লেটস ডু লাভ

মো. রেজাউল করিম

নেপালে এসে যারা কাঠমান্ডুর কাছাকাছি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক কোনো জায়গা দেখতে চান, তাদের জন্য নাগরকোট ও ধুলিখেলই বোধ করি আদর্শ জায়গা। নাগরকোট বা ধুলিখেলে দিনে যেয়ে দিনেই ঘুরে আসা যায়। তবে ধুলিখেল এমনই এক জায়গা, যার সৌন্দর্য সময় নিয়ে উপভোগ করা প্রয়োজন। কাঠমান্ডু আসার আগেই নেপাল সম্পর্কে পড়াশোনা করে নাগরকোট দর্শনের বাসনা মনের কোণে লুকিয়ে রেখেছিলাম। নরেনের সাথে কথা বলে ধারণা হলো, দুদিনে নাগরকোট ও ধুলিখেল দেখা সম্ভব। 

পরিকল্পনা হলো—আগে নাগরকোট যাব, নাগরকোটে কিছুক্ষণ থেকে সেদিনই যাব ধুলিখেল। বিদেশি পর্যটকদের সাইট সিয়িং তালিকাতে নাগরকোটের নাম থাকেই। বনভোজনের জন্য নাগরকোট নেপালিদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। গ্রীষ্মকালে বিভিন্ন রংবেরঙের ফুলের কারণে এখানে সবসময়ই পরিবর্তনশীল একটা ভূদৃশ্য বিরাজ করে। তুষারাবৃত সুউচ্চ পর্বতের বিপরীত দিকে দিগন্ত-বিস্তৃত পর্বতময় দৃশ্য অপূর্ব মনোমুগ্ধকর। আর যাদের অ্যাডভেঞ্চারের  ইচ্ছে—তাদের জন্য রয়েছে লং ট্রেকিংয়ের সুবন্দোবস্ত।  

নরেন বলছিল, ধুলিখেলে কিছু বেশি সময় থাকতে। ধুলিখেল শুধু দেখার জায়গা নয়, বরং সেখানে থেকে কিছুটা ঘুরেফিরেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করা প্রয়োজন। কিন্তু তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রথমত, এসেছি কর্ম-উপলক্ষ্যে, ভ্রমণে নয়। দ্বিতীয়ত, টাকশালের স্থিতি এমন স্বাস্থ্যবান নয় যে, তা দিয়ে ইউরোপিয়ান কিংবা আমেরিকান পর্যটকদের মতো এক জায়গাতে দিনের পর দিন কাটিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করব।

বহু বছর আগে মহামহীয়ান বাদশাহ শাহজাহান স্ত্রীর মৃত্যুতে বিরহকাতর হয়ে আগ্রা নগরীর কাছে যমুনাতীরে স্ত্রীর সমাধিতে তাজমহল নামে যে অপরূপ স্থাপত্য কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, ছাত্রজীবনে তিন বন্ধু মিলে তা দেখতে গিয়েছিলাম। পরিকল্পনা ছিল দেখেই দৌড় দেবো দিল্লির দিকে। 

হাতে সময় কম, তহবিলও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু তাজ দেখার পর মনে হয়েছিল, নাহ! এ সৌন্দর্য দেখার নয়, বরং উপভোগের। প্রথমবার তাজ দেখার পরে বন্ধুদের সাথে শলা করে যাত্রা পিছিয়ে দিলাম। ঘুরেফিরে তাজ দেখলাম, বেসমেন্টে সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর মূল কবরও দেখলাম (এখন নাকি নিরাপত্তাজনিত কারণে ভিআইপি ছাড়া বেসমেন্টে যেতে দেওয়া হয় না)। ওপরে যে দুটো কবর রয়েছে তা নকল কবর, এর অভ্যন্তরে দেহাবশেষ নেই। আজ থেকে সাড়ে তিনশ বছরেরও আগে সম্রাট কী উদ্দেশ্যে বেসমেন্টে মূল কবর আর ওপরে একই আকৃতি ও নকশায় দুটো কবরের কাঠামো তৈরি করিয়েছিলেন তার সদুত্তর গাইডের কাছ থেকেও পাইনি। 

বিকেলের পড়ন্ত আলোয় তাজের গেটের কাছে বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে তাজের সৌন্দর্য অনুধাবনের চেষ্টা করেছিলাম। মনে হয়েছিল, ঘুরেফিরে তাজ দেখে যারা চলে যান তারা সত্যিই দুর্ভাগা। কোনো এক তাজপ্রেমিক কবি নাকি বিশ্ববাসীকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন। একভাগে রয়েছেন তাঁরা—যারা তাজ দেখেছেন। অপর ভাগে রয়েছেন, যাঁরা দেখেননি। আমার কাছে মনে হয়েছিল, তাজপ্রেমিক ওই কবি যথার্থই ভাগটি করেছিলেন। সন্ধ্যাবাতি জ্বলার আগেই বের হয়ে আসতে হলো। কিন্তু গাইডের পরামর্শ মোতাবেক চতুর্দশীর আলোয় আবারও তাজ দেখার ইচ্ছায় সামনের রেস্তোরাঁয় বসে ছিলাম রাত অবধি। 

