সালমান সাদিকের স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ: বিচিত্র সব ঘোর, নিরুদ্দেশের ঘোরে

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ

বই: স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ 

লেখক: সালমান সাদিক 

ধরন: গল্প 

পৃষ্ঠা: ১৩৮ 

গায়ের দাম: ৩৮০ 

প্রকাশনী: চিলেকোঠা 

বাংলাদেশি যেসব গল্প, ওগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। পড়তেই বুঝে ফেলা যায়, এটি বাংলাদেশি। কারণ, সেসব গল্পের প্লট, রঙচঙ, পরিবেশ-পরিস্থিতির বর্ণনা এবং গল্পের কাহিনি, এসব খোদ বলে দেয়।

তরুণ গল্পকার, সালমানের গল্পগুলোতে বিদেশি একটা টোন আছে। তিনি গল্পের বাংলাদেশি বৈশিষ্ট্যগুলোর ভেতরে থেকে লিখেন না, বরং সীমারেখার উপর দাঁড়িয়ে গল্পের অভ্যন্তরে ধ্যানমগ্ন শিকারি পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরার মতন ক্যারেক্টর এবং কাহিনিদের সত্তায় তিনি দেশীয় গল্পগুলোর মতো কোমলতা নয়, বরং জীবন-দর্শন, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়ার বড়শিটি ফেলেন। আবার এসবের বাইরে গিয়ে সামগ্রিকভাবে, কাঠামোগত একটা কোমলতাও আছে—পুরোপুরিভাবে কোমলতা বিবর্জিতও নয়। এবং পাঠক নিজেই তার ভেতরগত সত্তার সাথে আলাপচারিতা শুরু করে দেয় এমন সব গল্প পড়ার সময়। আবার এমন কিছু গল্পও আছে বইটিতে, যেগুলো পড়ে মনে হবে বাংলাদেশি।

বইটিতে নানান ধরনের গল্প স্থান পেয়েছে। ম্যাজিক রিয়েলিজম (জাদুবাস্তব), জীবন-দর্শন, জৈবনিক ও নিত্যদিনকার কিছু গল্প। যেমন ম্যাজিক রিয়েলিজমের ‘ছায়া এবং অবয়ব’, ‘সাতরঙা ডিম’ এই দুটি পড়ার সময় পাঠক ভাবতেই পারবেন না তিনি কোন ঘোরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। ‘সাতরঙা ডিম’ গল্পটি নয় পৃষ্ঠার, কখন শুরু করে শেষ করে ফেলেছি এখনো আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়, ঠিক এই জাদুবাস্তব গল্পটির মতোই। জাদুবাস্তব গল্পগুলোতে সমালোচনা করা যায় না তেমন। কারণ আমরা বাস্তবতার অস্তিত্বে বাস করি। ‘সাতরঙা ডিম’ গল্পটির ক্ষেত্রে এতটুকু বলতে পারি, গল্পের ‘শুরুয়াত’টা আরো চমকপ্রদ হতে পারত।

ঠাট্টা-বিদ্রুপমূলক কয়েকটি গল্প আছে। যেমন, ‘শীর্ষ ধনীদের তালিকা’, ‘একজন বুদ্ধিজীবী ও ষড়যন্ত্র’, ‘হসপিটাল ও তুলনাত্মক মডার্ন আর্ট বিশ্লেষণ’ ও ‘গুবরে পোকার পেটে’ এই গল্পগুলোতে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজের করুণ বাস্তবতা। ‘শীর্ষ ধনীদের তালিকা’ একটা বিষাদিত গল্পও বলা যায়। একদিকে ধনীরা ধনীই হচ্ছে, অন্যদিকে ঘরে একমুঠো চালের অভাবে বেকার পুরুষটি ঘরে ঢুকে না দুদিন যাবৎ।

লেখকের কলম খুবই চতুর, কোথায় গিয়ে কী বলতে হয় তা ভালো করেই আয়ত্ত করিয়েছেন লেখক তার কলমকে। কখনো হাস্যরসে, কখনো কান্নাজলে। তা আরো ভালো করে দেখতে পাই ‘হসপিটাল ও তুলনাত্মক মডার্ন আর্ট বিশ্লেষণ’ গল্পটিতে। লেখকের কলমের কণ্ঠস্বর ওখানে দেখার মতো ছিল। সচেতন পাঠকমাত্রই তা উপলব্ধি করা যায়। দারুণ একটি মজার গল্পই বটে।

ভিলেজ পলিটিক্সের একটা গল্প আছে। ‘কুরবানির গরু’। কুরবানির সময়গুলোতে গরুকে কেন্দ্র করে কত চুরি আর ডাকাতি হয়, তা-ই তিনি দেখিয়েছেন। এসবের নেতৃত্বে থাকে সমাজের এমপি, চেয়ারম্যান ও মেম্বার। এ ঘটনাগুলো আমাদের সমাজেই ঘটে, আমাদেরই অদৃশ্যে।

