কাহিনি সংক্ষেপ :
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত গিলগিত-বালতিস্তান (জিবি) অঞ্চল, যা আগে পাকিস্তানের ‘উত্তরাঞ্চল’ বা ‘Northern Areas’ নামে পরিচিত ছিল, এর ইতিহাস অত্যন্ত সুদীর্ঘ। এই অঞ্চলের মানুষ ‘দার্দ’ হিসেবে অভিহিত, যাদের কথা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ইতিহাসবিদদের লেখায় এবং হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতেও উল্লেখ আছে। এই অঞ্চলের আদি ইতিহাসের (খ্রিস্টীয় ৩য়-১০ম শতাব্দী) পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, এটি কুশান, চীনা ও তিব্বতি সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছিল। সপ্তম শতাব্দীর চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ এবং অষ্টম ও নবম শতাব্দীর আরবি ও ফারসি ইতিহাসে এই অঞ্চলটিকে ‘পালোলা’ বা আরবিতে ‘বলোর’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দশম শতাব্দীর ফারসি ইতিহাসগ্রন্থ ‘হুদুদ আল-আলম’, একাদশ শতাব্দীর কাশ্মীরি ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘রাজতরঙ্গিণী’ এবং মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের ইতিহাসবিদ মির্জা হায়দার দুঘলাতের ১৬শ শতাব্দীর ‘তারিখ-ই-রশিদি’-তেও এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জম্মুর রাজা গুলাব সিং-এর ডোগরা জেনারেলদের আক্রমণের মাধ্যমে। এই বৈদেশিক আক্রমণ এবং স্থানীয় বিদ্রোহের ইতিহাসই আজ অবধি এই অঞ্চলের আইনি, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক মর্যাদা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির মূলে রয়েছে। জম্মু এবং পরবর্তীতে কাশ্মীর থেকে আসা রাজাদের একের পর এক আক্রমণ, তারপর ব্রিটিশদের আধিপত্য ও সবশেষে পাকিস্তানের সাথে এই অঞ্চলের সংযুক্তি—এই সবকিছু মিলিয়ে সার্বভৌমত্ব নিয়ে একাধিক দাবি ও পাল্টা দাবির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে অঞ্চলটি কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এক জটিল বিরোধের জালে আটকা পড়ে আছে। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে এক পর্যায়ে কাশ্মীর রাজ্য, ব্রিটিশ এবং চীন—এই তিন পক্ষই একযোগে ক্ষুদ্র হুনজা রাজ্যের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করেছিল।
১৯৪৭-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার গিলগিত-বালতিস্তানকে অনেকটা ব্রিটিশদের কায়দাতেই শাসন করেছিল; অর্থাৎ, জাতীয় সংসদে এই অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল না। দেশভাগের পর থেকে গিলগিত-বালতিস্তানের ইতিহাস মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি পূর্ণাঙ্গ সদস্য হয়ে ওঠার সংগ্রামের ইতিহাস। ‘গ্রেডেড সোভেরেন্টি’ বা ক্রমবিন্যস্ত সার্বভৌমত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে এই ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে কিছু খণ্ডিত সংস্কার এবং সেসব সংস্কারের অত্যন্ত ধীরগতির বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে স্থানীয় মানুষের মনে যে আশা ছিল যে, তারা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো একটি প্রদেশ হিসেবে পাকিস্তানি ফেডারেশনে যোগ দেবে, তা মূলত আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সূচনা :
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত এই ভৌগোলিক এলাকাটি বিশ্বের তিনটি সর্বোচ্চ পর্বতমালা—হিমালয়, কারাকোরাম ও হিন্দুকুশের মিলনস্থল। এখানে বিশ্বের দীর্ঘতম হিমবাহগুলোর কয়েকটি এবং সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গের সবচেয়ে ঘন বিন্যাস বিদ্যমান। এলাকাটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চল বিশাল কারাকোরাম পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা, যা তিব্বত এবং চীনের মধ্য এশিয়ার মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত শক্তিশালী হিন্দুকুশ পর্বতমালা, যা এই অঞ্চলকে স্তেপ অঞ্চল এবং তুর্কি-পারস্য সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করেছে। এলাকাটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে পশ্চিম হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত, যার ওপারে ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু উপত্যকা অবস্থিত। এই এলাকাটি এমন একটি ঐতিহাসিক পথে অবস্থিত—যার মাধ্যমে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটত। এলাকাটি একসময় ছোট ছোট পার্বত্য রাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল, যা ১৯শ শতাব্দীতে ‘গ্রেট গেম’—অর্থাৎ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ব্রিটিশ এবং রাশিয়ার মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় বর্তমান ভৌগোলিক রূপ লাভ করে। সে সময় ব্রিটিশ এবং কাশ্মীরের ডোগরা শাসকরা বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্যের ওপর সাম্রাজ্যবাদী ও রাষ্ট্রীয় সীমানা চাপিয়ে দিয়ে একটি একক প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করে। তাই, এই অঞ্চলের বর্তমান সীমানা এবং এর ঐতিহাসিক অবস্থানকে কেবল জাতীয় মানচিত্রের অধীনস্থ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ মধ্য এশিয়া, তিব্বত, চীন, পারস্য ও সিন্ধু উপত্যকার সাথে এই অঞ্চলের দীর্ঘকালব্যাপী সংযোগ ছিল।
গিলগিত বালতিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বে ভারত-শাসিত কাশ্মীর, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে চীন, উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ অবস্থিত। এর মোট আয়তন প্রায় ২৮,১৮৫ বর্গমাইল এবং মোট জনসংখ্যা ১.২ মিলিয়ন। ঐতিহাসিকভাবে, এই অঞ্চলটি ম্যাগনাস মার্সডেনের সংজ্ঞায় ‘পারস্য বলয়’-এর অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ হলো, এই অঞ্চলটি সাংস্কৃতিক ও সৃষ্টিতাত্ত্বিকভাবে মূলত পারস্য সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত; যদিও কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারে যে, তিব্বতি প্রভাবের কারণে বালতিস্তান সম্ভবত পারস্য এবং তিব্বত— উভয় বলয়েরই অংশ।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় “উত্তরাঞ্চল” নামটি বিদ্যমান ছিল না। এই নামের উৎপত্তি হয় ১৯৪৮ সালে—যখন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত গিলগিত এবং বালতিস্তানের জনগণ তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং নবগঠিত স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রশাসনিক অংশে পরিণত হয়। এই অঞ্চলের পূর্ণ নাম ছিল “ফেডারেলি অ্যাডমিনিস্টারড নর্দার্ন এরিয়াস”, তবে সংক্ষেপে একে প্রায়ই “নর্দার্ন এরিয়াস” বা “এনএ” বলা হতো। ২০০৯ সালে এই অঞ্চলের জনগণের গণদাবির প্রেক্ষিতে এর দাপ্তরিক নাম পরিবর্তন করে “গিলগিত-বালতিস্তান (জিবি)” রাখা হয়।
এই অঞ্চলের প্রাথমিক ইতিহাস ঐতিহাসিক, নৃবিজ্ঞানী এবং প্রত্নতাত্ত্বিকগণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (যেমন: শিলালিপি ও ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন গ্রন্থ এবং ঔপনিবেশিক আমলের নথিপত্র) পরীক্ষা করে তৈরি করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের শুরুর দিকেই মানুষ এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের পরিচয় সম্পর্কে স্কলাররা নিশ্চিত নন, তবে ধারণা করা হয় তারা অত্যন্ত সাধারণ ও আদিম জীবনযাপন করত। একটি সাধারণ স্বীকৃত মতবাদ হলো—উত্তর দিক থেকে আসা ‘দার্দ’ নামক একটি প্রত্ন-ইরানি জাতি এই আদিবাসীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তারা স্থানীয়দের পরাজিত করে রাজা হিসেবে শাসন শুরু করে। শিলাশিল্প এবং শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই অঞ্চলটি কুশানদের শাসনাধীন ছিল, যারা তাদের সাম্রাজ্যের প্রশাসক হিসেবে স্থানীয় দার্দ রাজাদের নিযুক্ত করেছিল। ৩য় শতাব্দীর দিকেই এই অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। সম্ভবত ৭ম শতাব্দীতে কুশান শাসনের অবসান ঘটে, যখন গিলগিত ও বালতিস্তানের স্থানীয় শাসকরা চীনের তাং রাজবংশের সাথে করদ রাজ্য হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়। ৯ম শতাব্দীতে তারা তিব্বতিদের অধীনে চলে যায়। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক জুয়ানজাং ৭ম শতাব্দীতে ভারত ভ্রমণের পথে এই অঞ্চল অতিক্রম করেছিলেন। ৮ম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের আগমনের পর বাদাখশান, ওয়াখান ও মধ্য এশিয়া থেকে অভিবাসীদের একটি জোয়ার এই অঞ্চলে আসে। অবশেষে ১৫শ শতাব্দীতে ইরান ও ইরাক থেকে সুফি প্রচারকরা যখন উপমহাদেশে আসেন, তখন কাশ্মীরের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রবেশ ঘটে।
প্রাচীন রোমান এবং গ্রিক গ্রন্থে এই অঞ্চল এবং এখানকার মানুষের উল্লেখ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, টলেমি বালতিস্তানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং গ্রিক ইতিহাসবিদ স্ট্রাবো, প্লিনি ও মেগাস্থেনিস এই অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে ‘দার্দায়ে’-দের কথা বলেছেন। পুরাণেও উল্লেখ আছে যে এই অঞ্চলে ‘দারাদাস’ বসবাস ছিল। এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে, স্থানীয় কোনো সম্প্রদায়ই নিজেদের ‘দার্দ’ নামে পরিচয় দেয় না। তদুপরি, তথাকথিত দার্দরা কোন দিক থেকে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল, তা-ও একটি বিতর্কের বিষয়।
অঞ্চলগুলোর সামাজিক প্রেক্ষাপট :
গিলগিত :
গিলগিত উপত্যকা জিবি-এর মধ্যাঞ্চলে গিলগিত নদীর তীরে অবস্থিত, যা গিলগিত শহর থেকে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে সিন্ধু নদে গিয়ে মিশেছে। গিলগিত মহকুমার মোট আয়তন প্রায় ১৬,৬০০ বর্গমাইল এবং মোট জনসংখ্যা ৮ লক্ষ। গিলগিত হলো জিবি (গিলগিত বালতিস্তান)-র প্রশাসনিক রাজধানী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই অঞ্চলের প্রাথমিক ইতিহাস ব্যাখ্যার চেয়ে জল্পনা-কল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল, কারণ ইতিহাসবিদদের কাছে খুব সামান্যই তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। একজন জনপ্রিয় স্থানীয় ইতিহাসবেত্তার মতে, গিলগিত উপত্যকার ইতিহাস শুরু হয় প্রায় ১,৪০০ বছর আগে, যখন ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা জরথুষ্ট্রীয় (অগ্নিউপাসক) আক্রমণকারীদের বংশধরেরা একটি বিশাল রাষ্ট্র গঠন করেছিল যার সীমানা কমবেশি বর্তমান জিবির সীমানার মতোই ছিল। চীনা সূত্র অনুযায়ী, এই আদিবাসী রাষ্ট্রটির নাম ছিল ‘পালোলা’ এবং আরবি সূত্রগুলো পরবর্তীতে একে ‘বলোর’ বা ‘বলোরিস্তান’ অভিহিত করেছিল, যা বালতিস্তানের স্কারদু উপত্যকা থেকে শাসিত হতো। ১৫শ শতাব্দীতে গিলগিত উপত্যকা স্থানীয় ‘ত্রাখানে’ রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে পূর্ব দিক থেকে প্রতিবেশী বালতিস্তানের ধারাবাহিক আক্রমণের শিকার হয়। ১৯শ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত স্থানীয় রাজবংশীয় শাসন অব্যাহত ছিল, যদিও পূর্ব দিক থেকে বালতিস্তান ও পশ্চিম দিক থেকে চিত্রালের ঘনঘন অভিযানের ফলে তা মাঝেমধ্যেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে গিলগিত গোষ্ঠীগত কোন্দলের শিকার হয় এবং পুরো এলাকাটি চরম অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। ১৮৪২ সালে গিলগিত জম্মুর ডোগরা শাসকদের অধীনে আসে, যারা লাহোরের শিখ সাম্রাজ্যের প্রতি নামমাত্র আনুগত্য স্বীকার করত। এর চার বছর পর ব্রিটিশরা শিখদের পরাজিত করে জম্মুর গভর্নর রাজা গুলাব সিংকে মহারাজা হিসেবে নিযুক্ত করে ‘জম্মু ও কাশ্মীর’ নামে একটি নতুন দেশীয় রাজ্য গঠন করে। এর ফলে গিলগিত কাশ্মীরের একটি আঞ্চলিক অংশে পরিণত হয়, যদিও যে চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা কাশ্মীর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো রাজা গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করেছিল— সেখানে কাশ্মীরের সীমানা কেবল সিন্ধু নদের পূর্ব দিক পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল (গিলগিত সিন্ধু নদের পশ্চিম দিকে অবস্থিত)। তবে গিলগিতের ওপর নবগঠিত কাশ্মীর রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ দুর্বল এবং এটি বারবার বিদ্রোহের সম্মুখীন হতো। ১৮৫২ সালে পার্শ্ববর্তী ইয়াসিন উপত্যকার শাসক এবং খুশওয়াক্ত রাজবংশের বংশধর গহর আমান শাহ গিলগিত আক্রমণ করেন এবং কাশ্মীরের ডোগরাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে চিত্রালের কতুর রাজবংশের হাতে তিনি বিতাড়িত হন; কতুর রাজবংশ ইয়াসিন উপত্যকার ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করত এবং কাশ্মীরের ডোগরা শাসকদের প্রতি অনুগত ছিল। কতুরদের হাতে খুশওয়াক্ত রাজবংশের এই পরাজয়ের ফলে ১৮৬০ সালে গিলগিতে পুনরায় কাশ্মীরের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশরা কাশ্মীরিদের সাথে যৌথভাবে এই অঞ্চল পরিচালনার জন্য ‘গিলগিত এজেন্সি’ প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমানে গিলগিত বিভাগে সাতটি জেলা রয়েছে, যা স্থূলভাবে অতীতের ছোট ছোট পাহাড়ি রাজ্যগুলোর সাথে মিলে যায়। গিলগিত শহরের পশ্চিমে অবস্থিত ঘিজার জেলায় রয়েছে পুনিয়াল, ইয়াসিন এবং ইশকোমিন উপত্যকা। এই উপত্যকাগুলো খুশওয়াক্ত বংশের স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হতো, যারা কখনো গিলগিতের শাসকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত, আবার কখনো তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতো। গিলগিতের উত্তরে অবস্থিত হুনজা এবং নগর জেলা দু’টি ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি রাজ্য ছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সপ্তম শতাব্দীতে হুনজা ছিল কুশান সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক রাজধানী। ১৮শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে হুনজা রাজ্য ইয়ারকান্দ ও কাশগরের চীনা কর্মকর্তাদের সাথে উপহার বিনিময় শুরু করে। অন্যদিকে, দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দিয়ামের, আস্তোর এবং চিলাস জেলাগুলো সামন্ততান্ত্রিক শাসক এবং ছোট ছোট নেতৃত্বহীন প্রজাতন্ত্রের অধীনে শাসিত হতো।
গিলগিত উপত্যকার প্রধান অধিবাসীরা শিনাভাষী মানুষ, যারা শিন ও ইয়েশকুন নামে দু’টি প্রধান গোত্র/কওমে বিভক্ত। গিলগিত উপত্যকার জনসংখ্যা মোটামুটি সমানভাবে সুন্নি এবং ইসনা আশারি শিয়াদের মধ্যে বিভক্ত। সাবেক হুনজা ও নগর রাজ্য এবং ইয়াসিন উপত্যকার কিছু গ্রামের মানুষ বুরোশিস্কি ভাষায় কথা বলে, যা একটি স্বতন্ত্র ভাষা। হুনজার উত্তরে গোজাল অবস্থিত এবং এখানে ওয়াখিভাষী মানুষ বসবাস করে। তারা ১৭শ এবং ১৮শ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া থেকে অভিবাসিত হয়ে এখানে আসে এবং হুনজার মিরদের অনুগত প্রজা হয়। অল্প কয়েকটি গ্রাম বাদ দিলে, হুনজার পুরো জনসংখ্যাই ইসমাইলি মুসলিম। হুনজার পূর্ব দিকে নদীর ওপারে অবস্থিত সাবেক নগর রাজ্যের বাসিন্দারা ইসনা আশারি শিয়া ইসলাম অনুসরণ করে। ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন মাযহাব অনুসরণ করা সত্ত্বেও, নগর ও হুনজার মানুষ একই বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে এবং তাদের শাসকদের মধ্যে প্রায়ই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হতো।
গিলগিত উপত্যকা এবং হুনজার মাঝামাঝি ‘ডোম’ নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৃগোষ্ঠী বাস করে। তারা ডোমাকি ভাষায় কথা বলে এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় বা ঐতিহাসিকভাবে অপবিত্র বলে মনে করে। ঘিজার জেলার অধিকাংশ মানুষ ইসমাইলি মুসলিম এবং সুন্নিরা সেখানে বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। উনিশ শতকের এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ইয়াসিন উপত্যকা চিত্রাল ও গিলগিত শাসকদের মধ্যে বিবাদের কারণ ছিল এবং এই উপত্যকাকে কেন্দ্র করে ১৯ শতকে এই দুই রাজ্যের মধ্যে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
বালতিস্তান :
ভৌগোলিকভাবে বালতিস্তান বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় একটি অঞ্চল। এর দক্ষিণ ও পশ্চিমে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা এবং উত্তর ও পূর্বে বিশাল কারাকোরাম পর্বতমালার অবস্থান। এই আন্তঃপর্বত অঞ্চলে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোর অন্যতম প্রধান সন্নিবেশ লক্ষ্য করা যায়। সিন্ধু নদ বালতিস্তানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রবাহিত হওয়ার সময় এর দু’টি প্রধান উপনদী—শায়ক এবং শিগারের জলধারাকে নিজের দিকে টেনে নেয়।
পার্শ্ববর্তী উপত্যকাগুলোর উপরিভাগে বসবাসকারী মুষ্টিমেয় শিনা ভাষাভাষী লোক ছাড়া সমগ্র বালতিস্তানই বালতিভাষী অঞ্চল; তবে এলাকাভেদে কথা বলার ভঙ্গি বা শৈলীতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। প্রায় ১১,৫৮০ বর্গমাইল আয়তনের এই অঞ্চলে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের বসবাস। এখানকার অধিবাসীরা জাতিগতভাবে বালতি বা পালোলা জনপদভুক্ত, যারা নিজেদের বংশধারা তিব্বতি-মঙ্গোলীয় সংস্কৃতিতে খুঁজে পায়। বর্তমানে এখানকার জনসংখ্যার অধিকাংশ ইসনা আশারি শিয়া ইসলামের অনুসারী, তবে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু অংশ নূর-বখশি শিয়া মতবাদ অনুসরণ করে। বালতিস্তানে পাঁচটি প্রধান উপত্যকা রয়েছে। প্রধান স্কারদু উপত্যকাটি এই অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সিন্ধু নদের তীরে স্কারদু শহরটি গড়ে উঠেছে। স্কারদু শহরের উত্তরে শিগার উপত্যকা অবস্থিত, যেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কে-টু অবস্থিত। এটি একসময় একটি গিরিপথের মাধ্যমে জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্দের সাথে যুক্ত ছিল, যা প্রায় ২০০ বছর আগে গ্লেসিয়ারের বিচ্যুতির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। স্কারদু শহরের দক্ষিণে খারমাং উপত্যকা অবস্থিত, যা ভারত-শাসিত কাশ্মীরের লেহ এবং লাদাখ জেলার প্রবেশদ্বার। এখান দিয়েই সিন্ধু নদ পাকিস্তান-শাসিত ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। খাপলু স্কারদু শহরের পূর্বে অবস্থিত এবং বর্তমানে এটি সিয়াচেন গ্লেসিয়ার সংলগ্ন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। ভারত ও পাকিস্তান— উভয় দেশই এখানে সৈন্য মোতায়েন রেখেছে এবং প্রায়ই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রোন্দু স্কারদু শহরের পশ্চিমে অবস্থিত; এখানে সিন্ধু নদ প্রায় ৯০ মাইল দীর্ঘ একটি সরু গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বালতিস্তান ও গিলগিতকে সংযুক্ত করেছে। এই উপত্যকাগুলো স্থানীয় রাজা বা ‘চো’ দ্বারা শাসিত হতো। অতীতে স্থানীয় শাসকরা তিব্বতি, চীনা, মুঘল এবং ডোগরাদের সাথে আঞ্চলিক মিত্রতা গড়ে তুলেছিল। মাকপন’রা স্কারদু উপত্যকা শাসন করত, যা আয়তনে বৃহত্তম এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, আমাচা’রা শিগার এবং ইয়াবগু’রা খাপলু শাসন করত।
‘রাজতরঙ্গিণী’ নামক দ্বাদশ শতাব্দীর সংস্কৃত ইতিহাস গ্রন্থে ও ষোড়শ শতাব্দীর মুসলিম উৎসসমূহে (যেমন: মির্জা হায়দার দুঘলাতের তারিখ-ই-রশিদি) বালতিস্তানকে ‘বলোরিস্তান’ এবং ‘তিব্বত-ই-খুর্দ’ বা ‘ছোট তিব্বত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিব্বতি সংস্কৃতির সাথে এর জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণেই একে এই নামে ডাকা হতো। অষ্টম শতাব্দীতে ধারাবাহিক কিছু আক্রমণের পর অঞ্চলটি বিস্তৃত তিব্বতি সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। গিলগিতের মতো সেই সময়ের বালতিস্তানের শাসকরাও চীনের তাং রাজবংশের প্রতি নামমাত্র আনুগত্য প্রদর্শন করত। আক্রমণকারী তিব্বতি বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পরপরই বালতিস্তানের স্থানীয় পাটোলা শাহী রাজবংশ তিব্বতিদের সাথে একটি মিত্রতা গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ১৬শ এবং ১৭শ শতাব্দীতে স্থানীয় মাকপন রাজবংশের অধীনে বালতি রাজ্য পুনরায় গিলগিত শাসন করেছিল। ১৬শ শতাব্দীতে স্কারদুর শাসক আলি শের খাঁন আনচান একটি বিশাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যার সীমানা পশ্চিমে আফগানিস্তান এবং পূর্বে তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত এখানে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি ‘বন’ নামক একটি প্রকৃতিবাদী বা সর্বপ্রাণবাদী ধর্ম প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে ১৪৫০-১৫২০ সালের মধ্যে সুফি সাধকদের আগমনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪০ সালে পাঞ্জাবের শিখ মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের এক জেনারেল এই অঞ্চলটি জয় করে এবং স্কারদু তহসিল লাদাখ ‘ওজারত’ বা প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০শ শতাব্দীর শুরুর দিকে কাশ্মীর রাজ্য বালতিস্তানকে নতুন গঠিত লাদাখ জেলার অংশ করে নেয় এবং স্কারদুকে এর মৌসুমী রাজধানী করা হয়। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগ এবং ২০শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বালতিস্তান অভিযাত্রী, ক্রীড়াবিদ এবং ‘গ্রেট গেমারদের’ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যারা মূলত শিকারের রোমাঞ্চ এবং ট্রফির খোঁজে সেখানে যেত।
স্থানীয় রাজ্যগুলো :
ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে এই অঞ্চলটি কতগুলো ছোট ছোট আধা-স্বাধীন রাজ্যের সমষ্টি ছিল, যেগুলোর নেতৃত্বে থাকত একজন সামন্তপ্রভু এবং তাঁকে সহায়তা করত অভিজাত, প্রশাসক ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের একটি শ্রেণি। এই রাজ্যগুলোর রাজবংশীয় শাসকরা প্রায়শই নিজেদের বংশলতিকা অন্য কোনো বিদেশি ভূমিতে খুঁজে পেত। প্রচলিত আখ্যান অনুযায়ী, এই অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীরা কখনোই তাদের নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে শাসক হিসেবে মেনে নিতে একমত হতে পারত না; তাই তারা পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর অভিজাত পরিবার থেকে শাসক খুঁজে নেওয়ার একটি প্রথা গড়ে তুলেছিল। উদাহরণস্বরূপ, বালতিস্তানের শিগার উপত্যকা শাসনকারী ‘আমাচা’ রাজবংশ তাদের উৎপত্তিস্থল মঙ্গোলিয়ায় বলে দাবি করে; আবার হুনজার ‘আয়াশো’ রাজবংশ তাদের উৎস খুঁজে পায় বাদাখশানে। সামন্তপ্রভু, তাঁর পরিবার এবং অভিজাত শ্রেণিই ছিল অধিকাংশ আবাদি জমি, চারণভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক। এই রাজ্যগুলোর জনসংখ্যার সিংহভাগ ছিল বর্গা চাষি, যাদের কাছ থেকে শাসকরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষি কর আদায় করত। গবাদি পশু এবং কৃষিজাত পণ্যের ওপর ধার্য করা বিভিন্ন ধরনের করই ছিল এই রাজ্যগুলোর আয়ের মূল ভিত্তি। এই পাহাড়ি রাজ্যগুলোর কৃষি ব্যবস্থা ছিল নিবিড় ও ব্যাপক। প্রধান ফসল ছিল বার্লি এবং বাকহুইট (এক প্রকার তিতকুটে দানা শস্য) এবং পরবর্তীকালে গম ও আলু; যা বিস্তৃত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ের ধাপে ধাপে তৈরি জমিতে নিবিড়ভাবে চাষ করা হতো। এর পাশাপাশি, শাসকরা তাদের প্রজাদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করত, যা ‘কার-এ-বেগার’ বা বিনাশ্রমে বেগার খাটা হিসেবে পরিচিত ছিল। শাসকদের প্রতি সাধারণ মানুষের এই বহুমুখী দায়বদ্ধতাই তৎকালীন সমাজের সামাজিক স্তরবিন্যাসের মূল ভিত্তি ছিল।
এই অঞ্চলের ইতিহাসের পরিক্রমায় দেখা যায়, স্থানীয় শাসকরা সেচ নালা নির্মাণ এবং অনুন্নত জমি আবাদের মাধ্যমে সেগুলোকে সমৃদ্ধ কৃষিভূমিতে রূপান্তর করেছিল। স্থানীয় তথ্যসূত্র অনুযায়ী, হুনজা’র করিমাবাদের সেচ নালাটি আজ থেকে ৮০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। এই নতুন ব্যবস্থাগুলোর অর্থ ছিল স্থানীয় শাসকদের জন্য বর্ধিত রাজস্ব। কৃষি উৎপাদন এবং গবাদি পশু পালন— উভয় ক্ষেত্রেই শ্রম ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই কারণে, এই অঞ্চলের রাজ্যগুলোর শাসকরা শ্রমের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি প্রণয়ন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, হুনজা রাজ্য তার দক্ষিণ সীমান্তে চেক-পোস্ট স্থাপন করেছিল, যেখানে হুনজা বাহিনী সীমান্ত দিয়ে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করত। মৌখিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণ মানুষকে তাদের নিজ নিজ রাজ্য ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হতো না। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের আগমন এবং পরবর্তীকালে যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত হওয়া ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এই রাজ্যগুলোর সাধারণ জনগণের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল হয়। বিশেষ করে ১৯৩৫ সালের পর এটি আরও সহজতর হয়, যখন ব্রিটিশরা কাশ্মীরের কাছ থেকে গিলগিত এজেন্সি ষাট বছরের জন্য ইজারা নেয়। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য দেশান্তরের বা বাইরে যাওয়ার বিভিন্ন সুযোগ ও পথ তৈরি হয়। এই অঞ্চলের অধিবাসীরা গিলগিত স্কাউটস, হাসপাতাল, গণপূর্ত বিভাগ এবং শিক্ষা খাতের মতো নতুন উন্মুক্ত কর্মসংস্থান ক্ষেত্রগুলোতে চাকরি খুঁজে পায়।

ঔপনিবেশিক ইতিহাস :
১৮৩৫ সালে জম্মুর ডোগরা শাসক গুলাব সিংয়ের সেনাপতি জোরাওয়ার সিং লাদাখ জয় করে এবং পাঁচ বছর পর বালতিস্তান আক্রমণ করে একে লাদাখ প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ১৮৪২ সালে গুলাব সিং তার সেনাপতি নাথে শাহকে গিলগিত জয়ের জন্য পাঠায়, যা তৎকালীন সময়ে মধ্য এশিয়ার উত্তরমুখী পথগুলোর ওপর অবস্থিত একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছোট রাজ্য ছিল। গুলাব সিং এই বিজয়গুলো লাহোর-ভিত্তিক শিখ সাম্রাজ্যের দৃশ্যত সম্মতি বা জানাশোনা ছাড়াই সম্পন্ন করেছিল, যেই সাম্রাজ্যের প্রতি গুলাব সিং অনুগত ছিল। শিখ সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এবং ব্রিটিশদের আসন্ন বিজয়ের মুখে গুলাব সিং ইতিমধ্যেই শিখ শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশের অধিপতি হওয়ার প্রচেষ্টায় ছিল। ১৮৪৬ সালে শিখ সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর ব্রিটিশরা এই অঞ্চলটি গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং ‘জম্মু ও কাশ্মীর’ রাজ্য সৃষ্টি করে।
গিলগিতে প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার পর কাশ্মীরের নজর পড়ে গিলগিত উপত্যকার উত্তরে অবস্থিত স্বাধীন পাহাড়ি রাষ্ট্র হুনজার ওপর। ১৮৪৮-১৮৬৯ সালের মধ্যে ব্রিটিশদের পক্ষে কাশ্মীরি বাহিনী হুনজাকে দমনের জন্য তিনবার চেষ্টা চালায়, কিন্তু প্রতিবারই তারা পরাজিত হয়। এই পুরো সময়কালে হুনজার মীর (শাসক) গাজান খান, অত্যন্ত বিনয় কিন্তু দৃঢ়তার সাথে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের হুনজা অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে বাধা দেয়। তা সত্ত্বেও, ১৮৭০ সালে মীর গাজান খান কাশ্মীরের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয় এবং বার্ষিক ভাতার বিনিময়ে কাশ্মীরি শাসককে কর দিতে শুরু করে।
এর কাছাকাছি সময়ে, ভারত অভিমুখে রুশ সাম্রাজ্যের পূর্বমুখী বিস্তার গিলগিতের উত্তরের অঞ্চলগুলো অন্বেষণে ব্রিটিশদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে, যা দক্ষিণ এশিয়াকে মধ্য এশিয়ার জলপ্রপাতের সাথে যুক্ত করেছিল। এই অঞ্চলগুলো ব্রিটিশদের জন্য একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল, কারণ এখান থেকেই রুশ সেনাবাহিনী কাশ্মীর এবং এমনকি ভারতও আক্রমণ করতে পারত। এই অনুভূত হুমকি থেকেই ‘গ্রেট গেম’-এর সূচনা হয়।
১৮৭২ সালে, ভারত সরকার জন বিডালফকে হুনজার উত্তরের গিরিপথগুলো জরিপ করার জন্য একজন ‘বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে পাঠায়। বিডালফ ছিলেন প্রথম ইউরোপীয়দের একজন যিনি হুনজায় প্রবেশ করেছিলেন এবং পামির অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন। স্থানীয় উপজাতিদের সম্পর্কে তাঁর বিবরণই ছিল প্রথম পদ্ধতিগত বিবরণ; যা তিনি তাঁর বই ‘দ্য ট্রাইবস অব হিন্দু-কুশ’-এ বর্ণনা করেছেন, যা পরবর্তীতে আসা অধিকাংশ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের জন্য একটি আদর্শ রেফারেন্স গ্রন্থে পরিণত হয়েছিল।
বিডালফ তার রিপোর্টে সুপারিশ করেছিলেন যে, ব্রিটেনের উচিত সাম্রাজ্যের সীমানা হুনজা সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত করা। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে; এভাবেই এই অঞ্চলে ব্রিটিশদের ‘অগ্রবর্তী নীতি’র সুর নির্ধারণ হয়ে যায়। বিডালফের এমন আতঙ্কিত প্রচারণার ফলে, ডিজরালির রক্ষণশীল সরকার কাশ্মীরের মহারাজা রণবীর সিংকে গিলগিতে একটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্থা স্থাপনে বাধ্য করে এবং ১৮৭৮ সালে বিডালফ এই সংস্থার রাজনৈতিক এজেন্ট নিযুক্ত হয়। মাত্র তিন বছর পর গিলগিত এজেন্সি বিলুপ্ত করা হয়, যখন গ্ল্যাডস্টোনের উদারপন্থী সরকার অগ্রবর্তী নীতি ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ১৮৮৬ সালে রক্ষণশীলরা পুনরায় ক্ষমতায় এলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আবার ‘গ্রেট গেম’-এ ফিরে আসে।
চলবে …