খাওয়াদাওয়া সেরে যখন তিন বন্ধু মিলে রেস্তোরাঁর বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি, রাত তখন দশটা। তাজের বাইরে দোকানপাটের আলো নিভে গেছে। তাজের প্রাচীরের কাছে যেয়ে আবারও বিশ্বের সেই বিস্ময়কর স্থাপত্যকর্ম দেখলাম। চতুর্দশীর আলোয় প্রেমিক শাহজাহানের ভালোবাসাসিক্ত অপরূপ সৌন্দর্যস্থাপত্য তাজ বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত অহংকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও দেখলাম। তিন বন্ধু নির্বাক। জানি না ওদের তখনকার মনের অনুভূতি। এই অধম আবেগে আপ্লুত। মহামহীয়ান শাহজাহানের প্রতি শ্রদ্ধায় শির অবনত। অপরূপ এক সৌন্দর্য দেখার আনন্দে গভীর তৃপ্তি নিয়ে রাতে ঘুমিয়েছিলাম, স্বপ্নেও ছিল সেদিন তৃপ্তির অনুরণন। 

পরদিন খুব ভোরে আবারও তাজ দর্শনে গিয়েছিলাম। সকাল দশটার আগে তাজ কমপ্লেক্সে ঢোকার অনুমতি  নেই। আবারও প্রাচীরের কাছে যেয়ে সূর্যোদয়ের হালকা আলোয় তাজকে দেখলাম। অন্ধকারের চাদর অনাবৃত করে তাজ ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরছিল। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল হালকা কুয়াশার চাদর তাকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশার আবরণ সরিয়ে তাজ মহাকাব্যিক সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে বেরিয়ে আসলো। সূর্যের প্রখর আলোয় লাজুক তাজের অপ্রতিভ সৌন্দর্য দেখতে রাজি ছিলাম না। দ্রুত প্রস্থান করলাম। চলে গেলাম শাহজাহানের বিলাসপ্রাসাদ আগ্রা ফোর্ট দেখার জন্য।

নেপালি বন্ধু নরেনকে নিয়ে চলেছি নাগরকোট দর্শনে। টয়োটা পুরোনো মডেলের একটি ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়ায় নিয়েছি। কাঠমান্ডু থেকে নাগরকোট হয়ে ধুলিখেল—তিন হাজার রুপি মাত্র। (সে সময় নেপালি রুপি আর বাংলা টাকার মান ছিল সমান)। নরেনই ট্যাক্সি জোগাড় করেছে, আমি এ কাজ করতে গেলে নাকি আরও এক হাজার বেশি গুনতে হতো। ধন্যবাদ, নরেন।

শহর পেরোতেই নয়নাভিরাম সবুজ পাহাড়ের দেখা মিলল। এক ঘণ্টার রাস্তা। সময় যতই যায় ভূপ্রকৃতির রং-রূপ ততই পরিবর্তিত হতে থাকে। রাস্তার দু-পাড়ে সারি সারি পাহাড়ের মেলা। ক্রমেই তাদের উচ্চতা বাড়তে থাকে—পাহাড়ের পিঠে পাহাড়। সবুজাবৃত পাহাড়ের গায়ে সারি সারি পাইন বৃক্ষ। নয়ন ভরে দেখলাম সেই সৌন্দর্য। রাস্তা-লাগোয়া পাহাড় খাড়া উঠে গেছে আকাশপানে। কোথাও কোথাও রাস্তা যেন পাহাড়ের কাছে, আবার কোথাও বা দূরে। কোথাও কোথাও সংকীর্ণ রাস্তা পাহাড়ের গায়ে গভীর বাঁক নিয়েছে, অন্য পাশে গভীর গিরিখাত। সামান্য অসতর্কতায় ঢাকার রাস্তায় দৃশ্যমান স্লোগান বাস্তব রূপ নিতে পারে—একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। মনে কিছুটা শঙ্কা-ভীতি সঞ্চারিত হয় বটে। তবে পরিচিত রাস্তায় ড্রাইভারকে খুব আত্মবিশ্বাসী বলেই মনে হলো। 

ছবি তোলার নেশায় পেয়ে বসল। বেশ কয়েকবার গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুললাম। এক জায়গায় দাঁড়িয়েছি ছবি তোলার জন্য। কাছেই ছিল অস্থায়ী সেনাছাউনি। মাওবাদী গেরিলাদের মোকাবেলায় নেপাল রাজ দেশের সর্বত্র মহাসড়কগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সেনাছাউনি নির্মাণ করে দেশব্যাপী দখলিস্বত্ব বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছবি তোলায় প্রহরী সেনার আপত্তি। ড্রাইভার নেপালি ভাষায় উচ্চ স্বরে জানাল—ফরেন ট্যুরিস্ট। প্রহরী সেনা হাতের ইশারায় অনাপত্তি জানিয়ে দিলো। ছবি তোলা শেষে আবারও পথচলা। কোথাও কোথাও দেখা মিলল অনেক সাদাচামড়া নারী-পুরুষ পর্যটকের। পিঠে বড়সড় বোচকা নিয়ে পদব্রজে পথ চলেছে। এরা মূলত ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। হয়তো দলবদ্ধভাবেই বেরিয়েছে। পরবর্তীতে হাঁটার গতির ভিন্নতার কারণে দলছুট ট্রেকাররা একাকীই হেঁটে চলেছে। ওদের মধ্যে শ্বেত-সুন্দরীর দেখাও মেলে। সমগ্র নেপালে চলছে নেপালরাজ ও মাওবাদী গেরিলাদের মধ্যে সশস্ত্র লড়াই। এর মধ্যেও নিশ্চয় নিরাপত্তা রয়েছে। নইলে অনেক মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ওরা একাকী পথ চলতে পারত না। কিন্তু পাহাড়ে জনবসতি খুবই হালকা। দেখা যায় না বললেই চলে। 

