বাঙালি নৃগোষ্ঠীর উৎপত্তি ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

মোল্লা মুতাসিম বিল্লাহ

প্রারম্ভিকতা

বাঙালি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ভাষা ভিত্তিক জনগোষ্ঠী। হাজার বছরের ইতিহাসে এই বঙ্গভূমি ছিল নানা জনগোষ্ঠীর মিলনস্থল। ফলে বাঙালি কোন একক জাতিগত গোষ্ঠীর উত্তরসূরি নয়, বরং এটি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও ভাষার দীর্ঘকালীন সংমিশ্রণের ফল। ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণের কাছে হযরত নূহ (আ.)-এর প্লাবনের পর পৃথিবীতে মানবজাতির নতুন করে বিস্তার লাভ একটি সুপরিচিত ও সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। পবিত্র কুরআনের সূরা আস-সাফফাতের ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “এবং আমি তাঁর (নূহের) বংশধরদেরই অবশিষ্টাংশ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছি।”

এই আয়াতের সমর্থনে সালাফদের বহু নির্ভরযোগ্য বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী তাঁর তারীখুত তাবারী গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি বলেন: “প্লাবনের পর নূহের বংশধারা ব্যতীত আর কেউ (পৃথিবীতে) টিকে ছিল না।” তদ্রূপ, তাফসীর আল-ওয়াসীত (মাজমাউল বুহুস)-এ বর্ণিত হয়েছে: “নূহের পুত্র ছিলেন তিনজন এবং বর্তমান সমগ্র মানবজাতি তাঁদেরই বংশধর… অধিকাংশ আলিমের মতেই প্লাবনের পর বেঁচে থাকা সব মানুষ নূহেরই উত্তরসূরি।”[1]ইবনে কাসির – কুরআনের সূরা আস-সাফফাতের ৭৭ নম্বর আয়াতের তাফসির। তারীখুত … Continue reading

প্রাচীন ইতিহাস ও তাফসীর গ্রন্থসমূহের এই বর্ণনা অনুযায়ী, প্লাবন-পরবর্তী মানবসমাজ মূলত নূহ (আ.)-এর তিন পুত্র—সাম, হাম ও ইয়াফেসের মাধ্যমেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে এবং তাদের যে পুত্র যে স্থানে গিয়ে বসতি করেছেন সে স্থানের নাম তার নামানুসারে রাখা হয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ বর্ণনা করেছেন যে, নূহ আ. এর ছেলে হাম তাঁর বাবার অনুমতি নিয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে বসতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য তিনি তাঁর ছেলেদের বিভিন্ন দিকে মানুষের বসতি স্থাপন করতে পাঠান। তার প্রথম পুত্র হিন্দ ও দ্বিতীয় পুত্র সিন্দ এ উপমহাদেশে আসার দরুন এখানকার নাম হিন্দ থেকে হিন্দুস্তান হয়েছে এবং সিন্দ থেকে সিন্ধু দেশের নামকরণ হয়েছে। এভাবে হিন্দের পুত্রগণও যেখানে গিয়ে বসতি করেছেন তাদের নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয়েছে। যেহেতু হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম বঙ্গ এবং তিনি বাংলায় এসে বসতি করেছিলেন তাই উক্ত এলাকার নাম বঙ্গ হয়ে যায়। আদিতে বাংলার নাম ছিল বঙ্গ।[2]গোলাম হোসেন সলীম জাইদপুরী — ‘রিয়াজুস-সালাতিন’, এশিয়াটিক সোসাইটি অব … Continue reading

 

নিষাদ সংস্কৃতির আদিপর্ব

নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের সুচিন্তিত অভিমত অনুযায়ী, বাংলা অঞ্চলের প্রাচীনতম আদিবাসীদের সিংহভাগই ছিলেন ‘নিষাদ’ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। প্রাক-আর্য যুগের এই অস্ট্রিকভাষী নিষাদ জাতিই মূলত বাঙালি সংস্কৃতির আদি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা বিধৌত এই বঙ্গীয় ভূখণ্ড ছিল অববাহিকাজাত নদীমাতৃক, পলিগঠিত এবং চরম উর্বর। এই প্রাকৃতিক প্রাচুর্য ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে অঞ্চলটি যেমন কৃষি ও মানববসতির জন্য আদর্শ ছিল, তেমনি তা যুগে যুগে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের যাযাবর ও অভিযাত্রী জনগোষ্ঠীকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে। ফলস্বরূপ, এখানকার মূল আদিবাসীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর নানা দিক থেকে নতুন নতুন মানবগোষ্ঠীর আগমন ঘটে এই জনপদে। আগমনকারী এই বহিরাগত ধারাগুলোর সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের যে নিবিড় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শারীরিক মেলবন্ধন ঘটে, তার মধ্য দিয়েই কালক্রমে একটি অনন্য ও নতুন জাতিগত রূপরেখা তৈরি হয়।[3]ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং … Continue reading

ভাষাতাত্ত্বিক ও আর্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঐতিহাসিকদের ধারাবাহিক কালপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিষাদ জাতির বসতির পর এই বাংলা অঞ্চলে এসে আগমন শুরু করে ‘দ্রাবিড়’ ও ‘আলপাইন’ নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। দ্রাবিড়দের উন্নত নগর ও কৃষিসভ্যতা এবং আলপাইনদের সাংস্কৃতিক উপাদান স্থানীয় জনপদের সাথে মিলে একাকার হয়ে যায়। এই মিশ্রণের পর আসে বৈদিক যুগের শেষ ভাগে এসে ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের বিজয়রথ। আর্যদের আগমন ঘটে এই প্রাচ্য ভূমিতে। আর্যদের ভাষা, ধর্ম ও সামাজিক স্তরবিন্যাস পূর্ববর্তী নিষাদ ও দ্রাবিড় সংস্কৃতির ওপর এর গভীর প্রভাব ফেলে। তবে আর্যরা বাংলায় আসার আগে ও সমসাময়িক সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারত, তিব্বত এবং দূরপ্রাচ্যের মঙ্গোলীয় অঞ্চল থেকে বিভিন্ন মঙ্গোলীয় বা ‘ভোট-চীন’ উপজাতির মানুষ বাংলার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। ফলে কোচ, মেচ, গারো, হাজং প্রভৃতি মঙ্গোলীয় রক্তধারাও বাঙালির জাতিগত গঠনে যুক্ত হয়।[4]ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘Bengali Philology’, ঢাকা … Continue reading

 

ইসলামের আগমন ও ডেমোগ্রাফিক রূপান্তর

দ্বাদশ দ্বিতীয় শতক থেকে এসে বাংলার জনসংখ্যা ও সমাজতত্ত্বে এক যুগান্তকারী এবং নতুন রক্তধারার মিশ্রণ ঘটে। এ সময়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সুফি-সাধকদের ধর্মপ্রচারের হাত ধরে আরব ভূখণ্ড থেকে ‘সেমেটিক’ আরব গোত্রের মানুষেরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। আরব মুসলমানদের এই আগমন বাঙালি জাতিকে দ্রুত কেবল একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসের সংযোগই ঘটায়নি, বরং এর ফলে এ অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য, পোশাক এবং রন্ধনশিল্পেও এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক সাংস্কৃতিক রূপান্তর বা মেলবন্ধন ঘটে। মধ্যযুগের এই মিশ্রণেই বাঙালি জাতি এক নতুন ও মহাসমৃদ্ধ বৈশ্বিকমুখী সভ্যতার দিকে ধাবিত হতে থাকে। আফ্রিকান দাস ও হাবশি উপাদান সংযোজন ইতিহাসের এক জটিল প্রক্রিয়ায় এই আরব সেমেটিকদের আমলেই আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল হতে কিংবা আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রসারের সূত্রে এই বাংলায় আসছিলেন। ফলে তাঁরা নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন রহস্যঘেরা আফ্রিকান হাবশি বা দাসদের। পরবর্তীতে এদের অনেকেই সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, এমনকি বাংলায় এক সময় হাবশি রাজবংশের শাসনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর সুন্দর প্রমাণ যখন জিলহজ, ফাল্গুনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশ্রণের মাধ্যমে বাঙালি রক্তে ‘সোমালি’ বা কৃষ্ণকায় আফ্রিকান রক্তের উপাদানও আংশিকভাবে যুক্ত হয়।[5]ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘Bengali Philology’, ঢাকা … Continue reading [6]ড. মুহম্মদ এনামুল হক — ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’, বাংলা একাডেমি (ঢাকা) পৃষ্ঠা: … Continue reading

