বই : কাটা ও ফুল
লেখক : ইয়াহইয়া সিনওয়ার
অনুবাদ : মনযূরুল হক
জনরা : উপন্যাস
দাম : ৬৫০৳
প্রকাশনী : ইলহাম
সেটি ছিল গ্রীষ্মের এক দমবন্ধ করা রাত। গরমে অস্থির হয়ে বারবার এপাশ-ওপাশ করছিলাম, কিন্তু ঘুম আর এল না। মাথার ওপরে ঘুরতে থাকা পাখাটাও যেন তখন নিজের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে; শীতল বাতাসের বদলে শুধু একঘেয়ে শব্দ তুলে ঘরের অস্বস্তিটাকেই আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বুঝে গেলাম, আজ আর বিশ্রাম মিলবে না। সকালে অফিসে ক্লান্ত শরীরেই যেতে হবে। তাই ভাবলাম, এই নির্ঘুম সময়টুকু অন্তত পড়াশোনার কাজে লাগানো যাক।
টেবিলের কাছে গিয়ে বাতিটা জ্বালালাম। উপন্যাসটি তখনও সেখানেই রাখা ছিল। পাশে আমার ছোট্ট নোটবুক আর কলম। যেখানে পড়তে পড়তে ভালো লাগা উদ্ধৃতি, কিংবা হঠাৎ মনে জাগা কোনো ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ লিখে রাখি।
সত্যি বলতে, পড়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ আর কী-ই বা হতে পারে! গভীর রাতের নিস্তব্ধতা আর টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলো মিলেমিশে এক অন্যরকম আবহ তৈরি করেছিল। গরমের তীব্রতাও যেন খানিকটা সহনীয় মনে হচ্ছিল। তখন মনে পড়ল, আরবি ভাষা-সাহিত্যের প্রখ্যাত পণ্ডিত মাহমুদ শাকির (রহ.) এর মতো বহু বড় লেখক রাত জেগে লিখতেন। সেই মুহূর্তে যেন বুঝতে পারলাম কেন। রাতের এই নীরবতা, এই প্রশান্তি, পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোলাহল আর তর্ক-বিতর্ক যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে মনকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। আর তার সঙ্গে থাকে এক মধুর আত্মতৃপ্তি। মনে হয় যেন আপনিও চিন্তক-সাহিত্যিকদের সেই নীরব জগতে সামান্য হলেও প্রবেশ করতে পেরেছেন। অনুভূতিটা সত্যিই অপূর্ব।
এতক্ষণে হয়তো বলা উচিত, কোন বইটি পড়ছিলাম। বইটির নাম কাঁটা ও ফুল—লেখক ইয়াহইয়া সিনওয়ার। কয়েক দিন ধরেই বইটির পাতায় পাতায় ডুবে আছি। প্রতিটি অধ্যায় আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে, যখন ফিলিস্তিনি জনগণ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। সেই ইতিহাস, সেই দীর্ঘ বেদনা আর প্রতিদিনের সংগ্রাম উপন্যাসটির মাধ্যমে যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাস পড়ে আমি শুধু ঘটনাগুলো জানিনি; বরং ফিলিস্তিনি মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছি। আর এটাই, আমার কাছে, একটি শক্তিশালী উপন্যাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আমার দৃষ্টিতে, উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি মানুষকে বিমূর্ত তত্ত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের উচ্চ আসন থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে জীবনের একেবারে ভেতরে। যেখানে রাজনীতি, সমাজ কিংবা ইতিহাস আর নিছক তথ্য হয়ে থাকে না; বরং মানুষের হাসি-কান্না, ভয়, ভালোবাসা, আশা ও হতাশার মধ্য দিয়ে সেগুলো প্রাণ পায়। শুষ্ক পরিসংখ্যান তখন রক্ত-মাংসের বাস্তবতায় রূপ নেয়। কাঁটা ও ফুল ঠিক এ কাজটিই করেছে—ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃসহ বাস্তবতাকে মানুষের অনুভূতির ভাষায় তুলে ধরেছে।
সংবাদপত্রের নিরাবেগ প্রতিবেদন থেকে অনেক দূরে সরে এই উপন্যাস আমাদের নিয়ে যায় এক ফিলিস্তিনি পরিবারের ঘরে, তাদের প্রতিদিনের জীবনে। সেখানে শিশুরা প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণের আতঙ্কে বড় হয়। মায়েরা পানির লাইনে আগে-পরে দাঁড়ানো নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। ছোট ছেলেরা “আরব আর ইহুদি” নামে খেলা খেলতে গিয়ে জেদ ধরে—জিততে হলে আরব দলকেই জিততে হবে। ছোট মেয়েরা খেলছে এক্কা-দোক্কা কিংবা দড়ি লাফ। আর যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ এক শহীদ, মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে মায়ের মুখ, স্ত্রীর স্নেহ আর কোলে ফেলে আসা দুধের শিশুটির কথা স্মরণ করতে করতে হাসিমুখে শাহাদাতের কালিমা উচ্চারণ করছে।
এই উপন্যাস আমাদের এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যা সংবাদমাধ্যমের পর্দায় বারবার হারিয়ে যায়। প্রতিদিন আমরা শুনি—অমুক হামলায় দশজন শহীদ, তমুক বোমাবর্ষণে বিশজন নিহত, কোনো অভিযানে পঞ্চাশ হাজার প্রাণহানি। সংখ্যাগুলো ক্রমশ এত বড় হয়ে ওঠে যে, তাদের পেছনের মানুষগুলো যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে আছে একজন মানুষ। যার ছিল একটি শৈশব, কিছু স্মৃতি, অসংখ্য স্বপ্ন, অপূর্ণ আশা, আপনজন আর একটি পরিবার। উপন্যাসটি সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকেই আবার আমাদের সামনে ফিরিয়ে আনে—সংখ্যা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে।
অপ্রত্যাশিত এক অতিথি
আমি তখন উপন্যাসটির সবচেয়ে আবেগঘন একটি অধ্যায়ে ডুবে আছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। ঘরের একমাত্র আলো টেবিল ল্যাম্প থেকে এসে পড়েছে বইয়ের পাতার ওপর। জানালাটা আধখোলা—এই আশায় যে হয়তো বাইরে থেকে একটু শীতল বাতাস ঢুকবে।
হঠাৎ যেন অনুভব করলাম, বরফশীতল কিছু একটা আমার ঘাড়ের পেছন দিয়ে বয়ে গেল। চমকে উঠে পেছনে তাকালাম। কেউ নেই। শুধু খোলা দরজাটা অন্ধকার উঠোনের দিকে মুখ করে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেকেই বোঝালাম, হয়তো বাতাসের ঝাপটা। যদিও বিষয়টা অদ্ভুতই লাগছিল। বাতাস যদি আসেই, তবে তো জানালা দিয়ে আসার কথা; দরজার দিক থেকে কেন?
আবার বইয়ের পাতায় চোখ ফেরালাম। কিন্তু এবার আর আগের মতো মন বসছিল না। অকারণ এক অস্বস্তি বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাসের শিস কানে ভেসে এলো। ঘরের তাপমাত্রাও যেন অদ্ভুতভাবে নেমে যেতে লাগল। যদি ঘটনাটা এতটা অবিশ্বাস্য না হতো, তবে বলতাম—চারপাশে হাড়কাঁপানো শীত নেমে এসেছে।
পাখার একঘেয়ে ঘূর্ণনের শব্দ, বাতাসের সেই দীর্ঘশ্বাসের মতো শিস—সবকিছু মিলিয়ে ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। বুকের ভেতর চাপা এক আতঙ্ক ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করল।
আমি এমন মানুষ নই যে গভীর রাতে কবরস্থানের পাশ দিয়ে নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে পারি, কিংবা ঘন জঙ্গলে একা ঢুকে পড়তে পারি। আবার এতটাও ভীরুও নই যে জানালার শব্দ কিংবা ঘরের ছায়া আমাকে সহজেই ভয় পাইয়ে দেবে। কিন্তু আজ যা ঘটছে, তার ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। মনে হচ্ছিল, চোখে না-দেখা কোনো উপস্থিতি নিঃশব্দে ঘরটাকে দখল করে নিচ্ছে।
ঠিক সেই সময়ই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল।
বই থেকে পুরোপুরি চোখ না সরিয়েই, যেন অভ্যাসবশত বাম দিকে তাকালাম। চোখের কোণে এক ঝলক কিছু ধরা পড়ল। আমার থেকে মাত্র এক-দেড় মিটার দূরে। মুহূর্তেই শরীরের রক্ত যেন জমে গেল।
ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম—হয়তো কোনো চেয়ার, হয়তো কাপড় ঝোলানো স্ট্যান্ড, কিংবা আলো-আঁধারির কোনো বিভ্রম। কিন্তু না। সে ছিল একজন মানুষ। ঘরের অন্ধকার কোণে নিশ্চুপ বসে আছে। টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় শুধু তার দেহের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মুখের বেশির ভাগটাই ছায়ায় ঢাকা।
আমার নিঃশ্বাস যেন বুকে আটকে গেল। হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হয়ে উঠল যে মনে হচ্ছিল বুক ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। আমি এক লাফে চেয়ার ছেড়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলাম। লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। তারপর আশ্চর্য রকম শান্ত স্বরে বলল,
“ভয় পেও না। বসে পড়ো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতেই এসেছি।”
ভয়, বিস্ময়, কৌতূহল—সব অনুভূতি একসঙ্গে আমাকে গ্রাস করল। এ লোকটা আমার ঘরে ঢুকল কখন? আমি তো এতক্ষণ এখানেই বসে ছিলাম! একবারও কি টের পাইনি? কিন্তু তার চেয়েও বড় বিস্ময় ছিল অন্য জায়গায়। এই কণ্ঠস্বর… এই মুখ… আমি যেন কোথাও দেখেছি। না, শুধু দেখেছি নয়—আমি একে খুব ভালো করেই চিনি। অসম্ভব! তবু ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ঠিক তখনই সে যেন আমার মনের কথাই শুনে ফেলল। মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিকই চিনেছ। আমিই সে। মনে হচ্ছে, আমার সঙ্গে তুমি বেশ কিছুদিন ধরে পথ চলেছ। তাই ভাবলাম, এবার তোমাকে একটা সাক্ষাৎ দেওয়াই যায়। এসো, বসো।”
আমার জানা ছিল, মৃত মানুষ কিয়ামতের দিন ছাড়া আর ফিরে আসে না। মানুষের কল্পনায় ঘুরে বেড়ানো ভূত-প্রেতের গল্প শুধু ভৌতিক সাহিত্যের পাতায়ই মানায়। তাহলে আমার সামনে বসে থাকা মানুষটি…
ইয়াহইয়া সিনওয়ার? এটা কী করে সম্ভব? গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
“আমি কি স্বপ্ন দেখছি? নাকি… আপনি মৃত্যুর পর ফিরে এসেছেন?”
তিনি মাথা নাড়লেন।
“কোনোটাই নয়। আর সত্যি বলতে কী, প্রশ্নটার খুব একটা গুরুত্বও নেই।”
কথা শেষ করে তিনি টেবিলের ওপর রাখা উপন্যাসটির দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“বলুন তো, উপন্যাসটা কেমন লাগছে?”
আমি তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কী উত্তর দেব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
তিনি আবার বললেন,
“আমি এখানে কীভাবে এলাম, সেটা নিয়ে মাথা ঘামিও না। ভাবো, একজন পাঠক তার পড়া বইয়ের লেখকের সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। এমন সুযোগ জীবনে কয়বার আসে? আর তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, তুমি মনোযোগী পাঠক। এত দুর্লভ সুযোগ নিশ্চয়ই হাতছাড়া করবে না। কী বলো?”
তার কথাগুলো অদ্ভুতভাবে যুক্তিসঙ্গত মনে হলো।
আমি ধীরে ধীরে আবার চেয়ারে ফিরে বসলাম। নিজেকে বোঝালাম—ধরে নাও, এটা একটা স্বপ্ন। স্বপ্ন বলেই মেনে নাও। তাহলেই হয়তো ভয়টা কেটে যাবে, আর মনটা আবার বইয়ের আলোচনায় ফিরবে।
মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল। কোনটা আগে করব, সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। নীরবতা ভাঙতে অবশেষে বললাম,
“চমৎকার… সত্যিই অসাধারণ একটি উপন্যাস। পড়ার মতো, বারবার পড়ার মতো।”
তিনি মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে সন্তুষ্টির চেয়ে প্রত্যাশাই বেশি ছিল।
“এটা তো সৌজন্যমূলক প্রশংসা হলো। আমি তার চেয়ে বেশি কিছু শুনতে চাই। বলো তো, উপন্যাসটির কোন দিক তোমার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে? এর ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি, চরিত্র, চিন্তা কিংবা ঘটনাপ্রবাহ—কোন বিষয়টি তোমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে?”