জীবনদর্শনভিত্তিক ‘প্রজন্মান্তর’ ও ‘এক অবিশ্রান্ত যাত্রার গন্তব্য’। এই গল্পদুটোতে একটা যোগসূত্র দেখা যায়। ‘প্রজন্মান্তর’ গল্পে একদল বিপ্লবী যুবকের সংগ্রাম শুরু হয়, সমাজকে পাল্টে ও বদলে দেয়ার। ‘এক অবিশ্রান্ত যাত্রার গন্তব্য’ গল্পটিতে গিয়ে ওই গল্পের পরিণতি হয়। আমরা দেখতে পাই, তিনি গল্পের শুরুই করেন মানুষের বিশেষত্ব দিয়ে। তিনি বলেন, একজন মানুষের বিশেষত্ব মূলত তার চিন্তা করার ক্ষমতায়। এবং তার চিন্তাকে বাস্তবায়ন করাই কি তার সফলতা? এখানে তিনি মানুষের মনস্তত্ত্বে ঢুকে গিয়ে বিশ্লেষণ করেন, একেকজন মানুষের একেক দৃষ্টিভঙ্গি। একেক পর্যবেক্ষণ। আর মানুষ তার চিন্তা অপর মানুষের উপর চাপিয়ে দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আবার এমন কতিপয় মানুষও আছে, যারা বলে তুমি মানলে মানো, না মানলে নাই। আমার বলা আমি বলে দিয়েছি। এর অর্থ ওই ভদ্রলোক তার কথাই ‘মুখাতেব’ ব্যক্তিটিকে গিলাতে চাচ্ছেন।

এভাবে যখন গল্পটি এগিয়ে যায়, এবং শেষের দিকে উপনীত হয় তখন আমরা ‘প্রজন্মান্তর’ গল্পটির সাথে এই গল্পের যোগসূত্র দেখি। এই গল্পের শেষে এক বৃদ্ধের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। এবং ওই বৃদ্ধ বলেন, বৎস, তুমি এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় যত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস হাসিল করেছো তা মূলত ভুল অর্জন। বৃদ্ধ দরবেশ কোন লেন্স দিয়ে মেপেছেন যে যুবক ভুল ছিল? তা মূলত ভাবারই এক জানালা। আমরা যে জানালার সন্ধানে অনেক উদাসীন, আবার অনেকেই ওই জানালার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার জীবন শেষ হয়ে যায়। বৃদ্ধ বলেন, “এই প্রকাণ্ড বৃক্ষ আর এই বৃক্ষের শিকড় যে মাটিতে রয়েছে সেই মাটি আর বায়ুর আবর্তন এবং বৃক্ষের উপরের আকাশ, চাঁদ, তারা ও নক্ষত্র আর এসবকিছুকে নিয়ে যে বিশাল বিশ্ব আর বিশ্বের সাথে সহাবস্থান করতে থাকা অন্যান্য জগৎ; এসবের মধ্যেই রয়েছে জ্ঞানার্জনের সকল উপকরণ। যখন তুমি নিজের দুর্বলতা স্বীকার করবে এবং নিজের ঔদ্ধত্যকে ত্যাগ করবে তখন তুমি এই বিশালতার অসীম বিপুল সম্ভাবনার মধ্যে খুঁজে পাবে সেই জ্ঞান, যা মূলত তোমার মধ্যেই রেখে দেওয়া হয়েছিল সেই শুরু থেকেই যেখান থেকে তোমার প্রাণ এবং দেহের অস্তিত্বের সৃষ্টি। মূলত তোমার জন্য রয়েছে শিক্ষা সেই সৃষ্টির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একই স্থানে একই মাপকাঠিতে মাপা সমস্ত কার্যকারণের ব্যাখ্যার মধ্যে, যা তুমি নিজস্ব জ্ঞানগত স্বকীয় ঔদ্ধত্যের কারণে অস্বীকার করে এসেছ।” (এই গল্পদুটির যে যোগসূত্রের কথা বললাম, তা আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে।)

লেখক বৃদ্ধ দরবেশকে দিয়ে যে কথা বলিয়ে নিয়েছেন, এই ক’টি বাক্য সত্যিই অনস্বীকার্য। জীবন এবং তার অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসতে হয়। ভাবার মতোই বলেছেন।

‘জীবন্মৃত’ গল্পটিতে লেখক পৃথিবীর এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমরা কি বেঁচে আছি আসলে? আমরা যে রোবটিক্স জীবনটা যাপন করছি, এর শেষ কোথায়? আশপাশে কত মানুষ, তাদের নিজেদের অন্তর্গত সত্তাটা কি প্রফুল্ল? নাকি সকলেই নিজের ভেতর, নিজেরই লাশ বয়ে বেড়াচ্ছে, আর বাহ্যিকভাবে যে আনন্দোচ্ছ্বাস, তা তো মৃত ব্যক্তিকে ঘিরেই শোকের নাম। তা নয় কি?