 

বঙ্গভূমির ভৌগোলিক অবস্থান ও জনগোষ্ঠীর আগমন

যেহেতু বঙ্গভূমি উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এটি চিরকাল নানা জনস্রোতের মহাসড়ক হিসেবে কাজ করেছে। তাই প্রাচীন অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং আর্য ধারার সমান্তরালে বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এর একেক অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের আগমন ও স্থায়ী বসবাস ঘটেছে। ফলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা নৃগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়, যা সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়াতেই ফলপ্রসূ।[7]ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং … Continue reading

 

সিলেট অঞ্চল: তিব্বত-বর্মী ধারার চিহ্ন

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এবং অবস্থান ভারতের মেঘালয় ও আসামের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। এই অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক গঠনে তিব্বত-বর্মী রক্তধারার স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। আসাম ও তিব্বত-বর্মী অঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতির রক্ত ও সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে এখানকার মূল অধিবাসীদের সাথে। এছাড়া মণিপুরি, খাসিয়া, পাত্র বা গারো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থান এই অঞ্চলের মানুষের দৈহিক গঠনে একটি স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে।[8]ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। … Continue reading [9]সৈয়দ মুর্তজা আলী — ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’, ঢাকা পৃষ্ঠা: … Continue reading

 

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম: আরাকানি, বার্মিজ ও আদিবাসী ধারা

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম এবং এর সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস সাধারণ ভূমি থেকে অনেকটাই আলাদা। দীর্ঘকাল ধরে মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলের সাথে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় এখানকার সাধারণ মানুষের নৃ-তাত্ত্বিক গঠনে আরাকানি ও বার্মিজ মিশ্রণ বিদ্যমান। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে তাদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে, যা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও মঙ্গোলীয় ধারাকে ধারণ করে।[10]মাহবুবুল আলম — ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’, চট্টগ্রাম পৃষ্ঠা: ৪২-৪৫। … Continue reading

 

দক্ষিণবঙ্গ: বিদেশি বণিকদের রক্ত-মিশ্রণ

বাংলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চলগুলো সুপ্রাচীনকাল থেকেই ছিল বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, আরব ও পারস্যের বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এই উপকূলীয় অঞ্চলে আসত এবং অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল। এর দীর্ঘকালীন আদানপ্রদান ও স্থানীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের রক্ত, চোখের মণি বা দৈহিক উচ্চতায় এক ধরনের মিশ্র বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।[11]মাহবুবুল আলম — ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’, চট্টগ্রাম পৃষ্ঠা: ৪২-৪৫। … Continue reading [12]ড. মুহম্মদ এনামুল হক — ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’, বাংলা একাডেমি, ঢাকা … Continue reading

 

জিনগত ও ডিএনএ গবেষণায় বাঙালি নৃগোষ্ঠীর উৎপত্তি

বাঙালি জিন-পুলের সবচেয়ে গভীর ও প্রাচীন স্তর হলো Ancient Ancestral South Indian (AASI) উপাদান। জিনোম-ব্যাপী গবেষণা এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে বাঙালি জিন-পুলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই AASI উপাদান দিয়ে গঠিত, যা দক্ষিণ ভারতের অনেক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পাওয়া যায়।[13]Chaubey, G. et al. (2011) — Pastoralists or Iranian Farmers”, Cell, Vol. 179, Issue 3, পৃষ্ঠা: ৭২৯-৭৩৫। ওয়েবসাইট লিংক: Cell Journal … Continue reading

