আজ থেকে প্রায় দু হাজার বছর আগে, ইতালির পম্পেই নগরী। সার্নো নদীর কোলে ছবির মতো সাজানো এক ছোট্ট শহর। রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটা ৩-এর ঘর পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। চারপাশে ঘোলাটে অন্ধকার। ঘুমন্ত নগরীর উপর নেমে এসেছে শেষ রাতের সুনশান নীরবতা।
একটি দোতলা বাড়ির জানালার সামনে এসে দাঁড়াল এক কিশোর। তার নাম মার্কুস ভ্যালেরিয়ু। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে তার। চোখে মুখে এখনো আলস্য লেগে আছে। আড়মোড়া ভেঙ্গে বাইরে তাকাল। শহরের বড় রাস্তার মোড়ে একটা মশাল জ্বলছে। তার নিচেই শোনা যাচ্ছে পানি পড়ার একটানা নরম শব্দ। বড় বড় পাথর বিছানো রাস্তা ধরে বলিষ্ঠ একটা লোক হেঁটে ফোয়ারার সামনে এসে দাঁড়াল। দুই হাতে লম্বাটে ধরণের দুটো মাটির কলস। পানি ভরা শেষ হলে লোকটা আবার যে দিক থেকে এসেছিল, সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। পথে দেখা হলো তার মতোই আরেকজন লোকের সাথে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে দুজনে কী যেন আলাপ করল। তারপর চলতে লাগল যে যার পথ ধরে। ঘোলাটে অন্ধকারে শহরটাকে একটু ভৌতিক লাগছে। বিভিন্ন জায়গায় বড়ো বড়ো মশাল জ্বলছে। এ কারণে পরিবেশটা আরো বেশি থমথমে।
পম্পেই শহরটা অদ্ভুত সুন্দর। বাড়িগুলো একদম রাস্তার কিনারা ঘেঁষে বানান। সারি সারি। ইটের পুরু দেয়াল। উঁচু দরজা। মাঝে মাঝে কিছু বাড়ির সামনে বড়োসড়ো পাথর রাখা। পাথরগুলো গোলগাল, মসৃণ আর শীতল। এসব পাথরের উপর বসে মানুষ রোদ পোহায়, গল্প করে। সকাল হলে শিশুরা দরজা পেরিয়ে পথে নেমে আসে। খোলা জায়গাগুলোতে হইহল্লা করে। চারপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। লোকজনও হাসিখুশি। রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত। মাঝারি আকৃতির পাথর বিছানো। ফাঁকে ফাঁকে সিমেন্ট ঢুকিয়ে সমান করে দেওয়া হয়েছে। বিকাল হলে রাস্তার ওপরেই দুই পাশ জুড়ে বাজার বসে।
মার্কুস মশাল জ্বালানো জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল। ফোয়ারার আশপাশের পাথরগুলো পানি পড়ে ভিজে আছে। মশালের আলো পড়ে ভেজা পাথরগুলো অদ্ভুতভাবে চকচক করছে। মার্কুস শহরটা দেখছে আর মনে মনে ভাবছে—এই শহর সুন্দর। তবু কোথায় যেন অদৃশ্য একটা ভয় লুকিয়ে আছে।
মার্কুস এখানকার কেউ নয়। দশ বারো কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম থেকে ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। আসলে বেড়াতেও নয়। পড়ালেখা করতে এসেছে। চারদিন আগে পণ্ডিত ফ্লাভিয়ুসের স্কোলায় ভর্তি হয়েছে। ফ্লাভিয়ুস খুবই মজা করে পড়ান। মন টিকে গেলে ফুফুর বাড়িতেই থেকে যাবে। অবশ্য, ক’দিন হলো ক্লাস বন্ধ আছে। ফ্লাভিয়ুস পাশের সোরেন্তো শহরে কী এক কাজে গেছেন। ফিরতে আরো সপ্তাহখানেক দেরি হবে। এই ফাঁকে মার্কুস ফুফাত ভাই টিটুসের সাথে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ দুপুরে পাহাড়ের দিকটাতে বেড়াতে যাবার কথা আছে।
পূব আকাশে সূর্যটা উঁকি দিয়েছে। আলো এখনো পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়েনি। ভোরের এই আবছা আলো-অন্ধকারের ভিতরেই শহরটা জেগে উঠতে লাগল। পথে লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে। বেকারির চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে। হঠাৎ পাশের গলি থেকে সবজি বোঝাই একটা ঘোড়ার গাড়ি বেরিয়ে এলো। গাড়ির সামনে বসে আছে কুইন্টুস নামের এক পাইকার। প্রায় প্রতিদিনই সে ভোরের আগে আগে দূরের গ্রামগুলোতে চলে যায়। তারপর ফল, শাকসবজি, ডুমুর, জলপাই, আঙুর আর নানা জিনিস নিয়ে সকালে শহরে ফিরে আসে। একটু পর আরও কিছু গাড়ি এসে ঢুকবে শহরে। কাছের সমুদ্রবন্দর থেকে আসবে মাছ, লবণ, তেল, শুকনো খেজুর। আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকেরা আনবে তাদের নিজেদের ফলানো তরিতরকারি, আঙুর, গম, ডুমুর। শহরের বিভিন্ন জায়গায় পথের পাশে খোলা আকাশের নিচে বসবে নিত্যপণ্যের ছোট ছোট বাজার।
টিটুস তার পাশের বিছানায় বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। মার্কুস সিঁড়ি বেয়ে একা ছাদে উঠে গেল। ছাদ থেকে শহরটা আরো ভালো দেখা যায়। পম্পেইকে তার খুব ভালো লাগে। শহরটা বেশ বড়। হাজার হাজার মানুষের বসবাস। চারপাশ পরিষ্কার। লোকজনও প্রাণবন্ত। রাস্তায় ফোয়ারা, বাজার, দোকান, রুটি, গরম খাবারের গন্ধ—সব মিলিয়ে শহরটা যেন সবসময় জেগে থাকে।
পথের দিক থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে—‘হেই, মার্কুস! গুড মর্নিং!’
গতকাল সন্ধ্যার সেই বুড়ো লোকটা। শহরের দক্ষিণ দিকে তার চুল কাটার একটা দোকান আছে। গতকাল চুল কাটাতে গিয়ে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। লোকটা বেশ মজার। মার্কুস হাত নেড়ে পাল্টা জবাব দিল—‘হেই আংকেল, গুড মর্নিং!’
রাতের শিশিরে ছাদ খানিকটা ভেজা। সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে মার্কুস উত্তর দিকে এলো। দূরে সমুদ্রের বুক ঝলমল করছে। সকালের রোদ পড়ে ঢেউয়ের মাথাগুলো চকচক করছে সোনার মতো। কয়েকটি জাহাজ ধীরে ধীরে বন্দরের দিকে এগিয়ে আসছে। আজকে সমুদ্রকে কী সুন্দর লাগছে! কিন্তু এর চেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে ভিসুভিয়াসকে।
ভিসুভিয়াস। বিশাল, প্রশস্ত, নীরব এক পাহাড়। আকাশের দিকে মাথা তুলে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। তবে খুব খাড়া নয়। ঢালু আর বিস্তৃত। সকালের নতুন সূর্য তার গায়ে অদ্ভুত সুন্দর এক আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও সবুজ আঙুরলতা, কোথাও পাথুরে ধূসর ঢাল, আবার কোথাও হালকা ছায়া। শান্ত, গম্ভীর আর শহরের একদম কাছটিতে দাঁড়িয়ে। এই শহরের ঘরবাড়ি, পথঘাট, গাছপালা আর মানুষগুলোর দিকে সে যেন বহুদিনের চেনা এক বন্ধুর মতো তাকিয়ে আছে। এর দিকে তাকালে ভয় লাগে না। বরং মনে হয় বহু দিনের চেনাজানা খুব আপন কেউ।
মার্কুস পাহাড়টার দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যখন নিচে নামল, ততক্ষণে শহর পুরো জেগে গেছে। বড়োদের সঙ্গে শিশুরাও নেমে এসেছে রাস্তায়। পম্পেই নগরীতে অন্যান্য দিনের মতোই শুরু হয়েছে আরো একটি ব্যস্ত দিন। কিন্তু মানুষ জানে না আজকের দিনটি অন্য দিনের মতো নয়। পম্পেই নগরী ও এর মানুষদের ঘিরে পাহাড়ের গভীরে শুরু হয়েছে অজানা কিছুর গোপন প্রস্তুতি।
মার্কুস, টিটুস আর তাদের বন্ধু ফেলিক্স পাহাড়ে যাওয়ার জন্য শহরের রাস্তায় নেমে এলো। প্রথমেই গেল বেকারিতে। দুপুরের খাবারের জন্য কিছু রুটি কিনতে হবে। বেকারির সামনে বেশ ভীড়। ভিতরে এক জায়গায় একটা গাধা বড়ো একটি চাকতি ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে চক্কর কাটছে। কর্মচারীরা গোল গোল রুটি বানিয়ে চুলায় ঠেলে দিচ্ছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে গরম রুটির মিষ্টি ঘ্রাণ। তারপর তারা পাশের দোকান থেকে কিছু ডুমুর আর জলপাই নিল। রাস্তার মোড়ে একটি ফোয়ারা থেকে টলমল করে পানি পড়ছে। মানুষ কলসি ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে। পাশে দু-একটা শিশু হাত দিয়ে পানি ছিটিয়ে হাসাহাসি করছে। ফুয়ারা পেরিয়ে তারা ঢুকল একটি থার্মোপোলিয়ামে। পাথরের কাউন্টারে বড় বড় মাটির হাঁড়ি বসানো, তার ভেতরে গরম স্যুপ, ডাল আর মাংস। সেখানে নাস্তা সেরে ওরা এগিয়ে গেল ফোরামের দিকে।
পম্পেই শহরের সবচেয়ে জমজমাট জায়গা হলো এই ফোরাম। বড় এক খোলা পাথরের চত্বর। চারপাশে মন্দির, সরকারি দালান, আদালতঘর, বারান্দা, স্তম্ভ আর মানুষের ভিড়। এখানে বেচাকেনা হয়, খবরের আদানপ্রদান হয়, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়, সন্ধ্যার পর বিরাট আড্ডাও জমে ওঠে। ফোরামের চারদিকে সারি সারি পাথরের উঁচু স্তম্ভ, তার ওপরে ছাউনি। রোদ আর বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থা। স্তম্ভের কার্নিশে পাখিরা বসে থাকে। সারাক্ষণ ওদের কিচিরমিচির লেগেই আছে।
বন্ধু ফেলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে তারা শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে সারি সারি আঙুরক্ষেত। আঙুর ক্ষেতে মাথা গুঁজে লোকজন কাজ করছে। কেউ কেউ ঝুড়ি ভরে আঙুর তুলছে। দূরে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিসুভিয়াস। শান্ত, নীরব আর বন্ধুর মতো আপন। কিন্তু সাতশো বছর ধরে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা ভিসুভিয়াস আজ সকালে ভিন্ন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভীষণ ভয়ংকর কিছু একটা ঘটাতে চলেছে কাউকে কিছু না জানিয়েই।
সকাল ১০টা। দুপুরের রোদ তাঁতিয়ে ওঠেছে। রোদের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। পম্পেইয়ের বড়ো রাস্তায় লোকজন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। বেশির ভাগ মানুষ ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। শুধু শহর লাগোয়া আঙুর বাগানে কিছু লোককে দেখা যাচ্ছে। একমনে কাজ করে যাচ্ছে তখনও। কয়েকটা বাড়ির সামনে ছায়ায় ছোট ছোট শিশুরা খেলছে। পাশে তাদের মায়েরা বসে গল্প করছে। শহরের মূল রাস্তা ধরে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে কয়েকজন লোক। ক্লান্ত হয়ে ছায়ায় বসে ঝিমুচ্ছে তিনটে কুকুর। দোকানগুলোতে কেনাবেচা চলছে ঢিমে তালে। শহরের বড়ো বেকারিটিতে শ্রমিকদের হাঁকডাকও তেমন একটা শোনা যাচ্ছে না।
ভিসুভিয়াসের চূড়া থেকে হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছে। শহরের লোকজন একে তেমন গুরুত্ব দিল না। এমন ধোঁয়া প্রায়ই দেখা যায়। নতুন কিছু নয়।
দুপুর এগারোটা। ফুফু ভেলেরিয়া দোতলার জানালায় এসে দাঁড়ালেন। তার কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ। একটু আগে ঘরের কর্মচারী ভারুসকে পানি আনতে পাঠিয়েছিলেন। সে খালি হাতে ফিরে এসেছে। পুরো শহরে ফোয়ারা আছে মোট ১৬টি। পানি আসছে দেয়ালের উপর বানানো প্রশস্ত একটা নালা ধরে, বহু দূরের একটা পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে। আচমকা সবগুলো একসাথে বন্ধ হয়ে গেছে। কেন বন্ধ হয়েছে কেউ জানে না। শহরের মেয়র একদল মিস্ত্রি পাঠিয়েছিলেন অ্যাকুয়েডাক্ট এর কোথাও কোনো সমস্যা হলো কি না দেখার জন্য। তারা ফিরে এসে জানিয়েছে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। তারচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, নীচ তলার ঘরে মাটিতে চিকন একটা লম্বা ফাটল দেখা দিয়েছে। আঁকাবাঁকা। খুব বড়ো না, কিন্তু চোখে পড়ার মতো। ভেলেরিয়ার বুক ধকধক করতে লাগল। ভারুসকে বললেন—দ্রুত বন্দরে গিয়ে সাহেবকে খবর দাও। ভারুস তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। ভেলেরিয়া তার চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা এমিলিকে কোলে নিয়ে জানালার পাশে বসে বন্দরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। টিটুস আর মার্কুসের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
এরই মধ্যে শহরজুড়ে মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো। শহরের আরো বিভিন্ন জায়গায় মাটিতে চিকন ফাটল দেখা যাচ্ছে। আজ থেকে সতের বছর আগে ৬২ সালে এ ধরণের একটা ব্যাপার ঘটেছিল। সেবার ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছিল, বেশ কিছু মানুষও মারা পড়েছিল। এবারও কি এমন কিছুই ঘটতে যাচ্ছে? শহরের মানুষ যখন এমনটি ভাবছিল, তখনই পুরো শহর ভীষণভাবে কেঁপে উঠল।
তবে এর আগেই আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো অনেকেই খেয়াল করেনি। যদি খেয়াল করত, তাহলে বুঝত এবারের বিষয়টি সতেরো বছর আগের ভূমিকম্পের মতো কিছু নয়; তার চেয়ে ভয়াবহ কিছু ঘটতে চলেছে।
সারা রাত জেগে থেকে পথের পাশে যে কুকুরগুলো ঘুমিয়ে ছিল, ওরা হঠাৎ একসাথে জেগে গেল। বাড়ির ভিতরে যে কুকুরগুলো ছিল, সেগুলো একযোগে পথে বেরিয়ে এলো। কুকুরের মালিকেরা জোর করেও এদেরকে ঘরে ঢুকাতে পারছিল না। সব কুকুর অস্থির হয়ে দিশেহারার মতো এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে।
এদিকে ঘোড়াদের মধ্যেও দেখা দিয়েছিল ভয়ানক অস্থিরতা। সকাল থেকে কোনো ঘোড়া খাবার মুখে নিচ্ছে না। ফোঁস ফোঁস করছে এবং আস্তাবল থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড হলো ফোরামের পিলারগুলোর উপর বসে থাকা পাখিরা কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ একসাথে পাখা ঝাপটে ভিসুভিয়াস পাহাড়ের বিপরীত দিকে শহর ছেড়ে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন অদৃশ্য কোনো বিপদের গন্ধ তারা আগেই টের পেয়েছে।
মার্কুস, টিটুস ও ফেলিক্স এসবের কিছুই টের পায়নি। আঙুর বাগানের ভিতর দিয়ে, গম আর ভুট্টা ক্ষেত পেরিয়ে ওরা ভিসুভিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পাহাড়ের ঢালের কাছেই টিটুসের শিক্ষিকা ফ্লাভিয়ার বাড়ি। দূর থেকে ওদেরকে দেখতে পেয়ে ভৃত্য পাঠিয়ে তাদেরকে বাড়ির ভিতরে ডেকে নিলেন। টিটুসের মা ভেলেরিয়ার সঙ্গে ফ্লাভিয়ার খুব ভালো সম্পর্ক। ঘরে ঢুকতেই তিনি তিনজনকে খেতে বসালেন। তখন দুপুর প্রায় সাড়ে বারোটা।
ওরা যখন খাবারের মাঝামাঝি, তখনই ঘরবাড়ি ভয়ানকভাবে কেঁপে ওঠল। এর একটু পরই ভিসুভিয়াসের ভিতর থেকে অদ্ভুত এক আওয়াজ শোনা গেল। খাবার ফেলে সবাই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো।
ভিসুভিয়াসের দিকে তাকিয়ে ওদের চোখ বিস্ফারিত। শান্ত, নিশ্চুপ পাহাড়টি যেন আচমকা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশাল পেটের ভিতর থেকে এক নাগাড়ে বেরিয়ে আসছে চাপা গর্জন। এর সাথে প্রচণ্ড গতিতে নির্গত হচ্ছে গরম ধোঁয়া আর ছাই। মেঘের মতো সেই ছাই উঠানে, ঘরের ছাদে, গাছপালার মাথায় ঝুরঝুর করে এসে পড়ছে। একসময় গরম ধোঁয়া পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলল। ফ্লাভিয়া কী করবেন বুঝতে না পেরে পাহাড়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। তার বাড়িটা বেশ নির্জন জায়গায়। আশেপাশে আর কোনো ঘরবাড়ি নেই। হঠাৎ যেন তার হুঁশ ফিরল। কোনো উপায় না পেয়ে দ্রুত ঘরে গেলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা চিঠি লিখলেন: ‘আমরা ভয়ানক বিপদে। ছাই আর ধোঁয়ার ভিতর আটকে আছি। আমাদেরকে বাঁচান।’ তারপর চিঠিটা ভৃত্যের হাতে দিয়ে বললেন, দ্রুত বন্দরের দিকে যাও। কোনো সাহায্য হয়তো পাওয়া যাবে। এদিকে মার্কুস ও তার বন্ধুরা দৌড়াতে শুরু করেছে শহরের দিকে। পরিবারের কাছে ফিরতে হবে।
দুপুর ১টা। ভিসুভিয়াসের চূড়াটা হঠাৎ বিস্ফোরিত হলো। এমন রক্ত হিম করা শব্দ পম্পেইবাসী আগে কখনো শোনেনি। মুহূর্তের মধ্যে আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে গেলো আগুনের বিশাল এক স্তম্ভ। পম্পেই শহরের উপর বৃষ্টির মতো এসে পড়তে লাগল ছোট ছোট আগুন পাথর। ভয় পেয়ে হাজার হাজার মানুষ পালাতে লাগল শহর ছেড়ে।
মার্কুসের ফুফু ভেলেরিয়া ভয় পেয়ে ছোট মেয়ে এমিলিয়াকে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলেন। কাজের লোকটা বন্দরের দিকে সেই যে গেল ফেরার আর নামগন্ধ নেই। পুরো ঘর ফাঁকা। এমিলিয়া মায়ের বুকের সাথে লেপ্টে আছে। চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে ভেলেরিয়ার মুখের দিকে। মেঝের ফাটলটা আরো চওড়া হয়েছে। বাইরে পাথর পড়ার অনবরত শব্দ হচ্ছে। ভেলেরিয়া বুঝতে পারছেন না কী করবেন। মনে মনে এমিলিয়ার বাবার জন্য অপেক্ষা করছেন। হঠাৎ টিটুসের নাম ধরে ডাকলেন। পরক্ষণেই মনে হলো টিটুস তো পাহাড়ের দিকেই গিয়েছে। বাঁচতে হলে এখনই পালানো দরকার। কিন্তু টিটুস, মার্কুস আর এমিলিয়ার বাবা—ওরা কোথায়? ওরা কি এসে তাকে খুঁজবে? তাছাড়া পালিয়ে তিনি আসলে যাবেনই বা কোথায়? ঘরের ভিতরটা প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠেছে। দরজা খুলতে গিয়ে টের পেলেন আগুনের পাথর জমে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। উপায় না পেয়ে তিনি সেখানেই বসে রইলেন। এমিলিয়া পাগলের মতো চিৎকার করে বাবাকে ডাকতে শুরু করেছে।
মাঝরাত। হঠাৎ শুনতে পেলেন বাইরে থেকে কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। একটু পরই দরজা ভেঙ্গে ঢুকলো মার্কুস আর টিটুস। ভেলেরিয়া এমিলিয়াকে বুকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন। ভিসুভিয়াসের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, আকাশের বুক ছুঁয়ে আছে আগুনের বিশাল এক স্তম্ভ। তার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠল। মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। শরীর জ্বলছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু মনে হচ্ছে, আর একটু এগোতে পারলেই হয়তো শহরের ভিড় পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। পেছন পেছন আসছে মার্কুস ও টিটুস। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না।
চারজনের দলটা প্রাণপনে ছুটছে। একটু পর মার্কুস ও টিটুস দলছুট হয়ে কোথায় হারিয়ে গেল। এখন আর থামার কোনো উপায় নাই। যে করেই হোক বেরিয়ে যেতে হবে। হঠাৎ একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন ভেলেরিয়া। হাত থেকে ছিটকে দূরে পড়ে গেছে ছোট্ট এমিলিয়া। তিনি যখন ‘এমিলিয়া! এমিলিয়া’ বলে চিৎকার করে দু হাত বাড়িয়ে মেয়েকে খুঁজছেন, ঠিক তখনই পাহাড়ের মাথার সেই বিশাল অগ্নিস্তম্ভ ভেঙে পড়তে শুরু করল। এর কয়েক মিনিট পরই শহরের দিকে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে এলো জ্বলন্ত ছাই আর আগুনের স্রোত। কয়েক সেকেন্ডের ভিতর পুরো পম্পেই নগর ও আশপাশের বিশাল এলাকা জ্বলন্ত ছাই ও আগুনের নিচে তলিয়ে গেল। মায়ের সাথে গরম ছাইয়ের নিচে তলিয়ে গেল ছোট্ট এমিলিয়াও।
ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে, ৭৯ সালের ২৪ আগস্ট। দিনটি ছিল মঙ্গলবার।
টিটুসের শিক্ষিকা ফ্লাভিয়া কোনোদিন জানতে পারেননি তার চিঠি কারো হাতে পৌঁছেছিল কি না। এমিলিয়া মাকে খুঁজতে খুঁজতে সেই অন্ধকারের মধ্যেই হারিয়ে গেল। ভেলেরিয়াকে কেউ জানায়নি, তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরই তার স্বামী বন্দর থেকে দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকেছিলেন। তাদেরকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। টিটুস আর মার্কুসও জানেনি শেষ পর্যন্ত এমিলিয়া ও তার মা শহর থেকে বেরোতে পেরেছিলেন কি না। এরপর একসময় পৃথিবীর মানুষ ধীরে ধীরে পম্পেইয়ের কথা ভুলে গেল। মানুষের অজানায় মাটির নিচে চুপচাপ ঘুমিয়ে রইল এক আস্ত শহর—তার ঘরবাড়ি, তার রাস্তা, তার মানুষ আর তাদের অসমাপ্ত গল্পগুলো।