কেন লিখি—এই প্রশ্নটি অনেকটা ‘কেন নিশ্বাস নিই’ বলার মতোই শোনায়। অন্তত যারা একবার এই কলম-কাগজের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছেন, তাদের জন্য। ফরাসি লেখক জ্যাঁ-পল সার্ত্র বা জর্জ অরওয়েল থেকে শুরু করে আমাদের বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত সবাই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। কেউ বলেছেন সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষা থেকে লেখেন, কেউ বলেছেন আত্মসুখের জন্য। আমার কাছে লেখালেখির তাড়নাটা একটু ভিন্ন। আমার কাছে লেখা মানে বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরগুলোকে একে একে শব্দে রূপান্তর করা। যেন দিনশেষে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কিছুটা হালকা মনে হয়।
চারপাশের নানা অস্থিরতা খেলে বুকের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তি দানা বাঁধে। যাকে সেভেন হ্যাবিটসের ভাষায় বলে ‘সার্কেল অব কানসার্ন’। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে তথ্যের প্লাবন আছে, কিন্তু সত্যের আকাল। তো আমার তো দাপট নাই, প্রভাব নাই, যাকে বলে ‘ইনফ্লুয়েন্স’ তা নাই। ফলে ‘সার্কেল অব ইনফ্লুয়েন্স’ নিয়ে ভাবি না, বরং এই যে সময়কে ধরে রাখা, সময়ের অসংগতিগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া—এটা কেবল শখ নয়, এটা একটা দায়। এই দায় যখন কলমের ডগায় এসে ভিড় করে, তখন না লিখে উপায় থাকে না।
লিখতে যে খুব ভালো লাগে, তা নয়। লেখাটা বোঝার মতো চেপে থাকে বুকে, মাথায়। লিখে ফেলতে পারলে হালকা লাগে। যখন কোনো সামাজিক অবিচার বা রাজনৈতিক কুটিলতা নিয়ে লিখি, তখন মনে হয় আমার ভেতরের এক বিশাল বোঝা কাগজের ওপর নামিয়ে দিচ্ছি। সেই লেখা যখন পাঠকের কাছে পৌঁছায়, যখন তারা সেখানে নিজেদের অব্যক্ত কথাগুলো খুঁজে পান, তখনই লেখকের প্রকৃত মুক্তি ঘটে।
আমার মনে আছে, মাদানিনগর মাদ্রাসায় পড়ি তখন। আনজার শাহ কাশ্মীরি নামের একজন ভারতীয় আলেম এলেন মাদ্রাসায়। তিনি আবার খ্যাতিমান দেওবন্দি আলেম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরির ছেলে। তিনি সেদিন সমবেত শিক্ষার্থীদের বলছিলেন, আমরা যা বলতে চাই, বা আমরা যা শিখছি তা বলার, মানুষকে জানাবার মাধ্যম দুটি: লেখা এবং বলা।
ছোট ছিলাম তো, যুক্তিবিদ্যা পড়লে যেমন লাগে, ধোঁয়া দেখলে বোঝা যাবে আগুন, তৎক্ষণাৎ মনে হয় তাইতো, তাইতো। সেদিন কাশ্মীরির কথা শুনে তেমনই লাগল।
তো কীভাবে লিখব, মানে ভাষা কোথায় পাব, সেটা অবশ্য সেসময় একটা বিরাট সংকট ছিল। একটা বাংলা অভিধান কিনলাম, সংসদ। সেটা দেখে দেখে বানান ঠিক করা শুরু করলাম। যদিও তখনো লিখতে জানি না। অরুন্ধতী রায় যেমন মাদার মেরি কাম্স টু মি বইতে ‘ভাষাজন্তুটা আয়ত্ত’ করার কথা লিখেছেন, তেমন কিছু তখনও হয় নাই, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, কোনোদিন যদি লিখতে পারি, তাহলে বানান বিষয়টা আমার লাগবে, ভুল বানান হলে লোকে লেখা পড়তে চাইবে না।
স্মৃতি অনেক সময় বড় ভারী হয়ে দাঁড়ায়। ফেলে আসা দিন, চেনা মুখ আর হারিয়ে যাওয়া মফস্বলের গলিগুলো মনের কোণে ভিড় করে। সেই স্মৃতির কোলাহল অনেক সময় বর্তমানকে ছাপিয়ে যায়। যখন স্মৃতিকাতর হই বা ফেলে আসা সময়ের ধুলো ঝাড়ি, তখন যে আসলে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করি, তা নয়, বরং একরকমের সুখবোধ হয়, ভালো লাগে, যাক, এমন একটা মধুর সময় তাহলে আমারও ছিল, আমার জীবন একেবারে ফেলনা নয়।
আমার লেখায় প্রায়ই দেখা যায় সমকাল আর মহাকালের একটা দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বটা আমার ভেতরেও চলে। ব্যক্তিগত শোক, পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা কিংবা একাকিত্বের যে মুহূর্তগুলো আমরা সচরাচর কাউকে বলতে পারি না, সেগুলো যখন অক্ষরের রূপ নেয়, তখন মনের ভার অনেকটা কমে যায়। মনে হয়, এই তো—আমি একা নই, আমার শব্দগুলো আমার সাক্ষী হয়ে রইল।
তবে যা-ই বলি, আসল কথা হলো, আমার অনেক কথা আছে বলার, অনেক, অজস্র গল্প আছে, তা বলব কেমনে, কাকে বলব, কে শুনবে, বললেই কি লোকে বুঝবে? বুঝবে না। তাই লিখি। অনেক কথা আছে, যেমন করে লেখা যায়, তেমন বলা যায় না। এক লাইনে অনেক সময় এত কথা বলা হয়ে যায়, তা এক রাতে বলেও বলা হয় না।
তাছাড়া আমার আশেপাশের মানুষ জানেন, আমি প্রচুর কথা বলি। বলতেই থাকি। লোকজন বিরক্ত হয়। আমার আরও বহু আচরণে লোকে বিরক্ত। কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার যেই জিনিসটা সবাই উপভোগ করে, তা হলো আমার লেখা। আমার গদ্য। যেহেতু তেমনই বিষয়টা, তাই লিখব না কেন?
লিখতে বসলে লিখতে লিখতে অনেক যুক্তি তৈরি হয়, যা এমনি বসে থাকলে বা ভাবলে হয় না। বলার সময়ও মুখে জোগায় না। ফলে লেখাটা একরকমের ইলহাম বলা যায়। লিখতে বসলে অনেক পুরোনো দিন, অনেক আলাপ যা একদিন কোনো কারণে শুনেছিলাম, অনেক গল্প যা ভুলেও গেছি কবে মনে নাই—সব মনে পড়ে। আমার ধারণা, আমি টানা কয়েক দিন, বা কয়েক বছর লিখে যেতে পারব, বিরতি দিতে হবে না। কিন্তু সেই সময়টা কে দেবে আমাকে। জীবন ও জীবিকা লেখককে এমন শক্ত করে চেপে ধরে রাখে, নিশ্বাস নিতেই কষ্ট হয়, আর লেখা!
আরো সত্যি করে বললে, আমি লেখক কি না জানি না। ‘লেখক’ হওয়ার খুব যে আগ্রহ বা অভিলাষ আছে, তা-ও না। কিন্তু ফলে লেখার কৌশল কখনো কায়দা করে আমার শেখা হয় নাই, সাহিত্যযোগ্যতাও আমার আছে বলে মনে হয় না, ভাষার যে খেলা, শব্দের যে নানান তরঙ্গ, আমি কোনোদিনও বুঝে উঠতে পারি নাই। শুধু চেয়েছি, যেই কথাগুলো আমার মনে জাগে, যা না বললে আমাকে খোঁচায়, তা বলে যাই, তা সাহিত্য হোক না হোক, কিংবা কোনো লেখা বলেই গণ্য না হোক—কিছুই আসে যায় না।
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, একজন লেখকের বুকের বোঝা মানে কেবল তার ব্যক্তিগত দুঃখ নয়। এর মধ্যে থাকে সামষ্টিক হাহাকার। যখন দেখি মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে, যখন দেখি মানুষ মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাচ্ছে, তখন সেই সামগ্রিক ভারটা আমার ওপরও এসে পড়ে।
আমি অনলাইনে যখন লিখি, তখন দেখি মানুষের কত ধরনের প্রতিক্রিয়া। কেউ একমত হন, কেউ দ্বিমত পোষণ করেন। কেউ বলেন, ভাই, আপনি পাগল। কেউ পণ্ডিত বলে তুচ্ছ করে, আবার কারও কাজেও লাগে। যেমন, আজও সকালে একজন বললেন, ভাই, আপনার এই লেখাটা থেকে আজ মসজিদে জুমার বক্তব্য প্রস্তুত করেছি। এই যে মিথস্ক্রিয়া, এটাই প্রমাণ করে যে আমাদের সবার বুকেই কোনো না কোনো বোঝা আছে। আমরা সবাই চাই কেউ একজন আমাদের হয়ে কথা বলুক। যখন লিখি, তখন আমি আসলে অসংখ্য মানুষের বোবা কান্নার অনুবাদক হওয়ার চেষ্টা করি।
অনেকে বলেন লেখালেখি একটা শিল্প। আমি বলি লেখালেখি একটা সংগ্রাম। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। শীর্ষেন্দু পার্থিব উপন্যাসে যেমন ‘হোয়েন আই মিট মাইসেলফ’ বলে একটা আত্মজীবনীর কথা লিখেছেন, লেখাটা তেমনই মনে হয়। যেন নিজের সামনে নিজেকে মুখোমুখি করা। একটা জুতসই শব্দ খুঁজে পাওয়া, একটা নিখুঁত বাক্য গঠন করা, যার ভেতর দিয়ে বক্তব্যটা পুরোপুরি প্রকাশ পাবে—এমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বাইরের জগৎ থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই হয়। এই বিচ্ছিন্নতা একটা শান্তি দেয়। না, মনের কোণে জমে থাকা ক্লেদ মোছার শান্তি না; বরং পালানোর শান্তি। আমার কাছে লেখাটা স্কেপরুট, একটা পলায়ন পথ। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে আমার থাকতে ইচ্ছা করে না, অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো শহরে, গ্রিনল্যান্ডের মতো নিস্তব্ধ বরফের দেশ হতে পারে, যেখানে কেউ নাই, কেউই না, এমনকি একটা ক্যামেরাও না যে আমাকে লুকিয়ে দেখবে, আমার সেখানে বসে থাকতে ইচ্ছা করে—আর কখনো ফিরে আসার ইচ্ছা ছাড়াই। কিন্তু আমি তো পারি না। অনেক দায়, অনেক দায়িত্ব, মানে জীবন আর কী, মানে জীবন মানেই যেহেতু দায়িত্ব, তাই কোথাও যেতে চাওয়া মানে তো মরে যাওয়া। এইজন্য লিখি, যেন একটু সময়ের জন্য হলেও পালিয়ে থাকা যায়, সশরীরে হাজির থেকেও, মানে সবাই একটা ধোঁকা দেওয়া, সবাই দেখছে আছি, আসলে আমি নাই। আমি এখন লিখছি, লোকে দেখছে আমি অফিসে, নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করছি, আসলে মোটেও তা না, আমি পালাচ্ছি, পালিয়ে আছি।
একটা সত্যি কথা বলি, যখন লিখতে বসি, তখন কিন্তু কল্পনায় কোনো নির্দিষ্ট পাঠক থাকে না। শুরুতে থাকি কেবল আমি আর থাকে আমার অব্যক্ত যন্ত্রণা। শুনতে একটা কাব্যিক লাগছে মনে হয়। যদিও কবিতা আমি মোটেও বুঝি না, কবিতা যখন গদ্যের মতো সরল আর ধারালো হয়, তখন গদ্য ভেবেই পড়ি। যদিও বলতে লজ্জা হয়, প্রথম লেখাটা আমার ছিল কবিতাই, মানে যদি সেটা কবিতা হয় আর কি। কিন্তু যা-ই লিখি, লেখা শেষ হওয়ার পর আবার যখন পড়ি, মানে পড়তেই হয়, না পড়ে পারি না, তখন মনে হয় বুকটা হালকা হয়ে গেছে। দীর্ঘ এক যাত্রার পর যেমন পথিক বটবৃক্ষের ঠান্ডা ছায়ায় জিরিয়ে নেয়, লেখা শেষ করাটা আমার কাছে তেমনই এক প্রশান্তি।
এইটা ঠিক যে, অনেকেই প্রশ্ন করে ‘লিখে কী হয়’? যেমন, মেসে থাকতে আমার ছোট কাকা বা তার বন্ধুরা আমাকে লিখতে দেখলে বলত, লিখে কি অর্থকড়ি কিছু পাও? তখন আমি ভাবছিলাম—আসলেই তো, এত এত শব্দ খরচ করে আমি কী পাই? হ্যাঁ, পাই, যা পাই তা কোনো বস্তুগত প্রাপ্তি নয়। তা হলো মানসিক এক মুক্তি।
আমি লিখি কারণ আমি কথা বলতে চাই। আমি লিখি কারণ আমি চুপ থাকতে পারি না। আমি লিখি কারণ আমার চারপাশের দেওয়ালগুলো ভেঙে আমি একটু খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে চাই। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি লিখি যেন আমার বুকের এই ক্রমবর্ধমান বোঝাটা একটু হলেও হালকা হয়। এই অক্ষরগুলোই আমার অক্সিজেন, আমার বেঁচে থাকার রস। আমি তো পালাতে পারছি না, তাই লিখি। কী করব।