AASI উপাদান — সবচেয়ে প্রাচীন স্তর: এই AASI বংশধারা প্রায় ৪০,০০০ বছর খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি পশ্চিম ইউরেশীয় গোষ্ঠী থেকে আলাদা — বরং প্রাচীন পূর্ব ইউরেশীয়দের, যেমন আন্দামানি ওঙ্গি ও পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর সাথে এর জিনগত নৈকট্য বেশি। Y-ক্রোমোজোমে দেখা গেছে বাঙালি পুরুষদের মধ্যে ইন্দো-ইউরোপীয় ও মধ্য এশীয় প্রভাব বিদ্যমান এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণে বাঙালি নারীদের মধ্যে কিছু হ্যাপ্লোগ্রুপ পাওয়া গেছে যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং নিকট-প্রাচ্য পর্যন্ত প্রসারিত।[14]ড. জিনাত হুদা — ‘নৃতত্ত্ব ও বাঙালি জাতিসত্তা’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় … Continue reading

অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও পূর্ব-এশীয় উপাদান: প্রায় ৭,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাভাষীরা বঙ্গে আসতে শুরু করে। তারা সাথে করে ধান চাষের কৌশল এবং একটি স্বতন্ত্র জিনগত স্বাক্ষর নিয়ে আসে। উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রভাব অনেক বেশি স্পষ্ট। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, PLOS Genetics-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে বাঙালি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র জনগোষ্ঠী যাদের মধ্যে পরিমাপযোগ্য পূর্ব-এশীয় জিনগত উপাদান পাওয়া যায় — এটি বাঙালিকে অন্যান্য ইন্দো-আর্য ভাষাভাষী গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে। বাংলার অভ্যন্তরেও এই বৈচিত্র্য আঞ্চলিকভাবে দৃশ্যমান। পশ্চিম থেকে পূর্বে পূর্ব-এশীয় বংশধারার একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ করা গেছে — আধুনিক বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে এই উপাদান তুলনামূলকভাবে বেশি, যা তিব্বত-বর্মী জনগোষ্ঠীর সাথে দীর্ঘকালীন মিথস্ক্রিয়ার ফল।[15]Mondal, M. et al. (2016) — ‘Genomic analysis of Andamanese provides insights into Shifting South Asian ancestral populations’, Nature Genetics / PLOS Genetics (Bengal Cluster). … Continue reading

ইন্দো-আর্য বা স্তেপ-যাযাবর উপাদান: Narasimhan et al. (2019)-এর একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বেশিরভাগ দক্ষিণ এশীয়ের মধ্যে স্তেপ-যাযাবরদের থেকে প্রাপ্ত বংশধারা দশ শতাংশের কম থেকে বিশ শতাংশের কিছু বেশি পর্যন্ত বিদ্যমান। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে এই স্তেপ-বংশধারা ইন্দো-আর্য ভাষার বিস্তারের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত — অর্থাৎ যেখানে স্তেপ-বংশধারা আছে সেখানেই ইন্দো-আর্য ভাষার বিস্তার ঘটেছে।[16]Narasimhan, V. M. et al. (2019) — Narasimhan, V. M., et al. (2019) — “The formation of human populations in South and Central Asia”, Science, Vol. 365, Issue 6457, পৃষ্ঠা: … Continue reading তবে পুরোনো তত্ত্বকে সংশোধন করে আধুনিক গবেষণা দেখিয়েছে যে স্বাত উপত্যকায় (পাকিস্তান) ১২০০-৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আগে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো সমাধিতে স্তেপ-বংশধারার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। Y-ক্রোমোজোমের R1a-Z93 হ্যাপ্লোগ্রুপ — যা ইন্দো-আর্য অভিবাসনের চিহ্নিতকারী — ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আগের কোনো দক্ষিণ এশীয় নমুনায় পাওয়া যায়নি। হরপ্পা সভ্যতার জিনোম বিশ্লেষণে (Shinde et al., 2019) দেখা গেছে যে সিন্ধু সভ্যতার মানুষের মধ্যে স্তেপ-বংশধারা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল — যা প্রমাণ করে আর্যরা হরপ্পা সভ্যতার পতনের পরে এসেছিল, আগে নয়।[17]Shinde, V. et al. (2019) — ওয়েবসাইট লিংক: PLOS Genetics – Bengali Genomic Study ‘An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian … Continue reading

