নজরুল ও বাঙালি-মুসলমানের নবজাগরণ

আহমাদ সাব্বির

২৯ আগস্ট ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই মহান কবিকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি আমরা। তার বিপ্লবী চেতনা, সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, মানবপ্রেম ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো।—সম্পাদক।


হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য ও অপরিহার্য নাম। তিনি শুধু বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যধারার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিই নন, সামগ্রিকভাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যেরও অন্যতম শীর্ষ স্রষ্টা। বাংলা কবিতার আধুনিক পর্বে যে ক’জন কবি যুগস্রষ্টার মর্যাদা পেয়েছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের পাশে নজরুল ইসলামের নাম উচ্চারিত হয় সমান গুরুত্বে। তবে নজরুলকে কেবল কবি হিসেবে চিহ্নিত করলে তার সৃজনশীল বিস্তৃতিকে সংকুচিত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী; একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সংগীতস্রষ্টা, গায়ক, সুরকার, শিক্ষক, অভিনেতা এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি শাখায় তার অবদান গভীর ও স্থায়ী।

নজরুলের আবির্ভাবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝার জন্য তার পূর্ববর্তী সময়ের বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যচর্চার বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান শাসকদের ভূমিকা থাকলেও আধুনিক যুগে এসে বাঙালি-মুসলমান সমাজ নানা ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চায় পিছিয়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সূচনার পর মুসলমান সমাজ এক ধরনের আত্মসংকোচ, অভিমান ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে আধুনিক সাহিত্যচর্চায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন গড়ে ওঠেনি। গদ্যচর্চায় কিছু অগ্রগতি হলেও কবিতার ক্ষেত্রে আধুনিকতার সৃজনশীল বিকাশ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

নজরুলের আগে যারা মুসলমান কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে সক্রিয় ছিলেন, তাদের সংখ্যা কম ছিল এবং তাদের রচনাও ব্যাপক সাহিত্যিক আলোড়ন তুলতে পারেনি। তাদের অনেকেই ছিলেন সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ কিংবা সাংবাদিক; কবিতা তাদের প্রধান শক্তির জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি। তালিকাভুক্ত নামগুলো থেকে বোঝা যায় নজরুল-পূর্ব মুসলমান কবিদের উপস্থিতি ছিল বিচ্ছিন্ন, দুর্বল ও প্রভাবহীন। আধুনিক কাব্যভাষা, নতুন ছন্দ, বিদ্রোহী চেতনা কিংবা আত্মপরিচয়ের বলিষ্ঠ প্রকাশ সেখানে অনুপস্থিত ছিল বললেই চলে।

এই শূন্যতা ও স্থবিরতার ভেতরেই নজরুল ইসলামের আবির্ভাব এক বৈপ্লবিক ঘটনা হিসেবে সংঘটিত হয়। তার আগমন বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যকে শুধু একজন বড় কবিই দেয়নি; দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। নজরুল প্রথমবারের মতো বাংলা কবিতায় মুসলমান সমাজের অন্তর্গত বেদনা, বিদ্রোহ, স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে জোরালো ভাষা দেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, এবং মানুষের সমতা ও মানবিক মর্যাদার আহ্বান।

নজরুলের সাহিত্যিক সাহস ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি প্রচলিত রুচি, ভদ্রতার কৃত্রিমতা কিংবা সামাজিক ভয়কে তোয়াক্কা করেননি। বাংলা কবিতায় তিনি নিয়ে আসেন এক নতুন স্বর; যেখানে দ্রোহ আছে, কিন্তু তা নৈরাজ্য নয়; আবেগ আছে, কিন্তু তা অন্ধ নয়; ধর্মীয় অনুষঙ্গ আছে, কিন্তু তা সাম্প্রদায়িক নয়। তার কবিতা ও গান একদিকে ইসলামি ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, অন্যদিকে হিন্দু পুরাণ, পাশ্চাত্য কাব্যভাবনা ও বিশ্বমানবিক দর্শনের সঙ্গেও সেতুবন্ধন রচনা করে।

এই বহুমুখী সংলাপের মধ্য দিয়েই নজরুল বাঙালি-মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। তিনি দেখান, মুসলমান হওয়া মানেই সংকীর্ণ বা পশ্চাৎপদ হওয়া নয়; বরং তা হতে পারে মুক্তচিন্তা, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার শক্তিশালী ভিত্তি। তার সাহিত্য বাঙালি-মুসলমান সমাজের বদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়; যে দুয়ার দীর্ঘদিন ভয়, দ্বিধা ও আত্মগোপনের কারণে বন্ধ ছিল।

ঊনিশ শতকে বাঙালি হিন্দু সমাজে যে নবজাগরণ সংঘটিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাহিত্যচর্চার বিকাশ ঘটে, বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি-মুসলমান সমাজে সেই ধরনের জাগরণ শুরু হয় নজরুলের হাত ধরেই। তাই তাকে বাঙালি-মুসলমান নবজাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। তিনি শুধু এই জাগরণের অংশগ্রহণকারী নন, এর প্রধান প্রেরণা ও দিকনির্দেশক।

নজরুল-পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের যে বিস্ময়কর উত্থান ঘটে, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গবেষণায়, তার সূচনা বিন্দুতে নজরুল ইসলামের নাম অনিবার্যভাবে উপস্থিত। তার সৃষ্ট সাহসিকতা ও উদারতা পরবর্তী প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। মুসলমান সমাজ আর সাহিত্যকে নিজের বাইরের কোনো জগৎ মনে করেনি; বরং একে আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে শুধু একটি নতুন অধ্যায় সংযোজন করেননি; তিনি একটি নতুন মানসিকতার জন্ম দিয়েছেন। তার সাহিত্য আমাদের নতুন করে জানিয়ে দেয় যে, নবজাগরণ কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের নাম নয়; এটি চেতনার রূপান্তর। বাঙালি-মুসলমান সমাজের সেই চেতনার রূপান্তরের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও স্থায়ী নাম কাজী নজরুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments