দেশগত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, তবে জাতিগত পরিচয় অনেক বেশি স্থায়ী। দেশের মানচিত্রের বদল হয়, কাঁটাতারের সীমারেখা সরে যায়, এমনকি পরিবর্তন হয় রাষ্ট্রের নাম ও পরিচয়। কিন্তু একটি দেশের মানুষ এবং তাদের উত্তরসূরিদের জাতিগত সত্তা সহজে মুছে যায় না। একটি জাতি রাষ্ট্র, মানচিত্র ও পতাকার পরিবর্তনের পরও তার নিজস্ব পরিচয়ে টিকে থাকে। যেমন আমরা বাঙালি মুসলমান। সাতচল্লিশের আগেও আমরা ছিলাম, পরেও আছি। একাত্তরের আগেও ছিলাম, পরেও আছি। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলে আমরা আমাদের ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয়ে উপস্থিত থেকেছি সগৌরবে। একের পর এক বাঁকবদলের পরও আপন মহিমায় আজও রয়েছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে গভীর স্তরে লুকিয়ে আছে তার মুখের ভাষা। আবহমান কাল থেকে বাঙালি মুসলমান যে ভাষায় কথা বলছে, স্বপ্ন দেখছে, যে ভাষায় মাকে ডাকছে, প্রার্থনা করছে সেই ভাষাই বাঙালি মুসলমানের মুখের ভাষা। শত শত বছর এই ভাষা বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গভীরতর সংকটের কালে বাঙালি মুসলমানকে তার নিজের ভাষা রক্ষায় অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এক জাতি তার প্রভাব ও অহমিকা দেখিয়ে অন্য জাতির আত্মপরিচয় ঢেকে দেওয়ার হীন চেষ্টার উদাহরণ কম নয় পৃথিবীতে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলার মুসলমান সমাজ এমনই এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। খাঁটি আর অখাঁটির মানদণ্ডে বিভক্ত করে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে পরবাসী করে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছিল। তাদের দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় মিশে থাকা আরবি-ফারসি শব্দগুলো আল্লাহ, খোদা, পানি, নামাজ, রোজাকে বাংলা ভাষার অংশ বলে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক মহল থেকে। প্রশ্নটা ভাষাতত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর পেছনে কাজ করেছিল গভীর সামাজিক রাজনীতি, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কথ্য বাংলাকে অশুদ্ধ আখ্যা দিয়ে তাদের মাতৃভাষার ওপর একধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা।
এই সংকটকালে যাঁরা কলম হাতে দাঁড়িয়েছেন এবং বাঙালি মুসলমানের পক্ষে নানা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আবুল মনসুর আহমদ তাঁদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ বহু পরিচয়ে উজ্জ্বল কিংবদন্তি এই মনীষা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও নিজস্ব ভাষা রক্ষায় সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থে জীবনের ভিন্ন সময়ের দুটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তাঁর ভাষা ও উপস্থাপনার পরতে পরতে যে দরদ ও তড়প প্রকাশ পেয়েছে তা নিজের জাতি ও কৃষ্টির প্রতি তাঁর অসামান্য প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর সাহস ও আপসহীনতার এমনতর দৃষ্টান্ত বাংলা ভাষার এবং বাঙালি মুসলমানের জন্য অনেক গৌরবের।
আবুল মনসুর আহমদের সেই ঘটনার আজ শত বছর পেরিয়ে গেছে। এর তাৎপর্য ঢাকা পড়ে গেছে কালের ধুলোয়। কী করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে একজন সাধারণ বাঙালি মুসলমানের কাছে তার ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা সেকালের দারিদ্র্য ও আত্মপ্রতিষ্ঠার চেয়ে অধিক মহান হয়ে উঠেছিল, এখানে রইল সেই বৃত্তান্ত।
ঘটনা এক : ১৯২৪ কি ২৫ সাল। কলকাতার সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকায় সহকারী সম্পাদকের চাকরি করছেন তরুণ আবুল মনসুর আহমদ। মাসিক বেতন পঞ্চাশ টাকা। এই সামান্য মাইনে যদিও কোনোমতে দিন চলে যায়, কিন্তু একটু বাড়তি আয়েশ ও আহ্লাদের সুযোগ হয় না। এমনই টানাটানির জীবনে হঠাৎ একদিন পত্র মারফত খবর এলো গ্রাম থেকে, পিতা এক জরুরি প্রয়োজনে শখানেক টাকার সংকটে পড়েছেন। ছেলের কাছে পিতার এই আবদার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আবুল মনসুর জানতেন, একান্ত অসহায় না হলে কখনো এভাবে বলতেন না টাকার কথা। কিন্তু একশো টাকা জোগাড় করা সেই সময় পঞ্চাশ টাকার একজন সাংবাদিকের কাছে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তখন তাঁর মনে পড়ল নিজের লেখা প্রথম বইটির কথা। নবীদের জীবনকথা অবলম্বনে শিশুদের জন্য লেখা একটি গল্পগ্রন্থ, যার নাম তিনি প্রাথমিকভাবে ঠিক করেছিলেন ‘মুসলমানী উপকথা’। এই পাণ্ডুলিপির স্বত্ব বিক্রি করে বাড়িতে টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এর জন্য প্রথমে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী বুক এজেন্সির কর্ণধার মওলানা আকরম খাঁ এবং তাঁর পুত্র খায়রুল আনাম খাঁর কাছে প্রস্তাব রাখলেন। আলাপ-আলোচনার পর তাঁরা ছয়শো টাকায় রাজি হলেন, এর বেশি পারবেন না। তবে সদয়ভাবে এও জানিয়েছেন, অন্য কোথাও ভালো দাম পেলে সেখানে বিক্রি করতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। পাণ্ডুলিপি না কিনলেও মওলানা আকরম খাঁ পরামর্শ দিলেন, বইয়ের নাম থেকে ‘উপ’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘মুসলমানী কথা’ রাখার। দীনেশচন্দ্র সেনের ‘রামায়ণী কথা’র অনুকরণে এই নামটি পছন্দ হলো আবুল মনসুর আহমদের।
এরপর শুরু হলো বেশি দামের সন্ধান। বহু দ্বারে ঘুরে অবশেষে কলকাতার প্রখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ভট্টাচার্য অ্যান্ড সন্সের সঙ্গে এগারোশো টাকায় স্বত্ব বিক্রির চুক্তি হলো। সেকালে একটি পাণ্ডুলিপির মূল্য হিসেবে এটি বিপুল অঙ্ক বলা চলে। পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একশো টাকা অগ্রিম পাওয়া গেল, বাকি হাজার টাকা ছাপার পরে। শর্ত ছিল, প্রথম প্রুফ লেখক নিজে দেখে দেবেন। এই শর্তে আবুল মনসুর আহমদের কোনো আপত্তি ছিল না, কারণ ততক্ষণে তাঁর বাড়িতে একশো টাকা জরুরি প্রয়োজন মিটে গেছে, আর নিজের প্রথম বইটি নির্ভুল হোক এই আগ্রহ তাঁর নিজেরও কম ছিল না। প্রকাশক রঙিন কালিতে, বড় হরফে, নকশাদার সীমানাসহ জমকালোভাবে বইটি ছাপানোর প্রস্তুতি নিলেন। বিজ্ঞাপনও বেরিয়ে গেল। ভট্টাচার্য অ্যান্ড সন্স থেকে প্রকাশিত একটি শিশুতোষ মাসিক পত্রিকায় বইয়ের একটি গল্প—মুসা ও কারুনের কাহিনি—আগেভাগেই প্রকাশিত হলে সাহিত্যিক মহলে বেশ প্রশংসা কুড়াল। তরুণ লেখক আবুল মনসুর আহমদের আনন্দের সীমা রইল না। এই আনন্দের মধ্যেই একদিন প্রকাশক তাঁকে ডেকে পাঠালেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের দোকানে। চা-নাশতার আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রকাশক মূল প্রসঙ্গে এলেন। বই খুব ভালো হয়েছে, ভাষাও চমৎকার, এমনতর প্রশংসার পর জুড়ে দিলেন এক শর্ত। বললেন, বইয়ে যেসব আরবি-ফারসি শব্দ আছে, ফুটনোটে সেগুলোর অর্থ যুক্ত করে দিতে হবে। আবুল মনসুর আহমদ এই প্রস্তাব পছন্দ করলেন না। কিন্তু তখনও হাজার টাকা বাকি, তাই সংযতভাবে যুক্তি দিলেন যে, অমন সুন্দর, রঙিন, শিশুতোষ বইয়ে ফুটনোট বেমানান লাগবে, বইয়ের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। প্রকাশক তাঁর এই যুক্তি মেনে নিলেন। খানিক ভাবনার পর বিকল্প প্রস্তাব দিলেন, তাহলে বইয়ের শেষে পরিশিষ্টে আরবি-ফারসি শব্দের অর্থ দিয়ে দিতে হবে। এবার আবুল মনসুর আহমদ তাঁর মূল অবস্থান স্পষ্ট করলেন যে, তাঁর বইয়ে আসলে কোনো আরবি-ফারসি শব্দ নেই, সবই খাঁটি বাংলা শব্দ। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, এই শব্দগুলোর উৎস আরবি-ফারসি হলেও বহুকাল বাংলার সাধারণ মানুষ এগুলো নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে আসছে, ফলে তা এখন সম্পূর্ণ বাংলা শব্দে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তিন বছরের নিরক্ষর বাঙালি শিশুও যে শব্দ বুঝতে ও বলতে পারে, তার মূল উৎস যা-ই হোক, সেটা বাংলা শব্দই। এই ছিল তাঁর যুক্তি। তিনি জঙ্গল আর জানালা শব্দ দুটির উদাহরণ টানলেন, যার প্রথমটি ফারসি এবং দ্বিতীয়টি পর্তুগিজ হলেও বাংলার মাটিতে এমনভাবে মিশে গেছে শব্দ দুটি যে এদের বাংলা প্রতিশব্দ খোঁজার কথা কেউ ভাবে না। প্রকাশক বিরক্ত হয়ে বললেন, তিনি ভাষাবিজ্ঞানের পাঠ নিতে চান না, তিনি একজন ব্যবসায়ী মানুষ, তাঁর কাছে বই বিক্রিই মুখ্য। ওই শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ না দিলে হিন্দু পাঠকরা বুঝবে না। কারণ মুসলমানরা ওই শব্দ ব্যবহার করলেও হিন্দুরা করে না। আবুল মনসুর আহমদ পাল্টা বললেন, হিন্দুরা এসব শব্দ ব্যবহার না করলেও তাদের বুঝতে সমস্যা হবে না। প্রকাশক তবু জোর দিলেন, শব্দগুলো যতই প্রচলিত ও ব্যবহৃত হোক, এগুলো আরবি-ফারসি শব্দ, বাংলা শব্দ নয়।
এই তর্কের চূড়ান্ত মুহূর্তে আবুল মনসুর আহমদ প্রশ্ন করে বসলেন, শতকরা ছাপ্পান্নজন বাঙালির মুখের ভাষাকেই যদি বাংলা বলে স্বীকার করা না হয়, তবে এ তো দেশের দুর্ভাগ্য! প্রকাশক তখন তাঁর খদ্দরের পোশাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, তিনি দেশের ভাগ্য নিয়ে তর্ক করতে চান না, শুধু জানতে চান প্রতিশব্দ দিতে পারবেন কি না। এই কণ্ঠস্বরে অন্যকিছুর ইঙ্গিত টের পেয়ে আবুল মনসুর আহমদ কিছুটা নরম সুরে জানতে চাইলেন, তাহলে কি পানি মানে জল, আল্লাহ মানে ঈশ্বর, রোজা মানে উপবাস এভাবেই লিখতে হবে? প্রকাশক খুশি হয়ে সায় দিলেন। তখনই আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আসল প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন, তাহলে কি স্বীকার করতে হবে যে পানি, আল্লাহ, নামাজ, রোজা এই শব্দগুলো বাংলা নয়, বরং জল, ঈশ্বর, উপাসনা, উপবাসই আসল বাংলা শব্দ? প্রকাশক একটু ভেবে বললেন, না তা কেন, বাংলা শব্দেরও তো বাংলা প্রতিশব্দ থাকতে পারে, যেমন ঈশ্বরের প্রতিশব্দ ভগবান, জলের প্রতিশব্দ বারি। এই যুক্তি শুনে আবুল মনসুর আহমদ তাঁর কৌশল ঠিক করে ফেললেন। বললেন, ঠিক আছে, আপনার কথাই মেনে নিলাম, প্রতিশব্দ আমি লিখে দেব, তবে একটি শর্তে। প্রকাশক জানতে চাইলেন তাঁর শর্ত। আবুল মনসুর আহমদ বললেন, আপনি তো অনেক হিন্দু লেখকের বইয়ের প্রকাশক, তাঁদের রাজি করান যেন তাঁদের বইয়ের পরিশিষ্টেও লেখা হয়, ঈশ্বর মানে আল্লাহ, জল মানে পানি, উপবাস মানে রোজা। এই শর্তে আপনি রাজি আছেন কি?
এই প্রস্তাবে প্রকাশক আর সংযত থাকতে পারলেন না, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁদের মধ্যে চুক্তি সেখানেই ভেঙে গেল। প্রকাশক ব্লক তৈরির খরচ বাবদ যে এক হাজার টাকা ইতিমধ্যে ব্যয় করেছিলেন, তা আর দাবি করলেন না, শুধু আগের দেওয়া একশো টাকা ফেরত দিয়ে যেকোনো দিন পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আবুল মনসুর আহমদও উঠলেন, আদাব জানিয়ে বেরিয়ে এলেন। দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই প্রকাশক পেছন থেকে ডেকে শেষবারের মতো বললেন, রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত না নিয়ে আবার ভেবে দেখতে, পরিশিষ্ট দিতে রাজি হলে এখনও বই নেওয়া যেতে পারে। তখন প্রকাশকেরই কথার প্রতিধ্বনি করে আবুল মনসুর আহমদেরও মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, রাগ কমিয়ে আবার ভেবে দেখুন, পরিশিষ্ট ছাড়া বই ছাপাতে রাজি হলে তবেই বই দেওয়া সম্ভব।
আবুল মনসুর আহমদ ফিরে যাচ্ছেন। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে শিয়ালদহের অফিসে ফেরার পথজুড়ে একটাই প্রশ্ন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল, এ কী করে ফেললাম! নিছক জেদের বশে এক হাজার টাকা খোয়ালাম? শুধু তা-ই নয়, আগে নেওয়া অগ্রিম টাকাটাও তো ফেরত দিতে হবে। যেন রাজ্যপাট হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গেলেন তিনি। সেই সময়ের হিসেবে এগারোশো টাকা তাঁর কাছে ছিল বিপুল সম্পদ। তখন তাঁর মনে পড়ল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কথা, যিনি মাসে চল্লিশ হাজার টাকার আইন-ব্যবসা ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেই ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তো তিনি নিজেও আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, নিজের এই এগারোশো টাকার ত্যাগ যেন দেশবন্ধুর ত্যাগের চেয়েও বড়, কারণ দেশবন্ধু ত্যাগের পরও সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন, কিন্তু তাঁর এই ত্যাগে সম্মান তো দূরের কথা, একশো টাকা ফেরত দিতে না পারলে চরম অপমানই অপেক্ষা করছে।
মনের ভেতর প্রশ্ন জাগল, কী দরকার ছিল এই জেদের? একটা পরিশিষ্ট লিখে দিলেই হতো, বইয়ে তো তাঁর নিজের কোনো স্বত্বই থাকবে না, তার ভুলত্রুটির দায়ও তাঁর ওপর বর্তাবে না। তারপর আবুল মনসুর আহমদের ভাষ্যটি ছিল এমন, ‘আমার সারা অস্তিত্ব এক সঙ্গে হুংকার দিয়া উঠিল : না না, ভুল করি নাই। আমার আত্মসম্মানবোধ ঝাঁকি মারিয়া মাথা তুলিয়া বুক টান করিয়া বলিল : ঠিক করিয়াছি। বাংলার মেজরিটি মুসলমানের মুখের ভাষাকে বাংলা ভাষা বলিয়া স্বীকার করিল না বাংলার মাইনরিটি হিন্দুরা? এ অবস্থা চলিতে থাকিলে মুসলমানের ত ভাল হইবেই না, সারাদেশের, সুতরাং হিন্দুরও ভাল হইবে না। কাজেই এটা বন্ধ করিতেই হইবে। হিন্দুদের বর্তমান মতিগতিতে কাজটা খুবই কঠিন। কাজেই স্যাক্রিফাইস দরকার। আমার মত গরীবের পক্ষে এগারশ টাকা স্যাক্রিফাইস খুব বড় ত্যাগ বটে, কিন্তু উদ্দেশ্যের তুলনায় এ ত্যাগ খুবই সামান্য। হয়ত এর চেয়েও বড় ত্যাগ করিতে হইবে। মনে সান্ত্বনা পাইলাম।’
অফিসে ফিরে পুরো ঘটনা খায়রুল আনাম খাঁকে জানালেন। তিনি সহানুভূতির সঙ্গে আগের প্রস্তাব অনুযায়ী ছয়শো টাকায় বইটি কিনতে রাজি হলেন এবং একশো টাকা অগ্রিমও দিলেন। পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে আনা হলো। তারপর যথাসময়ে মোহাম্মদী বুক এজেন্সি থেকেই ‘মুসলমানী কথা’ প্রকাশিত হলো।
ঘটনা দুই : প্রথম ঘটনার পর কেটে গেছে এক যুগ। সময়ের প্রবাহে আবুল মনসুর আহমদ আর সেই অসহায় তরুণ সাংবাদিক নন। ময়মনসিংহ জজকোর্টের একজন আইনজীবী। সাহিত্যের নেশা আর কিছুটা অতিরিক্ত আয়ের আশায় তিনি লিখলেন চার খণ্ডের একটি শিশুপাঠ্য বই, নাম ‘নয়া পড়া’। বইটি মকতবের চারটি শ্রেণির জন্য টেক্সট বুক কমিটির অনুমোদন পেল, এবং এ থেকে যথেষ্ট আর্থিক সুবিধা পেতে থাকলেন। কিন্তু তিন বছর পূর্ণ হওয়ার মুখে বাংলায় নতুন প্রাইমারি এডুকেশন আইন পাস হলো, যাতে প্রাইমারি স্কুল আর মকতবকে একীভূত করার বিধান হলো। যেহেতু ‘নয়া পড়া’ আগে থেকেই অনুমোদিত ছিল, তাই প্রকাশকসহ সবাই ধরে নিলেন নতুন আইনেও বইটি পাঠ্য থেকে যাবে এবং চাহিদাও বাড়বে। এই আশায় তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখতে শুরু করলেন। এরই মধ্যে টেক্সট বুক কমিটি থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হলো, বইটি নতুন আইনে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে ঠিকই, তবে শর্ত হচ্ছে বইয়ে থাকা আরবি-ফারসি শব্দগুলোর জায়গায় বাংলা প্রতিশব্দ বসাতে হবে। বারো বছর আগের সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল আবুল মনসুর আহমদের। তখন ছিলেন একজন প্রকাশক, এবার প্রতিপক্ষ খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র, টেক্সট বুক কমিটি। কিন্তু এখন তো আবুল মনসুর আহমদ আর সেই অসহায় তরুণটি নন। ততদিনে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ফজলুল হক তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী শিষ্য। হক সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানোর পেছনে তাঁর নিজেরও যথেষ্ট অবদান ছিল। এই অবস্থানের জোরেই তিনি টেক্সট বুক কমিটিকে সেই একই পুরনো যুক্তি জানালেন, যা একদা প্রকাশক ভট্টাচার্যকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কমিটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তারা জানাল, আল্লা, খোদা, পানি ইত্যাদি শব্দ প্রাইমারি পাঠ্যবইয়ে থাকলে হিন্দু ছাত্রদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগবে। এই যুক্তি শুনে আবুল মনসুর আহমদ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন। বললেন যে, একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলার মুসলমান ছাত্ররা পাঠ্যবইয়ে ঈশ্বর, ভগবান, জল পড়ে এসেছে, তাতে যদি তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত না লাগে, তবে এখন আল্লা, খোদা, পানি পড়ে হিন্দু ছাত্রদেরও আঘাত লাগার কথা নয়। কিন্তু এই যুক্তি প্রকাশক যেমন মানেননি, কমিটিও মানল না। তারা জানিয়ে দিল, এই পরিস্থিতিতে বইটি বাতিল করতে তারা বাধ্য হচ্ছে। আবুল মনসুর আহমদ এবার ক্ষুব্ধ হলেন না, বরং মনে মনে হাসলেন। কারণ কমিটি হয়তো জানত না, কার বই তারা বাতিল করছে। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী হক সাহেবের মাধ্যমে তিনি শুধু এই বাতিল আদেশই বাতিল করাতে পারতেন না, চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি পর্যন্ত বিপন্ন করে দিতে পারতেন। যদিও তাঁর প্রকৃত ইচ্ছা কারও চাকরি নষ্ট করা ছিল না, বরং ভবিষ্যতের জন্য তাদের সতর্ক করা এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করানো।
এই লক্ষ্যে তিনি কলকাতা গেলেন। হক সাহেব যথারীতি প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখালেন। টেক্সট বুক কমিটি ভেঙে দেওয়ার, কর্মচারীদের বরখাস্ত করার হুমকি দিলেন, কৈফিয়তও তলব করলেন। আবুল মনসুর আহমদ আশ্বস্ত হয়ে এবং কারও চাকরি যেন সত্যিই না যায় সে অনুরোধ জানিয়ে ময়মনসিংহে ফিরে এলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন পুরোনো আদেশ বাতিল হলো না তখন পুনরায় তিনি কলকাতা যান। কিন্তু এবার হক সাহেব জানালেন, হিন্দু কর্মকর্তাদের বাধার কারণে তিনি কিছুই করতে পারেননি। তাছাড়া এতদিনে অনেক দেরিও হয়ে গেছে, এখন বই বদলালে ছাত্রদের অসুবিধা হবে। তবে আশ্বাস দিলেন, আগামী বছর বইটি অবশ্যপাঠ্য করার ব্যবস্থা তিনি নিশ্চয়ই করবেন।
এতদিন আর্থিক দিকটি নিয়ে তেমন ভাবেননি আবুল মনসুর আহমদ। হক সাহেবের এই আশ্বাসের পর সেই দিকটিও তাঁর মনে উঁকি দিল। কিন্তু প্রতিশ্রুত সেই আগামী বছর আর কখনো এলো না। এই ঘটনা বর্ণনার শেষে আবুল মনসুর আহমদ বলেন, ‘বাঙ্গালী মুসলমানের মুখের ভাষা বাংলা সাহিত্যে স্বীকৃতি পাইবার প্রয়াসে ইহাকে আমার আরেকটা স্যাক্রিফাইস বলিয়া অবশেষে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলাম।’
আবুল মনসুর আহমদ একা ছিলেন না এই সংগ্রামে। তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন আরও অসংখ্য বাঙালি মুসলমান মনীষা, যাঁরা কখনো রাজপথের লড়াইয়ে, কলমের জোরে, কখনো ব্যক্তিগত ত্যাগের বিনিময়ে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে অস্বীকৃতির অন্ধকার থেকে টেনে তুলে এনেছিলেন স্বীকৃতির আলোয়। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে আজ আল্লাহ, পানি, নামাজ, রোজা এই শব্দগুলো কোনো পরিশিষ্টের মুখাপেক্ষী না হয়ে, কোনো ক্ষমাপ্রার্থনা ছাড়াই, বাঙালি মুসলমানের মুখের অলংকার হয়ে বাংলা ভাষায় টিকে আছে সগৌরবে।
তথ্যসূত্র
আত্মকথা : অধ্যায় তের, ২৭৬-২৮৫