উপন্যাসের সাফল্য: ফিলিস্তিনের বেদনা পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া
কথা বলতে বলতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, ঘরের পরিবেশ যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। অল্প আগে যে অকারণ শীতলতা আর ভয়ের আবহ আমাকে গ্রাস করেছিল, তার আর কোনো চিহ্ন নেই। বাতাসে আবার পরিচিত উষ্ণতা ফিরে এসেছে। মনে হলো, এবার কথোপকথনের জন্যই যেন পুরো ঘর প্রস্তুত।
আমি ধীরে ধীরে উপন্যাসটির সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ মনে করার চেষ্টা করলাম। টেবিলের ওপর রাখা নোটবুকটি খুলে পড়তে লাগলাম নিজের লেখা ছোট ছোট মন্তব্যগুলো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“সত্যি বলতে কী, এই উপন্যাস আমার জন্য ফিলিস্তিনি জীবনের এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ফিলিস্তিন নিয়ে এর আগে যা পড়েছি, তার অধিকাংশই ছিল ইতিহাস, রাজনীতি কিংবা কূটনৈতিক বিশ্লেষণ। কিন্তু মানুষের জীবন, তাদের প্রতিদিনের কষ্ট, ছোট ছোট স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম—সেসব সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল খুবই সীমিত। এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, আমি যেন গাজার শাতি শরণার্থী শিবিরের টিনের ঘরগুলোর মাঝখানে বসবাস করছি।”
একটু থেমে আবার বললাম,
“শীতের রাতে ফুটো টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ঘরের ভেতরে পড়ছে—আমি যেন নিজেই সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের অপমান, দখলদার বাহিনীর চেকপোস্টে মানুষের অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা, অপমান আর অপেক্ষা—সবকিছু যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। শিশুদের আতঙ্ক, বৃদ্ধদের অসহায়ত্ব, পুরুষদের অপমানবোধ আর নারীদের নিঃশব্দ কান্না—আমি যেন সবই অনুভব করেছি।”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। ঠোঁটে তখনও সেই প্রশান্ত, মৃদু হাসি। আমি বললাম,
“ফিলিস্তিনের ইতিহাস নিয়ে যত বই-ই পড়া হোক, কিংবা যত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কিংবা সংবাদ প্রতিবেদনই দেখা হোক না কেন, সেগুলো মানুষের অনুভূতিকে এভাবে স্পর্শ করতে পারে না। তথ্য আমাদের অনেক কিছু জানায়, কিন্তু উপন্যাস মানুষকে অনুভব করতে শেখায়। আমার মনে হয়, ফিলিস্তিন প্রশ্নে যাদের সামান্যও আগ্রহ আছে—সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম—তাদের প্রত্যেকেরই এই উপন্যাস পড়া উচিত। আপনি ভূমিকায় যেমন লিখেছেন, ‘সমুদ্র থেকে সমুদ্র পর্যন্ত’—এই আহ্বান যেন সত্যিই সবার জন্য।”
তিনি নীরবে হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। তারপর বললেন,
“আমাদের কষ্ট যদি এই উপন্যাসের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পেরে থাকে, তাহলে একজন লেখক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! মনে হচ্ছে, তোমার কাছে আসার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না। তুমি শুধু গল্প পড়োনি; গল্পের ভেতরের জীবনটাকেও বোঝার চেষ্টা করেছ।”
ছিনিয়ে নেওয়া এক শৈশব
আমি বললাম,
“আমি নিজেকে খুব সূক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন পাঠক বলতে পারব না। বইয়ের প্রতিটি প্রতীক বা গভীর ইঙ্গিত ধরতে পারি—এমন দাবিও করি না। তবে পড়তে পড়তে একটা বিষয় বারবার আমাকে ভাবিয়েছে—বিশেষ করে… আপনার শৈশবের অংশগুলো।”
তিনি ভদ্রভাবে আমার কথা থামিয়ে দিলেন। বললেন,
“একটা অনুরোধ করব। ‘আমার শৈশব’ না বলে ‘উপন্যাসের নায়কের শৈশব’ বলো। বইয়ের শুরুতেই তো লিখেছি—এটি কোনো ব্যক্তির হুবহু আত্মজীবনী নয়। সত্যি, আমার জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা এর মধ্যে রয়েছে, কিন্তু আমি চাইনি পাঠক এটিকে কেবল আমার ব্যক্তিগত গল্প হিসেবে পড়ুক। আমি চাই চরিত্রগুলো ব্যক্তি ছাড়িয়ে প্রতীকে পরিণত হোক—একটি জাতির অভিজ্ঞতার প্রতীক।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“ঠিক আছে, সে ভাবেই বলছি। আসলে নায়কের শৈশব আমার কাছে সমগ্র ফিলিস্তিনি শৈশবের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়েছে—একটি শৈশব, যাকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
আমি একটু থেমে আবার বললাম,
“শিশুরা তো রাজনীতি বোঝে না, যুদ্ধের কৌশলও বোঝে না। তারা শুধু বোঝে, হঠাৎ তাদের পৃথিবী বদলে গেছে। আহমদ বুঝতে পারে না, যে মিসরীয় সৈন্যরা কিছুদিন আগেও তাকে আর তার ভাইকে কোলে তুলে আদর করত, পেস্তা-স্বাদের মিষ্টি খেতে দিত, তারাই হঠাৎ রূঢ় হয়ে কেন বাড়ি ফিরে যেতে বলছে। সে বুঝতে পারে না, কেন তার মা তাকে অন্ধকার গর্তের ভেতরে জোর করে লুকিয়ে রাখছেন। যুদ্ধের রাজনৈতিক অর্থ তার অজানা, কিন্তু ভয় তাকে প্রতিটি মুহূর্তে গ্রাস করছে। আর হয়তো না-বোঝার কারণেই সেই ভয় আরও গভীর হয়ে উঠেছে।”
তিনি মাথা নাড়লেন।
“ঠিক তাই। তাই তো নায়কের মুখ দিয়ে বলিয়েছি— ‘যুদ্ধের অর্থ আমি জানতাম না। শুধু বুঝেছিলাম, এটা ভয়ংকর, অস্বাভাবিক, অন্ধকার আর শ্বাসরুদ্ধকর এক বাস্তবতা।'”
আমি বললাম,
“এই একটি বাক্যই যেন পুরো শৈশবের ট্র্যাজেডিকে ধারণ করে ফেলেছে। উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্যগুলোর একটি বলে আমার মনে হয়েছে।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আমি আরেকটি প্রশ্ন করলাম।
“একটা বিষয় জানতে চাই। এমন একটি শৈশবের সঙ্গে প্রতিরোধের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? যে শিশু ছোটবেলা থেকেই দখলদারিত্ব, অপমান আর ভয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠে, সে কি বড় হয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধের পথে হাঁটার জন্য বেশি প্রস্তুত হয়ে ওঠে?”
