‘প্রিয় বন্ধুগণ! মহামান্য ভদ্র মহোদয়েরা! এই মধ্য যামিনীতে আচমকাই আমার নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। চোখ খুলে স্মৃতিতে চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগের পর মনে হলো, আমার ভাষা সংক্ষেপ হয়ে গেছে। তবু আপনাদের জানাতে চাই, আমার বুকের ভেতর বোশেখের ঝড় বইছে। আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেছে। দু চোখে নির্বিঘ্নে শ্রাবণের স্রোতধারা নামছে। আজ হঠাৎ এমন অসহায় কেন বোধ করছি, জানি না। সত্যি বলছি, জানি না। তবু বলতে চাই, আজ সমস্ত দিন যে স্মৃতি রোমন্থন করেছি মধ্যরাতে তা-ই আমাকে আঘাত করতে এসেছে। এর সূচনাটা হয়েছে একটি ক্ষুদ্র স্বপ্ন থেকে। যখন বিদুৎস্পৃষ্টের চেতন অনুভব করেছি, মনে হয়েছে অনন্তকাল ধরে এই বেদনাটা আমার ভেতরে ছিল। আজ বানের জলে ভেসে যাওয়া দূর্বল কুটিরের মতো সেটি ভেসে যাচ্ছে। সমস্ত কিছু মনে পড়ছে। আদি ও অন্ত। সূচনা ও সমাপ্তি। কিশোর বয়সে যে প্রেমে পড়েছিলাম, সেই স্মৃতি বুঝি আজ দ্বীপের মতো নিঃসঙ্গ সমুদ্রের বুকে জেগে উঠেছে—জগতের সমস্ত বেদনা ও দুঃখবোধসমেত। এমতাবস্থায় করণীয় কী? আপনারাই বলুন। আমি জানি! আপনারা কেউই এর প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করতে পারছেন না। সাকুল্যে এ অসম্ভবই। তবু কেন যেন আজ চিৎকার করে এই মর্মন্তুদ যাতনার কথা ঘোষণা দিতে ইচ্ছে করছে আমার। যেন বর্ণনাহীন কোনো বস্তুর পলকা শরীরের মতো হাওয়ায় ভাসছি। একটি অসহায় সত্তা ও শরীর। তাতে কেবল বোধটুকু সজাগ আছে। ফলে এতোকাল প্রেম সম্বন্ধীয় যে-সব পুস্তক আমি পড়েছি, যেসব সঙ্গীত ও সুর শুনেছি, সবই জাগ্রত হয়েছে। স্মৃতিতে সজাগ হয়ে একটি কিশোরীর মুখের আকারে ভেসে উঠেছে। কয়েক যুগ পর সেই কিশোরীটি নিশ্চয় আজ নারীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আমারই মতো জীবনের মধ্য বয়সে এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু এ-ই যাতনা কি তাকে স্পর্শ করেছে? না করুক। দুঃখ কেবল আমারই হোক। ফলে দুঃখের প্রতি একাগ্র হয়েছি। বাকহীন বসে আছি। এই তো পাঁজরে ব্যথা অনুভব করছি। এ ব্যথার আদিপ্রাণ কোথায়? হ্যাঁ! সেটা হৃদয়। তীরবিদ্ধ হরিণীর মতো ওটা ছটফট করছে। এখনই মরবে। কাতরাচ্ছে। কিন্তু মরবে না। একটি গভীর ক্ষত নিয়ে উঠে দাঁড়াবে। দৃষ্টি প্রচ্ছন্ন হয়েছে। এবং ‘কে তুমি তন্দ্রাহরণী’ গানটির কথা মনে পড়ছে। এই তো সমস্ত ঘরে গানের তীব্র সুরটি বাজছে। দ্বিধা ও অজ্ঞেয় অনুভূতিরা ক্রমশ ধ্বস্তাধস্তি শুরু করেছে। প্রেমের বিবরণ দেয়া সমস্ত রাবীন্দ্রিক বাক্য জড়ো হয়েছে। এতো এতো উপাখ্যানের মাঝে সুনীলের সোনালী দুঃখ ও ইভানের প্রথম প্রেমের স্মৃতি সজাগ হয়েছে। চিরায়ত যে-সব গ্রন্থমালা ও নাটক আমি পড়েছি, তাদের চরিত্ররা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পার্সিয়ান সঙ্গীতের সুর একীভূত হয়েছে। আমার মনে পড়ছে জীবনের কথা। যদি কোনোদিন শেষবার মুখোমুখি হই। কার! সে নারীর! তার হাতে তুলে দেব হেমলকের অমিয় বিষ। দাও পান করি। এ সমাপ্তির কথা ভাবতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। নিদ্রা ঘনীভূত হয়েছে মুহূর্তেই। নিস্তেজ হয়ে চলে যাচ্ছি। সেখানে মেঘ, সেই অসহায় কিশোরীর মুখ। আর কেবলই একটি শব্দ। ‘প্রেম’।
প্রেম
৮৪০
😭😭😭