আমাদের সমাজের পেছনে একটি দল আছে। যারা রাজনৈতিক কলকাঠি নাড়ে। যারা আমাদের সরাসরি হুকুম করে না, এমনভাবে যন্ত্র চালায়, আমাকে-আপনাকে তা করতেই হবে। তাদের মতো চিন্তা করা, তাদের মতো জীবনযাপন। এ-ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে লেখক লিখেছেন ‘দরজার এপাশ-ওপাশ’ শিরোনামে সার্থক একটি গল্প। এছাড়া আরও দুটি রয়েছে, ‘পলায়ন’ ও ‘আমার চোখ’। এখানে লেখকের মেটাফর সাধারণ পাঠকের বোধগম্য নয়। আমারও এখনো অস্পষ্ট। সবকিছু ঘোরের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। যেন, উপলব্ধিরই সন্দেহজনক স্পষ্টতা। অথবা, বিচিত্র সব ঘোর, নিরুদ্দেশের ঘোরের পানে তীরবিদ্ধ অশ্বের মতো মাতাল হয়ে ছুটে চলছে। এ এক বিস্ময়কর অনুভূতি!

লেখক যে গল্পটির জন্য বেঁচে থাকবেন তার শিরোনাম ‘স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ’। এটিকে লেখকের সিগনেচারও বলা যায়। একটা কওমি-সন্তান দশ-বারো বছর মাদ্রাসায় পড়ে কী অর্জন করে? আখেরাত, নাকি দুনিয়া? কোনোটাই হয় না। আখেরাত হলে, বাস্তবিক জীবনে তার জীবনযাপনের সম্বলটুকু কই? শুধু স্বপ্নই দেখে যায় প্রতিটি ছাত্র। একটাও যদি পূরণ হতো!? লেখক খুব হেয় প্রতিপন্ন ও ঠাট্টা করে এটাকে দেখিয়েছেন, একজন ছাত্র মোটা হতে চায়। সে শত চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। এরপর যখন তার পেট ঢুলে পড়ে পাজামার উপর দিয়ে, তখন সে হতাশ হয়ে চিকন হতে চায়। কিন্তু পারে না। লেখক তারপর কওমির অচল শিক্ষাব্যবস্থার কথা তুলে আনেন। যেখানে ইমাম গাজ্জালির খাদ্য সম্পর্কিত একটা সুফি দর্শন তিনি বয়ান করেন। ওই ছাত্র সে অনুযায়ী আমল করতে গেলে তার উস্তাদ নিষেধ করে। বলে, এরকম হলে তো তুমি ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারবে না। কিছুই করতে পারবা না, ক্লান্ত হয়ে পড়বা।

দরসে নেজামি বা তথাকথিত কওমি মাদ্রাসাগুলোর যে শিক্ষাব্যবস্থা, তা সংস্কার করার গুরুত্ব এই গল্পটিতে উঠে এসেছে। দেখানো হয়েছে, এখানে এত বিষয় পড়ানো হয়, দেখা যায় দশ-বারো বছর পড়ার পর একটা ছাত্র শেষমেশ কিছুই হতে পারে না ঠিকঠাক। শুধু স্বপ্নই দেখে যাওয়া। এবং পেপার কাটিং করে স্বপ্ন সংগ্রহ করে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া।

লেখককে এই গল্পটির জন্য স্যালুট দেয়া যায়।

ব্যক্তিগত ভাবনা: 

বইটি পড়তে গিয়ে আমার মস্তিষ্কে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। বাংলা সাহিত্যে রাবীন্দ্রিক যে কোমলতাটা দিয়ে গল্পের কাহিনি এগোয়, সেখানে এই গল্পগুলো আপনার নিরুত্তাপ মস্তিষ্ককে অনেকটা উষ্ণতা দিবে। ভাবতে শেখাবে, লেখকের ভাষায় যেটাকে বলা যায়, ‘মানুষের বিশেষত্ব হলো তার চিন্তা করার ক্ষমতায়’।

বলা ভালো, যারা হুমায়ূন-পাঠক, তাদের বইটি বাচাল মনে হবে। তাই বলব, যারা পড়ার জগতে একটু অগ্রসর, তারা পড়তে পারবেন। সাহিত্যের নতুন দরজায় আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে তরুণ গল্পকার সালমান সাদিকের ‘স্বপ্নভঙ্গ সংগ্রহ’।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments