‘এই ব্যস্ততার মধ্যে’

কাউসার মাহমুদ

একটি জোছনার রাত থেকে যেসব নক্ষত্র ঝরে পড়ে, সেগুলো কোথায় কোথায় যে হারিয়ে যায়, তা-ই  ভাবি এখনো! এখনো সেই অহেতুক কল্পনায় দাঁড়িয়ে স্মৃতির প্রতি মুমূর্ষুর মতো এমন কাতরতা বোধ করি যে, নির্জনে বসলেই কণ্ঠরোধ হয়ে আসে। বিকেল, সন্ধ্যা, সমুদ্র, বৃষ্টি, গান, কবিতা, ছবি, বৃক্ষ—ইত্যকার বিষয়াদি তো বর্তমান জীবন থেকে যোজন যোজন দূরের পৃথিবীর বস্তু। এ সত্য মেনেই তো এ পথে পা বাড়িয়েছিলাম। এই ক্লান্তির সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। দিকশূন্য নাবিকের মতো এখনো তো সে সমুদ্রে ভেসে চলছি। বন্দর নেই জেনেও কোনোদিন একটি লন্ঠন দেখব, এই আশায় পথ চলছি। তাই তো এই কাতরতাবোধ। এই আশা, এই হতাশা। এই দুঃখবোধ, এই গ্লানির জীবন। এই মগ্নতা আবার একইসাথে বেঁচে থাকার ক্রুরতা। ফলে সবকিছু মিলিয়ে যদি পেছনে তাকাই, তাহলে তা কেবল সুন্দর স্মৃতির কাছেই নিয়ে যায় আমায়। যেখানে মুঠো মুঠো জোছনা ছিল। ছিল থোকায় থোকায় গল্প। ছিল গ্রামীণ জীবনে বেড়ে ওঠার প্রাণচঞ্চল চপলতা, আর ছিল শহুরে জীবনে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেকে শিল্পের মাঝে বিপন্ন করে দেওয়ার এক তীব্র বাসনা। কিন্তু যখনই আবার বর্তমানের দিকে তাকাই আর ভবিষ্যতের কথা ভাবি, তখন প্রকম্পিত হই। অতীতে ফেরার তো সুযোগ নেই, তাই বর্তমান থেকে পালিয়ে কবে যে ভবিতব্যের দিকে আগাবো—সে কথাই দিনমান বসে বসে ভাবি। কল্পনা করে নিঝুম সন্ধ্যার দিকে পা বাড়াই।