পশ্চিম ও মধ্য এশীয় উপাদান (মধ্যযুগীয় স্তর): মধ্যযুগের প্রথম দিকে সেমীয় আরবি গোত্রের মুসলিম বণিক, সুফি সাধক এবং পরবর্তীতে তুর্কি ও পারসিয়ান প্রশাসকদের আগমনে পশ্চিম ও মধ্য এশীয় বংশধারার একটি নতুন স্তর বাঙালির জিনে যুক্ত হয়। এই প্রভাব অঞ্চলভেদে ও সামাজিক শ্রেণিভেদে ভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়। ইরানীয় কৃষিজীবী উপাদান যা সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেছিল বাঙালির জিনে একটি উল্লেখযোগ্য তৃতীয় উপাদান হিসেবে বিদ্যমান। গবেষণায় দেখা গেছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় ইরানীয় কৃষিজীবী-সংক্রান্ত বংশধারা ইরান মালভূমির মূল রেখা থেকে বারো হাজারেরও বেশি বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেমীয় আরবি গোত্রের মানুষদের অনুসরণ করে আফ্রিকার নেগ্রিটো রক্তবাহী হাবশিরাও একসময় এ দেশে প্রবেশ করে। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে বেশ কয়েকজন হাবশি সুলতান বাংলায় রাজত্বও করেছিলেন। অবশ্য দিল্লি ও আগ্রার অনুকরণে এ দেশে হাবশি প্রহরী রাখার প্রথা চালু হয়েছিল খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর অনেক আগেই। তারাও বাঙালি রক্তের সঙ্গে নেগ্রিটো রক্তের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। যার ফলে, বাঙালিদের মধ্যে আজও গভীর কৃষ্ণবর্ণ, চওড়া নাক, কোঁকড়া চুল ও পুরু উল্টানো ঠোঁটের মানুষ দেখলে সেই নেগ্রিটো রক্তের কথাই মনে পড়ে যায়।[18]Shinde, V. et al. (2019) — ওয়েবসাইট লিংক: PLOS Genetics – Bengali Genomic Study ‘An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian … Continue reading

 

প্রাচীন বাংলা: প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও সাহিত্যের আলোকে বাঙালি নৃগোষ্ঠী

সাধারণত ধারণা করা হতো বাংলার সভ্যতা খুব বেশি প্রাচীন নয়, কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য এই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন প্রমাণ করেছে যে, খ্রিষ্টপূর্ব হাজার বছর আগেই (নব্যপ্রস্তর যুগে) বাংলায় মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং কৃষিকাজের সূচনা করেছিল।

উয়ারী-বটেশ্বর (নরসিংদী): এখানকার আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দে) বাংলায় একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, পরিকল্পিত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল।[19]ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান — উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য … Continue reading

মহাস্থানগড় (বগুড়া) ও ময়নামতি (কুমিল্লা): মহাস্থানগড় বা প্রাচীন ‘পুণ্ড্রনগর’ ছিল মৌর্য ও গুপ্ত আমলের প্রাদেশিক রাজধানী। অন্যদিকে ময়নামতি ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এগুলো প্রমাণ করে যে, উত্তর ও পূর্ব বাংলায় সুসংগঠিত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কাঠামো প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল।[20]ড. মুহম্মদ আবদুল কাদির — ‘মহাস্থানগড় ও ময়নামতির প্রত্নতত্ত্ব’, … Continue reading

 

প্রাচীন সাহিত্য: অনার্য জনপদ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যগুলোতে যখন বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায়, তখন তা মূলত এই অঞ্চলের মানুষের এক স্বতন্ত্র জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়। ঋগ্বেদের ঐতরেয় আরণ্যক বা অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যে ‘বঙ্গ’ বা ‘পুণ্ড্র’ জনগোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়। তবে আর্যরা (যারা উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে এসেছিল) বাংলার আদি অধিবাসীদের ‘অনার্য’ (নন-আর্য) এবং তাদের ভাষাকে ‘পাখির ভাষা’ বলে অবজ্ঞা করত। কারণ বাংলার মানুষ তখন আর্যদের বৈদিক ধর্ম বা জাতিভেদ প্রথা মানত না, বরং তাদের নিজস্ব অস্ট্রিক বা দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতি ছিল।[21]ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। … Continue reading

পরবর্তীতে রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পুরাণে বাংলার রাজ্যগুলোর (যেমন: বঙ্গ, পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত) রাজনৈতিক গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে। মহাভারতের যুদ্ধে বঙ্গরাজের পরাক্রম এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর হাতি বাহিনীর অংশগ্রহণের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন ভারতের রাজনীতিতে বাংলার রাজারা বেশ শক্তিশালী ছিলেন।[22]ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং, … Continue reading

 

বৌদ্ধ জাতকগ্রন্থ: সমুদ্রবাণিজ্য ও বৈশ্বিক যোগাযোগ

প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বহির্বিশ্বের সাথে এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান লিখিত উৎস হলো বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ করে জাতক গল্পসমূহ। এই জাতকগ্রন্থগুলোতে প্রাচীন বাংলার নৌ-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক প্রাণবন্ত ও চমৎকার বিবরণ মেলে। তৎকালীন সময়ে প্রাচীন বাংলার ‘তাম্রলিপ্ত’ (যার বর্তমান অবস্থান ভারতের তমলুক) ছিল একটি বিশ্ববিখ্যাত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। জাতকগ্রন্থের বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায় যে, বাংলার দুঃসাহসী বণিকরা এই বন্দর থেকে বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুদূর সুবর্ণভূমি (যা বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড জুড়ে বিস্তৃত) এবং সিংহলে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) বাণিজ্য করতে যেতেন। বাংলার এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় নৌ-বাণিজ্যের হাত ধরেই এ দেশের বিখ্যাত মসলিন কাপড়, চাল এবং অন্যান্য উৎপাদিত সামগ্রী বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাদৃত হয়েছিল। এই সুপ্রাচীন সামুদ্রিক যোগাযোগ কেবল অর্থনৈতিক লাভই আনেনি, বরং প্রাচীন বাংলার সাথে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির এক গভীর আদান-প্রদানও ঘটিয়েছিল।[23]ড. আবদুল করিম — ‘বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল)’, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (বৌদ্ধ … Continue reading

 

ঔপনিবেশিক নৃতত্ত্বের পক্ষপাত

ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদরা, বিশেষত রিজলি, সাম্রাজ্যবাদী শাসনের স্বার্থে বাঙালি জাতির একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও অবৈজ্ঞানিক রূপরেখা নির্মাণ করেন। তারা শারীরিক পরিমাপের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহার করে বাঙালিকে “নিম্নমানের জাতি” হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সমাজে কৃত্রিম “উচ্চতর আর্য” ও “নিম্নতর অনার্য” বিভাজনের ধারণা প্রচার করেন।[24]ড. আকবর আলি খান — ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’ (Discovery of Bangladesh), ইউনিভার্সিটি প্রেস … Continue reading

একই সঙ্গে বাংলার গতিশীল সংস্কৃতি, স্থানীয় জ্ঞানব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ মৌখিক ইতিহাসকে উপেক্ষা করে সমাজকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এর ফলে ব্রিটিশরা তাদের শাসন ও শোষণকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পায়, বাঙালি সমাজে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীর হয় এবং “ভাগ কর ও শাসন কর” নীতি আরও কার্যকর হয়। পাশাপাশি বাঙালির প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয় এবং বাস্তব ইতিহাস আড়ালে থেকে যায়।

 