তিনি উত্তর দিলেন বেশ শান্ত কণ্ঠে,
“অনেক ক্ষেত্রেই তাই হয়। ছোটবেলায় জমে থাকা ভয়, অপমান, বঞ্চনা আর অসহায়ত্ব একসময় শক্তিতে রূপ নেয়। যখন সেই শিশু বড় হয়, তার ভেতরে দখলদারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক কঠিন সংকল্প জন্ম নেয়। অবশ্য এটিই প্রতিরোধের একমাত্র কারণ নয়। বিশ্বাস, আদর্শ, জাতীয় চেতনা—এসবও বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু শৈশবের অভিজ্ঞতা যে একটি গভীর প্রেরণা হয়ে ওঠে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।”
তিনি কিছুটা থেমে আবার বললেন,
“তুমি লক্ষ করবে, যে প্রজন্ম শৈশব থেকেই দখলদারিত্বের নির্মম বাস্তবতা দেখেছে, তাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি ছিল। আর তার আগের প্রজন্মের অনেকেই তুলনামূলকভাবে শান্ত জীবন চাইত—নিজের কাজ, ব্যবসা কিংবা সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চাইত। কারণ প্রত্যেক প্রজন্মের মানসিক গঠন তাদের অভিজ্ঞতাই তৈরি করে।”
‘কাঁটা ও ফুল’: যন্ত্রণার ভেতর আশার সুবাস
আমি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম,
“একটু আগের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে চাই। আপনার উপন্যাসের নাম— কাঁটা ও ফুল—এই শিরোনামটি নিয়ে জানতে ইচ্ছা করছে। সাধারণত কোনো বই নিয়ে আলোচনা শুরু হয় লেখক কিংবা নামের ব্যাখ্যা দিয়ে। কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই সেই নিয়ম মানিনি। আশা করি, এতে আপনার আপত্তি নেই।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“বরং ভালোই করেছ। আমিও চাই না আমাদের কথোপকথন কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকুক। তুমি যেমন ইচ্ছা প্রশ্ন করবে, আমিও তেমনি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেব। আলোচনাটা আনুষ্ঠানিকের চেয়ে আন্তরিক হোক—এটাই ভালো।”
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। বললাম,
“সত্যি বলতে কী, আপনাকে আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম। আপনার বক্তৃতা আর ভিডিওগুলোতে সবসময় এত দৃঢ়, এত কঠোর মনে হতো যে ধারণা করেছিলাম, ব্যক্তিগত জীবনেও আপনি নিশ্চয়ই তেমনই গম্ভীর মানুষ। কিন্তু এখন দেখছি, আপনি বেশ সহজ-সরল আর আন্তরিক।”
তিনি একটু হেসে বললেন,
“তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে যে আমি কঠোর নই?”
তারপর নিজেই ব্যাখ্যা করলেন,
“মানুষের জীবনে প্রত্যেক পরিস্থিতিরই একটি উপযুক্ত ভাষা আছে। শত্রুর উদ্দেশে কথা বললে যে দৃঢ়তা দরকার, পরিবারের সঙ্গে বসে কথা বলার সময় তার কোনো প্রয়োজন নেই। সংবাদমাধ্যমে আমি যে ভাষায় কথা বলি, সেখানে শত্রুও শুনছে। সেখানে দৃঢ়তা দেখাতে হয়। আবার ঘরে, আপনজনদের মাঝে, কোমলতাই স্বাভাবিক। আর সামরিক সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও কঠোরতা ছাড়া উপায় নেই। জীবন একরৈখিক নয়; তাই মানুষের প্রকাশভঙ্গিও একরকম থাকে না।”
একটু থেমে তিনি আবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে এলেন।
“এবার আসি উপন্যাসের নামের কথায়। কাঁটা ও ফুল—এই নামটি আমি বেছে নিয়েছি ফিলিস্তিনি জীবনের দুই বিপরীত বাস্তবতাকে বোঝাতে। একদিকে রয়েছে কষ্ট, বেদনা, ত্যাগ আর রক্তাক্ত পথ; অন্যদিকে আছে আশা, সৌন্দর্য, বিজয়ের স্বপ্ন আর মুক্তির সুবাস। কাঁটা যেমন যন্ত্রণা দেয়, ফুল তেমনি সুবাস ছড়ায়। ফিলিস্তিনের জীবনও ঠিক তেমন—বেদনা আর আশার এক অবিচ্ছেদ্য সহাবস্থান।”
তিনি আরও বললেন,
“তবে পাঠক চাইলে এই শিরোনাম থেকে আরও নানা অর্থ আবিষ্কার করতে পারেন। যেমন কাঁটা সাধারণত পথের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। সে অর্থে প্রতিরোধের পথও কাঁটায় ভরা। কিন্তু পথের শেষে যদি ফুলের সুবাস অপেক্ষা করে থাকে, তবে সেই সুবাস পথের সব ক্ষত, সব কষ্ট, সব রক্তাক্ত পদচিহ্নকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।”
ঈমান: প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় শক্তি
আমি কিছুক্ষণ ভেবে প্রশ্ন করলাম,
“একটা বিষয় সবসময় আমাকে ভাবায়। মানুষ তো স্বভাবতই দ্রুত ফল দেখতে চায়। কুরআনেও এসেছে— ‘মানুষ তো বড়ই তাড়াহুড়োপ্রবণ’ (সূরা ইসরা, ১১)। তাহলে কী এমন শক্তি, যা ফিলিস্তিনি মানুষকে এত দীর্ঘ পথ চলার সাহস দেয়? এত কষ্ট, এত মৃত্যু, এত অপেক্ষার পরও কেন কেউ বলে না—’আর কাঁটা নয়, এবার আমি ফুলই চাই’?”
তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন।
“তুমি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছ। মানুষ সত্যিই ফলাফলের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। এমনকি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরাও কখনো কখনো দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চাইতেন।”
এরপর তিনি হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) এর সেই প্রসিদ্ধ হাদিসের কথা স্মরণ করালেন। তিনি বললেন, সাহাবিরা যখন নির্যাতনের চরম সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, তখন তিনি পূর্ববর্তী ঈমানদারদের অবর্ণনীয় পরীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন—আল্লাহ অবশ্যই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন, কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছ। (সহিহ বুখারি, ৩৬১২)
তিনি বললেন,
“একজন মুজাহিদের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত—তার দায়িত্ব চেষ্টা করা, ফল নিশ্চিত করা নয়। ফল আল্লাহর হাতে। সাহাবিদের অনেকেই শাহাদাত বরণ করেছেন, অথচ তাদের জীবদ্দশায় ইসলাম তখনও দুর্বল ও অবরুদ্ধ ছিল। তবু তারা পথ ছাড়েননি। কারণ তারা জানতেন, তারা একটি দায়িত্ব পালন করছেন। ফলাফল কখন আসবে, সেটি আল্লাহ নির্ধারণ করবেন।”
তিনি একটু থেমে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রজন্মগুলোও এই বিশ্বাস নিয়েই বড় হয়েছে। তাই আমি উপন্যাসে দেখাতে চেয়েছি—আমাদের স্থিতিশীলতার আসল রহস্য অস্ত্র নয়, কৌশল নয়; বরং ঈমান। ঈমানই মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রামে টিকিয়ে রাখে।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
“এই বিষয়টি সত্যিই উপন্যাসজুড়ে খুব স্পষ্ট। বিশেষ করে ইসলামি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের চরিত্রে এটি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান।”
তিনি সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে বললেন,
“আল্লাহর ইচ্ছাই ছিল, ফিলিস্তিনে প্রতিরোধের মশাল ইসলামের পতাকার নিচেই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে। ইতিহাস বলে, যখনই কোনো আন্দোলন এই আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে, তখনই তার দুর্বলতা শুরু হয়েছে। কেউ আবার ফিরে এসেছে; কেউ অহংকারে সেই পতনের দিকেই এগিয়ে গেছে।”
আমি তাঁর কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারছিলাম। তাই সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি কি ফাতাহ ও হামাস—এই দুই আন্দোলনের কথাই বোঝাচ্ছেন?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“আমি আসলে একটি সাধারণ নীতির কথা বলছিলাম। তবে যেহেতু তুমি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছ, তাই বলছি—হ্যাঁ, আমার দৃষ্টিতে হামাসের নানা সীমাবদ্ধতা ও ভুল থাকতে পারে, কিন্তু তারা অন্তত ইসলামি আদর্শকে তাদের পরিচয়ের কেন্দ্রে ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ফাতাহর অতিরিক্ত বাস্তববাদী রাজনীতি ধীরে ধীরে তাদের এমন সব সমঝোতা ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দখলদার শক্তিরই উপকার করেছে। এমনও সময় এসেছে, যখন প্রতিরোধযোদ্ধাদের গ্রেপ্তার করে দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়াকেই ‘জাতীয় দায়িত্ব’ বলে প্রচার করা হয়েছে।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের একটি চরিত্রের কথা মনে করলাম।
“হ্যাঁ, এখন বুঝতে পারছি। নায়কের চাচাতো ভাই ইবরাহিম—যে ইসলামি চিন্তার প্রতিনিধি—আর মাহমুদ—যে ফাতাহর সমাজতান্ত্রিক ধারার অনুসারী—তাদের দ্বন্দ্বটি আসলে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতীক। আমার কাছে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই কারণে যে, আপনি রাজনৈতিক সংঘাতকে বক্তৃতা বা স্লোগানের ভাষায় নয়, একটি পরিবারের দৈনন্দিন সম্পর্কের ভেতর এনে দেখিয়েছেন। ফলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারে, এই মতভেদ মানুষকে কীভাবে ভেতর থেকে স্পর্শ করে।”
তিনি সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন। হেসে দিয়ে বললেন,
“হয়তো এটাকেই আমি বলতে চাই—রাজনীতিকে মানবিক করে তোলা। আমি চেয়েছি এই দ্বন্দ্বকে টেলিভিশনের বিতর্কসভা থেকে বের করে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের ডাইনিং টেবিলে নিয়ে আসতে। যেখানে একই মায়ের সন্তান বা চাচাতো ভাইরা ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাস করে, তর্ক করে, কখনো উত্তেজিত হয়ে ওঠে, প্রায় হাতাহাতির উপক্রম হয়। কিন্তু ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাক ভেসে আসে—‘খেতে এসো।’ আর সেই এক ডাকেই সব মতভেদ সাময়িকভাবে থেমে যায়। কারণ রক্তের সম্পর্ক, পরিবার আর মাতৃস্নেহ—এসব অনেক সময় রাজনীতির বিভাজনের চেয়েও শক্তিশালী।”
উপন্যাসে ফিলিস্তিনি নারী: মাতৃত্বের ভেতর লুকিয়ে থাকা বীরত্ব
মুহূর্তের জন্য আমার মনে ভেসে উঠল উপন্যাসের সেই মায়ের চরিত্রটি। সাধারণ এক ফিলিস্তিনি নারী—যিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, ধর্মীয় শিক্ষারও বড় কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসর তার ছিল না। তবু পুরো উপন্যাসজুড়ে তার উপস্থিতি ছিল অবিস্মরণীয়। কখনো তিনি মমতার আশ্রয়, কখনো দৃঢ়তার প্রতীক, আবার কখনো নিঃশব্দ প্রজ্ঞার উৎস।
আমি কথার সূত্র ধরে বললাম,
“আপনি মায়ের কথা বললেন বলেই মনে পড়ল। আমার কাছে আহমদের মা উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র। তিনি যেন সমগ্র ফিলিস্তিনি নারীর প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু জীবন, অবিরাম সংগ্রাম—সবকিছু কাঁধে নিয়েও তিনি সন্তানদের মানুষ করেছেন। শুধু নিজের সন্তানই নয়, স্বামীর ভাইয়ের এতিম সন্তানদেরও নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। আমার কাছে এটিও এক ধরনের বীরত্ব। যে বীরত্বের হাতে বন্দুক নেই, কিন্তু আছে একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখার অসীম শক্তি।”
তিনি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। আর বললেন,
“ঠিক তাই। উপন্যাসে মায়ের চরিত্রটিকে আমি শুধু একজন ব্যক্তির গল্প হিসেবে রাখিনি। তার ভেতরে আমি এমন অনেক অর্থ ও মূল্যবোধ ধারণ করাতে চেয়েছি, যা অন্য কোনো চরিত্রের মাধ্যমে এত স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না।”
তিনি একটু থেমে বললেন,
“তিনি আসলে পরিবারের ঐক্যের প্রতীক। সন্তানদের বারবার মনে করিয়ে দেন—তোমরা সবাই একই ঘরের মানুষ। মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন সম্পর্কের ভেতর এমন কোনো ফাটল তৈরি না করে, যেখানে দখলদার শক্তি ঢুকে পড়তে পারে।”
তারপর তিনি একটি দৃশ্যের কথা স্মরণ করলেন।
“মনে আছে তো, কারাগারের সেই ঘটনাটি? ভিন্ন ভিন্ন প্রতিরোধ সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। আর বাইরে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি কারারক্ষীরা আনন্দ নিয়ে দেখছিল, একই দেশের মানুষ কীভাবে নিজেদের হাতেই নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করছে। সেই দৃশ্যের বিপরীতে আমি মায়ের চরিত্রটিকে দাঁড় করাতে চেয়েছি—যিনি সব সময় ভাঙনের বদলে মিলনের ভাষা বলেন।”
তিনি আবার বললেন,
“আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ অনেক সময় বাহ্যিকভাবে প্রতিরোধের বিরোধিতা বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্বেগই সন্তানদের আরও সতর্ক, আরও পরিকল্পিত ও আরও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
“ঠিক যেমন ইবরাহিমের ঘটনায়। গাড়ির ভেতর অসাবধানভাবে পিস্তল লুকিয়ে রাখায় মা তাকে কঠোরভাবে বকেছিলেন। কারণ কোনো চেকপোস্টে ধরা পড়লে শুধু তার নিজের জীবনই নয়, পুরো নেটওয়ার্কই বিপদের মুখে পড়তে পারত।”
তিনি হাসলেন। মনে হলো, আমি ঘটনাটি মনে রাখতে পেরেছি বলে তিনি খুশি হয়েছেন। অদ্ভুত এক তৃপ্তি আমাকেও ছুঁয়ে গেল। যেন একজন লেখকের সামনে তার বইয়ের সূক্ষ্ম একটি দৃশ্য স্মরণ করতে পারার ছোট্ট আনন্দ।
তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“তবে আমার কাছে মায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ছিলেন সন্তানদের নৈতিক প্রহরী। ছোটবেলা থেকেই তিনি তাদের চরিত্র, শিষ্টাচার আর মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন। প্রয়োজনে কঠোর হয়েছেন, শাস্তি দিয়েছেন, কিন্তু কখনো ছাড় দেননি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতির প্রতিরোধ শুধু অস্ত্রের ওপর দাঁড়ায় না; তার ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারে, বিশেষ করে মায়ের হাতে গড়া চরিত্রের ওপর।”
তারপর মুচকি হেসে বললেন,
“হাসানের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? প্রতিবেশীর মেয়ের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করায় যে মারটা সে খেয়েছিল!”
আমি হেসে ফেললাম। হাসানের গল্পটা সত্যিই মনে ছিল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই ছিল গভীর বেদনা। কারণ শেষ পর্যন্ত ছেলেটির জীবন এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে সে পথ হারিয়েছিল, আর একসময় দখলদার শক্তিরই সহযোগী হয়ে উঠেছিল।
হাসানের কথা মনে পড়তেই উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসে দাঁড়াল—প্রতিরোধ আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, আদর্শগত স্বচ্ছতা এবং দখলদার শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের সীমারেখা। আমি তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,
“আপনার উপন্যাসে বারবার একটি বিষয় ফিরে এসেছে—সংগ্রামের কাতারকে স্বচ্ছ রাখা, অর্থাৎ কে আপন, কে প্রতিপক্ষ, আর দখলদারের সঙ্গে আপসের সীমা কোথায়। জানতে চাই, বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন এই ধারণাটি কীভাবে গড়ে তুলেছে? দখলদার শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা বা সম্পর্কের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে?”
প্রতিরোধের কাতারের স্বচ্ছতা: দখলদারের সঙ্গে সম্পর্কের কঠিন বাস্তবতা
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“মনে হচ্ছে, হাসানের করুণ পরিণতিই তোমাকে এই প্রশ্নটি করতে বাধ্য করেছে।”
আমি বিস্মিত হলাম। আবারও মনে হলো, তিনি যেন আমার মনের কথাই পড়ে ফেলছেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেই থামালাম। এই পুরো সাক্ষাৎকারই তো যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এক অভিজ্ঞতা। সেখানে তার আমার ভাবনা জেনে ফেলা নিয়ে আর বিস্মিত হওয়ার কী আছে! তাই শুধু হালকা একটা হাসি দিয়ে চুপ করে রইলাম।
তিনি বলতে শুরু করলেন,
“এই বিষয়টি শুরু থেকেই অত্যন্ত জটিল ছিল। ইসরায়েল যখন অধিকৃত ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভেতরে কাজ করার সুযোগ দিতে শুরু করল, তখন প্রতিরোধ আন্দোলনের সামনে এক কঠিন নৈতিক প্রশ্ন এসে দাঁড়াল।”
তিনি ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করলেন,
“একদিকে ছিল মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারগুলো ওই কাজের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাত। অন্যদিকে ছিল এই বাস্তবতা যে, তাদের শ্রম শেষ পর্যন্ত দখলদার রাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করছে।”
তিনি একটু থেমে বললেন,
“প্রতিরোধ আন্দোলনের সামনে তখন দুটো পথ ছিল, আর দুটিই ছিল কঠিন। মানুষকে ওই কাজ থেকে বিরত রাখলে তাদের পরিবার না খেয়ে থাকবে। আবার অনুমতি দিলে তারা এমন এক ব্যবস্থার অংশ হবে, যা শেষ পর্যন্ত দখলদারেরই উপকারে আসে। দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—জীবিকার তাগিদে যারা সেখানে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের সবাইকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখা হবে না। এই বাস্তবতাকে আলাদা করে বিবেচনা করা হবে।”
তিনি আরও যোগ করলেন,
“শুধু এটুকুই নয়। শুরুতে বিভ্রান্তি ছিল আরেকটি ক্ষেত্রেও। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত দ্রুজ সম্প্রদায়ের সদস্য কিংবা অধিকৃত ভূখণ্ডের আরবদের নিয়ে কী অবস্থান নেওয়া হবে—সেটিও সহজ প্রশ্ন ছিল না। কারণ জাতিগত পরিচয়ে তাদের অনেকেই ফিলিস্তিনি সমাজের অংশ।”
তারপর তার কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে উঠল। অদ্ভুত দৃঢ়তায় তাকে বলতে শুনলাম,
“কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ আন্দোলন একটি স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করে। যে-ই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পোশাক পরে, তাদের অস্ত্র বহন করে এবং সেই বাহিনীর দায়িত্ব পালন করে সে আর শুধু জাতিগত পরিচয়ে বিচার্য নয়; সে দখলদার বাহিনীর সদস্য। সুতরাং প্রতিরোধের দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা হবে।”
তিনি বললেন,
“একইভাবে যারা গোয়েন্দাগিরি করে, প্রতিরোধযোদ্ধাদের তথ্য শত্রুর হাতে তুলে দেয় কিংবা দখলদারের হয়ে কাজ করে তাদের ব্যাপারেও অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই শাস্তি কার্যকর করা হতো, যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। আবেগের চেয়ে সংগঠনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দিলে কোনো গোপন সংগঠনই টিকে থাকতে পারে না, কোনো প্রতিরোধই সফল হতে পারে না।”
আমি তার কথার সূত্র ধরে বললাম,
“তা সত্ত্বেও তো গুপ্তচর পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সমাজের ভেতরেও ছিল, কারাগারের ভেতরেও ছিল। কেউ অর্থের লোভে, কেউ ভয়ের কারণে, কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের মানুষদেরই বিক্রি করে দিয়েছে। তবে প্রতিরোধ আন্দোলনের কঠোর শাস্তির ভয় না থাকলে হয়তো এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিত।”
তিনি সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বললেন,
“ঠিক তাই। আর ইবরাহিমের হাতে তার নিজের ভাই হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনাটি মনে আছে তো? ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে নীতিকে বড় করে দেখার কঠিন বাস্তবতাই সেখানে তুলে ধরতে চেয়েছি। এই ধরনের সিদ্ধান্ত মানবিকভাবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কিন্তু সংগঠনের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে প্রতিরোধ আন্দোলন সেগুলোকে অপরিহার্য বলে মনে করত।”
প্রতিরোধ অভিযানের বিস্তার ও প্রভাব
আমি নতুন প্রসঙ্গ তুললাম।
“উপন্যাসে দেখা যায়, প্রতিরোধের অভিযান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জানতে চাই, এই পথচলা শুরু হলো কীভাবে? অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, আপনার ভাষায়, ‘প্রতিটি বড় অভিযানের পর দখলদার নেতৃত্ব প্রায় উন্মত্ত হয়ে উঠত’?”
প্রশ্নটি শুনে তার মুখে ভিন্নরকম এক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। মনে হলো, এ বিষয়টি তার হৃদয়ের খুব কাছের। তিনি সামান্য সোজা হয়ে বসলেন। বললেন,
“উপন্যাসেও আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি—প্রতিরোধের পথ বন্দুক দিয়ে শুরু হয়নি। তার শুরু ছিল মানুষ গড়ার মাধ্যমে। দীর্ঘ সময় ধরে আদর্শিক, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের সদস্যদের চরিত্র, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা হয়েছে। এরপর এসেছে ময়দানের কাজ।”
তিনি বললেন,
“সেই সময় ফাতাহর অনেক কর্মী আমাদের নিয়ে উপহাস করত। তাদের ধারণা ছিল, এত পড়াশোনা, এত তারবিয়াত—এসব করে সময় নষ্ট হচ্ছে। উপন্যাসে নিশ্চয়ই মনে আছে, মাহমুদ কীভাবে তার চাচাতো ভাই ইবরাহিমকে এবং ইসলামি আন্দোলনকে ‘দুনিয়ার বাস্তবতা না-জানা ধর্মভীরু মানুষ’ বলে ব্যঙ্গ করত।”
আমি মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন,
“তারপর যখন প্রতিরোধের সামরিক অভিযান শুরু হলো, তখনও সেগুলো ছিল খুবই সীমিত। কোথাও ছুরি নিয়ে হামলা, কোথাও ছোট পিস্তল দিয়ে গুলি—এগুলোই ছিল প্রথম দিকের বাস্তবতা।”
তিনি একটু থেমে বললেন,
“কিন্তু সংগঠন থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সংগ্রহ করা হলো। নানা উপায়ে কালাশনিকভসহ আরও উন্নত অস্ত্রের ব্যবস্থা করা হলো। একই সঙ্গে কিছু দক্ষ প্রকৌশলী নিজেদের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুললেন। শহীদ ইয়াহইয়া আইয়াশের মতো ব্যক্তিরা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম সাংগঠনিক পরিকল্পনা ও গোপন কৌশল।”
তিনি বললেন,
“ফলে প্রতিরোধের প্রতিটি সফল অভিযান দখলদার নেতৃত্বের জন্য বড় ধাক্কায় পরিণত হতে লাগল। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ্যে চলে আসত। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশেষ বাহিনীও কখনো কখনো একজন প্রতিরোধযোদ্ধাকে খুঁজে বের করতে হিমশিম খেত। এইভাবেই প্রতিরোধ আন্দোলন ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে। কোনো অপমানজনক সমঝোতার মাধ্যমে নয়, নিজেদের সক্ষমতার মাধ্যমে।”
আমি বললাম,
“তাহলে যারা বলে প্রতিরোধের এসব অভিযান কোনো বাস্তব ফল দেয়নি, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে আপনার মূল্যায়নের বড় পার্থক্য রয়েছে।”
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“অবশ্যই। প্রতিরোধবিরোধী অনেকেই শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখেন, কিন্তু দখলদার সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এসব অভিযানের যে গভীর মানসিক চাপ, নিরাপত্তা-সংকট এবং ভয় সৃষ্টি হতো, সেটিকে তারা প্রায় কখনোই গুরুত্ব দেন না। ছোট একটি অভিযানও কখনো কখনো শত্রুর ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা কেবল নিহত বা আহতের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আর বড় অভিযানের কথা তো বলাই বাহুল্য।”
‘তুফান’: প্রতিরোধের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়
‘বড় বড় আঘাত’—এই কথাটি যেন হঠাৎ আমার ভেতরে নতুন এক প্রশ্নের আলো জ্বেলে দিল। মনে মনে বললাম, যদি সত্যিই ইয়াহইয়া সিনওয়ার আমার সামনে বসে থাকেন, তাহলে পৃথিবীকে নাড়া দেওয়া সেই ঘটনার কথা তাকে জিজ্ঞেস না করে কীভাবে থাকি?
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“একটা প্রশ্ন করতে চাই। যদি আলাপের বিষয় থেকে খুব বেশি সরে না যাই… আল-আকসা তুফান নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
তিনি হালকা হেসে উত্তর দিলেন,
“খুব বেশি সরে যাবে না। বরং বলা যায়, উপন্যাসে যে দীর্ঘ প্রস্তুতি, সংগঠন গড়ে তোলা আর মানসিক নির্মাণের কথা এসেছে, সেই ধারাবাহিকতারই একটি পরিণতি ছিল সেই অভিযান। তাই এটিও আমাদের আলোচনার অংশ হতে পারে।”
আমি বললাম,
“তাহলে বলুন, আপনি সেই ঘটনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? বিশেষ করে এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় নিলে?”
টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় তার চোখ দুটো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“এই বিষয় নিয়ে বলতে গেলে একটি রাত যথেষ্ট হবে না। আমার দৃষ্টিতে এটি ছিল ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমি এটিকে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখি না; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।”
তিনি কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
“আমার বিশ্বাস, এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত কিছু ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং নতুন করে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করা। আমার দৃষ্টিতে, সেই দিক থেকে ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। বহু দেশে এ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে, বিভিন্ন সরকার তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছে, আর বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিন প্রশ্ন নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করলেন,
“অনেক মানুষ আবারও ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়েছে। কেউ পুরোনো নথি পড়েছে, কেউ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করেছে। আবার অনেকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখেই নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করতে শুরু করেছে।”
আমি বললাম,
“কিন্তু এসব পরিবর্তনের বাস্তব গুরুত্ব কতটা আপনি মনে করেন?”
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন,
“আন্তর্জাতিক জনমত, কূটনৈতিক সমর্থন কিংবা একটি রাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি—এসব কোনো ছোট বিষয় নয়। বহু রাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে বিপুল অর্থ, প্রচার এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। সেই অবস্থান যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে সেটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করলাম,
“ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?”
তিনি বললেন,
“আমার দৃষ্টিতে, সেই অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি ছিল নিরাপত্তাবোধের ধারণাকে নাড়া দেওয়া। বহু মানুষ, যারা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে বিশ্বাস করত, তারা প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করল যে সংঘাতের বাস্তবতা তাদের কাছেও পৌঁছাতে পারে।”
তিনি বললেন,
“ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি ছিল অভিবাসন নীতির অন্যতম ভিত্তি। তাই যখন সেই নিরাপত্তাবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার প্রভাব কেবল সামরিক নয়; মানসিক ও সামাজিকও হয়।”
একটু থেমে তিনি আরও যোগ করলেন,
“এ ছাড়া ফিলিস্তিনি সমাজ এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি অংশের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস, প্রতিরোধের মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি।”
আমি তার কথার সারসংক্ষেপ টেনে বললাম,
“অর্থাৎ, আপনার মতে এই ঘটনা একদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচলিত অনেক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রচলিত বিশ্বাসকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।”
তিনি মাথা নাড়লেন।
“আমার মূল্যায়ন তাই। আর ইতিহাসের সব বড় ঘটনার মতোই এর প্রকৃত প্রভাবও সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।”
তারপর তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে সেই পরিচিত প্রশান্ত হাসি। হাসি হাসি মুখেই বললেন,
“আচ্ছা, এবার আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। সত্যি বলতে কী, তোমার সঙ্গে এই কথোপকথন আমার খুব ভালো লেগেছে।”
আমি যেন স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কথাগুলো পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই বুকের ভেতর আবার সেই প্রথম দিককার অজানা ভয়ের অনুভূতিটা ফিরে এল। কী বলব, কী করব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঠিক তখনই, হঠাৎ আমার চোখ খুলে গেল। মাথা তখনও টেবিলের ওপর ঝুঁকে আছে। আমি চারদিকে তাকালাম। সবকিছু আগের মতোই। তাহলে এতক্ষণ যা দেখলাম, তা কি স্বপ্ন ছিল? নাকি অন্য কোনো অভিজ্ঞতা?
আমি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলাম না।
বরং দ্রুত একটি কাগজ আর কলম হাতে নিলাম। মনে যতটুকু রয়ে গেছে, সব লিখে ফেলতে হবে—ভুলে যাওয়ার আগেই। শেষ লাইনটি লিখে জানালার দিকে তাকালাম।
পূর্ব দিগন্তে তখন ভোরের প্রথম আলোর রেখা ফুটে উঠেছে। রাত্রির দীর্ঘ অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আলো এসে পড়ছে পৃথিবীর বুকে।