কিন্ত হায়! এই লেখা যখন লিখছি, তখন পৃথিবীর এক দেশে আরেকটা রক্তাক্ত ঘটনা ঘটে গেল। কী জঘন্য! কী পাশবিকতা! আমি না বহুদিন একটা বিষয় ভেবে কোনো কিনারা করতে পারেনি যে, কীভাবে একটা মানুষকে খুন করে ফেলা যায়? মানে, কতটুকু ক্রোধান্ধ হলে একটা মানুষকে চিরতরে এই ধরিত্রী থেকে মুছে ফেলা যায়? ধরুন! কেউ বিশ বছরের জন্য পরদেশে গেল, কেউ অনেকদিনের জন্য চোখের আড়াল হল কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যু পেল—তা এক বিষয়। কিন্তু একটা মানুষকে খুনই করে ফেলা হলো! কোনোদিন যে আর এই জল, মাটি, আলোর মাঝে হাঁটবে না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও তার শারীরিক অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না—এ আমি মানতে পারি না। হয়তো আমি খুব মেদুর স্বভাবের, হয়তো ভীতু, হয়তো অযৌক্তিক! কিন্তু আমি আমার মনের কথাটিই বলছি। সত্যি! পৃথিবীর এ কোন চক্রে যে কখনো কখনো আমরা ফেঁসে যাই, তা বড় নির্মমই লাগে। আরো অদ্ভুৎ লাগে মানুষের অজ্ঞতা। এ তো সর্ববিদিত যে, সবকালে গরীবরাই নিষ্পেষিত হয়েছে। অর্থের দম্ভ যাদের ছিল, তারাই ছিল নিষ্পেশনকারী। এই ধারা কোনোকালেই আর রহিত হলো না। আদিকাল থেকে এখনো এই বিভক্তি পৃথিবীর দেশে দেশে সর্বগ্রাস করে রেখেছে। আর এই গ্রাসকে অধিকতর শক্তিশালী করেছে মানুষের এক আশ্চর্য একরোখা বিশ্বাস। সেটি হলো সেই সত্য, বাকিসব মিথ্যা। মূলত আমার এই যাতনা প্রকাশের বর্তমান কারণটি হলো পৃথিবীর দুঃখী দেশ সুদানকে ঘিরে। গত দুদিনে সেখানে কয়েক হাজার মানুষকে খুন করা হয়েছে বলে সংবাদ পেল বিশ্ববাসী। গৃহযুদ্ধ এই দেশটিতে তো আগ থেকেই ছিল। তাই বলে এতো বড় নৃশংস বিপর্যয় হয়তো সে দেশের নিরীহ মানুষগুলি আগে কখনো দেখিনি। আহা! পৃথিবীর সেরা উৎপাদনশীল ভূমির একটি হয়েও এ দেশের মানুষগুলো ক্ষুধা আর দুর্ভিক্ষে দিন কাটায়! অবহেলা, রিক্ততা আর অভাবের তীব্র গ্লানি নিয়ে দশক দশক ধরে নিজেদের প্রাণটা বয়ে চলছে! তবু কেন সেই অভাগাদের উপরই এ ক্রুর রাজনৈতিক চক্রান্তের পরীক্ষা?  কী, কেন এবং কীভাবে এই নিরীহ দেশটিকে ধ্বংস করা হচ্ছে—সচেতন সকলেই আমরা? সে বিষয়ে আমরা সকলেই জ্ঞাত। ফলে সেসব রাজনৈতিক দূরদর্শিতামূলক আলাপের বিন্দুমাত্র খায়েশ আমার নেই। বরং টিভি বা সংবাদপত্রে সুদানের আক্রমণকারী ও প্রতিহতকারী উভয়পক্ষের লোকদের থেকে যে ক’টা বক্তব্য শুনছি, তাতে, তাদের মহান আল্লাহর ওপর শপথ, নবীর ওপর দুরুদসহ যেভাবে বক্তব্যের উপস্থাপন শুনছি, তাতে এটুকু স্পষ্ট যে এ যুদ্ধে তারা ধর্মকে সর্বাগ্রে নিয়ে এসেছে। তথা, উভয়েই একে অন্যকে দুরাচারী বলে অভিহিত করছে এবং প্রতিশোধ নিতে খুন করছে। আশ্চর্য না! উভয়ই মুসলমান। উভয়ই কোরানের আয়াত ও হাদীস পাঠ করছে এবং গোলাবারুদ নিয়ে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মাঝখানে হত-দরিদ্র মানুষগুলো বানের জলের মতো খুন হয়ে ভেসে যাচ্ছে। শুষ্ক মাটি রক্তের স্রোতধারায় সিক্ত হয়ে গেছে। এসব যখন ভাবছি, তখন বহুদিন আগে আমার এক অজ্ঞেয়বাদী প্রবীণ বন্ধুর কথা মনে হলো। এক আড্ডায় আমরা যখন দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ে অহেতুক তর্ক জুড়েছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘দেখুন বন্ধুগণ! ধর্ম চিরকালই স্নিগ্ধতা, নিরাপত্তা ও কল্যাণের। কিন্তু যখনই এটি ভুল ব্যখ্যায় প্রচারিত হয়েছে, তখন রক্তের স্রোতধারা বয়ে গেছে। বিভক্তি অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে পরিশুদ্ধ শিল্প! এটি সর্বদা একতার দিকে আহবান করে।’

তার এ কথাটি যদিও শ্রবণে আরাম লাগে। কিন্তু পর্যালোচনার যথেষ্ট ফাঁক রয়ে গেছে। কেননা, শিল্পের শুদ্ধ, বিশুদ্ধ কী? আমাদের মতো বিশ্বাসীদের কাছে শিল্প আর ধর্মের মাঝে ধর্মই বিশুদ্ধ, শিল্প চর্চার। যদিও সেসব কপট, দ্বিমুখী, স্বার্থান্বেষী সাধুদের আমরা এড়িয়ে যাই। যারা ধর্মের নামে গণমানুষের রক্তকে উত্তেজিত করে তোলে এবং নিজেরা পেছনের পথে পলায়ন করে।

যা হোক, আহা! কীসব লিখছি এখন! এ এক অদ্ভুত স্বভাব আমার। লেখার বিষয়বস্তু নির্ধারণ না করে বসলে, গতিটাই হারিয়ে যায়। আমার হৃদয়ে থাকা সুখ ও আনন্দগুলোর চেয়ে পুঞ্জীভূত দুঃখ, হতাশা আর বেদনাবোধগুলোই সদা উচ্চকিত হয়ে উঠতে চায়। ফলে এই নিশীথ রাত্রির শেষে, চারপাশে যখন নিকষ আঁধার আর মরুভূমির নিস্তব্ধতা পিঠাপিঠি শুয়ে আছে, তখনও ভাবছি ‘এই ব্যস্ততার মধ্যে’ আগামীকালটাও হয়তো আরো করুণ, আরো নিষ্ঠুর হয়ে আসবে।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মাহফুজ তাসনিম
মাহফুজ তাসনিম
8 months ago

চমৎকার।