পরিশেষে

তাই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস কোনো একক জাতির ইতিহাস নয় — এটি বহু জনস্রোতের মিলনের, বহু সংস্কৃতির আলিঙ্গনের এবং বহু যুগের সংশ্লেষণের ইতিহাস। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের আদিম বসতি থেকে শুরু করে আর্যদের আগমন, বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ, মুসলিম শাসন, মুঘল সংস্কৃতির পরশ এবং ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিটি পর্যায়ে বাংলা নতুন উপাদান গ্রহণ করেছে এবং নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছে। এই সংমিশ্রণ কোনো বাহ্যিক চাপের ফল নয়, বরং বাংলার ভৌগোলিক খোলামেলা অবস্থান ও নদীমাতৃক প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে বাঙালিকে নৃতাত্ত্বিক অর্থে “সংকর জাতি” বলা অসংগত নয় — বরং এটিই সত্য। তবে “সংকর” শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে দেখার কোনো কারণ নেই। আধুনিক নৃতত্ত্ব ও জিনবিজ্ঞান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো জাতিই “বিশুদ্ধ” নয় — সব জাতিই কোনো না কোনো মাত্রায় সংকর। পার্থক্য কেবল মিশ্রণের গভীরতায় ও বৈচিত্র্যে। সেই মানদণ্ডে বাঙালি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংকর জাতিগুলোর একটি, কারণ এই মিশ্রণ ঘটেছে হাজার হাজার বছর ধরে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, একটি উর্বর ও উন্মুক্ত ভূমিতে।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 ইবনে কাসির – কুরআনের সূরা আস-সাফফাতের ৭৭ নম্বর আয়াতের তাফসির। তারীখুত তাবারী – কুরআনের সূরা আস-সাফফাতের ৭৭ নম্বর আয়াতের তাফসির।
2 গোলাম হোসেন সলীম জাইদপুরী — ‘রিয়াজুস-সালাতিন’, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, পৃষ্ঠা: ১১০-১১১। (এই গ্রন্থে পারস্য ও প্রাচীন ঐতিহ্যের সূত্রে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পৌত্র ‘বঙ্গ’ কর্তৃক এই অঞ্চলের নাম ‘বঙ্গ’ বা বাংলা হওয়ার ঐতিহাসিক বিবরণ এবং পরবর্তী হাবশি সুলতানদের শাসনের বিবরণ সংকলিত হয়েছে)।
3 ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং হাউস (ঢাকা) পৃষ্ঠা: ১২-১৪। (প্রাক-আর্য ও নিষাদ সংস্কৃতির প্রাচীন নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যায়)।
4, 5 ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘Bengali Philology’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (আর্য, দ্রাবিড় এবং অস্ট্রিক ভাষার সংমিশ্রণ প্রক্রিয়ার ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)।
6

ড. মুহম্মদ এনামুল হক — ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’, বাংলা একাডেমি (ঢাকা) পৃষ্ঠা: ৫৬-৫৯। (মধ্যযুগে সুফি-সাধক এবং আরবীয়দের আগমনে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির বৈপ্লবিক রূপান্তরের বিস্তারিত উৎস)। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, মাওলা ব্রাদার্স (ঢাকা) পৃষ্ঠা: ৩৫-৩৮। (এখানে তিনি বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গঠন ও ভাষার মিশ্রণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন)।

7 ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা। (বাংলার ভৌগোলিক গঠন কীভাবে আদিম জনস্রোত ও বিভিন্ন উপজাতির বসতি স্থাপনকে প্রভাবিত করেছে, তার বিশদ বিবরণ রয়েছে)।
8 ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। (উত্তরবঙ্গের কোচ, রাজবংশী ও মঙ্গোলীয় ধারার নৃগোষ্ঠীগত ও ভাষাতাত্ত্বিক মিশ্রণের আলোচনা)।
9 সৈয়দ মুর্তজা আলী — ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’, ঢাকা পৃষ্ঠা: ২৪-২৭। (সিলেট অঞ্চলের সীমান্ত সংলগ্ন আসাম ও খাসিয়া পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীর সহাবস্থান ও মিশ্র ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক দলিল)।
10, 11 মাহবুবুল আলম — ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’, চট্টগ্রাম পৃষ্ঠা: ৪২-৪৫। (চট্টগ্রামের প্রাচীন বাণিজ্যিক ইতিহাস, আরাকান-বার্মিজ সম্পর্ক এবং পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা-মারমাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের বিবরণ)।
12 ড. মুহম্মদ এনামুল হক — ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’, বাংলা একাডেমি, ঢাকা প্রাগুক্ত। (দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে আরব, পারস্য ও অন্যান্য বিদেশি বণিকদের আগমন, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং স্থানীয়দের সাথে তাদের বৈবাহিক ও রক্ত-মিশ্রণের আলোচনা)।
13 Chaubey, G. et al. (2011) — Pastoralists or Iranian Farmers”, Cell, Vol. 179, Issue 3, পৃষ্ঠা: ৭২৯-৭৩৫। ওয়েবসাইট লিংক: Cell Journal – Harappan Genome Study ‘Population Genetic Structure in Indian Austroasiatic Speakers’, The American Journal of Human Genetics. (বাঙালিদের প্রাচীন জিনগত পরিকাঠামো এবং দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে এর সম্পর্কের ওপর প্রথম সারির গবেষণা)।
14 ড. জিনাত হুদা — ‘নৃতত্ত্ব ও বাঙালি জাতিসত্তা’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা। (বাঙালির রক্তের গ্রুপ, লিঙ্গভিত্তিক হ্যাপ্লোগ্রুপ এবং মধ্য এশীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রভাবের সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)।
15 Mondal, M. et al. (2016) — ‘Genomic analysis of Andamanese provides insights into Shifting South Asian ancestral populations’, Nature Genetics / PLOS Genetics (Bengal Cluster). (বাঙালিদের মধ্যে পরিমাপযোগ্য পূর্ব-এশীয় জিনগত উপাদান ও ধান চাষের সংস্কৃতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা)।
16 Narasimhan, V. M. et al. (2019) — Narasimhan, V. M., et al. (2019) — “The formation of human populations in South and Central Asia”, Science, Vol. 365, Issue 6457, পৃষ্ঠা: ৭৪৮-৭৫০। ওয়েবসাইট লিংক: Science Journal – Central & South Asia DNA ‘The formation of human populations in South and Central Asia’, Science, 365(6457). (দক্ষিণ এশিয়ার স্তেপ-যাযাবর ও ইন্দো-আর্য সংস্কৃতির বিস্তার সংক্রান্ত যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক জিনোম গবেষণা)।
17, 18 Shinde, V. et al. (2019) — ওয়েবসাইট লিংক: PLOS Genetics – Bengali Genomic Study ‘An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers’, Cell, 179(3). (সিন্ধু সভ্যতার ডিএনএ ও আর্যদের আগমনের কালানুক্রমিক সংশোধিত তত্ত্ব)। গোলাম হোসেন সলীম জাইদপুরী — ‘রিয়াজুস-সালাতিন’, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল পৃষ্ঠা: ৩২৬-৩২৮ (হাবশি সুলতানদের বিবরণ)।
19 ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান — উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য রিপোর্ট — প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ১৫-১৮ (নরসিংদীর প্রাচীন নগর সভ্যতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পরিচালিত খননকার্যের মূল গবেষণা)।
20 ড. মুহম্মদ আবদুল কাদির — ‘মহাস্থানগড় ও ময়নামতির প্রত্নতত্ত্ব’, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ। (উত্তর ও পূর্ব বাংলার প্রাচীন সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস)।
21 ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ — ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। প্রাগুক্ত। (ঐতরেয় আরণ্যকে বাংলার অনার্য অধিবাসীদের ‘পাখির মতো ভাষা’ বলা এবং আর্যদের চোখে বাংলার প্রাচীন অস্ট্রিক-দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতির অস্পৃশ্যতার ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এখানে রয়েছে)।
22 ড. কাজী দীন মুহাম্মদ — ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড), আহমদ পাবলিশিং, ঢাকা। প্রাগুক্ত। (রামায়ণ, মহাভারত এবং পৌরাণিক সাহিত্যে বর্ণিত পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত ও বঙ্গ রাজ্যের প্রাচীন রাজনৈতিক গুরুত্ব ও মহাভারতের যুদ্ধে বঙ্গরাজের অংশগ্রহণের বিবরণ সংকলিত হয়েছে)।
23 ড. আবদুল করিম — ‘বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল)’, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। (বৌদ্ধ জাতক এবং প্রাচীন গ্রীক-রোমান ও আরব পর্যটকদের বিবরণীর আলোকে প্রাচীন বাংলার তাম্রলিপ্ত বন্দরের নৌ-বাণিজ্য, মসলিন শিল্প এবং সুবর্ণভূমির সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগের চমৎকার অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা)।
24 ড. আকবর আলি খান — ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’ (Discovery of Bangladesh), ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), ঢাকা। (এইচ. এইচ. রিজলির ‘The Tribes and Castes of Bengal’ গ্রন্থে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগের ত্রুটি ও ঔপনিবেশিক পক্ষপাতমূলক বর্ণবাদী তত্ত্বের বিজ্ঞানসম্মত ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ)।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments