খুতবায় মুসলিম জাতির জন্য এবং বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক অনেক ভবিষ্যৎবাণী এবং সুচিন্তিত সমাধান পেশ করেছি এই অল্প বয়সে। আমি আর লিখবো না। ১০০ বছরের জন্য ২৫ বছরের মধ্যেই আমার সিলেবাস দেয়া হয়ে গেছে পৃথিবীকে। একজন কোচ কি খেলার পুরো অংশেই থাকে নাকি? তিনি শুধু বলে দেন, খেলাটা কখন কেমন হবে? কোন পরিস্থিতিতে কোন বলটা করতে হবে?
আমীন মুহাম্মদ
আপনার ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ নামক বইটা লেখার জন্য বারবার আমি আবদার করতাম আপনাকে। কিন্তু আপনার আসল রাষ্ট্রচিন্তার সব বিষয়ই তো কবিতা সংগীতে লিখে ফেলেছেন। এগুলো জাস্ট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এই জন্য আমি নিয়ত করছি, রাষ্ট্রচিন্তার কাঠামো ও সংবিধান সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান অর্জন করে আপনার সমস্ত জ্ঞান কবিতা রচনা থেকে ছেঁকে ছেঁকে ‘মুহিব খানের রাষ্ট্রচিন্তা’ নামে একটা ফর্মুলা আমি নিজেই দাঁড় করাবো ইনশাআল্লাহ!
মুহিব খান
যেটা তুমি বুঝবা, সেটাই লিখবা। আমার ইলহামী কবিতা, প্রেম বিরহ এবং আমার কাছ থেকে যা শুনেছো—এগুলো তুমি লিখবা। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে কারো ছকে ফেলে লিখলে হয় না আসলে!
আমীন মুহাম্মদ
ঠিকাছে, আমি যেটা পারব, সেটাই আমি লিখব ইনশাআল্লাহ!
মুহিব খান
এ্যাই! এখানে কে আছে? আমাদের একটু চা-টা দিও!
আমীন মুহাম্মদ
অনেকদিন আমরা আপনার নতুন কোনো সাহিত্যিক নমুনা পাচ্ছি না! আমরা কি আবার একটা বিস্ময়ের অপেক্ষা করবো কাব্যানুনাদের মতো?
মুহিব খান
মানুষ তো বয়সের পরিবর্তনে একটা পরিণত অবস্থায় আসে। আমি এখন কিছু উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রচনা করছি। কিছু রুবাইয়াত এবং মহাকাব্যিক ধারার কিছু বিষয় লিখছি। তুমি আমার রত্নকথা গুলো দেখেছিলে? চার পঙক্তির দার্শনিক কবিতা!
আমীন মুহাম্মদ
কবিজী! কাব্য-কবিতা ও ফুল-পুষ্পের আপনি কিছু আকর্ষণীয় নাম রেখেছিলেন। সবগুলো কী কী? আমরা অগোছালোভাবে পাই!
মুহিব খান
কবুওয়ত, কবিস্তান, কবিতার বাড়িঘর, কবি কবিতার ঘর, কবিরাজ, আরো আছে কিছু। তোমরা বলো কবিজী! বইয়ের ভিতর খুঁজলে পাবে। কিছু ফুলের নাম রেখেছি—বৃষ্টিফুল, রোদ কুসুম, কাবা ফুল!
আমীন মুহাম্মদ
আগে যেটা বলছিলাম। আপনার কবিতায় দেশ, রাষ্ট্র, উম্মাহ ও প্রজন্মের নামে প্রচুর ভবিষ্যৎবাণী ছড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি দেশের ও বিশ্বের…..?
মুহিব খান
শাহ নিয়ামাতুল্লাহ কি প্রতিদিন এসে একটা একটা করে ভবিষ্যৎবাণী করে যান? আমি এই শতকের জন্য যা হবে, হয়েছে—সব বলে দিয়েছি। “সীমান্ত খুলে দাও” গানটা আমি কবে গাইছি? ২০০১—এ। আজকে দেশে দেশে সেই আওয়াজই সবাই তুলতেছে। তরুণরা ইসলামিক স্কলাররা ঘুরেফিরে আমার বলা কথাগুলোই পুনরাবৃত্তি করতেছে।
আমীন মুহাম্মদ
শুধু ভাষার বৈচিত্র্য, শুধু সময়ের পার্থক্য!
মুহিব খান
তারপর দেখো! ২০০৩—এ গাইলাম,
এই দূর বাংলার জনপদ থেকে
কেঁদে কেঁদে বলে হতভাগা এই কবি
সারা দুনিয়ার মুসলিম যতো
রাষ্ট্রপ্রধান আরবি বা অনারবী—
এক হও এক হও যদি সবাই বাঁচতে চাও!
এখন এক হও যদি স্বাধীনতা ফিরে চাও!
আমেরিকা নাইন-ইলেভেন
লন্ডন সেভেন-সেভেন
জিহাদের জ্বলছে আগুন জ্বলবে।
হক বাতিলের চলছে লড়াই চলবে।
এরপরে কী হলো ২০০৩ থেকে ২০২২ পর্যন্ত? ইরাক দখল করলো মার্কিনিরা, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, আরব বসন্ত, মিশরে ইসলামপন্থিদের বিজয় আবার ষড়যন্ত্র, তুরস্কে ইসলামের পুনর্জাগরণ, লিবিয়া আফ্রিকা ও আফগান কাশ্মীর পরিস্থিতি—স—ব তো আমি ২৫ বছর আগে আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে ইলহামের চোখে দেখেছি। দেশে তো আছেই, সাধ্যমতো বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে ছুটে গিয়েছি। আমার “তুমি তো মুসলমান” গানটা মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি যুবকেরই প্রাণের সঙ্গীত।
এই যে আফগানিস্তান মার্কিন আধিপত্যাবাদ থেকে স্বাধীন হলো—এর পেছনে আমার অবদান অনেক। তালেবানকে এদেশে জঙ্গিবাদের টাইটেল লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই আফগানিস্তান মুসলিম জাতি ও বাংলাদেশের কাছে অনুপ্রেরণার বস্তু কীভাবে হয়ে গেল? কিছুদিন আগে আফগান সরকারের বাংলাদেশে নিযুক্ত এক কর্মকর্তা আমাকে আফগান ভ্রমণের সরকারি দাওয়াত দিয়েছিল। আমি বললাম, “আপনারা আমাকে কী জন্য নিতে চাচ্ছেন? তিনি বললেন, বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট বড় আলেম হিসেবে। আমি বললাম, আমি কোনো বড় আলেম না।
আমি একজন আলেম কবি—যেই কবি আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ও দখলদার সাম্রাজ্যবাদীদের থেকে মুক্তির জন্য অসংখ্য চিন্তা কথা সঙ্গীত লিখেছি। দেশে দেশে গেয়েছি। বিশ্বজনতাকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে ইতিবাচক চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছি। আমি যা লিখেছি, আফগানিস্তানের জাতীয় কবি হওয়ার সম্মান আমি রাখি। এতো গভীর কথা চিন্তা, এতো অগ্রীম আফগানী কোনো কবিও বলেন নাই। আপনারা এগুলো পশতু ভাষায় অনুবাদ করেন। আর আফগান তালেবান সরকার যদি আমাকে সে দেশে নিতেই চায়, তাহলে একজন জাতীয় কবির সম্মান দিয়েই আমাকে নিতে হবে। আপনারা চিন্তা ভাবনা করে দেখেন!”
আমীন মুহাম্মদ
আপনার আমার গান—১ এর এক লাদেন বিন লাদেন যদি মরে যায়, মোল্লা মোহাম্মদ ওমর যদি সরে যায়, হবে ফের দুনিয়াতে ইসলামী ফরমান জারী, প্রাণের আওয়াজের দিনবদলের পূর্বাভাস, শেষ জামানার কারবালা-সমেত প্রভৃতি বই কবিতায় গানে আপনি আফগান প্রসঙ্গটা তুলে ধরেছেন, আমরা শুনেছি, পড়েছি। হুজুর! আপনার ‘তালেবান তালেবান’ গানটা আফগানিদের মুখে মুখে তুলে দিলে কেমন হয়—উর্দুতে দিলেও চলবে—ওরা তো উর্দু ভালোই বুঝে!
আপনার আরেকটা বিখ্যাত লাইন ছিল—বাকিংহামের দ্বার//হবে ঘর আল্লাহর//দিকে দিকে ইসলাম জাগবে! দিনে দিনে কিন্তু এই কথাটা আরও সত্য হচ্ছে আল্লাহর রহমতে!
মুহিব খান
ওই সংগীতের নামও—দিকে দিকে ইসলাম জাগবে! এখন তো সারা দুনিয়ায় এই কথাগুলো সাড়া পড়ে গেছে। বাংলাদেশে বসে তোমাদের জন্মেরও আগে থেকে আল্লাহপাক এই আমাকে দিয়ে এমন তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্ব মুসলিমের অমর সঙ্গীত, বিজয়ের গীতি লিখিয়েছেন। নজরুলে কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী নাই। তার কবিতায় অন্যান্য বিষয় এসেছে।
আমীন মুহাম্মদ
এই কথাটি নজরুলের একটা লাইন দ্বারাও প্রমাণিত হয়—“বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবী!” আল্লামা ইকবালে ভবিষ্যৎবাণী আছে। মাশাল্লাহ আপনার কবিতায়ও আছে।
মুহিব খান
আমি “ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি” গানে জাতীয় ৬ নেতার নাম কেন এনেছি? বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের প্রত্যেকের অবদান আছে। আমি শুধু মুজিব বা জিয়াকে আনি নাই। মুজিব যত কিছু হোক; একলা টিকতে পারবে না। বরং এরা ৬ জনই জাতির পিতা। কেউ একা মুজিবকে রাখতে চাইলে পারবে না। এই নতুন বাংলাদেশের চিত্র তো আমিই এঁকেছি—
এদেশে আল্লাহু আকবারের সুরে সূর্য ওঠে।
এদেশে আল্লাহু আকবারের সুরে সূর্য ডুবে।
বিশ্বের চোখে ঈমানের এই মাটিকে আর কে প্রেজেন্ট করেছে এভাবে? আজকের ছেলেরা যে ভাষায় কথা বলে, ভারতকে চোখ রাঙ্গানি দেয়; এই দেশে এগুলো এই ভাষায় আমিই প্রথম গেয়েছি। “সীমান্তে ওই ক্যাঠা?/কোন্ হারামির বেটা?/ধইরা তারে মাজায় ঘাড়ে/মুগুর দিয়ে পেটা!” চিন্তা করো, সেই সময় ২০০১ সনে এসব কেমন জাগরণী উচ্চারণ ছিল। আমাদের ছেলেরা কি এগুলো জানে? আমি তো “বাঁচাও বাংলাদেশ” গানে এই দেশপ্রেমিক যুব তারুণ্যকে আমার চূড়ান্ত কথা বলে দিয়েছি।
আমি তো জানি না, পরে কী আমার হবে
তোমরা ছেড়ো না এ মাটির স্বাধীনতা
তোমাদের হাতে এই দেশ বেঁচে রবে!
এগুলোই তো চেতনার খোরাক, স্বাধীনতার বিপ্লবী বাণী!
আমীন মুহাম্মদ
হুজুর! যুবকদের নিয়ে আপনাকে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত আশাবাদী দেখি। আপনি তো আরাকানে যুবকদের জন্যও লিখে রেখেছেন আরেক স্বাধীনতার সংগীত। আমি মনে করি, আপনার “যৌবনের রূপরেখা” রচনাটা পুরো পৃথিবীকে পাঠ করানো উচিত!
মুহিব খান
আরাকানের যুবকরা যদি কোনদিন জাগে—ওরা জানবে, বাংলাদেশের কবি মুহিব খান ওদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অনেক আগেই কবিতা গান চিন্তা ও দোয়া রেখে গেছেন।
আমীন মুহাম্মদ
হ্যাঁ, আমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এ মার্কিন শিল্পী জর্জ হ্যারিসনও বাংলাদেশ নামে গান গেয়ে গণসংযোগ করেছিলেন আমেরিকায়।
মুহিব খান
আরে জর্জ হ্যারিসন তো যুদ্ধকালীন বাংলাদেশরে নিয়ে কনসার্ট করেছে। আর রোহিঙ্গারা যখন বাস্তুচ্যুত, ঘরহারা, বাংলাদেশে আশ্রিত, শরণার্থী হয়ে আছে—আমি তখন লিখেছি, “জাগবে আরাকান, বাঁচবে আরাকান, লড়বে আরাকান, ঐ শোন আজান!” বুঝতে পারছো?
আমীন মুহাম্মদ
জ্বি, দুইটা দুইরকম। ইনশাআল্লাহ আরাকান একদিন স্বাধীন হলে আপনার এই “জাগবে আরাকান” গানটাকেই ওদের জাতীয় সংগীত বানাবে!
মুহিব খান
হ্যাঁ, “স্বাধীন আরাকানের জাতীয় সংগীত” নামে এটাকে রাখবে—যদি ওরা জানতে পারে প্রতিবেশী দেশের কবি তাদের জন্য এই মুক্তির গান গেয়েছিলেন!
আমীন মুহাম্মদ
আপনি ২০২৩ সনের শেষ দিকে—নির্বাচনের প্রাক্কালে বলেছিলেন—ন্যাশনাল মুভমেন্ট এর কার্যক্রম এবার ইচ্ছাকৃত স্থগিত রাখবেন। এর আগে বলেছিলেন, সারা দেশে কর্মী সংগ্রহ ও ৬৪ জেলাভিত্তিক দল মত সংগঠনের জন্য আমার মাত্র ৬ মাসের প্রয়োজন। এই ছয় মাসেই সভা সমাবেশ ও মিছিল-বিবৃতি দিয়ে গোটা দেশে ন্যাশনাল মুভমেন্ট তার অবস্থান তুলে ধরতে পারবে। এরপর ২০২৪ গেল। এখন ২০২৫ও শেষ। আজকে ন্যাশনাল মুভমেন্টের নবম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। পূর্বোক্ত নীতি অনুযায়ী তাহলে নিশ্চয়ই ২০২৬ সাল থেকে “ন্যাশনাল মুভমেন্ট” আবার গতিশীল ও সক্রিয় হয়ে উঠবে রাজনীতির মঞ্চে?
মুহিব খান
ন্যাশনাল মুভমেন্ট সর্বদাই ক্রিয়াশীল আছে। তোমরা এটা বাইরে দৃশ্যমান দেখো না। কিন্তু আমার এখানে ন্যাশনাল মুভমেন্টের জাতীয় সদস্য কারা? কোথা থেকে এনএম আগে বাড়বে—সব কিছু স্পষ্ট। আর ২০২৬শে অবশ্যই ন্যাশনাল মুভমেন্ট নবউদ্যমে পথ চলবে ইনশাআল্লাহ। এ বিষয়ে অচিরেই আমাদের নানা লেখা, বক্তব্য ও পদক্ষেপও দেখতে পাবে!
আমীন মুহাম্মদ
আপনার “করি না মৃত্যু ভয়” গানটা মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই youtube কর্তৃপক্ষ উধাও করে দিল। হায়রে গোলামী কোম্পানী। আমি প্রায়ই ভাবতাম—কবিজী বৈশ্বিক রাজনীতিতে মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে কোন রচনা বক্তব্য কেন দিচ্ছেন না? নাকি আমিই পাচ্ছি না! মাশাআল্লাহ হামাস ও গাজা রাফা নিয়ে আপনার এই গান সাম্রাজ্যবাদী ইহুদিদেরও কাঁপিয়ে দিয়েছে। আমার কাছে “করি না মৃত্যু ভয়” গানটাকে “সীমান্ত খুলে দাও” গানেরই বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও উত্তরাধুনিক বিশ্লেষণ মনে হয়। উমাইয়া, আব্বাসী খেলাফত, সেলজুক, আইয়ুবী হুকুমত, মামলুক ওসমানীদের রাজ, ইরান, মোঘল, বঙ্গ…. আবার মদিনা দামেশ্ক বাগদাদ ঘুরে, ইউরোপ আফ্রিকার সূদুরে, কর্ডোভা গ্রানাডার পথ ধরে তুর্কি দিল্লি ঢাকা….! সুবহানাল্লাহ! মুসলিম উম্মাহর চৌদ্দশ বছরের ঐতিহাসিক খেলাফতের সুস্পষ্ট দলিল উঠে আসছে এইখানে এবং চিরন্তন জিহাদী প্রেরণা উদ্দীপনা। এই গানের আরবি ইংরেজি করা দরকার আজকেই। আবার ইউটিউবেই আমরা এটা আপলোড করবো ইনশাআল্লাহ। বারবার করবো ইনশাআল্লাহ!
মুহিব খান
তোলো তাকবীর গানটার সময়ও ওরা এমন করছে। ডাকছে ফিলিস্তিন গানের ব্যাপারে রিপোর্ট পাঠাইছে। কী করবা? জীবনের ঝুঁকি তো বাদই। তারপরো এ অবুঝ ঘুমন্ত জাতিকে কে বুঝায়?
আমীন মুহাম্মদ
উত্তরায় নতুন ফ্ল্যাটে একদিন আমি আবদার করেছিলাম, মরহুম দাদাজান মাওলানা আতাউর রহমান খান রহমাতুল্লাহ আলাইহির নামে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে। তাকে নিয়ে আপনার “তাঁর মতো আর নেই” বইটাও তো বাজারে নেই। এতো বড় একজন রাজনীতিবিদ দার্শনিক আলেম মাওলানা—তাঁকে আমরা, আমাদের ছেলেরা যেন চিনেই না। অথচ তার পাঁচজন ছেলেই কিন্তু বাংলাদেশে বিখ্যাতমুখ। নদভী সাহেব শুধু “হযরত মাওলানা আতহার আলীর রহ. স্মৃতি” বইটিকে মাসিক নেয়ামতে পুনঃপ্রকাশ করেছেন। আর উনার আত্মজীবনী—আপনি বলেছিলেন—দাদাজান নিজেই নাম রেখে গিয়েছেন—আমার জীবন। ওইটার শেষে “যাবার বেলা” নামে একটা কবিতাও আছে দাদাজানের।
মুহিব খান
আব্বার নামে হলি মিডিয়ায় একটা ভিডিও চিত্র করবো বলছিলাম। এটা করবো। আব্বার আত্মজীবনীটা কিশোরগঞ্জে আছে। মাঝে বড় ভাইজান ঢাকায় নিয়ে আসছিলেন ছাপিয়ে প্রকাশ করে ফেলার জন্য। পরে আর হয়নি। আমার ইচ্ছে হলো, আব্বাকে নিয়ে লেখা “তাঁর মতো আর নেই” স্মরণিকাটা সহ তার আত্মজীবনীটাও আমিই প্রকাশের ব্যবস্থা করবো ইনশাআল্লাহ। তুমি একদিন আমার সাথে কিশোরগঞ্জে যেও। বাড়িতে আব্বার আরো লেখার ফাইল আমি তুলে রাখছিলাম।
আমীন মুহাম্মদ
মাসিক আলকাউসার ২০০৮ সনে দাদাজানের ওফাতের পরপরই “স্মৃতির পাতা থেকে” শিরোনামে উপমহাদেশের মনীষীদের নামে তাঁর একটা স্মৃতি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিল। আলহামদুলিল্লাহ সেটা আমি সংগ্রহ করেছি এবং পান্ডুলিপি আকারে সাজিয়েও ফেলেছি। আর আমার কাছে দাদাজানের আরো কিছু স্মৃতিচারণমূলক লিখনীও আছে। যেমন হযরত খতিব ওবায়দুল হক রহ., হযরত মাওলানা মুহাদ্দিস ছাহেব হুজুর রহ., হযরত মাওলানা মুহাম্মাদউল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-কে নিয়ে। উনার সম্পাদিত পত্রিকাটি ঘাটলে (মাসিক মুনাদী) আরো লেখা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে এরকম!
মুহিব খান
মাশাআল্লাহ! তুমি অনেক ভালো কাজ করেছো। এগুলোকে সংরক্ষণ করো। আমার আলমারিতেও ফাইল রেখো। ইনশাআল্লাহ এগুলোকেও বই করবো “গুণীজনদের স্মৃতিকথা” নামে। আব্বার “তাফসীরে সুরা মুলক”, “পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ও ইসলাম” বইগুলিও তো ছাপানো লাগে। আসলে আব্বা মূলত খতীবে মিল্লাত ছিলেন। তার বয়ানের ক্যাসেটগুলি থেকে বয়ানগুলি যদি কোনভাবে উদ্ধার করা যেত? ভাগিনা উবাইদুল্লাহ শাকির বলেছিল, একটা কী সিস্টেম আছে—আগের যুগের রেকর্ড থেকে বক্তব্য ভিডিও উদ্ধার করা যায় নাকি!
আমীন মুহাম্মদ
আল্লাহ কবুল করেন! দাদাজান এতো আধুনিক ছিলেন যে, আজকে মাওলানা তাকী ওসমানী সাহেবের একটা বই অনুবাদ ছেপেছে মাকতাবাতুল আযহার। ওই বইয়ের নামই রেখেছে তারা দাদাজানের বইয়ের নামানুসারে—পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ও ইসলাম—হুবহু এই নামেই।
মুহিব খান
আব্বা এমনই ছিলেন আজীবন। দূরদ্রষ্টা ছিলেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। ২০ বছর পরে কী ঘটতে পারে, কী হবে—এখন বসেই সেটা বলতে পারতেন। সবার কথা শুনতেন, নিজের বুঝে চলতেন। আমাদেরও চলতে বলতেন। আমার জীবনের অধিকাংশ বিষয় তো আব্বার থেকেই আমি শিখেছি। এতো বই আমি পড়ি নাই। ১০০টা বইও পড়ি নাই। খালি আব্বাকে দেখছি—তিনি কী করেন? কীভাবে করেন? কীভাবে চলেন? আমার সব থেকে বড় শিক্ষক, প্রিয় মানুষ আমার আব্বাই!
আমীন মুহাম্মদ
কবিজী! মুসলিম উম্মাহর জাতীয় কবি আপনি। ইসলাম ও বাংলাদেশের অভিভাবক আপনি। বর্তমান ও আগামীর বিশ্বের অবস্থা, অবস্থান ও পরিনামকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? বাংলাদেশের জন্য, মুসলিম জাতির জন্য অসংখ্য কালজয়ী গণসংগীত আপনি লিখেছেন। আরবি ইংলিশ উর্দু হিন্দি ইত্যাদি ভাষায় সাহিত্য ও চেতনার বাণী সৃষ্টি করে জাতি জাগরণের গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। এজন্য আপনাকে আন্তরিক শুকরিয়া, মোবারকবাদ।
মুহিব খান
২০২৩ এর ৭ই অক্টোবরের মাত্র ২ দিন আগে আমি একটি ফেসবুক পোস্টে, ইউটিউবে “উঠবে নতুন ঝড়” সংগীতটি আপলোড দিয়েছিলাম। এর দু’দিনের মাথায় অচিন্তনীয়ভাবে কুদরতের দয়ায় আফ্রিকায় এক মুসলিম শাসকের নবউত্থান সূচিত হয়। আর হামাসের ইতিহাস সৃষ্টিকারী “তুফানুল আকসা” তো একসাথে গোটা বিশ্বে প্রবল আলোচিত বিষয়। এর পেছনের হিকমতটা কী? এটা আল্লাহর বিশেষ দয়া ও ইলহাম। “পৃথিবীর কোনায় কোনায় আমার এ গান দাও ছড়িয়ে” ২০১৮তে আমি অসুস্থ্য অবস্থায় লিখেছিলাম। একটা মুসলিম জাতিসংঘের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন, আলহামদুলিল্লাহ স–ব আমার এই গানে চলে এসেছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলাম—
জাগো রে তুর্কি আরব বঙ্গ মালয় পাক সেনাদল
সমরের শক্তিতে আজ সব মিলে হও শক্তসবল।
…এর এক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের ইমরান খান, তুরস্কের এরদোগান ও মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ—এই তিন নেতা মিলে একমত হয়ে গিয়েছিলেন, একটা মুসলিম জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা ও ইন্টারন্যাশনাল মুসলিম আর্মি নামে একটা সামরিকবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে। যে কারণে ইমরান খান আজ সাম্রাজ্যবাদীদের চক্ষুশূলের শিকার।
আমীন মুহাম্মদ
অথচ আপনি ও ইমরান খান; দু’জনে দুই দেশে। এবং কোনরূপ যোগাযোগ হীন।
মুহিব খান
হুম! গানের লাইনগুলো খেয়াল করো—
জাগো অর্থে, জাগো অস্ত্রে, জাগো ঐক্যে জাগো আজ সব
রুখো বিশ্বের বুকে মুসলিম বিনাশের উদ্ধত উৎসব
জ্ঞান বিজ্ঞান বুঝে নাও, শক্তি বাড়াও তথ্যপ্রযুক্তির
গণমাধ্যম গড়ো, দুশমন শিবিরের দুর্গে ধরাও চির
তোলো তাকবীর! তোলো তাকবীর! তোলো তাকবীর!!
… ছেলেরা শুধু লাফায়—কবি! গান শোনান, গান শোনান। কিন্তু বোঝার চেষ্টা করে না গানের বক্তব্য। আমি তুর্কি আরব বঙ্গ মালয় পাক সেনাদল বুঝেই লিখেছি। কেননা, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য শক্তির কেন্দ্রস্থল এই দেশগুলোই হবে!
আমীন মুহাম্মদ
আপনার “ধর্ম দর্শন বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধি” বইটি কবে নাগাদ আসবে? নতুন কোন প্রকাশনী কি আর যোগাযোগ করেছিল?
মুহিব খান
আমার সাথে গার্ডিয়ান, ইত্তিহাদ ওরা যোগাযোগ করেছে। ঐতিহ্যের নাঈম ভাই তো আমার কাছে আগেই বই চেয়েছেন। ভাবছি নতুন কোন বই আরো লেখা হলে ওদের দিব। বাকি বইগুলো রাহনুমা করছে, করতে থাকুক। আমার এই বইটার জন্য নতুন কিছু বয়ান লেখা বাকি আছে। ইনশাআল্লাহ ৩০ টা বয়ান হলে একটা সুন্দর বই হবে। আচ্ছা, বইটার কী নাম রাখা যায়, ভাবো তো?
আমীন মুহাম্মদ
সব সুন্দর নাম তো মুরুব্বিরাই নিয়ে গেছেন। মাওলানা মনজুর নোমানী রহ. ইসলাম সম্পর্কে একটা বইয়ের নাম রেখেছেন “ইসলাম কেয়া হ্যায়?”। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর একটা বইয়ের অনুবাদ হয়েছে, “ইসলাম : ধর্ম দর্শন সংস্কৃতি” শিরোনামে। যেহেতু আপনার বইটা ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীর দার্শনিক বিশ্লেষণ, তাই এটার নাম—”ইসলাম কেন” বা “ইসলাম কী জন্য” রাখতে পারেন। আপনার “ইসলাম কেন শ্রেষ্ঠ ধর্ম?” বয়ানটি থেকেই এ নামটা আমি নিয়েছি।
মুহিব খান
হ্যাঁ, এটা রাখা যায়। মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ সাহেবের বইটাও সুন্দর। কি নাম যেন রাখছিলেন—ইসলামকে জানতে হলে। তিনি এখানে ইসলামের প্রাথমিক মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আমারটার কী নাম হবে? আমারটা তো এরকম না! এটার নাম হতে পারে—ইসলামকে বুঝতে হলে। (একযোগে হাসি) বইটার সুন্দর একটা নাম ভাবো! একটা নাম আমি ভাবছিলাম—ইসলামের জ্ঞানদর্শন!
আমীন মুহাম্মদ
এই নামটা অনেক সুন্দর।
মুহিব খান
একদিকে জ্ঞান আবার দর্শনও একসাথে। আবার চিন্তা করলাম, ইসলাম শব্দটা উহ্য থাকুক। এটা তো সব বয়ানে আছেই। সে হিসেবে “ধর্ম দর্শন বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধি” নামটাই সুন্দর। বইয়ের শুরুতে বিষয়গুলো নিয়ে আরেকটু আলোচনা না হয় করলাম। আপাতত এই দুইটা নামই মাথায় রাখো।
আমার মুরাকাবা বইটা—একটা প্রচ্ছদের কারণে এই বইটা পড়ে আছে। না, ওরা ফুটায় তুলতে পারে নাই। নাকি বইয়ের নামটা পাল্টে দিবো?
আমীন মুহাম্মদ
এই নামে তো আর কোন মহাকাব্য নাই। এখন পাঠক চিনে না বলে নামটা বাদ দিয়ে দিবেন? আমার আব্দার হলো, “মুরাকাবা” নাম যেটা আছে, ওইটাই রাখেন। অবশ্য “রহস্যপত্র” নামটা ভাবা যেতে পারে।
মুহিব খান
তাহলে এভাবে করা যায়, “মুরাকাবা” নামটা উপরে বা নিচে বড় করে লিখে “আল্লাহর সঙ্গে বান্দার আলাপ” বা “স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির রহস্যপত্র” নামে একটা টাইপোগ্রাফি তৈরি করা। ঠিকাছে, তাহলে সামনের এডিশনে আমি প্রচ্ছদ পরিবর্তনের কথা বলবো। মনে রেখো বিষয়টা।
Ekhon manush ki poriman self obsed hote pare ei interview ta porle buja zai
মুহিব খানের অবদান অনস্বীকার্য। তার কাজের আরো মূল্যায়ন হওয়া দরকার। কিন্তু একুশে পদক বা জাতীয় কবি খেতাব টানাটানি অসুন্দর ঠেকে।