এক জায়গায় এসে গাড়ি খুবই খাড়া পথে চলতে চলতে অবশেষে দাঁড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভার আমাদের জানিয়ে দিলো—আমরা গন্তব্যে উপস্থিত। আমরা এখানে এক ঘণ্টা থাকতে পারি। ঊর্ধ্বমুখে কিছুটা হেঁটে, সোজা কথায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রশস্ত এক চূড়ায় পৌঁছলাম। পাহাড়চূড়ার নাম দাতুম হাইট (উচ্চতা লেখা আছে, ভুলে গেছি)। 

এই টাওয়ার থেকে মাউন্ট এভারেস্ট দেখা যায়, যা নাগরকোটের আবাসিক এলাকা থেকে দেখা যায় না। নাগরকোটের পেছনের দিকে আছে তুষার-আবৃত দীর্ঘ পর্বতের সারি। বেশ কিছু সাদাচামড়া পর্যটক সেখানে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখছে, কেউ বা চারপাশের দৃশ্যাবলি ক্যামেরাবন্দি করছে। একজনের সাথে কথা বলে জানলাম তারা পাঁচজনের একটি দল কাঠমান্ডু থেকে হেঁটেই নাগরকোটে এসেছে। এখানে হোটেলে অবস্থান করছে ট্রেকিংয়ের জন্য। এখানে দুদিন ট্রেকিং করে পদব্রজে ধুলিখেল চলে যাবে। ওদের ইচ্ছে-সাহস-ধৈর্য-সামর্থ্য সবকিছুই আমার চিন্তা-বিচিন্তার সামর্থ্যরেও বাইরে। 

ট্রেকিংয়ের সময়-অভ্যেস-সামর্থ্য আছে বলেও মনে হয় না। তবুও দাতুম চূড়া থেকে পেছনের পাহাড়ে দৃশ্যমান বনে প্রবেশের চেষ্টা করলাম। সবুজ চিরহরিৎ বনে ট্রেকিংয়ের সরু পায়ে চলা পথ দেখা যায়।

যেহেতু ট্রেকিংয়ের সাইনবোর্ড আছে, সেহেতু জীবজন্তু নেই, তা নিশ্চিত। সুতরাং বনের মধ্যে কিছুটা প্রবেশ করা যায়—মনের মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারের ক্ষীণ বাসনা। দেশে গিয়ে গল্পের উপাদান সংগ্রহের সন্ধানও বটে।

গাছগাছালির মাঝ দিয়ে কিছুটা এগোতেই পাখির কিচিরমিচির, কলকাকলি শুনতে পেলাম। ক্রমেই তা বাড়তে লাগল। কিছু কিছু বৃক্ষ বুনো ফুলে আবৃত, তবে সবই অচেনা। নরেনও চেনে না। বড় একটি বৃক্ষ বেগুনি রঙের ফুলে সয়লাব। অনেকটাই মহুয়া ফুলের আকৃতি, তবে অশোক নয়।

এই বনে মানুষের পদচারণা রয়েছে, তবুও হঠাৎই বনমোরগের দেখা মিলল—আদম সন্তান দেখে ভয়ে কক্‌-কক্‌ করতে করতে উড়াল দিয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসল। দুষ্টু কাঠবিড়ালি এগাছ-ওগাছ করে বেড়াচ্ছে। নাম না জানা পাখির তীব্র কলতান।

এই বনে এই ক্ষণে—সঙ্গী হিসেবে নরেন একেবারেই বেমানান। তারপরেও এটাই বাস্তবতা।

আমাদের সময় শেষ। ট্যাক্সি ড্রাইভার নিশ্চয় ঘড়ি দেখছে। পশ্চাদপসরণ করলাম। দাতুম চূড়ায় এসে দেখি আরও মানুষ জড়ো হয়েছে। সবাই সাদা বর্ণের, সাথে তাদের এক দঙ্গল পোলাপান। এদের মধ্যে কিছু আছে দুষ্টের শিরোমণি। ওরা সবাই মিলে দাতুম চূড়ায় স্থাপিত স্টিলের টাওয়ারে উলটো হয়ে ঝুলে হাত ছেড়ে দিয়ে বাঁদরামি দেখানোর চেষ্টা করছে। ওদের বাবা-মাও তা উপভোগ করছে।

আমি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দুই নয়ন ভরে দূরে দৃশ্যমান হিমালয়ের সারি সারি পাহাড়চূড়া দেখলাম। সাদা পাহাড়চূড়ার নিচে যে অংশে বরফ নেই তা দেখা যায় না। মনে হয় বরফের পাহাড়চূড়া শূন্যে ভেসে আছে। দূরে বরফের পাহাড়চূড়া আর দাতুম হাইটের মাঝে বিস্তীর্ণ এলাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ের এক বিশাল সাগর।

বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাস টেনে নিলাম। মনে হলো ঢাকার দূষিত বাতাসে দুমড়ে-মুচড়ে-কুঁকড়ে যাওয়া ফুসফুস অনেক দিন পরে বিশুদ্ধ বাতাস পেয়ে আনন্দে ফুলে ফুলে উঠল। আমার বাসায় অ্যাকুরিয়ামের পানি নির্দিষ্ট সময়ান্তে পালটাতে দেরি হলেই দেখি মাছগুলোর চলাচল কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। পানি পালটে দিলেই দেখি অক্সিজেনসমৃদ্ধ নতুন পানিতে ওরা ছোটাছুটি শুরু করেছে। আমার ফুসফুসও তেমনই হিমালয়ের অক্সিজেনসমৃদ্ধ বিশুদ্ধ বাতাসে আনন্দে আত্মহারা।

নরেনের তাড়ায় নেমে এলাম ট্যাক্সি পার্কিংয়ে। সঙ্গে নিয়ে এলাম দাতুম হাইটের স্মরণীয় এক ঘণ্টার আনন্দস্মৃতি।

মনোমুগ্ধকর স্মৃতি, আনন্দময় অনুভূতি নিয়েই গাড়িতে উঠে বসলাম। পরবর্তী গন্তব্য নয়নাভিরাম নগরী—ধুলিখেল।

ড্রাইভার কিছু একটা বলছে আমাদেরকে। নরেন জানাল, ড্রাইভার নরেনকে জিজ্ঞাসা করছে, বিদেশ থেকে এসে এক ঘণ্টায় কীভাবে নাগরকোট দেখা হলো, কেন আমি নাগরকোটে থাকলাম না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি হাসলাম। নরেন জানাল ড্রাইভার বিদেশি মেহমানকে স্থানীয় মনেস্ট্রি দেখাতে চায়। এজন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ লাগবে না।

নেপালের সর্বত্রই দেখেছি মানুষের মাঝে একধরনের সাংস্কৃতিক চেতনা রয়েছে যা পর্যটন সহায়ক। আশেপাশের অন্য কোনো দেশে এমনটি দেখিনি। নেপালের দুটি নগরী পর্যটকদের কাছে ভূস্বর্গের খ্যাতি পেয়েছে—পোখারা ও ধুলিখেল। এক পর্যটক ধুলিখেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন: “A Tourist Paradise: The spectacular snow fed mountains seen from Dhulikhel must be one of the finest panoramic views in the world. When a blue haze covers the lower portion of the mountains, they seem to be floating in the air.”

নাগরকোট থেকে ধুলিখেলের দূরত্ব বাইশ কিলোমিটার আর কাঠমাণ্ডু থেকে ত্রিশ। নাগরকোট থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই ধুলিখেল পৌঁছে গেলাম। পঞ্চখাল উপত্যকার পাদদেশে ধুুলিখেল নগরী অবস্থিত। কাঠমাণ্ডু থেকে পশ্চিম দিকে তিব্বত অভিমুখী মহাসড়কের পাশেই এই শহরের অবস্থান।

বরফাবৃত হিমালয় পর্বতমালা, বিস্তৃত উপত্যকা এবং সবুজ বনসমৃদ্ধ ধুলিখেল নেওয়ারি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন এক শহর। ধুলিখেল থেকে হিমালয় পর্বতমালা খুবই বিস্তৃত পরিসরে দেখা যায়, যা নেপালের অন্য কোনো শহর থেকে দেখা যায় না। ধুলিখেল শহরের যেকোনো পাহাড়চূড়ায় বসে মাউন্ট কারোলাং থেকে মাউন্ট অন্নপূর্ণা পর্যন্ত সুবিস্তৃত বরফাবৃত পর্বতচূড়া দেখা যায়। এ ছাড়াও আরও অসংখ্য পর্বতচূড়া দেখা যায়, যার মধ্যে—মাউন্ট গণেশহিমাল (৭৪২৯ মিটার), মাউন্ট লাঙ্গটাঙ্গ (৭২৩৪ মিটার), মাউন্ট গৌরিশঙ্কর (৭৪২৯ মিটার)।

ধুলিখেল বিদেশি পর্যটকদের কাছে প্যানোরামিক মাউন্টেন ভিউ এবং আকর্ষণীয় ট্রেকিং ট্রেইলের জন্য বিখ্যাত হলেও দেশি হিন্দু পুণ্যার্থী পর্যটকদের কাছেও বহুসংখ্যক মন্দিরের জন্য আকর্ষণীয়। আবার নামোবুদ্ধের আত্মাহুতির স্থান হিসাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এটি তীর্থ নগরী। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে আজ থেকে ছয় হাজার বছর আগে যুবরাজ নামোবুদ্ধ এখান থেকে তাঁর তীর্থযাত্রা শুরু করেছিলেন। চলার পথে একটি ক্ষুধার্ত বাঘ ও কয়েকটি বাচ্চা দেখে তাঁর খুব দয়া হয়। নামোবুদ্ধ ক্ষুধার্ত বাঘ ও তার বাচ্চাদের খাওয়ার জন্য নিজের শরীর উৎসর্গ করেছিলেন বলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ বিশ্বাস করেন। নিজের শরীরকে বাঘের ক্ষুধা মেটানোর জন্য উৎসর্গ করার সেই দৃশ্যটি পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে।

এভাবেই নামোবুদ্ধের জীবনাবসান হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে পরবর্তীতে নামোবুদ্ধ লুম্বিনী নগরীতে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন—দ্বিতীয় জন্মে তাঁর নাম হয় গৌতম বুদ্ধ। লুম্বিনী থেকে তিনি যখন আবারও ওই স্থানে আসেন, তখন এ স্থানটির নামকরণ করেন—সাঙ্গকে দা ফিয়াফুলসা (Sangke da Fyafulsa)। পরবর্তীতে এটি নামোবুদ্ধের তীর্থস্থান হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, নামোবুদ্ধ তীর্থকেন্দ্র পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রভু বুদ্ধের ইচ্ছায় সকল গুনাহ মাফ পাওয়া যেতে পারে।

নরেন তার এক বন্ধুর মাধ্যমে ধুলিখেলে আগে থেকেই একটি রিসোর্টে আমাদের জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছিল। রিসোর্টের আকার-আকৃতি ও চেহারা-সুরত দেখে ভয়ই পেয়ে গেলাম। এর ভাড়া কি আমি মেটাতে পারব? এতটা রাজকীয় রিসোর্ট। চার একর জায়গা জুড়ে রিসোর্টটি গড়ে উঠেছে। মধ্যখানের পাহাড়ে দোতলা মূল ভবনটি নেওয়ারি স্থাপত্যরীতিতে নির্মাণ করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত নিচে পাহাড়ের ঢালে একই স্থাপত্যরীতিতে আরও কিছু ছোট ছোট কটেজ। ভবনগুলো নানা বর্ণের ফুলবাগান দিয়ে ঘেরা হলেও এর পেছনে সবজিখেত। এখানে জৈবসার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতির বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করা হয়, যা দিয়ে রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশন করা হয়।

: নরেনকে বললাম, বন্ধু আমার তো মনে হয় এটা অনেক উচ্চমূল্যের রিসোর্ট। এখানে বোধ হয় আমাদের থাকা উচিত হবে না।

নরেনের সহজ উত্তর: আমি তো আছি। এখন ডাল সিজন। তার ওপরে এখানে বুকিং দিয়েছি আমার বন্ধুর মাধ্যমে। আমরা একটি রুম বুক করেছি। ভাড়া বেশি হবে না।

: কিন্তু নরেন, এক রুমে আমার থাকতে আপত্তি নেই। তবে বেড আলাদা হওয়া চাই।

: কেন বন্ধু, এক রাতে কী এমন সমস্যা? নরেন যেন কিছুটা আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে।

: আমার সমস্যা আছে।

নরেন রিসিপশন থেকে ঘুরে এসে জানাল, দুই বেডবিশিষ্ট একটি কক্ষ পাওয়া গেছে। ভাড়াও নাগালের মধ্যে। ‘তথাস্তু’ বলে নিজ কক্ষে রওনা হলাম। রুমে লাগেজ রেখে রিসোর্টের লবিতে এসে বসলাম।

একে লবি না বলে বরং হিমালয় অবজারভেশন টাওয়ার বলাই ভালো। দূরে দেখা যায় বিস্তৃত বরফাচ্ছাদিত পর্বতচূড়া। বরফাচ্ছাদিত সাদা পর্বতচূড়ার নিচে যে অংশে বরফ নেই তা দেখা যায় না। মনে হয় বরফের পাহাড়চূড়া শূন্যে ভেসে আছে। নাগরকোটেও এ দৃশ্য দেখেছি, তবে ধুলিখেলে তা আরও মনোমুগ্ধকর-চিত্তাকর্ষক-হৃদয়গ্রাহী। নাগরকোট থেকে এভারেস্টচূড়া দেখতে পারিনি। এখান থেকে এভারেস্টচূড়া পরিষ্কার দেখা যায়। পর্বতমালা যেন সগৌরবে মাথা উঁচিয়ে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টায় মত্ত। হায়—এ দৃশ্য দেখছি কুসুম, ফারহান, সুজানকে ছাড়াই। একদিকে স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখার আনন্দ, আর অপরদিকে প্রিয়জনদের বাদ দিয়ে তা দেখার বেদনা। আনন্দ আর বেদনার এক মিশেল অনুভূতি। পণ করলাম, ওদেরকেও কোনো না কোনো দিন নিয়ে আসব। আবারও দেখব এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য, ওদেরকে নিয়ে।

সাঁঝের আঁধার নামতেই শীতের অনুভূতি। লবি থেকে রুমে চলে গেলাম। উষ্ণ পানিতে গোসল সেরে বসতেই রুমে ওয়েলকাম-টি আর শুকনো বিস্কুট দিয়ে গেল। কম্বল গায়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের পরি পরম মমতায় দু-চোখের পাতা বন্ধ করে দিয়ে গেল।

ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। শরীরে মানুষের হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙল। নরেন বসে আছে শিয়রে—আমার বিছানায়। অস্বস্তি বোধ করে দ্রুত উঠে বসলাম। সন্ধ্যা পেরিয়েছে, তখন সাড়ে সাতটা। ইংলিশ রীতিতে ডিনারের সময়, ঢাকাইয়া রীতিতে স্ন্যাকস টাইম। নরেন জানাল, এখানে রাত নয়টার মধ্যেই রাতের খাবার পর্ব শেষ করতে হবে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে রিসোর্টের ক্যাফে লাউঞ্জে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা শুরু হবে, চলবে ঘণ্টাখানেক। স্থানীয় গ্রামীণ নারী-পুরুষ সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করবেন। রিসোর্টে আবাসন গ্রহণকারীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন মুফতে। নরেনের প্রবল আগ্রহ—সে কোনোভাবেই এটা মিস করতে চায় না। আমিও সঙ্গী হলাম।

অনুষ্ঠান বেশ জমে উঠেছে। দুজন তরুণ-তরুণী গেয়ে চলেছে, চেহারা-সুরত বেশ। আরও কজন আলো-আঁধারিতে উদ্বাহু নৃত্যে রত। নেপালি নৃত্য কিংবা গীত—কোনোটা সম্পর্কেই আমার সম্যক ধারণা নেই। সুতরাং নৃত্য ও গীতের মান সম্পর্কে বোঝার ক্ষমতাও আমার নেই। তবে এটুকু বোঝার ক্ষমতা আছে যে, যা কিছু হচ্ছে সবই অত্যন্ত উচ্চলয়ের। দর্শকদের প্রায় সকলেই সাদা চামড়াধারী নারী-পুরুষ। তাঁরা অনুষ্ঠান বেশ উপভোগ করছেন বলেই মনে হলো। সকল টেবিলেই পানীয় সরবরাহ করা হচ্ছে। এখানেই আমার বিপত্তি। নরেনের পীড়াপীড়িতেও বরফ গলল না। তবে নরেন শুরু করে দিল। পাশে আরও দুজন মধ্যবয়স্ক সাদাচামড়া রমণী এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু খালি আসন নেই। একজন সেবক এসে আমাদের টেবিলে তাদের বসার অনুমতি চাইল। বিনা ওজরে অনুমতি দেওয়া হলো।

নিকি আর পলা (উচ্চারণ করল অনেকটাই পওলা হিসাবে) দুজনই এসেছে সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে। অবসর কাটানো, হিমালয়ের দেশ নেপাল সম্পর্কে জানা আর ট্রেকিং করে সময় কাটানো—এই তাঁদের উদ্দেশ্য। নেপালে এসে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়, ট্রেকিং নামক শব্দটি শুনতে শুনতে। শ্রবণযন্ত্রের হার্ডডিস্কে শব্দটি বোধ হয় এমনভাবেই সেভ হয়ে গেছে যে, এটি আর ডিলিট করাও যাবে না। পাহাড়ের গায়ে মাটির সরু পথে স্থানীয় একজন গাইড নিয়ে কিংবা তা ছাড়াই দিনভর লাঠি হাতে হেঁটে চলা আর সূর্য মাথার ওপরে হেলে পড়লেই আবার ফিরে আসা। পরদিন আবার ভিন্ন পথে চলা, এই হচ্ছে—ট্রেকিং।

ইতোমধ্যে খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেকে ভেজিটেরিয়ান হিসাবে মিথ্যা পরিচয় দিয়েছি। ফিশ ফিঙ্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ভারতীয় চম্পাকোলায় চুমুক দিয়ে রঙিন পানীয়সেবীদের সাথে যথাসম্ভব আলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নাকি নেই। তবে ড. ইউনূসের বাড়ি যে বাংলাদেশে তা তাঁরা জানে। নরেন তাদের সাথে রসিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। তাঁদের আগামীকালের ট্রেকিংয়ে আমাদেরকে সাথী হওয়ার আমন্ত্রণে নরেন যেন আনন্দিত-আহ্লাদিত। আমার নির্দিষ্ট কোনো প্রোগ্রাম নেই জেনে নিকি আর পলা আরও উৎসাহিত হয়ে ট্রেকিংয়ের উপকারিতা, এর আনন্দ ইত্যাদি সম্পর্কে রীতিমতো যেন প্রশিক্ষণ পর্ব শুরু করে দিল। ট্রেকিংয়ের অন্যতম সরঞ্জাম লাঠি—তাও নাকি তাঁদের কাছে অতিরিক্ত আছে।

নরেনের প্রবল আগ্রহে-আতিশয্যে রাজি হলাম। তিনজনই আমার সাথে হ্যান্ডশেক করে সমস্বরে বলল, ‘ব্রাভো’। নরেন ওদেরকে ইউরোপিয়ান রীতিতে প্রায় জড়িয়ে ধরে বিদায়পর্ব সমাপ্ত করল। ততক্ষণে সাংস্কৃতিক পর্বও গুটিয়ে গেছে। অভ্যাগত অতিথিবৃন্দ একে একে যে যার মতো চলে যাচ্ছে। কেন যেন মনে হলো, নরেনের সাথে আমার বন্ধুত্ব স্থায়ী হওয়ার নয়। আর যাই হোক সে সাধুপুরুষ নয়। সাথে অফিসের ল্যাপটপ, নিজের ক্যামেরা আছে। ওগুলো নিয়ে চিন্তাতেই পড়ে গেলাম। এক কক্ষে থাকার ব্যবস্থা আমার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। নরেন কেন যে পয়সা বাঁচানোর নামে এক বেডে থাকার পরিকল্পনা করেছিল, তাও খুবই আপত্তিকর, নিন্দনীয়।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি নাহ—আমার ধারণা ভুল। ল্যাপটপ নিয়ে নরেন পালিয়ে যায়নি। একজন নির্দোষ মানুষ সম্পর্কে কুৎসিত চিন্তা করার জন্য নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হলো। আসলে আমরা এমন এক নেতিবাচক পরিবেশে বেড়ে উঠেছি, যেখানে নিত্যদিন অনাস্থা-অবিশ্বাস-অসততার মুখোমুখি হতে হয়। সে কারণেই আমাদের মনে নেতিবাচক চিন্তা, দুশ্চিন্তা, সন্দেহ-সংশয় সবসময়ই কমবেশি ঘোরাফেরা করে।

বেশ সকাল করেই নাশতা সেরে নিলাম। জীবনে প্রথমবারের মতো পড়ন্ত বয়সে ট্রেকিংয়ে বেরিয়েছি। নিকি, পলা, নরেন আর আমি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সরু হাঁটা পথ ধরে এগিয়ে চলেছি। ওদের গাইড এমন একটা ট্রেইল বেছে নিয়েছে, যা নাকি ধুলিখেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ট্রেইল। অফসিজন হওয়ায় খুব বেশি ট্রেকারের দেখা মিলল না, তবে আগে-পিছে ট্রেকাররা আছে।

সকলের মাথায়ই কাউবয় ক্যাপ। তাঁদের পিঠে অনেক বড় ব্যাগ। তার মধ্যে আছে—ক্যামেরা, বাইনোকুলার, কাপড়চোপড় (যদি প্রয়োজন হয়), পানির বোতল, শুকনো খাবার, ফার্স্টএইড বক্স, কম্পাস, হেলমেট, গ্লাভস, ছোট তাঁবু ইত্যাদি। আমার কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ, যার মধ্যে আছে পানির বোতল, অল্প কিছু শুকনো খাবার, ছোট্ট একটি ক্যামেরা (হাতে রাখলেও চলে)। নিকি আর পলার দেওয়া স্টিক হাতে এগিয়ে চলেছি।

আধা ঘণ্টা পার হয়েছে। চলেছি পাহাড়ি উপত্যকায় মাটির রাস্তা বেয়ে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাটির রাস্তা ক্রমেই উঁচুতে উঠছে। হাতের স্টিক ব্যবহারে পথচলা কিছুটা ভারমুক্ত বলেই মনে হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে সবজিখেত। কোথাও-বা সবুজ পত্রপল্লবিত পাইন গাছের সারি। দু-পাশে হালকা বন। বনের মধ্যে দিয়েই পথচলা, তবে বনে কোনো প্রাণখেকো জীবজন্তু নেই। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় বিক্ষিপ্ত পাখির দল। নিকটবর্তী পাইন বনে অসংখ্য পাখির দেখা মেলে, সবই অচেনা—নাম না জানা। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বাড়িঘর। বাড়িগুলো বেশিরভাগই যত্ন করে বানানো হয়েছে। পাহাড় থেকে পাথর জোগাড় করে এনে ঘরের দেওয়াল বানানো হয়েছে। টালির ছাদ। ট্রেকিং ট্রেইলে স্থানীয় কোনো মানুষের দেখা মিলল না। তবে দূরে কৃষিখেতে কর্মরত পাহাড়ি রমণীদের দেখা যায়। কখনো-সখনো বেজী, গুইসাপ, বনবিড়াল ট্রেইল ক্রস করে এদিক থেকে ওদিকে চলে যাচ্ছে। মনে হলো নিকি-পলা দুজনই খুব উপভোগ করছে।

দু-ঘণ্টা হাঁটার পর টিম লিডার পলা যাত্রাবিরতি ঘোষণা করল। তাঁদের বিছানো চাদরে (প্লাস্টিক শিট) বসে পড়লাম। স্থানীয় গাইড মাটিতেই বসে পড়ল। আমরা চারজন চাদরের উপরে। নিকির সাথে নরেনের ভাব জমেছে বেশ। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে, বসেছেও পাশাপাশি। নানা বর্ণের পাখি আশেপাশেই মাটিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে, এখানে মানবকূলকে তারা ভয় পাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পরে আবারও পথচলা। হালকা নাশতা পেটে পড়ায় ক্লান্তি আরও বেড়ে গেল। কিন্তু যাত্রাবিরতির কোনো সম্ভাবনা নেই। দলনেতা পলা জানিয়েছে, যতক্ষণ না বরফাবৃত পাহাড়ের সারির দেখা না মিলবে, ততক্ষণ চলবে পথচলা। বিষণ্ণ বদনে, ক্লান্ত পদক্ষেপে চলেছি অজানা গন্তব্যে, চলৎশক্তি বোধ হয় রহিত হয়ে যাচ্ছে। নিকি-পলা হাইলি টেম্পটেড। পাহাড়ি যুবক নরেন নতুন বান্ধবীর সাথে অধিকতর টেম্পটেড। আমি আমার শারীরিক দুর্বলতার কথা লজ্জায় কাউকে জানাচ্ছি না।

আমার নিজের দুর্বলতার কারণে গোটা জাতির মানসম্মান, শৌর্যবীর্য ধূলিসাৎ হয়ে যাক, তা আমি হতে দিতে পারি না। তবে খুবই চিন্তিত—কীভাবে নিচে নামব? পাহাড়ি পথ সমতলের মানুষের জন্য খুব সুবিধার নয়। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি মাত্র সতেরোজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে আকস্মিকভাবে বাংলার স্বাধীন রাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদ তোরণে এসে হাজির হলে, সেনবাবু প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নগ্ন পায়ে নৌকাযোগে পলায়ন করে জীবন রক্ষা করেছিলেন। খলজি সাহেবের সৈন্যবাহিনী আরও পরে এসে তাঁর সাথে যোগ দেয়। এই বিজয়ে অধিকতর টেম্পটেড হয়ে খলজি সাহেব উত্তরবঙ্গ পেরিয়ে নেপাল-ভূটানের মাঝ বরাবর সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করে তিব্বত জয় করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু হায়—পাহাড়ি পথ সম্পর্কে খলজি সাহেবের ধারণা ছিল না। দশ হাজার (মতান্তরে বারো হাজার) সৈন্য নিয়ে তিব্বত অভিযানে গিয়ে পরাজিত-রণক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে মাত্র একশত সৈন্যসহ বাংলা মুলুকে আবার ফিরে আসতে পেরেছিলেন। আমিও পাহাড়ি পথের আপদবিপদ সম্পর্কে চিন্তা করে যারপরনাই বিচলিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। শুধু নিজের শরীরটাকে কোনোরকমে টেনে নিয়ে চলেছি। আর প্রার্থনা করছি—হে রাহমানুর রাহিম, এ যাত্রায় আপনি আমাকে রিসোর্টে পৌঁছে দিন, আর কোনোদিন অন্যের মন্ত্রণা-প্রেরণা-প্রণোদনায় ট্রেকিংয়ে বের হব না।

চার ঘণ্টা হেঁটে বেশ খানিকটা হাই অলটিচুডে পৌঁছে গেছি। অক্সিজেন ঘাটতির কারণে নিশ্বাসে কিছুটা অস্বস্তি অনুভূত হচ্ছে। আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য, বেশ উঁচু এক পাহাড়ের প্রশস্ত চূড়ায় আসন গ্রহণ করেছি। আমাদের গাইড—নগেন বাহাদুর বসেছেন মাটিতে আর আমরা চাদরে। তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক-সহায়ক বটে, তবে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে আমাদের সাথে তার বসার কথাও নয়!

নিকি-নরেনকে দেখে বোঝা যায় না যে, তাঁরা গতকালই পরিচিত হয়েছে। মনে হয় বহুদিনের পরিচিত, বরং আমিই অনেকটা তাঁর সাথে নতুন পরিচিত। নরেন আজ আমার সাথে খুব কম কথাই বলেছে। নিকিকে নিয়েই সে আনন্দিত-আহ্লাদিত-উদ্বেলিত।

দূরে দেখা যায়, বরফাবৃত পাহাড়ের সারি। গতকাল রিসোর্টের ব্যালকনি থেকে যে পর্বতমালা দেখেছি, এটা সেটাই। তবে পর্বতমালাকে আরও অনেক কাছে মনে হয়। নয়ন জুড়িয়ে যায়। হৃদয়ে দোলা লাগে। পাহাড়ের সেই ডাক আবারও শুনতে পাচ্ছি। আকস্মিকভাবেই উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঁচিয়ে চিৎকার দিলাম। নগেন বোকার মতো হাসল। সাথে পলাও। নিকি আর নরেন খুব কাছাকাছি বসে। নিকির কণ্ঠস্বর—‘হোয়াট হ্যাপেন্ড?’ অনুভব করলাম, পাহাড়ের ডাকে আমার মধ্যে আবারও কেউ যেন একজন জেগে উঠেছে। সে আমাকে ঠেলে দিতে চায় পাহাড়ের বুকে। কী এক অদ্ভুত অনুভূতি, কেন এমন হয় জানি না। মনে হলো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি। চোখ বন্ধ করে দুই হাত শরীরের দুই পাশে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। যোগাসন করে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে। বেশ কিছুটা সময় পার করে আবারও উঠে বসলাম হিমালয়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার জন্য।

আবারও একই পথে নেমে আসলাম রিসোর্টে, তখন সন্ধ্যা। আমারই জন্য সকলের দেরি হয়েছে। নগেন বাহাদুর একবার আমাকে ঘাড়ে করে নামাবার প্রস্তাব করেছিলেন। লজ্জায় সে প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারিনি। তবে রিসোর্টে এসে মনে হলো আগামীকাল হেঁটে গাড়িতে উঠতে পারব কি না সন্দেহ। কিছুক্ষণ পর আরও অসুস্থ হয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল পা দুটো আর শরীরের সাথে নেই।

নরেনের পরামর্শে ওরই ঘাড়ে ভর করে রিসোর্টের ম্যাসাজ পার্লারে গেলাম। সেটাও জীবনের প্রথমবারের মতো অভিজ্ঞতা। ‘অয়েল ম্যাসাজ’, বাংলায় যাকে বলে ‘তৈল মর্দন’। পুরো এক ঘণ্টা অপরিচিত নারীর হাতের ছোঁয়ায় ক্রমেই পদযুগলে অনুভূতি ফিরে আসতে শুরু করল। অনুভূতি একপর্যায়ে অনুপম বলেই মনে হতে লাগল। এই লেখা পড়ে কুসুমের কী অনুভূতি হবে জানি না, তবে প্রার্থনা করি আমার মঙ্গল কামনায় সে আমাকে ক্ষমাই করবে।

এক ঘণ্টার সেশন শেষে নরেনের ঘাড়ে ভর করে নয়, নিজের পায়ে হেঁটেই ঘরে ফিরলাম। সে রাতে ঘরে বসেই খেয়েছিলাম। প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়লাম।

দরজায় টুক টুক শব্দ। ঘুম ভেঙে দেখি নরেনের বিছানায় নরেন নেই। নরেনের বিছানায় বালিশের সাথে চাদর এমনভাবে সেঁটে রাখা হয়েছে যে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে নরেন যেন কম্বলে মাথা মুড়িয়ে শুয়ে আছে। রাত নিশ্চয়ই গভীর, নরেন কোথায়? দরজায় কে? নরেন নিশ্চয় দরজায় টোকা দেবে না। হোটেলের রুম সার্ভিস থেকেও এত রাতে কেউ আসতে পারে না। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, উঠব কি উঠব না ভাবছি।

আবারও টোকা। ক্লান্ত শরীরে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই চমকে গেলাম। বিস্মিত-হতচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, পলা। হাতে পানীয় ভর্তি গ্লাস। পলার শরীরে নাইট ড্রেস। বাম হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরে একেবারে কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—‘হাই বেবে, লেটস ডু লাভ।’

গতকাল পরিচয়পর্বেই নিকির প্রতি নরেনের আগ্রহ, সারাদিন দুজনের মাখামাখি, আর এখন এই মাঝরাতে নরেনের অনুপস্থিতি—সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘সরি পলা, আই অ্যাম লয়াল টু মাই ওয়াইফ।’

আমার কথা শুনে পলা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওই আমেরিকান বোধ হয় তার চল্লিশ বছরের জীবনে এমন বেরসিক মানুষের দেখা পায়নি। কিন্তু ও এখন যাবে কোথায়? ওর কক্ষ তো নিকি আর নরেনের দখলে। যে পোশাকে ও আছে, তাতে ওকে রিসেপশনে নিয়ে যাওয়াটাও খুব শোভন হবে না। পলা বোধ হয় অনেক বেশি তরল গিলেছে। ভালোভাবে তাকাতেও পারছে না। ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে নরেনের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রিসেপশনে চলে গেলাম।

পুনশ্চ: সেদিন রাতে আরও এক ঘণ্টা পরে রুমে গিয়ে দেখি, পলা নেই। নরেন তার নিজ বিছানায় ঘোরে অথবা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমি আমার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নরেন এমনভাবে ‘গুড মর্নিং’ জানাল যে, গতকাল রাতে কিছুই হয়নি।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments