অমর একুশের স্মৃতি

ডা. (ক্যাপ্টেন) আবদুল বাছেত

যোগাযোগ ডেস্ক

বায়ান্ন সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার, অপরাহ্ন ৩টায় যে নৃশংস ঘটনাবলী আমার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছিল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্মরণীয় ঘটনা। আজো চোখের পাতা নির্মিলিত করলে স্মৃতির ক্যামেরায় সেই দিনটি এবং তার পরবর্তী দিনগুলোর দৃশ্যাবলী আয়নার মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে।

তখন আমি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। তিন নাম্বার ব্যারাকের এক নাম্বার রুমে থাকতাম। ঐদিন আমার চোখের সামনেই গোলাগুলী সংঘটিত হয়েছিলো। কাজেই যা কিছুই দেখেছি এবং পর্যবেক্ষণ করেছি, তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা এখানে দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে তার আগে সেই সময়ে মেডিক্যাল কলেজের পুরানো হোস্টেলের পজিশন এবং চেহারা কি ছিলো, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া প্রয়োজন। কারণ, আগের চেহারার সঙ্গে বর্তমান চেহারার কোন মিল নই।

আগে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে কোনো সুরম্য অট্টালিকা ছিলো না। আমরা মেডিক্যালের ছাত্ররা মূলী বাঁশের ব্যারাকে বাস করতাম, যার শুধু বেড়াই মূলী বাঁশের ছিলো না, চালও ছিলো মূলী বাঁশের। লম্বা লম্বা ব্যারাক ছিলো এবং সেগুলো তিনটি সারিতে ছিলো। পূর্বদিকের সারিটি ছিলো সবচেয়ে বড়, যার উত্তর পাশে কিছুটা খোলা জায়গা ছিলো। এই খোলা জায়গাটিতেই গোলাগুলী হয়। ১ম ব্যারাটি ছিলো ১নং ব্যারাক। এই সারির পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে একটি কোণাকুণি রাস্তা ছিলো, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মাঠের দিকে বের হওয়া যেতো। এই রাস্তাটি পাকা ছিলো। এই রাস্তার পশ্চিম পাশে ব্যারাকের ২য় সারিটি ছিলো, আর ৩য় সারি ছিলো তারও পশ্চিমে। এই ব্যারাকগুলোর পশ্চিম-উত্তর পাশেও কিছুটা খালি জায়গা ছিল, যেখানে পুরানো ইটের একটি পাঁজাও ছিল। হোস্টেলটির চতুর্দিকে কাঁটা তারের বেড়া ছিলো। উত্তর দিকের গেটটি ছিলো প্রধান, আর দক্ষিণ দিকে আরো একটি গেট ছেলো। এ ছাড়া পূর্বদিক দিয়ে আরো একটি ছোট প্রাইভেট গেট ছিলো, যা দিয়ে আমরা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যাতায়াত করতাম এবং এই গেটটি দিয়েই গোলাগুলীতে আহতদেরকে চিকিৎসার জন্য তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পৌঁছানো হয়েছিলো।

উত্তর গেটের পাশ দিয়েই একটি পাকা রাস্তা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও সলিমুল্লাহ হোস্টেলের দিকে গিয়েছিলো। বর্তমানেও সে রাস্তাটি আছে বটে, তবে অনেকটা পশ্চিম দিকে বেঁকে গিয়েছে। এই রাস্তার পশ্চিম পাশ দিয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট দোকান ছিল, যার কয়েকটি ছিল খাবার হোটেল, বাকীগুলো ছিল লণ্ডী, মনোহারী ও পান, বিড়ি, সিগারেটের দোকান। এর একটি ছোট খাবার হোটেলে এত সুস্বাদু গরুর ভুনা গোশত পাক হত যে, আজও সে লোভ সংবরণ করতে পারি না। মাত্র আট আনায় যে গোশ্ত-ভাত তৃপ্তি সহকারে পেটপুরে খেতাম, এখন পনর টাকায়ও পাওয়া যাবে না।

পুরানো হোস্টেলের পুরা এলাকায়ই এখন বিভিন্ন কন্সট্রাকশন হয়ে গেছে, যেমন মেডিকেল আউট ডোর, ডিস্পেন্সারী, মহিলা স্টুডেন্ট হোস্টেল, নার্সিং ইনস্টিটিউট হোস্টেল এবং প্রশস্ত শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের আদৎ অংশটুকু মোটামুটিভাবে ঠিক জায়গায়ই আছে, তবে কিছুটা পশ্চিমে সরে গিয়েছে বলে অনুমিত হয়।

এবারে একুশে ফেব্রুয়ারী এবং তার পরবর্তী দিনগুলোতে যে সব লোমহর্ষক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, পাঠকগণের অবগতির জন্য তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছি।

একুশে ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বলীর মিটিং ছিল এবং সে-মিটিং-এ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী উত্থাপন করার জন্য সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হবে–এই উদ্দেশ্যে ঐদিন সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ দিবস পালনের আহ্বান করা হয় (সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে)। কিন্তু আন্দোলনের উত্তপ্ত আবহাওয়া লক্ষ্য করে সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারী বিকালেই দীর্ঘ ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন। এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা, সে সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ২০ তারিখ রাত্রেই নওয়াবপুরস্থ আওয়ামী লীগ অফিসে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের এক মিটিং বসে এবং সেখানে বিস্তারিত আলোচনার পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে, মেজরিটি ভোটে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু অনেক ছাত্র নেতাই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজী হন নি। তাঁরা রাত্রেই ঘরোয়া মিটিং করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যে ১১ জন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন: হাবীবুর রহমান শেলী, গাজীউল হক, এস. এ. বারী. এ.টি, মোহাম্মদ সুলতান, এম.আর. আখতার মুকুল, জিল্লুর রহমান, আবদুল মোমিন, কমরুদ্দিন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, আনোয়ার হোসেন এবং মঞ্জুর।

পরের দিন, ২১শে ফেব্রুয়ারী বেলা ১১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আবারো এ ব্যাপারে মিটিং বসে। সেই মিটিং-এ বহু তর্ক-বিতর্কের পর সাব্যস্ত হয় যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে এবং ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এই শ্লোগান দিতে দিতে ১০ জন করে ছাত্র এক সঙ্গে রাস্তায় বের হবে; যাতে শৃঙ্খলা বাজায় থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মিছিল চলতে থাকে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ১০ জন ১০ জন করে, বেলা সাড়ে এগারটার দিক থেকে মিছিল বের হতে থাকে এবং গেটের সম্মুখে দণ্ডায়মান পুলিশরা মিছিলকারীদের পুলিশ ভ্যানে তুলে লালবাগ থানা, সেন্ট্রাল জেল এবং টঙ্গীর দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এত করেও পুলিশরা ছাত্রদেরকে দমাতে না পেরে, বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় টিয়ারগ্যাস ছোঁড়া শুরু করে। আমি তখন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকায় ছিলাম এবং যন্ত্রণায় আমার চোখ দিয়েও দর দর করে পানি ঝরছিলো। এমন সময় একজন অভিজ্ঞ ছাত্র-নেতা মাইকে প্রচার করলেন যে, ‘সবাই পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন অথবা ভিজা রুমাল দিয়ে চোখ মুছে ফেলুন।’ তখন কলের পানিতে রুমাল ভিজিয়ে এবং সেই ভিজা রুমাল দিয়ে চোখ মুছে অনেকটা স্বস্তি পেলাম।

টিয়ার গ্যাসের প্রচণ্ড আক্রমণে পুলিশরা সাময়িকভাবে কৃতকার্য হল। বেলা ১ টার মধ্যে সমস্ত এলাকা কিছুটা শান্ত আকার ধারণ করল। পুলিশরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এদিক ওদিক কেটে পড়ল। মনে হল, আন্দোলন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু বাঙ্গালীর বুকে যে বারুদ ছিল, তাকে টিয়ার গ্যাস দিয়ে আর কতক্ষণ দমিয়ে রাখা যায়? দক্ষিণা হাওয়ায় যে মেঘ কিছুটা কেটে গিয়েছিলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তরে হাওয়ায় তা কালবৈশাখীর রূপ ধারণ করল। ছুট ছাট জনতা কোথা থেকে এসে এক পা দু’পা করে এসে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে জমা হতে লাগলো। হোস্টেলের পাশেই ছিল পরিষদ ভবন এবং বেলা ৩টায় সেখানে ছিল এ্যসেম্বলী মিটিং। মন্ত্রী এবং সদস্যরা তখন এ্যাসেম্বলীর দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। তাঁদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাস্তায় তখন শুধু পুলিশ আর পুলিশ। বেলা ৩টার আগ দিয়েই পরিস্থিতি খুব ভয়ানক আকার ধারণ করল। ছাত্ররা পুলিশের দিকে ভেংচি কাটা শুরু করল। পুলিশরাও মারমুখো হয়ে ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ করতে এলো।

এই পরিস্থিতিতে ছাত্ররা ভাঙ্গা ইটের পাঁজা থেকে দু’হাতে ভাঙ্গা ইট তুলে নিল এবং রাস্তায় ইট-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এমতাবস্থায় বেলা ৩টায় দিকে একজন পুলিশ সার্জেন্টের ইঙ্গিতে কিছু সংখ্যক রাইফেলধারী পুলিশ অতর্কিতে হোস্টেলের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল এবং সমানে গুলী চালাতে লাগল। মিনিটের মধ্যে হোস্টেলের সম্মুখ ভাগটা একটা রণাঙ্গণে পরিণত হল। বোমারু বিমান যেমন করে বোমা ফেলে চলে যায়, পুলিশরাও তেমনি গোলাগুলীর কাজ শেষ করে চলে গেল, কিন্তু আহতদের বুক-ফাটা ক্রন্দনে মেডিক্যালের আকাশ-বাতাস হল প্রকম্পিত, আর শহীদদের তাজা রক্তে হোস্টেলের সম্মুখ ভাগ হল রক্তাক্ত। সেদিনের শহীদদের সেই তাজা রক্তে -বাংলার মাটিতে বাংলা ভাষার যে বীজ প্রোথিত হয়েছিল, তা-ই আজ বিরাট মহীরূপে পরিণত হয়েছে।

গোলাগুলীর পর যে দু’টি লাশ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তা ছিল শহীদ জব্বার ও সালামের।

একজনের মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল। আরেকজনের বুকে গুলী লেগেছিল। এই দু’টি লাশ ছাড়াও গেটের কাছাকাছি ড্রেনের মধ্যে ১১-১২ বছরের একটি ছেলের লাশ পড়েছিল, যা অনেকেরই দৃষ্টিগোচর হয়নি এবং ছেলেটি পথচারী ছিল বলে তার পরিচয় জানাও সম্ভব হয় নি। কিছু সংখ্যক লোক আহত হয়ে এদিক ওদিক পড়েছিল। হোস্টেলের পূর্বদিকের ভিতরের গেট দিয়ে চিকিৎসার জন্য তাদেরকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেয়া হয় এবং ভর্তি করা হয়। কিন্তু পরে তাদের মধ্য থেকেও কয়েকজন মারা যায়। মৃতদের মধ্যে যে ৪ জনের নাম বিশেষভাবে জানা গিয়েছিল, তাঁরা হচ্ছেন: ১. আব্দুল জব্বার, ২. আবুল বরকত, ৩. আব্দুস ছালাম ও ৪. রফিক উদ্দীন। মেডিক্যালের ছাত্রগণ অতন্দ্র প্রহরীর মতো অনেক রাত পর্যন্ত লাশগুলোকে পাহারা দিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু গভীর রাতে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লোক এসে লাশগুলোকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং আজিমপুর গোরস্থানে কবরস্থ করে।

পরের দিন ২২শে ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে শহীদদের গায়েবানা জানাযার প্রোগ্রাম করা হয় এবং চতুর্দিক থেকে অগণিত লোক এসে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে জড়ো হয় ছাত্র-শিক্ষক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, উকিল-মোক্তার, কামার-কুমার, কৃষক-শ্রমিক কেউ বাদ ছিল না। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসেন সবার পরে, বেলা ১০ টিকে দিকে। তাঁর আসার পর পরই গায়েবানা জানাযা শুরু হয়। এবং জানাযান্তে তিনি মুনাজাত করেন। তাঁর দীর্ঘ মুনাজাতের ভিতর দিয়ে তিনি শুধু শহীদদের রুহের মাগফিরাতই কামনা করেন না, বরং অগণিত বাঙালীর অব্যক্ত বুকের ব্যাথার কথা আল্লাহর দরবারে এমন করুণভাবে পেশ করেন যে–আল্লাহর আরশ যেন কেঁপে উঠে। পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা’আলা হয়তবা সেদিন জালেমদের বিরুদ্ধে মজলুমদের এই করুণ ফরিয়াদ কবুল করেছিলেন, কেননা এর পরবর্তীতে প্রত্যেকটা ঘটনার ভিতর দিয়ে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।

জানাযার পর শহীদদের রক্তাক্ত জামা-কাপড় সরু বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে এবং সেগুলো সম্মুখে রেখে লাখো-জনতার মিছিল হোস্টেলের গেট দিয়ে এগিয়ে চলে। মিছিল কলাভবনের দিকে যেয়ে, রশীদ বিল্ডিং-এর মোড় পেরিয়ে, ইউনিভার্সিটি মাঠের পাশ দিয়ে কার্জন হলের মোড় পেরিয়ে হাইকোর্ট বিল্ডিং পর্যন্ত পৌঁছলে, অতর্কিতে পুলিশ স্টেনগানের গুলী ছোঁড়ে। আমি তখন মিছিলের প্রায় সম্মুখ ভাগে ছিলাম। হাইকোর্ট এবং কার্জন হল দু’ দিকেই উঁচু লোহার শিকের বেড়া থাকায় আমরা কোন্ দিক থেকে কোন্ দিকে যাই-একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ি এবং পাগলের মত লাফিয়ে, উঁচু লোহার শিক ডিঙ্গিয়ে অর্ধেক লোক কার্জন হলের দিকে এবং অর্ধেক লোক হাইকোর্টের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ি। স্টেনগানের মাজল কিছুটা উপরের দিকে তাক করা ছিল বলে, সেদিন আমরা অনেকেই রক্ষা পেয়েছিলাম, নতুবা যে ঘন মিছিলের উপর গুলী ছোঁড়া হয়েছিল, তাতে লাশের পর লাশ পড়ে সেদিন রাজপথ রক্তে ভেসে যেতো। ঐ গুলীতে একজন নিহত এবং বেশ কিছু লোক হতাহত হয়েছিল। সেদিন সারা দিন ধরেই বিভিন্ন পথে বিভিন্ন মিছিল বের হয়েছিল এবং পুলিশের বিক্ষিপ্ত গুলীতে বেশ কিছু লোক হতাহত হয়েছিল। ঐদিন রাত্রেই মেডিক্যাল হোস্টেলে কয়েকজন নেতা এক বৈঠক করেন এবং শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য একটি শহীদ মিনার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই ক্ষান্ত হন না, মেডিক্যাল কলেজের উচ্চ শ্রেণীর ছাত্র বদরুল আলমের নক্সা অনুসারে সারারাত ভরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে হোস্টেলের সেই পুরানো ইট দিয়েই একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন।

২৩ শে ফেব্রুয়ারী শনিবার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ২৪শে ফেব্রুয়ারী রবিবার সকালের দিকেই সেনাবাহিনীর লোক এসে শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে এবং মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মাইক দু’টি কেড়ে নিয়ে যায়। এতে সকলের মনে দারুণ হতাশার সৃষ্টি হয় এবং প্রচার কার্য ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। শুধু সলিমুল্লাহ হলের একটি মাইক দিয়ে প্রচার কার্য চলতে থাকে।

২৫ তারিখে তেমন কোন ঝামেলা হয়নি কিন্তু হোস্টেলগুলো খালি করার জন্য সরকারী আদেশ জারী হয়। ২৬ তারিখ বেলা ১০টার দিকে পুলিশ এবং মিলিটারীর একটি যুগ্ম দল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল দখল করে ফেলে। আমি ভাগ্যক্রমে তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম, কারণ ইকবাল হল থেকে মেইন রোড ধরে আমি মেডিক্যাল হোস্টেলে যাচ্ছিলাম। একজন আর্মী মেজর এই অপারেশনের কমাণ্ডার ছিলেন এবং হলের প্রভোস্ট সাহেবকেও ডেকে আনা হয়েছিল। প্রায় এক ঘন্টা ধরে ভিতরে সার্চ কার্য চলতে থাকে, বহু কাগজ-পত্র তছনছ করা হয় এবং বেশ কয়েকজন ছাত্র-নেতাকে ধরে নিয়ে যায়, সেই সঙ্গে হলের মাইকটিও কেড়ে নিয়ে যায়। ফলে তখনকার মত আন্দোলন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে যায় এবং আমরাও যার যার গ্রামের বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হই।

 

[বানান অপরিবর্তিত রাখা হলো]

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments